📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শাস্তি অবতরণ

📄 শাস্তি অবতরণ


শাস্তি অবতরণ
কোন জাতির নিকট নবী-রাসূল ও আসমানী কিতাব না পাঠানো পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা সেই জাতিকে তাহাদের অপরাধের কারণে ধ্বংস করেন না।
وَמَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا . "আমি রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাহাকেও শাস্তি দেই না" (১৭: ১৫)।
নবী এবং তাঁহার আনীত বার্তা বান্দার অভিযোগ উত্থাপন করিতে না পারার জন্য আল্লাহর তরফ হইতে প্রমাণ (হুজ্জাত)। এই প্রমাণ পূর্ণরূপে পেশ না করা পর্যন্ত বান্দাকে শাস্তি প্রদান ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। অন্যথায় বান্দা এই আপত্তি উত্থাপন করার সুযোগ পায় যে, তাহাদেরকে অনুসরণীয় বিষয় অবহিত করা হয় নাই, তাই তাহারা শাস্তিযোগ্য হইবে কেন? অতএব ন্যায়বিচারের স্বার্থে আল্লাহ তাআলা নবী-রাসূল প্রেরণ করিয়া মানবজাতিকে তাঁহার বিধান অবহিত করেন এবং তাহা মানিয়া লওয়ার আহবান জানান। একটি নির্দিষ্ট কাল ব্যাপিয়া নবী-রাসূলগণ দাওয়াত দিতে থাকেন এবং তাহাদের আহ্বানে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী সাড়া না দিলে তাহাদেরকে ক্রমান্বয়ে ছোটখাট বিপদ দ্বারা সতর্ক করা হয়। যেমন সূরা ইয়াসীনে অনুরূপ একটি দৃষ্টান্ত পেশ করা হইয়াছে :
وَاضْرِبْ لَهُمْ مَثَلًا أَصْحَبَ الْقَرْيَةِ إِذْ جَاءَهَا الْمُرْسَلُونَ . إِذْ أَرْسَلْنَا إِلَيْهِمُ اثْنَيْنِ فَكَذَّبُوهُمَا فَعَزَّزْنَا بِثَالِثٍ فَقَالُوا إِنَّا إِلَيْكُمْ مُرْسَلُونَ . قَالُوا مَا أَنْتُمْ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُنَا وَمَا أَنْزَلَ الرَّحْمَنُ مِنْ شَيْءٍ إِنْ أَنْتُمْ إِلَّا تَكْذِبُونَ . قَالُوا رَبُّنَا يَعْلَمُ إِنَّا إِلَيْكُمْ لَمُرْسَلُونَ . وَمَا عَلَيْنَا إِلَّا البَلْغُ الْمُبِينُ. قَالُوا إِنَّا تَطَيَّرْنَا بِكُمْ لَئِنْ لَّمْ تَنْتَهُوا لَنَرْجُمَنَّكُمْ وَلَيَمَسَّنُكُمْ مِنَّا عَذَابٌ أَلِيمٌ. قَالُوا طَائِرُكُمْ مَعَكُمْ أَئِنْ ذُكَرْتُمْ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُسْرِفُونَ، وَجَاءَ مِنْ أَقْصَا الْمَدِينَةِ رَجُلٌ يَسْعَى قَالَ يُقَوْمِ اتَّبِعُوا الْمُرْسَلِينَ . اتَّبِعُوا مَنْ لَّا يَسْأَلُكُمْ أَجْرًا وَهُمْ مُهْتَدُونَ .

"উহাদের নিকট এক জনপদের অধিবাসীদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা কর, যখন তাহাদের নিকট রাসূলগণ আসিয়াছিল। যখন উহাদের নিকট দুইজন রাসূল পাঠাইয়াছিলাম, তখন উহারা তাহাদেরকে মিথ্যাবাদী বলিয়াছিল। অতঃপর আমি তাহাদেরকে শক্তিশালী করিয়াছিলাম তৃতীয় একজন দ্বারা। তাহারা বলিয়াছিল, আমরা তো তোমাদের নিকট প্রেরিত হইয়াছি। উহারা বলিল, তোমরা আমাদের মতই মানুষ, দয়াময় আল্লাহ তো কিছুই নাযিল করেন নাই। তোমরা কেবল মিথ্যাই বলিতেছ। তাহারা বলিল, আমাদের প্রতিপালক জানেন, আমরা অবশ্যই তোমাদের নিকট প্রেরিত হইয়াছি। স্পষ্টভাবে প্রচার করাই আমাদের দায়িত্ব। উহারা বলিল, আমরা তো তোমাদেরকে অমঙ্গলের কারণ মনে করি। যদি তোমরা বিরত না হও তবে অবশ্যই আমরা তোমাদেরকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করিব এবং আমাদের পক্ষ হইতে অবশ্যই তোমাদের উপর মর্মন্তুদ শাস্তি আপতিত হইবে। তাহারা বলিল, তোমাদের অমঙ্গল তোমাদেরই সাথে, ইহা কি এইজন্য যে, আমরা তোমাদেরকে উপদেশ দিতেছি? বস্তুত তোমরা এক সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়। নগরীর প্রান্ত হইতে এক ব্যক্তি ছুটিয়া আসিল। সে বলিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা রাসূলগণের অনুসরণ কর। অনুসরণ কর তাহাদের, যাহারা তোমাদের নিকট কোন প্রতিদান চায় না এবং যাহারা সৎপথ প্রাপ্ত" (৩৬ঃ ১৩-২১)।

উদ্ধত সম্প্রদায় এই লোকটিকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করার পর আল্লাহ তা'আলা তাহাদেরকে ধ্বংসাত্মক শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করান:
وَمَا أَنْزَلْنَا عَلَى قَوْمِهِ مِنْ بَعْدِهِ مِنْ جُنْدٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَمَا كُنَّا مُنْزِلِينَ إِنْ كَانَتْ إِلَّا صَيْحَةً وَاحِدَةً فَإِذَاهُمْ حمِدُونَ يُحْسَرَةً عَلَى الْعِبَادِ مَا يَأْتِيهِمْ مِّنْ رَّسُولٍ إِلَّا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِءُونَ . أَلَمْ يَرَوْا كَمْ أَهْلَكْنَا قَبْلَهُمْ مِّنَ الْقُرُونِ أَنَّهُمْ إِلَيْهِمْ لَا يَرْجِعُونَ .

"আমি তাহার মৃত্যুর পর তাহার সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আকাশ হইতে কোন বাহিনী প্রেরণ করি নাই এবং প্রেরণের প্রয়োজনও ছিল না। উহা ছিল কেবলমাত্র এক মহানাদ। ফলে উহারা নিথর নিস্তব্ধ হইয়া গেল। পরিতাপ বান্দাদের জন্য, উহাদের নিকট যখনই কোন রাসূল আসিয়াছে তখনই উহারা তাহাকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিয়াছে। ইহারা কি লক্ষ্য করে না যে, উহাদের পূর্বে কত মানবগোষ্ঠী আমি ধ্বংস করিয়াছি, যাহারা উহাদের মধ্যে আর ফিরিয়া আসিবে না" (৩৬: ২৮-৩১)?

অনুরূপভাবে হযরত নূহ (আ) দীর্ঘকাল ধরিয়া তাঁহার জাতিকে বিভিন্নভাবে বুঝানোর পরও যখন তাহারা সৎপথে আসিল না, তখন আল্লাহ তাহাদেরকে ধ্বংস করেন (উদাহরণস্বরূপ দ্র. সূরা নূহ)। যে জাতির ধ্বংসের ঘটনাই কুরআন মজীদে উক্ত হইয়াছে সেখানেই লক্ষ্য করা যায় যে, নবী-রাসূলগণ একটি উল্লেখযোগ্য কাল ধরিয়া তাহাদের সৎপথে আনয়নের সার্বিক চেষ্টা করার পর যখন ব্যর্থ হইয়াছেন তখনই আল্লাহ তাহাদেরকে ধ্বংস করিয়াছেন। লূত (আ)-এর সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও আল্লাহ তা'আলার আযাব নাযিল হওয়ার বেলায় একই অবস্থা লক্ষ্য করা যায়। তিনি শেষ মুহূর্তে বলিলেন:
إِنَّ هَؤُلاء ضَيْفِي فَلَا تَفْضَحُونَ وَاتَّقُوا اللَّهَ
"ইহারা আমার মেহমান। অতএব তোমরা আমাকে বেইজ্জত করিও না। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর" (১৫: ৬৮-৬৯; আরও দ্র. ১১: ৭৮)।

কিন্তু তাহারা আল্লাহকে ভয় করার পরিবর্তে লূত (আ)-কে কঠোর ভাষায় হুমকি দিল এবং তওবার সর্বশেষ সুযোগও গ্রহণ করিল না। অথচ আযাব নাযিলের এই সর্বশেষ মুহূর্তেও যদি তাহারা তওবা করিত তবে আল্লাহ তাহাদের তওবা কবুল করিতেন, যেমন তিনি আযাব নাযিলের পূর্ব মুহূর্তে হযরত ইয়ূনুস (আ)-এর জাতির তওবা কবুল করিয়া তাহাদেরকে ক্ষমা করিয়াছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন:
فَلُولَا كَانَتْ قَرْيَةً أَمَنَتْ فَنَفَعَهَا إِيْمَانُهَا إِلَّا قَوْمَ يُونُسَ لَمَّا أَمَنُوا كَشَفْنَا عَنْهُمْ عَذَابَ الْخِزْيِ فِي الحيوة الدُّنْيَا
"তবে ইয়ূনুসের সম্প্রদায় ব্যতীত কোন জনপদবাসী কেন এমন হইল না যাহারা ঈমান আনিত এবং তাহাদের ঈমান তাহাদের উপকারে আসিত? তাহারা যখন ঈমান আনিল তখন আমি তাহাদের উপর হইতে পার্থিব জীবনের হীনতাজনক শাস্তি দূর করিলাম" (১০: ৯৮)।

উল্লেখ্য যে, নীনাওয়াবাসী হযরত ইয়ূনুস (আ)-এর দা'ওয়াত প্রত্যাখ্যান করিলে তাহাদের কর্মফলের শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ্র গযব আসিলে তাহারা অনুতপ্ত হইয়া আল্লাহ্র দরবারে তওবা করে। আল্লাহ তাহাদের প্রতি দয়াপরবশ হইয়া তাহাদের তওবা কবুল করেন এবং তাহাদেরকে উপস্থিত শাস্তি হইতে নাজাত দেন।

এই পরিস্থিতিতে হযরত জিবরাঈল (আ) দূত সম্প্রদায়ের শাস্তির ব্যবস্থা করিবার জন্য আল্লাহ তা'আলার অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। তিনি তাঁহার অনুমতি প্রাপ্ত হইয়া নিজের একটি ডানা বিস্তার করিলে উহার আঘাতে পাপাচারীদের চক্ষুসমূহের দৃষ্টিশক্তি লোপ পাইল এবং উহারা অন্ধ হইয়া লূত (আ)-কে হুমকি দিয়া প্রাচীরের সঙ্গে ধাক্কা খাইতে খাইতে বলিতে লাগিল, আগামী কাল তাঁহাকে দেখিয়া লইব (আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৯২; বিদায়া, ২খ, পৃ. ১৮১; আরাইস, পৃ. ১১৩)। বাইবেলে বলা হইয়াছে যে, সে পশ্চাতে তাকাইলে একটি লবণস্তম্ভে রূপান্তরিত হইয়া যায় (আদিপুস্তক, ১৯: ২৬)। তাঁহারা নিরাপদ এলাকায় সরিয়া যাওয়ার পর ভোরবেলা সূর্য উদিত হইলে আল্লাহ্র অমোঘ নির্দেশ বাস্তবায়িত হইল (বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৮১-৮২; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৯৩; আরাইস, পৃ. ১১২; আদিপুস্তক, ১৯: ২৪)। হযরত জিবরাঈল (আ), মতান্তরে হযরত মীকাঈল (আ) তাঁহার দুইটি ডানা মাটির গর্ভে প্রবিষ্ট করাইয়াসিাদৃমবাসীর সমগ্র এলাকা শূন্যে তুলিয়া ফেলিলেন। তখন মোরগ ও কুকুরের মত প্রাণীরা গগণবিদারী আর্তনাদে চীৎকার করিয়া উঠিল, শূন্য হইতে প্রস্তর বর্ষিত হইল এবং স্টোটা এলাকাকে উল্টাইয়া শূন্য হইতে সজোরে নিক্ষেপ করা হল্পল। এভাবে মুহূর্তের মধ্যে একটি জনবসতি পৃথিবীর বুক স্ত্রইতে নিশ্চিহ্ন হইয়া গেল। চতুষ্পদ জন্তু হইতেও নিকৃষ্ট মানবরূপী পিশাচগুলির সঙ্গে নিষ্পাপ প্রাণীগুলিও ধ্বংস হইল (বিদয়া, ১খ, পৃ. ১৮২; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৯৩; আরাইস, পৃ. ১১৩; বাইবেলের আদিপুস্তক, ১৯: ২৪-২৫)। চল্লিশ লক্ষ (মতান্তরে চার হাজার ও চার শত) জনবসতি সম্বলিত পাঁচটি এলাকা (বিদায়ায় সাতটি) সাদূম, সাবআ, আমুরা (বাইবেলে ঘমোরা), দূমা, সাউত ইত্যাদি চিরকালের জন্য মানবজাতির শিক্ষা গ্রহণের বিষয়ে পরিণত হইল (পূর্বোক্ত বরাত)। কুরআন মজীদের বিভিন্ন সূরায় এই গযব নাযিলের বিভিষীকাময় দৃশ্য এভাবে তুলিয়া ধরা হইয়াছে :

وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَراً فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ "আমি তাহাদের উপর ভীষণভাবে বৃষ্টি বর্ষণ করিয়াছিলাম। সুতরাং অপরাধীদের পরিণাম কি হইয়াছিল তাহা লক্ষ্য কর" (৭:৮৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 লূত সম্প্রদায়ের ধ্বংসাবশেষ ও মানবজাতির জন্য দৃষ্টান্তমূলক শিক্ষা

📄 লূত সম্প্রদায়ের ধ্বংসাবশেষ ও মানবজাতির জন্য দৃষ্টান্তমূলক শিক্ষা


লূত সম্প্রদায়ের ধ্বংসাবশেষ ও মানবজাতির জন্য দৃষ্টান্তমূলক শিক্ষা
আল্লাহ তা'আলা পাপাচারী যে জাতিকেই ধ্বংস করিয়াছেন, বহু কাল ব্যাপিয়া মানবজাতির শিক্ষা গ্রহণের জন্য এবং তাহাদেরকে সতর্ক করার জন্য তাহা দর্শনীয় করিয়া রাখিয়াছেন। তিনি মানবজাতিকে অপরাধী যালেম সম্প্রদায়সমূহের ধ্বংসাবশেষ পর্যবেক্ষণ করিয়া তাহা হইতে শিক্ষা গ্রহণের আহ্বান জানাইয়াছেন:
قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ ثُمَّ انْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ . "বল, তোমরা, পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর, অতঃপর দেখ, যাহারা সত্যকে অস্বীকার করিয়াছিল তাহাদের পরিণাম কী হইয়াছে” (৬ঃ ১১)।

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ فَمِنْهُمْ مَنْ هَدَى اللَّهُ وَمِنْهُمْ مَنْ حَقَّتْ عَلَيْهِ الضَّلَةُ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ . "আমি তো প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠাইয়াছি আল্লাহ্‌র ইবাদত করিবার এবং তাগূতকে (সীমা লংঘনকারীকে) বর্জন করিবার নির্দেশ দিবার জন্য। অতঃপর উহাদের কতকের উপর পথভ্রষ্টতা সাব্যস্ত হইয়াছিল। অতএব তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং দেখ, যাহারা সত্যকে মিথ্যা বলিয়াছিল তাহাদের পরিণাম কী হইয়াছে” (১৬: ৩৬)?

قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ "বল, তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং অপরাধীদের কী পরিণাম হইয়াছিল তাহা পর্যবেক্ষণ কর" (২৭ঃ ৬৯; আরও দ্র. ৩৪: ১৩৭; ২৭: ১৪; ২৮: ৪০ ও ৩০:৪২)। অনুরূপভাবে আল্লাহ্ তা'আলা লূত সম্প্রদায়ের পরিণতিও স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণের জন্য মানবজাতিকে আহবান জানাইয়াছেন:
وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَراً فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ . "আমি তাহাদের উপর ভীষণভাবে বৃষ্টি বর্ষণ করিয়াছিলাম। সুতরাং অপরাধীদের পরিণাম কী হইয়াছিল তাহা লক্ষ্য কর" (৭:৮৪)।

লূত সম্প্রদায়ের বিধ্বস্ত জনপদের ধ্বংসাবশেষের নিদর্শনসমূহ আল্লাহ্‌ তা'আলা বোধশক্তিসম্পন্ন, বিবেকবান ও মর্মান্তিক পরিণতি সম্পর্কে সজাগ মানুষের জন্য উপদেশ গ্রহণের বিষয় হিসাবে পরিত্যক্ত অবস্থায় রাখিয়া দিয়াছেন এবং তাহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুগেও অবশিষ্ট ছিল। হিজায হইতে আরব বণিকদল যে পথ ধরিয়া সিরিয়া যাতায়াত করিত, উক্ত ধ্বংসাবশেষ সেই পথেই অবস্থিত ছিল। এই কারণে আরবগণ লূতসম্প্রদায়ের ধ্বংসাবশেষ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিল (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ১খ, পৃ. ২৫২)। আরবগণ, বিশেষত কুরায়শ গোত্র মহানবী (স)-এর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করিয়া তাঁহার বিরুদ্ধাচরণ করিতে থাকিলে মহান আল্লাহ তাহাদেরকে বারবার স্মরণ করাইয়া দেন:
وَمَا هِيَ مِنَ الظَّلِمِينَ بِبَعِيدٍ . "ইহা (ধ্বংসাবশেষ) যালেমদের হইতে দূরে নহে” (১১:৮৩)। অর্থাৎ এই প্রকারের শাস্তি আজও যালেমদের হইতে মোটেও দূরবর্তী নহে (তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৩০৫, টীকা ১১; তাফহীমুল কুরআন, সূরা হূদ-এর ৯৩ নং টীকা)।

وَأَنَّهَا لَبِسَبيل مقيم . إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ . "ইহা তো লোক চলাচলের পথিপার্শ্বে এখনও বিদ্যমান। অবশ্যই ইহাতে মুমিনদের জন্য নিদর্শন রহিয়াছে” (১৫ঃ ৭৬-৭)। অর্থাৎ হিজায হইতে সিরিয়া এবং ইরাক হইতে মিসর যাওয়ার পথিপার্শ্বে এই ধ্বংসাবশেষ অবস্থিত এবং যাত্রীদল এই পুরা এলাকায় ছড়াইয়া থাকা ধ্বংসাবশেষের চিহ্নাদি দেখিতে পায় (তাফহীম, সূরা হিজর, টীকা ৪২)। এই ধ্বংসাবশেষ স্বচক্ষে দেখিয়া কেবল ঈমানদার জনগোষ্ঠীই শিক্ষা গ্রহণ করিয়া থাকে। কারণ তাহারা মনে করে যে, লূত জাতির পাপাচার ও দৌরাত্মের শাস্তিস্বরূপই এই সম্প্রদায়ের বসতি ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। ঈমানদারগণ ব্যতীত অন্যরা যতদূর সম্ভব এই ধ্বংসাবশেষ প্রত্যক্ষ করিয়া ইহাকে একটি আকস্মিক দুর্ঘটনা অথবা উহা কোন প্রাকৃতিক কারণে ঘটিয়াছে বলিয়া ব্যাখ্যা করে (তাফসীরে উছমানী, পৃ.৩৫২, টীকা ৫)।

وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ وَلَقَدْ تَرَكْنَا مِنْهَا آيَةً بَيِّنَةً لِّقَوْمٍ يَعْقِلُونَ "কিন্তু ইহাদের অধিকাংশই মুমিন নহে” (২৬ঃ ১৭৪)।

"আমি বোধশক্তি সম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য ইহাতে (ধ্বংসাবশেষে) রাখিয়াছি একটি নিদর্শন" (২৯:৩৫)। وَإِنَّكُمْ لَتَمُرُّونَ عَلَيْهِمْ مُصْبِحِيْنَ . وَبِالَّيْلِ أَفَلَا تَعْقِلُونَ .

"তোমরা তো উহাদের ধ্বংসাবশেষগুলি সকালে ও সন্ধ্যায় অতিক্রম করিয়া থাক। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করিবে না।" (৩৭: ১৩৭-৮)।

আল্লামা শাববীর আহমাদ উছমানী বলেন, উক্ত আয়াতে নাফরমান মক্কাবাসীদেরকে বলা হইয়াছে যে, তথা হইতে যেসব কাফেলা সিরিয়ায় যাতায়াত করে তাহাদের রাস্তায় তাহারা লূত সম্প্রদায়ের বিধ্বস্ত জনপদ দেখিতে পায়। অর্থাৎ রাত-দিন তাহারা এই নিদর্শনসমূহ দেখিতেছে, ইহার পরও কি তাহারা শিক্ষা গ্রহণ করিবে না, তাহারা কি বুঝে না যে, এই অবাধ্য সম্প্রদায় যে করুণ পরিণতির শিকার হইয়াছে, অন্যান্য অবাধ্য সম্প্রদায়েরও অনুরূপ অবস্থা হইতে পারে (তাফসীর, পৃ. ৬০১, টীকা ৩)?

وَتَرَكْنَا فِيهَا أَيَةً لِّلَّذِينَ يَخَافُوْنَ الْعَذَابَ الْأَلِيمَ . "যাহারা মর্মান্তিক শাস্তিকে ভয় করে, আমি তাহাদের জন্য উহাতে একটি নিদর্শন রাখিয়াছি" (৫১:৩৭)। অর্থাৎ এখনো তথায় বিধ্বস্ত জনপদের নিদর্শন বিদ্যমান আছে এবং লূত সম্প্রদায়ের সাংঘাতিকভাবে ধ্বংস হওয়ার ঘটনায় আল্লাহর শাস্তিকে ভয়কারীদের জন্য শিক্ষা গ্রহণের উপকরণ আছে (তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৬৯৩, টীকা ৫)।

وَلَقَدْ تَرَكْنَا مِنْهَا آيَةً بَيِّنَةً لِّقَوْمٍ يَعْقِلُونَ "আমি বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য ইহাতে একটি স্পষ্ট নিদর্শন রাখিয়াছি" (২৯ঃ ৩৫)। উক্ত আয়াতসমূহ হইতে বুঝা গেল যে, লূত সম্প্রদায়ের ধ্বংসাবশেষ হইতে কেবল তাহারাই শিক্ষা গ্রহণ করিতে পারিবে, সতর্ক ও সাবধান হইতে পারিবে, যাহারা আল্লাহর শাস্তিতে ভীত প্রজ্ঞাবান মু'মিন।

বাইবেলের বর্ণনা, গ্রীক ও লাতিন প্রাচীনলিপি এবং আধুনিক কালের প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে জানা যায় যে, লূত সাগরের পূর্ব ও দক্ষিণের যে অঞ্চলটি জনশূন্য অবস্থায় পরিত্যক্ত আছে সেখানে বহু প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ বিদ্যমান, যাহা হইতে অনুমিত হয় যে, এক কালে এখানে মানববসতি ছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মুক্তির উপায় ঈমান ও নেক আমল

📄 মুক্তির উপায় ঈমান ও নেক আমল


মুক্তির উপায় ঈমান ও নেক আমল
কুরআন মজীদে আল্লাহর গযবে যে কয়েকটি সম্প্রদায়ের ধ্বংস হওয়ার কথা উল্লেখ আছে, তাহাতে লক্ষ্য করা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা তথাকার নেক বান্দাদেরকে তাঁহার বিশেষ ব্যবস্থায় গযব নাযিলের পূর্ব মুহূর্তে উদ্ধার করিয়া লইয়াছেন। অতএব মুক্তির একমাত্র উপায় হইতেছে ঈমান ও তদনুযায়ী আমল, কোন ব্যক্তিবিশেষের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক নহে। হযরত লূত (আ)-এর স্ত্রী এবং হযরত নূহ (আ)-এর স্ত্রী ও এক পুত্রের ঈমান না থাকার কারণে নবীর সহিত আত্মীয়তা সম্পর্ক সত্ত্বেও তাহারা শাস্তি হইতে রক্ষা করিতে পারে নাই, বরং অন্যান্য পাপীদের সহিত তাহারাও ধ্বংস হইয়া গিয়াছে।

ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِّلَّذِينَ كَفَرُوا امْرَأَتَ نُوحٍ وَامْرَأَتَ لُوطٍ كَانَتَا تَحْتَ عَبْدَيْنِ مِنْ عِبَادِنَا صَالِحَيْنِ فَخَانَتْهُمَا فَلَمْ يُغْنِيَا عَنْهُمَا مِنَ اللَّهِ شَيْئًا وَقِيلَ ادْخُلَا النَّارَ مَعَ الدَّاخِلِينَ. "আল্লাহ কাফেরদের জন্য নূহের স্ত্রী ও লূতের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত দিতেছেন। উহারা ছিল আমার বান্দাদের মধ্যে দুই সৎকর্মপরায়ণ বান্দার অধীন। কিন্তু উহারা তাহাদের সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছিল। ফলে নূহ ও লূত উহাদেরকে আল্লাহ্ শাস্তি হইতে রক্ষা করিতে পারিল না এবং উহাদেরকে বলা হইল, তোমরা উভয়ে প্রবেশকারীদের সহিত জাহান্নামে প্রবেশ কর" (৬৬:১০)।

হযরত নূহ (আ)-এর নাফরমান পুত্র যখন ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ মহা প্লাবনে ডুবিয়া যাইতেছিল তখন তিনি বলিলেন:
رَبِّ إِنَّ ابْنِي مِنْ أَهْلِي . "হে আমার প্রতিপালক! আমার পুত্র আমার পরিবারভুক্ত" (১১:৪৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দীনের দাওয়াত দানকারীদের জন্য শিক্ষণীয়

📄 দীনের দাওয়াত দানকারীদের জন্য শিক্ষণীয়


মহান আল্লাহ তাঁহার মহান নবীর আবেদনের উত্তরে বলিলেন :
يَنُوحُ إِنَّهُ لَيْسَ مِنْ أَهْلِكَ إِنَّهُ عَمَلٌ غَيْرُ صَالِحٍ فَلَا تَسْتَلْنِ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ "হে নূহ! সে তো তোমার পরিবারভুক্ত নহে। সে অবশ্যই অসৎকর্মপরায়ণ। সুতরাং যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নাই সেই বিষয়ে তুমি আমাকে অনুরোধ করিও না" (১১:৪৬)।

উপরিউক্ত ঘটনাত্রয় হইতে প্রতিভাত হয় যে, আল্লাহ্ প্রিয় বান্দাদের সহিত আত্মীয়তার সম্পর্ক কিংবা রক্তের বন্ধন কাহাকেও অপকর্মের পরিণতি হইতে রক্ষা করিতে পারে না। আল্লাহ্র অবাধ্য যেই ব্যক্তিই হউক তাহার ঠিকানা জাহান্নাম।

দীনের দাওয়াত দানকারীদের জন্য শিক্ষণীয়
হযরত লূত (আ)-এর জীবনে আল্লাহর দীনের দা'ওয়াত দানকারীর জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয় রহিয়াছে।

(১) তিনি তাঁহার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁহার মহান পথপ্রদর্শক হযরত ইবরাহীম (আ)-এর আনুগত্য করিয়াছেন সুখে-সম্পদে, বিপদে-আপদে সর্বাবস্থায়। যুবক বয়সে জন্মভূমি ত্যাগ করিয়া এবং পিতৃব্যের আহ্বানে সাড়া দিয়া তাঁহার প্রতি ঈমান আনিয়া তিনি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন।

২. ধৈর্যের সহিত দীর্ঘ বিশটি বৎসর ধরিয়া তিনি সাদৃমবাসীদের মধ্যে আল্লাহ্র দীনের প্রচার করিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে সাদৃমবাসীরা তাঁহার আহ্বানে সাড়া না দেওয়া সত্ত্বেও তিনি দা'ওয়াতী কাজ অব্যাহত রাখেন এবং নৈরাশ্য তাঁহাকে স্পর্শ করিতে পারে নাই।

৩. তিনি মহাসত্যকে মানুষের সামনে পেশ করার সঙ্গে সঙ্গে সমাজে প্রচলিত পাপাচার ও অন্যায়-অত্যাচারের কঠোর ও তীব্র সমালোচনা করেন এবং অপরাধীদেরকে তাহা পরিহার করিয়া সচ্চরিত্রতা, সততা ও আল্লাহভীতি অবলম্বনের দা'ওয়াত দেন।

৪. আল্লাহ্ উপর ভরসা রাখিয়া দা'ওয়াতী কাজের সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় পার্থিব উপায়-উপকরণও ব্যবহার করিতে হইবে।

৫. প্রতিকূল অবস্থায়ও পরোপকারে তৎপর থাকিতে হইবে। হযরত লূত (আ) তাঁহার ও তাঁহার পরিবারবর্গের জীবন বিপন্ন করিয়াও আগন্তুকগণের নিরাপত্তার চেষ্টা করিয়াছিলেন।

৬. দা'ওয়াত দানকারীর দা'ওয়াত কেহ কবুল না করিলেও তিনি তাহার প্রচেষ্টার পূর্ণ প্রতিদান লাভ করিবেন এবং দা'ওয়াত দানের দায়িত্ব পালনকারীরূপে গণ্য হইবেন।

৭. হাজারও বাধা-বিপত্তির মধ্যে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার মুক্তির পথ বাহির করিয়া দেন। হযরত লূত (আ)-এর দুইটি উক্তির তাৎপর্য
মানববেশে তিন ফেরেশতার আগমনে হযরত লূত (আ)-এর বাড়িতে যে এক কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছিল তাহাতে তিনি একান্তই নিরূপায় হইয়া সাদৃমীদিগকে (লক্ষ্য) করিয়া বলিয়াছিলেন :

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00