📄 লূত সম্প্রদায়ের পাপাচার ও তাহাদের মর্মান্তিক পরিণতি
এই সম্প্রদায় ছিল জঘন্য পাপাচারী। কুরআন মজীদে তাহাদের অন্যান্য পাপাচারের মধ্যে সর্বাধিক জঘন্য পাপকর্ম উল্লিখিত হইয়াছে তাহাদের সমকামিতা (লাওয়াতাত)। আল্লামা ইব্ন কাছীর (র) বলেন, তাহারা এমন একটি নিকৃষ্ট পাপকর্মের প্রচলন করে যাহা ইতোপূর্বে কোন আদম-সন্তান অথবা অন্য কোন জীব করে নাই। তাহা হইল নারীদের ত্যাগ করিয়া পুরুষে-পুরুষে তাহাদের কামতৃপ্তি লাভ করা। সাদৃমবাসীদের পূর্বে কোন মানব সন্তানের তাহাতে লিপ্ত হওয়া তো দূরের কথা, সে ইহার চিন্তাও করে নাই। দামিশক জামে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা উমায়্যা খলীফা ওয়ালীদ ইব্ন আবদুল মালিক বলেন, আল্লাহ তা'আলা যদি আমাদেরকে লূত জাতির এই কুকর্মের কথা অবহিত না করিতেন তাহা হইলে আমরা চিন্তাও করিতে পারিতাম না যে, যৌন সম্ভোগের জন্য নারী ছাড়া পুরুষকেও ব্যবহার করা যায় (তাফসীরে ইব্ন কাছীর, ২খ, পৃ. ৩৪)। কুরআন মজীদে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকবার তাহাদের নৈতিক অবক্ষয় ও লূত (আ)-এর উপদেশ সম্পর্কে আলোচনা আসিয়াছে। ১১ : ৭৮ আয়াতে বলা হইয়াছে যে, তাহারা নানারকম পাপাচারে লিপ্ত থাকিত। ১৫ : ৫৮ আয়াতে তাহাদেরকে অপরাধী সম্প্রদায়, ২১ : ৭৪ আয়াতে অশ্লীল কার্যকলাপে লিপ্ত সম্প্রদায়, ২২ : ৪৩ আয়াতে রাসূলগণকে প্রত্যাখ্যানকারী সম্প্রদায়, ২৬ : ১৬০ আয়াতে রাসূলগণকে প্রত্যাখ্যানকারী ও সমকামিতায় লিপ্ত সম্প্রদায়, ২৭ : ৫৪-৫৫ আয়াতে অশ্লীল কর্মে ও সমকামিতায় লিপ্ত সম্প্রদায়, ২৯ : ২৮-২৯ আয়াতে অশ্লীল কর্মে, সমকামিতায়, রাহাজানিতে ও প্রকাশ্য মজলিসে ঘৃণ্যকর্মে লিপ্ত সম্প্রদায় এবং ৩৮ : ১২-১৪ ও ২৯:৩১ আয়াতে যালেম সম্প্রদায় এবং ৫০ : ১২-১৪ ও ৫৪:৩৩ আয়াতে রাসূলগণকে প্রত্যাখ্যানকারী সম্প্রদায় হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। এই বহুবিধ গর্হিত অপরাধসমূহের মধ্যে প্রধানত মহান নবীর আহ্বানে সাড়া দিয়া সমকামিতা ত্যাগ না করার পরিণতিতেই এই জাতি আল্লাহর গযবে ধ্বংস হইয়াছিল। হাকেম নীশাপুরী (র) তাহাদের মধ্যে এই ঘৃণ্য পাপাচার কিভাবে সংক্রমিত হইয়াছিল তাহার একটি বর্ণনা দিয়াছেন। ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, যে বিষয়টি তাহাদেরকে নারীদের ত্যাগ করিয়া পুরুষদের সহিত কুকর্ম করিতে প্ররোচিত করিয়াছিল তাহা এই যে, তাহাদের আবাসিক এলাকায় এবং আবাসিক এলাকার বাহিরেও পথিপার্শ্বে তাহাদের ফলের বাগান ছিল। তাহারা দুর্ভিক্ষের শিকার হইলে তাহারা পরস্পর বলিল, তোমরা পথিপার্শ্বের বাগানসমূহের ফল পথিক-মুসাফিরদেরকে খাইতে নিষেধ করিলে তাহা দ্বারা তোমাদের জীবিকার ব্যবস্থা হইয়া যাইত। তাহারা বলিল, আমরা তাহাদেরকে কিভাবে নিষেধ করিব? তাহারা পরস্পরের মুখামুখী হইয়া বলিল, ঐ বাগানের ব্যাপারে তোমরা এই নীতি অবলম্বন কর যে, তোমাদের অপরিচিত কোন বিদেশী তোমাদের জনবসতিতে আসিলে তোমরা তাহার মালপত্র লুণ্ঠন করিয়া নিজ দখলে নাও এবং তাহার সহিত কুকর্ম কর। ইহা করিলে লোকেরা আর তোমাদের এলাকা দিয়া যাতায়াত করিবে না। (তাহাতে তোমাদের পথিপার্শ্বের বাগানের ফল রক্ষা পাইবে)। অতঃপর নিকটস্থ পাহাড় হইতে সুদর্শন ও সুশ্রী যুবকের বেশে শয়তান পথিকরূপে তাহাদের নিকট আবির্ভূত হইল। তাহারা তাহাকে দেখিবামাত্র তাহার দিকে ধাবিত হইয়া তাহার সহিত কুকর্ম করিল এবং তাহার সর্বস্ব লুণ্ঠন করিয়া লইয়া গেল। অতঃপর সে চলিয়া গেল। ইহার পর হইতে কোন আগন্তুকের আবির্ভাব হইলেই তাহারা তাহার সহিত উক্তরূপ কদর্য আচরণ করিত এবং ইহা তাহাদের অভ্যাসে পরিণত হইয় গেল। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা তাহাদের নিকট লূত (আ)-কে প্রেরণ করিলেন। তিনি তাহাদেরকে এই কদর্য অপকর্ম হইতে বিরত থাকিতে বলিলেন, তাহাদেরকে শাস্তির ভয় দেখাইলেন এবং তাহাদেরকে ইহা পরিহারের অনুরোধ করিলেন। তিনি বলিলেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা এমন কুকর্ম করিতেছ যাহা তোমাদের পূর্বে বিশ্ববাসীর কেহ করে নাই।... অতঃপর তিনি ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে হাদীছের অবশিষ্ট অংশ বর্ণনা করেন (আল-মুসতাদরাক, ২খ, পৃ. ৫৬২)।
ইবরাহীম (আ)-এর শরীআতে আগন্তুক মেহমানের আপ্যায়নের সুব্যবস্থা করা ফরয ছিল (প্রাগুক্ত)। এই ফরয আদায় না করিয়া তাহারা আগন্তুকের সর্বস্ব লুণ্ঠন করিয়া লওয়ার পর তাহার সহিত জোরপূর্বক কুকর্ম করিত এবং ইহার পরিণতিতে ঈমানের অন্যতম ভূষণ “লজ্জাশীলতা" তাহাদের চক্ষু ও চরিত্র হইতে বিদায় গ্রহণ করিল। সমকামিতার পাশাপাশি তাহারা রাহাজানি ও লুটতরাজে মাতিয়া থাকিত। তাহারা অভিনব পদ্ধতিতে ব্যবসায়ীর পণ্য লুণ্ঠন করিত। কোন ব্যবসায়ী তাহাদের এলাকায় পৌঁছিলে তাহার পণ্য হইতে তাহাদের প্রত্যেকে একটু একটু করিয়া লইয়া যাইত। এইভাবে তাহার সর্বস্ব লুণ্ঠিত হইলে কোন ব্যক্তি আসিয়া বলিত, আমি তোমার এই যৎকিঞ্চিৎ মাল নিয়াছি, এই তাহা ফেরত দিলাম। বণিক বলিত, আমার সর্বস্ব লুণ্ঠিত হইয়া গিয়াছে, আমি এই সামান্য জিনিস ফেরত লইয়া কি করিব? তুমি ইহা লইয়া যাও। অতঃপর সে উহা লইয়া চলিয়া যাওয়ার পর আরেকজন আসিয়া একই কথা বলিত। এইভাবে বণিক তাহার মূলধন হারাইয়া রিক্তহস্ত হইয়া যাইত (নাজ্জারের কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ১১২)।
📄 শাস্তির ফেরেশতার আগমন
শাস্তির ফেরেশতার আগমন
প্রথমে হযরত ইবরাহীম (আ) ও পরে হযরত লূত (আ)-এর নিকট আগত মানবরূপী ফেরেশতাগণের সহিত লূত সম্প্রদায়ের আচরণেও তাহাদের কদর্য পাপাচারের চিত্র ফুটিয়া উঠে। শাস্তির ভয়াবহ বার্তাসহ ফেরেশতা আগমনের বিষয় কুরআন মজীদের চার স্থানে উল্লিখিত হইয়াছে:
وَ لَقَدْ جَاءَتْ رُسُلُنَا إِبْرَاهِيمَ بِالْبُشْرَى قَالُوا سَلْمًا قَالَ سَلْمٌ فَمَا لَبِثَ أَنْ جَاءَ بِعِجْلٍ حَنِيدٍ ، فَلَمَّا رَأَى أَيْدِيَهُمْ لَا تَصِلُ إِلَيْهِ نَكِرَهُمْ وَأَوْجَسَ مِنْهُمْ خِيفَةً ، قَالُوا لَا تَخَفْ إِنَّا أُرْسِلْنَا إِلَى قَوْمِ لُوطٍ ... فَلَمَّا ذَهَبَ عَنْ إِبْرَاهِيمَ الرَّوْعُ وَجَاءَتْهُ الْبُشْرَى يُجَادِلُونَ فِي قَوْمِ لُوطٍ . إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَعَلِيمٌ أَوَّاهُ مُنِيبٌ ، يَا إِبْرَاهِيمُ أَعْرِضْ عَنْ هَذَا إِنَّهُ قَدْ جَاءَ أَمْرُ رَبِّكَ وَإِنَّهُمْ آتِيهِمْ عَذَابٌ غَيْرُ مَرْدُودٍ. وَلَمَّا جَاءَتْ رُسُلُنَا لُوطًا سِيءَ بِهِمْ وَضَاقَ بِهِمْ ذَرْعًا وَقَالَ هَذَا يَوْمٌ عَصِيبٌ ، وَجَاءَهُ قَوْمُهُ يُهْرَعُونَ إِلَيْهِ وَمِنْ قَبْلُ كَانُوا يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ قَالَ يُقَوْمٍ هُؤُلَاءِ بَنَاتِي هُنَّ أَطْهَرُ لَكُمْ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَلَا تُخْزُونِ فِي ضَيْفِى أَلَيْسَ مِنْكُمْ رَجُلٌ رَشِيدٌ . قَالُوا لَقَدْ عَلِمْتَ مَا لَنَا فِي بَنْتِكَ مِنْ حَقِّ وَإِنَّكَ لَتَعْلَمُ مَا نُرِيدُ. قَالَ لَوْ أَنَّ لِي بِكُمْ قُوَّةً أَوْ آوِى إِلَى رُكْنٍ شَدِيدٍ. قَالُوا يُلُوطُ إِنَّا رُسُلُ رَبِّكَ لَنْ يُصِلُّوا إِلَيْكَ فَأَسْرِ بِأَهْلِكَ بِقِطْعٍ مِنَ الَّيْلِ وَلَا يَلْتَفِتْ مِنْكُمْ أَحَدٌ إِلَّا امْرَأَتَكَ إِنَّهُ مُصِيبُهَا مَا أَصَابَهُمْ إِنَّ مَوْعِدَهُمُ الصُّبْحُ أَلَيْسَ الصُّبْحُ بِقَرِيبٍ.
"আমার ফেরেশতাগণ তো সুসংবাদ লইয়া ইবরাহীমের নিকট আসিল। তাহারা বলিল, সালাম। সেও বলিল, সালাম। সে অবিলম্বে কাবাবকৃত এক গো-বৎস লইয়া আসিল। সে যখন দেখিল, তাহাদের হস্ত উহার দিকে প্রসারিত হইতেছে না, তখন তাহাদেরকে অবাঞ্ছিত মনে করিল এবং তাহাদের সম্বন্ধে তাহার মনে ভীতির সঞ্চার হইল। তাহারা বলিল, ভয় করিও না, আমরা তো লূতের সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হইয়াছি।... অতঃপর যখন ইবরাহীমের ভীতি দূরীভূত হইল এবং তাহার নিকট সুসংবাদ আসিল তখন সে লূতের সম্প্রদায় সম্পর্কে আমার সহিত বাদানুবাদ করিতে লাগিল। ইবরাহীম তো অবশ্যই সহনশীল, কোমল হৃদয়, সতত আল্লাহ অভিমুখী। হে ইবরাহীম। ইহা হইতে বিরত হও; তোমার প্রতিপালকের বিধান আসিয়া পড়িয়াছে; তাঁহাদের প্রতি আসিবে এমন শাস্তি যাহা অনিবার্য। আর যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ লূতের নিকট আসিল, তখন তাহাদের আগমনে সে বিষণ্ণ হইল এবং নিজকে তাহাদের রক্ষায় অসমর্থ মনে করিল এবং বলিল, ইহা নিদারুণ দিন। তাহার সম্প্রদায় তাহার নিকট উদ্ভ্রান্ত হইয়া ছুটিয়া আসিল এবং পূর্ব হইতে তাহারা কুকর্মে লিপ্ত ছিল। সে বলিল, হে আমার সম্প্রদায়! ইহারা আমার কন্যা, তোমাদের জন্য ইহারা পবিত্র। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার মেহমানদের ব্যাপারে আমাকে হেয় করিও না। তোমাদের মধ্যে কি কোন ভাল মানুষ নাই? তাহারা বলিল, তুমি তো জান, তোমার কন্যাদেরকে আমাদের কোন প্রয়োজন নাই, আমরা কি চাই তাহা তো তুমি জানই। সে বলিল, তোমাদের উপর যদি আমার শক্তি থাকিত অথবা যদি আমি কোন সুদৃঢ় স্তম্ভের আশ্রয় লইতে পারিতাম! তাহারা বলিল, হে লূত! নিশ্চয় আমরা তোমার প্রতিপালকের প্রেরিত ফেরেশতা। উহারা কখনও তোমার নিকট পৌঁছিতে পারিবে না। সুতরাং তুমি রাত্রির কোন এক সময় তোমার স্ত্রী ব্যতীত তোমার পরিজনসহ বাহির হইয়া পড় এবং তোমাদের মধ্যে কেহ যেন পিছন দিকে না তাকায়। উহাদের যাহা ঘটিবে তাহারও তাহাই ঘটিবে। নিশ্চয় প্রভাত উহাদের জন্য নির্ধারিত কাল। প্রভাত কি নিকটবর্তী নহে” (১১ : ৬৯-৮১)?
وَنَبِّئْهُمْ عَنْ ضَيْفِ ابْرَاهِيمَ . إِذْ دَخَلُوا عَلَيْهِ فَقَالُوا سَلْمًا . قَالَ إِنَّا مِنْكُمْ وَجِلُونَ . قَالُوا لَا تَوْجَلْ إِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلَمٍ عَلِيمٍ. ... قَالَ فَمَا خَطِبُكُمْ أَيُّهَا الْمُرْسَلُونَ. قَالُوا إِنَّا أُرْسِلْنَا إِلَى قَوْمٍ مُجْرِمِينَ إِلَّا أَلَ لُوطٍ إِنَّا لَمُنَجُوهُمْ أَجْمَعِينَ . إِلَّا امْرَأَتَهُ قَدَّرْنَا إِنَّهَا لَمِنَ الْغَبِرِينَ . فَلَمَّا جَاءَ أَلَ لُوطُ الْمُرْسَلُونَ. قَالَ إِنَّكُمْ قَوْمٌ مُنْكَرُونَ قَالُوا بَلْ جِئْتُكَ بِمَا كَانُوا فِيْهِ يَمْتَرُونَ، وَأَتَيْنُكَ بِالْحَقِّ وَإِنَّا لَصُدِقُونَ، فَأَسْرِ بِأَهْلِكَ بِقِطْعِ مِّنَ الَّيْلِ وَاتَّبِعْ أَدْبَارَهُمْ وَلَا يَلْتَفِتْ مِنْكُمْ أَحَدٌ وَامْضُوا حَيْثُ تُؤْمَرُوْنَ، وَقَضَيْنَا إِلَيْهِ ذَلِكَ الْأَمْرَ أَنَّ دَابِرَ هُؤُلَاءِ مقطوع مُصْبِحِيْنَ . وَجَاءَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ يَسْتَبْشِرُونَ . قَالَ إِنَّ هَؤُلَاءِ ضَيْفِي فَلَا تَفْضَحُونِ، وَاتَّقُوا اللَّهَ وَلَا تُخْزُونِ. قَالُوا أَوَلَمْ نَنْهَكَ عَنِ الْعَلَمِينَ . قَالَ هُؤُلَاءِ بَنْتِى إِنْ كُنْتُمْ فَعِلِينَ لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يعمهون .
"আর তাহাদেরকে অবহিত কর ইবরাহীমের মেহমানদের কথা। যখন তাহারা তাহার নিকট উপস্থিত হইয়া বলিল, সালাম, তখন সে বলিয়াছিল, আমরা তোমাদের আগমনে আতঙ্কিত। তাহারা বলিল, ভয় করিও না, আমরা তোমাকে এক জ্ঞানী পুত্রের সুসংবাদ দিতেছি...। সে বলিল, হে ফেরেশতাগণ! তোমাদের আর বিশেষ কি কাজ আছে? তাহারা বলিল, আমাদেরকে এক অপরাধী সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরণ করা হইয়াছে। তবে দূতের পরিবারের বিরুদ্ধে নহে। আমরা তাহার স্ত্রী ব্যতীত তাহাদের সকলকে রক্ষা করিব। আমরা স্থির করিয়াছি যে, সে অবশ্যই পশ্চাতে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত। ফেরেশতাগণ যখন লূত পরিবারের নিকট আসিল, তখন লূত বলিল, তোমরা তো অপরিচিত লোক। তাহারা বলিল, না, উহারা যে বিষয়ে সন্ধিগ্ধ ছিল আমরা তোমার নিকট তাহাই লইয়া আসিয়াছি। আমরা তোমার নিকট সত্য সংবাদ লইয়া আসিয়াছি এবং অবশ্যই আমরা সত্যবাদী। সুতরাং তুমি রাত্রির কোন এক সময়ে তোমাব পরিবারবর্গসহ বাহির হইয়া পড় এবং তুমি তাহাদের পশ্চাদনুসরণ কর এবং তোমাদের মধ্যে কেহ যেন পশ্চাত দিকে না তাকায়। তোমাদেরকে যেথায় যাইতে বলা হইয়াছে তোমরা তথায় চলিয়া যাও। আমি তাহাকে এই বিষয়ে ফয়সালা জানাইয়া দিলাম যে, প্রত্যুষে উহাদেরকে সমূলে বিনাশ করা হইবে। নগরবাসীরা উল্লসিত হইয়া উপস্থিত হইল। সে বলিল, ইহারা আমার মেহমান, অতএব তোমরা আমাকে বেইজ্জত করিও না। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে হেয় করিও না। উহারা বলিল, আমরা কি দুনিয়া সুদ্ধ লোককে আশ্রয় দিতে তোমাকে নিষেধ করি নাই? লূত বলিল, একান্তই যদি তোমরা কিছু করিতে চাহ তবে আমার এই কন্যাগণ রহিয়াছে। তোমার জীবনের শপথ! উহারা তো মত্ততায় বিমূঢ় হইয়া আছে" (১৫: ৫১-৭২)।
وَلَمَّا جَاءَتْ رُسُلُنَا إِبْرَاهِيمَ بِالْبُشْرَى قَالُوا إِنَّا مُهْلِكُوا أَهْلِ هذه القَرْيَةِ إِنَّ أَهْلَهَا كَانُوا ظُلِمِينَ . قَالَ إِنَّ فِيهَا لُوْطًا قَالُوا نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَنْ فِيْهَا لَنُنَجِّيَنَّهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ كَانَتْ مِنَ الغَبِرِينَ، وَلَمَّا أَنْ جَاءَتْ رُسُلُنَا لُوطًا سِيءَ بِهِمْ وَضَاقَ بِهِمْ ذَرْعًا وَقَالُوا لَا تَخَفْ وَلَا تَحْزَنْ إِنَّا مُنَجُوكَ وَأَهْلَكَ إِلَّا امْرَأَتَكَ كَانَتْ مِنَ الْعَبِرِينَ إِنَّا مُنْزِلُونَ عَلَى أَهْلِ هَذِهِ الْقَرْيَةِ رِجْرًا مِّنَ السَّمَاءِ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ .
"যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ সুসংবাদসহ ইবরাহীমের নিকট আসিল, তখন তাহারা বলিয়াছিল, আমরা এই জনপদবাসীকে ধ্বংস করিব। ইহার অধিবাসীরা তো যালেম। ইবরাহীম বলিল, এই জনপদে তো লূত রহিয়াছে। উহারা বলিল, সেখানে কাহারা আছে তাহা আমরা ভাল জানি। আমরা তো লূতকে ও তাহার পরিজনবর্গকে রক্ষা করিবই, তাহার স্ত্রীকে ব্যতীত, সে তো পশ্চাতে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত। আর যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ লূতের নিকট আসিল, তখন তাহাদের জন্য সে বিষণ্ণ হইয়া পড়িল এবং নিজেকে তাহাদের রক্ষায় অসমর্থ মনে করিল। তাহারা বলিল, ভয় করিও না, দুঃখও করিও না, আমরা তোমাকে ও তোমার পরিবারবর্গকে রক্ষা করিব, তোমার স্ত্রী ব্যতীত, সে তো পশ্চাতে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত। আমরা এই জনপদবাসীদের উপর আকাশ হইতে শাস্তি নাযিল করিব, কারণ উহারা পাপাচার করিতেছিল" (২৯: ৩১-৩৪)।
هَلْ أَنَّكَ حَدِيثُ ضَيْفِ إِبْرَاهِيمَ الْمُكْرَمِينَ * إِذْ دَخَلُوا عَلَيْهِ فَقَالُوا سَلْمًا ، قَالَ سَلَّمٌ قَوْمٌ مُنْكَرُونَ . فَرَاغَ إِلَى أَهْلِهِ فَجَاءَ بِعِجْلٍ سَمِيْنِ * فَقَرَّبَهُ إِلَيْهِمْ قَالَ أَلَا تَأْكُلُونَ . فَأَوْجَسَ مِنْهُمْ خِيفَةً قَالُوا لَا تَخَفْ . وَبَشِّرُوهُ بِغُلْمٍ عَلِيمٍ *
"তোমার নিকট ইবরাহীমের সম্মানিত অতিথিদিগের বৃত্তান্ত আসিয়াছে কি? যখন উহারা তাহার নিকট উপস্থিত হইয়া বলিল, 'সালাম'। উত্তরে সে বলিল, 'সালাম'। তাহার মনে হইল, ইহারা তো অপরিচিত লোক। অতঃপর ইবরাহীম তাহাদিগকে কিছু না বলিয়া তাহার স্ত্রীর নিকট গেল এবং একটি মাংসল গো-বৎস ভাজা লইয়া আসিল ও তাহাদের সামনে রাখিল এবং পরে বলিল, 'তোমরা খাইতেছ না কেন'? ইহাতে উহাদিগের সম্পর্কে তাহার মনে ভীতির সঞ্চার হইল। উহারা বলিল, 'ভীত হইও না'। অতঃপর উহারা তাহাকে এক গুণী পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিল...। ইবরাহীম বলিল, হে ফেরেশতাগণ! তোমাদের বিশেষ কাজ কি? তাহারা বলিল, আমাদেরকে এক অপরাধী সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরণ করা হইয়াছে- উহাদের উপর মাটির শক্ত ঢেলা নিক্ষেপ করার জন্য। সেইগুলি তোমার প্রতিপালকের নিকট হইতে সীমালংঘনকারীদের জন্য চিহ্নিত" (৫১: ২৪-২৮)।
উল্লিখিত আয়াতসমূহে লক্ষ্য করা যায় যে, ফেরেশতাগণ একটি ব্যক্তিগত সুসংবাদ ও একটি জাতিগত দুঃসংবাদসহ প্রথমে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর নিকট আগমন করেন। তাঁহারা তাঁহাকে একজন জ্ঞানবান পুত্রসন্তান লাভের সুসংবাদ প্রদানের পর লূত সম্প্রদায়ের ধ্বংসের দুঃসংবাদ সম্পর্কে অবহিত করেন। তিন সদস্যবিশিষ্ট ফেরেশতাগণের এই দলটির প্রধান ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আ) এবং অপর দুইজন ছিলেন হযরত মীকাঈল ও হযরত ইসরাফীল (আ)।
📄 শাস্তি অবতরণ
শাস্তি অবতরণ
কোন জাতির নিকট নবী-রাসূল ও আসমানী কিতাব না পাঠানো পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা সেই জাতিকে তাহাদের অপরাধের কারণে ধ্বংস করেন না।
وَמَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا . "আমি রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাহাকেও শাস্তি দেই না" (১৭: ১৫)।
নবী এবং তাঁহার আনীত বার্তা বান্দার অভিযোগ উত্থাপন করিতে না পারার জন্য আল্লাহর তরফ হইতে প্রমাণ (হুজ্জাত)। এই প্রমাণ পূর্ণরূপে পেশ না করা পর্যন্ত বান্দাকে শাস্তি প্রদান ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। অন্যথায় বান্দা এই আপত্তি উত্থাপন করার সুযোগ পায় যে, তাহাদেরকে অনুসরণীয় বিষয় অবহিত করা হয় নাই, তাই তাহারা শাস্তিযোগ্য হইবে কেন? অতএব ন্যায়বিচারের স্বার্থে আল্লাহ তাআলা নবী-রাসূল প্রেরণ করিয়া মানবজাতিকে তাঁহার বিধান অবহিত করেন এবং তাহা মানিয়া লওয়ার আহবান জানান। একটি নির্দিষ্ট কাল ব্যাপিয়া নবী-রাসূলগণ দাওয়াত দিতে থাকেন এবং তাহাদের আহ্বানে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী সাড়া না দিলে তাহাদেরকে ক্রমান্বয়ে ছোটখাট বিপদ দ্বারা সতর্ক করা হয়। যেমন সূরা ইয়াসীনে অনুরূপ একটি দৃষ্টান্ত পেশ করা হইয়াছে :
وَاضْرِبْ لَهُمْ مَثَلًا أَصْحَبَ الْقَرْيَةِ إِذْ جَاءَهَا الْمُرْسَلُونَ . إِذْ أَرْسَلْنَا إِلَيْهِمُ اثْنَيْنِ فَكَذَّبُوهُمَا فَعَزَّزْنَا بِثَالِثٍ فَقَالُوا إِنَّا إِلَيْكُمْ مُرْسَلُونَ . قَالُوا مَا أَنْتُمْ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُنَا وَمَا أَنْزَلَ الرَّحْمَنُ مِنْ شَيْءٍ إِنْ أَنْتُمْ إِلَّا تَكْذِبُونَ . قَالُوا رَبُّنَا يَعْلَمُ إِنَّا إِلَيْكُمْ لَمُرْسَلُونَ . وَمَا عَلَيْنَا إِلَّا البَلْغُ الْمُبِينُ. قَالُوا إِنَّا تَطَيَّرْنَا بِكُمْ لَئِنْ لَّمْ تَنْتَهُوا لَنَرْجُمَنَّكُمْ وَلَيَمَسَّنُكُمْ مِنَّا عَذَابٌ أَلِيمٌ. قَالُوا طَائِرُكُمْ مَعَكُمْ أَئِنْ ذُكَرْتُمْ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُسْرِفُونَ، وَجَاءَ مِنْ أَقْصَا الْمَدِينَةِ رَجُلٌ يَسْعَى قَالَ يُقَوْمِ اتَّبِعُوا الْمُرْسَلِينَ . اتَّبِعُوا مَنْ لَّا يَسْأَلُكُمْ أَجْرًا وَهُمْ مُهْتَدُونَ .
"উহাদের নিকট এক জনপদের অধিবাসীদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা কর, যখন তাহাদের নিকট রাসূলগণ আসিয়াছিল। যখন উহাদের নিকট দুইজন রাসূল পাঠাইয়াছিলাম, তখন উহারা তাহাদেরকে মিথ্যাবাদী বলিয়াছিল। অতঃপর আমি তাহাদেরকে শক্তিশালী করিয়াছিলাম তৃতীয় একজন দ্বারা। তাহারা বলিয়াছিল, আমরা তো তোমাদের নিকট প্রেরিত হইয়াছি। উহারা বলিল, তোমরা আমাদের মতই মানুষ, দয়াময় আল্লাহ তো কিছুই নাযিল করেন নাই। তোমরা কেবল মিথ্যাই বলিতেছ। তাহারা বলিল, আমাদের প্রতিপালক জানেন, আমরা অবশ্যই তোমাদের নিকট প্রেরিত হইয়াছি। স্পষ্টভাবে প্রচার করাই আমাদের দায়িত্ব। উহারা বলিল, আমরা তো তোমাদেরকে অমঙ্গলের কারণ মনে করি। যদি তোমরা বিরত না হও তবে অবশ্যই আমরা তোমাদেরকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করিব এবং আমাদের পক্ষ হইতে অবশ্যই তোমাদের উপর মর্মন্তুদ শাস্তি আপতিত হইবে। তাহারা বলিল, তোমাদের অমঙ্গল তোমাদেরই সাথে, ইহা কি এইজন্য যে, আমরা তোমাদেরকে উপদেশ দিতেছি? বস্তুত তোমরা এক সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়। নগরীর প্রান্ত হইতে এক ব্যক্তি ছুটিয়া আসিল। সে বলিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা রাসূলগণের অনুসরণ কর। অনুসরণ কর তাহাদের, যাহারা তোমাদের নিকট কোন প্রতিদান চায় না এবং যাহারা সৎপথ প্রাপ্ত" (৩৬ঃ ১৩-২১)।
উদ্ধত সম্প্রদায় এই লোকটিকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করার পর আল্লাহ তা'আলা তাহাদেরকে ধ্বংসাত্মক শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করান:
وَمَا أَنْزَلْنَا عَلَى قَوْمِهِ مِنْ بَعْدِهِ مِنْ جُنْدٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَمَا كُنَّا مُنْزِلِينَ إِنْ كَانَتْ إِلَّا صَيْحَةً وَاحِدَةً فَإِذَاهُمْ حمِدُونَ يُحْسَرَةً عَلَى الْعِبَادِ مَا يَأْتِيهِمْ مِّنْ رَّسُولٍ إِلَّا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِءُونَ . أَلَمْ يَرَوْا كَمْ أَهْلَكْنَا قَبْلَهُمْ مِّنَ الْقُرُونِ أَنَّهُمْ إِلَيْهِمْ لَا يَرْجِعُونَ .
"আমি তাহার মৃত্যুর পর তাহার সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আকাশ হইতে কোন বাহিনী প্রেরণ করি নাই এবং প্রেরণের প্রয়োজনও ছিল না। উহা ছিল কেবলমাত্র এক মহানাদ। ফলে উহারা নিথর নিস্তব্ধ হইয়া গেল। পরিতাপ বান্দাদের জন্য, উহাদের নিকট যখনই কোন রাসূল আসিয়াছে তখনই উহারা তাহাকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিয়াছে। ইহারা কি লক্ষ্য করে না যে, উহাদের পূর্বে কত মানবগোষ্ঠী আমি ধ্বংস করিয়াছি, যাহারা উহাদের মধ্যে আর ফিরিয়া আসিবে না" (৩৬: ২৮-৩১)?
অনুরূপভাবে হযরত নূহ (আ) দীর্ঘকাল ধরিয়া তাঁহার জাতিকে বিভিন্নভাবে বুঝানোর পরও যখন তাহারা সৎপথে আসিল না, তখন আল্লাহ তাহাদেরকে ধ্বংস করেন (উদাহরণস্বরূপ দ্র. সূরা নূহ)। যে জাতির ধ্বংসের ঘটনাই কুরআন মজীদে উক্ত হইয়াছে সেখানেই লক্ষ্য করা যায় যে, নবী-রাসূলগণ একটি উল্লেখযোগ্য কাল ধরিয়া তাহাদের সৎপথে আনয়নের সার্বিক চেষ্টা করার পর যখন ব্যর্থ হইয়াছেন তখনই আল্লাহ তাহাদেরকে ধ্বংস করিয়াছেন। লূত (আ)-এর সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও আল্লাহ তা'আলার আযাব নাযিল হওয়ার বেলায় একই অবস্থা লক্ষ্য করা যায়। তিনি শেষ মুহূর্তে বলিলেন:
إِنَّ هَؤُلاء ضَيْفِي فَلَا تَفْضَحُونَ وَاتَّقُوا اللَّهَ
"ইহারা আমার মেহমান। অতএব তোমরা আমাকে বেইজ্জত করিও না। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর" (১৫: ৬৮-৬৯; আরও দ্র. ১১: ৭৮)।
কিন্তু তাহারা আল্লাহকে ভয় করার পরিবর্তে লূত (আ)-কে কঠোর ভাষায় হুমকি দিল এবং তওবার সর্বশেষ সুযোগও গ্রহণ করিল না। অথচ আযাব নাযিলের এই সর্বশেষ মুহূর্তেও যদি তাহারা তওবা করিত তবে আল্লাহ তাহাদের তওবা কবুল করিতেন, যেমন তিনি আযাব নাযিলের পূর্ব মুহূর্তে হযরত ইয়ূনুস (আ)-এর জাতির তওবা কবুল করিয়া তাহাদেরকে ক্ষমা করিয়াছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন:
فَلُولَا كَانَتْ قَرْيَةً أَمَنَتْ فَنَفَعَهَا إِيْمَانُهَا إِلَّا قَوْمَ يُونُسَ لَمَّا أَمَنُوا كَشَفْنَا عَنْهُمْ عَذَابَ الْخِزْيِ فِي الحيوة الدُّنْيَا
"তবে ইয়ূনুসের সম্প্রদায় ব্যতীত কোন জনপদবাসী কেন এমন হইল না যাহারা ঈমান আনিত এবং তাহাদের ঈমান তাহাদের উপকারে আসিত? তাহারা যখন ঈমান আনিল তখন আমি তাহাদের উপর হইতে পার্থিব জীবনের হীনতাজনক শাস্তি দূর করিলাম" (১০: ৯৮)।
উল্লেখ্য যে, নীনাওয়াবাসী হযরত ইয়ূনুস (আ)-এর দা'ওয়াত প্রত্যাখ্যান করিলে তাহাদের কর্মফলের শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ্র গযব আসিলে তাহারা অনুতপ্ত হইয়া আল্লাহ্র দরবারে তওবা করে। আল্লাহ তাহাদের প্রতি দয়াপরবশ হইয়া তাহাদের তওবা কবুল করেন এবং তাহাদেরকে উপস্থিত শাস্তি হইতে নাজাত দেন।
এই পরিস্থিতিতে হযরত জিবরাঈল (আ) দূত সম্প্রদায়ের শাস্তির ব্যবস্থা করিবার জন্য আল্লাহ তা'আলার অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। তিনি তাঁহার অনুমতি প্রাপ্ত হইয়া নিজের একটি ডানা বিস্তার করিলে উহার আঘাতে পাপাচারীদের চক্ষুসমূহের দৃষ্টিশক্তি লোপ পাইল এবং উহারা অন্ধ হইয়া লূত (আ)-কে হুমকি দিয়া প্রাচীরের সঙ্গে ধাক্কা খাইতে খাইতে বলিতে লাগিল, আগামী কাল তাঁহাকে দেখিয়া লইব (আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৯২; বিদায়া, ২খ, পৃ. ১৮১; আরাইস, পৃ. ১১৩)। বাইবেলে বলা হইয়াছে যে, সে পশ্চাতে তাকাইলে একটি লবণস্তম্ভে রূপান্তরিত হইয়া যায় (আদিপুস্তক, ১৯: ২৬)। তাঁহারা নিরাপদ এলাকায় সরিয়া যাওয়ার পর ভোরবেলা সূর্য উদিত হইলে আল্লাহ্র অমোঘ নির্দেশ বাস্তবায়িত হইল (বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৮১-৮২; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৯৩; আরাইস, পৃ. ১১২; আদিপুস্তক, ১৯: ২৪)। হযরত জিবরাঈল (আ), মতান্তরে হযরত মীকাঈল (আ) তাঁহার দুইটি ডানা মাটির গর্ভে প্রবিষ্ট করাইয়াসিাদৃমবাসীর সমগ্র এলাকা শূন্যে তুলিয়া ফেলিলেন। তখন মোরগ ও কুকুরের মত প্রাণীরা গগণবিদারী আর্তনাদে চীৎকার করিয়া উঠিল, শূন্য হইতে প্রস্তর বর্ষিত হইল এবং স্টোটা এলাকাকে উল্টাইয়া শূন্য হইতে সজোরে নিক্ষেপ করা হল্পল। এভাবে মুহূর্তের মধ্যে একটি জনবসতি পৃথিবীর বুক স্ত্রইতে নিশ্চিহ্ন হইয়া গেল। চতুষ্পদ জন্তু হইতেও নিকৃষ্ট মানবরূপী পিশাচগুলির সঙ্গে নিষ্পাপ প্রাণীগুলিও ধ্বংস হইল (বিদয়া, ১খ, পৃ. ১৮২; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৯৩; আরাইস, পৃ. ১১৩; বাইবেলের আদিপুস্তক, ১৯: ২৪-২৫)। চল্লিশ লক্ষ (মতান্তরে চার হাজার ও চার শত) জনবসতি সম্বলিত পাঁচটি এলাকা (বিদায়ায় সাতটি) সাদূম, সাবআ, আমুরা (বাইবেলে ঘমোরা), দূমা, সাউত ইত্যাদি চিরকালের জন্য মানবজাতির শিক্ষা গ্রহণের বিষয়ে পরিণত হইল (পূর্বোক্ত বরাত)। কুরআন মজীদের বিভিন্ন সূরায় এই গযব নাযিলের বিভিষীকাময় দৃশ্য এভাবে তুলিয়া ধরা হইয়াছে :
وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَراً فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ "আমি তাহাদের উপর ভীষণভাবে বৃষ্টি বর্ষণ করিয়াছিলাম। সুতরাং অপরাধীদের পরিণাম কি হইয়াছিল তাহা লক্ষ্য কর" (৭:৮৪)।
📄 লূত সম্প্রদায়ের ধ্বংসাবশেষ ও মানবজাতির জন্য দৃষ্টান্তমূলক শিক্ষা
লূত সম্প্রদায়ের ধ্বংসাবশেষ ও মানবজাতির জন্য দৃষ্টান্তমূলক শিক্ষা
আল্লাহ তা'আলা পাপাচারী যে জাতিকেই ধ্বংস করিয়াছেন, বহু কাল ব্যাপিয়া মানবজাতির শিক্ষা গ্রহণের জন্য এবং তাহাদেরকে সতর্ক করার জন্য তাহা দর্শনীয় করিয়া রাখিয়াছেন। তিনি মানবজাতিকে অপরাধী যালেম সম্প্রদায়সমূহের ধ্বংসাবশেষ পর্যবেক্ষণ করিয়া তাহা হইতে শিক্ষা গ্রহণের আহ্বান জানাইয়াছেন:
قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ ثُمَّ انْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ . "বল, তোমরা, পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর, অতঃপর দেখ, যাহারা সত্যকে অস্বীকার করিয়াছিল তাহাদের পরিণাম কী হইয়াছে” (৬ঃ ১১)।
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ فَمِنْهُمْ مَنْ هَدَى اللَّهُ وَمِنْهُمْ مَنْ حَقَّتْ عَلَيْهِ الضَّلَةُ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ . "আমি তো প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠাইয়াছি আল্লাহ্র ইবাদত করিবার এবং তাগূতকে (সীমা লংঘনকারীকে) বর্জন করিবার নির্দেশ দিবার জন্য। অতঃপর উহাদের কতকের উপর পথভ্রষ্টতা সাব্যস্ত হইয়াছিল। অতএব তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং দেখ, যাহারা সত্যকে মিথ্যা বলিয়াছিল তাহাদের পরিণাম কী হইয়াছে” (১৬: ৩৬)?
قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ "বল, তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং অপরাধীদের কী পরিণাম হইয়াছিল তাহা পর্যবেক্ষণ কর" (২৭ঃ ৬৯; আরও দ্র. ৩৪: ১৩৭; ২৭: ১৪; ২৮: ৪০ ও ৩০:৪২)। অনুরূপভাবে আল্লাহ্ তা'আলা লূত সম্প্রদায়ের পরিণতিও স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণের জন্য মানবজাতিকে আহবান জানাইয়াছেন:
وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَراً فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ . "আমি তাহাদের উপর ভীষণভাবে বৃষ্টি বর্ষণ করিয়াছিলাম। সুতরাং অপরাধীদের পরিণাম কী হইয়াছিল তাহা লক্ষ্য কর" (৭:৮৪)।
লূত সম্প্রদায়ের বিধ্বস্ত জনপদের ধ্বংসাবশেষের নিদর্শনসমূহ আল্লাহ্ তা'আলা বোধশক্তিসম্পন্ন, বিবেকবান ও মর্মান্তিক পরিণতি সম্পর্কে সজাগ মানুষের জন্য উপদেশ গ্রহণের বিষয় হিসাবে পরিত্যক্ত অবস্থায় রাখিয়া দিয়াছেন এবং তাহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুগেও অবশিষ্ট ছিল। হিজায হইতে আরব বণিকদল যে পথ ধরিয়া সিরিয়া যাতায়াত করিত, উক্ত ধ্বংসাবশেষ সেই পথেই অবস্থিত ছিল। এই কারণে আরবগণ লূতসম্প্রদায়ের ধ্বংসাবশেষ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিল (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ১খ, পৃ. ২৫২)। আরবগণ, বিশেষত কুরায়শ গোত্র মহানবী (স)-এর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করিয়া তাঁহার বিরুদ্ধাচরণ করিতে থাকিলে মহান আল্লাহ তাহাদেরকে বারবার স্মরণ করাইয়া দেন:
وَمَا هِيَ مِنَ الظَّلِمِينَ بِبَعِيدٍ . "ইহা (ধ্বংসাবশেষ) যালেমদের হইতে দূরে নহে” (১১:৮৩)। অর্থাৎ এই প্রকারের শাস্তি আজও যালেমদের হইতে মোটেও দূরবর্তী নহে (তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৩০৫, টীকা ১১; তাফহীমুল কুরআন, সূরা হূদ-এর ৯৩ নং টীকা)।
وَأَنَّهَا لَبِسَبيل مقيم . إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ . "ইহা তো লোক চলাচলের পথিপার্শ্বে এখনও বিদ্যমান। অবশ্যই ইহাতে মুমিনদের জন্য নিদর্শন রহিয়াছে” (১৫ঃ ৭৬-৭)। অর্থাৎ হিজায হইতে সিরিয়া এবং ইরাক হইতে মিসর যাওয়ার পথিপার্শ্বে এই ধ্বংসাবশেষ অবস্থিত এবং যাত্রীদল এই পুরা এলাকায় ছড়াইয়া থাকা ধ্বংসাবশেষের চিহ্নাদি দেখিতে পায় (তাফহীম, সূরা হিজর, টীকা ৪২)। এই ধ্বংসাবশেষ স্বচক্ষে দেখিয়া কেবল ঈমানদার জনগোষ্ঠীই শিক্ষা গ্রহণ করিয়া থাকে। কারণ তাহারা মনে করে যে, লূত জাতির পাপাচার ও দৌরাত্মের শাস্তিস্বরূপই এই সম্প্রদায়ের বসতি ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। ঈমানদারগণ ব্যতীত অন্যরা যতদূর সম্ভব এই ধ্বংসাবশেষ প্রত্যক্ষ করিয়া ইহাকে একটি আকস্মিক দুর্ঘটনা অথবা উহা কোন প্রাকৃতিক কারণে ঘটিয়াছে বলিয়া ব্যাখ্যা করে (তাফসীরে উছমানী, পৃ.৩৫২, টীকা ৫)।
وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ وَلَقَدْ تَرَكْنَا مِنْهَا آيَةً بَيِّنَةً لِّقَوْمٍ يَعْقِلُونَ "কিন্তু ইহাদের অধিকাংশই মুমিন নহে” (২৬ঃ ১৭৪)।
"আমি বোধশক্তি সম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য ইহাতে (ধ্বংসাবশেষে) রাখিয়াছি একটি নিদর্শন" (২৯:৩৫)। وَإِنَّكُمْ لَتَمُرُّونَ عَلَيْهِمْ مُصْبِحِيْنَ . وَبِالَّيْلِ أَفَلَا تَعْقِلُونَ .
"তোমরা তো উহাদের ধ্বংসাবশেষগুলি সকালে ও সন্ধ্যায় অতিক্রম করিয়া থাক। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করিবে না।" (৩৭: ১৩৭-৮)।
আল্লামা শাববীর আহমাদ উছমানী বলেন, উক্ত আয়াতে নাফরমান মক্কাবাসীদেরকে বলা হইয়াছে যে, তথা হইতে যেসব কাফেলা সিরিয়ায় যাতায়াত করে তাহাদের রাস্তায় তাহারা লূত সম্প্রদায়ের বিধ্বস্ত জনপদ দেখিতে পায়। অর্থাৎ রাত-দিন তাহারা এই নিদর্শনসমূহ দেখিতেছে, ইহার পরও কি তাহারা শিক্ষা গ্রহণ করিবে না, তাহারা কি বুঝে না যে, এই অবাধ্য সম্প্রদায় যে করুণ পরিণতির শিকার হইয়াছে, অন্যান্য অবাধ্য সম্প্রদায়েরও অনুরূপ অবস্থা হইতে পারে (তাফসীর, পৃ. ৬০১, টীকা ৩)?
وَتَرَكْنَا فِيهَا أَيَةً لِّلَّذِينَ يَخَافُوْنَ الْعَذَابَ الْأَلِيمَ . "যাহারা মর্মান্তিক শাস্তিকে ভয় করে, আমি তাহাদের জন্য উহাতে একটি নিদর্শন রাখিয়াছি" (৫১:৩৭)। অর্থাৎ এখনো তথায় বিধ্বস্ত জনপদের নিদর্শন বিদ্যমান আছে এবং লূত সম্প্রদায়ের সাংঘাতিকভাবে ধ্বংস হওয়ার ঘটনায় আল্লাহর শাস্তিকে ভয়কারীদের জন্য শিক্ষা গ্রহণের উপকরণ আছে (তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৬৯৩, টীকা ৫)।
وَلَقَدْ تَرَكْنَا مِنْهَا آيَةً بَيِّنَةً لِّقَوْمٍ يَعْقِلُونَ "আমি বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য ইহাতে একটি স্পষ্ট নিদর্শন রাখিয়াছি" (২৯ঃ ৩৫)। উক্ত আয়াতসমূহ হইতে বুঝা গেল যে, লূত সম্প্রদায়ের ধ্বংসাবশেষ হইতে কেবল তাহারাই শিক্ষা গ্রহণ করিতে পারিবে, সতর্ক ও সাবধান হইতে পারিবে, যাহারা আল্লাহর শাস্তিতে ভীত প্রজ্ঞাবান মু'মিন।
বাইবেলের বর্ণনা, গ্রীক ও লাতিন প্রাচীনলিপি এবং আধুনিক কালের প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে জানা যায় যে, লূত সাগরের পূর্ব ও দক্ষিণের যে অঞ্চলটি জনশূন্য অবস্থায় পরিত্যক্ত আছে সেখানে বহু প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ বিদ্যমান, যাহা হইতে অনুমিত হয় যে, এক কালে এখানে মানববসতি ছিল।