📄 কুরআন ও হাদীছে হযরত লূত (আ)
কুরআন মজীদের মোট ১৭টি সূরায় সাতাশবার নামোল্লেখসহ হযরত লূত (আ) ও তাঁহার কাওম সম্পর্কে আলোচনা বিদ্যমান: ৬ : ৮৬; ৭ : ৮০-৮৪; ১১ : ৬৯-৮৩; ১৫ : ৫১-৭৭; ২১ : ৫১-৭৫; ২২:৪২-৪৩; ২৫: ৪০; ২৬ : ১৬০-১৭৫; ২৭:৫৪-৫৮; ২৯: ২৬-৩৫; ৩৭: ১৩৩-১৩৮; ৩৮: ১৩; ৫০: ১৩; ৫১: ২৪-৩৭; ৫৩ ৫৩-৫৪; ৫৪ : ৩৩-৩৮ এবং ৬৬:১০।
সূরা আল-আন'আম (৬)-এ ৮৩-৮৬ আয়াতে মোট আঠারজন নবীর নামোল্লেখ করা হইয়াছে, এই ৮৬ নং আয়াতে তিনজন নবীর নাম সহীহ আল-বুখারীর কিতাবুত তাফসীরে, বাব: "উলাইকাল্লাযীনা হাদাল্লাহু ফাবিহুদাহুম ইকতাদিহ্" (৬: ৯০) অনুচ্ছেদেও উক্ত হইয়াছে। সূরা আম্বিয়া (২১)-র ৭১ নং আয়াতে ইবরাহীম (আ)-এর সহিত তাঁহার বরকতময় ভূমিতে হিজরতের কথা ব্যক্ত হইয়াছে। সূরা হজ্জের ৪২-৪৮ আয়াতে কয়েকজন নবীর উম্মতের করুণ পরিণতির উল্লেখপূর্বক মহানবী (স)-কে সান্ত্বনা দিয়া বলা হইয়াছে যে, তাঁহার জাতি তাঁহাকে প্রত্যাখ্যান করিলে তাহাদেরও অনুরূপ পরিণতি হইবে। এই প্রসঙ্গে কওমে দূতেরও উল্লেখ করা হইয়াছে। সূরা 'আনকাবূতের ২৬ নং আয়াতে ইবরাহীম (আ)-এর উপর তাঁহার ঈমান আনার কথা ব্যক্ত হইয়াছে। ৩৮: ১৩ এবং ৫০ : ১৩ আয়াতে লূত (আ)-কে তাঁহার জাতি কর্তৃক প্রত্যাখ্যান করার কথা উক্ত হইয়াছে। ৬৬: ১০ আয়াতে লূত (আ)-এর স্ত্রীর কুফরী এবং পরিণামে তাহার জাহান্নামী হওয়ার কথা বলা ইয়াছে। ৫৩ঃ ৫৩ আয়াতে "আল-মু'তাফিকাহ” (উল্টানো আবাসভূমি) দ্বারা দূত (আ)-এর সম্প্রদায়কে বুঝানো হইয়াছে (তাফসীরে ইবন 'আব্বাস, পৃ. ৪৪৮; তাফসীরে তাবারী, ২৭ খ, পৃ. ৪৭; তাফসীরে কুরতুবী, ২৭খ, পৃ. ১২০; তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৭০১, টীকা ৬; তাফহীমুল কুরআন, উক্ত সূরার টীকা ৪৬; মাআরেফুল কোরআন, সংক্ষিপ্ত সং, পৃ. ১৩১১) এবং পরবর্তী (৫৪) আয়াতে তাহাদের সর্বগ্রাসী শাস্তিতে আচ্ছন্ন হওয়ার কথা বলা হইয়াছে। অবশিষ্ট সূরাসমূহে লূত (আ)-এর দাওয়াত, তাঁহার জাতি কর্তৃক তাহা প্রত্যাখ্যান, তাঁহার জাতির অপকর্ম এবং পরিণতিতে তাহাদের করুণভাবে ধ্বংস হওয়ার বিষয় উক্ত হইয়াছে (যাহা নিবন্ধের সংশ্লিষ্ট স্থানসমূহে উল্লেখ করা হইবে)।
সহীহ বুখারীতে হযরত লূত (আ) সম্পর্কে নিম্নোক্ত হাদীছ বিদ্যমানঃ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ يَغْفِرُ اللهِ لِلُوطُ إِنْ كَانَ لَيَأْوِي إِلى رُكْنِ شَدِيدٍ . "আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। নবী (স) বলেন: "আল্লাহ লূত (আ)-কে ক্ষমা করুন। তিনি একটি মজবুত খুঁটির আশ্রয় লইতে চাহিয়াছিলেন” (বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া, বাব: লাকাদ কানা ফী ইয়ূসুফা...., ভারতীয় সং, ১খ, পৃ. ৪৭৯; ২খ, পৃ. ৬৭৯, তাফসীর সূরা ইয়ূসুফ লাকাদ কানা ফী ইয়ুসুফা...)।
সুনান ইবন মাজায় হাদীছটি বিস্তারিতভাবে বর্ণিত:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَحْنُ أَحَقُّ بِالشَّكْ مِنْ إِبْرَاهِيمَ إِذْ قَالَ رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِ الْمَوْتَى قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنْ قَالَ بَلَى وَلَكِنْ لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِي وَيَرْحُمُ اللَّهُ لُوْطًا لَقَدْ كَانَ يَأْوِي إِلى رُكْنِ شَدِيدٍ وَلَوْ لَبِثْتُ فِي السِّجْنِ طُولَ مَا لَبِثَ يُوسُفُ لَأَجَبْتُ الدَّاعِي . "আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: ইবরাহীম (আ)-এর তুলনায় আমরাই সন্দেহ পোষণের অধিক উপযুক্ত, যখন তিনি বলিলেন, "হে আমার প্রতিপালক! কিভাবে তুমি মৃতকে জীবিত কর (তাহা) আমাকে দেখাও। তিনি বলিলেন, তবে কি তুমি বিশ্বাস কর না? সে বলিল, কেন করিব না, তবে ইহা কেবল আমার অন্তরের প্রশান্তির জন্য" (২: ২৬০)। আল্লাহ লূত (আ)-কে অনুগ্রহ করুন। তিনি এক শক্তিশালী স্তম্ভের আশ্রয় চাহিয়াছিলেন। আমি ইয়ূসুফ (আ)-এর মত তত কাল জেলখানায় বন্দী থাকিলে অবশ্যই আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিতাম" (কিতাবুল ফিতান, বাবুস সার আলাল বালা, দেওবন্দ সং, পৃ. ২৯১; বৈরূত সং, ২খ, পৃ. ১৩৩৫-৬, নং ৪০২৬)।
ইমাম ইব্ন কাছীর (র) তাঁহার ইতিহাস গ্রন্থে (১খ, পৃ. ১৮০) একটি হাদীছ উদ্ধৃত করিয়াছেন যাহা হইতে "শক্তিশালী স্তম্ভ" (রুকন শাদীদ)-এর একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়:
رَحْمَةُ اللَّهِ عَلَى لُوطٍ لَقَدْ كَانَ يَأْوِي إِلى رُكْنِ شَدِيدٍ يَعْنِي اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ فَمَا بَعَثَ اللَّهُ بَعْدَهُ مِنْ نَبِيٍّ إِلَّا فِي ثُرْوَةٍ مِّنْ قَوْمِهِ . "লূত (আ)-এর উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হউক। তিনি একটি সুদৃঢ় স্তম্ভের অর্থাৎ মহামহিম আল্লাহ্ আশ্রয় প্রার্থনা করিয়াছিলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার পর হইতে যে কোনও জাতির নিকট তাহাদের মধ্যকার প্রভাবশালী বংশ হইতেই নবী পাঠাইয়াছে”। হাদীছটি আল-মুসতাদরাক গ্রন্থেও সামান্য শাব্দিক পার্থক্যসহ উক্ত হইয়াছে (২খ, পৃ. ৫৬১)।
📄 দাওয়াত ও তাবলীগের বিবরণ
হযরত লূত (আ) পিতৃব্য হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সহিত বর্তমান ইরাকের বাবিল অর্থাৎ মেসোপটামিয়ার ঊর নামক স্থান হইতে বসতি ত্যাগ করিয়া কিছুকাল যাবত সিরিয়া, ফিলিস্তীন ও মিসর পরিভ্রমণ করিয়া দীনের প্রচারকার্যে অংশগ্রহণ করিতে থাকেন। এইভাবে তিনি নুবুওয়াত লাভের পূর্ব হইতেই দীনের প্রচারকার্যে ব্যাপৃত হন। তিনিই সর্বপ্রথম হযরত ইবরাহীম (আ)-এর উপর ঈমান আনেন (আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৭৬; বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৪৯)। এই সম্পর্কে কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে: فَامَنَ لَهُ لُوْطُ "লূত তাঁহার প্রতি ঈমান আনিল" (২৯: ২৬)। নমরূদের অগ্নিকুণ্ড হইতে ইবরাহীম (আ) মুক্তিলাভ করার পরপরই তিনি তাঁহার প্রতি প্রথম ঈমান আনেন। তিনি হিজরতেও ইবরাহীম (আ)-এর সঙ্গী ছিলেন। উপরিউক্ত আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হইয়াছেঃ
وَقَالَ إِنِّي مُهَاجِرُ إِلى رَبِّي إِنَّهُ هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ "এবং ইবরাহীম বলিল, আমি আমার প্রতিপালকের উদ্দেশে দেশত্যাগ করিতেছি। নিশ্চয় তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (২৯: ২৬)।
উক্ত আয়াতে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর হিজরতের কথা বলা হইলেও তাঁহার সহিত লূত (আ)-ও ছিলেন। এখানে মুখ্য ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হইয়াছে মাত্র। মতান্তরে ২৯: ২৬ আয়াতের বক্তব্য হযরত লূত (আ)-এর (আল-মুসতাদরাক, ২খ, পৃ. ৫৬২; নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮০)। কিন্তু এই মত প্রসঙ্গের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ নহে (মাআরেফুল কোরআন, সৌদী সংস্করণ, পৃ. ১২২৭; তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৫০১, টীকা ৯)। এখানে আরও একটি জ্ঞাতব্য বিষয় এই যে, হযরত ইবরাহীম (আ)-এর উপর ঈমান আনার পূর্বে লূত (আ)-এর ধর্মীয় বিশ্বাস কি ছিল? তাঁহার জাতি ছিল মুশরিক। কুরআন মজীদের যত জায়গায় তাঁহার সম্পর্কে আলোচনা আছে, উহার কোথাও বলা হয় নাই যে, তিনিও তাঁহার জাতির মত বিভ্রান্ত ছিলেন। তিনি শিশুকাল হইতে পিতৃব্য হযরত ইবরাহীম (আ)-এর তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হওয়ায় তাঁহার চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন এই কথা বলা যায়। আল্লাহ তা'আলা যাঁহাদেরকে নুবুওয়াত ও রিসালাতের পদে অভিষিক্ত করিয়াছেন তাঁহাদের জন্মাবধি তাঁহাদেরকে পৌত্তলিকতা (শিক)-সহ সকল প্রকারের পঙ্কিলতা হইতে মুক্ত ও পবিত্র রাখিয়াছেন। অতএব হযরত লূত (আ)-ও যাবতীয় পঙ্কিলতা হইতে মুক্ত ছিলেন। কয়েকজন নবীর নামোল্লেখের পর মহান আল্লাহ বলেন:
وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُمْ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ . "তাহারা যদি শির্ক করিত তাহা হইলে তাহাদের কৃতকর্ম নিষ্ফল হইয়া যাইত" (৬:৮৮)। অনন্তর ২১ঃ ৭১ আয়াতে বলা হইয়াছে:
وَنَجَّيْنَاهُ وَلُوطًا إِلَى الْأَرْضِ الَّتِي بَارَكْنَا فِيهَا لِلْعَلَمِينَ . "এবং আমি তাহাকে ও লূতকে উদ্ধার করিয়া সেই দেশে লইয়া গেলাম যেথায় আমি বিশ্ববাসীর জন্য কল্যাণ রাখিয়াছি" (২১ঃ ৭১)।
উবায় ইব্ন কাব (রা), আবুল 'আলিয়া, কাতাদা (র) প্রমুখের মতে উক্ত আয়াতে তাহাদের সিরিয়া গমন বুঝানো হইয়াছে এবং ইব্ন 'আব্বাস (রা)-র মতে মক্কাকে বুঝানো হইয়াছে (বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৫০; তাফসীরে কবীর, ২২খ, পৃ. ১৯০; রূহুল মাআনী, ১৭খ, পৃ. ৭০)। রূহুল মাআনীতে মিসরের কথাও উল্লিখিত হইয়াছে, তবে সিরিয়া সম্পর্কিত মতকে সহীহ বলা হইয়াছে। তাফসীরে কাশশাফে শুধু সিরিয়ার উল্লেখ আছে (২খ, পৃ. ৫৭৮)। পৃথিবীর বুকে ইবরাহীম (আ)-ই সর্বপ্রথম হিজরত করেন এবং তাঁহার স্ত্রীও তাঁহার সঙ্গী হন। লূত (আ)-ও তাঁহার সঙ্গে ছিলেন। হযরত উছমান (রা) সস্ত্রীক হাবশায় হিজরত করিলে মহানবী (স) বলেন:
انَّ عُثْمَانَ أَوَّلُ مُهَاجِرٍ بِأَهْلِهِ بَعْدَ لُوطٍ . "লূত (আ)-এর পর উছমানই সস্ত্রীক সর্বপ্রথম মুহাজির" (নাজ্জারের কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮৪)। ইহাতে প্রমাণিত হয় যে, লূত (আ)-এর স্ত্রীও তাঁহার সঙ্গে ছিলেন। অতঃপর চাচা-ভ্রাতুষ্পুত্র সিরিয়ায় পৌঁছিয়া কিন'আনীদের এলাকা সিক্কীম (নাবলুস)-এ বসবাস করিতে থাকেন (নাজ্জার, পৃ. ৮৪)। এই এলাকায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তাঁহারা মিসর গমন করেন, বিভিন্ন বিপদাপদের পর প্রচুর সম্পদসহ পুনরায় পবিত্র ভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেন (বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৫২; আরাইস, পৃ. ১০৯; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৯১)। প্রত্যাবর্তনের পথে লূত (আ) পিতৃব্যের সম্মতিক্রমে সাদৃমে বসতি স্থাপন করেন এবং এই ভ্রমণের এক পর্যায়ে নুবুওয়াত লাভ করেন (নাজ্জার, পৃ. ৯০-৯১; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৯১; আরাইস, পৃ. ১০৯; বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৫২, ১৭৬; আল-মুসতাদরাক, ২খ, পৃ. ৫৬২)। বাইবেলে বলা হইয়াছে: "আর ইবরাহীমের সহযাত্রী দূতেরও অনেক মেষ ও গো এবং তাম্বু ছিল। আর সেই দেশে একত্র বাস সম্পোষ্য হইল না, কেননা তাঁহাদের প্রচুর সম্পত্তি থাকাতে তাঁহারা একত্র বাস করিতে পারিলেন না। আর ইবরাহীমের পশুপালকদের ও ভূতের পশুপালকদের পরস্পর বিবাদ হইল। ... তাহাতে ইবরাহীম লূতকে কহিলেন, বিনয় করি, তোমাতে ও আমাতে এবং তোমার পশুপালকগণে ও আমার পশুপালকগণে বিবাদ না হউক। কেননা আমরা পরস্পর জ্ঞাতি। তোমার সম্মুখে কি সমস্ত দেশ নাই? বিনয় করি, আমা হইতে পৃথক হও, হয় তুমি বামে যাও, আমি দক্ষিণে যাই, নয় তুমি দক্ষিণে যাই" (আদিপুস্তক, ১৩:৫-৯)।
এখানে দুইজনের পৃথক হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্ট। (১) তাঁহাদের উভয়ের সহায়-সম্পত্তি ও গবাদিপশুর প্রাচুর্যের কারণে স্থান সংকুলান হইতেছিল না। (২) তাঁহাদের দুইজনের পশুপালকদের মধ্যে বিবাদ হইয়াছিল এবং পশুপালকদের মধ্যে বিবাদ হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। যাহাতে সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে স্থান সংকুলান হয় এবং যাহাতে তাহাদের পশুচারকদের মধ্যে বিবাদ বাধিতে না পারে সেই লক্ষ্যে তাঁহারা পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে পৃথক হইয়াছিলেন। কোন কোন ইসলামী সূত্রে বলা হইয়াছে যে, দুই মহান নবীর পশু সম্পদে অত্যধিক বরকত হওয়ায় তাঁহারা স্থান সংকুলানের জন্য পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে দুই ভিন্ন এলাকায় নিজ নিজ সম্পত্তি স্থানান্তরিত করেন (নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮৯-৯০)। লূত (আ) স্থানান্তরিত হওয়ার পর এক পর্যায়ে এলমের কদলায়মূর শাহ তাহার অপর তিনজন যুক্তরাষ্ট্রীয় শাহগণকে সঙ্গে লইম্মা সাদূম ও ইহার চার যুক্তরাষ্ট্রীয় বাদশাহগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়া জয়যুক্ত হইল এবং অন্যান্য লুণ্ঠিত সম্পদের সহিত হযরত লূত (আ)-কে তাঁহার সম্পদসহ বন্দী করিয়া লইয়া গেল। হযরত ইবরাহীম (আ) এই সংবাদ প্রাপ্ত হইয়া তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং জয়যুক্ত হইয়া লূত (আ)-কে মুক্ত করেন ও অনেক গানীমাত লাভ করেন (আদিপুস্তক, ১৪ : ১-১৬; বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৫২-৫৩)।
কুরআন ও হাদীছে হযরত লূত (আ)
কুরআন মজীদের মোট ১৭টি সূরায় সাতাশবার নামোল্লেখসহ হযরত লূত (আ) ও তাঁহার কাওম সম্পর্কে আলোচনা বিদ্যমান: ৬ : ৮৬; ৭ : ৮০-৮৪; ১১ : ৬৯-৮৩; ১৫ : ৫১-৭৭; ২১ : ৫১-৭৫; ২২:৪২-৪৩; ২৫: ৪০; ২৬ : ১৬০-১৭৫; ২৭:৫৪-৫৮; ২৯: ২৬-৩৫; ৩৭: ১৩৩-১৩৮; ৩৮: ১৩; ৫০: ১৩; ৫১: ২৪-৩৭; ৫৩ ৫৩-৫৪; ৫৪ : ৩৩-৩৮ এবং ৬৬:১০। সূরা আল-আন'আম (৬)-এ ৮৩-৮৬ আয়াতে মোট আঠারজন নবীর নামোল্লেখ করা হইয়াছে, এই ৮৬ নং আয়াতে তিনজন নবীর নাম সহীহ আল-বুখারীর কিতাবুত তাফসীরে, বাব: "উলাইকাল্লাযীনা হাদাল্লাহু ফাবিহুদাহুম ইকতাদিহ্" (৬: ৯০) অনুচ্ছেদেও উক্ত হইয়াছে। সূরা আম্বিয়া (২১)-র ৭১ নং আয়াতে ইবরাহীম (আ)-এর সহিত তাঁহার বরকতময় ভূমিতে হিজরতের কথা ব্যক্ত হইয়াছে। সূরা হজ্জের ৪২-৪৮ আয়াতে কয়েকজন নবীর উম্মতের করুণ পরিণতির উল্লেখপূর্বক মহানবী (স)-কে সান্ত্বনা দিয়া বলা হইয়াছে যে, তাঁহার জাতি তাঁহাকে প্রত্যাখ্যান করিলে তাহাদেরও অনুরূপ পরিণতি হইবে। এই প্রসঙ্গে কওমে দূতেরও উল্লেখ করা হইয়াছে। সূরা 'আনকাবূতের ২৬ নং আয়াতে ইবরাহীম (আ)-এর উপর তাঁহার ঈমান আনার কথা ব্যক্ত হইয়াছে। ৩৮: ১৩ এবং ৫০ : ১৩ আয়াতে লূত (আ)-কে তাঁহার জাতি কর্তৃক প্রত্যাখ্যান করার কথা উক্ত হইয়াছে। ৬৬: ১০ আয়াতে লূত (আ)-এর স্ত্রীর কুফরী এবং পরিণামে তাহার জাহান্নামী হওয়ার কথা বলা ইয়াছে। ৫৩ঃ ৫৩ আয়াতে "আল-মু'তাফিকাহ” (উল্টানো আবাসভূমি) দ্বারা দূত (আ)-এর সম্প্রদায়কে বুঝানো হইয়াছে (তাফসীরে ইবন 'আব্বাস, পৃ. ৪৪৮; তাফসীরে তাবারী, ২৭ খ, পৃ. ৪৭; তাফসীরে কুরতুবী, ২৭খ, পৃ. ১২০; তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৭০১, টীকা ৬; তাফহীমুল কুরআন, উক্ত সূরার টীকা ৪৬; মাআরেফুল কোরআন, সংক্ষিপ্ত সং, পৃ. ১৩১১) এবং পরবর্তী (৫৪) আয়াতে তাহাদের সর্বগ্রাসী শাস্তিতে আচ্ছন্ন হওয়ার কথা বলা হইয়াছে। অবশিষ্ট সূরাসমূহে লূত (আ)-এর দাওয়াত, তাঁহার জাতি কর্তৃক তাহা প্রত্যাখ্যান, তাঁহার জাতির অপকর্ম এবং পরিণতিতে তাহাদের করুণভাবে ধ্বংস হওয়ার বিষয় উক্ত হইয়াছে (যাহা নিবন্ধের সংশ্লিষ্ট স্থানসমূহে উল্লেখ করা হইবে)। সহীহ বুখারীতে হযরত লূত (আ) সম্পর্কে নিম্নোক্ত হাদীছ বিদ্যমানঃ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ يَغْفِرُ اللهِ لِلُوطُ إِنْ كَانَ لَيَأْوِي إِلى رُكْنِ شَدِيدٍ . "আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। নবী (স) বলেন: "আল্লাহ লূত (আ)-কে ক্ষমা করুন। তিনি একটি মজবুত খুঁটির আশ্রয় লইতে চাহিয়াছিলেন” (বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া, বাব: লাকাদ কানা ফী ইয়ূসুফা...., ভারতীয় সং, ১খ, পৃ. ৪৭৯; ২খ, পৃ. ৬৭৯, তাফসীর সূরা ইয়ূসুফ লাকাদ কানা ফী ইয়ুসুফা...)।
সুনান ইবন মাজায় হাদীছটি বিস্তারিতভাবে বর্ণিত: عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَحْنُ أَحَقُّ بِالشَّكْ مِنْ إِبْرَاهِيمَ إِذْ قَالَ رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِ الْمَوْتَى قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنْ قَالَ بَلَى وَلَكِنْ لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِي وَيَرْحُمُ اللَّهُ لُوْطًا لَقَدْ كَانَ يَأْوِي إِلى رُكْنِ شَدِيدٍ وَلَوْ لَبِثْتُ فِي السِّجْنِ طُولَ مَا لَبِثَ يُوسُفُ لَأَجَبْتُ الدَّاعِي . "আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: ইবরাহীম (আ)-এর তুলনায় আমরাই সন্দেহ পোষণের অধিক উপযুক্ত, যখন তিনি বলিলেন, "হে আমার প্রতিপালক! কিভাবে তুমি মৃতকে জীবিত কর (তাহা) আমাকে দেখাও। তিনি বলিলেন, তবে কি তুমি বিশ্বাস কর না? সে বলিল, কেন করিব না, তবে ইহা কেবল আমার অন্তরের প্রশান্তির জন্য" (২: ২৬০)। আল্লাহ লূত (আ)-কে অনুগ্রহ করুন। তিনি এক শক্তিশালী স্তম্ভের আশ্রয় চাহিয়াছিলেন। আমি ইয়ূসুফ (আ)-এর মত তত কাল জেলখানায় বন্দী থাকিলে অবশ্যই আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিতাম" (কিতাবুল ফিতান, বাবুস সার আলাল বালা, দেওবন্দ সং, পৃ. ২৯১; বৈরূত সং, ২খ, পৃ. ১৩৩৫-৬, নং ৪০২৬)।
ইমাম ইব্ন কাছীর (র) তাঁহার ইতিহাস গ্রন্থে (১খ, পৃ. ১৮০) একটি হাদীছ উদ্ধৃত করিয়াছেন যাহা হইতে "শক্তিশালী স্তম্ভ" (রুকন শাদীদ)-এর একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়:
রَحْمَةُ اللَّهِ عَلَى لُوطٍ لَقَدْ كَانَ يَأْوِي إِلى رُكْنِ شَدِيدٍ يَعْنِي اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ فَمَا بَعَثَ اللَّهُ بَعْدَهُ مِنْ نَبِيٍّ إِلَّا فِي ثُرْوَةٍ مِّنْ قَوْمِهِ . "লূত (আ)-এর উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হউক। তিনি একটি সুদৃঢ় স্তম্ভের অর্থাৎ মহামহিম আল্লাহ্ আশ্রয় প্রার্থনা করিয়াছিলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার পর হইতে যে কোনও জাতির নিকট তাহাদের মধ্যকার প্রভাবশালী বংশ হইতেই নবী পাঠাইয়াছে”। হাদীছটি আল-মুসতাদরাক গ্রন্থেও সামান্য শাব্দিক পার্থক্যসহ উক্ত হইয়াছে (২খ, পৃ. ৫৬১)।
📄 বৈবাহিক জীবন
আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার তাঁহার গ্রন্থে লিখিয়াছেন যে, ইবরাহীম (আ)-এর সঙ্গে দেশান্তর গমনে লূত (আ)-এর সহিত লূত-পত্নীও ছিল (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮৩)। তবে অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে এই সময় তাঁহার সহিত লূত-পত্নী ছিল না, তবে তিনি তখন বিবাহিত ছিলেন কি না তাহা স্পষ্ট নহে। কুরআন মজীদে লূত (আ), তাঁহার জাতি ও তাঁহার স্ত্রীর সহিত সংশ্লিষ্ট বর্ণনা হইতে অনুমিত হয় যে, তিনি সাদূমে পৌছিয়া তথাকার এক নারীকে বিবাহ করিয়াছিলেন। তাহার বংশপরিচয় সম্পর্কে ইসলামী উৎস ও বাইবেল নীরব। তাহাদের সহিত তাঁহার বৈবাহিক সম্পর্ক থাকার কারণে হয়তো এই জাতিকে কওমে লূত বলা হইয়াছে। লূত (আ)-এর স্ত্রী যদি দেশত্যাগের দীর্ঘ সফরে তাঁহাদের সহিত থাকিত, তবে মিসরে ইবরাহীম (আ)-এর স্ত্রী সারার বেলায় যাহা ঘটিয়াছিল, তাহার বেলায়ও অনুরূপ না ঘটিবার কোন কারণ ছিল না। অতএব এই ঘটনা হইতে অনুমিত হয় যে, লূত (আ) তখন বিবাহিত ছিলেন না। তবে নাজ্জারের কাসাস গ্রন্থে যে হাদীছ উক্ত হইয়াছে (পৃ. ৮৪) তাহা তাঁহার বিবাহিত হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
লূত (আ) বৈবাহিক জীবনে সুখী ছিলেন বলিয়া মনে হয় না। কারণ তাঁহার স্ত্রী তাঁহার উপর ঈমান আনে নাই; সে তাহার জ্ঞাতি সাদৃমদের মত মুশরিক ছিল। লূত (আ)-এর বাড়িতে সুদর্শন যুবকের বেশে ফেরেশতাগণ আগমন করিলে তাঁহার স্ত্রীই তাহার লম্পট জাতিকে সেই খবর জানাইয়া দিয়াছিল। তাই তাঁহার স্ত্রীও সাদূমবাসীদের উপর পতিত গযবে ধ্বংস হয় (তাফসীরে তাবারী, ১২ খ, পৃ. ৫৫)। তাহার অবাধ্যচারিতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও উহার পরিণতি সম্পর্কে কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে :
ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لَّلَّذِينَ كَفَرُوا امْرَأَتَ نُوحٍ وَامْرَأَتَ لُوطٍ كَانَتَا تَحْتَ عَبْدَيْنِ مِنْ عِبَادِنَا صَالِحَيْنِ فَخَانَتْهُمَا فَلَمْ يُغْنِيَا عَنْهُمَا مِنَ اللَّهِ شَيْئًا وَقِيلَ ادْخُلَا النَّارَ مَعَ الدَّاخِلِينَ. "আল্লাহ কাফেরদের জন্য নূহের স্ত্রী ও লূতের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত দিতেছেন। উহারা ছিল আমার বান্দাদের মধ্যে দুই সৎকর্মপরায়ণ বান্দার অধীন। কিন্তু উহারা তাহাদের সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছিল। ফলে নূহ ও লূত উহাদেরকে আল্লাহ্ শাস্তি হইতে রক্ষা করিতে পারিল না এবং উহাদেরকে বলা হইল, তোমরা উভয়ে প্রবেশকারীদের সহিত দোযখে প্রবেশ কর" (৬৬:১০)।
ইব্ন কাছীর (র) লূত (আ)-এর স্ত্রীর নাম ওয়ালিহা (والهة) এবং ছা'লাবী ওয়াইলা (واعلة) উল্লেখ করিয়াছেন (বিদায়া, ২খ, পৃ. ১৮১; আরাইস, পৃ. ১১৩; সংক্ষিপ্ত ই.বি.-তে 'হালসাকা' উক্ত হইয়াছে, ১ম সং, ২খ, পৃ. ৪০৭)। উপরিউক্ত আয়াতে "উহারা তাহাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছিল" কথার তাৎপর্য এই যে, তাহারা উভয়ে দু'জন মহান নবীর স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তাঁহাদের দীন গ্রহণ করে নাই, বরং কুফরের উপর থাকিয়া তাঁহাদের সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছিল। বিশ্বাসঘাতকতা অর্থ এই নহে যে, তাহারা ব্যভিচারেও লিপ্ত হইয়াছিল। কখনও নহে। কারণ আল্লাহ তা'আলা কোন নবীর স্ত্রীর সহিত ব্যভিচার করিবার ক্ষমতা রুদ্ধ করিয়া দিয়াছেন। যেমন ইব্ন আব্বাস (রা)-সহ পূর্বকালের ও পরবর্তী কালের মুফাসসির ও ঐতিহাসিকগণ বলেন, কোনও নবীর স্ত্রী কখনও ব্যভিচারে লিপ্ত হয় নাই (তাফসীর ইব্ন আব্বাস, পৃ. ৪৭৮; বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৮২)। উপমহাদেশীয় আলমগণের তাফসীর গ্রন্থাবলীতেও ইব্ন আব্বাস (রা)-র মত গৃহীত হইয়াছে। ইব্ন আব্বাস (রা) আরও বলেন, দুই নবীর স্ত্রীদ্বয় প্রকাশ্যে ঈমান আনিয়াছিল, কিন্তু বাস্তবে ছিল মুনাফিক (পৃ. স্থা.)।
ইসলামী উৎসসমূহে হযরত লূত (আ)-এর তিন কন্যা, মতান্তরে দুই কন্যা সন্তানের উল্লেখ পাওয়া যায়, জ্যেষ্ঠার নাম রীছা এবং কনিষ্ঠার নাম রাবিয়া (সংক্ষিপ্ত ই.বি., ১ম সং., ২খ, পৃ. ৪০৭), মতান্তরে যা'ওয়ারা'আ ও যীতাআ (কুরতুবী, ৯খ, পৃ. ৭৬; রূহুল মাআনী, ১২খ, পৃ. ১০৬; তাবারীতে জ্যেষ্ঠার নাম রীছা)। তাঁহারাও পিতার দীনের অনুসারী নেককার মহিলা ছিলেন এবং পিতার সহিত আল্লাহর গযবের স্থান ত্যাগ করিয়া নিরাপদ স্থানে চলিয়া যান। তাঁহাদের একজন ছিলেন হযরত শু'আয়ব (আ)-এর পিতামহী এবং অপরজন ছিলেন হযরত আয়্যব (আ)-এর মাতা (ইব্ন কুতায়বা, আল-মাআরিফ, পৃ. ৪১-৪২-এর বরাতে ই.বি., ২৩খ, পৃ. ৩৭৪)। বাইবেলে বলা হইয়াছে যে, হযরত লূত (আ)-এর সহিত সাদূম ত্যাগকারিনী তাঁহার দুই কন্যা ছিলেন অবিবাহিতা (আদিপুস্তক, ১৯: ৮)। বাইবেলে আরো উক্ত হইয়াছে যে, মহান আল্লাহ হযরত লূত (আ)-কে নির্দেশ দিলেন, "তোমার জামাতা ও পুত্র-কন্যা যতজনই এই নগরে আছে, সে সকলকে এই স্থান হইতে লইয়া যাও” (আদিপুস্তক, ১৯ : ১২)। "তখন দূত বাহিরে গিয়া, যাহারা তাঁহার কন্যাদিগকে বিবাহ করিয়াছিল, আপনার সেই জামাতাদিগকে কহিলেন, উঠ, এ স্থান হইতে বাহির হও, কেননা সদাপ্রভু এই নগর উচ্ছন্ন করিবেন" (আদিপুস্তক, ১৯ : ১৪)।
📄 কাওমে লূত-এর পরিচয়
লূত (আ)-এর সম্প্রদায় নৃতাত্ত্বিক বিবেচনায় তাঁহার স্বগোত্রীয় ছিল না, বরং যে জাতির হেদায়াতের জন্য আল্লাহ তাঁহাকে নবীরূপে প্রেরণ করিয়াছিলেন তাহাদেরকে লূত সম্প্রদায় (১১ : ৭০, ৭৪; ২২ : ৪০; ২৬ : ১৬০; ৩৮ : ১৩ এবং ৫৪ : ৩৩), লূতের ভ্রাতৃবৃন্দ (৫০ : ১৩); তাঁহার জাতি (৬ : ৮০; ৭ : ৮০; ১১:৭৮; ২৭ : ৫৪, ৫৬ এবং ২৯ : ২৮, ২৯) এবং তাহাদের ভ্রাতা (২৬ : ১৬১) বলিয়া কুরআন মজীদে সম্বোধন করা হইয়াছে। একটি আয়াতে এই সম্প্রদায়কে "আল-মু'তাফিকা' (উল্টানো জনপদবাসী, ৫৩ : ৫৩) বলা হইয়াছে তাহাদেরকে প্রদত্ত শাস্তির প্রকৃতি অনুযায়ী। এই জাতির আবাস ছিল সাদৃম, 'আমূদ, আরূম, সা'উর ও সাবুর। এইগুলির মধ্যে সাদৃমই ছিল তাহাদের সর্ববৃহৎ শহর। আল্লাহ্র গযবে ধ্বংসের সময় এসব শহরের মোট জনবসতি ছিল আনুমানিক চল্লিশ লক্ষ (আল-মুসতাদরাক, ২খ, পৃ. ৫৬২; বিদায়া, ১খ. পৃ. ১৮২; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৯৩)। আল-কামিলে পাঁচটি শহরের নাম নিম্নরূপ: সাদূম, সাব্'আ, আমুরা, দূমা ও সা'উত (পৃ. স্থা.)। আল-বিদায়া গ্রন্থে তাহাদের জনবসতির সংখ্যা সাতটি বলা হইয়াছে (পৃ. স্থা.)। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে বর্তমান মৃত সাগর তাহাদের ধ্বংসাবশেষে সৃষ্ট। তৎপূর্বে এখানে কোন সমুদ্র ছিল না, তাই ইহার অপর নাম মৃতসাগর (নাজ্জারের কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ১১৩)। এই জাতি ছিল চরম উচ্ছৃঙ্খল এবং পাপাচারী, যাহার কারণে তাহাদেরকে সমূলে ধ্বংস করা হইয়াছে (বিস্তারিত দ্র. লূত জাতির পাপাচার অনুচ্ছেদে)। সংক্ষিপ্ত ই.বি.-তে এলাকাগুলির নাম উল্লিখিত হইয়াছে সাদূম, আমোরা, আদমাহ, সেবাইম ও সো'আর-রূপে। ছা'লাবীর মতে সো'আর নগরী ধ্বংসের হাত হইতে রক্ষা পায়। কারণ উহার অধিবাসিগণ হযরত লূত (আ)-এর প্রতি ঈমান আনিয়াছিল (১ম সং, ২খ, পৃ. ৪০৭)। বাইবেলের মতে হযরত লূত (আ) তাঁহার পরিবারবর্গসহ প্রথমে এই শহরে আশ্রয় গ্রহণ করেন (আদিপুস্তক, ১৯ : ২০-২২)। ওয়াকিদী জনবসতিগুলি নিম্নোক্তভাবে উল্লেখ করিয়াছেন : সাদূম, আমূরা, আদমৃতা, সা'উরা ও সাবুরা (মুরূজ, ১খ, পৃ. ৫৭)।
লূত সম্প্রদায়ের পাপাচার ও তাহাদের মর্মান্তিক পরিণতি
এই সম্প্রদায় ছিল জঘন্য পাপাচারী। কুরআন মজীদে তাহাদের অন্যান্য পাপাচারের মধ্যে সর্বাধিক জঘন্য পাপকর্ম উল্লিখিত হইয়াছে তাহাদের সমকামিতা (লাওয়াতাত)। আল্লামা ইব্ন কাছীর (র) বলেন, তাহারা এমন একটি নিকৃষ্ট পাপকর্মের প্রচলন করে যাহা ইতোপূর্বে কোন আদম-সন্তান অথবা অন্য কোন জীব করে নাই। তাহা হইল নারীদের ত্যাগ করিয়া পুরুষে-পুরুষে তাহাদের কামতৃপ্তি লাভ করা। সাদৃমবাসীদের পূর্বে কোন মানব সন্তানের তাহাতে লিপ্ত হওয়া তো দূরের কথা, সে ইহার চিন্তাও করে নাই। দামিশক জামে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা উমায়্যা খলীফা ওয়ালীদ ইব্ন আবদুল মালিক বলেন, আল্লাহ তা'আলা যদি আমাদেরকে লূত জাতির এই কুকর্মের কথা অবহিত না করিতেন তাহা হইলে আমরা চিন্তাও করিতে পারিতাম না যে, যৌন সম্ভোগের জন্য নারী ছাড়া পুরুষকেও ব্যবহার করা যায় (তাফসীরে ইব্ন কাছীর, ২খ, পৃ. ৩৪)। কুরআন মজীদে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকবার তাহাদের নৈতিক অবক্ষয় ও লূত (আ)-এর উপদেশ সম্পর্কে আলোচনা আসিয়াছে। ১১ : ৭৮ আয়াতে বলা হইয়াছে যে, তাহারা নানারকম পাপাচারে লিপ্ত থাকিত। ১৫ : ৫৮ আয়াতে তাহাদেরকে অপরাধী সম্প্রদায়, ২১ : ৭৪ আয়াতে অশ্লীল কার্যকলাপে লিপ্ত সম্প্রদায়, ২২ : ৪৩ আয়াতে রাসূলগণকে প্রত্যাখ্যানকারী সম্প্রদায়, ২৬ : ১৬০ আয়াতে রাসূলগণকে প্রত্যাখ্যানকারী ও সমকামিতায় লিপ্ত সম্প্রদায়, ২৭ : ৫৪-৫৫ আয়াতে অশ্লীল কর্মে ও সমকামিতায় লিপ্ত সম্প্রদায়, ২৯ : ২৮-২৯ আয়াতে অশ্লীল কর্মে, সমকামিতায়, রাহাজানিতে ও প্রকাশ্য মজলিসে ঘৃণ্যকর্মে লিপ্ত সম্প্রদায় এবং ৩৮ : ১২-১৪ ও ২৯:৩১ আয়াতে যালেম সম্প্রদায় এবং ৫০ : ১২-১৪ ও ৫৪:৩৩ আয়াতে রাসূলগণকে প্রত্যাখ্যানকারী সম্প্রদায় হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে।