📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইবরাহীম (আ)-এর উপর নাযিলকৃত সহীফা ও উহার বিষয়বস্তু

📄 ইবরাহীম (আ)-এর উপর নাযিলকৃত সহীফা ও উহার বিষয়বস্তু


হযরত ইবরাহীম (আ) তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ)-কে সঙ্গে লইয়া আল্লাহ তা'আলার মহিমান্বিত ঘর কা'বা শরীফ স্থায়ীভাবে নির্মাণ করেন। তিনি সর্বপ্রথম কা'বা ঘর নির্মাণ করেন নাই, বরং পুনর্নির্মাণ করিয়াছেন, যাহা ১৪ : ৩৭ আয়াত হইতে পরিষ্কার বুঝা যায়। এই ঘরের সম্পূর্ণরূপে নূতন নির্মাণে হযরত ইসমাঈল (আ) পিতার সহযোগিতা করেন। কুরআন মজীদে তাহা এইভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে :
وَعَهِدْنَا إِلى إِبْرَاهِيمَ وَاسْمَعِيلَ أَنْ طَهْرًا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعُكَفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ . "এবং আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করিলাম যে, তোমরা দুইজনে আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ই'তিকাফকারী এবং রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ” (২: ১২৫)।
وَإِذْ يَرْفَعُ ابْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَاسْتَعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ . "যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা'বা ঘরের প্রাচীর তুলিতেছিল তখন তাহারা বলিয়াছিল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এই কাজ কবুল কর, নিশ্চয় তুমি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞাতা” (২ঃ ১২৭)।
তাফসীর ও ইতিহাসের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, হযরত ইসমাঈল (আ) কা'বা ঘর নির্মাণে প্রয়োজনীয় পাথর ও আনুষঙ্গিক দ্রব্যাদির যোগান দিতেন। কা'বা ঘর আগে নির্মিত হইয়াছে না কুরবানীর ঘটনা আগে ঘটিয়াছে তাহা নিশ্চিত করিয়া বলা যায় না। তবে কা'বা ঘর নির্মাণকালেও ইসমাঈল (আ) যে তরুণ যুবক ছিলেন তাহার ইঙ্গিত পাওয়া যায় কা'বা ঘর নির্মাণে তাঁহার সহযোগী ভূমিকা হইতে। ইবন সা'দ লিখিয়াছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আ) এক শত বৎসর বয়সে কা'বা ঘর নির্মাণের নির্দেশ প্রাপ্ত হন এবং তখন ইসমাঈল (আ)-এর বয়স ত্রিশ বৎসর হইয়াছিল (আত-তাবাকাতুল-কুবরা, ১খ, পৃ. ৫২)। তবে কা'বা শরীফ নির্মাণকালে ইবরাহীম (আ.)-এর বয়স সংক্রান্ত এই বর্ণনাটি সন্দেহমুক্ত নহে। কা'বা ঘর নির্মাণ সংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ হযরত ইবরাহীম (আ) শীর্ষক নিবন্ধে দ্র.।
আল্লাহ তা'আলা ডাক দিলেন: "হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্য প্রমাণিত করিয়া দেখাইলে”।
ইমাম সুদ্দী (র) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা পিতার ছুরি ও পুত্রের কণ্ঠনালীর মাঝখানে একটি তাম্রপাত রাখিয়া দিয়াছিলেন। ফলে ছুরি কণ্ঠনালী স্পর্শ করিতে পারে নাই (আরাইস, পৃ. ১০০)। মহান আল্লাহ বলেন: "আমি এইভাবেই সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করিয়া থাকি"। হে ইবরাহীম! এই তোমার পুত্রের পরিবর্তে তোমার যবেহ করার প্রাণী। ইহাকে তুমি যবেহ কর। ইবরাহীম (আ) দৃষ্টি ফিরাইয়া একটি হৃষ্টপুষ্ট দুম্বাসহ হযরত জিবরাঈল (আ)-কে উপস্থিত দেখিতে পান। ইন্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, ইহা ছিল জান্নাতের একটি দুম্বা যাহা চল্লিশ বৎসর ধরিয়া জান্নাতে বিচরণ করিয়াছে। অপর বর্ণনায় আছে, ইবন আব্বাস (রা) বলেন যে, ইবরাহীম (আ) যে দুম্বা যবেহ করেন তাহা ছিল আদম (আ)-এর পুত্র হাবীল কর্তৃক কুরবানীকৃত দুম্বা, যাহা আল্লাহ কবুল করিয়াছিলেন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ১৫৮; তাফসীরে রুহুল মাআনী, ২৩ খ, পৃ. ১৩২)।
ইবরাহীম (আ) পুত্রকে ছাড়িয়া দিলেন এবং দুম্বাটি মিনার কুরবানীর স্থানে যবেহ করিলেন (আরাইস, পৃ. ১০০; মাআরেফুল কোরআন, ৭খ, পৃ. ৪৪৯)। তখন হইতে কিয়ামতকাল পর্যন্ত তৌহীদবাদী মানবজাতির জন্য প্রতি বৎসর দশ যুলহিজ্জা পশু কুরবানী করার ঐতিহ্য চালু হইয়াছে। এইভাবে অবিস্মরণীয় করিয়া রাখা হইয়াছে পিতা-পুত্রের এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার দৃষ্টান্তকে। "নিশ্চয় ইহা ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাহাকে মুক্ত করিলাম এক কুরবানীর বিনিময়ে। আমি ইহা পরবর্তীদের জন্য স্মরণে রাখিয়াছি” (৩৭: ১০৬-৭)।
এখানে একটি প্রশ্ন জাগিতে পারে যে, হযরত ইবরাহীম (আ) তো পুত্রকে কুরবানী করার স্বপ্ন দেখিয়াছেন, অথচ তিনি তাহাকে কুরবানী করেন নাই। তাহা হইলে নবীর স্বপ্ন সত্য হইল কিভাবে? বস্তুত ইবরাহীম (আ) স্বপ্নে পুত্রকে যবেহ করিতে দেখিয়াছেন, যবেহ করিয়া তাহাকে শেষ করিয়া ফেলিয়াছেন তাহা দেখেন নাই। অতএব তিনি তাঁহার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করিয়াছেন অর্থাৎ স্বপ্নে যবেহ করিতে দেখিয়াছিলেন এবং বাস্তবেও তিনি ছুরি হাতে লইয়া পুত্রের গলায় তাহা সজোরে চালাইয়াছেন কিন্তু যেহেতু তিনি যবেহকর্ম সমাপ্ত করিয়াছেন এইরূপ স্বপ্ন দেখেন নাই, তাই বাস্তবেও যবেহ সমাপ্ত করিতে পারেন নাই। আল্লাহ তাঁহাকে যতদূর স্বপ্ন দেখাইয়াছেন, তিনি ততটাই বাস্তবায়িত করিয়াছেন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ১৫৫; তাফহীমুল কুরআন, ৩৭: ১০২ ও ১০৫ আয়াত সংশ্লিষ্ট ৫৮ ও ৬৩ নং টীকা)।
ইয়াহুদী-খৃস্টানগণ হযরত ইসমাঈল (আ)-এর প্রতি বিদ্বেষবশত এই কুরবানীর ঐতিহ্যকে ত্যাগ করিয়াছে। আরবদের মধ্যে ইহা চালু থাকিলেও কালক্রমে তাওহীদের বিশ্বাস হইতে তাহাদের বিচ্যুতির সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথাও বিকৃত হইয়া যায়। তাহারা আল্লাহ্ উদ্দেশ্যে কুরবানী করার পরিবর্তে তাহাদের মনগড়া দেব-দেবীর নামে পশু উৎসর্গ করিত। যেমন কুরআন মজীদে উক্ত হইয়াছে:
وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ . “এবং যাহা মূর্তিপূজার বেদীর উপর বলি দেওয়া হয় (তাহাও তোমাদের জন্য হারাম)" (৫ঃ৩)।

হযরত ইবরাহীম (আ) তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ)-কে সঙ্গে লইয়া আল্লাহ তা'আলার মহিমান্বিত ঘর কা'বা শরীফ স্থায়ীভাবে নির্মাণ করেন। তিনি সর্বপ্রথম কা'বা ঘর নির্মাণ করেন নাই, বরং পুনর্নির্মাণ করিয়াছেন, যাহা ১৪ : ৩৭ আয়াত হইতে পরিষ্কার বুঝা যায়। এই ঘরের সম্পূর্ণরূপে নূতন নির্মাণে হযরত ইসমাঈল (আ) পিতার সহযোগিতা করেন। কুরআন মজীদে তাহা এইভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে :
وَعَهِدْنَا إِلى إِبْرَاهِيمَ وَاسْمَعِيلَ أَنْ طَهْرًا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعُكَفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ . "এবং আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করিলাম যে, তোমরা দুইজনে আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ই'তিকাফকারী এবং রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ” (২: ১২৫)।
وَإِذْ يَرْفَعُ ابْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَاسْتَعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ . "যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা'বা ঘরের প্রাচীর তুলিতেছিল তখন তাহারা বলিয়াছিল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এই কাজ কবুল কর, নিশ্চয় তুমি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞাতা” (২ঃ ১২৭)।
তাফসীর ও ইতিহাসের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, হযরত ইসমাঈল (আ) কা'বা ঘর নির্মাণে প্রয়োজনীয় পাথর ও আনুষঙ্গিক দ্রব্যাদির যোগান দিতেন। কা'বা ঘর আগে নির্মিত হইয়াছে না কুরবানীর ঘটনা আগে ঘটিয়াছে তাহা নিশ্চিত করিয়া বলা যায় না। তবে কা'বা ঘর নির্মাণকালেও ইসমাঈল (আ) যে তরুণ যুবক ছিলেন তাহার ইঙ্গিত পাওয়া যায় কা'বা ঘর নির্মাণে তাঁহার সহযোগী ভূমিকা হইতে। ইবন সা'দ লিখিয়াছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আ) এক শত বৎসর বয়সে কা'বা ঘর নির্মাণের নির্দেশ প্রাপ্ত হন এবং তখন ইসমাঈল (আ)-এর বয়স ত্রিশ বৎসর হইয়াছিল (আত-তাবাকাতুল-কুবরা, ১খ, পৃ. ৫২)। তবে কা'বা শরীফ নির্মাণকালে ইবরাহীম (আ.)-এর বয়স সংক্রান্ত এই বর্ণনাটি সন্দেহমুক্ত নহে। কা'বা ঘর নির্মাণ সংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ হযরত ইবরাহীম (আ) শীর্ষক নিবন্ধে দ্র.।
আল্লাহ তা'আলা ডাক দিলেন: "হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্য প্রমাণিত করিয়া দেখাইলে”।
ইমাম সুদ্দী (র) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা পিতার ছুরি ও পুত্রের কণ্ঠনালীর মাঝখানে একটি তাম্রপাত রাখিয়া দিয়াছিলেন। ফলে ছুরি কণ্ঠনালী স্পর্শ করিতে পারে নাই (আরাইস, পৃ. ১০০)। মহান আল্লাহ বলেন: "আমি এইভাবেই সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করিয়া থাকি"। হে ইবরাহীম! এই তোমার পুত্রের পরিবর্তে তোমার যবেহ করার প্রাণী। ইহাকে তুমি যবেহ কর। ইবরাহীম (আ) দৃষ্টি ফিরাইয়া একটি হৃষ্টপুষ্ট দুম্বাসহ হযরত জিবরাঈল (আ)-কে উপস্থিত দেখিতে পান। ইন্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, ইহা ছিল জান্নাতের একটি দুম্বা যাহা চল্লিশ বৎসর ধরিয়া জান্নাতে বিচরণ করিয়াছে। অপর বর্ণনায় আছে, ইবন আব্বাস (রা) বলেন যে, ইবরাহীম (আ) যে দুম্বা যবেহ করেন তাহা ছিল আদম (আ)-এর পুত্র হাবীল কর্তৃক কুরবানীকৃত দুম্বা, যাহা আল্লাহ কবুল করিয়াছিলেন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ১৫৮; তাফসীরে রুহুল মাআনী, ২৩ খ, পৃ. ১৩২)।
ইবরাহীম (আ) পুত্রকে ছাড়িয়া দিলেন এবং দুম্বাটি মিনার কুরবানীর স্থানে যবেহ করিলেন (আরাইস, পৃ. ১০০; মাআরেফুল কোরআন, ৭খ, পৃ. ৪৪৯)। তখন হইতে কিয়ামতকাল পর্যন্ত তৌহীদবাদী মানবজাতির জন্য প্রতি বৎসর দশ যুলহিজ্জা পশু কুরবানী করার ঐতিহ্য চালু হইয়াছে। এইভাবে অবিস্মরণীয় করিয়া রাখা হইয়াছে পিতা-পুত্রের এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার দৃষ্টান্তকে। "নিশ্চয় ইহা ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাহাকে মুক্ত করিলাম এক কুরবানীর বিনিময়ে। আমি ইহা পরবর্তীদের জন্য স্মরণে রাখিয়াছি” (৩৭: ১০৬-৭)।
এখানে একটি প্রশ্ন জাগিতে পারে যে, হযরত ইবরাহীম (আ) তো পুত্রকে কুরবানী করার স্বপ্ন দেখিয়াছেন, অথচ তিনি তাহাকে কুরবানী করেন নাই। তাহা হইলে নবীর স্বপ্ন সত্য হইল কিভাবে? বস্তুত ইবরাহীম (আ) স্বপ্নে পুত্রকে যবেহ করিতে দেখিয়াছেন, যবেহ করিয়া তাহাকে শেষ করিয়া ফেলিয়াছেন তাহা দেখেন নাই। অতএব তিনি তাঁহার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করিয়াছেন অর্থাৎ স্বপ্নে যবেহ করিতে দেখিয়াছিলেন এবং বাস্তবেও তিনি ছুরি হাতে লইয়া পুত্রের গলায় তাহা সজোরে চালাইয়াছেন কিন্তু যেহেতু তিনি যবেহকর্ম সমাপ্ত করিয়াছেন এইরূপ স্বপ্ন দেখেন নাই, তাই বাস্তবেও যবেহ সমাপ্ত করিতে পারেন নাই। আল্লাহ তাঁহাকে যতদূর স্বপ্ন দেখাইয়াছেন, তিনি ততটাই বাস্তবায়িত করিয়াছেন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ১৫৫; তাফহীমুল কুরআন, ৩৭: ১০২ ও ১০৫ আয়াত সংশ্লিষ্ট ৫৮ ও ৬৩ নং টীকা)।
ইয়াহুদী-খৃস্টানগণ হযরত ইসমাঈল (আ)-এর প্রতি বিদ্বেষবশত এই কুরবানীর ঐতিহ্যকে ত্যাগ করিয়াছে। আরবদের মধ্যে ইহা চালু থাকিলেও কালক্রমে তাওহীদের বিশ্বাস হইতে তাহাদের বিচ্যুতির সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথাও বিকৃত হইয়া যায়। তাহারা আল্লাহ্ উদ্দেশ্যে কুরবানী করার পরিবর্তে তাহাদের মনগড়া দেব-দেবীর নামে পশু উৎসর্গ করিত। যেমন কুরআন মজীদে উক্ত হইয়াছে:
وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ . “এবং যাহা মূর্তিপূজার বেদীর উপর বলি দেওয়া হয় (তাহাও তোমাদের জন্য হারাম)" (৫ঃ৩)।

হাদীছ ও ইতিহাস গ্রন্থসমূহ হইতে জানা যায় যে, হযরত ইবরাহীম (আ)-এর উপর দশখানা সহীফা নাযিল হইয়াছিল। আবার ইদরীস আল-খাওলানী আবূ যার (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তা'আলা কতখানি কিতাব নাযিল করিয়াছেন? তিনি বলিলেন, এক শত সহীফা আর চারখানি কিতাব। আল্লাহ তা'আলা আদম (আ)-এর উপর দশখানি, শীছ (আ)-এর উপর পঞ্চাশখানা, খানুখ বা ইদরীস (আ)-এর উপর ত্রিশখানা এবং ইবরাহীম (আ)-এর উপর দশখানা সহীফা নাযিল করেন। ইহা ছাড়া তিনি তাওরাত, যাবুর, ইনজীল ও ফুরকান নাযিল করেন। আবূ যারর্ (রা) বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইবরাহীম (আ)-এর সহীফায় কি ছিল? তিনি বলিলেন সবই উপদেশমূলক নীতিকথা (مثال)। উদাহরণস্বরূপ উদ্ধৃত করা যায়:
"হে স্বেচ্ছাচারী, অহংকারী বাদশাহ! আমি তোমাকে এইজন্য প্রেরণ করি নাই যে, তুমি একটার পর একটা দুনিয়ার সম্পদ জমা করিবে, বরং এইজন্য প্রেরণ করিয়াছি যে, তুমি আমা হইতে মজলুমের বদদোআ ফিরাইয়া রাখিবে। কারণ আমি তাহা ফেরৎ দেই না, যদিও তাহা কোন কাফিরের পক্ষ হইতেও আসে। উহাতে আরও উপদেশ বাক্য ছিল যে, বুদ্ধিমান যতক্ষণ পর্যন্ত বুদ্ধিহারা না হয়, তাহার উচিৎ সময়কে চার ভাগে ভাগ করা: এক ভাগে সে আল্লাহকে ডাকিবে এবং তাঁহার সহিত গোপনে কথোপকথন করিবে; এক ভাগে আল্লাহ্র সৃষ্টি-নিচয় লইয়া চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করিবে; এক ভাগে নিজের কৃতকর্মসমূহের হিসাব লইবে এবং একভাগ নিজের প্রয়োজন যথা হালাল জীবিকা জোগাড় করার জন্য রাখিবে। বুদ্ধিমানের উচিৎ সে যেন তিনটি কাজ ছাড়া আর কিছুর জন্য প্রচেষ্টা না চালায়: (১) পরকালের জন্য পাথেয় সঞ্চয় করা; (২) নিজের জীবনযাত্রার ব্যবস্থা করা এবং (৩) হারাম নহে এমন বস্তুর স্বাদ আস্বাদন করা। জ্ঞানীর উচিৎ তাহার সময়কাল সম্পর্কে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া; নিজের অবস্থা অনুযায়ী অগ্রগামী হওয়া এবং নিজের জিহ্বাকে হেফাজত করা। যে জানে যে, তাহার কথা তাহার কাজ হইতে নিকৃষ্ট প্রয়োজনীয় কথাবার্তা ছাড়া অনর্থক ও অবান্তর কথাবার্তা তাহার কম হইবে (আত্-তাবারী, তারীখ, ১খ, ১৬১; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ১০৬-১০৭)।
তাঁহার সাহীফার আরও উপদেশ হইল: শান্তি বর্ষিত হউক সেই ব্যক্তির উপর যে মেহমানের সম্মান করে। যে তাহাকে অপদস্থ করে সে জাহান্নামের সর্বশেষ স্তরে থাকিবে। আবূ যার (রা) বলেন, এইজন্যই ইবরাহীম (আ) মেহমান ছাড়া আহার করিতেন না (ইবনুল-জাওযী, তারীখুল-মুনতাজাম, ১খ, ২৭২-২৭৩)।
জান্নাতে তাঁহার প্রাসাদ: হাফিজ আবূ বাকর আল-বায্যার আবূ হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, জান্নাতে একটি প্রাসাদ আছে, আমার মনে হয় তিনি বলিয়াছিলেন, উহা মুক্তার তৈরী, যাহাতে কোন ফাটল কিংবা ভাঙ্গন নাই। আল্লাহ উহা তাঁহার বন্ধু ইবরাহীম (আ)-কে আপ্যায়িত করার জন্য তৈরি করিয়াছেন (ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১৭২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 একটি অযৌক্তিক আপত্তি ও উহার জবাব

📄 একটি অযৌক্তিক আপত্তি ও উহার জবাব


লাইডেন হইতে প্রকাশিত ইংরাজী ইসলামী বিশ্বকোষের প্রথম সংস্করণে ইবরাহীম (আ) সম্বন্ধে কতগুলি অযৌক্তিক ও বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য উপস্থাপন করা হইয়াছে। উহাতে বলা হইয়াছে যে, কুরআন কারীমে একটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ইবরাহীম (আ)-কে কা'বাঃ গৃহের নির্মাতা এবং দীন-ই হানীফ-এর প্রবর্তক হিসাবে তুলিয়া ধরা হয় নাই। অবশ্য দীর্ঘকাল পর তাঁহাকে এই সকল বিশেষণে বিশেষিত বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। মাক্কী সূরাগুলির কোথাও ইবরাহীম (আ)-এর সহিত ইসমাঈল (আ)-এর সম্পর্ক দৃষ্টিগোচর হয় না এবং তাঁহাকে প্রথম মুসলমান বলিয়াও কোথাও উল্লেখ করা হয় নাই; বরং তাঁহাকে কেবল একজন নবী ও পয়গাম্বর হিসাবে দেখা যায়। সেখানে তাঁহাকে কা'বাঃ গৃহের প্রতিষ্ঠাতা, ইসমাঈলের পিতা, 'আরব-এর পয়গাম্বর ও পথপ্রদর্শক এবং দীন-ই হানীফ-এর প্রচারক বলিয়া উল্লেখ করা হয় নাই। অবশ্য মুহাম্মাদ (স)-এর মাদানী যিন্দেগী শুরু হইলে তখন মাদানী সূরায় হযরত ইবরাহীম (আ)-এর উল্লেখকালে সঙ্গে সঙ্গে উক্ত বৈশিষ্ট্যাবলীর উল্লেখও করিতে দেখা যায়। প্রশ্নকারিগণ ইহার কারণ হিসাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, মাক্কী যিন্দিগীতে তিনি (রাসূলুল্লাহ স.) সকল বিষয়েই ইয়াহূদীদের উপর নির্ভর করিতেন এবং তাহাদের রীতিনীতি পছন্দ করিতেন। তাই ইবরাহীম (আ)-কেও সেই দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখিতেন ইয়াহ্দীগণ যে দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখিত। কিন্তু মদীনায় যখন ইয়াহ্দীগণ ইসলামের দা'ওয়াত গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিল তখন তিনি ইয়াহুদীদের ইযাহুদীবাদ হইতে পৃথক ইবরাহীমী দা'ওয়াতের ভিত্তি স্থাপন করিলেন এবং ইবরাহীম (আ)-কে দীনে হানীফ-এর প্রচারক, আরবের পয়গাম্বর, ইসমাঈল (আ)-এর পিতা এবং কা'বা গৃহের ভিত্তি স্থাপনকারী হিসাবে পেশ করিলেন। এই প্রশ্ন এবং এই সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্র. মুহাম্মাদ হিফজুর রাহমান সিউহারবী, কাসাসুল-কুরআন, দিল্লী। ১খ, ১৪০-১৫১)।
মুসলিম-অমুসলিম কোন ঐতিহাসিক এই কথা বলেন নাই যে, রাসূলুল্লাহ (স) ইসলামী দা'ওয়াত প্রচার-প্রসারের জন্য ইয়াহুদীদের সাহায্য লইয়াছেন; বরং তাঁহারা সকলেই ইহার বিপরীত বর্ণনা করিয়াছে যে, মক্কা ও মদীনা উভয় জায়গার ইয়াহূদীরই তাঁহার ঘোর বিরোধী ছিল এবং তাঁহার বিরুদ্ধে জনগণকে উস্কানী দিত। খোদ কুরআন কারীমে উল্লিখিত হইয়াছে, "তুমি ইয়াহুদী ও মুশরিকদিগকে মু'মিনদের প্রতি সর্বাধিক কট্টর দুশমনরূপে দেখিতে পাইবে এবং তাহাঁদিগকে তুমি মু'মিনদের সর্বাধিক নিকটতম বন্ধুরূপে দেখিতে পাইবে যাহারা নিজদিগকে খৃস্টান বলিয়া দাবি করে" (৫ঃ ৮২)।
জাহিলী যুগে আরবগণ ইয়াহুদীগণকে কোন মূল্যই দিত না; বরং তাহাদের সম্পর্কে এমনও বর্ণনা পাওয়া যায় যে, ইয়াহুদীদের প্রতিবেশী থাকাও তাহারা পছন্দ করিত না এবং যে সকল স্থান তাহারা নিজেদের হিজরতের জন্য মনোনীত করিয়াছিল সেইখান হইতে ইয়াহুদীগণকে তাহারা বিতাড়নের পক্ষপাতী ছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00