📄 বৈশিষ্ট্যাবলী
ইবরাহীম (আ) ছিলেন আল্লাহ্র খলীল। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيْلًا (٤:١٢٥)
"আল্লাহ ইবরাহীমকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেন" (৪: ১২৫)।
তিনিই প্রথম মেহমানদারী করেন, ছারীদ (রুটি ও গোশতের শুরুয়া মিশ্রিত খাদ্য) বানান এবং তাহা মিসকীনদিগকে খাওয়ান। মেহমানকে সাথে না লইয়া সকাল বা সন্ধ্যার তিনি আহার গ্রহণ করিতেন না। কখনো একজন মেহমান তালাশ করিতে দুই বা ততোধিক মাইল যাইতেন। কিয়ামত পর্যন্ত তাঁহার এই মেহমানদারী চালু থাকিবে। তিনিই প্রথম গোঁফ খাটো করেন, ক্ষৌরকর্ম করেন, নখ কর্তন করেন, মিসওয়াক করেন, চুলে সিঁথি করেন, কুলি করেন, নাকে পানি দেন এবং নাক ঝাড়িয়া সাফ করেন, পানি দ্বারা ইসতিনজা করেন (ইব্ন কুতায়বা, আল-মা'আরিফ, পৃ. ৩০)। তিনিই প্রথম খাতনা করেন। আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, ইবরাহীম (আ) ৮০ বছর বয়সে 'কাদূম' নামক স্থানে, মতান্তরে বাইস দ্বারা খাতনা করেন (বুখারী, আস-সাহীহ, ৪খ, ২৭৯, কিতাবুল-আম্বিয়া, হাদীস নং ৩১৪০)। অন্য এক বর্ণনামতে তাঁহার ৯৯ বৎসর বয়সকালে তিনি এই সুন্নাত পালন করেন। ইসমাঈল (আ)-এর বয়স ছিল তখন ১৩ বৎসর। তখন ইবরাহীম (আ), ইসমাঈল (আ) এবং ইবরাহীম (আ)-এর যত দাস ছিল সকলেই খাতনা করেন। বারনাবাসের বাইবেলে খতনার কারণস্বরূপ বলা হইয়াছে যে, আদম (আ) যখন স্বীয় প্রভুর নাফরমানী করেন তখন মানত করেন যে, আল্লাহ তওবা কবুল করিলে তিনি শরীরের কোন একটি অঙ্গ কাটিয়া ফেলিবেন। অতঃপর তাঁহার তওবা কবুল হইলে তিনি মানত পূর্ণ করিতে চাহিলেন। কিন্তু কিভাবে তাহা করিবেন সেই ব্যাপারে পেরেশান হইয়া গেলেন। তখন জিবরীল (আ) আসিয়া উক্ত স্থানটি নির্দেশ করিলেন। অতঃপর তিনি উহা কাটিয়া ফেলিলেন। সম্ভবত তাঁহার বংশধরগণ এই সুন্নাত ত্যাগ করিয়াছিল। তাই আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম (আ)-কে উক্ত সুন্নাত জীবিত করার নির্দেশ দেন (আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৯৪)।
মহানবী (সা) বলেনঃ اخْتَتَنَ إِبْرَاهِيمُ النَّبِيُّ عَلَيْهِ السَّلَامُ وَهُوَ ابْنُ ثَمَانِينَ سَنَةً بِالْقَدُوْمِ.
"নবী ইবরাহীম (আ) আশি বৎসর বয়সে বাইস দ্বারা (মতান্তরে কাদূম নামক স্থানে) নিজের খতনা করেন” (বুখারী, আম্বিয়া, বাব ১০, নং ৩১০৮, ৩খ, পৃ. ৩৫০; বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৫৬)।
মহানবী (সা) আরও বলেন: أَرْبَعُ مِنْ سُنَنِ الْمُرْسَلِينَ الْحَيَاءُ وَيُرْوَى الخِتَانُ وَالتَّعَطُرُ وَالسَّوَاكُ وَالنِّكَاحُ "চারটি বিষয় নবী-রাসূলগণের আদর্শ: লজ্জাশীলতা, অপর বর্ণনায় খতনা, সুগন্ধি ব্যবহার ও বিবাহ” (তিরমিযীর বরাতে মিশকাতুল মাসাবীহ, বাংলা অনু., ২খ, পৃ. ৯৯, নং ৩৫২, কিতাবুত তাহারাত, দ্বিতীয় ফাল; আরও দ্র. বুখারী, লিবাস, বাবঃ গোঁফ কাটা, নং ৫৪৬১ ও ৫৪৬৩, ৫খ, পৃ. ৪০৪-৫; মুসলিম, তাহারাত, বাব ১৬, নং ৪৮৮-৯, ২খ, পৃ. ৩০-১; আবু দাউদ, তারাজ্জল, বাব ফী আখযিশ শারিব; তিরমিযী, আদাব, বাব ১৪, নং ২৬৯৩; ইবন মাজা, তাহারাত, বাব ৮, নং ২৯২, ২৯৪; নাসাঈ, তাহারাত, বাব : ফিতরাত, তাকলীমুল আযফার, নাতফুল ইবিত; যীনাত, বাব : ফিতরাত)।
মুসলমানদের ন্যায় ইয়াহুদীরাও এই সুন্নাত পালন করে। কিন্তু খৃস্টানরা ইবরাহীম-ইসমাঈল-ইসহাক-ইয়াকূব (আ)-এর এই রীতিকে কিসের ভিত্তিতে বর্জন করিয়াছে তাহা অজ্ঞাত। অথচ বাইবেলে খতনা করাইবার প্রতি অত্যন্ত জোর দেওয়া হইয়াছে। আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম (আ)-কে বলেন: "তোমার সহিত ও তোমার ভাবী বংশের সহিত কৃত আমার যে নিয়ম তোমরা পালন করিবে তাহা এই যে, তোমাদের প্রত্যেক পুরুষের ত্বকছেদ হইবে। তোমরা আপন আপন লিঙ্গাগ্রচর্ম ছেদন করিবে, তাহাই তোমাদের সহিত আমার নিয়মের চিহ্ন হইবে। পুরুষানুক্রমে তোমাদের প্রত্যেক পুত্র সন্তানের আট দিন বয়সে ত্বকছেদ হইবে.... ত্বকছেদ অবশ্য কর্তব্য" (আদিপুস্তক, ১৭: ১০-১৪)।
বালক ইসমাঈল ও তাঁহার ভাষার পরিবর্তন
শৈশবকাল হইতে ইসমাঈল (আ) জুরহুম গোত্রের লোকদের নিকট আরবী ভাষা শিক্ষা করেন। এই প্রসঙ্গে মহানবী (সা) বলেন: أَوَّلُ مَا فُتِقَ لِسَانُهُ بِالعَرَبِيَّةِ المُبَيِّنَةِ اسْمَاعِيلُ وَهُوَ ابْنُ أَرْبَعَ عَشَرَ سَنَةً . "সর্বপ্রথম স্পষ্ট আরবী ভাষা ইসমাঈল (আ)-এর মুখে ফুটিয়া উঠে; তখন তিনি ছিলেন চৌদ্দ বৎসরের বালক" (শীরাযীর আলকাব গ্রন্থের বরাতে কানযুল উম্মাল, ১১ খ, পৃ. ৪৯০, নং ৩২৩০৯)।
الهم اسْمَاعِيلُ هَذَا النِّسَانَ الْعَرَبِيُّ الْهَامًا "ইসমাঈল (আ)-এর অন্তরে আরবী ভাষা শিক্ষার অনুপ্রেরণা সঞ্চারিত হইয়াছিল" (ঐ গ্রন্থ, ১১খ, নং ৩২৩১১; হাকেম ও ইবন হিব্বানের আস-সাহীহ গ্রন্থের বরাতে)।
বালক ইসমাঈল (আ) তীরন্দাজী, অশ্বারোহণ, শিকার ও কুস্তি শিক্ষা করেন। বংশবিশারদ ও জীবনীকারগণ বলেন যে, ইসমাঈল (আ)-ই সর্বপ্রথম ঘোড়াকে পোষ মানাইয়া উহাকে বাহন হিসাবে কাজে লাগান। ইহার পূর্বে অশ্ব ছিল বন্য প্রাণী। মহানবী (সা) বলেন: اتَّخِذُوا الْخَيْلَ وَاعْتَبَقُوهَا فَإِنَّهَا مِيْرَاثُ أَبِيْكُمْ إِسْمَاعِيلَ . "তোমরা ঘোড়া পোষো এবং উহার প্রতি যত্নবান হও। কেননা উহা তোমাদের পূর্বপুরুষ ইসমাঈল (আ)-এর পরিত্যক্ত সম্পদ" (সাঈদ ইব্ন ইয়াহ্ইয়া আল-উমাবীর আল-মাগাযী গ্রন্থের বরাতে বিদায়া, ২খ. পৃ. ১৯২)।
ইসমাঈল (আ) যৌবনে একজন পারদর্শী তীরন্দায ছিলেন, বাইবেল এবং মহানবী (সা)-এর হাদীছে যাহার স্বীকৃতি বিদ্যমান। তিনি শিকারকার্য করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিতেন (বরাতের জন্য দ্র. ইতিপূর্বে উদ্ধৃত দীর্ঘ হাদীছ)।
কুরআন মজীদে হযরত ইসমাঈল (আ)
কুরআন মজীদের মোট নয়টি সূরায় হযরত ইসমাইল (আ) সম্পর্কে উল্লেখ আছে। তন্মধ্যে বারো স্থানে তাঁহার নামোল্লেখসহ আলোচনা রহিয়াছে। (২ঃ ১২৫, ১২৭, ১৩৩, ১৩৬, ১৪০; ৩ঃ ৮৪; ৪: ১৬৩; ৬:৮৬; ১৪ : ৩৯; ১৯: ৫৪; ২১:৮৫ ও ৩৮:৪৮)। ২ঃ ১২৪-১৪১ আয়াতে পিতা-পুত্রের কা'বা ঘর নির্মাণ, তৎসংক্রান্ত দু'আ এবং ইবরাহীম পরিবারের তৌহীদী আদর্শের আলোচনা, ১৪: ৩৯-৪১ আয়াতে মাতা-পুত্রকে মক্কায় স্থানান্তর ও ইবরাহীম (আ)-এর আবেগাপ্লুত দু'আ এবং ৩৭: ১০০-১১৩ আয়াতে কুরবানী সংক্রান্ত ঘটনা আলোচিত হইয়াছে। অবশিষ্ট সূরাসমূহে তাঁহার সম্পর্কে খুবই সংক্ষিপ্ত উল্লেখ আছে।
যমযম কূপের পূর্বকথা
ইব্ন আব্বাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত দীর্ঘ হাদীছে বলা হইয়াছে যে, ইবরাহীম (আ) স্ত্রী ও পুত্রের জন্য যে যৎসামান্য পানি রাখিয়া গিয়াছিলেন তাহা ফুরাইয়া যাওয়ার পর হযরত হাজার (রা) পানি সংগ্রহের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও তাহার কোন ব্যবস্থা করিতে না পারিয়া নিরাশ হইয়া পড়িলেন। তিনি সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে ছুটাছুটির সময়ে মারওয়া পাহাড়ে উঠার পর একটি অদৃশ্য আহবান শুনিতে পান এবং বর্তমানে যেখানে যমযম কূপ অবস্থিত সেখানে একজন ফেরেশতাকে দেখিতে পান। ফেরেশতার পদাঘাতে বা ডানার আঘাতে মাটির অভ্যন্তর হইতে পানির উৎস নির্গত হইল। হযরত হাজার (রা) ইহার চারিপাশে আইল বাঁধিয়া উহাকে কূপের রূপ দান করিলেন (বুখারী, বাংলা অনু., ৩খ, পৃ. ৩৫৭-৮, নং ৩১১4)। এই কূপই "যমযম কূপ” নামে ইতিহাস খ্যাত। ইহাই যমযম কূপের আদি উৎস। যমযম শব্দের আভিধানিক অর্থ নির্ণয়ে মতভেদ আছে। ইবন হিশামের মতে আরবদের নিকট زمزمة শব্দের অর্থ প্রাচুর্য, সঞ্চিত হইয়া জমা হওয়া। যেহেতু সূচনা হইতেই ইহাতে পানির প্রাচুর্য লক্ষ্য করা গিয়াছে এবং ব্যবহারের ফলে পানি হ্রাস প্রাপ্ত না হইয়া সঙ্গে সঙ্গে পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছে, তাই ইহার এই নামকরণ। ভিন্ন মতে শব্দটির অর্থ গর্জন, নাদ, শব্দধ্বনি; হযরত হাজার (রা) অদৃশ্য শব্দধ্বনি শ্রবণ করিয়া কূপের সন্ধান লাভ করিয়াছিলেন। ভিন্নমতে যমযম শব্দ হইতে উক্ত নামকরণ হইয়াছে। শব্দটির অর্থ অবরুদ্ধ হওয়া, শক্ত করিয়া বাঁধা। হাজার (রা) কূপের চারিদিকে বাঁধ নির্মাণ করিয়া পানি অবরুদ্ধ করিয়াছেন। বাঁধ দিয়া আটক করা না হইলে কূপের পানি মাটির উপর দিয়া গড়াইয়া যাইত। ইব্ন আব্বাস (রা)-এর এই মত। হারাবীর মতে زَمْزَمَةُ الْمَاءِ শব্দের অর্থ 'পানির শব্দ' এবং এজন্য কূপটির উক্ত নামকরণ। ইয়া'কূব আল-হামাবী লিখিয়াছেন যে, পানির প্রাচুর্যের কারণেই কূপটির 'যমযম' নামকরণ করা হইয়াছে। মুহাম্মাদ ইব্ন ইসহাক আল-ফাকিহী তাঁহার "আখবার মাক্কাতা ফী কাদীমি'দ-দাহহি ওয়া হাদীছিহি” গ্রন্থে যমযম কূপের চৌত্রিশটি অর্থবোধক নাম উল্লেখ করিয়াছেন (মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৫৮-৬১; তারীখু'ল-কাবীম, ৩খ, পৃ. ৯৫; মু'জামুল-বুলদান, ৩খ, পৃ. ১৪৭-৮)।
যেহেতু কা'বা শরীফ হযরত আদম (আ)-এর যুগ হইতেই বর্তমান স্থানে বিদ্যমান ছিল, হয়ত কালের প্রবাহে কখনও কখনও গৃহকাঠামো অবলুপ্ত হইয়াছে, তাই নিশ্চয়ই তখন হইতেই এখানে পানির ব্যবস্থাও বিদ্যমান থাকার কথা। আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত হওয়ার উদ্দেশে পানি হইল পবিত্রতা অর্জনের অন্যতম উপাদান। তাই এই মহাসম্মানিত গৃহের সংলগ্ন পানি ব্যবস্থাও নিশ্চয়ই ছিল।
সকল ঐতিহাসিকের জন্য ইব্ন আব্বাস (রা)-র হাদীছই যমযমের আদি ইতিহাসের উৎস। আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ)-এর দু'আ (২: ১২৬-২৯ এবং ১৪: ৩৫-৮) এবং স্বামী-স্ত্রী ও পুত্রের আল্লাহ্ জন্য নিবেদিতপ্রাণ হওয়ার উসীলায় এমন বরকত দান করিলেন যে, এই যমযম কূপকে কেন্দ্র করিয়া স্বল্প কালের মধ্যে মক্কার বিজন প্রান্তর মানুষের কোলাহলে মুখরিত হইয়া উঠিল। প্রাথমিক পর্যায়ে আরবের একটি আদি গোত্র 'জুরহুম' হযরত হাজার (রা)-এর অনুমতিপ্রাপ্ত হইয়া এখানে বসতি স্থাপন করে এবং হযরত ইসমাঈল (আ) যৌবনে পদার্পণ করিয়া এই গোত্রে বিবাহ করেন।
হাদীছ শরীফে যমযম কূপ সম্পর্কে বহু স্থানে আলোচনা বিদ্যমান থাকিলেও কুরআন মজীদে এই কূপ সম্পর্কে সরাসরি কোন বক্তব্য নাই। হজ্জ সংক্রান্ত আলোচনায় পরোক্ষভাবে ইহার উল্লেখ আছেঃ لِيَشْهَدُوا مَنَافِعَ لَهُمْ “যাহাতে তাহারা তাহাদের কল্যাণময় স্থানসমূহে উপস্থিত হইতে পারে” (২২: ২৮)অতএব যমযম কূপ কা'বার চত্বরে অবস্থিত হওয়ায় ইহা একটি কল্যাণময়, মর্যাদাপূর্ণ ও বরকতময় স্থান এবং ইহার পানি মানুষের জন্য বরকতপূর্ণ। দুগ্ধপোষ্য নবীর জীবন তো এই পানি দ্বারা সঞ্জীবিত হইয়াছিল। অর্থাৎ একজন মহান নবীই সর্বপ্রথম এই কূপের পানি পান করিয়াছিলেন। তাঁহারই উত্তর পুরুষ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)-কে মি'রাজ উপলক্ষে ঊর্ধ্বজগতে আরোহণ করানোর প্রস্তুতিকালে তাঁহার হৃদয় মুবারক যমযমের পানি দ্বারাই ধৌত করা হয়। এই সম্পর্কে মহানবী (সা) বলেন: "আমি মক্কায় অবস্থানকালে একদিন রাত্রিবেলা আমার গৃহের ছাদ খুলিয়া গেল এবং জিবরাঈল (আ) অবতরণ করিয়া আমার বক্ষ বিদারণ করেন এবং যমযমের পানি দ্বারা তাহা ধৌত করেন, অতঃপর একখানা স্বর্ণের থালায় ঈমান ও হিকমত পরিপূর্ণ করিয়া আনিয়া আমার বক্ষমধ্যে ঢালিয়া দিয়া তাহা জোড়া লাগাইয়া দেন ......" (বুখারী, কিতাবুল হজ্জ, বাব ৭৫: যমযম সম্পর্কে যাহা কিছু উল্লিখিত ইহয়াছে, ২খ, পৃ. ১১৪)।
হাফিজ যয়নুদ্দীন ইরাকী বলেন, যমযমের পানি দ্বারা তাঁহার বক্ষ ধৌত করার উদ্দেশ্য যাহাতে তিনি বেহেশত-দোযখসহ ঊর্ধ্ব জগত অবলোকন করিবার শক্তি অর্জন করিতে পারেন। কারণ যমযমের পানি দ্বারা অন্তরাত্মা শক্তিশালী হয় এবং ভয়ভীতি দূর হয়। বালক বয়সের বক্ষ বিদারণ কালেও যমযমের পানি দ্বারা তাঁহার বক্ষ ধৌত করার কথা উল্লিখিত হইয়াছে (আযরাকীর আখবার মাক্কা গ্রন্থের বরাতে মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৬৫)। ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে যমযমের পানি পান করাইয়াছি। তিনি দাঁড়ানো অবস্থায় তাহা পান করেন" (বুখারী, পৃ. স্থা, নং ১৫২৭; তিরমিযী, আশরিবা, বাব ১২, নং ১৮৩০, ৩খ, পৃ. ৩৫৪-৫; মুসলিম, আশরিবা, বাব ২০৮, নং ৫১০৮-১১, ৭খ, পৃ. ৪৭; নাসাঈ, মানাসিক, বাব : আশ-শুরবি যামযাম কাইমান)।
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ مَاءُ زَمْرَمَ لِمَا شُرِبَ لَهُ. জাবির ইব্ন আবদিল্লাহ (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলিতে শুনিয়াছি: "যমযমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হইবে তাহা পূর্ণ হইবে" (ইবন মাজা, মানাসিক, বাব ৭৮, নং ৩০৬২, ২খ, পৃ. ১০১৮; আও দ্র. মুসতাদরাক হাকেম)। ইব্ন আব্বাস (রা)-এর নিকট এক ব্যক্তি আসিয়া উপস্থিত হইলে তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কোথা হইতে আগমন করিয়াছ? সে বলিল, যমযম হইতে। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহার পানি যেইভাবে পান করিতে হয় সেইভাবে তুমি কি তাহা পান করিয়াছ? আগন্তুক বলিল, তাহা কিভাবে? তিনি বলিলেন, তুমি ইহার পানি পান করার সময় কিবলামুখী হইবে, বিসমিল্লাহ বলিবে, তিন নিঃশ্বাসে পান করিবে, উদর পূর্তি করিয়া পান করিবে এবং পানশেষে আলহামদু লিল্লাহ বলিবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা) বলিয়াছেন :
إِنَّ أَيَةَ مَا بَيْنَنَا وَبَيْنَ الْمُنَافِقِينَ أَنَّهُمْ لَا يَتَضَلَّعُونَ مِنْ زَمْزَمَ.
"আমাদের ও মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য এই যে, তাহারা উদর পূর্তি করিয়া যমযমের পানি পান করে না" (ইবন মাজা, মানাসিক, বাব ৭৮, নং ৩০৬১)।
আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলিয়াছেন :
خَيْرُ مَاء عَلَى وَجْهِ الْأَرْضِ مَاءُ زَمْزَمَ .
"পৃথিবীর বুকে সর্বোত্তম পানি হইল যমযমের পানি" (সহীহ ইব্ন্ন হিব্বানের বরাতে মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৬৫)।
ইব্ন আব্বাস (রা) মহানবী (সা)-এর বাণী হিসাবে বলেন, যমযমের পানি যে উদ্দেশে পান করা হইবে তাহা পূর্ণ হইবে। তুমি উহার পানি রোগমুক্তির জন্য পান করিলে আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দান করিবেন এবং পিপাসা নিবারণের জন্য পান করিলে আল্লাহ তোমার পিপাসা মিটাইবেন। ইহা জিবরীল (আ)-এর পদাঘাতে ইসমাঈল (আ)-এর পানীয় হিসাবে সৃষ্টি হইয়াছে (আযরাকীর আখবার মাক্কা গ্রন্থের বরাতে মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৬৩; একই কথা মুজাহিদ (র)-এর নিজস্ব বক্তব্য হিসাবেও উদ্ধৃত হইয়াছে। তবে তাহাতে আরও আছে : তুমি উহা ক্ষুন্নিবৃত্তির উদ্দেশে পান করিলে আল্লাহ তোমার ক্ষুন্নিবৃত্তি করিবেন, পৃ. ৬২; তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৬৭)। আষরাকীর গ্রন্থে আরও আছে যে, মহানবী (সা) সুহায়ল ইব্ন আমর (রা)-কে যমযমের পানি উপহারস্বরূপ পাঠাইয়াছিলেন (মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৬২; তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৬৮)। ইব্ন আব্বাস (রা) বলিলেন, তোমরা পুণ্যবান লোকদের সালাতের স্থানে সালাত আদায় কর এবং দীনদার লোকদের পানীয় পান কর। তাঁহাকে পূন্যবানদের সালাতের স্থান এবং দীনদারগণের পানীয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি বলেন, পুণ্যবানদের সালাতের স্থান হইল মীযাবের নিচে এবং দীনদারগণের পানীয় হইল যমযমের পানি (আযরাকীর বরাতে মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৬৪; তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৬৮-৯; উভয় গ্রন্থে আখবার মাক্কা গ্রন্থের বরাতে)।
স্বেচ্ছায় দারিদ্র্য বরণকারী প্রবীণ সাহাবী হযরত আবূ যার আল-গিফারী (রা) মহানবী (সা)-এর নবুওয়াত লাভের সংবাদ জানিতে পারিয়া তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিতে মক্কায় আগমন করেন। তিনি তাঁহার সহিত সাক্ষাতের ইচ্ছা প্রকাশ করিলে মক্কার কুরায়শ মুশরিকরা তাঁহাকে প্রস্তর নিক্ষেপে জর্জরিত করিয়া বেহুঁশ করিয়া ফেলে এবং তাঁহার সমস্ত শরীর রক্তাক্ত হইয়া যায়। হুঁশ ফিরিয়া পাইলে তিনি যমযমের নিকট গিয়া দেহের রক্ত ধুইয়া ফেলেন এবং যমযমের পানি পান করেন। তিনি মহানবী (সা)-এর সহিত সাক্ষাতের আশায় কা'বার চত্বরে তিরিশ দিন (বর্ণনান্তরে পনর দিন) অতিবাহিত করেন। এই সময় যমযমের পানি ব্যতীত তাঁহার অন্য কোন খাদ্য বা পানীয় ছিল না। তিনি উহা পান করিয়া সুস্বাস্থ্য লাভ করেন এবং এই দীর্ঘ সময়ে কখনও ক্ষুধা অনুভব করেন নাই। তাঁহার সহিত সাক্ষাত হইলে পর রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁহার এই কয়দিনের খাদ্য-পানীয়ের খবর লইলে তিনি বলেন যে, যmযমের পানি ছাড়া আর কিছুই তাহার উদরে প্রবেশ করান নাই এবং ইহাতেই তিনি সুস্বাস্থ্য লাভ করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন: এই পানি ক্ষুধার সময় খাদ্যের অভাব পূর্ণ করে (বুখারী, মানাকিবুল আনসার, বাব ইসলাম আবী যার, ১খ., পৃ. ৫৪৪-৫; ইসাবা, ৭খ, পৃ. ৬--৬২, নং ৩৮২। সহীদ মুসলিম কিতাবুল ফাদাইলু মিন ফাদাইল আবী যার (রা), ২খ, পৃ. ২৯৫-৬; বাংলা অনু. ৮খ, পৃ. ৫-৯)।
আব্বাস (রা) বলেন, জাহিলী যুগে লোকেরা একবার ভীষণ দুর্ভিক্ষের শিকার হইল। খাদ্য সংগ্রহ তাহাদের জন্য কষ্টসাধ্য হইয়া পড়িল। এই সময় তাহারা যমযমের পানি পান করিয়া এবং তাহাদের দুগ্ধপোষ্য শিশুদেরকেও পান করাইয়া নিশ্চিত মৃত্যুর করাল গ্রাস হইতে মুক্তি পায়। ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, এইজন্যই যমযম কূপের অপর নাম হয় 'শাব্বাআহ' (شباعة) ক্ষুধা নিবারণকারী; (তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৬৮)। যমযমের পানি দাঁড়ানো অবস্থায় পান করা সুন্নাত। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) দাঁড়ানো অবস্থায় ইহার পানি পান করেন। ইব্ন আব্বাস (রা) যমযমের পানি পানকালে নিম্নোক্ত দু'আ পড়িতেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَرِزْقًا وَأَسِعًا وَشِفَاءٌ مِّنْ كُلِّ دَاء. "হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট প্রার্থনা করি উপকারী বিদ্যার, পর্যাপ্ত রিযিকের এবং যাবতীয় রোগব্যাধি হইতে আরোগ্য লাভের" (মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৭৩)। পৃথিবীর সর্বত্রই এই বরকতময় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা রহিয়াছে।
হাকেম তিরমিযী (র) বলেন, যমযম কূপের পানি দ্বারা উপকার লাভ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির খাঁটি নিয়তের উপর নির্ভরশীল। খালেছ নিয়তে উহা পান করিলে উপকার লাভ অবশ্যম্ভাবী। আল্লামা মুনাবী আত-তায়সীর বিশারহি' আল-জামে' আস-সাগীর গ্রন্থে বলিয়াছেন যে, যমযমের উৎপত্তি হইয়াছিল হযরত ইবরাহীম (আ)-এর পুত্র ইসমাঈল (আ)-এর সাহায্যার্থে। আজও কেহ নিষ্ঠার সহিত এই পানি ব্যবহার করিলে সেও আল্লাহ্ সাহায্য প্রাপ্ত হইবে (আখবার মাক্কা গ্রন্থের বরাতে মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৬৬)।
কালের পরিক্রমায় মানুষ সত্য দীন হইতে বিচ্যুত হইয়া পথভ্রষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ্ কুদরতে সৃষ্ট এই বরকতময় কূপেরও বিলুপ্তি ঘটে। ইসমাঈল (আ)-এর বংশধরগণকে পরাভূত করিয়া জুরহুম গোত্র কা'বার কর্তৃত্ব দখল করিয়া নেওয়ার পর তাহারা ক্রমান্বয়ে পথভ্রষ্ট হইতে থাকে। তাহারা পবিত্র হারাম শরীফের অসম্মান করে, হারাম শরীফে প্রদত্ত উপহার-সামগ্রী প্রকাশ্যে ও সন্তর্পণে চুরি ও আত্মসাৎ করিতে থাকে। তাহাদের গোত্রের প্রবীণ ব্যক্তি আমর ইবন হারিছ ইব্ন মাদাদ তাহাদেরকে এইসব অপকর্ম হইতে বিরত থাকিবার উপদেশ দেন, কিন্তু তাহারা উহাতে কর্ণপাত করে নাই। তাই তিনি কা'বার ধনভাণ্ডারে রক্ষিত দুইটি স্বর্ণের হরিণের প্রতিকৃতি এবং স্বর্ণের তরবারি রাতের অন্ধকারে গোপনে কূপের মধ্যে দাফন করিয়া কূপটিকে ভরাট করিয়া ফেলেন (মুহাম্মদ তাহির আল-কুরদী, তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৫৬)। কোন কোন ঐতিহাসিক বলেন যে, মাদাদ ইব্ন আমর আল-জুরহুমী খুযাআ গোত্রের নিকট পরাজিত হইলে তিনি তাহাদেরকে পানি হইতে বঞ্চিত করার উদ্দেশে নিজের মূল্যবান দ্রব্যাদি ও স্বর্ণ দ্বারা কূপটিকে ভরাট করিয়া ফেলেন, অতঃপর মরুভূমির ধুলা-বালিতে কূপের চিহ্নও বিলুপ্ত হইয়া যায়। ইয়াকৃত আল-হামাবী বলিয়াছেন যে, বৃষ্টিপাতের অভাবে কূপটি শুষ্ক হইয়া যায় এবং অবশেষে ইহার কোন চিহ্নই অবশিষ্ট থাকে নাই (মু'জামুল বুলদান, ৩খ, পৃ. ১৪৯)। কোন কোন ঐতিহাসিক বলিয়াছেন যে, বৃষ্টিপাতের অভাবের কারণে নয়, জুরহুম গোত্রের অবাধ্যাচারের কারণে কূপটি শুকাইয়া যায় এবং পরবর্তী কালে বন্যার কারণে ইহার শেষ চিহ্নও বিলুপ্ত হইয়া যায় (মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ২৩-২৪)।
জুরহুম গোত্রের পর কা'বাসহ মক্কার ক্ষমতা খুযাআ গোত্রের হস্তগত হওয়ার ইতিহাস কিছুটা জানা গেলেও মহানবী (সা)-এর দাদা আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক যমযম কূপের পুনরাবিষ্কারের পূর্বে পর্যন্ত উক্ত কূপের ইতিহাস সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। মক্কা শরীফে যেহেতু কোন নদীনালা ছিল না, তাই লোকেরা সম্ভবত বিকল্প কূপ খনন করিয়া নিজেদের পানির প্রয়োজন মিটাইত। কুরায়শ বংশের প্রতিষ্ঠাতা কুসায়্যি ইন্ন কিলাব চামড়ার মশকে করিয়া মক্কার বাহির হইতে পানি আনিয়া হাজ্জীদেরকে পান করাইতেন। পরে তিনি উম্মু হানী (রা)-র গৃহের স্থানে আজুল নামক কূপ খনন করিয়া পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। যমযম ছাড়া ইহাই মক্কার ভিতরের প্রথম কূপ (মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৪৬)। তখনও যমযম কূপ অনাবিষ্কৃত থাকে।
আবদুল মুত্তালিব একটি স্বপ্নের ভিত্তিতে যমযম কূপের সন্ধান লাভ করেন। তিনি হিজরে ইসমাঈলে (বর্তমান হাতীম) ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্নে তিনবার কূপ খননের নির্দেশ লাভ করেন। স্বপ্নে কেহ তাঁহাকে নির্দেশ প্রদান করেন যে, কা'বার সম্মুখে অবস্থিত, যুগল মূর্তি বরাবর পিঁপড়ার ঢিবিতে ময়লা ও রক্তের মাঝে কাকের ঠোঁকরে সৃষ্ট ছিদ্রের মধ্যে খননকার্য চালাইয়া যমযম কূপ আবিষ্কার করা যাইবে। অতএব তিনি মসজিদুল হারামে পৌঁছিয়া স্বপ্নের লক্ষণসমূহ অবলোকন করার অপেক্ষায় ছিলেন। এই সময় হারাম শরীফ এলাকার বাইরে একটি গরু যবেহ করা হইলে উহা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে অলৌকিকভাবে ছুটিয়া আসিয়া কা'বার চত্বরে পতিত হইয়া সেখানে মারা যায়। এক পর্যায়ে কাক আসিয়া পিঁপড়ার ঢিবি বরাবর খুঁড়িতে থাকে। আবদুল মুত্তালিব তাঁহার স্বপ্নের লক্ষণ বুঝিতে পারিয়া একমাত্র পুত্র হারিছকে লইয়া কূপ খনন শুরু করেন। কূপ খননের প্রাক্কালে তিনি যে বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হন তাহা অপসারিত করার জন্য আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করেন এবং বলেন যে, তিনি দশটি পুত্র সন্তান লাভ করিলে তাহাদের একজনকে আল্লাহর নামে কুরবানী করিবেন (ইবন হিশাম, ১খ, পৃ. ১৫৭)। আল্লাহ তাঁহার অভিযান সফল করেন এবং তিনি কূপের সন্ধান লাভ করেন। তিনি ইহাতে দাফনকৃত দুইটি সোনার হরিণের প্রতিকৃতি এবং স্বর্ণের তরবারি লাভ করেন এবং এইগুলিকে কা'বার ধনভাণ্ডারে জমা করেন (তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৬-৬২, মু'জামুল বুলদান, ৩খ, ১৪৯; তারীখ মাক্কা-এর বরাতে মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৪৮-৫১)। পরবর্তী কালে আবদুল মুত্তালিব দশজন পুত্র সন্তান লাভ করেন এবং পরিণত বয়সে তাহারা কুরায়শদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেন। তিনি তাঁহার মানত অনুযায়ী সন্তানদের মধ্যে লটারী করেন এবং ইহাতে তাঁহার সর্বাধিক প্রিয় ও সর্বকনিষ্ঠ সন্তান এবং মহানবী (স)-এর পিতা আবদুল্লাহর নাম উঠে। তিনি তাঁহাকে যবেহ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। অতঃপর তাঁহার ভ্রাতাগণের পরামর্শে তিনি একশত উষ্ট্র অথবা তাঁহার কনিষ্ঠ পুত্রের মধ্যে লটারী করেন। তৃতীয়বারে এক শত উষ্ট্রের নামে লটারী উঠে। অতএব তিনি পুত্রের পরিবর্তে এক শত উষ্ট্র যবেহ করেন (তা'রীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৬২)। এজন্য রাসূলুল্লাহ (সা)-এর একটি উপাধি হইল ইবনু'য-যাবীহায়ন (দুই যবেহকৃতের পুত্র)। পরবর্তীকালে নরহত্যার দিয়াতস্বরূপ এক শত উট প্রদান ইসলামী শরীআতে বিধিবদ্ধ হয় (ইবন হিশাম, ১খ, পৃ. ১৫৯-১৬১)। এখানে উল্লেখ্য যে, মহানবী (সা)-এর পিতা আবদুল্লাহ আবদুল মুত্তালিবের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন না, বরং তিনি তাঁহার মাতার সর্বকনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন। কারণ আবদুল্লাহ্র কনিষ্ঠ হামযা এবং হামযার কনিষ্ঠ ছিলেন আব্বাস (রা)। অর্থাৎ আব্বাস (রা)-ই ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান এবং মহানবী (স)-এর জন্মের সময় তাঁহার বয়স ছিল প্রায় তিন বৎসর (সীরাতে ইবন হিশামের ১নং টীকা, ১খ, পৃ. ১৫৯; আর-রাওদুল উনুফ-এর বরাতে; আর-রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ১৭৬)।
ইবরাহীম (আ) ছিলেন আল্লাহ্র খলীল। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيْلًا (٤:١٢٥)
"আল্লাহ ইবরাহীমকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেন" (৪: ১২৫)।
তিনিই প্রথম মেহমানদারী করেন, ছারীদ (রুটি ও গোশতের শুরুয়া মিশ্রিত খাদ্য) বানান এবং তাহা মিসকীনদিগকে খাওয়ান। মেহমানকে সাথে না লইয়া সকাল বা সন্ধ্যার তিনি আহার গ্রহণ করিতেন না। কখনো একজন মেহমান তালাশ করিতে দুই বা ততোধিক মাইল যাইতেন। কিয়ামত পর্যন্ত তাঁহার এই মেহমানদারী চালু থাকিবে। তিনিই প্রথম গোঁফ খাটো করেন, ক্ষৌরকর্ম করেন, নখ কর্তন করেন, মিসওয়াক করেন, চুলে সিঁথি করেন, কুলি করেন, নাকে পানি দেন এবং নাক ঝাড়িয়া সাফ করেন, পানি দ্বারা ইসতিনজা করেন (ইব্ন কুতায়বা, আল-মা'আরিফ, পৃ. ৩০)। তিনিই প্রথম খাতনা করেন। আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, ইবরাহীম (আ) ৮০ বছর বয়সে 'কাদূম' নামক স্থানে, মতান্তরে বাইস দ্বারা খাতনা করেন (বুখারী, আস-সাহীহ, ৪খ, ২৭৯, কিতাবুল-আম্বিয়া, হাদীস নং ৩১৪০)। অন্য এক বর্ণনামতে তাঁহার ৯৯ বৎসর বয়সকালে তিনি এই সুন্নাত পালন করেন। ইসমাঈল (আ)-এর বয়স ছিল তখন ১৩ বৎসর। তখন ইবরাহীম (আ), ইসমাঈল (আ) এবং ইবরাহীম (আ)-এর যত দাস ছিল সকলেই খাতনা করেন। বারনাবাসের বাইবেলে খতনার কারণস্বরূপ বলা হইয়াছে যে, আদম (আ) যখন স্বীয় প্রভুর নাফরমানী করেন তখন মানত করেন যে, আল্লাহ তওবা কবুল করিলে তিনি শরীরের কোন একটি অঙ্গ কাটিয়া ফেলিবেন। অতঃপর তাঁহার তওবা কবুল হইলে তিনি মানত পূর্ণ করিতে চাহিলেন। কিন্তু কিভাবে তাহা করিবেন সেই ব্যাপারে পেরেশান হইয়া গেলেন। তখন জিবরীল (আ) আসিয়া উক্ত স্থানটি নির্দেশ করিলেন। অতঃপর তিনি উহা কাটিয়া ফেলিলেন। সম্ভবত তাঁহার বংশধরগণ এই সুন্নাত ত্যাগ করিয়াছিল। তাই আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম (আ)-কে উক্ত সুন্নাত জীবিত করার নির্দেশ দেন (আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৯৪)।
মহানবী (সা) বলেনঃ اخْتَتَنَ إِبْرَاهِيمُ النَّبِيُّ عَلَيْهِ السَّلَامُ وَهُوَ ابْنُ ثَمَانِينَ سَنَةً بِالْقَدُوْمِ.
"নবী ইবরাহীম (আ) আশি বৎসর বয়সে বাইস দ্বারা (মতান্তরে কাদূম নামক স্থানে) নিজের খতনা করেন” (বুখারী, আম্বিয়া, বাব ১০, নং ৩১০৮, ৩খ, পৃ. ৩৫০; বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৫৬)।
মহানবী (সা) আরও বলেন: أَرْبَعُ مِنْ سُنَنِ الْمُرْسَلِينَ الْحَيَاءُ وَيُرْوَى الخِتَانُ وَالتَّعَطُرُ وَالسَّوَاكُ وَالنِّكَاحُ "চারটি বিষয় নবী-রাসূলগণের আদর্শ: লজ্জাশীলতা, অপর বর্ণনায় খতনা, সুগন্ধি ব্যবহার ও বিবাহ” (তিরমিযীর বরাতে মিশকাতুল মাসাবীহ, বাংলা অনু., ২খ, পৃ. ৯৯, নং ৩৫২, কিতাবুত তাহারাত, দ্বিতীয় ফাল; আরও দ্র. বুখারী, লিবাস, বাবঃ গোঁফ কাটা, নং ৫৪৬১ ও ৫৪৬৩, ৫খ, পৃ. ৪০৪-৫; মুসলিম, তাহারাত, বাব ১৬, নং ৪৮৮-৯, ২খ, পৃ. ৩০-১; আবু দাউদ, তারাজ্জল, বাব ফী আখযিশ শারিব; তিরমিযী, আদাব, বাব ১৪, নং ২৬৯৩; ইবন মাজা, তাহারাত, বাব ৮, নং ২৯২, ২৯৪; নাসাঈ, তাহারাত, বাব : ফিতরাত, তাকলীমুল আযফার, নাতফুল ইবিত; যীনাত, বাব : ফিতরাত)।
মুসলমানদের ন্যায় ইয়াহুদীরাও এই সুন্নাত পালন করে। কিন্তু খৃস্টানরা ইবরাহীম-ইসমাঈল-ইসহাক-ইয়াকূব (আ)-এর এই রীতিকে কিসের ভিত্তিতে বর্জন করিয়াছে তাহা অজ্ঞাত। অথচ বাইবেলে খতনা করাইবার প্রতি অত্যন্ত জোর দেওয়া হইয়াছে। আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম (আ)-কে বলেন: "তোমার সহিত ও তোমার ভাবী বংশের সহিত কৃত আমার যে নিয়ম তোমরা পালন করিবে তাহা এই যে, তোমাদের প্রত্যেক পুরুষের ত্বকছেদ হইবে। তোমরা আপন আপন লিঙ্গাগ্রচর্ম ছেদন করিবে, তাহাই তোমাদের সহিত আমার নিয়মের চিহ্ন হইবে। পুরুষানুক্রমে তোমাদের প্রত্যেক পুত্র সন্তানের আট দিন বয়সে ত্বকছেদ হইবে.... ত্বকছেদ অবশ্য কর্তব্য" (আদিপুস্তক, ১৭: ১০-১৪)।
বালক ইসমাঈল ও তাঁহার ভাষার পরিবর্তন
শৈশবকাল হইতে ইসমাঈল (আ) জুরহুম গোত্রের লোকদের নিকট আরবী ভাষা শিক্ষা করেন। এই প্রসঙ্গে মহানবী (সা) বলেন: أَوَّلُ مَا فُتِقَ لِسَانُهُ بِالعَرَبِيَّةِ المُبَيِّنَةِ اسْمَاعِيلُ وَهُوَ ابْنُ أَرْبَعَ عَشَرَ سَنَةً . "সর্বপ্রথম স্পষ্ট আরবী ভাষা ইসমাঈল (আ)-এর মুখে ফুটিয়া উঠে; তখন তিনি ছিলেন চৌদ্দ বৎসরের বালক" (শীরাযীর আলকাব গ্রন্থের বরাতে কানযুল উম্মাল, ১১ খ, পৃ. ৪৯০, নং ৩২৩০৯)।
الهم اسْمَاعِيلُ هَذَا النِّسَانَ الْعَرَبِيُّ الْهَامًا "ইসমাঈল (আ)-এর অন্তরে আরবী ভাষা শিক্ষার অনুপ্রেরণা সঞ্চারিত হইয়াছিল" (ঐ গ্রন্থ, ১১খ, নং ৩২৩১১; হাকেম ও ইবন হিব্বানের আস-সাহীহ গ্রন্থের বরাতে)।
বালক ইসমাঈল (আ) তীরন্দাজী, অশ্বারোহণ, শিকার ও কুস্তি শিক্ষা করেন। বংশবিশারদ ও জীবনীকারগণ বলেন যে, ইসমাঈল (আ)-ই সর্বপ্রথম ঘোড়াকে পোষ মানাইয়া উহাকে বাহন হিসাবে কাজে লাগান। ইহার পূর্বে অশ্ব ছিল বন্য প্রাণী। মহানবী (সা) বলেন: اتَّخِذُوا الْخَيْلَ وَاعْتَبَقُوهَا فَإِنَّهَا مِيْرَاثُ أَبِيْكُمْ إِسْمَاعِيلَ . "তোমরা ঘোড়া পোষো এবং উহার প্রতি যত্নবান হও। কেননা উহা তোমাদের পূর্বপুরুষ ইসমাঈল (আ)-এর পরিত্যক্ত সম্পদ" (সাঈদ ইব্ন ইয়াহ্ইয়া আল-উমাবীর আল-মাগাযী গ্রন্থের বরাতে বিদায়া, ২খ. পৃ. ১৯২)।
ইসমাঈল (আ) যৌবনে একজন পারদর্শী তীরন্দায ছিলেন, বাইবেল এবং মহানবী (সা)-এর হাদীছে যাহার স্বীকৃতি বিদ্যমান। তিনি শিকারকার্য করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিতেন (বরাতের জন্য দ্র. ইতিপূর্বে উদ্ধৃত দীর্ঘ হাদীছ)।
কুরআন মজীদে হযরত ইসমাঈল (আ)
কুরআন মজীদের মোট নয়টি সূরায় হযরত ইসমাইল (আ) সম্পর্কে উল্লেখ আছে। তন্মধ্যে বারো স্থানে তাঁহার নামোল্লেখসহ আলোচনা রহিয়াছে। (২ঃ ১২৫, ১২৭, ১৩৩, ১৩৬, ১৪০; ৩ঃ ৮৪; ৪: ১৬৩; ৬:৮৬; ১৪ : ৩৯; ১৯: ৫৪; ২১:৮৫ ও ৩৮:৪৮)। ২ঃ ১২৪-১৪১ আয়াতে পিতা-পুত্রের কা'বা ঘর নির্মাণ, তৎসংক্রান্ত দু'আ এবং ইবরাহীম পরিবারের তৌহীদী আদর্শের আলোচনা, ১৪: ৩৯-৪১ আয়াতে মাতা-পুত্রকে মক্কায় স্থানান্তর ও ইবরাহীম (আ)-এর আবেগাপ্লুত দু'আ এবং ৩৭: ১০০-১১৩ আয়াতে কুরবানী সংক্রান্ত ঘটনা আলোচিত হইয়াছে। অবশিষ্ট সূরাসমূহে তাঁহার সম্পর্কে খুবই সংক্ষিপ্ত উল্লেখ আছে।
যমযম কূপের পূর্বকথা
ইব্ন আব্বাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত দীর্ঘ হাদীছে বলা হইয়াছে যে, ইবরাহীম (আ) স্ত্রী ও পুত্রের জন্য যে যৎসামান্য পানি রাখিয়া গিয়াছিলেন তাহা ফুরাইয়া যাওয়ার পর হযরত হাজার (রা) পানি সংগ্রহের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও তাহার কোন ব্যবস্থা করিতে না পারিয়া নিরাশ হইয়া পড়িলেন। তিনি সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে ছুটাছুটির সময়ে মারওয়া পাহাড়ে উঠার পর একটি অদৃশ্য আহবান শুনিতে পান এবং বর্তমানে যেখানে যমযম কূপ অবস্থিত সেখানে একজন ফেরেশতাকে দেখিতে পান। ফেরেশতার পদাঘাতে বা ডানার আঘাতে মাটির অভ্যন্তর হইতে পানির উৎস নির্গত হইল। হযরত হাজার (রা) ইহার চারিপাশে আইল বাঁধিয়া উহাকে কূপের রূপ দান করিলেন (বুখারী, বাংলা অনু., ৩খ, পৃ. ৩৫৭-৮, নং ৩১১4)। এই কূপই "যমযম কূপ” নামে ইতিহাস খ্যাত। ইহাই যমযম কূপের আদি উৎস। যমযম শব্দের আভিধানিক অর্থ নির্ণয়ে মতভেদ আছে। ইবন হিশামের মতে আরবদের নিকট زمزمة শব্দের অর্থ প্রাচুর্য, সঞ্চিত হইয়া জমা হওয়া। যেহেতু সূচনা হইতেই ইহাতে পানির প্রাচুর্য লক্ষ্য করা গিয়াছে এবং ব্যবহারের ফলে পানি হ্রাস প্রাপ্ত না হইয়া সঙ্গে সঙ্গে পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছে, তাই ইহার এই নামকরণ। ভিন্ন মতে শব্দটির অর্থ গর্জন, নাদ, শব্দধ্বনি; হযরত হাজার (রা) অদৃশ্য শব্দধ্বনি শ্রবণ করিয়া কূপের সন্ধান লাভ করিয়াছিলেন। ভিন্নমতে যমযম শব্দ হইতে উক্ত নামকরণ হইয়াছে। শব্দটির অর্থ অবরুদ্ধ হওয়া, শক্ত করিয়া বাঁধা। হাজার (রা) কূপের চারিদিকে বাঁধ নির্মাণ করিয়া পানি অবরুদ্ধ করিয়াছেন। বাঁধ দিয়া আটক করা না হইলে কূপের পানি মাটির উপর দিয়া গড়াইয়া যাইত। ইব্ন আব্বাস (রা)-এর এই মত। হারাবীর মতে زَمْزَمَةُ الْمَاءِ শব্দের অর্থ 'পানির শব্দ' এবং এজন্য কূপটির উক্ত নামকরণ। ইয়া'কূব আল-হামাবী লিখিয়াছেন যে, পানির প্রাচুর্যের কারণেই কূপটির 'যমযম' নামকরণ করা হইয়াছে। মুহাম্মাদ ইব্ন ইসহাক আল-ফাকিহী তাঁহার "আখবার মাক্কাতা ফী কাদীমি'দ-দাহহি ওয়া হাদীছিহি” গ্রন্থে যমযম কূপের চৌত্রিশটি অর্থবোধক নাম উল্লেখ করিয়াছেন (মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৫৮-৬১; তারীখু'ল-কাবীম, ৩খ, পৃ. ৯৫; মু'জামুল-বুলদান, ৩খ, পৃ. ১৪৭-৮)।
যেহেতু কা'বা শরীফ হযরত আদম (আ)-এর যুগ হইতেই বর্তমান স্থানে বিদ্যমান ছিল, হয়ত কালের প্রবাহে কখনও কখনও গৃহকাঠামো অবলুপ্ত হইয়াছে, তাই নিশ্চয়ই তখন হইতেই এখানে পানির ব্যবস্থাও বিদ্যমান থাকার কথা। আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত হওয়ার উদ্দেশে পানি হইল পবিত্রতা অর্জনের অন্যতম উপাদান। তাই এই মহাসম্মানিত গৃহের সংলগ্ন পানি ব্যবস্থাও নিশ্চয়ই ছিল।
সকল ঐতিহাসিকের জন্য ইব্ন আব্বাস (রা)-র হাদীছই যমযমের আদি ইতিহাসের উৎস। আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ)-এর দু'আ (২: ১২৬-২৯ এবং ১৪: ৩৫-৮) এবং স্বামী-স্ত্রী ও পুত্রের আল্লাহ্ জন্য নিবেদিতপ্রাণ হওয়ার উসীলায় এমন বরকত দান করিলেন যে, এই যমযম কূপকে কেন্দ্র করিয়া স্বল্প কালের মধ্যে মক্কার বিজন প্রান্তর মানুষের কোলাহলে মুখরিত হইয়া উঠিল। প্রাথমিক পর্যায়ে আরবের একটি আদি গোত্র 'জুরহুম' হযরত হাজার (রা)-এর অনুমতিপ্রাপ্ত হইয়া এখানে বসতি স্থাপন করে এবং হযরত ইসমাঈল (আ) যৌবনে পদার্পণ করিয়া এই গোত্রে বিবাহ করেন।
হাদীছ শরীফে যমযম কূপ সম্পর্কে বহু স্থানে আলোচনা বিদ্যমান থাকিলেও কুরআন মজীদে এই কূপ সম্পর্কে সরাসরি কোন বক্তব্য নাই। হজ্জ সংক্রান্ত আলোচনায় পরোক্ষভাবে ইহার উল্লেখ আছেঃ لِيَشْهَدُوا مَنَافِعَ لَهُمْ “যাহাতে তাহারা তাহাদের কল্যাণময় স্থানসমূহে উপস্থিত হইতে পারে” (২২: ২৮)অতএব যমযম কূপ কা'বার চত্বরে অবস্থিত হওয়ায় ইহা একটি কল্যাণময়, মর্যাদাপূর্ণ ও বরকতময় স্থান এবং ইহার পানি মানুষের জন্য বরকতপূর্ণ। দুগ্ধপোষ্য নবীর জীবন তো এই পানি দ্বারা সঞ্জীবিত হইয়াছিল। অর্থাৎ একজন মহান নবীই সর্বপ্রথম এই কূপের পানি পান করিয়াছিলেন। তাঁহারই উত্তর পুরুষ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)-কে মি'রাজ উপলক্ষে ঊর্ধ্বজগতে আরোহণ করানোর প্রস্তুতিকালে তাঁহার হৃদয় মুবারক যমযমের পানি দ্বারাই ধৌত করা হয়। এই সম্পর্কে মহানবী (সা) বলেন: "আমি মক্কায় অবস্থানকালে একদিন রাত্রিবেলা আমার গৃহের ছাদ খুলিয়া গেল এবং জিবরাঈল (আ) অবতরণ করিয়া আমার বক্ষ বিদারণ করেন এবং যমযমের পানি দ্বারা তাহা ধৌত করেন, অতঃপর একখানা স্বর্ণের থালায় ঈমান ও হিকমত পরিপূর্ণ করিয়া আনিয়া আমার বক্ষমধ্যে ঢালিয়া দিয়া তাহা জোড়া লাগাইয়া দেন ......" (বুখারী, কিতাবুল হজ্জ, বাব ৭৫: যমযম সম্পর্কে যাহা কিছু উল্লিখিত ইহয়াছে, ২খ, পৃ. ১১৪)।
হাফিজ যয়নুদ্দীন ইরাকী বলেন, যমযমের পানি দ্বারা তাঁহার বক্ষ ধৌত করার উদ্দেশ্য যাহাতে তিনি বেহেশত-দোযখসহ ঊর্ধ্ব জগত অবলোকন করিবার শক্তি অর্জন করিতে পারেন। কারণ যমযমের পানি দ্বারা অন্তরাত্মা শক্তিশালী হয় এবং ভয়ভীতি দূর হয়। বালক বয়সের বক্ষ বিদারণ কালেও যমযমের পানি দ্বারা তাঁহার বক্ষ ধৌত করার কথা উল্লিখিত হইয়াছে (আযরাকীর আখবার মাক্কা গ্রন্থের বরাতে মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৬৫)। ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে যমযমের পানি পান করাইয়াছি। তিনি দাঁড়ানো অবস্থায় তাহা পান করেন" (বুখারী, পৃ. স্থা, নং ১৫২৭; তিরমিযী, আশরিবা, বাব ১২, নং ১৮৩০, ৩খ, পৃ. ৩৫৪-৫; মুসলিম, আশরিবা, বাব ২০৮, নং ৫১০৮-১১, ৭খ, পৃ. ৪৭; নাসাঈ, মানাসিক, বাব : আশ-শুরবি যামযাম কাইমান)।
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ مَاءُ زَمْرَمَ لِمَا شُرِبَ لَهُ. জাবির ইব্ন আবদিল্লাহ (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলিতে শুনিয়াছি: "যমযমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হইবে তাহা পূর্ণ হইবে" (ইবন মাজা, মানাসিক, বাব ৭৮, নং ৩০৬২, ২খ, পৃ. ১০১৮; আও দ্র. মুসতাদরাক হাকেম)। ইব্ন আব্বাস (রা)-এর নিকট এক ব্যক্তি আসিয়া উপস্থিত হইলে তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কোথা হইতে আগমন করিয়াছ? সে বলিল, যমযম হইতে। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহার পানি যেইভাবে পান করিতে হয় সেইভাবে তুমি কি তাহা পান করিয়াছ? আগন্তুক বলিল, তাহা কিভাবে? তিনি বলিলেন, তুমি ইহার পানি পান করার সময় কিবলামুখী হইবে, বিসমিল্লাহ বলিবে, তিন নিঃশ্বাসে পান করিবে, উদর পূর্তি করিয়া পান করিবে এবং পানশেষে আলহামদু লিল্লাহ বলিবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা) বলিয়াছেন :
إِنَّ أَيَةَ مَا بَيْنَنَا وَبَيْنَ الْمُنَافِقِينَ أَنَّهُمْ لَا يَتَضَلَّعُونَ مِنْ زَمْزَمَ.
"আমাদের ও মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য এই যে, তাহারা উদর পূর্তি করিয়া যমযমের পানি পান করে না" (ইবন মাজা, মানাসিক, বাব ৭৮, নং ৩০৬১)।
আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলিয়াছেন :
خَيْرُ مَاء عَلَى وَجْهِ الْأَرْضِ مَاءُ زَمْزَمَ .
"পৃথিবীর বুকে সর্বোত্তম পানি হইল যমযমের পানি" (সহীহ ইব্ন্ন হিব্বানের বরাতে মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৬৫)।
ইব্ন আব্বাস (রা) মহানবী (সা)-এর বাণী হিসাবে বলেন, যমযমের পানি যে উদ্দেশে পান করা হইবে তাহা পূর্ণ হইবে। তুমি উহার পানি রোগমুক্তির জন্য পান করিলে আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দান করিবেন এবং পিপাসা নিবারণের জন্য পান করিলে আল্লাহ তোমার পিপাসা মিটাইবেন। ইহা জিবরীল (আ)-এর পদাঘাতে ইসমাঈল (আ)-এর পানীয় হিসাবে সৃষ্টি হইয়াছে (আযরাকীর আখবার মাক্কা গ্রন্থের বরাতে মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৬৩; একই কথা মুজাহিদ (র)-এর নিজস্ব বক্তব্য হিসাবেও উদ্ধৃত হইয়াছে। তবে তাহাতে আরও আছে : তুমি উহা ক্ষুন্নিবৃত্তির উদ্দেশে পান করিলে আল্লাহ তোমার ক্ষুন্নিবৃত্তি করিবেন, পৃ. ৬২; তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৬৭)। আষরাকীর গ্রন্থে আরও আছে যে, মহানবী (সা) সুহায়ল ইব্ন আমর (রা)-কে যমযমের পানি উপহারস্বরূপ পাঠাইয়াছিলেন (মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৬২; তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৬৮)। ইব্ন আব্বাস (রা) বলিলেন, তোমরা পুণ্যবান লোকদের সালাতের স্থানে সালাত আদায় কর এবং দীনদার লোকদের পানীয় পান কর। তাঁহাকে পূন্যবানদের সালাতের স্থান এবং দীনদারগণের পানীয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি বলেন, পুণ্যবানদের সালাতের স্থান হইল মীযাবের নিচে এবং দীনদারগণের পানীয় হইল যমযমের পানি (আযরাকীর বরাতে মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৬৪; তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৬৮-৯; উভয় গ্রন্থে আখবার মাক্কা গ্রন্থের বরাতে)।
স্বেচ্ছায় দারিদ্র্য বরণকারী প্রবীণ সাহাবী হযরত আবূ যার আল-গিফারী (রা) মহানবী (সা)-এর নবুওয়াত লাভের সংবাদ জানিতে পারিয়া তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিতে মক্কায় আগমন করেন। তিনি তাঁহার সহিত সাক্ষাতের ইচ্ছা প্রকাশ করিলে মক্কার কুরায়শ মুশরিকরা তাঁহাকে প্রস্তর নিক্ষেপে জর্জরিত করিয়া বেহুঁশ করিয়া ফেলে এবং তাঁহার সমস্ত শরীর রক্তাক্ত হইয়া যায়। হুঁশ ফিরিয়া পাইলে তিনি যমযমের নিকট গিয়া দেহের রক্ত ধুইয়া ফেলেন এবং যমযমের পানি পান করেন। তিনি মহানবী (সা)-এর সহিত সাক্ষাতের আশায় কা'বার চত্বরে তিরিশ দিন (বর্ণনান্তরে পনর দিন) অতিবাহিত করেন। এই সময় যমযমের পানি ব্যতীত তাঁহার অন্য কোন খাদ্য বা পানীয় ছিল না। তিনি উহা পান করিয়া সুস্বাস্থ্য লাভ করেন এবং এই দীর্ঘ সময়ে কখনও ক্ষুধা অনুভব করেন নাই। তাঁহার সহিত সাক্ষাত হইলে পর রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁহার এই কয়দিনের খাদ্য-পানীয়ের খবর লইলে তিনি বলেন যে, যmযমের পানি ছাড়া আর কিছুই তাহার উদরে প্রবেশ করান নাই এবং ইহাতেই তিনি সুস্বাস্থ্য লাভ করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন: এই পানি ক্ষুধার সময় খাদ্যের অভাব পূর্ণ করে (বুখারী, মানাকিবুল আনসার, বাব ইসলাম আবী যার, ১খ., পৃ. ৫৪৪-৫; ইসাবা, ৭খ, পৃ. ৬--৬২, নং ৩৮২। সহীদ মুসলিম কিতাবুল ফাদাইলু মিন ফাদাইল আবী যার (রা), ২খ, পৃ. ২৯৫-৬; বাংলা অনু. ৮খ, পৃ. ৫-৯)।
আব্বাস (রা) বলেন, জাহিলী যুগে লোকেরা একবার ভীষণ দুর্ভিক্ষের শিকার হইল। খাদ্য সংগ্রহ তাহাদের জন্য কষ্টসাধ্য হইয়া পড়িল। এই সময় তাহারা যমযমের পানি পান করিয়া এবং তাহাদের দুগ্ধপোষ্য শিশুদেরকেও পান করাইয়া নিশ্চিত মৃত্যুর করাল গ্রাস হইতে মুক্তি পায়। ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, এইজন্যই যমযম কূপের অপর নাম হয় 'শাব্বাআহ' (شباعة) ক্ষুধা নিবারণকারী; (তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৬৮)। যমযমের পানি দাঁড়ানো অবস্থায় পান করা সুন্নাত। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) দাঁড়ানো অবস্থায় ইহার পানি পান করেন। ইব্ন আব্বাস (রা) যমযমের পানি পানকালে নিম্নোক্ত দু'আ পড়িতেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَرِزْقًا وَأَسِعًا وَشِفَاءٌ مِّنْ كُلِّ دَاء. "হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট প্রার্থনা করি উপকারী বিদ্যার, পর্যাপ্ত রিযিকের এবং যাবতীয় রোগব্যাধি হইতে আরোগ্য লাভের" (মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৭৩)। পৃথিবীর সর্বত্রই এই বরকতময় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা রহিয়াছে।
হাকেম তিরমিযী (র) বলেন, যমযম কূপের পানি দ্বারা উপকার লাভ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির খাঁটি নিয়তের উপর নির্ভরশীল। খালেছ নিয়তে উহা পান করিলে উপকার লাভ অবশ্যম্ভাবী। আল্লামা মুনাবী আত-তায়সীর বিশারহি' আল-জামে' আস-সাগীর গ্রন্থে বলিয়াছেন যে, যমযমের উৎপত্তি হইয়াছিল হযরত ইবরাহীম (আ)-এর পুত্র ইসমাঈল (আ)-এর সাহায্যার্থে। আজও কেহ নিষ্ঠার সহিত এই পানি ব্যবহার করিলে সেও আল্লাহ্ সাহায্য প্রাপ্ত হইবে (আখবার মাক্কা গ্রন্থের বরাতে মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৬৬)।
কালের পরিক্রমায় মানুষ সত্য দীন হইতে বিচ্যুত হইয়া পথভ্রষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ্ কুদরতে সৃষ্ট এই বরকতময় কূপেরও বিলুপ্তি ঘটে। ইসমাঈল (আ)-এর বংশধরগণকে পরাভূত করিয়া জুরহুম গোত্র কা'বার কর্তৃত্ব দখল করিয়া নেওয়ার পর তাহারা ক্রমান্বয়ে পথভ্রষ্ট হইতে থাকে। তাহারা পবিত্র হারাম শরীফের অসম্মান করে, হারাম শরীফে প্রদত্ত উপহার-সামগ্রী প্রকাশ্যে ও সন্তর্পণে চুরি ও আত্মসাৎ করিতে থাকে। তাহাদের গোত্রের প্রবীণ ব্যক্তি আমর ইবন হারিছ ইব্ন মাদাদ তাহাদেরকে এইসব অপকর্ম হইতে বিরত থাকিবার উপদেশ দেন, কিন্তু তাহারা উহাতে কর্ণপাত করে নাই। তাই তিনি কা'বার ধনভাণ্ডারে রক্ষিত দুইটি স্বর্ণের হরিণের প্রতিকৃতি এবং স্বর্ণের তরবারি রাতের অন্ধকারে গোপনে কূপের মধ্যে দাফন করিয়া কূপটিকে ভরাট করিয়া ফেলেন (মুহাম্মদ তাহির আল-কুরদী, তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৫৬)। কোন কোন ঐতিহাসিক বলেন যে, মাদাদ ইব্ন আমর আল-জুরহুমী খুযাআ গোত্রের নিকট পরাজিত হইলে তিনি তাহাদেরকে পানি হইতে বঞ্চিত করার উদ্দেশে নিজের মূল্যবান দ্রব্যাদি ও স্বর্ণ দ্বারা কূপটিকে ভরাট করিয়া ফেলেন, অতঃপর মরুভূমির ধুলা-বালিতে কূপের চিহ্নও বিলুপ্ত হইয়া যায়। ইয়াকৃত আল-হামাবী বলিয়াছেন যে, বৃষ্টিপাতের অভাবে কূপটি শুষ্ক হইয়া যায় এবং অবশেষে ইহার কোন চিহ্নই অবশিষ্ট থাকে নাই (মু'জামুল বুলদান, ৩খ, পৃ. ১৪৯)। কোন কোন ঐতিহাসিক বলিয়াছেন যে, বৃষ্টিপাতের অভাবের কারণে নয়, জুরহুম গোত্রের অবাধ্যাচারের কারণে কূপটি শুকাইয়া যায় এবং পরবর্তী কালে বন্যার কারণে ইহার শেষ চিহ্নও বিলুপ্ত হইয়া যায় (মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ২৩-২৪)।
জুরহুম গোত্রের পর কা'বাসহ মক্কার ক্ষমতা খুযাআ গোত্রের হস্তগত হওয়ার ইতিহাস কিছুটা জানা গেলেও মহানবী (সা)-এর দাদা আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক যমযম কূপের পুনরাবিষ্কারের পূর্বে পর্যন্ত উক্ত কূপের ইতিহাস সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। মক্কা শরীফে যেহেতু কোন নদীনালা ছিল না, তাই লোকেরা সম্ভবত বিকল্প কূপ খনন করিয়া নিজেদের পানির প্রয়োজন মিটাইত। কুরায়শ বংশের প্রতিষ্ঠাতা কুসায়্যি ইন্ন কিলাব চামড়ার মশকে করিয়া মক্কার বাহির হইতে পানি আনিয়া হাজ্জীদেরকে পান করাইতেন। পরে তিনি উম্মু হানী (রা)-র গৃহের স্থানে আজুল নামক কূপ খনন করিয়া পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। যমযম ছাড়া ইহাই মক্কার ভিতরের প্রথম কূপ (মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৪৬)। তখনও যমযম কূপ অনাবিষ্কৃত থাকে।
আবদুল মুত্তালিব একটি স্বপ্নের ভিত্তিতে যমযম কূপের সন্ধান লাভ করেন। তিনি হিজরে ইসমাঈলে (বর্তমান হাতীম) ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্নে তিনবার কূপ খননের নির্দেশ লাভ করেন। স্বপ্নে কেহ তাঁহাকে নির্দেশ প্রদান করেন যে, কা'বার সম্মুখে অবস্থিত, যুগল মূর্তি বরাবর পিঁপড়ার ঢিবিতে ময়লা ও রক্তের মাঝে কাকের ঠোঁকরে সৃষ্ট ছিদ্রের মধ্যে খননকার্য চালাইয়া যমযম কূপ আবিষ্কার করা যাইবে। অতএব তিনি মসজিদুল হারামে পৌঁছিয়া স্বপ্নের লক্ষণসমূহ অবলোকন করার অপেক্ষায় ছিলেন। এই সময় হারাম শরীফ এলাকার বাইরে একটি গরু যবেহ করা হইলে উহা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে অলৌকিকভাবে ছুটিয়া আসিয়া কা'বার চত্বরে পতিত হইয়া সেখানে মারা যায়। এক পর্যায়ে কাক আসিয়া পিঁপড়ার ঢিবি বরাবর খুঁড়িতে থাকে। আবদুল মুত্তালিব তাঁহার স্বপ্নের লক্ষণ বুঝিতে পারিয়া একমাত্র পুত্র হারিছকে লইয়া কূপ খনন শুরু করেন। কূপ খননের প্রাক্কালে তিনি যে বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হন তাহা অপসারিত করার জন্য আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করেন এবং বলেন যে, তিনি দশটি পুত্র সন্তান লাভ করিলে তাহাদের একজনকে আল্লাহর নামে কুরবানী করিবেন (ইবন হিশাম, ১খ, পৃ. ১৫৭)। আল্লাহ তাঁহার অভিযান সফল করেন এবং তিনি কূপের সন্ধান লাভ করেন। তিনি ইহাতে দাফনকৃত দুইটি সোনার হরিণের প্রতিকৃতি এবং স্বর্ণের তরবারি লাভ করেন এবং এইগুলিকে কা'বার ধনভাণ্ডারে জমা করেন (তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৬-৬২, মু'জামুল বুলদান, ৩খ, ১৪৯; তারীখ মাক্কা-এর বরাতে মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৪৮-৫১)। পরবর্তী কালে আবদুল মুত্তালিব দশজন পুত্র সন্তান লাভ করেন এবং পরিণত বয়সে তাহারা কুরায়শদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেন। তিনি তাঁহার মানত অনুযায়ী সন্তানদের মধ্যে লটারী করেন এবং ইহাতে তাঁহার সর্বাধিক প্রিয় ও সর্বকনিষ্ঠ সন্তান এবং মহানবী (স)-এর পিতা আবদুল্লাহর নাম উঠে। তিনি তাঁহাকে যবেহ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। অতঃপর তাঁহার ভ্রাতাগণের পরামর্শে তিনি একশত উষ্ট্র অথবা তাঁহার কনিষ্ঠ পুত্রের মধ্যে লটারী করেন। তৃতীয়বারে এক শত উষ্ট্রের নামে লটারী উঠে। অতএব তিনি পুত্রের পরিবর্তে এক শত উষ্ট্র যবেহ করেন (তা'রীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৬২)। এজন্য রাসূলুল্লাহ (সা)-এর একটি উপাধি হইল ইবনু'য-যাবীহায়ন (দুই যবেহকৃতের পুত্র)। পরবর্তীকালে নরহত্যার দিয়াতস্বরূপ এক শত উট প্রদান ইসলামী শরীআতে বিধিবদ্ধ হয় (ইবন হিশাম, ১খ, পৃ. ১৫৯-১৬১)। এখানে উল্লেখ্য যে, মহানবী (সা)-এর পিতা আবদুল্লাহ আবদুল মুত্তালিবের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন না, বরং তিনি তাঁহার মাতার সর্বকনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন। কারণ আবদুল্লাহ্র কনিষ্ঠ হামযা এবং হামযার কনিষ্ঠ ছিলেন আব্বাস (রা)। অর্থাৎ আব্বাস (রা)-ই ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান এবং মহানবী (স)-এর জন্মের সময় তাঁহার বয়স ছিল প্রায় তিন বৎসর (সীরাতে ইবন হিশামের ১নং টীকা, ১খ, পৃ. ১৫৯; আর-রাওদুল উনুফ-এর বরাতে; আর-রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ১৭৬)।
📄 ইবরাহীম (আ)-এর উপর নাযিলকৃত সহীফা ও উহার বিষয়বস্তু
হযরত ইবরাহীম (আ) তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ)-কে সঙ্গে লইয়া আল্লাহ তা'আলার মহিমান্বিত ঘর কা'বা শরীফ স্থায়ীভাবে নির্মাণ করেন। তিনি সর্বপ্রথম কা'বা ঘর নির্মাণ করেন নাই, বরং পুনর্নির্মাণ করিয়াছেন, যাহা ১৪ : ৩৭ আয়াত হইতে পরিষ্কার বুঝা যায়। এই ঘরের সম্পূর্ণরূপে নূতন নির্মাণে হযরত ইসমাঈল (আ) পিতার সহযোগিতা করেন। কুরআন মজীদে তাহা এইভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে :
وَعَهِدْنَا إِلى إِبْرَاهِيمَ وَاسْمَعِيلَ أَنْ طَهْرًا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعُكَفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ . "এবং আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করিলাম যে, তোমরা দুইজনে আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ই'তিকাফকারী এবং রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ” (২: ১২৫)।
وَإِذْ يَرْفَعُ ابْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَاسْتَعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ . "যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা'বা ঘরের প্রাচীর তুলিতেছিল তখন তাহারা বলিয়াছিল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এই কাজ কবুল কর, নিশ্চয় তুমি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞাতা” (২ঃ ১২৭)।
তাফসীর ও ইতিহাসের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, হযরত ইসমাঈল (আ) কা'বা ঘর নির্মাণে প্রয়োজনীয় পাথর ও আনুষঙ্গিক দ্রব্যাদির যোগান দিতেন। কা'বা ঘর আগে নির্মিত হইয়াছে না কুরবানীর ঘটনা আগে ঘটিয়াছে তাহা নিশ্চিত করিয়া বলা যায় না। তবে কা'বা ঘর নির্মাণকালেও ইসমাঈল (আ) যে তরুণ যুবক ছিলেন তাহার ইঙ্গিত পাওয়া যায় কা'বা ঘর নির্মাণে তাঁহার সহযোগী ভূমিকা হইতে। ইবন সা'দ লিখিয়াছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আ) এক শত বৎসর বয়সে কা'বা ঘর নির্মাণের নির্দেশ প্রাপ্ত হন এবং তখন ইসমাঈল (আ)-এর বয়স ত্রিশ বৎসর হইয়াছিল (আত-তাবাকাতুল-কুবরা, ১খ, পৃ. ৫২)। তবে কা'বা শরীফ নির্মাণকালে ইবরাহীম (আ.)-এর বয়স সংক্রান্ত এই বর্ণনাটি সন্দেহমুক্ত নহে। কা'বা ঘর নির্মাণ সংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ হযরত ইবরাহীম (আ) শীর্ষক নিবন্ধে দ্র.।
আল্লাহ তা'আলা ডাক দিলেন: "হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্য প্রমাণিত করিয়া দেখাইলে”।
ইমাম সুদ্দী (র) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা পিতার ছুরি ও পুত্রের কণ্ঠনালীর মাঝখানে একটি তাম্রপাত রাখিয়া দিয়াছিলেন। ফলে ছুরি কণ্ঠনালী স্পর্শ করিতে পারে নাই (আরাইস, পৃ. ১০০)। মহান আল্লাহ বলেন: "আমি এইভাবেই সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করিয়া থাকি"। হে ইবরাহীম! এই তোমার পুত্রের পরিবর্তে তোমার যবেহ করার প্রাণী। ইহাকে তুমি যবেহ কর। ইবরাহীম (আ) দৃষ্টি ফিরাইয়া একটি হৃষ্টপুষ্ট দুম্বাসহ হযরত জিবরাঈল (আ)-কে উপস্থিত দেখিতে পান। ইন্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, ইহা ছিল জান্নাতের একটি দুম্বা যাহা চল্লিশ বৎসর ধরিয়া জান্নাতে বিচরণ করিয়াছে। অপর বর্ণনায় আছে, ইবন আব্বাস (রা) বলেন যে, ইবরাহীম (আ) যে দুম্বা যবেহ করেন তাহা ছিল আদম (আ)-এর পুত্র হাবীল কর্তৃক কুরবানীকৃত দুম্বা, যাহা আল্লাহ কবুল করিয়াছিলেন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ১৫৮; তাফসীরে রুহুল মাআনী, ২৩ খ, পৃ. ১৩২)।
ইবরাহীম (আ) পুত্রকে ছাড়িয়া দিলেন এবং দুম্বাটি মিনার কুরবানীর স্থানে যবেহ করিলেন (আরাইস, পৃ. ১০০; মাআরেফুল কোরআন, ৭খ, পৃ. ৪৪৯)। তখন হইতে কিয়ামতকাল পর্যন্ত তৌহীদবাদী মানবজাতির জন্য প্রতি বৎসর দশ যুলহিজ্জা পশু কুরবানী করার ঐতিহ্য চালু হইয়াছে। এইভাবে অবিস্মরণীয় করিয়া রাখা হইয়াছে পিতা-পুত্রের এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার দৃষ্টান্তকে। "নিশ্চয় ইহা ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাহাকে মুক্ত করিলাম এক কুরবানীর বিনিময়ে। আমি ইহা পরবর্তীদের জন্য স্মরণে রাখিয়াছি” (৩৭: ১০৬-৭)।
এখানে একটি প্রশ্ন জাগিতে পারে যে, হযরত ইবরাহীম (আ) তো পুত্রকে কুরবানী করার স্বপ্ন দেখিয়াছেন, অথচ তিনি তাহাকে কুরবানী করেন নাই। তাহা হইলে নবীর স্বপ্ন সত্য হইল কিভাবে? বস্তুত ইবরাহীম (আ) স্বপ্নে পুত্রকে যবেহ করিতে দেখিয়াছেন, যবেহ করিয়া তাহাকে শেষ করিয়া ফেলিয়াছেন তাহা দেখেন নাই। অতএব তিনি তাঁহার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করিয়াছেন অর্থাৎ স্বপ্নে যবেহ করিতে দেখিয়াছিলেন এবং বাস্তবেও তিনি ছুরি হাতে লইয়া পুত্রের গলায় তাহা সজোরে চালাইয়াছেন কিন্তু যেহেতু তিনি যবেহকর্ম সমাপ্ত করিয়াছেন এইরূপ স্বপ্ন দেখেন নাই, তাই বাস্তবেও যবেহ সমাপ্ত করিতে পারেন নাই। আল্লাহ তাঁহাকে যতদূর স্বপ্ন দেখাইয়াছেন, তিনি ততটাই বাস্তবায়িত করিয়াছেন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ১৫৫; তাফহীমুল কুরআন, ৩৭: ১০২ ও ১০৫ আয়াত সংশ্লিষ্ট ৫৮ ও ৬৩ নং টীকা)।
ইয়াহুদী-খৃস্টানগণ হযরত ইসমাঈল (আ)-এর প্রতি বিদ্বেষবশত এই কুরবানীর ঐতিহ্যকে ত্যাগ করিয়াছে। আরবদের মধ্যে ইহা চালু থাকিলেও কালক্রমে তাওহীদের বিশ্বাস হইতে তাহাদের বিচ্যুতির সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথাও বিকৃত হইয়া যায়। তাহারা আল্লাহ্ উদ্দেশ্যে কুরবানী করার পরিবর্তে তাহাদের মনগড়া দেব-দেবীর নামে পশু উৎসর্গ করিত। যেমন কুরআন মজীদে উক্ত হইয়াছে:
وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ . “এবং যাহা মূর্তিপূজার বেদীর উপর বলি দেওয়া হয় (তাহাও তোমাদের জন্য হারাম)" (৫ঃ৩)।
হযরত ইবরাহীম (আ) তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ)-কে সঙ্গে লইয়া আল্লাহ তা'আলার মহিমান্বিত ঘর কা'বা শরীফ স্থায়ীভাবে নির্মাণ করেন। তিনি সর্বপ্রথম কা'বা ঘর নির্মাণ করেন নাই, বরং পুনর্নির্মাণ করিয়াছেন, যাহা ১৪ : ৩৭ আয়াত হইতে পরিষ্কার বুঝা যায়। এই ঘরের সম্পূর্ণরূপে নূতন নির্মাণে হযরত ইসমাঈল (আ) পিতার সহযোগিতা করেন। কুরআন মজীদে তাহা এইভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে :
وَعَهِدْنَا إِلى إِبْرَاهِيمَ وَاسْمَعِيلَ أَنْ طَهْرًا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعُكَفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ . "এবং আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করিলাম যে, তোমরা দুইজনে আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ই'তিকাফকারী এবং রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ” (২: ১২৫)।
وَإِذْ يَرْفَعُ ابْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَاسْتَعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ . "যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা'বা ঘরের প্রাচীর তুলিতেছিল তখন তাহারা বলিয়াছিল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এই কাজ কবুল কর, নিশ্চয় তুমি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞাতা” (২ঃ ১২৭)।
তাফসীর ও ইতিহাসের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, হযরত ইসমাঈল (আ) কা'বা ঘর নির্মাণে প্রয়োজনীয় পাথর ও আনুষঙ্গিক দ্রব্যাদির যোগান দিতেন। কা'বা ঘর আগে নির্মিত হইয়াছে না কুরবানীর ঘটনা আগে ঘটিয়াছে তাহা নিশ্চিত করিয়া বলা যায় না। তবে কা'বা ঘর নির্মাণকালেও ইসমাঈল (আ) যে তরুণ যুবক ছিলেন তাহার ইঙ্গিত পাওয়া যায় কা'বা ঘর নির্মাণে তাঁহার সহযোগী ভূমিকা হইতে। ইবন সা'দ লিখিয়াছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আ) এক শত বৎসর বয়সে কা'বা ঘর নির্মাণের নির্দেশ প্রাপ্ত হন এবং তখন ইসমাঈল (আ)-এর বয়স ত্রিশ বৎসর হইয়াছিল (আত-তাবাকাতুল-কুবরা, ১খ, পৃ. ৫২)। তবে কা'বা শরীফ নির্মাণকালে ইবরাহীম (আ.)-এর বয়স সংক্রান্ত এই বর্ণনাটি সন্দেহমুক্ত নহে। কা'বা ঘর নির্মাণ সংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ হযরত ইবরাহীম (আ) শীর্ষক নিবন্ধে দ্র.।
আল্লাহ তা'আলা ডাক দিলেন: "হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্য প্রমাণিত করিয়া দেখাইলে”।
ইমাম সুদ্দী (র) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা পিতার ছুরি ও পুত্রের কণ্ঠনালীর মাঝখানে একটি তাম্রপাত রাখিয়া দিয়াছিলেন। ফলে ছুরি কণ্ঠনালী স্পর্শ করিতে পারে নাই (আরাইস, পৃ. ১০০)। মহান আল্লাহ বলেন: "আমি এইভাবেই সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করিয়া থাকি"। হে ইবরাহীম! এই তোমার পুত্রের পরিবর্তে তোমার যবেহ করার প্রাণী। ইহাকে তুমি যবেহ কর। ইবরাহীম (আ) দৃষ্টি ফিরাইয়া একটি হৃষ্টপুষ্ট দুম্বাসহ হযরত জিবরাঈল (আ)-কে উপস্থিত দেখিতে পান। ইন্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, ইহা ছিল জান্নাতের একটি দুম্বা যাহা চল্লিশ বৎসর ধরিয়া জান্নাতে বিচরণ করিয়াছে। অপর বর্ণনায় আছে, ইবন আব্বাস (রা) বলেন যে, ইবরাহীম (আ) যে দুম্বা যবেহ করেন তাহা ছিল আদম (আ)-এর পুত্র হাবীল কর্তৃক কুরবানীকৃত দুম্বা, যাহা আল্লাহ কবুল করিয়াছিলেন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ১৫৮; তাফসীরে রুহুল মাআনী, ২৩ খ, পৃ. ১৩২)।
ইবরাহীম (আ) পুত্রকে ছাড়িয়া দিলেন এবং দুম্বাটি মিনার কুরবানীর স্থানে যবেহ করিলেন (আরাইস, পৃ. ১০০; মাআরেফুল কোরআন, ৭খ, পৃ. ৪৪৯)। তখন হইতে কিয়ামতকাল পর্যন্ত তৌহীদবাদী মানবজাতির জন্য প্রতি বৎসর দশ যুলহিজ্জা পশু কুরবানী করার ঐতিহ্য চালু হইয়াছে। এইভাবে অবিস্মরণীয় করিয়া রাখা হইয়াছে পিতা-পুত্রের এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার দৃষ্টান্তকে। "নিশ্চয় ইহা ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাহাকে মুক্ত করিলাম এক কুরবানীর বিনিময়ে। আমি ইহা পরবর্তীদের জন্য স্মরণে রাখিয়াছি” (৩৭: ১০৬-৭)।
এখানে একটি প্রশ্ন জাগিতে পারে যে, হযরত ইবরাহীম (আ) তো পুত্রকে কুরবানী করার স্বপ্ন দেখিয়াছেন, অথচ তিনি তাহাকে কুরবানী করেন নাই। তাহা হইলে নবীর স্বপ্ন সত্য হইল কিভাবে? বস্তুত ইবরাহীম (আ) স্বপ্নে পুত্রকে যবেহ করিতে দেখিয়াছেন, যবেহ করিয়া তাহাকে শেষ করিয়া ফেলিয়াছেন তাহা দেখেন নাই। অতএব তিনি তাঁহার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করিয়াছেন অর্থাৎ স্বপ্নে যবেহ করিতে দেখিয়াছিলেন এবং বাস্তবেও তিনি ছুরি হাতে লইয়া পুত্রের গলায় তাহা সজোরে চালাইয়াছেন কিন্তু যেহেতু তিনি যবেহকর্ম সমাপ্ত করিয়াছেন এইরূপ স্বপ্ন দেখেন নাই, তাই বাস্তবেও যবেহ সমাপ্ত করিতে পারেন নাই। আল্লাহ তাঁহাকে যতদূর স্বপ্ন দেখাইয়াছেন, তিনি ততটাই বাস্তবায়িত করিয়াছেন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ১৫৫; তাফহীমুল কুরআন, ৩৭: ১০২ ও ১০৫ আয়াত সংশ্লিষ্ট ৫৮ ও ৬৩ নং টীকা)।
ইয়াহুদী-খৃস্টানগণ হযরত ইসমাঈল (আ)-এর প্রতি বিদ্বেষবশত এই কুরবানীর ঐতিহ্যকে ত্যাগ করিয়াছে। আরবদের মধ্যে ইহা চালু থাকিলেও কালক্রমে তাওহীদের বিশ্বাস হইতে তাহাদের বিচ্যুতির সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথাও বিকৃত হইয়া যায়। তাহারা আল্লাহ্ উদ্দেশ্যে কুরবানী করার পরিবর্তে তাহাদের মনগড়া দেব-দেবীর নামে পশু উৎসর্গ করিত। যেমন কুরআন মজীদে উক্ত হইয়াছে:
وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ . “এবং যাহা মূর্তিপূজার বেদীর উপর বলি দেওয়া হয় (তাহাও তোমাদের জন্য হারাম)" (৫ঃ৩)।
হাদীছ ও ইতিহাস গ্রন্থসমূহ হইতে জানা যায় যে, হযরত ইবরাহীম (আ)-এর উপর দশখানা সহীফা নাযিল হইয়াছিল। আবার ইদরীস আল-খাওলানী আবূ যার (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তা'আলা কতখানি কিতাব নাযিল করিয়াছেন? তিনি বলিলেন, এক শত সহীফা আর চারখানি কিতাব। আল্লাহ তা'আলা আদম (আ)-এর উপর দশখানি, শীছ (আ)-এর উপর পঞ্চাশখানা, খানুখ বা ইদরীস (আ)-এর উপর ত্রিশখানা এবং ইবরাহীম (আ)-এর উপর দশখানা সহীফা নাযিল করেন। ইহা ছাড়া তিনি তাওরাত, যাবুর, ইনজীল ও ফুরকান নাযিল করেন। আবূ যারর্ (রা) বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইবরাহীম (আ)-এর সহীফায় কি ছিল? তিনি বলিলেন সবই উপদেশমূলক নীতিকথা (مثال)। উদাহরণস্বরূপ উদ্ধৃত করা যায়:
"হে স্বেচ্ছাচারী, অহংকারী বাদশাহ! আমি তোমাকে এইজন্য প্রেরণ করি নাই যে, তুমি একটার পর একটা দুনিয়ার সম্পদ জমা করিবে, বরং এইজন্য প্রেরণ করিয়াছি যে, তুমি আমা হইতে মজলুমের বদদোআ ফিরাইয়া রাখিবে। কারণ আমি তাহা ফেরৎ দেই না, যদিও তাহা কোন কাফিরের পক্ষ হইতেও আসে। উহাতে আরও উপদেশ বাক্য ছিল যে, বুদ্ধিমান যতক্ষণ পর্যন্ত বুদ্ধিহারা না হয়, তাহার উচিৎ সময়কে চার ভাগে ভাগ করা: এক ভাগে সে আল্লাহকে ডাকিবে এবং তাঁহার সহিত গোপনে কথোপকথন করিবে; এক ভাগে আল্লাহ্র সৃষ্টি-নিচয় লইয়া চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করিবে; এক ভাগে নিজের কৃতকর্মসমূহের হিসাব লইবে এবং একভাগ নিজের প্রয়োজন যথা হালাল জীবিকা জোগাড় করার জন্য রাখিবে। বুদ্ধিমানের উচিৎ সে যেন তিনটি কাজ ছাড়া আর কিছুর জন্য প্রচেষ্টা না চালায়: (১) পরকালের জন্য পাথেয় সঞ্চয় করা; (২) নিজের জীবনযাত্রার ব্যবস্থা করা এবং (৩) হারাম নহে এমন বস্তুর স্বাদ আস্বাদন করা। জ্ঞানীর উচিৎ তাহার সময়কাল সম্পর্কে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া; নিজের অবস্থা অনুযায়ী অগ্রগামী হওয়া এবং নিজের জিহ্বাকে হেফাজত করা। যে জানে যে, তাহার কথা তাহার কাজ হইতে নিকৃষ্ট প্রয়োজনীয় কথাবার্তা ছাড়া অনর্থক ও অবান্তর কথাবার্তা তাহার কম হইবে (আত্-তাবারী, তারীখ, ১খ, ১৬১; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ১০৬-১০৭)।
তাঁহার সাহীফার আরও উপদেশ হইল: শান্তি বর্ষিত হউক সেই ব্যক্তির উপর যে মেহমানের সম্মান করে। যে তাহাকে অপদস্থ করে সে জাহান্নামের সর্বশেষ স্তরে থাকিবে। আবূ যার (রা) বলেন, এইজন্যই ইবরাহীম (আ) মেহমান ছাড়া আহার করিতেন না (ইবনুল-জাওযী, তারীখুল-মুনতাজাম, ১খ, ২৭২-২৭৩)।
জান্নাতে তাঁহার প্রাসাদ: হাফিজ আবূ বাকর আল-বায্যার আবূ হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, জান্নাতে একটি প্রাসাদ আছে, আমার মনে হয় তিনি বলিয়াছিলেন, উহা মুক্তার তৈরী, যাহাতে কোন ফাটল কিংবা ভাঙ্গন নাই। আল্লাহ উহা তাঁহার বন্ধু ইবরাহীম (আ)-কে আপ্যায়িত করার জন্য তৈরি করিয়াছেন (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১৭২)।
📄 একটি অযৌক্তিক আপত্তি ও উহার জবাব
লাইডেন হইতে প্রকাশিত ইংরাজী ইসলামী বিশ্বকোষের প্রথম সংস্করণে ইবরাহীম (আ) সম্বন্ধে কতগুলি অযৌক্তিক ও বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য উপস্থাপন করা হইয়াছে। উহাতে বলা হইয়াছে যে, কুরআন কারীমে একটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ইবরাহীম (আ)-কে কা'বাঃ গৃহের নির্মাতা এবং দীন-ই হানীফ-এর প্রবর্তক হিসাবে তুলিয়া ধরা হয় নাই। অবশ্য দীর্ঘকাল পর তাঁহাকে এই সকল বিশেষণে বিশেষিত বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। মাক্কী সূরাগুলির কোথাও ইবরাহীম (আ)-এর সহিত ইসমাঈল (আ)-এর সম্পর্ক দৃষ্টিগোচর হয় না এবং তাঁহাকে প্রথম মুসলমান বলিয়াও কোথাও উল্লেখ করা হয় নাই; বরং তাঁহাকে কেবল একজন নবী ও পয়গাম্বর হিসাবে দেখা যায়। সেখানে তাঁহাকে কা'বাঃ গৃহের প্রতিষ্ঠাতা, ইসমাঈলের পিতা, 'আরব-এর পয়গাম্বর ও পথপ্রদর্শক এবং দীন-ই হানীফ-এর প্রচারক বলিয়া উল্লেখ করা হয় নাই। অবশ্য মুহাম্মাদ (স)-এর মাদানী যিন্দেগী শুরু হইলে তখন মাদানী সূরায় হযরত ইবরাহীম (আ)-এর উল্লেখকালে সঙ্গে সঙ্গে উক্ত বৈশিষ্ট্যাবলীর উল্লেখও করিতে দেখা যায়। প্রশ্নকারিগণ ইহার কারণ হিসাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, মাক্কী যিন্দিগীতে তিনি (রাসূলুল্লাহ স.) সকল বিষয়েই ইয়াহূদীদের উপর নির্ভর করিতেন এবং তাহাদের রীতিনীতি পছন্দ করিতেন। তাই ইবরাহীম (আ)-কেও সেই দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখিতেন ইয়াহ্দীগণ যে দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখিত। কিন্তু মদীনায় যখন ইয়াহ্দীগণ ইসলামের দা'ওয়াত গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিল তখন তিনি ইয়াহুদীদের ইযাহুদীবাদ হইতে পৃথক ইবরাহীমী দা'ওয়াতের ভিত্তি স্থাপন করিলেন এবং ইবরাহীম (আ)-কে দীনে হানীফ-এর প্রচারক, আরবের পয়গাম্বর, ইসমাঈল (আ)-এর পিতা এবং কা'বা গৃহের ভিত্তি স্থাপনকারী হিসাবে পেশ করিলেন। এই প্রশ্ন এবং এই সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্র. মুহাম্মাদ হিফজুর রাহমান সিউহারবী, কাসাসুল-কুরআন, দিল্লী। ১খ, ১৪০-১৫১)।
মুসলিম-অমুসলিম কোন ঐতিহাসিক এই কথা বলেন নাই যে, রাসূলুল্লাহ (স) ইসলামী দা'ওয়াত প্রচার-প্রসারের জন্য ইয়াহুদীদের সাহায্য লইয়াছেন; বরং তাঁহারা সকলেই ইহার বিপরীত বর্ণনা করিয়াছে যে, মক্কা ও মদীনা উভয় জায়গার ইয়াহূদীরই তাঁহার ঘোর বিরোধী ছিল এবং তাঁহার বিরুদ্ধে জনগণকে উস্কানী দিত। খোদ কুরআন কারীমে উল্লিখিত হইয়াছে, "তুমি ইয়াহুদী ও মুশরিকদিগকে মু'মিনদের প্রতি সর্বাধিক কট্টর দুশমনরূপে দেখিতে পাইবে এবং তাহাঁদিগকে তুমি মু'মিনদের সর্বাধিক নিকটতম বন্ধুরূপে দেখিতে পাইবে যাহারা নিজদিগকে খৃস্টান বলিয়া দাবি করে" (৫ঃ ৮২)।
জাহিলী যুগে আরবগণ ইয়াহুদীগণকে কোন মূল্যই দিত না; বরং তাহাদের সম্পর্কে এমনও বর্ণনা পাওয়া যায় যে, ইয়াহুদীদের প্রতিবেশী থাকাও তাহারা পছন্দ করিত না এবং যে সকল স্থান তাহারা নিজেদের হিজরতের জন্য মনোনীত করিয়াছিল সেইখান হইতে ইয়াহুদীগণকে তাহারা বিতাড়নের পক্ষপাতী ছিল।