📄 দূত সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বাদানুবাদ
হযরত ইবরাহীম (আ) ছিলেন খুবই কোমল হৃদয়। তিনি যখন জানিতে পারিলেন যে, ফেরেশতাগণ লূত সম্প্রদায়কে ধ্বংস করিতে আসিয়াছেন তখন সেই সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁহার হৃদয় বিগলিত হইল। তিনি ফেরেশতাদের সহিত তাহাদের ব্যাপারে বাদানুবাদ শুরু করিলেন। তাহাদের প্রতি আল্লাহ্র রহমত কামনা করিলেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
فَلَمَّا ذَهَبَ عَنْ إِبْرَاهِيمَ الرَّوْعُ وَجَاءَتْهُ الْبُشْرَى يُجَادِلُنَا فِي قَوْمٍ لُوطٍ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَعَلِيمٌ أَوَاهُ مُّنِيبٌ .(١١:٧٤-٧٥) "অতঃপর যখন ইবরাহীমের ভীতি দূরীভূত হইল এবং তাহার নিকট সুসংবাদ আসিল তখন সে লূতের সম্প্রদায়ের সম্বন্ধে আমার সহিত বাদানুবাদ করিতে লাগিল। ইবরাহীম তো অবশ্যই সহনশীল, কোমল হৃদয়, সতত আল্লাহ অভিমুখী” (১১: ৭৪-৭৫)। তাঁহার এই বাদানুবাদের বিষয়টি কুরআন কারীমে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয় নাই, বরং বাইবেলে উহার উল্লেখ রহিয়াছে (আবদুল ওয়াহ্হাব নাজ্জার, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৯৫)। মুসলিম সীরাতবিদগণও উহার উল্লেখ করিয়াছেন। সাঈদ ইব্ন জুবায়র, সুদ্দী, কাতাদা ও মুহাম্মাদ ইব্ন ইসহাক প্রমুখ বর্ণনা করিয়াছেন যে, ফেরেশতাগণ বলিলেন যে, আমরা এই জনপদের জীবদ্বাসীদিগকে ধ্বংস করিব। ইবরাহীম (আ) বলিলেন, তোমরা কি এমন জনপদ ধ্বংস করিবে, যেখানে তিন শত মু'মিন রহিয়াছে? তাহারা বলিলেন, না। তিনি বলিলেন, যেখানে দুই শত মু'মিন রহিয়াছে? তাহারা বলিলেন, না। তিনি বলিলেন, চল্লিশজন মু'মিন থাকিলে? তাহারা বলিলেন, না। ইবরাহীম (আ) ধারণা করিয়াছিলেন যে, লূত (আ)-এর স্ত্রীসহ সেখানে চৌদ্দজন মু'মিন রহিয়াছে। তাই তাহাদের কথায় তিনি স্বস্তি লাভ করিলেন এবং চুপ হইয়া গেলেন। ইব্ন ইসহাক বলেন, এইভাবে বলিতে বলিতে বলিতে সর্বশেষ বলিলেন, সেখানে একজন মুমিন থাকিলে তোমাদের কি অভিমত? তাহারা বলিলেন, না, একজন মু'মিন থাকিলেও সেই জনপদ আমরা ধ্বংস করিব না। তারপর ইবরাহীম (আ) যখন ফেরেশতাদের নিকট হইতে লূত সম্প্রদায়ের সম্পর্কে অবহিত হইলেন যে, তাহাদিগকে মাটির ঢেলা নিক্ষেপ করিয়া বিলীন করিয়া দেওয়া হইবে (৫১ঃ ৩৩)। তখন লূত (আ)-এর প্রতি স্নেহভরে বলিলেন, إِنَّ فِيهَا لُوْطًا “এই জনপদে তো লূত রহিয়াছে” (২৯ঃ ৩২)। ফেরেশেতাগণ জবাবে বলিলেন, نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَنْ فِيْهَا لَنُنَجِّيَنَّهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ “সেথায় কাহারা আছে, তাহা আমরা ভালো জানি। আমরা তো লূতকে ও তাহার পরিজনবর্গকে রক্ষা করিবই, তাহার স্ত্রীকে ব্যতীত” (২৯ঃ ৩২)। অতঃপর আল্লাহ্র পক্ষ হইতে স্থির সিদ্ধান্ত ঘোষিত হইল : يَا إِبْرَاهِيمُ أَعْرِضْ عَنْ هَذَا إِنَّهُ قَدْ جَاءَ أَمْرُ رَبِّكَ وَإِنَّهُمْ آَتِيهِمْ عَذَابٌ غَيْرُ مَرْدُود. "হে ইবরাহীম! ইহা হইতে বিরত হও। তোমার প্রতিপালকের বিধান আসিয়া পড়িয়াছে; উহাদের প্রতি তো আসিবে এমন শাস্তি যাহা অনিবার্য" (১১:৭৬) (দ্র. ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া, ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১৭৮-১৭৯; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ১৫৩-১৫৪)।
📄 প্রথম পুত্র ইসমাঈল (আ)-এর জন্ম
আল-কুরআনে ইবরাহীম (আ)-এর প্রথম পুত্র ইসমাঈল (আ)-এর জন্মবৃত্তান্ত বিস্তারিতভাবে উল্লিখিত হয় নাই। বাইবেলের বর্ণনামতে ইবরাহীম (আ) আল্লাহ্র নিকট সুসন্তান প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তাঁহাকে উহার সুসংবাদ দেন। কুরআন কারীমেও ইহার উল্লেখ আছে। ইরশাদ হইয়াছে:
رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّلِحِينَ فَبَشِّرْنَهُ بِغُلَامٍ حَلِيمٍ (۳۷ : ۱۰۰-۱۰۱) "(ইবরাহীম বলিল,) হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এক সৎকর্মপরায়ণ সন্তান দান কর। অতঃপর আমি তাহাকে এক স্থিরবুদ্ধি পুত্রের সুসংবাদ দিলাম" (৩৭ঃ ১০০-১০১)।
পুত্র ইসমাঈল এই কথার সঙ্গে সঙ্গে নির্দ্বিধায় ও সোৎসাহে উত্তর দিলেন: قَالَ يَابَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللهُ مِنَ الصَّابِرِينَ (۳۷:۱۰۲) "সে বলিল, হে আমার পিতা! আপনি যাহা আদিষ্ট হইয়াছেন তাহাই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাইবেন" (৩৭ঃ ১০২)।
কোন কোন ইতিহাসবিদের বর্ণনামতে ইবরাহীম (আ) প্রথমেই যবাহের কথাটি প্রকাশ করেন নাই, বরং যবাহের স্থানে (মিনা) পৌঁছিয়া তাঁহাকে এই কথা জানান এবং ইসমাঈল (আ) তখন উক্ত উত্তর দেন। প্রথমে তাঁহাকে কাষ্ঠ সংগ্রহ করার কথা বলা হইয়াছিল (তাবারী, তারীখ, ১খ., ১৪০-১৪১)।
📄 হাজার ও ইসমাঈল (আ)-এর মক্কায় আবাসন
আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নারীরা ইসমাঈল (আ)-এর মাতার নিকট হইতে সর্বপ্রথম কোমরবন্ধের ব্যবহার রপ্ত করে। তিনি তাঁহার (সতীন) সারা (রা) হইতে স্বীয় চিহ্নাদি লুকাইবার জন্য একটি কোমরবন্ধ ধারণ করেন। অতঃপর ইবরাহীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইসমাঈলের মাতা ও তাহার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে (ইসমাঈল) লইয়া আসিলেন। তাহাদেরকে তিনি একটি প্রকাণ্ড বৃক্ষের নিচে, মসজিদের উচ্চ ভূমিতে যমযমের স্থানে রাখিলেন। সে সময় মক্কায় কোন জনবসতি কিংবা পানির ব্যবস্থা ছিল না। তিনি তাহাদেরকে সেখানে রাখিলেন। আর তাহাদের পাশে এক ঝুড়ি খেজুর ও এক মশক (চামড়ার তৈরি পানির পাত্র) পানি রাখিলেন। অতঃপর ইবরাহীম (আ) তথা হইতে রওয়ানা হইলেন। ইসমাঈলের মাতা তাঁহার পিছনে পিছনে যাইতেছিলেন এবং বলিতেছিলেন, হে ইবরাহীম! আপনি আমাদেরকে এই জনপ্রাণীহীন উপত্যকায় রাখিয়া কোথায় যাইতেছেন? এখানে তো বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিত পরিবেশ কিছুই নাই। তিনি তাঁহাকে এই কথা বারবার বলিতে থাকিলেন। কিন্তু ইবরাহীম (আ) তাহার কথায় ভ্রুক্ষেপ করিলেন না। তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, আল্লাহ কি আপনাকে ইহার নির্দেশ দিয়াছেন? ইবরাহীম (আ) বলিলেনঃ হাঁ। তখন ইসমাঈলের মাতা বলিলেন, তবে আল্লাহ আমাদেরকে ধ্বংস করিবেন না। অতঃপর তিনি স্বস্থানে ফিরিয়া আসিলেন। ইবরাহীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বিদায় হইলেন। তিনি তাহাদের দৃষ্টিসীমার বাহিরে 'সানিয়াহ্' নামক স্থানে পৌঁছিয়া কা'বা ঘরের দিকে মুখ ফিরাইলেন এবং দুই হাত তুলিয়া দু'আ করিলেনঃ "হে আমাদের প্রতিপালক! আমি পানি ও তরুলতাশূন্য উষর এক প্রান্তরে আমার সন্তানদের একটি অংশ তোমার মহাসম্মানিত ঘরের কাছে আনিয়া বসবাসের জন্য রাখিয়া গেলাম। .... অতএব তুমি লোকদের অন্তরকে তাহাদের প্রতি অনুরক্ত করিয়া দাও, ফলমূল হইতে তাহাদেরকে খাবার দান কর, যেন তাহারা কৃতজ্ঞ ও শোকরকারী বান্দাহ হইতে পারে" (১৪:৩৭)।
ইসমাঈলের মাতা ইসমাঈলকে বুকের দুধ পান করাইয়া লালন-পালন করিতে লাগিলেন। তিনি নিজে মশকের পানি পান করিতে থাকিলেন। পরিশেষে পাত্রের পানি শেষ হইয়া গেল, তিনি নিজে এবং তাঁহার সন্তান পিপাসাকাতর হইয়া পড়িলেন। তিনি দেখিলেন যে, তাঁহার দুগ্ধপোষ্য শিশু পিপাসায় ছটফট করিতেছে। তিনি তাহা সহ্য করিতে না পারিয়া উঠিয়া চলিয়া গেলেন। সেখানে সাফা পাহাড়কে তিনি তাঁহার সর্বাধিক নিকটে দেখিতে পাইলেন। তিনি সাফা পাহাড়ে উঠিয়া চারিদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিলেন। উপত্যকার দিকে এই আশায় তাকাইলেন যে, কাহারো দেখা পাওয়া যায় কি না, কিন্তু কাহারো দেখা পাইলেন না। অতএব তিনি সাফা পাহাড় হইতে নামিয়া আসিলেন এবং উপত্যকা পার হইয়া মারওয়া পাহাড়ের পাদদেশে পৌছিয়া তাহাতে আরোহণ করিলেন। পাহাড়ের উপর দাঁড়াইয়া তিনি এদিক-সেদিক তাকাইয়া দেখিলেন কাহাকেও দেখা যায় কি না, কিন্তু কোন লোকজন দেখিতে পাইলেন না। এমনিভাবে তিনি দুই পাহাড়ের মাঝখানে সাতবার দৌড়াইলেন। আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন : এই কারণেই লোকেরা (হজ্জের সময়) উভয় পাহাড়ের মধ্যে দৌড়াইয়া (সাঈ করিয়া) থাকে। ইসমাঈলের মা (শেষবারের মত) দৌড়াইয়া মারওয়া পাহড়ে উঠিলে একটি শব্দ শুনিতে পাইলেন। তিনি নিজেকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, কি ব্যাপার! আওয়াজ শুনিতে পাইলাম যেন। অতঃপর তিনি শব্দের প্রতি কান খাড়া করিলেন। তিনি আবার শব্দ শুনিতে পাইলেন এবং মনে মনে বলিলেন, তুমি আমাকে আওয়াজ শুনাইলে, হয়তো তোমার কাছে আমার বিপদের কোন প্রতিকার আছে। হঠাৎ তিনি (বর্তমান) যমযমের কাছে একজন ফেরেশতাকে দেখিতে পাইলেন। তিনি তাহার পায়ের গোড়ালি দিয়া মাটি খুঁড়িতেছিলেন এবং এইভাবে পানি ফুটিয়া বাহির হইল। তিনি ইহার চারিপাশে বাঁধ দিলেন এবং অঞ্জলি ভরিয়া মশকে পানি ভরিতে লাগিলেন। তিনি মশকে পানি ভরিতে ছিলেন, এদিকে পানি উথলিয়া পড়িতে থাকিল। অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি মশক ভরিয়া পানি রাখিলেন। ইব্ন আব্বাস (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলিয়াছেন : ইসমাঈলের মায়ের উপর আল্লাহ্র রহমত বর্ষিত হউক। যদি তিনি যমযমকে ঐ অবস্থায় রাখিয়া দিতেন, অথবা বলিয়াছেন : তাহা হইতে যদি মশক ভরিয়া তিনি পানি না রাখিতেন, তবে যমযম একটি প্রবহমান ঝর্ণায় পরিণত হইত। নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলিয়াছেন : তিনি পানি পান করিলেন এবং তাঁহার সন্তানকে দুধ পান করাইলেন। ফেরেশতা তাঁহাকে বলিলেন, আপনি ধ্বংস হইয়া যাওয়ার ভয় করিবেন না। কেননা এখানে আল্লাহর ঘরের স্থান নির্দিষ্ট আছে, যাহা এই ছেলে ও তাহার পিতা নির্মাণ করিবেন। আল্লাহ এখানকার বাসিন্দাদেরকে ধ্বংস করেন না। ঘটনাক্রমে বনী জুরহুমের কাফেলা অথবা বনী জুরহুম গোত্রের লোক এই পথ ধরিয়া 'কাদাআ' নামক স্থান দিয়া আসিতেছিল। তাহারা মক্কার নিম্নভূমিতে পৌঁছিলে সেখানে কিছু পাখি বৃত্তাকারে উড়িতে দেখিয়া বলিল, এসব পাখি নিশ্চয়ই পানির উপর চক্কর খাইতেছে। আমরা তো এই মরুভূমিতে আসিয়াছি অনেক দিন হইল, কিন্তু কোথাও পানি দেখি নাই। তাহারা একজন অথবা দুইজন অনুসন্ধানকারীকে খোঁজ নেওয়ার জন্য পাঠাইল। তাহারা গিয়া পানি দেখিতে পাইল এবং ফিরিয়া গিয়া তাহাদেরকে জানাইল। কাফেলার লোকেরা অনতিবিলম্বে পানির দিকে চলিয়া আসিল। ইসমাঈলের মাতা তখন পানির কাছে বসা ছিলেন। তাহারা আসিয়া তাহাকে বলিল, আপনি কি আমাদেরকে এখানে আসিয়া অবস্থান করার অনুমতি দিবেন? তিনি বলিলেন, হ্যাঁ, কিন্তু পানির উপর তোমাদের কোন মালিকানা স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হইবে না। তাহারা বলিল, হাঁ, তাহাই হইবে। আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলিয়াছেন : ইসমাঈলের মায়ের উদ্দেশ্য ছিল তাহাদের সহিত পরিচিত হইয়া একটা অন্তরংগ ও সহানুভূতিসম্পন্ন পরিবেশ গড়িয়া তোলা। ঐ সকল লোক অসিয়া এখানে বসতি স্থাপন করিল এবং কাফেলার অন্যান্য লোকও তাহাদের পরিবার-পরিজনদেরকে ডাকিয়া আনিল। অবশেষে সেখানে বেশ কয়েক ঘর বসতি গড়িয়া উঠিল। ইসমাঈল যৌবনে পদার্পণ করিলেন এবং তাহাদের নিকট হইতে আরবী ভাষা শিখিলেন। তাঁহার স্বাস্থ্য-চেহারা ও সুরুচিপূর্ণ জীবন তাহারা খুবই পছন্দ করিল। তিনি বড় হইলে ঐ লোকেরা তাহাদের এক কন্যার সহিত তাঁহার বিবাহ দিল। ইতিমধ্যে ইসমাঈলের মা ইন্তিকাল করিলেন। ইসমাঈলের বিবাহের পর ইবরাহীম (আ) মক্কায় আসিলেন নিজের রাখিয়া যাওয়া পরিজনের খোঁজে। তিনি ইসমাঈলকে বাড়িতে পাইলেন না। তিনি পুত্রবধূর কাছে জিজ্ঞাসা করিলেন, ইসমাঈল কোথায় গিয়াছে? সে বলিল, খাদ্যের সংস্থান করার জন্য তিনি বাহিরে গিয়াছেন। অন্য বর্ণনায় আছে : তিনি শিকারে বাহির হইয়াছেন। ইবরাহীম (আ) তাহাদের জীবনযাত্রা ও সাংসারিক বিষয়াদির খোঁজ নিলেন। পুত্রবধূ বলিল, আমরা খুব খারাপ অবস্থায় আছি। কঠোরতা ও সংকীর্ণতা আমাদেরকে গ্রাস করিয়াছে। এসব কথা বলিয়া সে অভিযোগ করিল। তিনি বলিলেন, তোমার স্বামী আসিলে তাহাকে আমার সালাম জানাইয়া বলিবে, সে যেন তাহার ঘরের দরজার চৌকাঠ পরিবর্তন করে। বাড়ী ফিরিয়া ইসমাঈল (আ) যেন কিছু অনুভব করিতে পারিলেন। তিনি স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, কেহ আসিয়াছিলেন নাকি? স্ত্রী বলিল, হাঁ! আমার কাছে একজন সুন্দর সুঠাম বৃদ্ধ লোক আসিয়াছিলেন। স্ত্রী বৃদ্ধের কিছু প্রশংসাও করিল। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, কিভাবে আমাদের জীবিকা ও ভরণপোষণ চলিতেছে? আমি বলিলাম, আমরা বেশ ভাল আছি। ইসমাঈল (আ) জিজ্ঞাসা করিলেন, তিনি কি তোমাকে কোন কথা বলিয়া গিয়াছেন? স্ত্রী বলিল, হাঁ! তিনি আপনাকে সালাম পৌঁছাইতে বলিয়াছেন এবং আপনাকে আপনার ঘরের চৌকাঠ পরিবর্তন করিতে বলিয়াছেন। ইসমাঈল (আ) বলিলেন, তিনি আমার পিতা। তিনি তোমাকে পরিত্যাগ করিতে আদেশ দিয়াছেন। সুতরাং তুমি তোমার পরিবার-পরিজনের কাছে চলিয়া যাও। পরে তিনি তাহাকে তালাক দিলেন এবং ঐ গোত্রেরই অন্য এক মেয়েকে বিবাহ করিলেন। আল্লাহর ইচ্ছামত ইবরাহীম (আ) বেশ কিছু দিন আর এদিকে আসেন নাই। পরে তিনি যখন আবার আসিলেন তখনও ইসমাঈলের সাথে তাঁহার দেখা হইল না। পুত্রবধূর কাছে গিয়া ইসমাঈলের কথা জিজ্ঞাসা করিলে সে বলিল, তিনি আমাদের খাদ্যের সন্ধানে গিয়াছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কেমন আছ? তিনি তাহাদের সাংসারিক জীবন ও অন্যান্য বিষয়েও জানিতে চাহিলেন। ইসমাঈলের স্ত্রী বলিল, আমরা খুব ভাল এবং স্বচ্ছল অবস্থায় দিন যাপন করিতেছি। এই কথা বলিয়া সে মহান আল্লাহ্ প্রশংসা করিল। ইবরাহীম (আ) জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কি খাও? পুত্রবধূ বলিল, গোস্ত। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, কি পান কর? সে বলিল, পানি। তখন ইবরাহীম (আ) দু'আ করিলেনঃ হে আল্লাহ! ইহাদের গোস্ত ও পানিতে বরকত দান করুন। নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলিয়াছেন: সেই সময় তাহাদের কাছে কোন খাদ্যশস্য ছিল না, যদি থাকিত তাহা হইলে ইবরাহীম (আ) তাহাদের খাদ্যশস্যেও বরকতের দু'আ করিতেন। এইজন্যই মক্কা ছাড়া অন্য কোথায়ও শুধু গোস্ত ও পানির উপর নির্ভর করিলে তাহা স্বাস্থ্যের জন্য অনুকূল হয় না। ইবরাহীম (আ) বলিলেন, তোমার স্বামী ফিরিয়া আসিলে তাহাকে আমার সালাম জানাইয়া বলিবে, সে যেন তাহার ঘরের চৌকাঠ হিফাজত করিয়া রাখে। ইসماঈল (আ) ফিরিয়া আসিয়া স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার কাছে কেহ কি আসিয়াছিল? স্ত্রী বলিল, হাঁ! আমার কাছে একজন সুন্দর সুঠাম বৃদ্ধ লোক আসিয়াছিলেন। স্ত্রী বৃদ্ধের কিছু প্রশংসাও করিল। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, কিভাবে আমাদের জীবিকা ও ভরণপোষণ চলিতেছে? আমি বলিলাম, আমরা বেশ ভাল আছি। ইসমাঈল (আ) জিজ্ঞাসা করিলেন, তিনি কি তোমাকে কোন কথা বলিয়া গিয়াছেন? স্ত্রী বলিল, হাঁ! তিনি আপনাকে সালাম পৌঁছাইতে বলিয়াছেন এবং আপনাকে আপনার ঘরের চৌকাঠ পরিবর্তন করিতে বলিয়াছেন। ইসমাঈল (আ) বলিলেন, তিনি আমার পিতা এবং তুমি ঘরের চৌকাঠ। তিনি আমাকে তোমার সহিত বৈবাহিক সম্পর্ক সুদৃঢ় রাখার নির্দেশ দিয়া গিয়াছেন। ইবরাহীম (আ) আল্লাহ্র ইচ্ছায় বেশ কিছু দিন পর্যন্ত আর এখানে আসেন নাই। একদিন ইসমাঈল (আ) যমযম কূপের পাশে একটি প্রকাণ্ড বৃক্ষের নিচে বসিয়া তাঁহার তীর ঠিক করিতেছিলেন। এমন সময় ইবরাহীম (আ) আসিলেন। ইসমাঈল (আ) পিতাকে দেখিয়া উঠিয়া আগাইয়া গেলেন। অতঃপর যেভাবে পিতা পুত্রের সঙ্গে এবং পুত্র পিতার সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করিয়া থাকে, তাঁহারাও তাহাই করিলেন। তিনি বলিলেন, হে ইসমাঈল! আল্লাহ্ আমাকে একটি কাজের নির্দেশ দিয়াছেন। ইসমাঈল (আ) বলিলেন, আপনার প্রভু আপনাকে যে কাজের নির্দেশ দিয়াছেন তাহা আঞ্জাম দিন। তিনি বলিলেন, তুমি এই কাজে আমাকে সাহায্য কর। পুত্র বলিলেন, আমি আপনাকে অবশ্যই সাহায্য করিব। ইবরাহীম (আ) বলিলেন, আল্লাহ আমাকে এখানে একখানা ঘর নির্মাণ করার নির্দেশ দিয়াছেন। এই কথা বলিয়া তিনি একটি উঁচু টিলার দিকে ইশারা করিয়া বলিলেন, ইহার চারিদিকে ঘর নির্মাণ করিতে হইবে। অতঃপর তাঁহারা এই ঘরের ভিত্তি স্থাপন করিলেন। ইসমাঈল (আ) পাথর বহিয়া আনিতেন, আর ইবরাহীম (আ) তাহা দ্বারা ভিত গাঁথিতেন। চতুর্দিকের দেয়াল অনেকটা উঁচু হইয়া গেলে ইবরাহীম (আ) এই পাথরটি আনিয়া (মাকামে ইবরাহীম) উহার উপর দাঁড়াইয়া ভিত গাঁথিতে থাকিলেন এবং ইসমাঈল (আ) পাথর আনিয়া যোগান দিতে থাকিলেন। পিতা-পুত্র উভয়ে ঘর নির্মাণকালে প্রার্থনা করিতে থাকিলেন: “হে আমাদের প্রভু! আমাদের এই প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম কবুল করুন। আপনি সব কিছু শুনেন এবং জানেন" (২ঃ ১২৭)। রাবী বলেন, তাঁহারা নির্মাণ কাজ করিতে থাকিলেন। তাঁহারা উভয়ে কা'বা ঘরের চারিদিকে প্রদক্ষিণ করিতেছিলেন এবং বলিতেছিলেনঃ "হে আমাদের প্রভু! আমাদের এই প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম কবুল করুন; নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা” (বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া, ১খ, পৃ. ৪৭৪-৬)। বুখারীর অপর বর্ণনায়ও প্রায় অনুরূপ বর্ণিত হইয়াছে। হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বলেনঃ
لَمَّا كَانَ بَيْنَ إِبْرَاهِيمَ وَبَيْنَ أَهْلِهِ مَا كَانَ خَرَجَ بِإِسْمَاعِيلَ وَأُمَّ إِسْمَاعِيلَ مَعَهُمْ شَنَّةٌ فِيْهَا مَاءً فَجَعَلَتْ أُمُّ إِسْمَاعِيلَ تَشْرَبُ مِنَ السُّنَّةِ فَيَدِرُّ لَبَنُهَا عَلَى صَبِيهَا حَتَّى قَدِمَ مَكَّةَ فَوَضَعَهَا تَحْتَ دَوْحَةٍ ثُمَّ رَجَعَ إِبْرَاهِيمُ إلى أَهْلِهِ فَاتَّبَعَتْهُ أُمُّ إِسْمَاعِيلَ حَتَّى لَمَّا بَلَغُوا كَذَاءَ نَادَتْهُ مِنْ وَرَائِهِ يَا إِبْرَاهِيمُ إِلَى مَنْ تَتْرُكْنَا قَالَ إِلَى اللَّهِ قَالَتْ رَضِيْتُ بِاللَّهِ فَرَجَعَتْ وَجَعَلَتْ تَشْرَبُ مِنَ السُّنَّةِ وَيَدِرُّ لَبَنُهَا عَلَى صَبِيهَا حَتَّى لَمَّا فَنَى الْمَاءُ قَالَتْ لَوْ ذَهَبْتُ فَنَظَرْتُ لَعَلَى أُحِسُّ أَحَداً قَالَ فَذَهَبَتْ فَصَعِدَتِ الصَّفَا فَنَظَرَتْ وَنَظَرَتْ هَلْ تُحِسُّ أَحَدًا فَلَمْ تُحِسُّ أَحَداً فَلَمَّا بَلَغَتِ الْوَادِي سَعَتْ وَآتَتِ الْمَرْوَةَ وَفَعَلَتْ ذَلِكَ أَشْوَاطًا ثُمَّ قَالَتْ لَوْ ذَهَبْتُ فَنَظَرْتُ مَا فَعَلَ الصَّبِيُّ فَذَهَبَتْ وَنَظَرَتْ فَإِذَا هُوَ عَلَى حَالِهِ كَأَنَّهُ يَنْشَعُ لِلْمَوْتِ فَلَمْ تُقِرُّهَا نَفْسُهَا فَقَالَتْ لَوْ ذَهَبْتُ فَنَظَرْتُ لَعَلَى أُحِسَ احدا فَذَهَبَتْ فَصَعِدَتِ الصَّفَا فَنَظَرَتْ وَنَظَرَتْ فَلَمْ تُحِسُّ أَحَداً حَتَّى أَتِمُتْ سَبْعًا ثُمَّ قَالَتْ لَوْ ذَهَبْتُ فَنَظَرْتُ مَا فَعَلَ فَإِذَا هِيَ بِصَوْتٍ فَقَالَتْ أَغِتْ إِنْ كَانَ عِنْدَكَ خَيْرٌ فَإِذَا جِبْرِيلُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ بِعَقِبِهِ لهكذا وَغَمَزَ بِعَقِبِهِ عَلَى الْأَرْضِ قَالَ فَانْبَثَقَ الْمَاءُ فَدَهَشَتْ أُمُّ اسْمَعِيلَ فَجَعَلَتْ تَخْفِرُ قَالَ فَقَالَ أَبُو الْقَاسِمِ صلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَوْ تَرَكَتْهُ كَانَ الْمَاءُ ظَاهِراً قَالَ فَجَعَلَتْ تَشْرَبُ مِنَ السُّنَّةِ وَيَدِرُّ لَبَنُهَا عَلَى صَبِيهَا قَالَ فَمَرَّ نَاسٌ مِنْ جُرْهُم بِبَطْنِ الْوَادِي فَإِذَاهُمْ بِطَيْرِ كَأَنَّهُمْ أَنْكَرُوا ذَلِكَ وَقَالُوا مَا يَكُونُ الطَّيْرُ إِلَّا عَلَى مَاء لَعَهِدْنَا بِهُذَا الْوَادِي وَمَا فِيْهِ مَاءً فَأَرْسَلُوا جَرِيًّا أَوْ جَرِييْنِ فَإِذَا هُمْ بِالْمَاءِ فَفَرَجَعُوا فَأَخْبَرُوهُمْ بِالْمَاءِ فَأَقْبَلُوا قَالَ وَأَمُّ إِسْمَاعِيلَ عِنْدَ الْمَاءِ فَقَالُوْ أَتَأْذَنِينَ لَنَا أَنْ نَنْزِلَ عِنْدِكِ قَالَتْ نَعَمْ وَلَكِنْ حَقٌّ لَكُمْ فِي الْمَاءِ قَالُوا نَعَمْ . قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَالْفَى ذَلِكَ أَمَّ اسْمَاعِيلَ وَهِيَ تُحِبُّ الْأَنْسَ فَنَزَلُوا فَأَرْسَلُوا إِلى أَهْلِيْهِمْ فَنَزَلُوا مَعَهُمْ حَتَّى إِذَا كَانُوا بِهَا أَهْلُ أَبْيَاتٍ مِنْهُمْ وَشَبُّ الْغُلَامُ وَتَعَلَّمَ الْعَرَبِيَّةَ مِنْهُمْ وَأَنْفُسَهُمْ وَأَعْجَبَهُمْ حِيْنَ شَبٌ فَلَمَّا أَدْرَكَ زَوَّجُوهُ امْرَأَةً مِنْهُمْ وَمَاتَتْ أُمُّ إِسْمَاعِيلَ فَجَاءَ إِبْرَاهِيمُ بَعْدَ مَا تَزَوَّجَ اسْمَاعِيلُ يُطَالِعُ تَرِكَتَهُ فَلَمْ يَجِدْ إِسْمَاعِيلَ فَسَأَلَ امْرَأَتَهُ عَنْهُ فَقَالَتْ خَرَجَ يَبْتَغِي لَنَا وَفِي رِوَايَةٍ يَصِيدُ لَنَا ثُمَّ سَأَلَهَا عَنْ عَيْشِهِمْ وَهَيْئَتِهِمْ فَقَالَتْ نَحْنُ بَشَرٍ نَحْنُ فِي ضَيْقٍ وَشِدَّةٍ فَشَكَتْ إِلَيْهِ قَالَ فَإِذَا جَاءَ زَوْجُكِ فَأَقْرِى عَلَيْهِ السَّلَامَ وَقَوْلِى لَهُ يُغَيِّرُ عَتَبَةً بِابِهِ فَلَمَّا جَاءَ إِسْمَاعِيلُ كَأَنَّهُ أَنَسَ شَيْئًا فَقَالَ هَلْ جَاءَكُمْ مِنْ أَحَدٍ قَالَتْ نَعَمْ جَاءَنَا شَيْخٌ كَذَا وَكَذَا فَسَأَلَنَا عَنْكَ فَأَخْبَرْتُهُ فَسَأَلَنِي كَيْفَ عَيْشُنَا فَأَخْبَرْتُهُ أَنَّا فِي جَهْدٍ وَشِدَّةٍ قَالَ فَهَلْ أَوْصَاكِ بِشَيْءٍ قَالَتْ نَعَمْ أَمَرَنِي أَنْ أَقْرَأَ عَلَيْكَ السَّلَامَ وَيَقُولُ غَيْرُ عَتَبَةَ بَابِكَ قَالَ ذَاكَ أَبِي وَقَدْ أَمَرَنِي أَنْ أَفَارِقَكِ الْحَقِي بِأَهْلِكِ فَطَلَّقَهَا وَتَزَوَّجَ مِنْهُمْ أُخْرَى فَلَبِثَ عَنْهُمْ إِبْرَاهِيمُ مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ آتَاهُمْ بَعْدُ فَلَمْ يَجِدُهُ فَدَخَلَ عَلَى امْرَأَتِهِ فَسَأَلَ عَنْهُ قَالَتْ خَرَجَ يَبْتَغِي لَنَا قَالَ كَيْفَ أَنْتُمْ وَسَأَلَهَا عَنْ عَيْشِهِمْ وَهَيْئَتِهِمْ فَقَالَتْ نَحْنُ بِخَيْرٍ وَسَعَةٍ وَاثْنَتْ عَلَى اللهِ فَقَالَ مَا طَعَامُكُمْ قَالَتِ اللَّحْمُ قَالَ فَمَا شَرَابُكُمْ قَالَتِ الْمَاءُ قَالَ اللَّهُمَّ بَارِكْ لَهُمْ فِي اللَّحْمِ وَالْمَاء قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَمْ يَكُنْ لَهُمْ يَوْمَئِذٍ حَبُّ وَلَوْ كَانَ لَهُمْ دَعَا لَهُمْ فِيهِ قَالَ فَهُمَا لَا يَخْلُوْ عَلَيْهِمَا أَحَدٌ بِغَيْرِ مَكَّةَ إِلَّا لَمْ يُوَافِقَاهُ قَالَ فَإِذَا جَاءَ زَوْجُكَ فَأَقْرَنِي عَلَيْهِ السَّلَامَ وَمُرِيهِ يُثَبِّتُ عَتَبَةَ بَابِهِ فَلَمَّا جَاءَ إِسْمَاعِيلُ قَالَ هَلْ أَتَاكُمْ مِنْ أَحَدٍ قَالَتْ نَعَمْ أَتَانَا شَيْخٌ حَسَنُ الْهَيْئَةِ وَاثْنَتْ عَلَيْهِ فَسَأَلَنِي عَنْكَ فَأَخْبَرْتُهُ فَسَأَلَنِي كَيْفَ عَيْشُنَا فَأَخْبَرْتُهُ أَنَّا بِخَيْرٍ قَالَ فَأَوْصَاكِ بِشَيْءٍ قَالَتْ نَعَمْ يَقْرَأُ عَلَيْكَ السَّلامَ وَيَأْمُرُكَ أَنْ تُثَبِّتَ عَتَبَةَ بَابِكَ قَالَ ذَاكَ أَبِي وَأَنْتَ الْعَتَبَةُ أَمَرَنِي أَنْ أَمْسِكَكَ ثُمَّ لَبِثَ عَنْهُمْ مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ جَاءَ بَعْدَ ذَلِكَ وَاسْمَاعِيلُ يَبْرِئُ نَبْلًا لَهُ تَحْتَ دَوْحَةٍ قَرِيبًا مِنْ زَمْزَمَ فَلَمَّا رَاهُ قَامَ إِلَيْهِ فَصَنَعَ كَمَا يَصْنَعُ الْوَالِدُ بِالْوَلَدِ وَالْوَلَدُ بِالْوَالِدِ ثُمَّ قَالَ يَا إِسْمَاعِيلُ إِنَّ اللَّهَ أَمَرَنِي بِأَمْرٍ قَالَ فَاصْنَعْ مَا أَمَرَكَ رَبُّكَ قَالَ وَتُعِينُنِي قَالَ وَأُعِينُكَ قَالَ فَإِنَّ اللَّهَ أَمَرَنِي أَنْ أَبْنِي بَيْتًا هُهُنَا وَأَشَارَ إلى أَكْمَةٍ مُرْتَفِعَةٍ عَلَى مَا حَولَهَا قَالَ فَعِنْدَ ذَلِكَ رَفَعَ القَوَاعِدَ مِنَ البَيْتِ فَجَعَلَ إِسْمَاعِيلُ يَأْتِي بِالْحِجَارَةِ وَإِبْرَاهِيمُ يَبْنِي حَتَّى إِذَا ارْتَفَعَ الْبِنَاءُ جَاءَ بِهَذَا الحَجَرِ فَوَضَعَهُ لَهُ فَقَامَ عَلَيْهِ وَهُوَ يَبْنِي وَإِسْمَاعِيلُ يُنَاوِلُهُ الْحِجَارَةَ وَهُمَا يَقُولَانِ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ قَالَ فَجَعَلَا يَبْنِيَانِ حَتَّى يَدُورًا حَوْلَ الْبَيْتِ وَهُمَا يَقُولَانِ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ العليم।
টিকাঃ
(১৪:৩৭)
📄 স্বীয় পুত্রকে যবেহ করার নির্দেশ
পূর্বে বর্ণিত হইয়াছে যে, ইবরাহীম (আ) যখন তাঁহার কওমের নিকট হইতে হিজরত করেন তখন আল্লাহ্র নিকট তিনি একজন নেককার সন্তান প্রার্থনা করিয়াছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁহাকে একজন স্থিরবুদ্ধি পুত্রের সুসংবাদ দেন। আর সেই 'স্থিরবুদ্ধি' পুত্র হইলেন ইসমাঈল (আ), যিনি ইবরাহীম (আ)-এর ৮৬ বৎসর বয়সকালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনিই তাঁহার প্রথম সন্তান। আর ইসহাক (আ)-এর জন্মের সময় ইবরাহীম (আ)-এর বয়স ছির ৯৯ বৎসর (ইব্ন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ৪খ, ১৪)। ইহাতে কাহারও কোন দ্বিমত নাই। অতঃপর ইসমাঈল (আ) যখন বয়ঃপ্রাপ্ত হইলেন, ইবন আব্বাস (রা)-এর বর্ণনামতে পিতার ন্যায় নিজের কাজসমূহ নিজেই আঞ্জাম দিতে সক্ষম হইলেন, তখন ইবরাহীম (আ)-কে স্বপ্নে দেখানো হইল ইসমাঈলকে যবাহ করিতে। হাদীছে বর্ণিত আছে, নবীগণের স্বপ্নও ওহীর অন্তর্ভুক্ত (ইবন কাছীর, আল-বিদায়া, ১খ, ১৫৭)।
কাহারও মতে ইসমাঈল (আ)-এর বয়স হইয়াছিল তখন ১৩ বৎসর, আর কাহারও মতে ৭ বৎসর (ছানাউল্লাহ পানীপতি, আত-তাফসীরুল মাযহারী, ৮খ, ১২৮; ইমাদ যুহায়র হাফিজ, আল কাসাসুল-কুরআনী, পৃ. ১০৫)। ইহা ছিল ইবরাহীম (আ)-এর জন্য কঠিন এক পরীক্ষা। বার্ধক্যে প্রাপ্ত অতি কামনার ধন স্নেহ ও আদরের দুলালকে একবার তো জনমানবহীন মরু প্রান্তরে নির্বাসন দিতে হইয়াছে। তাহাতেও সান্তনা ছিল যে, মাঝেমধ্যে তাঁহাকে দেখিয়া যাইতে পারিতেন। কিন্তু এইবার যে একেবারে যবাহ্ করার নির্দেশ, তাহাও আবার স্বহস্তে। আর কোন দিন সেই মুখ আর দেখা যাইবে না। কিন্তু এই পরীক্ষায়ও তিনি সফলতার সহিত উত্তীর্ণ হন। সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ পালনের জন্য তিনি প্রস্তুত হইয়া গেলেন এবং স্বীয় পুত্রের নিকট বিষয়টি উপস্থাপন করিলেন যাহাতে প্রফুল্ল চিত্তে সে রাজী হইয়া যায় এবং জোর-জবরদস্তি করিয়া যবাহ্ করিতে না হয়। ইহার বিবরণ কুরআন কারীমে এইভাবে প্রদত্ত হইয়াছে:
فَبَشِّرْنَهُ بِغُلَامٍ حَلِيمٍ. فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعَى قَالَ يُبْنَى إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَى . (۳۷:۱۰۱-۱۰۲) "অতঃপর আমি তাহাকে (ইবরাহীমকে) এক স্থিরবুদ্ধি পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। অতঃপর সে যখন তাহার পিতার সঙ্গে কাজ করিবার মত বয়সে উপনীত হইল তখন ইবরাহীম বলিল, বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, আমি তোমাকে যবাহ্ করিতেছি, এখন তোমার অভিমত কি বল” (৩৭ঃ ১০১-১০২)।
পুত্র ইসমাঈল এই কথার সঙ্গে সঙ্গে নির্দ্বিধায় ও সোৎসাহে উত্তর দিলেন: قَالَ يَابَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللهُ مِنَ الصَّابِرِينَ (۳۷:۱۰۲) "সে বলিল, হে আমার পিতা! আপনি যাহা আদিষ্ট হইয়াছেন তাহাই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাইবেন" (৩৭ঃ ১০২)।
কোন কোন ইতিহাসবিদের বর্ণনামতে ইবরাহীম (আ) প্রথমেই যবাহের কথাটি প্রকাশ করেন নাই, বরং যবাহের স্থানে (মিনা) পৌঁছিয়া তাঁহাকে এই কথা জানান এবং ইসমাঈল (আ) তখন উক্ত উত্তর দেন। প্রথমে তাঁহাকে কাষ্ঠ সংগ্রহ করার কথা বলা হইয়াছিল (তাবারী, তারীখ, ১খ., ১৪০-১৪১)।
কোন কোন রিওয়ায়াত হইতে জানা যায় যে, ইবরাহীম (আ) যাহাতে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হইতে পারেন সেইজন্য শয়তান আপ্রাণ চেষ্টা করে। আবূ হুরায়রা (রা) কা'ব আল-আহবার (রা) হইতে রিওয়ায়াত করেন যে, এই সময় অর্থাৎ তাঁহারা রওয়ানা হইলে শয়তান একজন মানুষের আকৃতি ধারণ করিয়া ইসমাঈলের মাতার নিকট গিয়া বলে, তুমি কি জান ইবরাহীম তোমার পুত্রকে কোথায় লইয়া যাইতেছে? তিনি বলিলেন, তাহাকে ঐ ঘাটিতে কাষ্ঠ সংগ্রহের জন্য লইয়া যাইতেছে। সে বলিল, না, আল্লাহর কসম! তাহাকে যবাহ করিতে লইয়া যাইতেছে। তিনি বলিলেন, কখনও না। সে তাহার প্রতি আমার চাইতে বেশি দয়াশীল এবং বেশি মহব্বত করে। শয়তান বলিল, সে নাকি মনে করে যে, আল্লাহ তাহাকে উহা করিতে নির্দেশ দিয়াছেন। তিনি বলিলেন, আল্লাহ যদি তাঁহাকে সে আদেশ দিয়াই থাকেন তবে তাঁহার প্রতিপালকের আনুগত্য করাতে এবং তাঁহার আদেশ শিরোধার্য করিয়া ভালই করিয়াছেন। শয়তান এখানে বিফল হইয়া দ্রুত তাঁহার পুত্রের নিকট চলিয়া গেল। অতঃপর তাঁহাকে পিতার পেছনে চলিতে দেখিল। সে নিকটে গিয়া বলিল, হে বালক! তুমি কি জান, তোমার পিতা তোমাকে কোথায় লইয়া যাইতেছে? ইসমাঈল (আ) বলিলেন, ঐ ঘাটি হইতে আমরা আমাদের পরিবারের জন্য কাষ্ঠ সংগ্রহ করিব। সে বলিল, আল্লাহর কসম! সে তোমাকে যবাহ করিতে লইয়া যাইতেছে। তিনি বলিলেন, কেন? শয়তান বলিল, সে মনে করে যে, আল্লাহ তাহাকে ঐরূপ নির্দেশ দিয়াছেন। তিনি বলিলেন, তবে তিনি যে বিষয়ে নির্দেশিত হইয়াছেন তাহা পালন করুন। আমি আল্লাহর নির্দেশ শুনিব ও মান্য করিব। এখানেই বিফল হইয়া শয়তান ইবরাহীম (আ)-এর নিকট গিয়া বলিল, শায়খ! কোথায় যাইতেছ? ইবরাহীম (আ) বলিলেন, ঐ ঘাটিতে আমার প্রয়োজনে যাইতেছি। সে বলিল, আল্লাহ্র কসম! আমি শয়তানকে দেখিয়াছি সে তোমার নিকট আসিয়া তোমার পুত্রকে যবাহ করিতে নির্দেশ দিয়াছে। ইবরাহীম (আ) তাহাকে চিনিতে পারিলেন। তিরস্কার করিয়া বলিলেন, আমার নিকট হইতে দূর হ, হে অভিশপ্ত! আল্লাহ্ কসম! আমি আমার প্রতিপালকের হুকুম তামীল করিবই। অতঃপর শয়তান ব্যর্থ হইয়া রাগান্বিত অবস্থায় ফিরিয়া আসিল, তাঁহাদের কোন অনিষ্ট করিতে পারিল না। আল্লাহ্ মদদ ও সাহায্যে তাঁহারা শয়তান হইতে নিরাপদ রহিলেন (আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ১৪০-১৪১; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ১০১)।
ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, ইবরাহীম (আ)-কে যখন এই আদেশ দেওয়া হইল তখন আল মাশ'আরুল-হারামে ইবলীস তাঁহার নিকট পৌঁছে। তিনি দ্রুত তাহাকে পিছনে ফেলিয়া সম্মুখে চলিয়া যান। তিনি আল-জামরাতুল আকাবার নিকট গেলে ইবলীস তাঁহার নিকট হাজির হয়। তিনি ইবলীসকে ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপ করিলে সে চলিয়া যায়। জামরাতুল উসতার নিকট আবার সে ইবরাহীম (আ)-এর নিকট হাজির হয়। ইবরাহীম (আ) এখানেও তাহাকে ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন, ফলে সে চলিয়া যায়। অতঃপর আবার সে আল-জামরাতুল-কুবরায় তাঁহার নিকট আগমন করে। এবারও তিনি তাহার প্রতি সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। ফলে সে চলিয়া যায় এবং ইবরাহীম (আ) আল্লাহ্র নির্দেশ পালন করেন (আছ-ছা'লাবী, প্রাগুক্ত)।
অতঃপর পর্বত ঘাটিতে যবাহ-এর জন্য পিতাপুত্র উভয়েই সন্তুষ্ট চিত্তে প্রস্তুত হইলেন এবং ইসমাঈলকে কাত করিয়া, আর কাহারো মতে উপুড় করিয়া শোয়াইলেন। ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, তাঁহাকে কাত করিয়া শোয়াইয়া কাঁধের দিক হইতে যবাহ করিতে উদ্যত হন এইজন্য যাহাতে যবাহ-এর সময় তাহার মুখের দিকে দৃষ্টি না পড়ে। কাহারও মতে অন্যান্য প্রাণী যবাহ্-এর ন্যায় চীৎ করিয়াই শোয়াইয়াছিলেন কিন্তু মাথাটি ঘুরাইয়া কাত করিয়া দিয়াছিলেন। ইবন ইসহাকের বর্ণনামতে ইসমাঈল (আ) পিতাকে বলিয়াছিলেন, হে পিতা! আমাকে যবাহ্ করার সময় শক্ত করিয়া বাঁধিবেন যাহাতে আমার হইতে আপনার শরীরে কিছু না লাগে। তাহা হইলে আমার ছওয়াব ও পুরস্কার কম হইয়া যাইবে। কারণ মৃত্যু খুবই কঠিন। আমি ছট্ফট্ করিতে পারি। আর আপনার ছুরি ভালমত ধারালো করুন যাহাতে উহা ভালোমত চালাইয়া আমার কষ্ট লাঘব করিতে পারেন। আর আমাকে কাত করিয়া শায়িত করাইবেন এবং আমার মুখমণ্ডল নীচের দিকে রাখিবেন, পার্শ্বদেশে শয়ন করাইবেন না। কারণ আমার আশঙ্কা হয় যে, আমার মুখমণ্ডলে আপনার দৃষ্টি পড়িলে আপনার অন্তর বিগলিত হইয়া যাইবে, ফলে উহা আল্লাহ্র নির্দেশ পালনে অন্তরায় হইয়া দাঁড়াইবে। আর আপনি যদি ভাল মনে করেন যে, আমার জামাটি আমার মাতার নিকট ফেরৎ দিলে ইহা তাঁহার জন্য সান্ত্বনাস্বরূপ হইবে তাহা হইলে দিবেন। তখন ইবরাহীম (আ) তাঁহাকে বলিলেন, বৎস! আল্লাহ্ নির্দেশ পালনে তুমি কতইনা ভাল সাহায্যকারী! অতঃপর ইসমাঈল (আ) যেভাবে বলিয়াছিলেন সেইভাবেই তিনি তাঁহাকে শক্ত করিয়া বাঁধিলেন, ছুরি ধারালো করিলেন। অতঃপর কাত করিয়া শয়ন করাইলেন এবং তাঁহার মুখমণ্ডল হইতে দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরাইয়া রাখিলেন। অতঃপর আল্লাহ্র নাম লইলেন এবং তিনি 'আল্লাহু আকবার' বলিয়া তাঁহার কন্ঠদেশে ছুরি চালনা করিলেন। ইসমাঈলও তাশাহ্হুদ )أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلى اللَّهُ وَحْدَهُ(( পড়িয়া মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হইয়াছিলেন, কিন্তু আল্লাহ তাঁহার হাতের মধ্যেই ছুরি উল্টাইয়া দিয়াছিলেন। ইবরাহীম (আ) যথাসাধ্য চেষ্টা করিলেন, কিন্তু আল্লাহর নির্দেশে ছুরি একটুও কাটিল না। এক বর্ণনামতে ছুরি ও গলার মধ্যখানে আল্লাহ ধুম্রজালের একটি আবরণ সৃষ্টি করিয়া দিয়াছিলেন। অতঃপর আল্লাহ্র পক্ষ হইতে ঘোষণা আসিল, যাহা কুরআন কারীমে এইভাবে উল্লিখিত হইয়াছে:
وَنَادَيْنَهُ أَنْ يَابْرَاهِيمُ قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلُوا الْمُبِينُ. (١٠٦-٣٧:١٠٤)
"তখন আমি তাহাকে আহবান করিয়া বলিলাম, হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যই পালন করিলে! এইভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদিগকে পুরস্কৃত করিয়া থাকি। নিশ্চয়ই ইহা ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা" (৩৭: ১০৪-১০৬)।
অতঃপর আল্লাহ তাআলা বিরাট এক দুম্বা প্রেরণ করিয়া তাহাই যবাহ্ করার নির্দেশ দিলেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে: )۳۷:۱۰۷( وَقَدَيْنَهُ بذبح عظیم" আমি তাহাকে মুক্ত করিলাম বিরাট এক কুরবানীর বিনিময়ে" (৩৭: ১০৭)।
জমহূর আলিমদের মতে উহা ছিল সাদা রংয়ের, ডাগর কালো চোখ ও জোড়া ভ্রবিশিষ্ট একটি দুম্বা, যাহা ইবরাহীম (আ) একটি পেরেক দ্বারা ছাবীর পর্বতের পাদদেশে বাঁধা অবস্থায় পাইয়াছিলেন (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১খ, ১৫৮)। ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, তাঁহার নিকট অবতরণ করানো হয় একটি ডাগর কালো চোখ, জোড়া ভ্রবিশিষ্ট দুম্বা যাহা ডাকিতেছিল। ইহা ছিল সেই দুম্বা, যাহা আদম (আ)-এর পুত্র হাবীল কুরবানী হিসাবে পেশ করিয়াছিলেন এবং তাহা কবুল হইয়াছিল। ছাওরী (র) ইব্ন আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, দুম্বাটি জান্নাতে চল্লিশ (মতান্তরে ৭০) বৎসর যাবত চরিয়া বেড়াইয়াছিল। অতঃপর ছাবীর পর্বতে উহা অবতরণ করানো হয় (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ১০০)।
মুজাহিদের বর্ণনামতে তিনি উহা মিনায় যবাহ করেন। উবায়দ ইবন উমায়রের বর্ণনামতে মাকামে ইবরাহীমে। উক্ত দুম্বার শিং মাকামে ইবরাহীমে লটকানো ছিল বলিয়া জানা যায়। ইমাম আহমাদ (র) সাফিয়্যা বিনত শায়বা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) মক্কা বিজয়ের পর কা'বা শরীফের তত্ত্বাবধায়ক ও চাবিরক্ষক উছমান ইবন তালহা (রা)-কে ডাকিয়া বলিয়াছিলেন, আমি যখন বায়তুল্লাহ শরীফে প্রবেশ করিয়াছিলাম তখন উহাতে দুইটি শিং দেখিয়াছিলাম। কিন্তু তোমাকে উহা ঢাকিয়া দেওয়ার নির্দেশ দিতে ভুলিয়া গিয়াছিলাম। তাই এখন উহা ঢাকিয়া দাও। কারণ বায়তুল্লাহতে এমন কিছু থাকা সমীচীন নহে যাহা মুসল্লীর সালাতে বিঘ্ন ঘটায়। সুফইয়ান (র) বলেন, দুম্বার দুইটি শিং সর্বদাই বায়তুল্লাহ-এ লটকানো ছিল। অতঃপর বায়তুল্লাহ-এ আগুন লাগিলে উহাও পুড়িয়া যায়। ইহাতে প্রমাণিত হয় যে, ইসমাঈল (আ) যবীহ ছিলেন. ইসহাক (আ) নহে। কারণ তিনি বাল্যকালে কখনও মক্কায় আসেন নাই (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১খ, ১৫৮)। ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, উক্ত দুম্বার খুলি সর্বদাই মীযাব- এর নিকট লটকানো ছিল (প্রাগুক্ত)।
কুরবানীর যে ঘটনা বিবৃত হইয়াছে তাহাতে নামোল্লেখ করিয়া বলা হয় নাই যে, হযরত ইবরাহীম (আ) তাঁহার পুত্রদ্বয়ের মধ্যে ইসমাঈল (আ)-কে কুরবানী করিয়াছেন, না ইসহাক (আ)-কে। এই বিষয়ে হাদীছের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাবলীতেও সহীহ সনদসূত্রে রাসূলুল্লাহ (স)-এর কোন বক্তব্যও বিদ্যমান নাই। ইয়াহুদী-খৃস্টান সম্প্রদায় দাবি করে যে, হযরত ইসহাক (আ)-কে কুরবানী করা হইয়াছিল, ইসমাঈল (আ)-কে নয়। এই বিষয়ে বাইবেলের বক্তব্য নিম্নরূপঃ "এই সকল ঘটনার পরে সদাপ্রভু ইবরাহীমের পরীক্ষা করিলেন। তিনি তাঁহাকে বলিলেন, হে ইবরাহীম! তুমি আপন পুত্রকে, তোমার অদ্বিতীয় পুত্রকে, যাহাকে তুমি ভালোবাস, সেই ইসহাককে লইয়া মোরিয়া দেশে যাও এবং তথাকার যে এক পর্বতের কথা আমি তোমাকে বলিব, তাহার উপর তাহাকে হোমার্থে যবেহ কর। পরে ইবরাহীম প্রত্যুষে উঠিয়া গর্দভ সাজাইয়া দুইজন দাস ও আপন পুত্র ইসহাককে সঙ্গে লইলেন, হোমের নিমিত্ত কাষ্ঠ কাটিলেন, আর উঠিয়া সদাপ্রভুর নির্দিষ্ট স্থানের দিকে গমন করিলেন। তৃতীয় দিবসে ইবরাহীম চক্ষু তুলিয়া দূর হইতে সেই স্থান দেখিলেন। তখন ইবরাহীম আপন দাসদিগকে কহিলেন, তোমরা এই স্থানে গর্দভের সহিত থাক; আমি ও যুবক আমরা ঐ স্থানে গিয়া প্রণিপাত করি, পরে তোমাদের কাছে ফিরিয়া আসিব। তখন ইবরাহীম হোমের কাষ্ঠ লইয়া আপন পুত্র ইসহাকের স্কন্ধে দিলেন এবং নিজ হস্তে অগ্নি ও খড়গ লইলেন; পরে উভয়ে একত্রে চলিয়া গেলেন। আর ইসহাক আপন পিতা ইবরাহীমকে বলিলেন, হে আমার পিতা! তিনি কহিলেন, হে বৎস! দেখ, এই আমি। তখন তিনি বলিলেন, এই দেখুন অগ্নি ও কাষ্ঠ, কিন্তু হোমের নিমত্ত মেষশাবক কোথায়? ইবরাহীম কহিলেন, বৎস! সদাপ্রভু আপনি হোমের জন্য মেষশাবক যোগাইবেন। পরে উভয়ে একসঙ্গে চলিয়া গেলেন। সদাপ্রভুর নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হইলে ইবরাহীম সেখানে যবেহ করার মঞ্চ নির্মাণ করিয়া কাষ্ঠ সাজাইলেন, পরে আপন পুত্র ইসহাককে বাঁধিয়া মঞ্চে কাষ্ঠের উপর রাখিলেন। অতঃপর ইবরাহীম হস্ত বিস্তার করিয়া আপন পুত্রকে যবেহ করিতে খড়গ গ্রহণ করিলেন। এমন সময় আকাশ হইতে সদাপ্রভুর দূত তাঁহাকে ডাকিলেন এবং বলিলেন, ইবরাহীম! তিনি বলিলেন, দেখুন এই আমি। তখন তিনি বলিলেন, যুবকের প্রতি তোমার হস্ত বিস্তার করিও না, তুমি সদাপ্রভুকে ভয় কর, আমাকে আপনার অদ্বিতীয় পুত্র দিতেও অসম্মত নও। তখন ইবরাহীম চক্ষু তুলিয়া চাহিলেন, আর দেখ, তাঁহার পশ্চাৎ দিকে একটি মেষ, তাহার শিং ঝোপে বদ্ধ। পরে ইবরাহীম গিয়া সেই মেষটি লইয়া আপন পুত্রের পরিবর্তে হোমার্থে যবেহ করিলেন।..... পরে সদাপ্রভু কহিলেন..... আমি অবশ্যই তোমাকে আশীর্বাদ করিব এবং আকাশের তারকারাজি ও সমুদ্র তীরস্থ বালুকার ন্যায় তোমার অতিশয় বংশ বৃদ্ধি করিব..." (বাইবেলের যাত্রাপুস্তক, ২২: ১-১৯)। যবীহুল্লাহ সম্পর্কে বাইবেলের বর্ণনায় স্ববিরোধিতা রহিয়াছে। কুরআন মজীদে এই ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নরূপ:
ফিলিস্তীনের নিকটস্থ কিতআ'বা কাত নামক স্থানে হিজরত ফেরেশতাদের আগমন ও পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দান দূত সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বাদানুবাদ প্রথম পুত্র ইসমাঈল (আ)-এর জন্ম হাজার ও ইসমাঈল (আ)-এর মক্কায় আবাসন স্বীয় পুত্রকে যবেহ করার নির্দেশ
page_359.jpg
page_360.jpg
page_361.jpg
page_362.jpg
page_363.jpg
page_364.jpg
page_365.jpg
"ফিলিস্তীনের নিকটস্থ কিতআ'বা কাত নামক স্থানে হিজরত" অংশ থেকে শুরু হওয়া এবং `হযরত ইসমাঈল (আ)` অধ্যায় থেকে নির্দেশিত `স্বীয় পুত্রকে যবেহ করার নির্দেশ` উপাধ্যায়ের বিষয়বস্তু, তাই এর শুরু হবে `স্বীয় পুত্রকে যবেহ করার নির্দেশ` থেকে।
কুরআন মজীদে মাত্র এক স্থানে সংক্ষেপে কুরবানী সংক্রান্ত বিষয়ের আলোচনা আছে। বাইবেলেও সংক্ষিপ্তাকারে ঘটনাটির উল্লেখ আছে। তবে সেখানে ইসহাক (আ)-কে যবেহ করার কথা বলা হইয়াছে। বাইবেলের বর্ণনা নিম্নরূপঃ "এই সকল ঘটনার পরে সদাপ্রভু ইবরাহীমের পরীক্ষা করিলেন। তিনি তাঁহাকে বলিলেন, হে ইবরাহীম! তুমি আপন পুত্রকে, তোমার অদ্বিতীয় পুত্রকে, যাহাকে তুমি ভালোবাস, সেই ইসহাককে লইয়া মোরিয়া দেশে যাও এবং তথাকার যে এক পর্বতের কথা আমি তোমাকে বলিব, তাহার উপর তাহাকে হোমার্থে যবেহ কর। পরে ইবরাহীম প্রত্যুষে উঠিয়া গর্দভ সাজাইয়া দুইজন দাস ও আপন পুত্র ইসহাককে সঙ্গে লইলেন, হোমের নিমিত্ত কাষ্ঠ কাটিলেন, আর উঠিয়া সদাপ্রভুর নির্দিষ্ট স্থানের দিকে গমন করিলেন। তৃতীয় দিবসে ইবরাহীম চক্ষু তুলিয়া দূর হইতে সেই স্থান দেখিলেন। তখন ইবরাহীম আপন দাসদিগকে কহিলেন, তোমরা এই স্থানে গর্দভের সহিত থাক; আমি ও যুবক আমরা ঐ স্থানে গিয়া প্রণিপাত করি, পরে তোমাদের কাছে ফিরিয়া আসিব। তখন ইবরাহীম হোমের কাষ্ঠ লইয়া আপন পুত্র ইসহাকের স্কন্ধে দিলেন এবং নিজ হস্তে অগ্নি ও খড়গ লইলেন; পরে উভয়ে একত্রে চলিয়া গেলেন। আর ইসহাক আপন পিতা ইবরাহীমকে বলিলেন, হে আমার পিতা! তিনি কহিলেন, হে বৎস! দেখ, এই আমি। তখন তিনি বলিলেন, এই দেখুন অগ্নি ও কাষ্ঠ, কিন্তু হোমের নিমত্ত মেষশাবক কোথায়? ইবরাহীম কহিলেন, বৎস! সদাপ্রভু আপনি হোমের জন্য মেষশাবক যোগাইবেন। পরে উভয়ে একসঙ্গে চলিয়া গেলেন। সদাপ্রভুর নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হইলে ইবরাহীম সেখানে যবেহ করার মঞ্চ নির্মাণ করিয়া কাষ্ঠ সাজাইলেন, পরে আপন পুত্র ইসহাককে বাঁধিয়া মঞ্চে কাষ্ঠের উপর রাখিলেন। অতঃপর ইবরাহীম হস্ত বিস্তার করিয়া আপন পুত্রকে যবেহ করিতে খড়গ গ্রহণ করিলেন। এমন সময় আকাশ হইতে সদাপ্রভুর দূত তাঁহাকে ডাকিলেন এবং বলিলেন, ইবরাহীম! তিনি বলিলেন, দেখুন এই আমি। তখন তিনি বলিলেন, যুবকের প্রতি তোমার হস্ত বিস্তার করিও না, তুমি সদাপ্রভুকে ভয় কর, আমাকে আপনার অদ্বিতীয় পুত্র দিতেও অসম্মত নও। তখন ইবরাহীম চক্ষু তুলিয়া চাহিলেন, আর দেখ, তাঁহার পশ্চাৎ দিকে একটি মেষ, তাহার শিং ঝোপে বদ্ধ। পরে ইবরাহীম গিয়া সেই মেষটি লইয়া আপন পুত্রের পরিবর্তে হোমার্থে যবেহ করিলেন।..... পরে সদাপ্রভু কহিলেন..... আমি অবশ্যই তোমাকে আশীর্বাদ করিব এবং আকাশের তারকারাজি ও সমুদ্র তীরস্থ বালুকার ন্যায় তোমার অতিশয় বংশ বৃদ্ধি করিব..." (বাইবেলের যাত্রাপুস্তক, ২২: ১-১৯)। যবীহুল্লাহ সম্পর্কে বাইবেলের বর্ণনায় স্ববিরোধিতা রহিয়াছে। কুরআন মজীদে এই ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নরূপ:
ফিলিস্তীনের নিকটস্থ কিতআ'বা কাত নামক স্থানে হিজরত ফেরেশতাদের আগমন ও পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দান দূত সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বাদানুবাদ প্রথম পুত্র ইসমাঈল (আ)-এর জন্ম হাজার ও ইসমাঈল (আ)-এর মক্কায় আবাসন স্বীয় পুত্রকে যবেহ করার নির্দেশ
পূর্বে বর্ণিত হইয়াছে যে, ইবরাহীম (আ) যখন তাঁহার কওমের নিকট হইতে হিজরত করেন তখন আল্লাহ্র নিকট তিনি একজন নেককার সন্তান প্রার্থনা করিয়াছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁহাকে একজন স্থিরবুদ্ধি পুত্রের সুসংবাদ দেন। আর সেই 'স্থিরবুদ্ধি' পুত্র হইলেন ইসমাঈল (আ), যিনি ইবরাহীম (আ)-এর ৮৬ বৎসর বয়সকালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনিই তাঁহার প্রথম সন্তান। আর ইসহাক (আ)-এর জন্মের সময় ইবরাহীম (আ)-এর বয়স ছির ৯৯ বৎসর (ইব্ন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ৪খ, ১৪)। ইহাতে কাহারও কোন দ্বিমত নাই। অতঃপর ইসমাঈল (আ) যখন বয়ঃপ্রাপ্ত হইলেন, ইবন আব্বাস (রা)-এর বর্ণনামতে পিতার ন্যায় নিজের কাজসমূহ নিজেই আঞ্জাম দিতে সক্ষম হইলেন, তখন ইবরাহীম (আ)-কে স্বপ্নে দেখানো হইল ইসমাঈলকে যবাহ করিতে। হাদীছে বর্ণিত আছে, নবীগণের স্বপ্নও ওহীর অন্তর্ভুক্ত (ইবন কাছীর, আল-বিদায়া, ১খ, ১৫৭)।
কাহারও মতে ইসমাঈল (আ)-এর বয়স হইয়াছিল তখন ১৩ বৎসর, আর কাহারও মতে ৭ বৎসর (ছানাউল্লাহ পানীপতি, আত-তাফসীরুল মাযহারী, ৮খ, ১২৮; ইমাদ যুহায়র হাফিজ, আল কাসাসুল-কুরআনী, পৃ. ১০৫)। ইহা ছিল ইবরাহীম (আ)-এর জন্য কঠিন এক পরীক্ষা। বার্ধক্যে প্রাপ্ত অতি কামনার ধন স্নেহ ও আদরের দুলালকে একবার তো জনমানবহীন মরু প্রান্তরে নির্বাসন দিতে হইয়াছে। তাহাতেও সান্তনা ছিল যে, মাঝেমধ্যে তাঁহাকে দেখিয়া যাইতে পারিতেন। কিন্তু এইবার যে একেবারে যবাহ্ করার নির্দেশ, তাহাও আবার স্বহস্তে। আর কোন দিন সেই মুখ আর দেখা যাইবে না। কিন্তু এই পরীক্ষায়ও তিনি সফলতার সহিত উত্তীর্ণ হন। সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ পালনের জন্য তিনি প্রস্তুত হইয়া গেলেন এবং স্বীয় পুত্রের নিকট বিষয়টি উপস্থাপন করিলেন যাহাতে প্রফুল্ল চিত্তে সে রাজী হইয়া যায় এবং জোর-জবরদস্তি করিয়া যবাহ্ করিতে না হয়। ইহার বিবরণ কুরআন কারীমে এইভাবে প্রদত্ত হইয়াছে:
فَبَشِّرْنَهُ بِغُلَامٍ حَلِيمٍ. فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعَى قَالَ يُبْنَى إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَى . (۳۷:۱۰۱-۱۰۲) "অতঃপর আমি তাহাকে (ইবরাহীমকে) এক স্থিরবুদ্ধি পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। অতঃপর সে যখন তাহার পিতার সঙ্গে কাজ করিবার মত বয়সে উপনীত হইল তখন ইবরাহীম বলিল, বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, আমি তোমাকে যবাহ্ করিতেছি, এখন তোমার অভিমত কি বল” (৩৭ঃ ১০১-১০২)।
পুত্র ইসমাঈল এই কথার সঙ্গে সঙ্গে নির্দ্বিধায় ও সোৎসাহে উত্তর দিলেন: قَالَ يَابَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللهُ مِنَ الصَّابِرِينَ (۳۷:۱۰۲) "সে বলিল, হে আমার পিতা! আপনি যাহা আদিষ্ট হইয়াছেন তাহাই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাইবেন" (৩৭ঃ ১০২)।
কোন কোন ইতিহাসবিদের বর্ণনামতে ইবরাহীম (আ) প্রথমেই যবাহের কথাটি প্রকাশ করেন নাই, বরং যবাহের স্থানে (মিনা) পৌঁছিয়া তাঁহাকে এই কথা জানান এবং ইসমাঈল (আ) তখন উক্ত উত্তর দেন। প্রথমে তাঁহাকে কাষ্ঠ সংগ্রহ করার কথা বলা হইয়াছিল (তাবারী, তারীখ, ১খ., ১৪০-১৪১)।
কোন কোন রিওয়ায়াত হইতে জানা যায় যে, ইবরাহীম (আ) যাহাতে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হইতে পারেন সেইজন্য শয়তান আপ্রাণ চেষ্টা করে। আবূ হুরায়রা (রা) কা'ব আল-আহবার (রা) হইতে রিওয়ায়াত করেন যে, এই সময় অর্থাৎ তাঁহারা রওয়ানা হইলে শয়তান একজন মানুষের আকৃতি ধারণ করিয়া ইসমাঈলের মাতার নিকট গিয়া বলে, তুমি কি জান ইবরাহীম তোমার পুত্রকে কোথায় লইয়া যাইতেছে? তিনি বলিলেন, তাহাকে ঐ ঘাটিতে কাষ্ঠ সংগ্রহের জন্য লইয়া যাইতেছে। সে বলিল, না, আল্লাহর কসম! তাহাকে যবাহ করিতে লইয়া যাইতেছে। তিনি বলিলেন, কখনও না। সে তাহার প্রতি আমার চাইতে বেশি দয়াশীল এবং বেশি মহব্বত করে। শয়তান বলিল, সে নাকি মনে করে যে, আল্লাহ তাহাকে উহা করিতে নির্দেশ দিয়াছেন। তিনি বলিলেন, আল্লাহ যদি তাঁহাকে সে আদেশ দিয়াই থাকেন তবে তাঁহার প্রতিপালকের আনুগত্য করাতে এবং তাঁহার আদেশ শিরোধার্য করিয়া ভালই করিয়াছেন। শয়তান এখানে বিফল হইয়া দ্রুত তাঁহার পুত্রের নিকট চলিয়া গেল। অতঃপর তাঁহাকে পিতার পেছনে চলিতে দেখিল। সে নিকটে গিয়া বলিল, হে বালক! তুমি কি জান, তোমার পিতা তোমাকে কোথায় লইয়া যাইতেছে? ইসমাঈল (আ) বলিলেন, ঐ ঘাটি হইতে আমরা আমাদের পরিবারের জন্য কাষ্ঠ সংগ্রহ করিব। সে বলিল, আল্লাহর কসম! সে তোমাকে যবাহ করিতে লইয়া যাইতেছে। তিনি বলিলেন, কেন? শয়তান বলিল, সে মনে করে যে, আল্লাহ তাহাকে ঐরূপ নির্দেশ দিয়াছেন। তিনি বলিলেন, তবে তিনি যে বিষয়ে নির্দেশিত হইয়াছেন তাহা পালন করুন। আমি আল্লাহর নির্দেশ শুনিব ও মান্য করিব। এখানেই বিফল হইয়া শয়তান ইবরাহীম (আ)-এর নিকট গিয়া বলিল, শায়খ! কোথায় যাইতেছ? ইবরাহীম (আ) বলিলেন, ঐ ঘাটিতে আমার প্রয়োজনে যাইতেছি। সে বলিল, আল্লাহ্র কসম! আমি শয়তানকে দেখিয়াছি সে তোমার নিকট আসিয়া তোমার পুত্রকে যবাহ করিতে নির্দেশ দিয়াছে। ইবরাহীম (আ) তাহাকে চিনিতে পারিলেন। তিরস্কার করিয়া বলিলেন, আমার নিকট হইতে দূর হ, হে অভিশপ্ত! আল্লাহ্ কসম! আমি আমার প্রতিপালকের হুকুম তামীল করিবই। অতঃপর শয়তান ব্যর্থ হইয়া রাগান্বিত অবস্থায় ফিরিয়া আসিল, তাঁহাদের কোন অনিষ্ট করিতে পারিল না। আল্লাহ্ মদদ ও সাহায্যে তাঁহারা শয়তান হইতে নিরাপদ রহিলেন (আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ১৪০-১৪১; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ১০১)।
ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, ইবরাহীম (আ)-কে যখন এই আদেশ দেওয়া হইল তখন আল মাশ'আরুল-হারামে ইবলীস তাঁহার নিকট পৌঁছে। তিনি দ্রুত তাহাকে পিছনে ফেলিয়া সম্মুখে চলিয়া যান। তিনি আল-জামরাতুল আকাবার নিকট গেলে ইবলীস তাঁহার নিকট হাজির হয়। তিনি ইবলীসকে ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপ করিলে সে চলিয়া যায়। জামরাতুল উসতার নিকট আবার সে ইবরাহীম (আ)-এর নিকট হাজির হয়। ইবরাহীম (আ) এখানেও তাহাকে ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন, ফলে সে চলিয়া যায়। অতঃপর আবার সে আল-জামরাতুল-কুবরায় তাঁহার নিকট আগমন করে। এবারও তিনি তাহার প্রতি সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। ফলে সে চলিয়া যায় এবং ইবরাহীম (আ) আল্লাহ্র নির্দেশ পালন করেন (আছ-ছা'লাবী, প্রাগুক্ত)।
অতঃপর পর্বত ঘাটিতে যবাহ-এর জন্য পিতাপুত্র উভয়েই সন্তুষ্ট চিত্তে প্রস্তুত হইলেন এবং ইসমাঈলকে কাত করিয়া, আর কাহারো মতে উপুড় করিয়া শোয়াইলেন। ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, তাঁহাকে কাত করিয়া শোয়াইয়া কাঁধের দিক হইতে যবাহ করিতে উদ্যত হন এইজন্য যাহাতে যবাহ-এর সময় তাহার মুখের দিকে দৃষ্টি না পড়ে। কাহারও মতে অন্যান্য প্রাণী যবাহ্-এর ন্যায় চীৎ করিয়াই শোয়াইয়াছিলেন কিন্তু মাথাটি ঘুরাইয়া কাত করিয়া দিয়াছিলেন। ইবন ইসহাকের বর্ণনামতে ইসমাঈল (আ) পিতাকে বলিয়াছিলেন, হে পিতা! আমাকে যবাহ্ করার সময় শক্ত করিয়া বাঁধিবেন যাহাতে আমার হইতে আপনার শরীরে কিছু না লাগে। তাহা হইলে আমার ছওয়াব ও পুরস্কার কম হইয়া যাইবে। কারণ মৃত্যু খুবই কঠিন। আমি ছট্ফট্ করিতে পারি। আর আপনার ছুরি ভালমত ধারালো করুন যাহাতে উহা ভালোমত চালাইয়া আমার কষ্ট লাঘব করিতে পারেন। আর আমাকে কাত করিয়া শায়িত করাইবেন এবং আমার মুখমণ্ডল নীচের দিকে রাখিবেন, পার্শ্বদেশে শয়ন করাইবেন না। কারণ আমার আশঙ্কা হয় যে, আমার মুখমণ্ডলে আপনার দৃষ্টি পড়িলে আপনার অন্তর বিগলিত হইয়া যাইবে, ফলে উহা আল্লাহ্র নির্দেশ পালনে অন্তরায় হইয়া দাঁড়াইবে। আর আপনি যদি ভাল মনে করেন যে, আমার জামাটি আমার মাতার নিকট ফেরৎ দিলে ইহা তাঁহার জন্য সান্ত্বনাস্বরূপ হইবে তাহা হইলে দিবেন। তখন ইবরাহীম (আ) তাঁহাকে বলিলেন, বৎস! আল্লাহ্ নির্দেশ পালনে তুমি কতইনা ভাল সাহায্যকারী! অতঃপর ইসমাঈল (আ) যেভাবে বলিয়াছিলেন সেইভাবেই তিনি তাঁহাকে শক্ত করিয়া বাঁধিলেন, ছুরি ধারালো করিলেন। অতঃপর কাত করিয়া শয়ন করাইলেন এবং তাঁহার মুখমণ্ডল হইতে দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরাইয়া রাখিলেন। অতঃপর আল্লাহ্র নাম লইলেন এবং তিনি 'আল্লাহু আকবার' বলিয়া তাঁহার কন্ঠদেশে ছুরি চালনা করিলেন। ইসমাঈলও তাশাহ্হুদ )أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلى اللَّهُ وَحْدَهُ(( পড়িয়া মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হইয়াছিলেন, কিন্তু আল্লাহ তাঁহার হাতের মধ্যেই ছুরি উল্টাইয়া দিয়াছিলেন। ইবরাহীম (আ) যথাসাধ্য চেষ্টা করিলেন, কিন্তু আল্লাহর নির্দেশে ছুরি একটুও কাটিল না। এক বর্ণনামতে ছুরি ও গলার মধ্যখানে আল্লাহ ধুম্রজালের একটি আবরণ সৃষ্টি করিয়া দিয়াছিলেন। অতঃপর আল্লাহ্র পক্ষ হইতে ঘোষণা আসিল, যাহা কুরআন কারীমে এইভাবে উল্লিখিত হইয়াছে:
وَنَادَيْنَهُ أَنْ يَابْرَاهِيمُ قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلُوا الْمُبِينُ. (١٠٦-٣٧:١٠٤)
"তখন আমি তাহাকে আহবান করিয়া বলিলাম, হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যই পালন করিলে! এইভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদিগকে পুরস্কৃত করিয়া থাকি। নিশ্চয়ই ইহা ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা" (৩৭: ১০৪-১০৬)।
অতঃপর আল্লাহ তাআলা বিরাট এক দুম্বা প্রেরণ করিয়া তাহাই যবাহ্ করার নির্দেশ দিলেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে: )۳۷:۱۰۷( وَقَدَيْنَهُ بذبح عظیم" আমি তাহাকে মুক্ত করিলাম বিরাট এক কুরবানীর বিনিময়ে" (৩৭: ১০৭)।
জমহূর আলিমদের মতে উহা ছিল সাদা রংয়ের, ডাগর কালো চোখ ও জোড়া ভ্রবিশিষ্ট একটি দুম্বা, যাহা ইবরাহীম (আ) একটি পেরেক দ্বারা ছাবীর পর্বতের পাদদেশে বাঁধা অবস্থায় পাইয়াছিলেন (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১খ, ১৫৮)। ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, তাঁহার নিকট অবতরণ করানো হয় একটি ডাগর কালো চোখ, জোড়া ভ্রবিশিষ্ট দুম্বা যাহা ডাকিতেছিল। ইহা ছিল সেই দুম্বা, যাহা আদম (আ)-এর পুত্র হাবীল কুরবানী হিসাবে পেশ করিয়াছিলেন এবং তাহা কবুল হইয়াছিল। ছাওরী (র) ইব্ন আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, দুম্বাটি জান্নাতে চল্লিশ (মতান্তরে ৭০) বৎসর যাবত চরিয়া বেড়াইয়াছিল। অতঃপর ছাবীর পর্বতে উহা অবতরণ করানো হয় (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ১০০)।
মুজাহিদের বর্ণনামতে তিনি উহা মিনায় যবাহ করেন। উবায়দ ইবন উমায়রের বর্ণনামতে মাকামে ইবরাহীমে। উক্ত দুম্বার শিং মাকামে ইবরাহীমে লটকানো ছিল বলিয়া জানা যায়। ইমাম আহমাদ (র) সাফিয়্যা বিনত শায়বা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) মক্কা বিজয়ের পর কা'বা শরীফের তত্ত্বাবধায়ক ও চাবিরক্ষক উছমান ইবন তালহা (রা)-কে ডাকিয়া বলিয়াছিলেন, আমি যখন বায়তুল্লাহ শরীফে প্রবেশ করিয়াছিলাম তখন উহাতে দুইটি শিং দেখিয়াছিলাম। কিন্তু তোমাকে উহা ঢাকিয়া দেওয়ার নির্দেশ দিতে ভুলিয়া গিয়াছিলাম। তাই এখন উহা ঢাকিয়া দাও। কারণ বায়তুল্লাহতে এমন কিছু থাকা সমীচীন নহে যাহা মুসল্লীর সালাতে বিঘ্ন ঘটায়। সুফইয়ান (র) বলেন, দুম্বার দুইটি শিং সর্বদাই বায়তুল্লাহ-এ লটকানো ছিল। অতঃপর বায়তুল্লাহ-এ আগুন লাগিলে উহাও পুড়িয়া যায়। ইহাতে প্রমাণিত হয় যে, ইসমাঈল (আ) যবীহ ছিলেন. ইসহাক (আ) নহে। কারণ তিনি বাল্যকালে কখনও মক্কায় আসেন নাই (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১খ, ১৫৮)। ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, উক্ত দুম্বার খুলি সর্বদাই মীযাব- এর নিকট লটকানো ছিল (প্রাগুক্ত)।
কুরবানীর যে ঘটনা বিবৃত হইয়াছে তাহাতে নামোল্লেখ করিয়া বলা হয় নাই যে, হযরত ইবরাহীম (আ) তাঁহার পুত্রদ্বয়ের মধ্যে ইসমাঈল (আ)-কে কুরবানী করিয়াছেন, না ইসহাক (আ)-কে। এই বিষয়ে হাদীছের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাবলীতেও সহীহ সনদসূত্রে রাসূলুল্লাহ (স)-এর কোন বক্তব্যও বিদ্যমান নাই। ইয়াহুদী-খৃস্টান সম্প্রদায় দাবি করে যে, হযরত ইসহাক (আ)-কে কুরবানী করা হইয়াছিল, ইসমাঈল (আ)-কে নয়। এই বিষয়ে বাইবেলের বক্তব্য নিম্নরূপঃ "এই সকল ঘটনার পরে সদাপ্রভু ইবরাহীমের পরীক্ষা করিলেন। তিনি তাঁহাকে বলিলেন, হে ইবরাহীম! তুমি আপন পুত্রকে, তোমার অদ্বিতীয় পুত্রকে, যাহাকে তুমি ভালোবাস, সেই ইসহাককে লইয়া মোরিয়া দেশে যাও এবং তথাকার যে এক পর্বতের কথা আমি তোমাকে বলিব, তাহার উপর তাহাকে হোমার্থে যবেহ কর। পরে ইবরাহীম প্রত্যুষে উঠিয়া গর্দভ সাজাইয়া দুইজন দাস ও আপন পুত্র ইসহাককে সঙ্গে লইলেন, হোমের নিমিত্ত কাষ্ঠ কাটিলেন, আর উঠিয়া সদাপ্রভুর নির্দিষ্ট স্থানের দিকে গমন করিলেন। তৃতীয় দিবসে ইবরাহীম চক্ষু তুলিয়া দূর হইতে সেই স্থান দেখিলেন। তখন ইবরাহীম আপন দাসদিগকে কহিলেন, তোমরা এই স্থানে গর্দভের সহিত থাক; আমি ও যুবক আমরা ঐ স্থানে গিয়া প্রণিপাত করি, পরে তোমাদের কাছে ফিরিয়া আসিব। তখন ইবরাহীম হোমের কাষ্ঠ লইয়া আপন পুত্র ইসহাকের স্কন্ধে দিলেন এবং নিজ হস্তে অগ্নি ও খড়গ লইলেন; পরে উভয়ে একত্রে চলিয়া গেলেন। আর ইসহাক আপন পিতা ইবরাহীমকে বলিলেন, হে আমার পিতা! তিনি কহিলেন, হে বৎস! দেখ, এই আমি। তখন তিনি বলিলেন, এই দেখুন অগ্নি ও কাষ্ঠ, কিন্তু হোমের নিমত্ত মেষশাবক কোথায়? ইবরাহীম কহিলেন, বৎস! সদাপ্রভু আপনি হোমের জন্য মেষশাবক যোগাইবেন। পরে উভয়ে একসঙ্গে চলিয়া গেলেন। সদাপ্রভুর নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হইলে ইবরাহীম সেখানে যবেহ করার মঞ্চ নির্মাণ করিয়া কাষ্ঠ সাজাইলেন, পরে আপন পুত্র ইসহাককে বাঁধিয়া মঞ্চে কাষ্ঠের উপর রাখিলেন। অতঃপর ইবরাহীম হস্ত বিস্তার করিয়া আপন পুত্রকে যবেহ করিতে খড়গ গ্রহণ করিলেন। এমন সময় আকাশ হইতে সদাপ্রভুর দূত তাঁহাকে ডাকিলেন এবং বলিলেন, ইবরাহীম! তিনি বলিলেন, দেখুন এই আমি। তখন তিনি বলিলেন, যুবকের প্রতি তোমার হস্ত বিস্তার করিও না, তুমি সদাপ্রভুকে ভয় কর, আমাকে আপনার অদ্বিতীয় পুত্র দিতেও অসম্মত নও। তখন ইবরাহীম চক্ষু তুলিয়া চাহিলেন, আর দেখ, তাঁহার পশ্চাৎ দিকে একটি মেষ, তাহার শিং ঝোপে বদ্ধ। পরে ইবরাহীম গিয়া সেই মেষটি লইয়া আপন পুত্রের পরিবর্তে হোমার্থে যবেহ করিলেন।..... পরে সদাপ্রভু কহিলেন..... আমি অবশ্যই তোমাকে আশীর্বাদ করিব এবং আকাশের তারকারাজি ও সমুদ্র তীরস্থ বালুকার ন্যায় তোমার অতিশয় বংশ বৃদ্ধি করিব..." (বাইবেলের যাত্রাপুস্তক, ২২: ১-১৯)। যবীহুল্লাহ সম্পর্কে বাইবেলের বর্ণনায় স্ববিরোধিতা রহিয়াছে। কুরআন মজীদে এই ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নরূপ:
ফিলিস্তীনের নিকটস্থ কিতআ'বা কাত নামক স্থানে হিজরত ফেরেশতাদের আগমন ও পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দান দূত সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বাদানুবাদ প্রথম পুত্র ইসমাঈল (আ)-এর জন্ম হাজার ও ইসমাঈল (আ)-এর মক্কায় আবাসন স্বীয় পুত্রকে যবেহ করার নির্দেশ
page_359.jpg
page_360.jpg
page_361.jpg
page_362.jpg
page_363.jpg
page_364.jpg
page_365.jpg
"ফিলিস্তীনের নিকটস্থ কিতআ'বা কাত নামক স্থানে হিজরত" অংশ থেকে শুরু হওয়া এবং `হযরত ইসমাঈল (আ)` অধ্যায় থেকে নির্দেশিত `স্বীয় পুত্রকে যবেহ করার নির্দেশ` উপাধ্যায়ের বিষয়বস্তু, তাই এর শুরু হবে `স্বীয় পুত্রকে যবেহ করার নির্দেশ` থেকে।
কুরআন মজীদে মাত্র এক স্থানে সংক্ষেপে কুরবানী সংক্রান্ত বিষয়ের আলোচনা আছে। বাইবেলেও সংক্ষিপ্তাকারে ঘটনাটির উল্লেখ আছে। তবে সেখানে ইসহাক (আ)-কে যবেহ করার কথা বলা হইয়াছে। বাইবেলের বর্ণনা নিম্নরূপঃ "এই সকল ঘটনার পরে সদাপ্রভু ইবরাহীমের পরীক্ষা করিলেন। তিনি তাঁহাকে বলিলেন, হে ইবরাহীম! তুমি আপন পুত্রকে, তোমার অদ্বিতীয় পুত্রকে, যাহাকে তুমি ভালোবাস, সেই ইসহাককে লইয়া মোরিয়া দেশে যাও এবং তথাকার যে এক পর্বতের কথা আমি তোমাকে বলিব, তাহার উপর তাহাকে হোমার্থে যবেহ কর। পরে ইবরাহীম প্রত্যুষে উঠিয়া গর্দভ সাজাইয়া দুইজন দাস ও আপন পুত্র ইসহাককে সঙ্গে লইলেন, হোমের নিমিত্ত কাষ্ঠ কাটিলেন, আর উঠিয়া সদাপ্রভুর নির্দিষ্ট স্থানের দিকে গমন করিলেন। তৃতীয় দিবসে ইবরাহীম চক্ষু তুলিয়া দূর হইতে সেই স্থান দেখিলেন। তখন ইবরাহীম আপন দাসদিগকে কহিলেন, তোমরা এই স্থানে গর্দভের সহিত থাক; আমি ও যুবক আমরা ঐ স্থানে গিয়া প্রণিপাত করি, পরে তোমাদের কাছে ফিরিয়া আসিব। তখন ইবরাহীম হোমের কাষ্ঠ লইয়া আপন পুত্র ইসহাকের স্কন্ধে দিলেন এবং নিজ হস্তে অগ্নি ও খড়গ লইলেন; পরে উভয়ে একত্রে চলিয়া গেলেন। আর ইসহাক আপন পিতা ইবরাহীমকে বলিলেন, হে আমার পিতা! তিনি কহিলেন, হে বৎস! দেখ, এই আমি। তখন তিনি বলিলেন, এই দেখুন অগ্নি ও কাষ্ঠ, কিন্তু হোমের নিমত্ত মেষশাবক কোথায়? ইবরাহীম কহিলেন, বৎস! সদাপ্রভু আপনি হোমের জন্য মেষশাবক যোগাইবেন। পরে উভয়ে একসঙ্গে চলিয়া গেলেন। সদাপ্রভুর নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হইলে ইবরাহীম সেখানে যবেহ করার মঞ্চ নির্মাণ করিয়া কাষ্ঠ সাজাইলেন, পরে আপন পুত্র ইসহাককে বাঁধিয়া মঞ্চে কাষ্ঠের উপর রাখিলেন। অতঃপর ইবরাহীম হস্ত বিস্তার করিয়া আপন পুত্রকে যবেহ করিতে খড়গ গ্রহণ করিলেন। এমন সময় আকাশ হইতে সদাপ্রভুর দূত তাঁহাকে ডাকিলেন এবং বলিলেন, ইবরাহীম! তিনি বলিলেন, দেখুন এই আমি। তখন তিনি বলিলেন, যুবকের প্রতি তোমার হস্ত বিস্তার করিও না, তুমি সদাপ্রভুকে ভয় কর, আমাকে আপনার অদ্বিতীয় পুত্র দিতেও অসম্মত নও। তখন ইবরাহীম চক্ষু তুলিয়া চাহিলেন, আর দেখ, তাঁহার পশ্চাৎ দিকে একটি মেষ, তাহার শিং ঝোপে বদ্ধ। পরে ইবরাহীম গিয়া সেই মেষটি লইয়া আপন পুত্রের পরিবর্তে হোমার্থে যবেহ করিলেন।..... পরে সদাপ্রভু কহিলেন..... আমি অবশ্যই তোমাকে আশীর্বাদ করিব এবং আকাশের তারকারাজি ও সমুদ্র তীরস্থ বালুকার ন্যায় তোমার অতিশয় বংশ বৃদ্ধি করিব..." (বাইবেলের যাত্রাপুস্তক, ২২: ১-১৯)। যবীহুল্লাহ সম্পর্কে বাইবেলের বর্ণনায় স্ববিরোধিতা রহিয়াছে। কুরআন মজীদে এই ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নরূপ:
ফিলিস্তীনের নিকটস্থ কিতআ'বা কাত নামক স্থানে হিজরত ফেরেশতাদের আগমন ও পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দান দূত সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বাদানুবাদ প্রথম পুত্র ইসমাঈল (আ)-এর জন্ম হাজার ও ইসমাঈল (আ)-এর মক্কায় আবাসন স্বীয় পুত্রকে যবেহ করার নির্দেশ