📄 ফিলিস্তীনের নিকটস্থ কিতআ'বা কাত নামক স্থানে হিজরত
অতঃপর সেখানকার অধিবাসিগণ তাহাকে কষ্ট দিল। তিনি সেখান হইতে বাহির হইয়া ফিলিসতীনের পার্শ্ববর্তী রামলা ও ঈলিয়ার মধ্যবর্তী 'কিতা' নামক স্থানে চলিয়া গেলেন। আল্লাহ তা'আলা ওহীর মাধ্যমে তাঁহাকে উত্তর-দক্ষিণে ও পূর্ব-পশ্চিমে দৃষ্টি প্রসারিত করিতে বলিলেন এবং তাঁহাকে সুসংবাদ দিলেন যে, এই ভূমি সবটাই তোমার এবং তোমার পরবর্তী বংশধরদের জন্য একেবারে শেষ যমানা পর্যন্ত আমি বরাদ্দ করিব। আর তোমার বংশধর অতিশয় বৃদ্ধি করিব, এমনকি তাহাদের সংখ্যা হইবে মাটির ধুলিকণা সম। এই সুসংবাদ বর্তমান উম্মতের সহিত সংশ্লিষ্ট, বরং উহার বিরাট এক সংখ্যাই উম্মাতে মুহাম্মাদ (স)। রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি হাদীছ হইতে ইহার সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি বলিয়াছেন: إِنَّ اللَّهَ زَوى لِي الأَرْضَ فََرَأَيْتُ مَشَارِقَهَا وَمَغَارِبَهَا وَسَيَبْلُغُ مَلِكُ أُمَّتِي مَا زَوى لِي مِنْهَا । "আল্লাহ তা'আলা আমার জন্য পৃথিবীকে একত্রিত করিয়া দিয়াছেন। আর আমি উহার পূর্ব-পশ্চিম দর্শন করিয়াছি। আমার উম্মাতের রাজত্ব ততদূর পর্যন্ত পৌঁছিবে যতদূর আমার জন্য একত্র করা হইয়াছিল" (ইব্ন কাছীর, আল-ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৭৯)। সাব'বাসীদের নিকট হইতে চলিয়া আসার পর উক্ত কূপের পানি শুকাইয়া যায়। ফলে তাহারা নিজদের কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ ও অনুশোচনা করে এবং বলে, আমরা একজন সৎ লোককে
📄 ফেরেশতাদের আগমন ও পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দান
ইবরাহীম (আ) এই কিত্তা বা কাত্ত নামক স্থানেই বসবাস করিতে থাকেন। তাঁহার নিকট যাহারা আগমন করিত তিনি তাহাদের মেহমানদারী করিতেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে প্রচুর ধন-সম্পদ ও চাকর-বাকর দান করিয়ছিলেন। এই সময় লূত (আ)-এর সম্প্রদায় এক জঘন্য অপকর্ম করিত যাহা বিশ্ববাসীর কেহ ইতিপূর্বে করে নাই। সঙ্গে সঙ্গে লূত (আ)-কে তাহারা অমান্য করিত এবং তাঁহার উপদেশ প্রত্যাখ্যান করিত। অতঃপর তাহাদিগকে শাস্তি দেওয়ার জন্য আল্লাহ এই সময় ফেরেশতা প্রেরণ করেন। তাহারা প্রথমে ইবরাহীম (আ)-এর নিকট আগমন করেন মেহমানের বেশে। ইবরাহীম (আ)-এর অভ্যাস ছিল সব সময় মেহমানকে সঙ্গে লইয়া আহার করা। কিন্তু ইহাদের আগমনের পূর্বে পনের দিন পর্যন্ত কোন মেহমানের আগমন ঘটে নাই। ইহাতে তিনি খুবই বিচলিত ছিলেন। অতঃপর ফেরেশতাগণ মেহমানদের বেশে আগমন করিলে তিনি খুবই খুশী হন। তিনি তাহাদের জন্য একটি ভুনা মাংসল গোবৎস লইয়া আসিলেন। কিন্তু তাহারা উহা না খাইয়া হাত গোটাইয়া বসিয়া রহিলেন। ইবরাহীম (আ) তাহাদিগকে বলিলেন, আপনারা খাইতেছেন না কেন? তাহাদের হস্তসমূহ খাবার স্পর্শ করিতেছে না দেখিয়া ইবরাহীম (আ) শংকিত হইয়া পড়িলেন। তাহারা বলিলেন, আপনি ভীত হইবেন না। আমরা লূত (আ)-এর সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হইয়াছি। তাঁহার স্ত্রী সারা নিকটে দণ্ডায়মান ছিলেন। আর ইবরাহীম (আ) তাহাদের সহিত আহারে বসিয়াছিলেন। তাহারা তাহাদের প্রেরিত হইবার কারণ অবহিত করিলেন এবং তাঁহার পুত্র ইসহাক-এর জন্মের ও ইসহাকের পর ইয়া'কূবের জন্মের সুসংবাদ দিলেন। ইহা শুনিয়া সারা হাসিয়া ফেলিলেন। কুরআন কারীমে উক্ত ঘটনা এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে:
وَامْرَأَتُهُ قَائِمَةً فَضَحِكَتْ فَبَشِّرْنُهَا بِإِسْحَقَ وَمِنْ وَرَاءِ اسْحَقَ يَعْقُوبَ. قَالَتْ يُوَيْلَتِي أَلِدُ وَأَنَا عَجُوزٌ وَهُذَا بَعْلِى شَيْئًا إِنْ هَذَا لَشَيْئٌ عَجِيْبٌ । "আর তাহার স্ত্রী দণ্ডায়মান এবং সে হাসিয়া ফেলিল। তারপর আমি তাহাকে ইসহাকের ও ইসহাকের পরবর্তী ইয়া'কূবের সুসংবাদ দিলাম। সে বলিল, কি আশ্চর্য! সন্তানের জননী হইব আমি যখন আমি বৃদ্ধা এবং এই আমার স্বামী বৃদ্ধ! ইহা অবশ্যই একটি অদ্ভুত ব্যাপার। তাহারা বলিল, আল্লাহ্ কাজে তুমি বিস্ময়বোধ করিতেছ? হে পরিবার্বর্গ! তোমাদের প্রতি রহিয়াছে আল্লাহ্ অনুগ্রহ ও কল্যাণ। তিনি তো প্রশংসার্হ ও সম্মানার্হ” (১১: ৭১-৭৩)। সারার এই হাসির কারণ সম্পর্কে আলিমগণ বিভিন্ন রকমের ব্যাখ্যা দিয়াছেন। সুদ্দী বলেন, তাহারা যখন আহার গ্রহণ করিতেছিলেন তখন তিনি বলিয়াছিলেন, কি অদ্ভূত আমাদের এই সকল মেহমান! আমরা তাহাদের সম্মানার্থে প্রাণপণ খেদমত করিতেছি, আর তাহারা আমাদের আহার গ্রহণ করিতেছেন না! কাতাদা বলেন, লুত (আ)-এর সম্প্রদায়ের কর্মকাণ্ড এবং শান্তি নিকটবর্তী জানিয়া তিনি হাসিয়াছিলেন। মুকাতিল ও কালবী বলেন, তিনি ইবরাহীম (আ)-এর ভয় পাওয়ায় হাসিয়াছিলেন। কারণ তিনি চাকর-বাকর ও পরিবার-পরিজন বেষ্টিত থাকিয়া ভয় পাইয়াছিলেন। ইবন আব্বাস (রা) বলেন, তাঁহার ও তাঁহার স্বামীর বার্ধক্যে পৌঁছা সত্ত্বেও সন্তান হওয়ার সংবাদে তিনি হাসিয়াছিলেন। তাঁহার বয়স ছিল তখন ৯০ বৎসর। আর ইবরাহীম (আ)-এর বয়স এই বর্ণনামতে ১২০ বৎসর। কিন্তু বাইবেলের বর্ণনামতে সুসংবাদ দেওয়া এই পুত্র ইসহাক (আ) যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন ইবরাহীম (আ)-এর বয়স ১০০ বৎসর (তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২৮; ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া; পৃ. ৮৬; Genesis, 21: 5)। তবে মুজাহিদ ও ইকরিমা (র) বলেন, কুরআন কারীমে উল্লিখিত ضحكت শব্দটির অর্থ “তিনি হাসিলেন” নহে; বরং “তিনি ঋতুবতী হইলেন”। আরবী পরিভাষায় ইহার ব্যবহার পাওয়া যায়। যেমন খরগোশ যখন ঋতুবতী হয় তখন বলা হয় ضحكت الارنب "খরগোশটি ঋতুবতী হইয়াছে” (ছা'লাবী, প্রাগুক্ত)।
📄 দূত সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বাদানুবাদ
হযরত ইবরাহীম (আ) ছিলেন খুবই কোমল হৃদয়। তিনি যখন জানিতে পারিলেন যে, ফেরেশতাগণ লূত সম্প্রদায়কে ধ্বংস করিতে আসিয়াছেন তখন সেই সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁহার হৃদয় বিগলিত হইল। তিনি ফেরেশতাদের সহিত তাহাদের ব্যাপারে বাদানুবাদ শুরু করিলেন। তাহাদের প্রতি আল্লাহ্র রহমত কামনা করিলেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
فَلَمَّا ذَهَبَ عَنْ إِبْرَاهِيمَ الرَّوْعُ وَجَاءَتْهُ الْبُشْرَى يُجَادِلُنَا فِي قَوْمٍ لُوطٍ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَعَلِيمٌ أَوَاهُ مُّنِيبٌ .(١١:٧٤-٧٥) "অতঃপর যখন ইবরাহীমের ভীতি দূরীভূত হইল এবং তাহার নিকট সুসংবাদ আসিল তখন সে লূতের সম্প্রদায়ের সম্বন্ধে আমার সহিত বাদানুবাদ করিতে লাগিল। ইবরাহীম তো অবশ্যই সহনশীল, কোমল হৃদয়, সতত আল্লাহ অভিমুখী” (১১: ৭৪-৭৫)। তাঁহার এই বাদানুবাদের বিষয়টি কুরআন কারীমে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয় নাই, বরং বাইবেলে উহার উল্লেখ রহিয়াছে (আবদুল ওয়াহ্হাব নাজ্জার, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৯৫)। মুসলিম সীরাতবিদগণও উহার উল্লেখ করিয়াছেন। সাঈদ ইব্ন জুবায়র, সুদ্দী, কাতাদা ও মুহাম্মাদ ইব্ন ইসহাক প্রমুখ বর্ণনা করিয়াছেন যে, ফেরেশতাগণ বলিলেন যে, আমরা এই জনপদের জীবদ্বাসীদিগকে ধ্বংস করিব। ইবরাহীম (আ) বলিলেন, তোমরা কি এমন জনপদ ধ্বংস করিবে, যেখানে তিন শত মু'মিন রহিয়াছে? তাহারা বলিলেন, না। তিনি বলিলেন, যেখানে দুই শত মু'মিন রহিয়াছে? তাহারা বলিলেন, না। তিনি বলিলেন, চল্লিশজন মু'মিন থাকিলে? তাহারা বলিলেন, না। ইবরাহীম (আ) ধারণা করিয়াছিলেন যে, লূত (আ)-এর স্ত্রীসহ সেখানে চৌদ্দজন মু'মিন রহিয়াছে। তাই তাহাদের কথায় তিনি স্বস্তি লাভ করিলেন এবং চুপ হইয়া গেলেন। ইব্ন ইসহাক বলেন, এইভাবে বলিতে বলিতে বলিতে সর্বশেষ বলিলেন, সেখানে একজন মুমিন থাকিলে তোমাদের কি অভিমত? তাহারা বলিলেন, না, একজন মু'মিন থাকিলেও সেই জনপদ আমরা ধ্বংস করিব না। তারপর ইবরাহীম (আ) যখন ফেরেশতাদের নিকট হইতে লূত সম্প্রদায়ের সম্পর্কে অবহিত হইলেন যে, তাহাদিগকে মাটির ঢেলা নিক্ষেপ করিয়া বিলীন করিয়া দেওয়া হইবে (৫১ঃ ৩৩)। তখন লূত (আ)-এর প্রতি স্নেহভরে বলিলেন, إِنَّ فِيهَا لُوْطًا “এই জনপদে তো লূত রহিয়াছে” (২৯ঃ ৩২)। ফেরেশেতাগণ জবাবে বলিলেন, نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَنْ فِيْهَا لَنُنَجِّيَنَّهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ “সেথায় কাহারা আছে, তাহা আমরা ভালো জানি। আমরা তো লূতকে ও তাহার পরিজনবর্গকে রক্ষা করিবই, তাহার স্ত্রীকে ব্যতীত” (২৯ঃ ৩২)। অতঃপর আল্লাহ্র পক্ষ হইতে স্থির সিদ্ধান্ত ঘোষিত হইল : يَا إِبْرَاهِيمُ أَعْرِضْ عَنْ هَذَا إِنَّهُ قَدْ جَاءَ أَمْرُ رَبِّكَ وَإِنَّهُمْ آَتِيهِمْ عَذَابٌ غَيْرُ مَرْدُود. "হে ইবরাহীম! ইহা হইতে বিরত হও। তোমার প্রতিপালকের বিধান আসিয়া পড়িয়াছে; উহাদের প্রতি তো আসিবে এমন শাস্তি যাহা অনিবার্য" (১১:৭৬) (দ্র. ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া, ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১৭৮-১৭৯; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ১৫৩-১৫৪)।
📄 প্রথম পুত্র ইসমাঈল (আ)-এর জন্ম
আল-কুরআনে ইবরাহীম (আ)-এর প্রথম পুত্র ইসমাঈল (আ)-এর জন্মবৃত্তান্ত বিস্তারিতভাবে উল্লিখিত হয় নাই। বাইবেলের বর্ণনামতে ইবরাহীম (আ) আল্লাহ্র নিকট সুসন্তান প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তাঁহাকে উহার সুসংবাদ দেন। কুরআন কারীমেও ইহার উল্লেখ আছে। ইরশাদ হইয়াছে:
رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّلِحِينَ فَبَشِّرْنَهُ بِغُلَامٍ حَلِيمٍ (۳۷ : ۱۰۰-۱۰۱) "(ইবরাহীম বলিল,) হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এক সৎকর্মপরায়ণ সন্তান দান কর। অতঃপর আমি তাহাকে এক স্থিরবুদ্ধি পুত্রের সুসংবাদ দিলাম" (৩৭ঃ ১০০-১০১)।
পুত্র ইসমাঈল এই কথার সঙ্গে সঙ্গে নির্দ্বিধায় ও সোৎসাহে উত্তর দিলেন: قَالَ يَابَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللهُ مِنَ الصَّابِرِينَ (۳۷:۱۰۲) "সে বলিল, হে আমার পিতা! আপনি যাহা আদিষ্ট হইয়াছেন তাহাই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাইবেন" (৩৭ঃ ১০২)।
কোন কোন ইতিহাসবিদের বর্ণনামতে ইবরাহীম (আ) প্রথমেই যবাহের কথাটি প্রকাশ করেন নাই, বরং যবাহের স্থানে (মিনা) পৌঁছিয়া তাঁহাকে এই কথা জানান এবং ইসমাঈল (আ) তখন উক্ত উত্তর দেন। প্রথমে তাঁহাকে কাষ্ঠ সংগ্রহ করার কথা বলা হইয়াছিল (তাবারী, তারীখ, ১খ., ১৪০-১৪১)।