📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বিবাহ

📄 বিবাহ


হযরত ইবরাহীম (আ) কত বৎসর বয়সে বিবাহ করেন তাহা সুস্পষ্টরূপে জানা যায় না। তবে অগ্নিকুণ্ড হইতে বাহির হওয়ার অব্যবহিত পরই তিনি বিবাহ করেন বলিয়া ধারণা করা হয়। স্বীয় চাচাতো ভগ্নি সারা বিনত হারান আল-আকবারকে তিনি বিবাহ করেন। সুদ্দীর বর্ণনামতে সারা ছিলেন হাররান সম্রাটের কন্যা। তিনি তাহার কওমের দীনের ব্যাপারে সমালোচনা করিতেন। ইবরাহীম (আ) যখন শাম অভিমুখে রওয়ানা হন তখন সারার সাক্ষাত পান এবং তাহাকে এই শর্তে বিবাহ করেন যে, তিনি তাহাকে পরিবর্তন করিতে পারিবেন না (তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২৫; ছালাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮৩; ইবনুল জাওযী, তারীখুল মুনতাজাম, ১খ, ২৬২)। তবে হাফিজ ইবন কাছীর এই মতটিকে বিরল বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। আর কেহ কেহ ধারণা করেন, যেমন সুহায়লী কুতায়বা ও মাক্কাশ হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, সারা ইবরাহীম (আ)-এর ভ্রাতা হারানের কন্যা, লূত (আ)-এর ভগ্নী। ইহাদের দাবি হইল, তখনকার শরীআতে ভ্রাতুষ্পুত্রীকে বিবাহ করা বৈধ ছিল। এইজন্য হাফিজ ইবন কাছীর এই মতটিকে জোরদারভাবে প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন যে, ইহা অজ্ঞতার ফল এবং ইহার সপক্ষে কোন প্রমাণ নাই। যদি মানিয়াও লওয়া যায় যে, তখনকার সময়ে উহা বৈধ ছিল, যেমন ইয়াহূদী পণ্ডিতগণ হইতে বর্ণিত আছে, তবুও আম্বিয়া-ই কিরাম উহার উপর আমল করেন নাই। ইবন কাছীর-এর মতে সারা ইবরাহীম (আ)-এর চাচা হারান এর কন্যা ছিলেন। ইহাই অধিকতর সঠিক ও প্রসিদ্ধ বলিয়া তিনি মত ব্যক্ত করিয়াছেন (ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১৫০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হিজরত

📄 হিজরত


হযরত ইবরাহীম (আ) স্বীয় পিতা, তাঁহার সম্প্রদায় ও বাদশাহকে অত্যন্ত নম্রভাবে নসীহতের দ্বারা, যুক্তি ও বুদ্ধির দ্বারা বিভিন্নভাবে এক আল্লাহ্র প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত দিলেন। তাঁহার সহিত শরীক করিতে নিষেধ করিলেন এবং মূর্তিপূজা ত্যাগ করিতে বলিলেন। কিন্তু তাহারা উহা প্রত্যাখ্যান করিল। তাঁহার সম্প্রদায় তাঁহাকে আগুনে ফেলিল। কিন্তু আল্লাহ তাহা ঠাণ্ডা ও নিরাপদ করিয়া দিলেন। আর পিতা তাঁহাকে উক্ত পথ ত্যাগ না করিলে প্রস্তরাঘাতে প্রাণনাশ করার হুমকি দিল। তাঁহার প্রতি কেবল স্ত্রী সারা এবং ভ্রাতুষ্পুত্র লূত (আ) ইব্‌ন হারান ব্যতীত আর কেহ ঈমান আনয়ন করিল না। ইহাতে ইবরাহীম (আ) ভীষণভাবে মনক্ষুন্ন হইলেন এবং স্বদেশ ভূমি ত্যাগ করত অন্যত্র গিয়া দীন প্রচার করিতে মনস্থ করিলেন। তিনি বলিলেন:
اِنِّي ذَاهِبٌ إِلَى رَبِّي سَيَهْدِيْنِ . (۳۷:۹۹)
"আমি আমার প্রতিপালকের দিকে চলিলাম, তিনি আমাকে অবশ্যই সৎ পথে পরিচালিত করিবেন" (৩৭ঃ ৯৯)।
অতঃপর নিরাশ হইয়া তিনি বাবেলের কৃছা হইতে বাহির হইয়া কালদানীগণের বাসস্থান ফুরাত নদীর পশ্চিম তীরের কাছাকাছি 'ঊর' নামক একটি জনপদে হিজরত করিলেন। এই সফরে তাঁহার সঙ্গে ছিলেন স্বীয় স্ত্রী সারা ও ভ্রাতুষ্পুত্র লূত (আ) ইব্‌ন হারান (ইব্‌ন কুতায়বা, আল-মা'আরিফ, পৃ. ৩২; আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮৩)। কিছুদিন পর এখান হইতে হারান (হাররান) চলিয়া যান এবং সেখানে দীন-ই হানীফের প্রচার শুরু করেন। এই সময়ে তিনি স্বীয় পিতা আযর-এর হিদায়াতের জন্য দু'আ করিতে থাকেন। কারণ অত্যন্ত নম্র ও দয়ার্দ্র হৃদয়ের অধিকারী হওয়ার কারণে পিতা কর্তৃক দীন-ই হানীফের দাওয়াত প্রতাখ্যান এবং তাঁহাকে ভর্ৎসনা করা সত্ত্বেও তিনি বলিয়াছিলেন:
سَلَّمَ عَلَيْكَ سَاسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي إِنَّهُ كَانَ بِي حَفِيًّا (١٩:٤٧)
"তোমার প্রতি সালাম। আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিব। নিশ্চয়ই তিনি আমার প্রতি অতিশয় অনুগ্রহশীল” (১৯:৪৭)।
অবশেষে আল্লাহ তা'আলা ওহীর মাধ্যমে তাঁহাকে জানাইয়া দিলেন যে, তাঁহার পিতা ঈমান আনয়ন করিবে না, সে আল্লাহ্ শত্রুই থাকিয়া যাইবে। এই কথা জানার পর ইবরাহীম (আ) তাঁহার পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা হইতে বিরত থাকেন। কুরআন কারীমে ইহাই সুস্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে:
وَمَا كَانَ اسْتِغْفَارُ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ إِلَّا عَنْ مَوْعِدَةٍ وَعَدَهَا إِيَّاهُ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ أَنَّهُ عَدُوٌّ لِلَّهِ تَبَرَأَ مِنْهُ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَأَوَاهُ حَلِيمٌ. (٩:١١٤)
"ইবরাহীম তাহার পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিয়ছিল, তাহাকে ইহার প্রতিশ্রুতি দিয়াছিল বলিয়া। অতঃপর যখন ইহা তাহার নিকট সুস্পষ্ট হইল যে, সে আল্লাহ্ শত্রু তখন ইবরাহীম উহার সম্পর্ক ছিন্ন করিল। ইবরাহীম তো কোমল হৃদয় ও সহনশীল" (৯:১১৪)।
বাইবেলের বর্ণনামতে এই সফরে ইবরাহীম (আ)-এর পিতা তারাহ (আযর) ও সঙ্গে ছিল। এই হারানে অবস্থানকালে ২০৫ (মতান্তরে ২৫০) বৎসর বয়সে তারাহ মৃত্যুবরণ করে (Genesis, 11: 31-32; মুহাম্মদ আল-ফুকা, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬১; ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, পৃ. ১৫০)। এইভাবে দীন-ই হানীফ-এর দাওয়াত দিতে দিতে তিনি হারান হইতে হিজরত করিয়া ফিলিসতীন পৌঁছিলেন। এই সফরেও তাঁহার সঙ্গী ছিলেন স্বীয় স্ত্রী সারা, ভ্রাতুষ্পুত্র লূত এবং তাঁহার স্ত্রী কুরআন কারীমে লূত (আ) কর্তৃক ইবরাহীম (আ)-এর উপর ঈমান আনয়ন এবং তাঁহার সহিত হিজরত করার কথা এইভাবে বিবৃত হইয়াছে:
فَأَمَنَ لَهُ لُوطُ . وَقَالَ إِنِّي مُهَاجِرُ إِلَى رَبِّي إِنَّهُ هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (٢٩:٢٦)
"লূত তাহার (ইবরাহীম-এর) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিল। ইবরাহীম বলিল, আমি আমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করিতেছি। তিনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়" (২৯: ২৬)।
আর হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে যে, উছমান (রা) যখন স্বীয় স্ত্রী হযরত রুকায়্যা (রা)-কে লইয়া হাবশা হিজরত করেন তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেন:
إن عثمان اول مهاجر باهله بعد لوط عليه السلام
"নিশ্চয়ই লূত (আ)-এর পর উছমানই প্রথম ব্যক্তি, যে সস্ত্রীক হিজরত করিয়াছে (আবদুল ওয়াহ্হাব নাজ্জার, কাসাসুল কুরআন, পৃ. ৮৪)।
অতঃপর ইবরাহীম (আ) ফিলিসতীনের পশ্চিমাঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। তৎকালে এই অঞ্চলটি কান'আনীদের অধীনস্থ ছিল। অতঃপর নিকটেই শাকীম (বর্তমান নাম নাবলুস) নামক স্থানে চলিয়া যান। আহলে কিতাবের বর্ণনামতে ফিলিসতীনে থাকাকালে আল্লাহ তাঁহার নিকট ওহী প্রেরণ করেন, তোমার পর এই ভূমিকে আমি বরকতময় করিব। তখন ইবরাহীম (আ) সেখানে একটি কুরবানীর স্থান তৈরি করিলেন এই নি'মাতের শুকরিয়াস্বরূপ (Genesis, 12: 8; ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, পৃ. ১৫০)। নাবলুসেও তিনি বেশি দিন অবস্থান করেন নাই। আরো পশ্চিম দিকে অগ্রসর হইয়া মিসর চলিয়া যান। মিসরের রাজত্ব ছিল তখন 'আমালীক সম্প্রদায়ের হাতে রোমানগণ যাহাদিগকে 'হাকসূস' নামে অভিহিত করিত (আবদুল ওয়াহ্হাব নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮৪)। কোন কোন ঐতিহাসিকের বর্ণনামতে মিসরের তৎকালীন ফির'আওন ছিল অত্যাচারী বাদশাহ আদ-দাহ্হাক-এর ভ্রাতা। দাহ্হাক-এর পক্ষ হইতে সে তখন মিসরের গভর্নর ছিল। আর কাহারও মতে তাহার নাম ছিল সিনান ইবন 'আলওয়ান ইব্‌ন 'উবায়দ ইব্‌ন 'উওয়ায়জ ইবন 'আমলাক ইব্‌ন লাউদ ইব্‌ন সাম ইব্‌ নূহ (আ)। ইব্‌ন হিশাম তাঁহার তীজান গ্রন্থে 'আমর ইবন ইমরুউল কায়স ইন মাইলুন (মায়ালবুন) ইবন সাবা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। সে ছিল মিসরে। কোন কোন বর্ণনায় তাহার নাম সাদৃফ বা সাদৃক বলিয়াও উল্লেখ আছে (ইবনুল আছীর, আল-কামিল, পৃ. ৭৭)। সুহায়লী ইহা বর্ণনা করিয়াছেন (ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, পৃ. ১৫২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হাজার (হাজেরা)-এর পরিচয়

📄 হাজার (হাজেরা)-এর পরিচয়


বাইবেলে হযরত হাজার (আ)-কে ইবরাহীম (আ)-এর স্ত্রী সারার 'মিসরীয় দাসী' বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে (Genesis, 16: 1)। সারা বন্ধ্যা ও নিঃসন্তান ছিলেন। ইবরাহীম (আ) নিঃসন্তান ও নির্বংশ থাকিবেন ইহা তাহার নিকট খুবই দুঃখের বিষয় ছিল। তাই সন্তানের আশায় তিনি আপন দাসী হাগারকে আপন স্বামী আব্রামের সহিত বিবাহ দেন (Genesis, 16: 3)। এই সূত্র ধরিয়া পাশ্চাত্যের সকল লেখক এবং কোন কোন মুসলিম লেখকও তাহাদের অনুসরণ করত হাজারকে সাধারণ একজন দাসী বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। কিন্তু ইহা সঠিক নহে, বরং বলা যায় অজ্ঞতা বা বিদ্বেষের ফল। প্রকৃতপক্ষে হাজার ছিলেন মিসরের রাজকন্যা (আল-কিসাঈ, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ১৪২; ইসলামী বিশ্বকোষ ২০ খ, ৫৬০-৬১)।
আল্লাহ তা'আলার প্রতি তাঁহার দৃঢ় বিশ্বাস, অবিচল আস্থা, ও মজবুত ইয়াকীন ছিল। তাই সম্পূর্ণ জনমানবহীন মরু প্রান্তরে সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় মাত্র কয়েকটি খেজুর ও কিছু পানি দিয়া ইবরাহীম (আ) যখন চলিয়া যাইতেছিলেন তখন শিশু সন্তানসহ নিশ্চিত মৃত্যুর হাতছানি দেখিয়া তিনি ইবরাহীম (আ)-এর পিছু গমন করত জিজ্ঞাসা করিলেন, "আমাদিগকে এই জনমানবহীন মরুপ্রান্তরে রাখিয়া আপনি কোথায় যাইতেছেন?" কয়েকবার এইরূপ বলার পরও ইবরাহীম (আ)-এর পক্ষ হইতে কোন উত্তর না পাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "আল্লাহই আপনাকে এইরূপ করিতে নির্দেশ দিয়াছেন কি?" ইবরাহীম (আ) বলিলেন, হাঁ। তখন যেন তিনি আশ্রয় খুঁজিয়া পাইলেন। দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলিলেন, اذا لا يضيعنا "তাহা হইলে আল্লাহ আমাদিগকে ধ্বংস করিবেন না" (ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, পৃ. ১৫৪)।
তিনটি মিথ্যা কথন
পূর্বে আলোচিত হযরত ইবরাহীম (আ)-এর কর্মকাণ্ডে বাহ্যত প্রতীয়মান হয় যে, তিনটি স্থানে তিনি মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন : (১) তাঁহার সম্প্রদায় তাঁহাকে মেলায় যাইতে বলিলে তিনি বলিয়াছিলেন 'আমি অসুস্থ'; (২) মন্দিরের মূর্তিগুলি ভাঙ্গিয়া বড়টির ঘাড়ে কুঠার রাখিয়া দিয়াছিলেন এবং তাহাদের জিজ্ঞাসার উত্তরে বলিয়াছিলেন: 'উহাদের এই বড়টিই এই করিয়াছে'; (৩) হিজরত করিয়া মিসরে উপস্থিত হইলে সেখানকার জালিম বাদশাহর নিকট স্বীয় স্ত্রী সারাকে ভগ্নী পরিচয় দেন। হাদীছেও ইহার সমর্থন পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন :

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তিনটি মিথ্যা কথন

📄 তিনটি মিথ্যা কথন


পূর্বে আলোচিত হযরত ইবরাহীম (আ)-এর কর্মকাণ্ডে বাহ্যত প্রতীয়মান হয় যে, তিনটি স্থানে তিনি মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন : (১) তাঁহার সম্প্রদায় তাঁহাকে মেলায় যাইতে বলিলে তিনি বলিয়াছিলেন 'আমি অসুস্থ'; (২) মন্দিরের মূর্তিগুলি ভাঙ্গিয়া বড়টির ঘাড়ে কুঠার রাখিয়া দিয়াছিলেন এবং তাহাদের জিজ্ঞাসার উত্তরে বলিয়াছিলেন: 'উহাদের এই বড়টিই এই করিয়াছে'; (৩) হিজরত করিয়া মিসরে উপস্থিত হইলে সেখানকার জালিম বাদশাহর নিকট স্বীয় স্ত্রী সারাকে ভগ্নী পরিচয় দেন। হাদীছেও ইহার সমর্থন পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন :
لَمْ يَكْذِبُ إِبْرَاهِيمُ النَّبِيُّ عَلَيْهِ السَّلَامُ قَطَ إِلَّا ثَلْثَ كَذَبَاتٍ .
"নবী ইবরাহীম (আ) তিনটি স্থলে ছাড়া আর কখনও মিথ্যা (বাহ্যত) বলেন নাই...." (বুখারী, আস-সাহীহ, ৪খ, ২৮০; মুসলিম, আস-সাহীহ, ৭খ, ৯৭-৯৮)।
এই হাদীছটি হাদীছের বিভিন্ন কিতাবে উল্লিখিত আছে। এতদ্ব্যতীত বুখারীতে আরো একটি দীর্ঘ হাদীছ আছে যাহা শাফা'আতের হাদীছ নামে খ্যাত (উহা বিভিন্ন অধ্যায়ে, যথা সূরা বাকারার তাফসীর অধ্যায়ে, কিতাবুর রিকাক ও কিতাবুত-তাওহীদ-এ উল্লিখিত হইয়াছে)। উহাতে ইবরাহীম (আ) সম্পর্কে যে আলোচনা করা হইয়াছে তাহার সারাংশ হইল : হাশরের ময়দানে যখন সকল মানুষ হযরত আদম ও নূহ (আ)-এর নিকট আল্লাহ্র দরবারে সুপারিশের অনুরোধ করিয়া এক পর্যায়ে ইবরাহীম (আ)-এর নিকট গিয়া বলিবে, আপনি আল্লাহর খলীল! আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন যেন শীঘ্রই তিনি আমাদের ফায়সালা করেন। তখন তিনি বলিবেন, আমি লজ্জাবোধ করিতেছি। কারণ দুনিয়াতে আমি তিনটি মিথ্যা বলিয়াছিলাম : بل فعله كبيرهم هذا ، اني سقيم এবং স্ত্রীকে বলিয়াছিলাম انى اخوك সাহীহ বুখারী ছাড়াও এই রিওয়ায়াত মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ, সাহীহ ইবন খুযায়মা, হাকেমের মুসতাদরাক, মু'জাম তাবারানী, মুসান্নাফ ইব্‌ন আবী শায়বা, তিরমিযী ও মুসনাদ আবী আওয়ানাতে বিভিন্ন সাহাবী হইতে রিওয়ায়াত বর্ণিত আছে। কোনটিতে সংক্ষিপ্ত, কোনটিতে বিস্তারিত। ইহারই কোন কোন বর্ণনায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, ما منها كذبة الا حل بها عن دين الله অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, "ইবরাহীম (আ)-এর তিনটি মিথ্যার প্রতিটিই কেবলমাত্র আল্লাহর দীনের স্বার্থেই বলিয়াছিলেন।"
মোটকথা এই উভয় রিওয়ায়াতই বুখারী ও মুসলিমের রিওয়ায়াত যাহা সর্বপ্রকার ত্রুটিমুক্ত। এই রিওয়ায়াত ইবরাহীম (আ)-এর ন্যায় একজন উঁচু স্তরের মহান নবীর প্রতি 'মিথ্যা' আরোপ করে। যদিও এই সকল রিওয়ায়াতের কোন কোনটিতে স্পষ্ট করিয়া দেওয়া হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) এই ক্ষেত্রে 'মিথ্যা' (كذب) -এর দ্বারা সেই প্রচলিত সাধারণ অর্থ বুঝান নাই যাহা কথাবার্তা ও আচার-আচরণে খুবই ঘৃণ্য ও কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। ইহার বিপরীত তিনি এই কথা স্পষ্ট করিয়া দিয়াছেন যে, ইবরাহীম (আ) এই তিনটি কথা কোন ব্যক্তিস্বার্থে কিংবা পার্থিব কোন লাভের জন্য বলেন নাই; বরং সত্যের দুশমনদের বিরুদ্ধে আল্লাহ তা'আলার খাঁটি দীনের স্বার্থেই বলিয়াছিলেন।
ইহা ঠিক যে, কোন কোন রিওয়ায়াত সুস্পষ্টভাবে ইহাকে 'মিথ্যা' (كذب) -এর সাধারণ অর্থ হইতে পৃথক করিয়া দিয়াছে। তবুও প্রথমত, এই 'অতিরিক্ত ব্যাখ্যা' বুখারী-মুসলিমের রিওয়ায়াতে নাই, যদিও সাহীহ রিওয়ায়াতে তাহা উল্লেখ আছে। দ্বিতীয়ত, 'সত্যবাদিতা' যখন নবীদের অবিচ্ছেদ্য এবং নবীর পবিত্র ও নিষ্পাপ থাকার জন্য অপরিহার্য একটি গুণ, উপরন্তু কুরআন কারীমে যখন বিশেষভাবে ইবরাহীম (আ) সম্পর্কে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি সুষ্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে, তখন তাঁহার সম্পর্কে বাহ্যিক মিথ্যার আরোপ শোভনীয় হয় না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00