📄 নমরুদের সহিত বিতর্ক
“তাহার সম্প্রদায় তাহার সহিত বিতর্কে লিপ্ত হইল। সে বলিল, তোমরা কি আল্লাহ সম্বন্ধে আমার সহিত বিতর্কে লিপ্ত হইবে? তিনি তো আমাকে সৎপথে পরিচালিত করিয়াছেন। আমার প্রতিপালক অন্যবিধ ইচ্ছা না করিলে তোমরা যাহাকে তাঁহার শরীক কর তাহাকে আমি ভয় করি না। সব কিছুই আমার প্রতিপালকের জ্ঞানায়ত্ত, তবে কি তোমরা অনুধাবন করিবে না? তোমরা যাহাকে আল্লাহ্র শরীক কর আমি তাহাকে কিরূপে ভয় করিব? অথচ তোমরা আল্লাহ্ শরীক করিতে ভয় কর না, যে বিষয়ে তিনি তোমাদিগকে কোন সনদ দেন নাই। সুতরাং যদি তোমরা জান তবে বল, দুই দলের মধ্যে কোন্ দল নিরাপত্তা লাভের বেশী হকদার" (৬: ৮০-৮১)?
নমরূদের সহিত বিতর্ক
অতঃপর নমরূদ ইবরাহীম (আ)-কে বলিল, তুমি যে ইলাহের ইবাদত কর এবং যাঁহার ইবাদত করিতে অন্যকে দাওয়াত দাও, যাঁহার শক্তির কথা উল্লেখ কর এবং অন্যের উপর প্রাধান্য দাও তিনি কে? ইবরাহীম (আ) বলিলেন, তিনি আমার প্রতিপালক, যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান। নমরূদ বলিল, আমিও তো জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই। ইবরাহীম বলিল, তুমি কিভাবে জীবন দান কর ও মৃত্যু ঘটাও? নমরূদ বলিল, আমি দুই ব্যক্তিকে ধরিয়া আনিব যাহাদিগকে আমার নির্দেশে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হইয়াছে। অতঃপর উহাদের একজনকে হত্যা করিব। এইভাবে আমি তাহার মৃত্যু ঘটাইলাম। আর অপরজনকে ক্ষমা করিয়া মুক্তি দিব। এইভাবে আমি তাহার জীবন দান করিলাম। তখন ইবরাহীম (আ) বলিলেন, "আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক হইতে উদয় করান, তুমি উহাকে পশ্চিম দিক হইতে উদয় করাও তো'। তখন যে কুফরী করিয়াছিল সে (নমরূদ) হতবুদ্ধি হইয়া গেল" (২ঃ ২৫৮)। সে বুঝিতে পারিল যে, ইহা তাহার দ্বারা সম্ভব নহে। দলীল-প্রমাণে সে পরাস্ত হইল (তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২২-১২৩; ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৭৯)।
এইসব বাদানুবাদে ও দলীল-প্রমাণে পরাস্ত হইয়া নমরূদ ও তাহার সম্প্রদায় ইবরাহীম (আ)-এর উপর দারুণভাবে ক্ষিপ্ত হইল। তাহারা আলোচনা করিল যে, ইবরাহীমকে কাটিয়া টুকরা টুকরা করিতে হইবে। কিন্তু তাহারা ভাবিয়া দেখিল যে, এই শাস্তি তো কিছুক্ষণের মধ্যে শেষ হইয়া যাইবে, তাহাতে তাহাদের অন্তরে ক্রোধের যে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হইয়াছে উহা নিভিবে না। তাই তাঁহাকে এমন শাস্তি দিতে হইবে যাহা তিল তিল করিয়া তাঁহাকে দগ্ধীভূত করিবে। তাহারা সবশেষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল যে, তাঁহাকে অগ্নিতে দগ্ধীভূত করিয়া হত্যা করিতে হইবে। আর এমন অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করিতে হইবে যে, উহার উপর দিয়া উড্ডীয়মান পাখিও যেন পুড়িয়া যায় এবং যাহা ইতিহাসে প্রসিদ্ধ হইয়া থাকে (মাহমূদ যাহরান, কাসাস মিনাল-কুরআন, পৃ. ৫৬)।
কুরআন কারীমে এই দিকেই ইঙ্গিত করা হইয়াছে: قَالُوا حَرِّقُوهُ وَانْصُرُوا الهَتَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ فَعَلَيْنَ (٢١:٦٨)
"উহারা বলিল, তাহাকে পোড়াইয়া দাও এবং সাহায্য কর তোমাদের দেবতাগুলিকে, তোমরা যদি কিছু করিতে চাহ” (২১ঃ ৬৮)।
মুজাহিদ বলেন, আমি একবার আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা)-এর সম্মুখে উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করিলাম। তখন তিনি বলিলেন, মুজাহিদ! তুমি কি জান কে সর্বপ্রথম ইবরাহীম (আ)-কে অগ্নিতে দগ্ধীভূত করার প্রস্তাব করিয়াছিল? আমি বলিলাম, না। তিনি বলিলেন, পারস্যের এক বেদুঈন। আমি বলিলাম, হে আবূ আবদুর রাহমান! পারস্যে কি বেদুঈন আছে? তিনি বলিলেন, হ্যাঁ, কুর্দীরাই পারস্যের বেদুঈন। তাহাদেরই এক ব্যক্তি ইবরাহীম (আ)-কে আগুনে দগ্ধীভূত করিবার প্রস্তাব করিয়াছিল (তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২৩)। ইব্ন জুরায়জ শু'আয়ব আল-জুব্বাঈ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, যে ব্যক্তি এই প্রস্তাব করিয়াছিল তাহার নাম 'হায়যান'। আল্লাহ তাহাকে মাটিতে ধ্বসাইয়া দিয়াছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত সে মাটির নীচে ধ্বসিতে থাকিবে (ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৭৫)।
অতঃপর নমরূদ কাষ্ঠ সংগ্রহ করার নির্দেশ দিল এবং ইবরাহীম (আ)-কে বন্দী করিয়া রাখিল। তাঁহার জন্য একটি পাকা প্রাচীরযুক্ত ইমারত নির্মাণ করিল (ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮১; তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২৩-১২৪)। এই সম্পর্কে কুরআন কারীমে বলা হইয়াছে:
قَالُوا ابْنُوا لَهُ بُنْيَانًا فَالْقُوهُ فِي الْحَحِيمِ (۳۷:٩٧)
"তাহারা বলিল, ইহার জন্য এক ইমারত নির্মাণ কর, অতঃপর ইহাকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ কর" ( ৩৭ঃ ৯৭)।
ইহার পর তাহারা বিভিন্ন প্রকারের কাষ্ঠ সংগ্রহ করিল। এক বর্ণনামতে এক মাস যাবত এই কাষ্ঠ সংগ্রহ অভিযান চলে। ইহাকে তাহারা ধর্মীয় দিক হইতে পূণ্যের কাজ মনে করিত, এমনকি কোন মহিলা রোগাক্রান্ত হইলে তাহা আরোগ্যের জন্য অথবা কোন কাম্য বস্তু পাওয়ার জন্য কাষ্ঠ সংগ্রহ করার মানত করিত (তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২৩-১২৪; ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮১)। কাষ্ঠ সংগৃহীত হইলে চতুর্দিক হইতে তাহারা উহাতে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করিল। এই অগ্নির তেজ এত তীব্র ছিল যে, উপর দিয়া কোন পাখি উড়িয়া যাইতে লাগিলে তাহা পুড়িয়া ছাই হইয়া যাইত। অগ্নি প্রজ্জ্বলনের পর তাহারা ইবরাহীম (আ)-কে ইমারতের উপরে উঠাইয়া হাত-পা বাঁধিল। অতঃপর ইবলীসের পরামর্শ মত একটি প্রস্তর নিক্ষেপণ যন্ত্র (মিনজানীক) বানাইল এবং ইবরাহীম (আ)-কে উহাতে উঠাইল। তাহারা যখন তাঁহাকে অগ্নিকুণ্ডে ফেলিতে উদ্যত হইল তখন জিন ও মানব ব্যতীত আসমান-যমীন, পাহাড়-পর্বত ও উহার মধ্যে যত সৃষ্টি আছে ফেরেশতাসহ সবাই একবাক্যে চীৎকার করিয়া আল্লাহ্র নিকট ফরিয়াদ জানাইল, "হে আল্লাহ! পৃথিবীর বুকে ইবরাহীম ছাড়া আর দ্বিতীয় কেহ নাই যে, তোমার ইবাদত করিবে। তোমার জন্যই তাঁহাকে অগ্নিতে জ্বালানো হইতেছে। তাঁহাকে সাহায্য করিবার জন্য আমাদিগকে অনুমতি দাও।"
তখন আল্লাহ তাআলা বলিলেন, আমি তাঁহার ব্যাপারে অধিক অবগত। সে যদি তোমাদের মধ্যে কাহারও নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে অথবা কাহারো সাহায্য কামনা করে তবে সে যেন তাঁহাকে সাহায্য করে। আমি তাঁহাকে সেই ব্যাপারে অনুমতি দিলাম। আর যদি আমি ছাড়া অন্য কাহারো সাহায্য প্রার্থনা না করে তবে আমিই তাঁহার জন্য যথেষ্ট (ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৭৬)।
এক বর্ণনামতে ইবরাহীম (আ)-কে আগুনে নিক্ষেপ করিতে উদ্যত হইলে পানির ফেরেশতা তাঁহার নিকট আসিয়া বলিল, আপনি চাহিলে আমি অগ্নি নিভাইয়া দিব। কারণ পানি ও বৃষ্টির ভাণ্ডার আমার হাতে। বাতাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা আসিয়া বলিল, আপনি চাহিলে এই অগ্নিকুণ্ড আমি বাতাসে উড়াইয়া দিব। কিন্তু ইবরাহীম (আ) বলিলেন, তোমাদের কাহারো নিকট আমার কোন প্রয়োজন নাই (ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৮১)।
অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মাথা উঠাইয়া বলিলেন, হে আল্লাহ! আকাশে তুমিই একক সত্তা এবং দুনিয়াতে আমি এক ব্যক্তি। দুনিয়াতে আমি ছাড়া আর এমন কেহ নাই, যে তোমার ইবাদত করিবে (তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২৪; ছা'লাবী, প্রাগুক্ত)। ইবন কাছীরের বর্ণনা মতে ইবরাহীম (আ) এই বলিয়া দু'আ করিয়াছিলেন, “তুমিই আসমানে একক ও যমীনেও একক। আমার জন্য তুমিই যথেষ্ট ও উত্তম কর্মবিধায়ক” (আল কামিল, ১খ, পৃ. ৭৬)। মুতামির আরকাম (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ইবরাহীম (আ)-কে হাত পা বাঁধিয়া যখন তাহারা অগ্নিতে নিক্ষেপ করিতেছিল তখন তিনি বলিলেন,
لَا اِلَهَ اِلَّا اَنْتَ سُبْحَانَكَ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ لَكَ الْحَمْدُ وَلَكَ الْمُلْكُ لَا شَرِيْكَ لَكَ.
"তুমি ছাড়া কোন ইলাহ নাই। তুমি জগৎসমূহের প্রতিপালক, প্রশংসা তোমারই। রাজত্ব ও কর্তৃত্ব তোমারই। তোমার কোন শরীক নাই" (প্রাগুক্ত)। এক বর্ণনামতে তখন জিবরীল (আ) আসিয়া বলিলেন, ইবরাহীম! তোমার কোন প্রয়োজন আছে কি? তিনি বলিলেন, আপনার কাছে কোন প্রয়োজন নাই। জিবরীল (আ) বলিলেন, তবে তোমার প্রতিপালকের নিকট আবেদন কর। তিনি বলিলেন, তিনি আমার অবস্থা সম্পর্কে সব কিছুই অবগত আছেন। তাই তাঁহার অবগতিই যথেষ্ট।
حَسْبِيَ اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيْلُ.
"আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি কত উত্তম কর্মবিধায়ক" (প্রাগুক্ত; ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১৪৬)। অতঃপর তাহারা মিনজানীকের সাহায্যে তাঁহাকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করিল। তখন আল্লাহ ত'আলা আগুনকে বলিলেন।
يَا نَارُ كُونِي بَرْداً وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ. (২১:৬৯)
"হে অগ্নি! তুমি ইবরাহীমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হইয়া যাও" (২১ঃ ৬৯)।
সুদ্দীর বর্ণনামতে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে জিবরীল (আ) এই ঘোষণা দিয়াছিলেন (ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৮২)। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে প্রজ্জ্বলিত অগ্নি ইবরাহীম (আ)-এর জন্য শীতল ও নিরাপদ হইয়া গেল। শুধু তাহাই নহে, উহা তাঁহার জন্য পরম আরামদায়ক স্থান হইয়া গেল। তাঁহার হাত-পায়ের রশিগুলি আগুনে পুড়িয়া তিনি মুক্ত হইয়া গেলেন। আগুনের প্রতি আল্লাহ ত'আলার উক্ত নির্দেশ শোনার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর সমস্ত অগ্নিই সেই দিন নির্বাপিত হইয়া গিয়াছিল। কা'ব আল-আহবার, কাতাদা ও যুহরী (র) বলেন, পৃথিবীর বুকে ঐদিন কেহই অগ্নি দ্বারা কোন কাজ করিতে পারে নাই। ইবরাহীম (আ)-এর হাত-পায়ের রশি ব্যতীত অগ্নি ঐদিন কোন কিছুকেই দগ্ধীভূত করে নাই (তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২৪)। আলী ইবন আবী তালিব ও ইবন আব্বাস (রা) বলেন, আল্লাহ তা'আলা যদি তাঁহার নির্দেশের মধ্যে বর্দ (শীতল) শব্দের পর সালাম (নিরাপদ) শব্দ না আনিতেন তবে অগ্নি এমন ঠাণ্ডা হইয়া যাইত যে, ঠাণ্ডায় ইবরাহীম ইন্তিকাল করিতেন (প্রাগুক্ত)। গিরগিটি (وزغ) ব্যতীত সকল প্রাণীই সেই দিন ইবরাহীম (আ)-এর আগুন নিভাইতে চেষ্টা করে। এই জন্যই নবী (স) উহাকে হত্যা করিবার নির্দেশ দিয়াছেন এবং তাহাকে ক্ষুদ্র দৃষ্কৃতিকারী (فويسقة) নামে অভিহিত করিয়াছেন (বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুল-আম্বিয়া, ৪খ, ৫৯৮)।
ইবরাহীম (আ) ৭ দিন (ইবন আবী হাতিমের বর্ণনায় ৪০ দিন, আম্বিয়া-ই কুরআন, 'খ., পৃ. ১৯৯) উক্ত অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে অবস্থান করেন। মিনহাল ইবন উমার হইতে বর্ণিত আছে যে, ইবরাহীম (আ) বলিয়াছেন, আমি আগুনের মধ্যে অবস্থানকালীন দিনগুলিতে যে সুখ-স্বচ্ছন্দ ও আরাম-আয়েশ ভোগ করিয়াছিলাম তেমন সুখ-স্বচ্ছন্দ ও আরাম-আয়েশ জীবনে আর কখনো পাই নাই (ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮২)। ইবন ইসহাক প্রমুখ বলেন, আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম (আ)-এর আকৃতিতে ছায়ার ফেরেশতাকে প্রেরণ করিলেন। তিনি ইবরাহীম (আ)-এর পার্শ্বে আসিয়া উপবেশন করিলেন এবং তাঁহাকে সান্ত্বনা দিতে লাগিলেন।
কয়েক দিন পর নমরূদ একটি বাহনে করিয়া সেই অগ্নিকুণ্ডের নিকট দিয়া যাইতেছিল। ইবরাহীম (আ) যে পুড়িয়া ছাইভস্ম হইয়া গিয়াছেন এই ব্যাপারে তাহার কোনই সন্দেহ ছিল না। কিন্তু সে তাঁকাইয়া দেখিল, ইবরাহীম (আ) উহার মধ্যে বসিয়া আছেন। পার্শ্বে তাঁহারই মত এক লোক। সে নিজের চক্ষুকে বিশ্বাস করিতে পারিতেছিল না। সে যাত্রা বিরতি করিয়া ফিরিয়া আসিল এবং তাহার সম্প্রদায়কে ডাকিয়া বলিল, আমি যেন ইবরাহীমকে আগুনের মধ্যে জীবিত দেখিলাম। আমার সন্দেহ হইতেছে। তোমরা আমার জন্য একটি সুউচ্চ স্তম্ভ নির্মাণ কর যেখান হইতে আমি নিম্নে তাঁকাইয়া অগ্নির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিতে পারি। তাহারা স্তম্ভ নির্মাণ করিলে নমরূদ সেখান হইতে তাঁকাইয়া দেখিল, ইবরাহীম (আ) একটি ফুল বাগানে বসিয়া আছেন এবং তাঁহার পার্শ্বে উপবিষ্টে তাঁহারই মত এক লোক অর্থাৎ ফেরেশতাকেও সে দেখিতে পাইল।
নমরূদ ইবরাহীম (আ)-কে ডাকিয়া বলিল, ইবরাহীম! তোমার উপাস্য অতি মহান, যাহার শক্তির ফলে তোমার মধ্যে এবং আগুনের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হইয়াছে। তাই তোমার কোন ক্ষতি হয় নাই। ইবরাহীম! তুমি কি উহা হইতে বাহির হইয়া আসিতে পার? ইবরাহীম (আ) বলিলেন, হাঁ। নমরূদ বলিল, তুমি কি এই ভয় কর যে, তুমি ঐখানে অবস্থান করিলে তোমার কোন ক্ষতি হইবে? ইবরাহীম (আ) বলিলেন, না। নমরূদ বলিল, উঠিয়া দাঁড়াও এবং উহা হইতে বাহির হইয়া আস। ইবরাহীম (আ) উঠিয়া উহার মধ্য দিয়া হাঁটিয়া বাহির হইয়া আসিলেন।
নমরূদের নিকটে আসিলে সে বলিল, ইবরাহীম! তোমার পার্শ্বে উপবিষ্ট তোমারই আকৃতিতে যে লোকটিকে দেখিয়াছিলাম সেই লোকটি কে? ইবরাহীম (আ) বলিলেন, তিনি ছায়ার ফেরেশতা। আমাকে সঙ্গ দিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে আমার নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন। নমরূদ বলিল, হে ইবরাহীম! আমি তোমার উপাস্যের উদ্দেশ্যে কিছু কুরবানী করিব। কারণ আমি তাঁহার শক্তি ও দৃঢ়তা দেখিয়াছি, যাহা তোমার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করিয়াছেন, যখন তুমি কেবল তাঁহারই ইবাদত কর এবং তাঁহারই একত্ব স্বীকার করা ব্যতীত আর সবকিছুই অস্বীকার করিয়াছিলে। আমি তাঁহার জন্য চার হাজার গাভী যবাহ করিব। ইবরাহীম (আ) বলিলেন, তুমি তোমার এই দীনে থাকাবস্থায় তিনি তোমার কিছুই কবুল করিবেন না, যতক্ষণ না তুমি উহা ত্যাগ করিয়া আমার দীন গ্রহণ কর। নমরূদ বলিল, হে ইবরাহীম! আমি আমার রাজত্ব ত্যাগ করিতে পারি না। তবে শীঘ্রই আমি উহা যবাহ করিব। অতঃপর সত্যই সে উহা যবাহ করিল এবং ইবরাহীম (আ)-কে নূতন কোন শাস্তি দেওয়া হইতে বিরত রহিল। সে ইবরাহীম (আ)-কে বলিল, তোমার প্রতিপালক কতই না উত্তম হে ইবরাহীম! (ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮২-৮৩; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২৪; ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৭৬)।
📄 বিবাহ
হযরত ইবরাহীম (আ) কত বৎসর বয়সে বিবাহ করেন তাহা সুস্পষ্টরূপে জানা যায় না। তবে অগ্নিকুণ্ড হইতে বাহির হওয়ার অব্যবহিত পরই তিনি বিবাহ করেন বলিয়া ধারণা করা হয়। স্বীয় চাচাতো ভগ্নি সারা বিনত হারান আল-আকবারকে তিনি বিবাহ করেন। সুদ্দীর বর্ণনামতে সারা ছিলেন হাররান সম্রাটের কন্যা। তিনি তাহার কওমের দীনের ব্যাপারে সমালোচনা করিতেন। ইবরাহীম (আ) যখন শাম অভিমুখে রওয়ানা হন তখন সারার সাক্ষাত পান এবং তাহাকে এই শর্তে বিবাহ করেন যে, তিনি তাহাকে পরিবর্তন করিতে পারিবেন না (তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২৫; ছালাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮৩; ইবনুল জাওযী, তারীখুল মুনতাজাম, ১খ, ২৬২)। তবে হাফিজ ইবন কাছীর এই মতটিকে বিরল বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। আর কেহ কেহ ধারণা করেন, যেমন সুহায়লী কুতায়বা ও মাক্কাশ হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, সারা ইবরাহীম (আ)-এর ভ্রাতা হারানের কন্যা, লূত (আ)-এর ভগ্নী। ইহাদের দাবি হইল, তখনকার শরীআতে ভ্রাতুষ্পুত্রীকে বিবাহ করা বৈধ ছিল। এইজন্য হাফিজ ইবন কাছীর এই মতটিকে জোরদারভাবে প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন যে, ইহা অজ্ঞতার ফল এবং ইহার সপক্ষে কোন প্রমাণ নাই। যদি মানিয়াও লওয়া যায় যে, তখনকার সময়ে উহা বৈধ ছিল, যেমন ইয়াহূদী পণ্ডিতগণ হইতে বর্ণিত আছে, তবুও আম্বিয়া-ই কিরাম উহার উপর আমল করেন নাই। ইবন কাছীর-এর মতে সারা ইবরাহীম (আ)-এর চাচা হারান এর কন্যা ছিলেন। ইহাই অধিকতর সঠিক ও প্রসিদ্ধ বলিয়া তিনি মত ব্যক্ত করিয়াছেন (ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১৫০)।
📄 হিজরত
হযরত ইবরাহীম (আ) স্বীয় পিতা, তাঁহার সম্প্রদায় ও বাদশাহকে অত্যন্ত নম্রভাবে নসীহতের দ্বারা, যুক্তি ও বুদ্ধির দ্বারা বিভিন্নভাবে এক আল্লাহ্র প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত দিলেন। তাঁহার সহিত শরীক করিতে নিষেধ করিলেন এবং মূর্তিপূজা ত্যাগ করিতে বলিলেন। কিন্তু তাহারা উহা প্রত্যাখ্যান করিল। তাঁহার সম্প্রদায় তাঁহাকে আগুনে ফেলিল। কিন্তু আল্লাহ তাহা ঠাণ্ডা ও নিরাপদ করিয়া দিলেন। আর পিতা তাঁহাকে উক্ত পথ ত্যাগ না করিলে প্রস্তরাঘাতে প্রাণনাশ করার হুমকি দিল। তাঁহার প্রতি কেবল স্ত্রী সারা এবং ভ্রাতুষ্পুত্র লূত (আ) ইব্ন হারান ব্যতীত আর কেহ ঈমান আনয়ন করিল না। ইহাতে ইবরাহীম (আ) ভীষণভাবে মনক্ষুন্ন হইলেন এবং স্বদেশ ভূমি ত্যাগ করত অন্যত্র গিয়া দীন প্রচার করিতে মনস্থ করিলেন। তিনি বলিলেন:
اِنِّي ذَاهِبٌ إِلَى رَبِّي سَيَهْدِيْنِ . (۳۷:۹۹)
"আমি আমার প্রতিপালকের দিকে চলিলাম, তিনি আমাকে অবশ্যই সৎ পথে পরিচালিত করিবেন" (৩৭ঃ ৯৯)।
অতঃপর নিরাশ হইয়া তিনি বাবেলের কৃছা হইতে বাহির হইয়া কালদানীগণের বাসস্থান ফুরাত নদীর পশ্চিম তীরের কাছাকাছি 'ঊর' নামক একটি জনপদে হিজরত করিলেন। এই সফরে তাঁহার সঙ্গে ছিলেন স্বীয় স্ত্রী সারা ও ভ্রাতুষ্পুত্র লূত (আ) ইব্ন হারান (ইব্ন কুতায়বা, আল-মা'আরিফ, পৃ. ৩২; আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮৩)। কিছুদিন পর এখান হইতে হারান (হাররান) চলিয়া যান এবং সেখানে দীন-ই হানীফের প্রচার শুরু করেন। এই সময়ে তিনি স্বীয় পিতা আযর-এর হিদায়াতের জন্য দু'আ করিতে থাকেন। কারণ অত্যন্ত নম্র ও দয়ার্দ্র হৃদয়ের অধিকারী হওয়ার কারণে পিতা কর্তৃক দীন-ই হানীফের দাওয়াত প্রতাখ্যান এবং তাঁহাকে ভর্ৎসনা করা সত্ত্বেও তিনি বলিয়াছিলেন:
سَلَّمَ عَلَيْكَ سَاسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي إِنَّهُ كَانَ بِي حَفِيًّا (١٩:٤٧)
"তোমার প্রতি সালাম। আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিব। নিশ্চয়ই তিনি আমার প্রতি অতিশয় অনুগ্রহশীল” (১৯:৪৭)।
অবশেষে আল্লাহ তা'আলা ওহীর মাধ্যমে তাঁহাকে জানাইয়া দিলেন যে, তাঁহার পিতা ঈমান আনয়ন করিবে না, সে আল্লাহ্ শত্রুই থাকিয়া যাইবে। এই কথা জানার পর ইবরাহীম (আ) তাঁহার পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা হইতে বিরত থাকেন। কুরআন কারীমে ইহাই সুস্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে:
وَمَا كَانَ اسْتِغْفَارُ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ إِلَّا عَنْ مَوْعِدَةٍ وَعَدَهَا إِيَّاهُ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ أَنَّهُ عَدُوٌّ لِلَّهِ تَبَرَأَ مِنْهُ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَأَوَاهُ حَلِيمٌ. (٩:١١٤)
"ইবরাহীম তাহার পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিয়ছিল, তাহাকে ইহার প্রতিশ্রুতি দিয়াছিল বলিয়া। অতঃপর যখন ইহা তাহার নিকট সুস্পষ্ট হইল যে, সে আল্লাহ্ শত্রু তখন ইবরাহীম উহার সম্পর্ক ছিন্ন করিল। ইবরাহীম তো কোমল হৃদয় ও সহনশীল" (৯:১১৪)।
বাইবেলের বর্ণনামতে এই সফরে ইবরাহীম (আ)-এর পিতা তারাহ (আযর) ও সঙ্গে ছিল। এই হারানে অবস্থানকালে ২০৫ (মতান্তরে ২৫০) বৎসর বয়সে তারাহ মৃত্যুবরণ করে (Genesis, 11: 31-32; মুহাম্মদ আল-ফুকা, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬১; ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, পৃ. ১৫০)। এইভাবে দীন-ই হানীফ-এর দাওয়াত দিতে দিতে তিনি হারান হইতে হিজরত করিয়া ফিলিসতীন পৌঁছিলেন। এই সফরেও তাঁহার সঙ্গী ছিলেন স্বীয় স্ত্রী সারা, ভ্রাতুষ্পুত্র লূত এবং তাঁহার স্ত্রী কুরআন কারীমে লূত (আ) কর্তৃক ইবরাহীম (আ)-এর উপর ঈমান আনয়ন এবং তাঁহার সহিত হিজরত করার কথা এইভাবে বিবৃত হইয়াছে:
فَأَمَنَ لَهُ لُوطُ . وَقَالَ إِنِّي مُهَاجِرُ إِلَى رَبِّي إِنَّهُ هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (٢٩:٢٦)
"লূত তাহার (ইবরাহীম-এর) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিল। ইবরাহীম বলিল, আমি আমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করিতেছি। তিনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়" (২৯: ২৬)।
আর হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে যে, উছমান (রা) যখন স্বীয় স্ত্রী হযরত রুকায়্যা (রা)-কে লইয়া হাবশা হিজরত করেন তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেন:
إن عثمان اول مهاجر باهله بعد لوط عليه السلام
"নিশ্চয়ই লূত (আ)-এর পর উছমানই প্রথম ব্যক্তি, যে সস্ত্রীক হিজরত করিয়াছে (আবদুল ওয়াহ্হাব নাজ্জার, কাসাসুল কুরআন, পৃ. ৮৪)।
অতঃপর ইবরাহীম (আ) ফিলিসতীনের পশ্চিমাঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। তৎকালে এই অঞ্চলটি কান'আনীদের অধীনস্থ ছিল। অতঃপর নিকটেই শাকীম (বর্তমান নাম নাবলুস) নামক স্থানে চলিয়া যান। আহলে কিতাবের বর্ণনামতে ফিলিসতীনে থাকাকালে আল্লাহ তাঁহার নিকট ওহী প্রেরণ করেন, তোমার পর এই ভূমিকে আমি বরকতময় করিব। তখন ইবরাহীম (আ) সেখানে একটি কুরবানীর স্থান তৈরি করিলেন এই নি'মাতের শুকরিয়াস্বরূপ (Genesis, 12: 8; ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, পৃ. ১৫০)। নাবলুসেও তিনি বেশি দিন অবস্থান করেন নাই। আরো পশ্চিম দিকে অগ্রসর হইয়া মিসর চলিয়া যান। মিসরের রাজত্ব ছিল তখন 'আমালীক সম্প্রদায়ের হাতে রোমানগণ যাহাদিগকে 'হাকসূস' নামে অভিহিত করিত (আবদুল ওয়াহ্হাব নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮৪)। কোন কোন ঐতিহাসিকের বর্ণনামতে মিসরের তৎকালীন ফির'আওন ছিল অত্যাচারী বাদশাহ আদ-দাহ্হাক-এর ভ্রাতা। দাহ্হাক-এর পক্ষ হইতে সে তখন মিসরের গভর্নর ছিল। আর কাহারও মতে তাহার নাম ছিল সিনান ইবন 'আলওয়ান ইব্ন 'উবায়দ ইব্ন 'উওয়ায়জ ইবন 'আমলাক ইব্ন লাউদ ইব্ন সাম ইব্ নূহ (আ)। ইব্ন হিশাম তাঁহার তীজান গ্রন্থে 'আমর ইবন ইমরুউল কায়স ইন মাইলুন (মায়ালবুন) ইবন সাবা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। সে ছিল মিসরে। কোন কোন বর্ণনায় তাহার নাম সাদৃফ বা সাদৃক বলিয়াও উল্লেখ আছে (ইবনুল আছীর, আল-কামিল, পৃ. ৭৭)। সুহায়লী ইহা বর্ণনা করিয়াছেন (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, পৃ. ১৫২)।
📄 হাজার (হাজেরা)-এর পরিচয়
বাইবেলে হযরত হাজার (আ)-কে ইবরাহীম (আ)-এর স্ত্রী সারার 'মিসরীয় দাসী' বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে (Genesis, 16: 1)। সারা বন্ধ্যা ও নিঃসন্তান ছিলেন। ইবরাহীম (আ) নিঃসন্তান ও নির্বংশ থাকিবেন ইহা তাহার নিকট খুবই দুঃখের বিষয় ছিল। তাই সন্তানের আশায় তিনি আপন দাসী হাগারকে আপন স্বামী আব্রামের সহিত বিবাহ দেন (Genesis, 16: 3)। এই সূত্র ধরিয়া পাশ্চাত্যের সকল লেখক এবং কোন কোন মুসলিম লেখকও তাহাদের অনুসরণ করত হাজারকে সাধারণ একজন দাসী বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। কিন্তু ইহা সঠিক নহে, বরং বলা যায় অজ্ঞতা বা বিদ্বেষের ফল। প্রকৃতপক্ষে হাজার ছিলেন মিসরের রাজকন্যা (আল-কিসাঈ, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ১৪২; ইসলামী বিশ্বকোষ ২০ খ, ৫৬০-৬১)।
আল্লাহ তা'আলার প্রতি তাঁহার দৃঢ় বিশ্বাস, অবিচল আস্থা, ও মজবুত ইয়াকীন ছিল। তাই সম্পূর্ণ জনমানবহীন মরু প্রান্তরে সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় মাত্র কয়েকটি খেজুর ও কিছু পানি দিয়া ইবরাহীম (আ) যখন চলিয়া যাইতেছিলেন তখন শিশু সন্তানসহ নিশ্চিত মৃত্যুর হাতছানি দেখিয়া তিনি ইবরাহীম (আ)-এর পিছু গমন করত জিজ্ঞাসা করিলেন, "আমাদিগকে এই জনমানবহীন মরুপ্রান্তরে রাখিয়া আপনি কোথায় যাইতেছেন?" কয়েকবার এইরূপ বলার পরও ইবরাহীম (আ)-এর পক্ষ হইতে কোন উত্তর না পাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "আল্লাহই আপনাকে এইরূপ করিতে নির্দেশ দিয়াছেন কি?" ইবরাহীম (আ) বলিলেন, হাঁ। তখন যেন তিনি আশ্রয় খুঁজিয়া পাইলেন। দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলিলেন, اذا لا يضيعنا "তাহা হইলে আল্লাহ আমাদিগকে ধ্বংস করিবেন না" (ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, পৃ. ১৫৪)।
তিনটি মিথ্যা কথন
পূর্বে আলোচিত হযরত ইবরাহীম (আ)-এর কর্মকাণ্ডে বাহ্যত প্রতীয়মান হয় যে, তিনটি স্থানে তিনি মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন : (১) তাঁহার সম্প্রদায় তাঁহাকে মেলায় যাইতে বলিলে তিনি বলিয়াছিলেন 'আমি অসুস্থ'; (২) মন্দিরের মূর্তিগুলি ভাঙ্গিয়া বড়টির ঘাড়ে কুঠার রাখিয়া দিয়াছিলেন এবং তাহাদের জিজ্ঞাসার উত্তরে বলিয়াছিলেন: 'উহাদের এই বড়টিই এই করিয়াছে'; (৩) হিজরত করিয়া মিসরে উপস্থিত হইলে সেখানকার জালিম বাদশাহর নিকট স্বীয় স্ত্রী সারাকে ভগ্নী পরিচয় দেন। হাদীছেও ইহার সমর্থন পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন :