📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দাওয়াত ও তাবলীগ

📄 দাওয়াত ও তাবলীগ


হযরত ইবরাহীম (আ) কখন নবুওয়াত প্রাপ্ত হন তাহার সঠিক সময় জানা না গেলেও আল-কুরআনুল কারীমের বিবরণ হইতে প্রতীয়মান হয় যে, বাল্যকাল হইতেই আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সঠিক জ্ঞান ও হিদায়াত দান করিয়াছিলেন। ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَقَدْ آتَيْنَا إِبْرَاهِيمَ رُشْدَهُ مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا بِهِ عَلِمِينَ . (٢١:٥١)
“আমি তো ইহার পূর্বে ইবরাহীমকে সৎপথের জ্ঞান দিয়াছিলাম এবং আমি তাহার সম্বন্ধে ছিলাম সম্যক পরিজ্ঞাত” (২১ : ৫১)।
সীরাত ও ইতিহাসবিদগণ কর্তৃক বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনা হইতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, বাল্যকাল হইতেই তিনি ছিলেন সত্যানুসন্ধানী। ইমাম ছা'লাবী বর্ণনা করিয়াছেন যে, গুহার মধ্যে থাকিয়া ইবরাহীম (আ) যখন যুবক হইলেন তখন একদিন তাঁহার মাতাকে বলিলেন, আমার প্রতিপালক কে? মাতা বলিল, আমি। তিনি বলিলেন, আপনার প্রতিপালক কে? মাতা বলিল, তোমার পিতা। তিনি বলিলেন, আমার পিতার প্রতিপালক কে? মাতা বলিল, নমরূদ। তিনি বলিলেন, নমরূদের প্রতিপালক কে? তখন মাতা তাহাকে এক ধমক দিয়া বলিল, চুপ কর। তখন ইবরাহীম (আ) চুপ করিয়া গেলেন। অতঃপর তাঁহার মাতা স্বামীর নিকট ফিরিয়া আসিয়া বলিল, আমাদের নূতন বালক, যে তোমার পুত্র, আমি দেখিতেছি যে, সে জগৎবাসীর দীন পরিবর্তন করিয়া ফেলিতেছে। অতঃপর ইবরাহীম (আ) যাহা যাহা বলিয়াছিলেন তাহা স্বামীকে শুনাইল। ইবরাহীম (আ) তাঁহার পিতাকে অনুরূপ প্রশ্ন করিয়াছিলেন। তাঁহার পিতা মায়ের অনুরূপ জবাব দিয়াছিলেন। নমরূদের প্রতিপালক কে? এই প্রশ্নের জবাবে পিতা তাহাকে একটি চপেটাঘাত করিয়া বলিল, চুপ কর (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৮)।
ইবরাহীম (আ) যুবক অবস্থায় একদিন পিতার সহিত (এক বর্ণনামতে মাতার সহিত) গুহা হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। তখন সূর্য অস্ত গিয়াছে। তিনি চতুষ্পদ জন্তু ও অন্যান্য সৃষ্টি দেখিয়া কৌতূহলবশত সেইগুলি সম্পর্কে পিতাকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। পিতাও তাঁহার প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগিলেন যে, এইটি উট, এইটি গাভী, ঐটি ঘোড়া, ঐটা বকরী প্রভৃতি। ইবরাহীম (আ) বলিলেন, নিশ্চয়ই এইগুলির একজন প্রতিপালক আছেন যিনি তাহাদের সৃষ্টিকর্তা। অতঃপর তিনি আসমান-যমীনের সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করিলেন এবং বলিলেন, যিনি আমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন, রিযিক দিয়াছেন, আহার করাইয়াছেন, পান করাইয়াছেন, তিনিই ঠিক আমার প্রতিপালক। তিনি ভিন্ন আমার আর কোন ইলাহ (উপাস্য) নাই (ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৭৮-৭৯)। অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মাথা তুলিলেন। সেখানে তিনি যুহরাঃ (শুক্র) মতান্তরে মুশতারী (বৃহস্পতি) নক্ষত্র দেখিতে পাইয়া বলিলেন, এই আমার রব। কিছুক্ষণ পর তাহা অদৃশ্য হইয়া গেল। তাহা দেখিয়া তিনি বলিলেন, যাহা অস্ত যায় আমি তাহা পছন্দ করি না অর্থাৎ যে প্রতিপালক অদৃশ্য হয় তাহাকে আমি পছন্দ করি না। ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর বর্ণনামতে তিনি মাসের শেষদিকে বাহির হইয়াছিলেন তাই নক্ষত্রোদয়ের পূর্বে তখন চন্দ্র দেখিতে পান নাই। অতঃপর রজনীর মধ্য অথবা শেষভাগে তিনি সমুজ্জ্বল চন্দ্র উদিত হইতে দেখিয়া বলিলেন, এই আমার প্রতিপালক। উহা যখন অদৃশ্য হইল তখন তিনি বলিলেন, আমাকে আমার প্রতিপালক সৎপথ প্রদর্শন না করিলে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হইব। অতঃপর ভোর হইলে সূর্যকে দীপ্তিমানরূপে উদিত হইতে দেখিয়া তিনি বলিলেন, ইহা আমার প্রতিপালক, ইহা সর্ববৃহৎ। যখন তাহা অদৃশ্য হইল তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে বলিলেন, "আত্মসমর্পণ কর”। তিনি বলিলেন, "জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ করিলাম” (২: ১৩১)।
অতঃপর তিনি তাঁহার কওমের নিকট আসিয়া তাহাদিগকে দাওয়াত দিয়া বলিলেন, “হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যাহাকে আল্লাহ্ শরীক কর তাহার সহিত আমার কোন সংশ্রব নাই। আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁহার দিকে মুখ ফিরাইতেছি যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নহি" (৬ঃ ৭৬-৭৯; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২১)। ইন্ন কাছীর প্রমুখ এই মত প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন যে, ইবরাহীম (আ) গুহা হইতে বাহির হইয়াই এই সকল কথাবার্তা বলিয়াছিলেন। কারণ তখন তিনি ছোট ছিলেন। তাহারা ইহাকে ইসরাঈলী রিওয়াাত বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (দ্র. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১৪৩)। তাহাদের মতে ইবরাহীম (আ) প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নক্ষত্র, চন্দ্র ও সূর্যকে প্রতিপালক বলিয়াছিলেন এবং তাহা অস্ত যাওয়ার পর ঐ সকল কথাবার্তা বলিয়াছিলেন। ইহার উদ্দেশ্য ছিল কওমের সামনে প্রশ্ন রাখা এবং তাহাদের বিবেক জাগ্রত করা। কাহারও কাহারও মতে সম্প্রদায়ের নিকট এই কথা প্রমাণ করার জন্য যে, যাহা পরিবর্তনশীল তাহা কখনও প্রতিপালক হওয়ার উপযুক্ত নহে। ইহাই অধিকাংশ 'আলিমের মত যে, তিনি কওমকে হুশিয়ার করার জন্য অথবা তাহাদের সহিত বিদ্রূপ করার জন্য এইরূপ বলিয়াছিলেন (ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ., ৭৩)। তবে যেহেতু পূর্বেই ইমাম ছা'লাবীর বরাতে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম (আ)-এর গুহার মধ্যে প্রতিপালিত হওয়ার সময়ের মধ্যে বরকত দেওয়ার ফলে তিনি দ্রুত বড় হইয়া উঠেন এবং যখন তিনি গুহার বাহিরে আসেন তখন যুবা বয়সে পদার্পণ করিয়াছিলেন, সেই হেতু ইমাম তাবারী বর্ণিত প্রথমোক্ত মতটি সঠিক হইতে পারে যে, গুহা হইতে বাহির হইয়া সত্যানুসন্ধানের জন্য তিনি ঐ সকল বাদানুবাদ করিয়াছিলেন। আর ইহাই 'আয়াতের (৬ : ৭৬-৭৯) সহজ-সরল ব্যাখ্যা। ইবরাহীম (আ)-এর পিতা আযর মূর্তি বানাইত। অতঃপর উহা সন্তানদিগকে বিক্রয় করিতে দিত। ইবরাহীম (আ) গুহা হইতে বাহির হইবার পর সে তাহাকেও উহা বিক্রয় করিবার জন্য দিল। ইবরাহীম (আ) উহা লইয়া বাজারে গিয়া জোরে জোরে বলিতেন, “কে এমন জিনিস ক্রয় করিবে যাহা তাহার কোন ক্ষতিও করিবে না, উপকারও করিবে না”। তাঁহার ভ্রাতাগণ মূর্তি বিক্রয় করিয়া ফিরিয়া আসিত। কিন্তু তাঁহার মূর্তি সেইভাবেই পড়িয়া থাকিত, কেহই ক্রয় করিত না। অতঃপর তিনি উহা নদীতে লইয়া যাইতেন এবং তাঁহার কওম যে গোমরাহী ও মূর্খতায় ডুবিয়া ছিল তাহার প্রতি বিদ্রূপবশত উহাদের মস্তক পানিতে ডুবাইয়া বলিতেন, 'পানি পান কর'। আস্তে আস্তে তাঁহার মূর্তির প্রতি এই আচরণের কথা এবং তাহাদের সহিত এই বিদ্রূপের কথা ছড়াইয়া পড়িতে লাগিল (ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৭৩; তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২০)। অতঃপর হযরত ইবরাহীম (আ) বিভিন্ন পন্থায় তাঁহার সত্যের প্রতি আহবান করার কাজ চালাইয়া যাইতে লাগিলেন। পিতাকে তিনি অত্যন্ত বিনীতভাবে বুঝাইলেন যে, তাঁহার নিকট সত্যের জ্ঞান আসিয়াছে যাহা দ্বারা তিনি জানিতে পরিয়াছেন যে, এই সকল মূর্তির পূজা করা শয়তানের ইবাদত, যাহার ফলে আল্লাহ্ শাস্তি অবধারিত। কিন্তু পিতা উহা কবুল করিল না, বরং উল্টা তাঁহার প্রাণনাশের হুমিক দিল। কিন্তু ইবরাহীম (আ) তাহার সহিত অত্যন্ত নম্র ও মার্জিত আচরণ করেন, তাহার কল্যাণ কামনা করেন এবং আল্লাহ্র নিকট তাহার জন্য মাগফিরাত চাওয়ার অঙ্গীকার করেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَبِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا نَبِيًّا . إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ يَابَتِ لِمَ تَعْبُدُ مَالَا يَسْمَعُ وَلَا يُبْصِرُ وَلَا يُغْنِي عَنْكَ شَيْئًا . يابَتِ إِنِّي قَدْ جَاءَنِي مِنَ الْعِلْمِ مَالَمْ يَأْتِكَ فَاتَّبِعْنِي أَهْدِكَ صِرَاطًا سَوِيًّا ، يَابَتِ لَا تَعْبُدِ الشَّيْطَنَ إِنَّ الشَّيْطَنَ كَانَ لِلرَّحْمَنِ عَصِيًّا . يابَتِ إِنِّي أَخَافُ أَنْ يَمَسَّكَ عَذَابٌ مِّنَ الرَّحْمَنِ فَتَكُونَ لِلشَّيْطَنِ وليا . قَالَ أَرَاغِبٌ أَنْتَ عَنْ الهَتِي يَا بْرَاهِيمُ لَئِنْ لَمْ تَنْتَه لَأَرْجُمَنَّكَ وَاهْجُرْنِي مَلِيًّا . قَالَ سَلِّمُ عَلَيْكَ سَاسْتَغْفِرُ لكَ رَبِّي إِنَّهُ كَانَ بِي حَفِيًّا ، وَأَعْتَزِلُكُمْ وَمَا تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَادْعُو رَبِّي عَسَى أَنْ لَا أَكُونَ بِدُعَاءِ رَبِّي شَقِيًّا (٤٧-١٩:٤١)
"স্মরণ কর, এই কিতাবে উল্লিখিত ইবরাহীমের কথা; সে ছিল সত্যনিষ্ঠ নবী। যখন সে তাহার পিতাকে বলিল, হে আমার পিতা! তুমি তাহার ইবাদত কর কেন যে শুনে না, দেখে না এবং তোমার কোন কাজেই আসে না? হে আমার পিতা! আমার নিকট তো আসিয়াছে জ্ঞান যাহা তোমার নিকট আসে নাই; সুতরাং আমার অনুসরণ কর, আমি তোমাকে সঠিক পথ দেখাইব। হে আমার পিতা! শয়তানের ইবাদত করিও না। শয়তান তো দয়াময়ের অবাধ্য। হে আমার পিতা! আমি তো আশঙ্কা করি যে, তোমাকে দয়াময়ের শান্তি স্পর্শ করিবে, তখন তুমি হইয়া পড়িবে শয়তানের বন্ধু। পিতা বলিল, হে ইবরাহীম! তুমি কি আমার দেব-দেবী হইতে বিমুখ? যদি তুমি নিবৃত্ত না হও তবে আমি প্রস্তরাঘাতে তোমার প্রাণ নাশ করিবই; তুমি চিরদিনের জন্য আমার নিকট হইতে দূর হইয়া যাও। ইবরাহীম বলিল, তোমার প্রতি সালাম। আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিব, নিশ্চয়ই তিনি আমার প্রতি অতিশয় অনুগ্রহশীল। আমি তোমাদের হইতে এবং তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাহাদের ইবাদত কর তাহাদিগ হইতে পৃথক হইতেছি। আমি আমার প্রতিপালককে আহবান করি; আশা করি, আমার প্রতিপালককে আহবান করিয়া ব্যর্থকাম হইব না" (১৯:৪১-৪৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কওমকে দাওয়াত

📄 কওমকে দাওয়াত


তিনি তাঁহার সম্প্রদায়কে ও পিতাকে বুঝাইলেন যে, মূর্তি কখনো উপাস্য ও প্রতিপালক হইতে পারে না, বরং প্রতিপালক তো তিনি যিনি আসমান-যমীনের সৃষ্টিকর্তা। কুরআন শরীফে এই ব্যাপারে ইরশাদ হইয়াছেঃ وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ إِبْرَاهِيمَ إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ وَقَوْمِهِ مَا تَعْبُدُونَ. قَالُوا نَعْبُدُ أَصْنَامًا فَنَظَلُّ لَهَا عَاكِفِينَ. قَالَ هَلْ يَسْمَعُونَكُمْ إِذْ تَدْعُونَ . أَوْ يَنْفَعُونَكُمْ أَوْ يَضُرُّونَ . قَالُوا بَلْ وَجَدْنَا أَبَاءَنَا كَذَلِكَ يَفْعَلُونَ . قَالَ أَفَرَأَيْتُمْ مَا كُنْتُمْ تَعْبُدُونَ . أَنْتُمْ وَأَبَاءَكُمُ الْأَقْدَمُونَ . فَإِنَّهُمْ عَدُوٌّ لِي إِلَّا رَبَّ الْعَالَمِينَ الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِينِ . وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ. وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِينِ وَالَّذِي أَطْمَعُ أَنْ يَغْفِرَ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ . (٢٦:٦٩-٨٢) "তাহাদের নিকট ইবরাহীমের বৃত্তান্ত বর্ণনা কর। সে যখন তাহার পিতা ও তাহার সম্প্রদায়কে বলিয়াছিল তোমরা কিসের ইবাদত কর? তাহারা বলিল, আমরা মূর্তির পূজা করি এবং আমরা নিষ্ঠার সহিত উহাদের পূজায় নিরত থাকিব। সে বলিল, তোমরা প্রার্থনা করিলে ইহারা কি শোনে অথবা উহারা কি তোমাদের উপকার কিংবা অপকার করিতে পারে? তাহারা বলিল, না, তবে আমরা আমাদের পিতৃ-পুরুষদিগকে এইরূপই করিতে দেখিয়াছি। সে বলিল, তোমরা কি ভাবিয়া দেখিয়াছ কিসের পূজা করিতেছ, তোমরা এবং তোমাদের অতীত পিতৃপুরুষেরা? উহারা সকলেই আমার শত্রু, জগতসমূহের প্রতিপালক ব্যতীত; যিনি আমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন, তিনিই আমাকে পথ প্রদর্শন করেন। তিনিই আমাকে দান করেন আহার্য ও পানীয় এবং রোগাক্রান্ত হইলে তিনিই আমাকে রোগমুক্ত করেন; এবং তিনিই আমার মৃত্যু ঘটাইবেন, অতঃপর পুনর্জীবিত করিবেন। এবং আশা করি তিনি কিয়ামত দিবসে আমার অপরাধ মার্জনা করিয়া দিবেন" (২৬ঃ ৬৯-৮২)। সুদ্দী বর্ণনা করেন যে, প্রতি বৎসর তাহাদের একটি ঈদ হইত। তাহারা সকলেই সেখানে সমবেত হইত। সেই ঈদ হইতে যখন তাহারা প্রত্যাবর্তন করিত তখন মূর্তিগৃহে প্রবেশ করিয়া উহাকে সিজদা করিত। ইহার পর বাড়ি ফিরিত (ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮০)। ইবরাহীম (আ)-এর পিতা আযর তাহাকে বলিল, হে ইবরাহীম! আমাদের একটি ঈদ আছে। তুমি যদি আমাদের সঙ্গে সেখানে যাইতে তবে আমাদের দীন অবশ্যই তোমার ভাল লাগিত। অতঃপর ঈদের দিন তাহারা ঈদে গমন করিল। ইবরাহীম (আ) তাহাদের সহিত বাহির হইলেন। কিছু দূর গিয়া তাঁহার মনে কিছু একটা উদয় হইল। তিনি বলিলেন, আমি অসুস্থ। প্রকৃতপক্ষে তিনি তাহাদের দেবতাদিগকে অপদস্থ করত উহাদের অক্ষমতা ও অসারতা প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ করিতে এবং আল্লাহ্ প্রভুত্ব ও তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করিতে চাহিলেন। আল্লাহ্ সত্য দীনকে সহায়তা কল্পেই তিনি এই কৌশল অবলম্বন করিয়াছিলেন। কুরআন শরীফে ইরশাদ হইয়াছে: فَنَظَرَ نَظْرَةً فِي النُّجُومِ. فَقَالَ إِنِّي سَقِيمٌ. فَتَوَلَّوْا عَنْهُ مُدْبِرِينَ . (۳۷ : ۸۸-۹۰) "অতঃপর সে তারকারাজির দিকে একবার তাকাইল এবং বলিল, আমি অসুস্থ। অতঃপর উহারা তাহাকে পশ্চাতে রাখিয়া চলিয়া গেল" (৩৭ঃ ৮৮-৯০)। অতঃপর তিনি তাহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন : وَتَاللَّهِ لَا كَيْدَنَّ أَصْنَامَكُمْ بَعْدَ أَنْ تُوَلُّوا مُدْبِرِينَ (۲۱ : ٥٧) "শপথ আল্লাহ্, তোমরা চলিয়া গেলে আমি তোমাদের মূর্তিগুলি সম্বন্ধে অবশ্যই কৌশল অবলম্বন করিব” (২১:৫৭)। তাহাদের মধ্যে দুর্বল এক ব্যক্তি পিছনে পড়িয়া গিয়াছিল, সে ইহা শুনিয়া ফেলিল। মুজাহিদ ও কাতাদার বর্ণনামতে, ইবরাহীম (আ) ইহা আস্তে আস্তে বলা সত্ত্বেও সে উহা শুনিয়া ফেলে এবং প্রচার করিয়া দেয়। অতঃপর ইবরাহীম (আ) দ্রুতপদে ও সন্তর্পণে তাহাদের দেবতা গৃহে আসিলেন। তিনি বিরাট এক মন্দিরে আসিলেন। মন্দিরের দরজায় বিরাটকায় একটি মূর্তি স্থাপিত ছিল। উহার পার্শ্বে ছিল আরো ছোট একটি, তাহার পার্শ্বে আরো ছোট একটি। এমনিভাবে প্রত্যেকটির পার্শ্বে ছিল তাহার চাইতে ছোট একটি মূর্তি। তাহার সম্প্রদায় বিভিন্ন রকমের খাবার তৈরি করিয়া তাহাদের দেবতাদের সম্মুখে ভোজ হিসাবে রাখিয়া দিয়াছিল এবং বলিয়াছিল, আমরা যখন প্রত্যাবর্তন করিব এবং ততক্ষণে আমাদের দেবতাগণ আমাদের খাবারে আশির্বাদ দিয়া দিবে তখন আমরা উহা খাইব। ইবরাহীম (আ) মন্দিরে প্রবেশ করিয়া যখন উহাদিগকে এবং উহাদের সম্মুখে রাখা খাবার দেখিলেন তখন বলিলেন, "তোমরা খাদ্য গ্রহণ করিতেছ না কেন" (৩৭: ৯১)? উহারা যখন ইবরাহীম (আ)-এর কথার কোন উত্তর দিল না তখন তিনি ঠাট্টা ও বিদ্রূপ করিয়া বলিলেন, "তোমাদের কী হইয়াছে যে, তোমরা কথা বল না"? অতপর তিনি উহাদের উপর সজোরে আঘাত হানিলেন" (৩৭: ৯২-৯৩)। তিনি একখানি লোহার কুঠার লইয়া প্রতিটি মূর্তিকে ভাঙ্গিয়া চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া ফেলিলেন। প্রধান মূর্তিটি ছাড়া আর একটিও অবশিষ্ট রহিল না। তখন কুঠারখানি উহার ঘাড়ে ঝুলাইয়া রাখিলেন যাহাতে তাহার সম্প্রদায় উহাকে দোষারোপ করে। ইহার পর তিনি বাহির হইয়া আসিলেন। ইহার প্রতিই ইঙ্গিত করা হইয়াছে কুরআন কারীমে : فَجَعَلَهُمْ جُدَادًا إِلَّا كَبِيرًا لَّهُمْ لَعَلَّهُمْ إِلَيْهِ يَرْجِعُونَ . (٢١:٥٨) "অতপর সে চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিল মূর্তিগুলিকে উহাদের প্রধানটি ব্যতীত; যাহাতে উহারা তাহার দিকে ফিরিয়া আসে" (২১:৫৮)। প্রকৃতপক্ষে ইহা ছিল একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, তাহারা যদি কোন কিছু বুঝিতে পারিত তবে অবশ্যই যে তাহাদের প্রতি এইরূপ খারাপ আচরণ করিতে ইচ্ছা করে তাহাকে প্রতিহত করিতে পারিত। কিন্তু তাহাদের মূর্খতা, বুদ্ধির স্বল্পতা ও গোমরাহীর প্রচণ্ডতায় কোন শিক্ষাই গ্রহণ করিল না বরং ঈদ হইতে ফিরিয়া আসিয়া দেবতা গৃহে প্রবেশ করিল এবং উহাদিগকে এই অবস্থায় দেখিয়া বলিল: مَنْ فَعَلَ هذا بالهَتِنَا إِنَّهُ لَمِنَ الظَّلِمِيْنَ . قَالُوا سَمِعْنَا فَتًى يُذْكُرُهُمْ يُقَالُ لَهُ إِبْرَاهِيمُ ( ٦٠-٢١:٥٩ ) . "আমাদের উপাস্যগুলির প্রতি এইরূপ করিল কে? সে নিশ্চয়ই সীমালংঘনকারী। কেহ কেহ বলিল, এক যুবককে উহাদের সমালোচনা করিতে শুনিয়াছি; তাহাকে বলা হয় ইবরাহীম" (২১: ৫৯-৬০)। তাহাকেই আমরা এই ব্যাপারে সন্দেহ করি। কেননা সে দেবতাদিগকে গালি দেয় ও সমালোচনা করে। এই সংবাদ যখন বাদশাহ নমরূদ ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দের নিকট পৌঁছিল তখন তাহারা বলিল, তাহাকে উপস্থিত কর লোক সম্মুখে, যাহাতে উহারা প্রত্যক্ষ করিতে পারে (২১ঃ৬১) যে, সে-ই ইহা করিয়াছে। তাহারা বিনা প্রমাণে তাঁহাকে দোষারোপ করিতে অপছন্দ করিল। প্রকৃতপক্ষে ইবরাহীম (আ)-এর উদ্যেশ্য ইহাই ছিল যে, সকল লোক একত্র হউক। তাহা হইলে সকল মূর্তিপূজকের সম্মুখে তিনি প্রমাণ করিয়া দিবেন যে, তাহারা গোমরাহীর মধ্যে রহিয়াছে, যেমন মূসা (আ) ফিরআওনকে বলিয়াছিলেন: مَوْعِدُكُمْ يَوْمُ الزِّينَةِ وَأَنْ يُحْشَرَ النَّاسُ ضُحى (٢٠:٥٩) "তোমাদের নির্ধারিত সময় উৎসবের দিন এবং যেই দিন পূর্বাহ্নে জনগণকে সমবেত করা হইবে” (২০:৫৯)। অতঃপর যখন তাঁহাকে আনা হইল তখন লোকজন বাদশাহ নমরূদের নিকট সমবেত হইল। তাহারা বলিল, انْتَ فَعَلْتَ هذا بالهَتِنَا يَا ابْرَاهِيمُ (٦٢ : ٢١) "হে ইবরাহীম! তুমিই কি আমাদের উপাস্যগুলির প্রতি এইরূপ করিয়াছ” (২১ঃ৬২)? উত্তরে ইবরাহীম (আ) বলিলেন, بَلْ فَعَلَهُ كَبِيرُهُمْ هُذَا فَاسْتَلُوهُمْ إِنْ كَانُوا يَنْطِقُونَ . (٢١:٦٣) "বরং ইহাদের এই প্রধান, সেই তো ইহা করিয়াছে, ইহাদিগকে জিজ্ঞাসা কর যদি ইহারা কথা বলিতে পারে" (২১:৬৩)। প্রকৃতপক্ষে ইহার উদ্দেশ্যে ছিল তাহাদের নিকট হইতে এই কথার স্বীকারোক্তি আদায় করা যে, ইহারা কথা বলিতে পারে না। এইগুলি জড় পদার্থ, অন্যান্য জড় পদার্থের ন্যায়ই। তখন তাহারা মূর্তি ভাঙ্গার জন্য তাহাকে যে দোষারোপ করিয়াছিল উহা হইতে ফিরিয়া আসিল এবং পরস্পর বলিতে লাগিল, আমরাই তাহার উপর জুলুম করিয়াছি; সে তো ঠিকই বলিয়াছে। যেমন ইরশাদ হইয়াছে: فَرَجَعُوا إِلَى أَنْفُسِهِمْ فَقَالُوا إِنَّكُمْ أَنْتُمُ الظَّلِمُونَ (٢١:٦٤) "তখন তাহারা মনে মনে চিন্তা করিয়া দেখিল এবং একে অপরকে বলিতে লাগিল, তোমরাই তো সীমালংঘনকারী" (২১ঃ ৬৪)। অতঃপর তাহারা বুঝিতে পারিল এবং বলিল, উহারা তো কোন ক্ষতি করিতে পারে না, উপকার করিতে পারে না, কোন কিছু ধরিতেও পারে না। উহারা তো কথা বলিতে পারে না যে, কে এইরূপ করিয়াছে তাহা আমাদিগকে বলিয়া দিবে। হাত দিয়া ধরিতেও পারে না যে, আমরা তোমাকে সত্য বলিয়া সমর্থন করিব। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে: ثُمَّ نُكِسُوا عَلَى رُءُوسِهِمْ لَقَدْ عَلِمْتَ مَا هُؤُلَاءِ يَنْطِقُونَ (٢١:٦٥) "অতঃপর উহাদের মস্তক অবনত হইয়া গেল এবং উহারা বলিল, তুমি তো জানই যে, ইহারা কথা বলে না" (২১:৬৫)। অতঃপর উহাদের উপর ইবরাহীম (আ)-এর যুক্তি প্রমাণ যখন অকাট্য বলিয়া বিবেচিত হইল এবং তাহারা পরাজয়ের গ্লানি লইয়া মাথা নোয়াইয়া ফেলিল তখন ইবরাহীম (আ) বলিলেন: أَفَتَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنْفَعُكُمْ شَيْئًا وَلَا يَضُرُّكُمْ . أَنَّ لَكُمْ وَلِمَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَفَلَا تَعْقِلُونَ (٢١:٦٦-٦٧) "তবে কি তোমরা আল্লাহ্র পরিবর্তে এমন কিছুর ইবাদত কর যাহা তোমাদের কোন উপকার করিতে পারে না, ক্ষতিও করিতে পারে না? ধিক তোমাদিগকে এবং আল্লাহ্র পরিবর্তে তোমরা যাহাদের ইবাদত কর তাহাদিগকে! তবুও কি তোমরা বুঝিবে না" (২১ঃ ৬৬-৬৭)? তখন তাঁহার সম্প্রদায় আল্লাহ্ ব্যাপারে তাঁহার সহিত বিতর্ক করিতে প্রবৃত্ত হইল। তাহাদের দাবি ছিল, ইবরাহীম (আ) যাহার ইবাদত করেন তাহা হইতে তাহাদের উপাস্য ও দেবতারাই উত্তম। তখন ইবরাহীম (আ) উদাহরণ দিয়া তাহাদিগকে বুঝাইলেন যাহাতে তাহারা বুঝিতে পারে যে, তাহারা যাহার ইবাদত করে উহা অপেক্ষা আল্লাহই ইবাদত পাওয়ার বেশী যোগ্য এবং তাঁহাকেই ভয় করা উচিৎ। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে: وَحَاجَّهُ قَوْمُهُ قَالَ أَتُحَاجُّونَنِي في اللَّهِ وَقَدْ هَدَانِ وَلَا أَخَافُ مَا تُشْرِكُونَ بِهِ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ رَبِّي شَيْئًا وَسِعَ رَبِّي كُلَّ شَيْءٍ عِلْمًا أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ . وَكَيْفَ أَخَافُ مَا أَشْرَكْتُمْ وَلَا تَخَافُونَ أَنَّكُمْ أَشْرَكْتُمْ بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَانًا فَأَيُّ الْفَرِيقَيْنِ أَحَقُّ بِالْأَمْنِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ (٦:٨٠-٨١) "তাহার সম্প্রদায় তাহার সহিত বিতর্কে লিপ্ত হইল। সে বলিল, তোমরা কি আল্লাহ সম্বন্ধে আমার সহিত বিতর্কে লিপ্ত হইবে? তিনি তো আমাকে সৎপথে পরিচালিত করিয়াছেন। আমার প্রতিপালক অন্যবিধ ইচ্ছা না করিলে তোমরা যাহাকে তাঁহার শরীক কর তাহাকে আমি ভয় করি না। সব কিছুই আমার প্রতিপালকের জ্ঞানায়ত্ত, তবে কি তোমরা অনুধাবন করিবে না? তোমরা যাহাকে আল্লাহ্র শরীক কর আমি তাহাকে কিরূপে ভয় করিব? অথচ তোমরা আল্লাহ্ শরীক করিতে ভয় কর না, যে বিষয়ে তিনি তোমাদিগকে কোন সনদ দেন নাই। সুতরাং যদি তোমরা জান তবে বল, দুই দলের মধ্যে কোন্ দল নিরাপত্তা লাভের বেশী হকদার" (৬: ৮০-৮১)?

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নমরুদের সহিত বিতর্ক

📄 নমরুদের সহিত বিতর্ক


“তাহার সম্প্রদায় তাহার সহিত বিতর্কে লিপ্ত হইল। সে বলিল, তোমরা কি আল্লাহ সম্বন্ধে আমার সহিত বিতর্কে লিপ্ত হইবে? তিনি তো আমাকে সৎপথে পরিচালিত করিয়াছেন। আমার প্রতিপালক অন্যবিধ ইচ্ছা না করিলে তোমরা যাহাকে তাঁহার শরীক কর তাহাকে আমি ভয় করি না। সব কিছুই আমার প্রতিপালকের জ্ঞানায়ত্ত, তবে কি তোমরা অনুধাবন করিবে না? তোমরা যাহাকে আল্লাহ্র শরীক কর আমি তাহাকে কিরূপে ভয় করিব? অথচ তোমরা আল্লাহ্ শরীক করিতে ভয় কর না, যে বিষয়ে তিনি তোমাদিগকে কোন সনদ দেন নাই। সুতরাং যদি তোমরা জান তবে বল, দুই দলের মধ্যে কোন্ দল নিরাপত্তা লাভের বেশী হকদার" (৬: ৮০-৮১)?
নমরূদের সহিত বিতর্ক
অতঃপর নমরূদ ইবরাহীম (আ)-কে বলিল, তুমি যে ইলাহের ইবাদত কর এবং যাঁহার ইবাদত করিতে অন্যকে দাওয়াত দাও, যাঁহার শক্তির কথা উল্লেখ কর এবং অন্যের উপর প্রাধান্য দাও তিনি কে? ইবরাহীম (আ) বলিলেন, তিনি আমার প্রতিপালক, যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান। নমরূদ বলিল, আমিও তো জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই। ইবরাহীম বলিল, তুমি কিভাবে জীবন দান কর ও মৃত্যু ঘটাও? নমরূদ বলিল, আমি দুই ব্যক্তিকে ধরিয়া আনিব যাহাদিগকে আমার নির্দেশে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হইয়াছে। অতঃপর উহাদের একজনকে হত্যা করিব। এইভাবে আমি তাহার মৃত্যু ঘটাইলাম। আর অপরজনকে ক্ষমা করিয়া মুক্তি দিব। এইভাবে আমি তাহার জীবন দান করিলাম। তখন ইবরাহীম (আ) বলিলেন, "আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক হইতে উদয় করান, তুমি উহাকে পশ্চিম দিক হইতে উদয় করাও তো'। তখন যে কুফরী করিয়াছিল সে (নমরূদ) হতবুদ্ধি হইয়া গেল" (২ঃ ২৫৮)। সে বুঝিতে পারিল যে, ইহা তাহার দ্বারা সম্ভব নহে। দলীল-প্রমাণে সে পরাস্ত হইল (তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২২-১২৩; ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৭৯)।
এইসব বাদানুবাদে ও দলীল-প্রমাণে পরাস্ত হইয়া নমরূদ ও তাহার সম্প্রদায় ইবরাহীম (আ)-এর উপর দারুণভাবে ক্ষিপ্ত হইল। তাহারা আলোচনা করিল যে, ইবরাহীমকে কাটিয়া টুকরা টুকরা করিতে হইবে। কিন্তু তাহারা ভাবিয়া দেখিল যে, এই শাস্তি তো কিছুক্ষণের মধ্যে শেষ হইয়া যাইবে, তাহাতে তাহাদের অন্তরে ক্রোধের যে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হইয়াছে উহা নিভিবে না। তাই তাঁহাকে এমন শাস্তি দিতে হইবে যাহা তিল তিল করিয়া তাঁহাকে দগ্ধীভূত করিবে। তাহারা সবশেষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল যে, তাঁহাকে অগ্নিতে দগ্ধীভূত করিয়া হত্যা করিতে হইবে। আর এমন অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করিতে হইবে যে, উহার উপর দিয়া উড্ডীয়মান পাখিও যেন পুড়িয়া যায় এবং যাহা ইতিহাসে প্রসিদ্ধ হইয়া থাকে (মাহমূদ যাহরান, কাসাস মিনাল-কুরআন, পৃ. ৫৬)।
কুরআন কারীমে এই দিকেই ইঙ্গিত করা হইয়াছে: قَالُوا حَرِّقُوهُ وَانْصُرُوا الهَتَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ فَعَلَيْنَ (٢١:٦٨)
"উহারা বলিল, তাহাকে পোড়াইয়া দাও এবং সাহায্য কর তোমাদের দেবতাগুলিকে, তোমরা যদি কিছু করিতে চাহ” (২১ঃ ৬৮)।
মুজাহিদ বলেন, আমি একবার আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা)-এর সম্মুখে উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করিলাম। তখন তিনি বলিলেন, মুজাহিদ! তুমি কি জান কে সর্বপ্রথম ইবরাহীম (আ)-কে অগ্নিতে দগ্ধীভূত করার প্রস্তাব করিয়াছিল? আমি বলিলাম, না। তিনি বলিলেন, পারস্যের এক বেদুঈন। আমি বলিলাম, হে আবূ আবদুর রাহমান! পারস্যে কি বেদুঈন আছে? তিনি বলিলেন, হ্যাঁ, কুর্দীরাই পারস্যের বেদুঈন। তাহাদেরই এক ব্যক্তি ইবরাহীম (আ)-কে আগুনে দগ্ধীভূত করিবার প্রস্তাব করিয়াছিল (তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২৩)। ইব্‌ন জুরায়জ শু'আয়ব আল-জুব্বাঈ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, যে ব্যক্তি এই প্রস্তাব করিয়াছিল তাহার নাম 'হায়যান'। আল্লাহ তাহাকে মাটিতে ধ্বসাইয়া দিয়াছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত সে মাটির নীচে ধ্বসিতে থাকিবে (ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৭৫)।
অতঃপর নমরূদ কাষ্ঠ সংগ্রহ করার নির্দেশ দিল এবং ইবরাহীম (আ)-কে বন্দী করিয়া রাখিল। তাঁহার জন্য একটি পাকা প্রাচীরযুক্ত ইমারত নির্মাণ করিল (ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮১; তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২৩-১২৪)। এই সম্পর্কে কুরআন কারীমে বলা হইয়াছে:
قَالُوا ابْنُوا لَهُ بُنْيَانًا فَالْقُوهُ فِي الْحَحِيمِ (۳۷:٩٧)
"তাহারা বলিল, ইহার জন্য এক ইমারত নির্মাণ কর, অতঃপর ইহাকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ কর" ( ৩৭ঃ ৯৭)।
ইহার পর তাহারা বিভিন্ন প্রকারের কাষ্ঠ সংগ্রহ করিল। এক বর্ণনামতে এক মাস যাবত এই কাষ্ঠ সংগ্রহ অভিযান চলে। ইহাকে তাহারা ধর্মীয় দিক হইতে পূণ্যের কাজ মনে করিত, এমনকি কোন মহিলা রোগাক্রান্ত হইলে তাহা আরোগ্যের জন্য অথবা কোন কাম্য বস্তু পাওয়ার জন্য কাষ্ঠ সংগ্রহ করার মানত করিত (তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২৩-১২৪; ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮১)। কাষ্ঠ সংগৃহীত হইলে চতুর্দিক হইতে তাহারা উহাতে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করিল। এই অগ্নির তেজ এত তীব্র ছিল যে, উপর দিয়া কোন পাখি উড়িয়া যাইতে লাগিলে তাহা পুড়িয়া ছাই হইয়া যাইত। অগ্নি প্রজ্জ্বলনের পর তাহারা ইবরাহীম (আ)-কে ইমারতের উপরে উঠাইয়া হাত-পা বাঁধিল। অতঃপর ইবলীসের পরামর্শ মত একটি প্রস্তর নিক্ষেপণ যন্ত্র (মিনজানীক) বানাইল এবং ইবরাহীম (আ)-কে উহাতে উঠাইল। তাহারা যখন তাঁহাকে অগ্নিকুণ্ডে ফেলিতে উদ্যত হইল তখন জিন ও মানব ব্যতীত আসমান-যমীন, পাহাড়-পর্বত ও উহার মধ্যে যত সৃষ্টি আছে ফেরেশতাসহ সবাই একবাক্যে চীৎকার করিয়া আল্লাহ্র নিকট ফরিয়াদ জানাইল, "হে আল্লাহ! পৃথিবীর বুকে ইবরাহীম ছাড়া আর দ্বিতীয় কেহ নাই যে, তোমার ইবাদত করিবে। তোমার জন্যই তাঁহাকে অগ্নিতে জ্বালানো হইতেছে। তাঁহাকে সাহায্য করিবার জন্য আমাদিগকে অনুমতি দাও।"
তখন আল্লাহ তাআলা বলিলেন, আমি তাঁহার ব্যাপারে অধিক অবগত। সে যদি তোমাদের মধ্যে কাহারও নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে অথবা কাহারো সাহায্য কামনা করে তবে সে যেন তাঁহাকে সাহায্য করে। আমি তাঁহাকে সেই ব্যাপারে অনুমতি দিলাম। আর যদি আমি ছাড়া অন্য কাহারো সাহায্য প্রার্থনা না করে তবে আমিই তাঁহার জন্য যথেষ্ট (ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৭৬)।
এক বর্ণনামতে ইবরাহীম (আ)-কে আগুনে নিক্ষেপ করিতে উদ্যত হইলে পানির ফেরেশতা তাঁহার নিকট আসিয়া বলিল, আপনি চাহিলে আমি অগ্নি নিভাইয়া দিব। কারণ পানি ও বৃষ্টির ভাণ্ডার আমার হাতে। বাতাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা আসিয়া বলিল, আপনি চাহিলে এই অগ্নিকুণ্ড আমি বাতাসে উড়াইয়া দিব। কিন্তু ইবরাহীম (আ) বলিলেন, তোমাদের কাহারো নিকট আমার কোন প্রয়োজন নাই (ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৮১)।
অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মাথা উঠাইয়া বলিলেন, হে আল্লাহ! আকাশে তুমিই একক সত্তা এবং দুনিয়াতে আমি এক ব্যক্তি। দুনিয়াতে আমি ছাড়া আর এমন কেহ নাই, যে তোমার ইবাদত করিবে (তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২৪; ছা'লাবী, প্রাগুক্ত)। ইবন কাছীরের বর্ণনা মতে ইবরাহীম (আ) এই বলিয়া দু'আ করিয়াছিলেন, “তুমিই আসমানে একক ও যমীনেও একক। আমার জন্য তুমিই যথেষ্ট ও উত্তম কর্মবিধায়ক” (আল কামিল, ১খ, পৃ. ৭৬)। মুতামির আরকাম (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ইবরাহীম (আ)-কে হাত পা বাঁধিয়া যখন তাহারা অগ্নিতে নিক্ষেপ করিতেছিল তখন তিনি বলিলেন,
لَا اِلَهَ اِلَّا اَنْتَ سُبْحَانَكَ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ لَكَ الْحَمْدُ وَلَكَ الْمُلْكُ لَا شَرِيْكَ لَكَ.
"তুমি ছাড়া কোন ইলাহ নাই। তুমি জগৎসমূহের প্রতিপালক, প্রশংসা তোমারই। রাজত্ব ও কর্তৃত্ব তোমারই। তোমার কোন শরীক নাই" (প্রাগুক্ত)। এক বর্ণনামতে তখন জিবরীল (আ) আসিয়া বলিলেন, ইবরাহীম! তোমার কোন প্রয়োজন আছে কি? তিনি বলিলেন, আপনার কাছে কোন প্রয়োজন নাই। জিবরীল (আ) বলিলেন, তবে তোমার প্রতিপালকের নিকট আবেদন কর। তিনি বলিলেন, তিনি আমার অবস্থা সম্পর্কে সব কিছুই অবগত আছেন। তাই তাঁহার অবগতিই যথেষ্ট।
حَسْبِيَ اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيْلُ.
"আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি কত উত্তম কর্মবিধায়ক" (প্রাগুক্ত; ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১৪৬)। অতঃপর তাহারা মিনজানীকের সাহায্যে তাঁহাকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করিল। তখন আল্লাহ ত'আলা আগুনকে বলিলেন।
يَا نَارُ كُونِي بَرْداً وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ. (২১:৬৯)
"হে অগ্নি! তুমি ইবরাহীমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হইয়া যাও" (২১ঃ ৬৯)।
সুদ্দীর বর্ণনামতে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে জিবরীল (আ) এই ঘোষণা দিয়াছিলেন (ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৮২)। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে প্রজ্জ্বলিত অগ্নি ইবরাহীম (আ)-এর জন্য শীতল ও নিরাপদ হইয়া গেল। শুধু তাহাই নহে, উহা তাঁহার জন্য পরম আরামদায়ক স্থান হইয়া গেল। তাঁহার হাত-পায়ের রশিগুলি আগুনে পুড়িয়া তিনি মুক্ত হইয়া গেলেন। আগুনের প্রতি আল্লাহ ত'আলার উক্ত নির্দেশ শোনার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর সমস্ত অগ্নিই সেই দিন নির্বাপিত হইয়া গিয়াছিল। কা'ব আল-আহবার, কাতাদা ও যুহরী (র) বলেন, পৃথিবীর বুকে ঐদিন কেহই অগ্নি দ্বারা কোন কাজ করিতে পারে নাই। ইবরাহীম (আ)-এর হাত-পায়ের রশি ব্যতীত অগ্নি ঐদিন কোন কিছুকেই দগ্ধীভূত করে নাই (তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২৪)। আলী ইবন আবী তালিব ও ইবন আব্বাস (রা) বলেন, আল্লাহ তা'আলা যদি তাঁহার নির্দেশের মধ্যে বর্দ (শীতল) শব্দের পর সালাম (নিরাপদ) শব্দ না আনিতেন তবে অগ্নি এমন ঠাণ্ডা হইয়া যাইত যে, ঠাণ্ডায় ইবরাহীম ইন্তিকাল করিতেন (প্রাগুক্ত)। গিরগিটি (وزغ) ব্যতীত সকল প্রাণীই সেই দিন ইবরাহীম (আ)-এর আগুন নিভাইতে চেষ্টা করে। এই জন্যই নবী (স) উহাকে হত্যা করিবার নির্দেশ দিয়াছেন এবং তাহাকে ক্ষুদ্র দৃষ্কৃতিকারী (فويسقة) নামে অভিহিত করিয়াছেন (বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুল-আম্বিয়া, ৪খ, ৫৯৮)।
ইবরাহীম (আ) ৭ দিন (ইবন আবী হাতিমের বর্ণনায় ৪০ দিন, আম্বিয়া-ই কুরআন, 'খ., পৃ. ১৯৯) উক্ত অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে অবস্থান করেন। মিনহাল ইবন উমার হইতে বর্ণিত আছে যে, ইবরাহীম (আ) বলিয়াছেন, আমি আগুনের মধ্যে অবস্থানকালীন দিনগুলিতে যে সুখ-স্বচ্ছন্দ ও আরাম-আয়েশ ভোগ করিয়াছিলাম তেমন সুখ-স্বচ্ছন্দ ও আরাম-আয়েশ জীবনে আর কখনো পাই নাই (ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮২)। ইবন ইসহাক প্রমুখ বলেন, আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম (আ)-এর আকৃতিতে ছায়ার ফেরেশতাকে প্রেরণ করিলেন। তিনি ইবরাহীম (আ)-এর পার্শ্বে আসিয়া উপবেশন করিলেন এবং তাঁহাকে সান্ত্বনা দিতে লাগিলেন।
কয়েক দিন পর নমরূদ একটি বাহনে করিয়া সেই অগ্নিকুণ্ডের নিকট দিয়া যাইতেছিল। ইবরাহীম (আ) যে পুড়িয়া ছাইভস্ম হইয়া গিয়াছেন এই ব্যাপারে তাহার কোনই সন্দেহ ছিল না। কিন্তু সে তাঁকাইয়া দেখিল, ইবরাহীম (আ) উহার মধ্যে বসিয়া আছেন। পার্শ্বে তাঁহারই মত এক লোক। সে নিজের চক্ষুকে বিশ্বাস করিতে পারিতেছিল না। সে যাত্রা বিরতি করিয়া ফিরিয়া আসিল এবং তাহার সম্প্রদায়কে ডাকিয়া বলিল, আমি যেন ইবরাহীমকে আগুনের মধ্যে জীবিত দেখিলাম। আমার সন্দেহ হইতেছে। তোমরা আমার জন্য একটি সুউচ্চ স্তম্ভ নির্মাণ কর যেখান হইতে আমি নিম্নে তাঁকাইয়া অগ্নির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিতে পারি। তাহারা স্তম্ভ নির্মাণ করিলে নমরূদ সেখান হইতে তাঁকাইয়া দেখিল, ইবরাহীম (আ) একটি ফুল বাগানে বসিয়া আছেন এবং তাঁহার পার্শ্বে উপবিষ্টে তাঁহারই মত এক লোক অর্থাৎ ফেরেশতাকেও সে দেখিতে পাইল।
নমরূদ ইবরাহীম (আ)-কে ডাকিয়া বলিল, ইবরাহীম! তোমার উপাস্য অতি মহান, যাহার শক্তির ফলে তোমার মধ্যে এবং আগুনের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হইয়াছে। তাই তোমার কোন ক্ষতি হয় নাই। ইবরাহীম! তুমি কি উহা হইতে বাহির হইয়া আসিতে পার? ইবরাহীম (আ) বলিলেন, হাঁ। নমরূদ বলিল, তুমি কি এই ভয় কর যে, তুমি ঐখানে অবস্থান করিলে তোমার কোন ক্ষতি হইবে? ইবরাহীম (আ) বলিলেন, না। নমরূদ বলিল, উঠিয়া দাঁড়াও এবং উহা হইতে বাহির হইয়া আস। ইবরাহীম (আ) উঠিয়া উহার মধ্য দিয়া হাঁটিয়া বাহির হইয়া আসিলেন।
নমরূদের নিকটে আসিলে সে বলিল, ইবরাহীম! তোমার পার্শ্বে উপবিষ্ট তোমারই আকৃতিতে যে লোকটিকে দেখিয়াছিলাম সেই লোকটি কে? ইবরাহীম (আ) বলিলেন, তিনি ছায়ার ফেরেশতা। আমাকে সঙ্গ দিতে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে আমার নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন। নমরূদ বলিল, হে ইবরাহীম! আমি তোমার উপাস্যের উদ্দেশ্যে কিছু কুরবানী করিব। কারণ আমি তাঁহার শক্তি ও দৃঢ়তা দেখিয়াছি, যাহা তোমার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করিয়াছেন, যখন তুমি কেবল তাঁহারই ইবাদত কর এবং তাঁহারই একত্ব স্বীকার করা ব্যতীত আর সবকিছুই অস্বীকার করিয়াছিলে। আমি তাঁহার জন্য চার হাজার গাভী যবাহ করিব। ইবরাহীম (আ) বলিলেন, তুমি তোমার এই দীনে থাকাবস্থায় তিনি তোমার কিছুই কবুল করিবেন না, যতক্ষণ না তুমি উহা ত্যাগ করিয়া আমার দীন গ্রহণ কর। নমরূদ বলিল, হে ইবরাহীম! আমি আমার রাজত্ব ত্যাগ করিতে পারি না। তবে শীঘ্রই আমি উহা যবাহ করিব। অতঃপর সত্যই সে উহা যবাহ করিল এবং ইবরাহীম (আ)-কে নূতন কোন শাস্তি দেওয়া হইতে বিরত রহিল। সে ইবরাহীম (আ)-কে বলিল, তোমার প্রতিপালক কতই না উত্তম হে ইবরাহীম! (ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮২-৮৩; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২৪; ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৭৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বিবাহ

📄 বিবাহ


হযরত ইবরাহীম (আ) কত বৎসর বয়সে বিবাহ করেন তাহা সুস্পষ্টরূপে জানা যায় না। তবে অগ্নিকুণ্ড হইতে বাহির হওয়ার অব্যবহিত পরই তিনি বিবাহ করেন বলিয়া ধারণা করা হয়। স্বীয় চাচাতো ভগ্নি সারা বিনত হারান আল-আকবারকে তিনি বিবাহ করেন। সুদ্দীর বর্ণনামতে সারা ছিলেন হাররান সম্রাটের কন্যা। তিনি তাহার কওমের দীনের ব্যাপারে সমালোচনা করিতেন। ইবরাহীম (আ) যখন শাম অভিমুখে রওয়ানা হন তখন সারার সাক্ষাত পান এবং তাহাকে এই শর্তে বিবাহ করেন যে, তিনি তাহাকে পরিবর্তন করিতে পারিবেন না (তাবারী, তারীখ, ১খ, ১২৫; ছালাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮৩; ইবনুল জাওযী, তারীখুল মুনতাজাম, ১খ, ২৬২)। তবে হাফিজ ইবন কাছীর এই মতটিকে বিরল বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। আর কেহ কেহ ধারণা করেন, যেমন সুহায়লী কুতায়বা ও মাক্কাশ হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, সারা ইবরাহীম (আ)-এর ভ্রাতা হারানের কন্যা, লূত (আ)-এর ভগ্নী। ইহাদের দাবি হইল, তখনকার শরীআতে ভ্রাতুষ্পুত্রীকে বিবাহ করা বৈধ ছিল। এইজন্য হাফিজ ইবন কাছীর এই মতটিকে জোরদারভাবে প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন যে, ইহা অজ্ঞতার ফল এবং ইহার সপক্ষে কোন প্রমাণ নাই। যদি মানিয়াও লওয়া যায় যে, তখনকার সময়ে উহা বৈধ ছিল, যেমন ইয়াহূদী পণ্ডিতগণ হইতে বর্ণিত আছে, তবুও আম্বিয়া-ই কিরাম উহার উপর আমল করেন নাই। ইবন কাছীর-এর মতে সারা ইবরাহীম (আ)-এর চাচা হারান এর কন্যা ছিলেন। ইহাই অধিকতর সঠিক ও প্রসিদ্ধ বলিয়া তিনি মত ব্যক্ত করিয়াছেন (ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১৫০)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00