📄 তৎকালীন বাদশাহ নমরূদের পরিচয়
ঐতিহাসিক ইবন ইসহাক-এর মতে হযরত ইবরাহীম (আ) পারস্যদেশবাসী বাদশাহ নমরূদ ইবন কিন'আন ইবন কূশ-এর আমলে জন্মগ্রহণ করেন। কাহারও কাহারও মতে সে কূশ ইবন কিন'আন-এর পুত্র ছিল। কিন্তু অধিকাংশের মতে সে নিজেই বাদশাহ ছিল। ইবন ইসহাক বলেন, তাহার রাজত্ব পূর্ব হইতে পশ্চিমে বিস্তৃত ছিল। সে বাবিলের বসবাস করিত। কথিত আছে যে, সমগ্র বিশ্বের রাজত্ব করেন তিন ব্যক্তিঃ নমরূদ, যুল-কারনায়ন ও সুলায়মান ইবন দাউদ (আ)। কেহ কেহ হযরত সুলায়মানের স্থলে আয়াতের অন্তর্ভুক্ত করিয়াছেন, কিন্তু ইনুল-আছীর তাহা বাতিল বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন (আল-কামিল, ১৪, ৭২)। তাহার বংশলতিকা হইলঃ নমরূদ ইবন কিন'আন ইবন কূশ ইবন সাম ইবন নূহ (আৎ-তাবারী, তারীখ, ১৪, ১২৯)। সে-ই প্রথম স্বেচ্ছাচারী ও কঠোর আচরণকারী রাজা ছিল। সে বিবিধ ধরণের খারাপ আদর্শের প্রচলন করে। প্রথম মাথায় তাজ (রাজমুকুট) পরিধান করে, শয়তানের সহায়তায় জ্যোতির্বিদ্যার প্রসার ঘটায় এবং তারকার প্রতি দৃষ্টিপাত করত উহা পর্যবেক্ষণ করিয়া গণনা করত এবং ইহাকে ভবিষ্যদ্বাণী বলিয়া প্রচার করত (ইবন কুতায়বা, মা'আরিফ, পৃ. ৩১) এবং এই কাজে কিছু লোক নিয়োজিত করে, যাহারা কাহিন (গণক) ও মুনাজ্জিম (জ্যোতিষী) নামে পরিচিত। সে-ই প্রথম লোকদেরকে তাহার পূজা করিতে উদ্বুদ্ধ করে এবং নিজেকে বিস্ময়কর ক্ষমতাধর বলিয়া দাবি করে। সে প্রথম আল্লাহ্র অবাধ্যতা ও বিদ্রোহিতায় চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে। তাহার সময়ে অগ্নিপূজার প্রচলন হয় এবং জ্যোতির্বিদদের উভয় ঘটে (আল-মাসউদী, মুরুযুয-যাহাব, ১৪, ৪৪)। আল্লাহ্ তা'আলা তাহাকে দীর্ঘ জীবন দান করেন। দীর্ঘদিন সে রাজত্ব করে (এক বর্ণনামতে চার শত বৎসর)। কোনও দলীল-প্রমাণই তাহাকে গোমরাহী হইতে ফিরাইতে পারে নাই। অবশেষে তাহাকে ধ্বংস করিবার জন্য আল্লাহ্ তা'আলা মশা বাহিনী প্রেরণ করেন। এক অতি পরিশ্রান্ত মশা বাহির হয় যে, সূর্যকে পর্যন্ত আচ্ছাদন করিয়া ফেলে। মশা বাহিনী নমরূদের সেনাবাহিনীসহ রক্ত মাংস খাইয়া ফেলিল, শুধুমাত্র হাড্ডিগুলি অবশিষ্ট রহিল। অবশেষে একটি মশা নমরূদের নাক দিয়া মগজে ঢুকিয়া বসিল। সেখানে নমরূদ উৎপত্তি করিত নমরূদকে অস্থির করিয়া ফেলিত। তাই সর্বদাই দ্বারা তাহার মস্তক পিটাইতে হইত। মানুষ তাহার প্রতি এইভাবে প্রদর্শন করিত যে, দুই হাত দিয়া অনবরত মস্তকে তাহার আঘাত করিতে থাকিত। এইভাবে শত বৎসর জীবিত থাকিয়া শাস্তি ভোগ করে (যাহাদের বর্ণনামতে ৪০ দিন)। এইরূপ অবস্থায় তাহার মৃত্যু হয় (ইবনুল-জাওযী, আল-মুনতাজাম, ১৪, ২৮০-২৮১; ইবন কুতায়বা, আল-মা'আরিফ, পৃ. ৩১; মুখতাসার কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৭৫)।
📄 ইবরাহীম (আ)-এর জন্ম ও বংশপরিচয়
তাহার জন্মস্থান সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। কাহারও মতে তিনি আহওয়ায প্রদেশের 'সূস' নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন, কাহারও মতে কূফার শহরতলী কূছরাবা নামক স্থানে। অতঃপর তাঁহার পিতা যে প্রান্তে বসবাস করিত তাঁহাকে সেখানে লইয়া যায়। কাহারও মতে হারান নামক স্থানে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। অতঃপর তাঁহার পিতা তাঁহাকে বাবিলের কূছা নামক স্থানে লইয়া যান। কাহারও মতে তিনি আহওয়াযের কাসকার নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। অতঃপর তাঁহার পিতা তাঁহাকে বাবিলের ভূমিতে লইয়া যান। কিন্তু অধিকাংশের মতে হারান নামক স্থানেই তিনি জন্মগ্রহণ করেন (আৎ-তাবারী, তারীখ, ১৪, ১১৬; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৭৬)। হাকিম ইবন আসাকির তাঁহার জন্মস্থান সম্পর্কে দুইটি মত উদ্ধৃত করিয়াছেন এবং বাবিলকেই বলিষ্ঠ বলিয়া রায় দিয়াছেন। তিনি ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, ইবরাহীম (আ) দামিশক-এর খূতা নামক শহর-শ্যামল প্রান্তের কাছিয়ূন পর্বতের সালিহিয়া নগরে জন্মগ্রহণ করেন। অতঃপর দামিশক বুনন, তবে নাকি শস্য-শ্যামল হইতে তিনি বাবিলের কূছায় প্রবেশ করেন। উপস্থিত তথ্য গ্রহণে তাহা এই হইবে যে, লূত (আ)-এর সহায়তার জন্য সেখানে গমন করেন তখন সেখানে সাদ্দূম আদায় করেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১৪, ১৪০; মুহাম্মাদ আলী-সাকরী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬২)। খ্যাতনামা ভূগোলবিদ ইয়াকূত আল-হামাবী ও আল-বাকরী আল-আন্দালুসী-এর বর্ণনা হইতেও এই মতের সমর্থন পাওয়া যায়। তাঁহাদের বর্ণনামতে বাবিলের অন্তর্গত ‘কূছা রাব্বা' নামক স্থানেই ইবরাহীম (আ) জন্মগ্রহণ করেন, সেখানকে তাঁহাকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হয় (ইয়াকূত আল-হামাবী, মু'জামুল-বুলদান, ৪খ, ৪৯৭; আল-বাকরী আল-আন্দালুসী, মু'জামু মাসতা'জাম, ৪খ, ১১৩৮)।
ইবন ইসহাক-এর বর্ণনামতে হযরত নূহ (আ) ও ইবরাহীম (আ)-এর মধ্যখানে মাত্র দুইজন নবী হূদ (আ) ও সালিহ (আ) আগমন করেন। তাঁহাদের সময়কাল শেষ হওয়ার পর মানুষ যখন গোমরাহী ও শিরক-এ লিপ্ত হইল, এক আল্লাহ্র পরিবর্তে মূর্তিপূজা ও নক্ষত্র পূজায় লিপ্ত হইল, তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার বান্দাদিগকে সুপথে আনিবার জন্য ইবরাহীম (আ)-কে নবীরূপে প্রেরণ করিবার ইচ্ছা করিলেন। এমতাবস্থায় জ্যোতিষী ও গণকগণ তৎকালীন পারস্যদেশীয় বাদশাহ নমরূদের নিকট গিয়া বলিল, আমরা আমাদের বিদ্যার মাধ্যমে দেখিতে পাইতেছি যে, আপনার এই অঞ্চলে অমুখ বৎসরে অমুখ মাসে ইবরাহীম নামে এক শিশু জন্মগ্রহণ করিবে। সে আপনার ধর্ম ধ্বংস করিবে এবং মূর্তি ভাঙ্গিয়া ফেলিবে। আপনার রাজত্বের ভিত্তিও তাহার দ্বারাই হইবে। কোন কোন বর্ণনায় আছে, তাহারা পূর্ববর্তী নবীদের কিতাবে পাইয়াছে (ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৭; আৎ-তাবারী, তারিখ, ১৪, ১২০; ইবনুল-জাওযী, আল-মুনতাজাম, ১৪, ২৮৫)। অতঃপর পরামর্শক্রমে সেই বৎসরের যেই বৎসরে সেই ছেলে ভূমিষ্ঠ হইবার কথা, নমরূদ তাহার এলাকার প্রত্যেক গর্ভবতী মহিলার নিকট একজন লোক প্রেরণ করিল। সে উক্ত মহিলার প্রতি নজর রাখিতে লাগিল। যখন কোন মহিলা কোন পুত্রসন্তান প্রসব করিত তখনই নমরূদের নির্দেশে তাহাকে হত্যা করা হইত। কিন্তু আয়াতের কী লীলা, ইবরাহীম (আ)-এর মাতা গর্ভবতী হইলেন কিন্তু তাঁহার পেটে কোন চিহ্নই ছিল না। কিছু আয়াতের কী লীলা, ইবরাহীম (আ)-এর মাতা গর্ভবতী হইলেন কিন্তু তাঁহার পেটে কোন চিহ্নই ছিল না। তিনি অন্য অবস্থা গোপন করিলেন। অতঃপর প্রসব বেদনা শুরু হইলে তিনি লোকালয় হইতে দূরে এক গুহায় গিয়া আশ্রয় নিলেন এবং সেখানে তিনি ইবরাহীম (আ) জন্মগ্রহণ করিলেন। অতঃপর প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সমাধা করার পর গুহার মুখ বন্ধ করিয়া তিনি বাড়ি ফিরিয়া আসিলেন। ইহার পর তিনি গুহায় গিয়া তাঁহাকে দেখিয়া আসিতেন। তিনি যখনই যাইতেন দেখিতেন যে, ইবরাহীম জীবিত আছেন এবং স্বীয় বৃদ্ধাঙ্গুলী চোষণ করিতেছেন। কথিত আছে এই বৃদ্ধাঙ্গুলী দিয়া আল্লাহ্ মধু, এক অঙ্গুলী দিয়া দুধ, এক অঙ্গুলী দিয়া মাখন এবং আর এক অঙ্গুলী দিয়া খেজুরের রস বাহির করিয়া দিতেন (আৎ-তাবারী, তারিখ, ১৪, ১১৯-১২০; আল-মুনতাজাম, ১৪, ২৫৯)। তাহার জন্ম ও বর্ধন প্রক্রিয়া ছিল অন্য সাধারণ বালকের ন্যায়, এক মাসে তাঁহার শারীরিক বৃদ্ধি হইত অন্য বালকের এক বৎসরের ন্যায়। তিনি টগবগ করিয়া মাত্র ১৫ মাস ছিলেন। এক দিন তিনি তাঁহার মাতাকে বলিলেন, আমাকে বাহির করিয়া লইয়া চলুন। এই বর্ণনামতে ইবরাহীম (আ) তাঁহার পিতাকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, তিনি তাহার স্রষ্টা। অতঃপর তিনি তাহার মাতাকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, তিনি তাহার স্রষ্টা। ইহাতে তাহার পিতা তাহাকে মারিতে উদ্যত হন। কারণ এক মাসে এক বৎসরের সমান হইলে ১৫ মাস অর্থাৎ ১৫ বৎসর। ছা'লাবীর এই মত যে কেহ খণ্ডন করেন যে, গুহায় থাকিতেই ইবরাহীম (আ) যুবকে পরিণত হন (ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৭৮)।
তাঁহার জন্ম সম্পর্কে সুদ্দী ইবন মাসউদ (রা) ও অন্যান্য সাহাবী সূত্রে ভিন্ন বর্ণনা দিয়াছেন। তাহা হইলঃ নমরূদ এক কঠিন স্বপ্ন দেখিয়াছিল। একটি তারকা উদিত হইয়াছে। চন্দ্র ও সূর্যের আলোকে বিলীন করিয়া দিয়াছে, এমনকি উহাদের আর একটুও জ্যোতি রহিল না। ইহাতে নমরূদ দারুণভাবে ঘাবড়াইয়া গেল, গণক, জ্যোতিষী ও যাদুগর সকলকে ডাকিল। তাহারা বলিল, আপনার রাজত্বের ধ্বংস অনিবার্য। কারণ হাতে এমন এক ব্যক্তি জন্ম নিবে যাহার হাতে আপনার ও আপনার রাজত্বের ধ্বংস অনিবার্য (ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৭)। নমরূদের বাদশাহীতে ছিল বিপুল শহর। অতঃপর সে শহর হইতে বাহির হইয়া গেল এবং অন্য এলাকার চলিয়া গেল এবং তাঁহার পরিবারের সকল পুরুষকে বাহিরে রাখিয়া সকল পুরুষকে বাহিরে লইয়া আসিল, যাহাতে উহাতে উক্ত শিশু কোন মহিলার গর্ভে আসিতে না পারে। অতঃপর সে নির্দেশ দিল যে, কোন পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করিলেই তাহাকে হত্যা করা হইত। এইভাবে তাহারা সকল পুত্র সন্তানকে হত্যা করিতে লাগিল। অতঃপর তাঁহার স্ত্রী গর্ভবতী হইলেন। অতঃপর ইবরাহীম (আ)-এর পিতা তাহার গর্ভবতী স্ত্রীকে ছাড়িয়া রাখিল না। তাহার সহিত মেলামেশা করিল না। আবার তাহাকে বাহির করিল। আমার দানিতে উহা হইতে বেশী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইলঃ দেখাও, তোমার স্ত্রীতে মেলামেশা করিও না। আবার তাহাকে বলিলঃ দেখাও, আমি আমার দানিতে উহা হইতেও বেশী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইলঃ দেখাও, আমার স্ত্রীর সহিত মেলামেশা করিও না। আবার তাহাকে বাহির করিল। সেখানে সে স্ত্রীর নানাবিধ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়া আসিত। এদিকে যখন অনেক দিন অতিবাহিত হইল তখন বাদশাহ বলিল, তোমরা তোমাদের স্ব স্ব গৃহে ফিরিয়া যাও। তখন তাহারা ফিরিয়া আসিল। ওদিকে সেই ভয় ইবরাহীম (আ) জন্মগ্রহণ করিলেন। প্রতিদিন তাঁহার এক সপ্তাহ, প্রতি মাস এক বৎসরের মত অতিবাহিত হইতে লাগিল। বাদশাহ তাহা ভুলিয়া গেল। ইবরাহীম (আ) বড় হইলে তাঁহার পিতামাতা ছাড়া অন্য কোন সৃষ্টি দেখিতে নাই। ইবরাহীমের পিতা তাহার সঙ্গী-সাথীদেরকে বলিল, আমার একটি পুত্র আছে যাহাকে আমি লুকাইয়া রাখিয়াছি। তাহাকে যদি আমি লইয়া আসি তাহা হইলে কি বাদশাহের ভয় আছে? তাহারা বলিল, না, তাহাকে লইয়া আস। তিনি গিয়া তাহাকে গুহা হইতে বাহিরে লইয়া আসিল (আৎ-তাবারী, তারিখ, ১৪, ১২০-১২২; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৭-৭৮; ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১৪, ৭৯)।
ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, ইবরাহীম (আ)-এর মাতা যখন পূর্ববর্তী দুইজন তখন পদব্রজে নমরূদের কাছে গেল, যে শিশু পুত্রের সংবাদ আপনাকে দিয়াছিলাম সে গুহার মধ্যে মারা গিয়াছে। তখন নমরূদ পরম সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে কুশল জিজ্ঞাসা করিল এবং সে গুহা হইতে বাহির হইয়া আসিল। অতঃপর ইবরাহীম (আ)-এর মাতার যখন সন্তান প্রসবের সময় ঘনাইয়া আসিল এবং প্রসব বেদনা তাঁহাকে কাবু করিয়া ফেলিল তখন তিনি গুহা বা একটি নির্জন স্থানে প্রসব করিলেন, জানাননি হইয়া গেলে তাহার সন্তানের মৃত্যু ভয় হইল। অতঃপর তিনি একটি কাপড় দিয়া মুড়াইয়া গুহার একটি নির্জন স্থানে প্রসব করিলেন। অতঃপর ফিরিয়া আসিয়া স্বামীকে তিনি একটি পুত্রসন্তান প্রসবের কথা জানাইলেন এবং গুহাতে রাখিয়া আসিয়াছেন তাহাও জানাইলেন। অতঃপর তাহার পিতা গুহায় গিয়া তাহাকে জীবিত সুস্থ অবস্থায় নিজের একটি পূর্ব একটি পূর্ব আঙ্গুল দিয়া চুষিয়া চুষিয়া দুগ্ধ পান করিয়া খাইয়াছেন (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৭)।
📄 বংশলতিকা
তাওরাত-এর বর্ণনামতে তাঁহার বংশলতিকা হইলঃ ইবরাহীম ইবন তারাহ (বয়স ২৫০ বৎসর) ইবন নাহুর (বয়স ১৪৮ বৎসর) ইবন সারূগ (আ) ইবন রাউ ইবন ফালিগ ইবন আবির ইবন শালিখ ইবন আরফাখশায-এর ইবন নাহুর (Genesis, 11: 10-27; ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১৪, ১৩২; আত-তাবারী, তারিখ, ১৪, ১১৯)। বংশ লতিকার ছক নিম্নরূপঃ
সাম আর পিতা নূহ (আ)-এর বয়স ৫০০ বৎসর
আরফাখশায-এর ” সাম ” ১০০ ”
শালিহ ” ” আরফাখশায ” ১২৫ ”
আবির ” ” শালিহ ” ৩০ ”
ফালিজ ” ” আবির ” ৩৪ ”
রাউ ” ” ফালিজ ” ৩২ ”
সারূজ ” ” রাউ ” ৩০ ”
নাহুর ” ” সারূজ ” ৩০ ”
তারাহ ” ” নাহুর ” ২৯ ”
আবরাহাম/ইবরাহীম ” ” তারাহ ” ৭৫ ”
মোট-৯৮৫ বৎসর।
(আল-নাজ্জার, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৭৩)।
ইতিহাস ও বাইবেলে ইবরাহীম (আ)-এর পিতার নাম আরিখ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। কিন্তু কুরআন কারীমে তাহাকে আযর বলা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে; وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لِأَبِيهِ آزَرَ أَتَتَّخِذُ أَصْنَامًا آلِهَةً “স্মরণ কর, ইবরাহীম তাহার পিতা আযরকে বলিয়াছিল, আপনি কি মূর্তিকে ইলাহরূপে গ্রহণ করেন?” (৬ঃ ৭৪)। তাই উলামায়ে কিরাম এই অসামঞ্জস্য দূরীকরণে বিভিন্ন প্রকারের ব্যাখ্যা পেশ করিয়াছেন।
(১) কাহারও মতে তারাহ ও আযর একই ব্যক্তি। তাহার নামবাচক বিশেষ্য (علم اسمى) আর গুণের অপভ্রংশ বিশেষ্য (علم وصفى)। ইহাতে মতে আযর হিব্রু শব্দ যাহার অর্থ প্রেমিক, তাহার মূর্তির সহিত সর্বদাই জড়িত ছিল। সে মূর্তি তৈরি করিত এবং মূর্তির পূজা করিত। এইজন্য তাহাকে আযর উপাধি দেওয়া হয় এবং এই উপাধিতেই সে প্রসিদ্ধি লাভ করে। আর কিছু লোকের ধারণা, আযর শব্দের অর্থ أَعرج অর্থাৎ নির্বোধ বা বক্রপদ ও অন্ধের জন্য নির্দিষ্ট বা বোকা ও পথভ্রষ্ট এবং সে কারণে তাঁহার বংশে বর্তমান ছিল বিধায় এই উপাধিই তাহার মূল নাম রাখিয়াছিল (তাফসীর-আলূস, ৩খ, ১১)। তারাহ-এর মধ্যে এই বিশেষণে বর্তমান ছিল বিধায় এই উপাধিতে বিশেষায়িত হইয়া সেই পরিচিতি হইয়া যায়। তাই কুরআন কারীমে তাহার রাসূল উনূফ গ্রন্থে এই মত বর্ণনা করিয়াছেন (১৮, ৭৪)।
(২) কাহারও কাহারও মতে উক্ত আয়াতে ইবরাহীম (আ)-এর পিতার নাম উল্লেখ নাই। এই মর্মে মুজাহিদ (র) হইতে একটি রিওয়ায়াত রহিয়াছে যে, কুরআন কারীমের উল্লিখিত আয়াতে অর্থ হইল أَأَزَرًا تَتَّخِذُ أَرْبَابًا অর্থাৎ ‘তুমি কি আযরকে উপাস্য বানাও কর, অর্থাৎ মূর্তিকে উপাস্য মানাও আর আল্লাহ্র সান্নিধ্য হইতে ইহাকেই মোটকথা ইহাতে মতে কুরআন কারীমে ইবরাহীম (আ)-এর পিতার নাম উল্লেখ করা হয় নাই, মুজাহিদ (র)-এর মতটিই যুক্তিযুক্ত বলিয়া গ্রহণযোগ্য। কারণ মিসরের প্রাচীন দেবমূর্তির মধ্যে একটির নাম ছিল আযরিস। যাহার অর্থ “শক্তিশালী ও সাহায্যকারী খোদা”। আর মূর্তি পূজারীদের মধ্যে পূর্বে প্রচলিত ছিল যে, তাহারা প্রাচীন দেবতাদের নামে নূতন দেবতাদের নামকরণ করিত। তাই এই মূর্তিটি প্রাচীন মিসরীয় দেবতার নামে আযর রাখা হয়। আর তাঁহারই কুরআন কারীমে উল্লিখিত হইয়াছে (হিফজুর রাহমান সিওহারবী, কাসাসুল-কুরআন, ১৪, ১৫২-১৫৩)।
(৩) একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনামতে ইবরাহীম (আ)-এর পিতার নাম তাহার আর তাহার চাচাই তাহার লালন-পালন করে। তাই কুরআন কারীমে তাহাকে ইবরাহীম (আ)-এর পিতা বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। চাচা তো পিতার সমপর্যায়ের। রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি হাদীছেও ইহার সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি ইরশাদ করিয়াছেনঃ الصِّنْوَ أَبِيهِ “চাচা পিতার ন্যায়ই” (সিওহারবী, প্রাগুক্ত)।
তবে কুরআনের কারীমের সুস্পষ্ট বর্ণনায় আয়াতে পিতা বলা হইয়াছে। তন্মধ্যে উহার কোন রূপক অর্থ গ্রহণ বা অন্য কোনও জটিল বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে বলিয়া যুক্তিযুক্ত মনে হয় না। যদি স্বীকারও করিয়া লওয়া হয় যে, আযর অর্থ মূর্তির কোন বিশেষ দেবতার নাম, তবুও ইহার জটিল বিশ্লেষণে যাওয়ার প্রয়োজন নাই। উভয় অবস্থাতেই বলা যায় যে, তাহার ভাস্কর নামই ছিল। যেমন মূর্তিপূজকগণ ইবাদত করিতে হইলে নিজেদের সন্তানদের দেবতার গোলামরূপে নাম রাখিত (যথা আবদুল উয্যা, আবদ মানাত প্রভৃতি), আর কখনো কখনো সরাসরি দেবতার নামে নাম রাখিত। এই ক্ষেত্রেও তাহাই ঘটিয়া থাকিবে।
প্রকৃতপক্ষে কালদীয় ভাষায় বড় পূজারীকে বলা হয় আযর। আরবী ভাষায় ইহারকেই আযর বলা হইয়াছে। সুতরাং তাহার চাচাকে যেহেতু মূর্তির নির্মাতা এবং সবচেয়ে বড় পূজারী ছিল, এইজন্য আযর নামেই সে প্রসিদ্ধি লাভ করে। অথচ ইহার তাহার নাম নহে, উপাধি। আর উপাধি যেহেতু নামের স্থান দখল করে সেহেতু কুরআন কারীমে তাহাকে উক্ত নামেই উল্লেখ করা হইয়াছে (হিফজুর রাহমান সিওহারবী, কাসাসুল কুরআন, ১৪, ১৫০)।
নির্দেশ, বেতরুফ বা অকেজো বৃদ্ধ প্রভৃতি বিশেষণের কারণে অথবা বলী মোটেও সমর্থনযোগ্য নহে। কারণ হযরত ইবরাহীম (আ)-এর চরিত্র এতই উন্নত ছিল যে, পিতার সম্মুখে যখন তিনি মূর্তি পূজার অসারতা তুলিয়া ধরিলেন তখন পিতা রাগান্বিত হইয়া তাহাকে ভর্ৎসনা ও হুমকি প্রদর্শন করিয়া বলিয়াছিলঃ
أَرَاغِبٌ أَنتَ عَنْ آلِهَتِي يَا إِبْرَاهِيمُ ۖ لَئِن لَّمْ تَنتَهِ لَأَرْجُمَنَّكَ ۖ وَاهْجُرْنِي مَلِيًّا
“হে ইবরাহীম! তুমি কি আমার দেব-দেবী হইতে বিমুখ? যদি তুমি নিবৃত্ত না হও তবে আমি প্রস্তরাঘাতে তোমার প্রাণনাশ করিবই। তুমি চিরদিনের জন্য আমার নিকট হইতে দূরে হইয়া যাও” (১৯ঃ ৪৬)।
এত কঠোর ভাষা ও কঠোর আচরণের পরও তিনি পিতার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা ও ভক্তি রাখিয়া বিনয়াবনতভাবে তাহার শান্তি কামনা করিয়াছিলেন এবং তাহার জন্য আল্লাহ্র নিকট দুআ করার অঙ্গীকার করিয়া বলেনঃ
سَلَامٌ عَلَيْكَ ۖ سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي ۖ إِنَّهُ كَانَ بِي حَفِيًّا
“তোমার প্রতি সালাম। আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিব। নিশ্চয় তিনি আমার প্রতি অতিশয় অনুগ্রহশীল” (১৯ঃ ৪৭)।
সুতরাং এমন মহানবিদের পিতা অযোগ্য, বেতরুফ, অকেজো বৃদ্ধ প্রভৃতি অসম্মান-সূচক বিশেষণে সম্বোধন করা বা তাহার সামনে উক্ত শব্দ ব্যবহার করা জাহেলী আচরণের অন্তর্ভুক্ত (আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার, পৃ. ৭০)। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ইতিহাস ও বাইবেলে বর্ণিত তাহার কুরাইশ বংশে এই একই ব্যক্তি। আমার তাহার নামবাচক বিশেষ্য (علم اسمى) ; গুণবাচক বিশেষ্য (علم وصفى) এবং তাহার আয়াত হয়ত-বা তাহার নামের অংশ নহে, শাব্দিক অনুবাদ, তুচ্ছার্থে তাহার নামটি উল্লিখিত হইয়াছে। আর পিতার পিতাকে পিতৃব্য বলা হয়। বেতরুফ, অকেজো বৃদ্ধ প্রভৃতি অসম্মান সূচক বিশেষণে সম্বোধন করা বা তাহার সামনে উক্ত শব্দ ব্যবহার করা জাহেলী আচরণের অন্তর্ভুক্ত। পিতাকে পিতৃব্য বলা হয়। বেতরুফ, অকেজো বৃদ্ধ প্রভৃতি অসম্মান সূচক বিশেষণে সম্বোধন করা বা তাহার সামনে উক্ত শব্দ ব্যবহার করা জাহেলী আচরণের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং আল্লাহর নবীদের অনুবাদ না করিয়া হুবহু নামই ব্যবহার করা প্রশস্ত হইয়াছে (সিওহারবী, কাসাসুল কুরআন, ১৮, ১৫৩-১৫৪)।
ইবরাহীম (আ)-এর পিতা আযর ছিল কাঠমিস্ত্রী। সে কাঠের মূর্তি তৈরি করিত এবং মূর্তি-পূজকদের নিকট উহা বিক্রয় করিত (আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৯)।
হাফিজ ইবন আসাকির ইবন আবী-দাখিল সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ইবরাহীম (আ)-এর মাতা ছিল উনায়লা। আল-কালবীর বর্ণনামতে তাহার নাম ছিল বূনা বিনত কারবাতা। আন-নাজ্জারবী “লায়ূছা” বলিয়া তাহার একটি নামের উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি ছিলেন আরফাখশায ইবন সাম ইবন নূহ (আ)-এর বংশধর (ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১৪, ১৪০; ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ১১৯; আল-রাযী, ৩৬খ, ৭৫)।
তারাহ-এর বয়স যখন ৭৫ বৎসর তখন পুত্র ইবরাহীম (আ) জন্মগ্রহণ করেন। তারাহ-এর অপর দুই পুত্র ছিল নাহুর ও হারান। ইবরাহীম (আ) মধ্যম ও নাহুর কনিষ্ঠ। হারানের পুত্র লূত (আ)। হারান তাহার পিতার জীবদ্দশায় স্বীয় জন্মভূমি কালদানীদের ভূমি অর্থাৎ বাবিলের মারা যান। ইতিহাস ও সীরাতবিদগণের নিকট ইহাই প্রসিদ্ধ। হাফিজ ইবন আসাকির ইরাক হইতে সীরাত বিশেষজ্ঞ বালিয়াকেন (ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১৪, ১৪০; ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ১১৯; মুহাম্মাদ আলী-সাকরী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬১)।
📄 কুরআন কারীমে হযরত ইবরাহীম (আ)
কুরআন কারীমের বহু স্থানে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর আলোচনা করা হইয়াছে। তাঁহার হিদায়াত প্রাপ্তি, পিতা ও কওমের প্রতি তাওহীদের দাওয়াত এবং মূর্তির অসারতা প্রতিপাদন করিয়া যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য প্রদান, জালিম ও জাহিল বাদশাহের সহিত বিতর্ক, তাঁহার অগ্নিপরীক্ষা, বাবুন শহর ত্যাগ, সন্তান ও পরিবারবর্গের জন্য দু'আ, কাবা গৃহ নির্মাণ ও হজ্জের ঘোষণা প্রদান প্রভৃতি বিষয় মাক্কী ও মাদানী উভয় প্রকার সূরাতেই ব্যাপক আলোচনা করা হইয়াছে। একটি মাত্র সূরাও তাঁহার নামে নামকরণ করা হইয়াছে, যাহা মক্কায় অবতীর্ণ হয়। কুরআনের কারীমের মোট ২৫টি সূরার ৬৯টি স্থানে তাঁহার নাম উল্লেখ করা হইয়াছে। তন্মধ্যে সূরা বাকারা, আল-ই ইমরান, আন'আম, হূদ, আন-নাহল, মারয়াম, আল-আম্বিয়া, আল-হাজ্জ ও আস-সাফফাত-এ বিস্তারিত আলোচনা করা হইয়াছে। যে সকল সূরা ও আয়াতে তাঁহার আলোচনা করা হইয়াছে তাহার একটি ছক নিম্নরূপঃ
ক্রমিক নং সূরার নাম ও ক্রমিক নং আয়াত সংখ্যা
১. আল-বাকারাহ-২ - ১২৪, ১২৫, ১২৬, ১২৭, ১৩০, ১৩২, ১৩৩, ১৩৫, ১৩৬, ১৪০, ২৫৮, ২৬০।
২. আল-ইমরান-৩ - ৩৩, ৬৫, ৬৭, ৬৮, ৮৪, ৯৫, ৯৭।
৩. আন-নিসা-৪ - ৫৪, ১২৫, ১৬৩।
৪. আল-আন'আম-৬ - ৭৪, ৭৫, ৮৩, ১৬১।
৫. আত-তাওবা-৯ - ৭০, ১১৪।
৬. হূদ-১১ - ৬৯, ৭৪, ৭৫, ৭৬।
৭. ইউসুফ-১২ - ৬, ৩৮।
৮. ইবরাহীম-১৪ - ৩৫।
৯. আল-হিজর-১৫ - ৫১।
১০. আন-নাহল-১৬ - ১২০, ১২৩।
১১. মারয়াম-১৯ - ৪১, ৪৬, ৫৮।
১২. আল-আম্বিয়া-২১ - ৫১, ৬০, ৬২, ৬৯।
১৩. আল-হাজ্জ-২২ - ২৬, ৪৩, ৭৮।
১৪. আশ-শু'আরা-২৬ - ৬৯।
১৫. আল-আনকাবূত-২৯ - ১৬, ৩১।
১৬. আল-আহযাব-৩৩ - ৭।
১৭. আস-সাফফাত-৩৭ - ৮৩, ১০৪, ১০৯।
১৮. সাদ-৩৮ - ৪৫।
১৯. আশ-শূরা-৪২ - ১৩।
২০. আয-যুখরুফ-৪৩ - ২৬।
২১. আয-যারিয়াত-৫১ - ২৪।
২২. আন-নাজম-৫৩ - ৩৭।
২৩. আল-হাদীদ-৫৭ - ২৬।
২৪. আল-মুমতাহানা-৬০ - ৪।
২৫. আল-আ'লা-৮৭ - ১৯।
(আন-নাজ্জার, পৃ. ৭৭; সিওহারবী, কাসাসুল কুরআন, ১৪, ১১৭-১১৮)।
কুরআনুল কারীমে হযরত ইবরাহীম (আ) সম্পর্কে যে আলোচনা করা হইয়াছে উহার বিশদ বিবরণ নিম্নে প্রদত্ত হইলঃ
وَإِذِ ابْتَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَّهُنَّ ۖ قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا ۖ قَالَ وَمِن ذُرِّيَّتِي ۖ قَالَ لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ ﴿١٢٤﴾ وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَأَمْنًا وَاتَّخِذُوا مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى ۖ وَعَهِدْنَا إِلَىٰ إِبْرَahِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَن طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ ﴿١٢٥﴾ وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَٰذَا بَلَدًا آمِنًا وَارْزُقْ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ مَنْ آمَنَ مِنْهُم بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۖ قَالَ وَمَن كَفَرَ فَأُمَتِّعُهُ قَلِيلًا ثُمَّ أَضْطَرُّهُ إِلَىٰ عَذَابِ النَّارِ ۖ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ ﴿١٢٦﴾ وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ ﴿١٢٧﴾ رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ ﴿١٢٨﴾ رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ ﴿١٢٩﴾ وَمَن يَرْغَبُ عَن مِّلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَن سَفِهَ نَفْسَهُ ۚ وَلَقَدِ اصْطَفَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا ۖ وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ ﴿١٣٠﴾ إِذْ قَالَ لَهُ رَبُّهُ أَسْلِمْ ۖ قَالَ أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ ﴿١٣١﴾ وَوَصَّىٰ بِهَا إِبْرَاهِيمُ بَنِيهِ وَيَعْقُوبُ يَا بَنِيَّ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَىٰ لَكُمُ الدِّينَ فَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ ﴿١٣٢﴾ أَمْ كُنتُمْ شُهَدَاءَ إِذْ حَضَرَ يَعْقُوبَ الْمَوْتُ إِذْ قَالَ لِبَنِيهِ مَا تَعْبُدُونَ مِن بَعْدِي قَالُوا نَعْبُدُ إِلَٰهَكَ وَإِلَٰهَ آبَائِكَ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ إِلَٰهًا وَاحِدًا وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ
( ২ঃ ১২৪-১৩৩)
“আর স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম তাঁহার প্রতিপালকের কয়েকটি কথা দ্বারা পরীক্ষা করিয়াছিলেন এবং সেগুলি সে পূর্ণ করিয়াছিল। আল্লাহ্ বলিলেন, আমি তোমাকে মানবজাতির নেতা করিতেছি। সে বলিল, আমার বংশধরগণের মধ্য হইতেও আল্লাহ্ বলিলেন, আমার প্রতিশ্রুতি জালিমদের প্রতি প্রযোজ্য নহে। আর সেই সময়কে স্মরণ কর যখন কা'বাগৃহকে মানবজাতির মিলন কেন্দ্র ও নিরাপত্তার স্থল করিয়াছিলাম, তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ কর এবং ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে তাওহীদীকারী, রুকূ ও সিজদাকারীদের জন্য আমার গৃহকে রাখিবার আদেশ দিয়াছিলাম। স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম বলিয়াছিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার এই শহরকে নিরাপদ শহর কর। নিশ্চয় তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা। হে আমার প্রতিপালক! আমাদের উভয়কে তোমার অনুগত কর এবং আমাদের বংশধর হইতে তোমার এক অনুগত উম্মত করিও। আমাদিগকে ইবাদাতের নিয়ম-পদ্ধতি দেখাইয়া দাও এবং আমাদের প্রতি ক্ষমাপরবশ হও। তুমি অত্যন্ত ক্ষমাপরবশ, পরম দয়ালু। হে আমাদের প্রতিপালক! তাহাদের মধ্য হইতে তাহাদের নিকট এরূপ রাসূল প্রেরণ করিও যে তাহাদের নিকট তোমার আয়াতসমূহ আবৃত্তি করিবে, তাহাদিগকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবে এবং তাহাদিগকে পবিত্র করিবে। তুমি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। যে নিজেকে নির্বোধ করিয়াছে সে ব্যতীত ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ হইতে আর কে বিমুখ হইবে? পৃথিবীতে তাহাকে আমি মনোনীত করিয়াছি; আখিরাতেও সে অবশ্যই সৎকর্মপরায়ণদের অন্যতম। তাহার প্রতিপালক যখন তাহাকে বলিয়াছিলেন, আত্মসমর্পণ কর, সে বলিয়াছিল, আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ করিলাম। এবং ইবরাহীম ও ইয়া'কূব এই সম্বন্ধে তাহাদের পুত্রগণকে নির্দেশ দিয়াছিল (মুসলিম) যে হে! তোমরা কখনও মৃত্যুবরণ করিও না। ইয়া'কূবের নিকট যখন মৃত্যু আসিয়াছিল তখন তোমরা কি তখন উপস্থিত ছিলে? সে যখন পুত্রগণকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, আমার পরে তোমরা কিসের ইবাদত করিবে? তখন তাহারা বলিয়াছিল, আমরা আপনার ইলাহ-এবং আপনার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাক-এর ইলাহ-একই ইলাহর ইবাদত করিব। তিনি একমাত্র ইলাহ এবং আমরা তাঁহারই নিকট আত্মসমর্পণকারী” (২ঃ ১২৪-১৩৩)।
قَالُوا نُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنزِلَ إِلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَىٰ وَعِيسَىٰ وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِن رَّبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ
( ২ঃ ১৩৬-২৭)
“তোমরা বল, ইয়াহূদী বা খৃস্টান হও, ঠিক পথ পাইবে। বল, বরং একনিষ্ঠ হইয়া আমরা ইবরাহীমের মিল্লাত (ধর্মাদর্শ) অনুসরণ করি এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না” (২ঃ ১৩৫-৬)।
أَمْ تَقُولُونَ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطَ كَانُوا هُودًا أَوْ نَصَارَىٰ ۗ قُلْ أَأَنتُمْ أَعْلَمُ أَمِ اللَّهُ ۗ وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّن كَتَمَ شَهَادَةً عِندَهُ مِنَ اللَّهِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
“তোমরা কি বল, ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়া'কূব ও তাঁহার বংশধরগণ অবশ্যই ইয়াহূদী কিংবা খৃস্টান ছিল? বল, তোমরা কি বেশী জ্ঞান, না আল্লাহ্র নিকট হইতে তাহার কাছে যে প্রমাণ আছে তাহা যে গোপন করে তাহার অপেক্ষা অধিক জালিম আর কে হইতে পারে? তোমরা যাহা কর আল্লাহ্ সে সম্বন্ধে অনব অবহিত নহেন” (২ঃ ১৪০)।
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِي حَاجَّ إِبْرَاهِيمَ فِي رَبِّهِ أَنْ آتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ إِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّيَ الَّذِي يُحْيِي وَيُمِيتُ قَالَ أَنَا أُحْيِي وَأُمِيتُ ۖ قَالَ إِبْرَاهِيمُ فَإِنَّ اللَّهَ يَأْتِي بِالشَّمْسِ مِنَ الْمَشْرِقِ فَأْتِ بِهَا مِنَ الْمَغْرِبِ فَبُهِتَ الَّذِي كَفَرَ ۗ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
( ২ঃ ২৫৮)
“তুমি কি ঐ ব্যক্তিকে দেখ নাই, যে ইবরাহীমের সহিত তাহার সম্বন্ধে বিতর্ক লিপ্ত হইয়াছিল, যেহেতু আল্লাহ্ তাহাকে রাজত্ব দিয়াছিলেন। যখন ইবরাহীম বলিল, তিনি আমার প্রতিপালক যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান। সে বলিল, আমিও তো জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই। ইবরাহীম বলিল, আল্লাহ্ সূর্যকে পূর্ব দিক হইতে উদয় করান, তুমি পশ্চিম দিক হইতে উহা উদয় করাও তো। অতঃপর যে কুফরী করিয়াছিল সে হতবুদ্ধি হইয়া গেল। আল্লাহ্ জালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না” (২ঃ ২৫৮)।
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَىٰ آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعَالَمِينَ ﴿٣٣﴾ ذُرِّيَّةً بَعْضُهَا مِن بَعْضٍ ۗ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
( ৩ঃ ৩৩-৩৪)
“নিশ্চয় আল্লাহ্ আদমকে, নূহকে ও ইবরাহীমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরকে বিশ্বজগতে মনোনীত করিয়াছেন। ইহারা একে অপরের বংশধর। আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ” (৩ঃ ৩৩-৩৪)।
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تُحَاجُّونَ فِي إِبْرَاهِيمَ وَمَا أُنزِلَتِ التَّوْرَاةُ وَالْإِنجِيلُ إِلَّا مِن بَعْدِهِ ۚ أَفَلَا تَعْقِلُونَ ﴿٦٥﴾ هَا أَنتُمْ هَٰؤُلَاءِ حَاجَجْتُمْ فِيمَا لَكُم بِهِ عِلْمٌ فَلِمَ تُحَاجُّونَ فِيمَا لَيْسَ لَكُم بِهِ عِلْمٌ ۚ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ ﴿٦٦﴾ مَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًّا وَلَا نَصْرَانِيًّا وَلَٰكِن كَانَ حَنِيفًا مُّسْلِمًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ ﴿٦٧﴾ إِنَّ أَوْلَى النَّاسِ بِإِبْرَاهِيمَ لَلَّذِينَ اتَّبَعُوهُ وَهَٰذَا النَّبِيُّ وَالَّذِينَ آمَنُوا ۗ وَاللَّهُ وَلِيُّ الْمُؤْمِنِينَ
(৩ঃ ৬৫-৬৭)
“হে কিতাবীগণ! ইবরাহীম সম্বন্ধে কেন তোমরা তর্ক কর, অথচ তাওরাত ও ইনজীল তো তাহার পরেই অবতীর্ণ হইয়াছিল? তোমরা কি বুঝ না? হাঁ, তোমরা তো সেইসব লোক, যে বিষয়ে তোমাদের সামান্য জ্ঞান আছে সে বিষয়ে তোমরা তর্ক করিয়াছ, তবে যে বিষয়ে তোমাদের কোন জ্ঞান নাই সে বিষয়ে কেন তর্ক করিতেছ? আল্লাহ্ জ্ঞাত কিন্তু তোমরা জ্ঞাত নও। ইবরাহীম ইয়াহূদীও ছিল না, খৃস্টানও ছিল না; সে ছিল একনিষ্ঠ আত্মসমর্পণকারী এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। নিশ্চয় মানুষের মধ্যে তাহারাই ইবরাহীমের ঘনিষ্ঠতম যাহারা তাহার অনুসরণ করিয়াছে এবং এই নবী ও যাহারা ঈমান আনিয়াছে, আল্লাহ্ মুমিনদের অভিভাবক” (৩ঃ ৬৫-৬৮)।
أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ ۖ قُلْ إِنِ افْتَرَيْتُهُ فَعَلَيَّ إِجْرَامِي وَأَنَا بَرِيءٌ مِّمَّا تُجْرِمُونَ
(৩ঃ ৮৪)
“বল, আমরা আল্লাহ্ এবং আমাদের প্রতি যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে এবং যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়া'কূব ও তাঁহার বংশধরগণের প্রতি যাহা মূসা, ঈসা ও অন্যান্য নবীগণকে তাহাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে প্রদান করা হইয়াছে তাহাতে আমরা বিশ্বাস করি। আমরা তাহাদের মধ্যে কোন তারতম্য করি না এবং আমরা তাঁহারই নিকট আত্মসমর্পণকারী” (৩ঃ ৮৪)।
فَلَمَّا ذَهَبَ عَنْ إِبْرَاهِيمَ الرَّوْعُ وَجَاءَتْهُ الْبُشْرَىٰ يُجَادِلُنَا فِي قَوْمِ لُوطٍ
(৩ঃ ৭০)
“বল, আল্লাহ্ সত্য বলিয়াছেন। তোমরা একনিষ্ঠ ইবরাহীমের (ধর্মাদর্শ) অনুসরণ কর, সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নহে” (৩ঃ ৯৫)।
إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبَارَكًا وَهُدًى لِّلْعَالَمِينَ ﴿٩٦﴾ فِيهِ آيَاتٌ بَيِّنَاتٌ مَّقَامُ إِبْرَاهِيمَ ۖ وَمَن دَخَلَهُ كَانَ آمِنًا
(৩ঃ ৯৭)
“নিশ্চয় মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহ প্রতিষ্ঠিত হয় তাহা তো বাক্কায়; উহা বরকতময় ও বিশ্বজগতের দিশারী। উহাতে (আছে) অনেক সুস্পষ্ট নিদর্শন আছে, যেমন মাকামে ইবরাহীম। আর যে কেহ সেথায় প্রবেশ করে সে নিরাপদ” (৩ঃ ৯৬-৯৭)।
أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَىٰ مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ ۖ فَقَدْ آتَيْنَا آلَ إِبْرَاهِيمَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَآتَيْنَاهُم مُّلْكًا عَظِيمًا
( ৪ঃ ৫৪)
অথবা আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যাহা দিয়াছেন সেজন্য কি তাহারা তাহাদিগকে ঈর্ষা করে? আমি ইবরাহীমের বংশধরকেও তো কিতাব ও হিকমত প্রদান করিয়াছিলাম এবং তাহাদিগকে বিশাল রাজ্য দান করিয়াছিলাম” (৪ঃ ৫৪)।
وَمَنْ أَحْسَنُ دِينًا مِّمَّنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ وَاتَّبَعَ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ۗ وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا
( ৪ঃ ১২৫)
“তাহার অপেক্ষা দীনে কে উত্তম যে সৎকর্মপরায়ণ হইয়া আল্লাহ্র নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং একনিষ্ঠভাবে ইবরাহীমের মিল্লাত (ধর্মাদর্শ) অনুসরণ করে? আল্লাহ্ ইবরাহীমকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিয়াছেন” (৪ঃ ১২৫)।
إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَىٰ نُوحٍ وَالنَّبِيِّينَ مِن بَعْدِهِ ۚ وَأَوْحَيْنَا إِلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَعِيسَىٰ وَأَيُّوبَ وَيُونُسَ وَهَارُونَ وَسُلَيْمَانَ ۚ وَآتَيْنَا دَاوُودَ زَبُورًا
( ৪ঃ ১৬৩)
“আমি তো তোমার নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছি, যেমন নূহ ও তাহার পরবর্তী নবীগণের নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছিলাম। ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়া'কূব ও তাহার বংশধরগণ, ঈসা, আইয়ূব, ইউনুস, হারূন ও সুলায়মানের নিকটও ওহী প্রেরণ করিয়াছিলাম এবং দাউদকে যাবূর দিয়াছিলাম” (৪ঃ ১৬৩)।
وَكَذَٰلِكَ نُرِي إِبْرَاهِيمَ مَلَكُوتَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلِيَكُونَ مِنَ الْمُوقِنِينَ ﴿٧٥﴾ فَلَمَّا جَنَّ عَلَيْهِ اللَّيْلُ رَأَىٰ كَوْكَبًا ۖ قَالَ هَٰذَا رَبِّي ۖ فَلَمَّا أَفَلَ قَالَ لَا أُحِبُّ الْآفِلِينَ ﴿٧٦﴾ فَلَمَّا رَأَى الْقَمَرَ بَازِغًا قَالَ هَٰذَا رَبِّي ۖ فَلَمَّا أَفَلَ قَالَ لَئِن لَّمْ يَهْدِنِي رَبِّي لَأَكُونَنَّ مِنَ الْقَوْمِ الضَّالِّينَ ﴿٧٧﴾ فَلَمَّا رَأَى الشَّمْسَ بَازِغَةً قَالَ هَٰذَا رَبِّي هَٰذَا أَكْبَرُ ۖ فَلَمَّا أَفَلَتْ قَالَ يَا قَوْمِ إِنِّي بَرِيءٌ مِّمَّا تُشْرِكُونَ ﴿٧٨﴾ إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا ۖ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ ﴿٧٩﴾ وَحَاجَّهُ قَوْمُهُ ۚ قَالَ أَتُحَاجُّونِّي فِي اللَّهِ وَقَدْ هَدَانِ ۚ وَلَا أَخَافُ مَا تُشْرِكُونَ بِهِ إِلَّا أَن يَشَاءَ رَبِّي شَيْئًا ۗ وَسِعَ رَبِّي كُلَّ شَيْءٍ عِلْمًا ۗ أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ ﴿٨٠﴾ وَكَيْفَ أَخَافُ مَا أَشْرَكْتُمْ وَلَا تَخَافُونَ أَنَّكُمْ أَشْرَكْتُم بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَانًا ۚ فَأَيُّ الْفَرِيقَيْنِ أَحَقُّ بِالْأَمْنِ ۖ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ
“স্মরণ কর, ইবরাহীম তাহার পিতা আযরকে বলিয়াছিল, আপনি কি মূর্তিকে ইলাহরূপে গ্রহণ করেন? আমি তো আপনাকে ও আপনার সম্প্রদায়কে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখিতেছি। এইভাবে আমি ইবরাহীমকে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর পরিচালন ব্যবস্থা দেখাই, যাহাতে সে নিশ্চিত বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়। অতঃপর যখন রজনীর অন্ধকার যখন তাহাকে আচ্ছন্ন করিল তখন সে নক্ষত্র দেখিল, বলিল, ‘ইহাই আমার প্রতিপালক। অতঃপর যখন উহা অস্তমিত হইল তখন বলিল, ‘যাহা অস্তমিত হয় তাহা আমি পছন্দ করি না'। অতঃপর যখন সে চন্দ্রকে উদীয়মান দেখিল তখন বলিল, ‘ইহাই আমার প্রতিপালক'। যখন ইহাও অস্তমিত হইল তখন বলিল, ‘আমার প্রতিপালক আমাকে সৎপথ প্রদর্শন না করিলে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হইব'। অতঃপর যখন সূর্যকে দীপ্তিমানরূপে দেখিল তখন বলিল, 'ইহাই আমার প্রতিপালক, ইহা সর্ববৃহৎ। যখন ইহাও অস্তমিত হইল তখন বলিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যাহাকে আল্লাহ্র শরীক কর আমি তাহা হইতে মুক্ত হইলাম। আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁহার দিকে মুখ ফিরাইতেছি যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নহি'। তাহার সম্প্রদায় তাহার সহিত বিতর্কে লিপ্ত হইল। সে বলিল, তোমরা কি আল্লাহ্ সম্বন্ধে আমার সহিত বিতর্ক করিতেছ? যে বিষয়ে তিনি তোমাদিগকে কোন সনদ দেন নাই। সুতরাং যদি তোমরা জান তবে বল, দুই দলের মধ্যে কোন্ দল নিরাপত্তা লাভের বেশী হকদার” (৬ ৪৭৪-৮১)?
وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ ۚ كُلًّا هَدَيْنَا ۚ وَنُوحًا هَدَيْنَا مِن قَبْلُ ۖ وَمِن ذُرِّيَّتِهِ دَاوُودَ وَسُلَيْمَانَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسَىٰ وَهَارُونَ ۚ وَكَذَٰلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ
(৬ঃ ৮৪-৮৬)
“আর আমি আমার যুক্তি ইবরাহীমকে দিয়াছিলাম তাহার সম্প্রদায়ের মুকাবিলায়; যাহাকে ইচ্ছা আমি মর্যাদায় আমি উন্নীত করি। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। আমি তাহাকে দান করিয়াছিলাম ইসহাক ও ইয়া'কূব, ইহাদের প্রত্যেককে সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম এবং তাহার বংশধর দাউদ, সুলায়মান, আইয়ূব, ইউসুফ, মূসা ও হারূনকেও; আর এইভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদিগকে পুরস্কৃত করি” (৬ঃ ৮৩-৮৪)।
قُلْ إِنَّنِي هَدَانِي رَبِّي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ دِينًا قِيَمًا مِّلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ۚ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ
(৭ঃ ১৭২)
“বল, 'আমার প্রতিপালক তো আমাকে সৎপথে পরিচালিত করিয়াছেন। ইহাই সুপ্রতিষ্ঠিত দীন, ইবরাহীমের মিল্লাত (ধর্মাদর্শ), সে ছিল একনিষ্ঠ এবং সে ছিল মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না'” (৬ঃ ১৬১)।
أَلَمْ يَأْتِهِمْ نَبَأُ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ قَوْمِ نُوحٍ وَعَادٍ وَثَمُودَ وَقَوْمِ إِبْرَاهِيمَ وَأَصْحَابِ مَدْيَنَ وَالْمُؤْتَفِكَاتِ ۚ أَتَتْهُمْ رُسُلُهُم بِالْبَيِّنَاتِ ۖ فَمَا كَانَ اللَّهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَٰكِن كَانُوا أَنفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ
( ৯ঃ ৭০)
“তাহাদের পূর্ববর্তী নূহ, আদ ও ছামূদের সম্প্রদায়, ইবরাহীমের সম্প্রদায় এবং মাদয়ান ও বিধ্বস্ত নগরের অধিবাসিগণের সংবাদ কি তাহাদের নিকট আসে নাই? তাহাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনসহ তাহাদের রাসূলগণ আসিয়াছিল। আল্লাহ্ এমন নহেন যে, তাহাদের উপর যুলুম করেন, কিন্তু উহারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করে” (৯ঃ ৭০)।
وَمَا كَانَ اسْتِغْفَارُ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ إِلَّا عَن مَّوْعِدَةٍ وَعَدَهَا إِيَّاهُ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ أَنَّهُ عَدُوٌّ لِّلَّهِ تَبَرَّأَ مِنْهُ ۚ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَأَوَّاهٌ حَلِيمٌ
(৭ঃ ১১৪)
“ইবরাহীম তাহার পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিয়াছিল, তাহাকে ইহার প্রতিশ্ৰুতি দিয়াছিল বলিয়া। অতঃপর যখন ইহা তাহার নিকট সুস্পষ্ট হইল যে, সে আল্লাহ্র শত্রু, তখন ইবরাহীম তাহার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করিল। ইবরাহীম তো কোমল হৃদয় ও সহনশীল” (৯ঃ ১১৪)।
وَلَقَدْ جَاءَتْ رُسُلُنَا إِبْرَاهِيمَ بِالْبُشْرَىٰ قَالُوا سَلَامًا ۖ قَالَ سَلَامٌ ۖ فَمَا لَبِثَ أَن جَاءَ بِعِجْلٍ حَنِيذٍ ﴿٦٩﴾ فَلَمَّا رَأَىٰ أَيْدِيَهُمْ لَا تَصِلُ إِلَيْهِ نَكِرَهُمْ وَأَوْجَسَ مِنْهُمْ خِيفَةً ۚ قَالُوا لَا تَخَفْ إِنَّا أُرْسِلْنَا إِلَىٰ قَوْمِ لُوطٍ ﴿٧٠﴾ وَامْرَأَتُهُ قَائِمَةٌ فَضَحِكَتْ فَبَشَّرْنَاهَا بِإِسْحَاقَ وَمِن وَرَاءِ إِسْحَاقَ يَعْقُوبَ ﴿٧١﴾ قَالَتْ يَا وَيْلَتَىٰ أَأَلِدُ وَأَنَا عَجُوزٌ وَهَٰذَا بَعْلِي شَيْخًا ۖ إِنَّ هَٰذَا لَشَيْءٌ عَجِيبٌ ﴿٧٢﴾ قَالُوا أَتَعْجَبِينَ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ ۖ رَحْمَتُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الْبَيْتِ ۚ إِنَّهُ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ ﴿٧٣﴾ فَلَمَّا ذَهَبَ عَنْ إِبْرَاهِيمَ الرَّوْعُ وَجَاءَتْهُ الْبُشْرَىٰ يُجَادِلُنَا فِي قَوْمِ لُوطٍ ﴿٧٤﴾ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَحَلِيمٌ أَوَّاهٌ مُّنِيبٌ ﴿٧٥﴾ يَا إِبْرَاهِيمُ أَعْرِضْ عَنْ هَٰذَا ۖ إِنَّهُ قَدْ جَاءَ أَمْرُ رَبِّكَ ۖ وَإِنَّهُمْ آتِيهِمْ عَذَابٌ غَيْرُ مَرْدُودٍ
(১১ঃ ৬৭-৭৭)
“আমার ফেরেশতাগণ তো সুসংবাদ লইয়া ইবরাহীমের নিকট আসিল। তাহারা বলিল, ‘সালাম’। সেও বলিল, 'সালাম'। সে অবিলম্বে এক কাবাবকৃত গো-বৎস লইয়া আসিল। তাহারা যখন দেখিল, তাহাদের হস্ত উহার দিকে প্রসারিত হইতেছে না, তখন তাহাদিগকে অবাঞ্ছিত মনে করিল এবং তাহাদের সম্বন্ধে তাহার মনে ভীতির সঞ্চার হইল। তাহারা বলিল, ভয় করিও না, আমরা তো লূত সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হইয়াছি। তাহার স্ত্রী নিকটে দণ্ডায়মান ছিল এবং সে হাসিয়া ফেলিল। অতঃপর আমি তাহাকে ইসহাকের ও ইসহাকের পরবর্তী ইয়া'কূবের সুসংবাদ দিলাম। সে বলিল, কী আশ্চর্য! সন্তানের জননী হইব আমি, যখন আমি বৃদ্ধা! ইহারা অবশ্যই এক আশ্চর্য ব্যাপার। তাহারা বলিল, আল্লাহ্র কাজে তুমি বিস্ময় বোধ করিতেছ? হে পরিবারবর্গ!