📄 আল্লাহ্র উষ্ট্রী আখ্যায়িত করার কারণ
আল-কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন, هَذِهِ نَاقَةُ الله لَكُمْ آيَةً "ইহা আল্লাহ্র উস্ত্রী, ইহা তোমাদের জন্য একটি নিদর্শন" (৭: ৭৩)। এই সম্পর্কে আল্লামা কুরতুবী বলেন, উষ্ট্রীটিকে আল্লাহ্ দিকে সম্পর্ক করা হইয়াছে সৃষ্টির সহিত স্রষ্টার সম্পর্ক হিসাবে। ইহা উষ্ট্রীটির মর্যাদার ইঙ্গিতবহ (কুরতুবী, আল-জামি লিআহকামিল কুরআন, ৮খ, ২৩৮)। সায়ি্যদ আলুসী বলেন, উষ্ট্রীটির সম্পর্ক আল্লাহ্র সাথে করা হইয়াছে ইহার সম্মানার্থে, যেইভাবে মসজিদকে বায়তুল্লাহ বলা হয়। তবে এখানে ইযাফতটি (সম্পর্ক) অতি নগণ্য সামঞ্জস্যের কারণে হইয়াছে। আল্লাহ্ দিকে ইযাফত করার আরও কারণ হইল, উষ্ট্রীর স্বাভাবিক জন্মলাভের পদ্ধতি ও কারণসমূহের দ্বারা সৃষ্টি হয় নাই। ফলে ইহাকে আল্লাহ্র স্পষ্ট নিদর্শন বলা হইয়াছে। কেহ কেহ বলিয়াছেন, আল্লাহ ব্যতীত ইহার কোন মালিক ছিল না বিধায় তাঁহার উষ্ট্রী বলা হইয়াছে (আল-আলুসী, রূহুল মাআনী, ৮খ., ১৬৩)। ইমাম রাযী বলেন, কাহারও কাহারও মতে উহা আল্লাহ্ নিদর্শন হইল এই হিসাবে যে, ইহা পূর্ণ অবয়বে পাথর হইতে নির্গত হইয়াছিল। কাদী ইয়াদ বলেন, এই অভিমত সঠিক হইলে তিনটি কারণে ইহাতে অলৌকিকতা রহিয়াছে, তাহা হইল: পর্বত হইতে ইহার আবির্ভাব, স্বাভাবিকভাবে উষ্ট্রীর পেটে জন্ম না হওয়া এবং ধাপে ধাপে বৃদ্ধি হওয়া ছাড়াই পূর্ণ উষ্ট্রী হিসাবে আত্মপ্রকাশ। দ্বিতীয় অভিমত হইল, উহা আল্লাহর নিদর্শন ছিল এই হিসাবে যে, এই উষ্ট্রীর পানি পানের পালা ছিল একদিন আর সমূদয় ছামূদ সম্প্রদায়ের পানের পালা ছিল আর একদিন। তৃতীয় অভিমত হইল উষ্ট্রীটি যেইদিন পানি পান করিত সেইদিন সমগ্র ছামূদ সম্প্রদায়ের লোকজন তাহাদের চাহিদামত উষ্ট্রী হইতে দুধ দোহন করিত। চতুর্থ অভিমত হইল, উষ্ট্রীটি যেই দিন পানি পান করিত সেই দিন অন্যান্য সকল প্রাণী পানি পানের ঘাটে অবতরণ করা হইতে বিরত থাকিত। আর যেই দিন সে পানি পান করিত না সেই দিন সকল প্রাণী ঘাটে নামিয়া আসিত। মোটকথা, আল-কুরআন উষ্ট্রীটিকে নিদর্শন বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছে কিন্তু তাহা কি কারণে নিদর্শন তাহা উল্লেখ করে নাই। তবে ইহা অবশ্যই জ্ঞাতব্য যে, উষ্ট্রীটি নিঃসন্দেহ মুজিযা ছিল (ফাখরুদ্দীন আর-রাযী, আত-তাফসীরুল কাবীর, বৈরুত তা, বি., ১৪.খ, ১৬২)।
📄 ধ্বংসপ্রাপ্ত ছামূদ সম্প্রদায়কে সালিহ (আ)-এর সম্বোধন
এই সম্পর্কে সাঈদ আলূসী বলেন, সালিহ (আ) কর্তৃক উহাদিগকে সম্বোধনের আখ্যান জানানো ছিল রাসূলুল্লাহ্ (স) কর্তৃক মূর্খ মুশরিকদেরকে সম্বোধনের মতো। মূর্খ মুশরিকদেরকে যদ্দরজা তিরস্কার করা হইয়াছে তাহাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহাদের প্রতিপালকের পক্ষ হইতে প্রেরিত পয়গামের জন্য সেই তিরস্কার করা হইয়াছিল। ইয়াহূদী ও খৃস্টান সম্প্রদায়কে সম্বোধন করিয়াছিলেন, যে সম্বোধন জাতিগতভাবে তাহাদের জন্য পরিপূর্ণ ও সর্বাঙ্গীণ ছিল। হইতে পারে সালিহ (আ)-এর সম্বোধন এমনিভাবে সর্বতোভাবে তাহাদের জন্য পরিব্যাপ্ত ছিল। কেহ কেহ বলিয়াছেন, এখানে আয়াত অংশ-বিশেষে করা হইয়াছে। আয়াতের মধ্যে অংশ-বিশেষ উদ্ধৃত করা হয় এবং অবশিষ্ট অংশ বাদ দেওয়া হইয়াছে। এই আয়াতের মধ্যে অংশটি এই যে, সালিহ (আ)-এর সম্বোধনের অংশবিশেষ। ইয়াহূদীগণকে সম্বোধনের ক্ষেত্রে ইহা ব্যবহৃত হয়। ইহাতে অর্থ এইরূপ হইবে : হে ইয়াহূদীগণ! তোমরা স্মরণ কর যখন আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করিয়াছিলেন, তাহা কি তোমরা বিস্মৃত হইয়াছ। তোমরা সালিহ (আ)-এর সম্বোধনের প্রতি লক্ষ্য কর, সালিহ (আ)-এর সম্বোধন অংশবিশেষ হইবে।
মু‘তাদেকে সম্বোধনের পক্ষে ইমাম রাযীর যুক্তি এই যে, ইহা শুনিয়া অনেক জীবিত লোক উপদেশ গ্রহণ করিবে এবং এইরূপ করা হইতে মূর্খ মুশরিকদেরকে যদ্দরজা তিরস্কার করা হইবে। ইহা তাহাদের জন্য উপদেশ হইবে এবং তাহাদের নিজেদের প্রতিপালকের প্রতি তাহাদের সম্বোধন। আল্লাহ্র নবী মূসা (আ)-এর সম্বোধন তাহাদের জন্য উপদেশ ছিল (আত্-তাফসীরুল কবীর, দারুস্ সাক্কাফাহ্, ১৪ খ, ১৬৭)।
📄 তাবৃক গমনকালে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ছামূদ জনপদ অতিক্রম
ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। ছামূদ সম্প্রদায়ের (আবাসভূমি) অতিক্রম করিবার সময় রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন : তোমরা ক্রন্দনরত অবস্থা ছাড়া এই সম্প্রদায়ের আবাসে প্রবেশ করিও না, যাহারা নিজেদের উপর “জুলুম” করিয়াছে যাহাতে উহাদের যে শাস্তি ভোগ করিতে হইয়াছে তাহা তোমাদেরকে স্পর্শ না করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) চাদর দ্বারা নিজ মস্তক আবৃত করিয়া দ্রুতগতিতে উপত্যকা অতিক্রম করিলেন” (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাব নুযূলিন-নবী (স) আল-হিজর, ২খ, ৫৩)।
ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেন :
لَمَّا كَانَ فِي غَزْوَةِ تَبُوكٍ فَأَسْرَعَ النَّاسُ إِلى أَهْلِ الْحِجْرِ يَدْخُلُوْنَ عَلَيْهِمْ فَبَلَغَ ذلِكَ رَسُولَ اللهِ ﷺ فَنَادَى فِي النَّاسِ الصَّلَاةَ جَامِعَةً قَالَ فَأَتَيْتُ النَّبِيَّ ﷺ وَهُوَ يُمْسِكُ بَعِيْرَهُ وَهُوَ يَقُولُ
“তাবুক যুদ্ধে গমনের পথে লোকজন হিজরবাসীদের দিকে দ্রুত ধাবিত হইয়া তাহাদের নিকট প্রবেশ করিতে প্রবৃত্ত হইল। এই কথা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট পৌঁছিলে। তিনি লোকজনকে “সালাতে জামাত খাড়া” বলিয়া আহ্বান করিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর আমি নবী করীম (স)-এর নিকট আগমন করিলাম। এই সময় রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার বাহন উষ্ট্রীকে ধরিয়া রাখিতেছিলেন। তিনি বলিলেন, তোমরা এই সম্প্রদায়ের নিকট প্রবেশ করিও না যাহাদের উপর গযব অবতীর্ণ হইয়াছিল। অতঃপর এই সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করিয়া রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে বলিতে শুনিলাম! ইহা দেখিয়া বিস্ময় প্রকাশ করিবার কিছু নাই। আল্লাহ্র রাসূল! ইহা দেখিয়া বিস্ময় প্রকাশ করিবার কিছু নাই। আল্লাহ্র রাসূল! ইহা দেখিয়া বিস্ময় প্রকাশ করিবার কিছু নাই।” (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত)।
হইতে বর্ণিত :
ثُمَّ زَجَرَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ رَاحِلَتَهُ فَأَسْرَعَ حَتَّى خَلَّفَهَا .
“অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহার সাওয়ারীকে তাড়া করিলেন এবং এই স্থানটি ত্যাগ করিবার পূর্ব পর্যন্ত দ্রুত চলিলেন” (তাফসীরুল কবীর, ৪খ, ৪৮৪)।
📄 ছামূদ সম্প্রদায়ের শাস্তির ধরন
আবদুল্লাহ্ ওয়ায়ল আন-নাজ্জার বলেন, ছামূদ সম্প্রদায়কে ধ্বংস করা হইয়াছিল বজ্রনিনাদে (সায়েকা) দ্বারা। এই বজ্রনাদ পৃথিবীকে প্রকম্পিত করিয়াছিল বজ্রনিনাদের কারণে সময় আতংকিত হইয়াছিল এবং সকল প্রকার ধ্বনি প্রচণ্ড শব্দে পরিণত হয়। ইহাতে তাহাদের কলিজা ফাটিয়া গিয়াছিল এবং তাহারা নিজ নিজ ঘরে উপুড় হইয়া পড়িয়াছিল। ইব্ন কাছীর বলেন, ছামূদ সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয় বজ্রনিনাদ। ইহার ফলে তাহাদের হৃৎপিণ্ডের শিরা ফাটিয়া যায়। আল-কালবী ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন : إِن صَيْحَةً كَانَتْ مِن جَوْفِهِمْ “তাহাদের পেটের ভিতর হইতে বিকট শব্দ আসিয়াছিল”। অথবা ইহা দ্বারা বুঝানো হইয়াছে তাহাদের শহরের মধ্যে বিকট শব্দ হইয়াছিল। আল-আলূসী বলেন, الرحيم ماخذهم আয়াতে উক্ত রহমতের ব্যাপারে আল-ফাররা ও আয-যাজ্জাজ নিকট হইতে শব্দে রহমতের ব্যাপারে দুইটি মত রহিয়াছে। ইহার অর্থ হইল তাহাদের ভয়ানক ভূমিপ্রকম্পন। মুজাহিদ ও আস-সুদ্দী বলেন, رحمة শব্দটি এখানে رحمة এর স্থানে ব্যবহৃত হইয়াছে। এই দুইটি অভিধানের মধ্যে শব্দের পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় যে, একটিতে প্রথমে যবর ও দ্বিতীয়টিতে যবরের পর যবর দেওয়া হইয়াছে। আল-আলূসী বলেন, আল-কুরআনের কোন কোন رحمة শব্দে সাকিন দেওয়া রহিয়াছে। আবহাওয়া ব্যাপারী কোন কোন ক্ষেত্রে رحمة শব্দে যবর ব্যবহার করা হইয়াছে। ছামূদ সম্প্রদায়ের ধ্বংসের কারণ হইল তাহারা তাহাদের নবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করিয়াছিল। ইহা হইতেই তাহাদের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হইয়াছিল। আল-কালবী ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন “কেমন করিয়া এমন হইল যে, তাহাদের ছায়া হইতে তাহাদের শরীর পৃথক হইয়া গেল”। অথবা ইহা দ্বারা বুঝানো হইয়াছে “তাহাদের শরীর হইতে রূহ বাহির হইয়া গেল”। সায়ীদ আলূসীও এই বর্ণনা করিয়াছেন (দ্র. কাসাসুল কুরআন, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৬২-৩৪)।