📄 ছামূদ জাতির লোকদের আয়ু
মহান আল্লাহ ছামূদ জাতির লোকদেরকে দীর্ঘ জীবন দান করিয়াছিলেন। ইহারা এত দীর্ঘকাল বাঁচিয়া থাকিত যে, তাহাদের কোন লোক মজবুত গৃহ নির্মাণ করিলেও তাহার জীবদ্দশায় গৃহটি ধ্বংস হইয়া যাইত। অবস্থাদৃষ্টে তাহারা পাহাড় কাটিয়া হইাতে গৃহ নির্মাণ করিতে লাগিল। এইরূপ গৃহ নির্মাণে তাহারা অত্যন্ত দক্ষতার স্বাক্ষর রাখিত। ধন-সম্পদে ইহারা অত্যন্ত সুখী ও সমৃদ্ধিশালী জাতি ছিল (ইবনুল আছীর, আল-কামিল ফিত-তারিখ, দারুল কুতুব বৈরূত ১৪০৭ হি., ১খ., ৬৮; বুতরুস আল-বুসতানী, দাইম্ফাতুল মাআরিফ, বৈরূত তা বি., ৬খ., ৩৩৯)। আল্লাহ তাআলা কোরআনে এরশাদ করিয়াছেন হُوَ أَنْشَاكُمْ مِنَ الْأَرْضِ وَاسْتَعْمَرَكُمْ فِيهَا -এর সম্পর্কে আদ-দাহ্হাক বলিয়াছেন وَاسْتَعْمَرَكُمْ -এর অর্থ হইল আল্লাহ তোমাদেরকে দীর্ঘায়ু দান করিয়াছেন। কারণ ইহাদের কোন কোন লোক তিন শত বৎসর হইতে এক হাজার বৎসর পর্যন্ত জীবিত থাকিত (তাফসীরুল বাগাবী, প্রাগুক্ত, ২খ., ৩৯০)।
📄 সালিহ (আ)-কে ছামূদ জাতির প্রতি প্রেরণ
ছামূদ সম্প্রদায় তাহাদের পূর্বপূরুষদের ন্যায় প্রতিমা পূজারী ছিল। তাহাদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য তাহাদেরই সম্প্রদায় হইতে আল্লাহ তাআলা সালিহ (আ)-কে রাসূল হিসাবে প্রেরণ করিলেন। জগতের সকল বস্তুই আল্লাহ্ তাওহীদের প্রমাণ বহন করে এই কথা তিনি তাহাদেরকে স্পষ্ট ভাষায় বুঝাইয়া দেন এবং প্রতিমা পূজার অসারতা তাহাদের সম্মুখে তুলিয়া ধরেন (আবদুল ওয়াহহাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, ৫৯ পৃ.; হিফজুর রহমান, কাসাসুল কুরআন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৭)। সালিহ (আ)-কে যখন নবী হিসাবে প্রেরণ করা হয় তখন তিনি যুবক ছিলেন। তাহার নুবুওয়াত লাভ ও হ্রদ (আ)-এর ইন্তিকালের মধ্যে ব্যবধান ছিল এক শত বৎসরের মত। এই সময় ছামূদ সম্প্রদায়ের অধিপতি ছিল জুনদা ইবন আমর (আল-মাসউদী, মুরূজুয যাহাব, প্রাগুক্ত, ২খ., ৪৩)। সালিহ (আ) তাহাদেরকে লা শারীক আল্লাহ্ ইবাদতের দিকে আহবান করিলেন। তাঁহার আহবানে অল্প মানুষ সাড়া দিল। কিন্তু অধিকাংশ লোক তাহা গ্রহণ করিল না। তাঁহারা তাহাকে গালমন্দ ও নির্যাতন করিতে লাগিল এবং তাঁহাকে হত্যা করিবার পরিকল্পনা করিল ও তাঁহার উষ্ট্রী হত্যা করিল। ফলে আল্লাহ্ তাহাদেরকে অত্যন্ত কঠোরভাবে পাকড়াও করিলেন (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, বৈরূত ১৯৮৮ খৃ. ৩১খ., ১২৩)। ইরশাদ হইয়াছে:
وَإِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا فَقَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَالَكُمْ مِّنْ الهِ غَيْرُهُ قَدْ جَاءَتْكُمْ بَيْنَةٌ مِّنْ رَّبِّكُمْ هُذِهِ نَاقَةُ اللَّهِ لَكُمْ آيَةً فَذَرُوهَا تَأْكُلْ فِي أَرْضِ اللَّهِ وَلَا تَمَسُّوهَا بِسُوْءٍ فَيَأْخُذَكُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ . وَاذْكُرُوا إِذْ جَعَلَكُمْ خُلَفَاءَ مِنْ بَعْدِ عَادٍ وَبَوَاكُمْ فِي الْأَرْضِ تَتَّخِذُونَ مِنْ سُهُولِهَا قُصُورًا وَتَنْحِتُونَ الجِبَالَ بُيُوتًا فَاذْكُرُوا أَلَاءَ اللَّهِ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ . قَالَ الْمَلَأُ الَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا مِنْ قَوْمِهِ لِلَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا لِمَنْ أَمَنَ مِنْهُمْ أَتَعْلَمُونَ أَنَّ صَالِحًا مُرْسَلٌ مِّنْ رَّبِّهِ قَالُوا إِنَّا بِمَا أُرْسِلَ بِهِ مُؤْمِنُونَ . قَالَ الَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا إِنَّا بِالَّذِي أَمَنْتُمْ بِهِ كَافِرُونَ ، فَعَقَرُوا النَّاقَةَ وَعَدُوا عَنْ أَمْرِ رَبِّهِمْ وَقَالُوا يَا صَالِحُ ائْتِنَا بِمَا تَعِدُنَا إِنْ كُنْتَ مِنَ الْمُرْسَلِينَ. فَأَخَذَتْهُمُ الرَّجْفَةُ فَأَصْبَحُوا فِي دَارِهِمْ جَاثِمِينَ . فَتَوَلَّى عَنْهُمْ وَقَالَ يَا قَوْمِ لَقَدْ أَبْلَغْتُكُمْ رِسَالَةِ رَبِّي وَنَصَحْتُ لَكُمْ وَلَكِنْ لَا تُحِبُّونَ النَّاصِحِينَ.
"আমি ছামূদ জাতির নিকট তাহাদের ভ্রাতা সালিহকে পাঠাইয়াছিলাম। সে বলিয়াছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহ্ ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ নাই। তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালক হইতে স্পষ্ট নিদর্শন আসিয়াছে। আল্লাহর এই উস্ত্রী তোমাদের জন্য একটি নিদর্শন। ইহাকে আল্লাহ্র জমিনে চরিয়া খাইতে দাও এবং ইহাকে কোন ক্লেশ দিও না, দিলে মর্মন্তুদ শাস্তি তোমাদের উপর আপতিত হইবে। স্মরণ কর, আদ জাতির পর তিনি তোমাদেরকে তাহাদের স্থলাভিষিক্ত করিয়াছেন, তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন যে, তোমরা সমতল ভূমিতে প্রাসাদ ও পাহাড় কাটিয়া বাসগৃহ নির্মাণ করিতেছ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ্র অনুগ্রহ স্মরণ কর এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটাইও না। তাহার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক প্রধানেরা সেই সম্প্রদায়ের ঈমানদার, যাহাদেরকে দুর্বল মনে করা হইত, তাহাদেরকে বলিল, তোমরা কি জান যে, সালিহ আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত? তাহারা বলিল, তাহার প্রতি যে বাণী প্রেরিত হইয়াছে আমরা তাহাতে বিশ্বাসী। দাম্ভিকেরা বলিল, তোমরা যাহা বিশ্বাস কর আমরা তাহা প্রত্যাখ্যান করি। অতঃপর তাহারা সেই উষ্ট্রীটি বধ করে এবং আল্লাহ্র আদেশ অমান্য করে এবং বলে, হে সালিহ! তুমি রাসূল হইলে আমাদেরকে যাহার ভয় দেখাইতেছ তাহা আনয়ন কর। অতঃপর তাহারা ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হয়, ফলে তাহাদের প্রভাত হইল নিজগৃহে অধঃমুখে পতিত অবস্থায়। তৎপর সে তাহাদের নিকট হইতে মুখ ফিরাইয়া লইয়া বলিল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তো আমার প্রতিপালকের বাণী তোমাদের নিকট পৌঁছাইয়াছিলাম এবং তোমাদেরকে হিতোপদেশ দিয়াছিলাম, কিন্তু তোমরা তো হিতাকাঙ্খীদেরকে पसন্দ কর না" (৭: ৭৩-৭৯)।
আল্লাহ্ তা'আলা সূরা হূদে ইরশাদ করিয়াছেন:
وَإِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا قَالَ يُقَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِنْ اللَّهِ غَيْرُهُ هُوَ أَنْشَاكُمْ مِّنَ الْأَرْضِ واستَعْمَرَكُمْ فِيهَا فَاسْتَغْفِرُوهُ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ إِنَّ رَبِّي قَرِيبٌ مُجِيبٌ . قَالُوا يَا صَالِحُ قَدْ كُنْتَ فِينَا مَرْجُوا قَبْلَ هذا أَتَنْهُنَا أَنْ نَّعْبُدَ مَا يَعْبُدُ آبَاءَنَا وَإِنَّنَا لَفِي شَكٍّ مِّمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ مُرِيبٍ. قَالَ يَقَوْمٍ أَرَيْتُمْ إِنْ كُنْتُ عَلَى بَيِّنَةٍ مِّنْ رَبِّي وَآتَانِي مِنْهُ رَحْمَةً فَمَنْ يَنْصُرُنِي مِنَ اللهِ إِنْ عَصَيْتُهُ فَمَا تَزِيدُونَنِي غَيْرَ تَخْسِيرٍ وَيَقَوْمِ هَذِهِ نَاقَةُ اللهِ لَكُمْ آيَةٌ فَذَرُوهَا تَأْكُلْ فِي أَرْضِ اللهِ وَلَا تَمَسُّوهَا بِسُوءٍ فَيَأْخُذَكُمْ عَذَابٌ قَرِيبٌ. فَعَقَرُوهَا فَقَالَ تَمَتَّعُوا فِي دَارِكُمْ ثَلُثَةَ أَيَّامٍ ذَلِكَ وَعْدٌ غَيْرُ مَكْذُوبٍ فَلَمَّا جَاءَ أَمْرُنَا نَجَّيْنَا صَالِحًا وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ بِرَحْمَةٍ مِّنَّا وَمِنْ خِزْيِ يَوْمَئِذٍ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ الْقَوِيُّ الْعَزِيزُ وَأَخَذَ الَّذِينَ ظَلَمُوا الصَّيْحَةَ فَأَصْبَحُوا فِي دَارِهِمْ جَاثِمِينَ كَأَنْ لَّمْ يَغْنَوْا فِيهَا أَلَا إِنَّ ثَمُودَ كَفَرُوا رَبَّهُمْ أَلَا بُعْدًا لِثَمُودَ
"আমি ছামূদ জাতির নিকট তাহাদের ভ্রাতা সালিহকে পাঠাইয়াছিলাম। সে বলিয়াছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহ্ ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ নাই। তিনি তোমাদেরকে মৃত্তিকা হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন এবং উহাতেই তোমাদিগকে বসবাস করাইয়াছেন। সুতরাং তোমরা তাঁহার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁহার দিকেই প্রত্যাবর্তন কর। নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক নিকটে, তিনি আহবানে সাড়া দেন। তাহারা বলিল, হে সালিহ! ইহার পূর্বে তুমি ছিলে আমাদের আশাস্থল। তুমি কি আমাদেরকে নিষেধ করিতেছ ইবাদত করিতে তাহাদের যাহাদের ইবাদত করিত আমাদের পিতৃপুরুষেরা? আমরা অবশ্যই বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রহিয়াছি সে বিষয়ে, যাহার প্রতি তুমি আমাদেরকে আহবান করিতেছ। সে বলিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কি ভাবিয়া দেখিয়াছ, আমি যদি আমার প্রতিপালক প্রেরিত স্পষ্ট প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হইয়া থাকি এবং তিনি যদি আমাকে তাঁহার নিজ অনুগ্রহ দান করিয়া থাকেন, তবে আল্লাহ্ শাস্তি হইতে আমাকে কে রক্ষা করিবে, আমি যদি তাঁহার অবাধ্যতা করি? সুতরাং তোমরা তো কেবল আমার ক্ষতিই বাড়াইয়া দিতেছ। হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ্র এই উষ্ট্রীটি তোমাদের জন্য একটি নিদর্শন। ইহাকে আল্লাহর জমিনে চরিয়া খাইতে দাও। ইহাকে কোন ক্লেশ দিও না, দিলে আশু শাস্তি তোমাদের উপর আপতিত হইবে। কিন্তু তাহারা উহাকে বধ করিল। অতঃপর সে বলিল, তোমরা তোমাদের গৃহে তিন দিন জীবন উপভোগ করিয়া লও। ইহা একটি প্রতিশ্রুতি যাহা মিথ্যা হইবার নহে। এবং যখন আমার নির্দেশ আসিল তখন আমি সালিহ ও তাহার সঙ্গে যাহারা ঈমান আনিয়াছিল তাহাদেরকে আমার অনুগ্রহে রক্ষা করিলাম এবং রক্ষা করিলাম সেই দিনের লাঞ্ছনা হইতে। তোমার প্রতিপালক তো শক্তিমান, পরাক্রমশালী। অতঃপর যাহারা সীমালঙ্ঘন করিয়াছিল মহানাদ তাহাদেরকে আঘাত করিল। ফলে উহারা নিজ নিজ গৃহে নতজানু অবস্থায় শেষ হইয়া গেল। যেন তাহারা সেথায় কখনও বসবাস করে নাই। জানিয়া রাখ! ছামূদ সম্প্রদায় তো তাহাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করিয়াছিল। জানিয়া রাখ! ধ্বংসই হইল ছামূদ সম্প্রদায়ের পরিণাম" (১১: ৬৫-৬৮)।
আল্লাহ্ তা'আলা সূরা আল-হিজরে ইরশাদ করেন :
وَلَقَدْ كَذَّبَ أَصْحَابُ الحِجْرِ الْمُرْسَلِينَ، وَأَتَيْنَاهُم آيَتِنَا فَكَانُوا عَنْهَا مُعْرِضِينَ ، وَكَانُوا يَنْحِتُونَ مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا آمِنِينَ . فَأَخَذَتْهُمُ الصَّيْحَةُ مُصْبِحِينَ . فَمَا أَغْنَى عَنْهُمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
"হিজরবাসীগণও রাসূলগণের প্রতি মিথ্যা আরোপ করিয়াছিল। আমি তাহাদেরকে আমার নিদর্শন দিয়াছিলাম, কিন্তু তাহারা তাহা উপেক্ষা করিয়াছিল। তাহারা পাহাড় কাটিয়া গৃহ নির্মাণ করিত নিরাপদ বাসের জন্য। অতঃপর প্রভাতকালে মহানাদ উহাদেরকে আঘাত করিল। সুতরাং তাহারা যাহা অর্জন করিত তাহা তাহাদের কোন কাজে আসে নাই" (১৫:৮০-৮৪)।
সূরা আল-ইসরা (বানু ইসরাঈলে) ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا مَنَعَنَا أَنْ نُرْسِلَ بِالْآيَاتِ إِلَّا أَنْ كَذَّبَ بِهَا الأَوَّلُونَ . وَأَتَيْنَا ثَمُودَ النَّاقَةَ مُبْصِرَةً فَظَلَمُوا بِهَا وَمَا نُرْسِلُ بالآيَاتِ إِلَّا تَخْوِيفًا .
"পূর্ববর্তিগণ কর্তৃক নিদর্শন অস্বীকার করাই আমাকে নিদর্শন প্রেরণ করা হইতে বিরত রাখে। আমি শিক্ষাপ্রদ নিদর্শনস্বরূপ ছামূদ জাতিকে উষ্ট্রী দিয়াছিলাম। অতঃপর তাহারা উহার প্রতি যুলুম করিয়াছিল। আমি ভীতি প্রদর্শনের জন্যই নিদর্শন প্রেরণ করি" (১৭:৫৯)।
মহান আল্লাহ্ সূরা শু'আরায় ইরশাদ করিয়াছেন:
كَذَّبَتْ ثَمُودُ الْمُرْسَلِينَ إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ صَالِحٌ أَلَا تَتَّقُوْنَ . إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينُ. فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ ، وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرِ إِنْ أَجْرِى إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَلَمِينَ . أَتُشْرَكُونَ فِي مَا ههُنَا آمِنِينَ فِي جَنَّتٍ وَعُيُونٍ، وَزُرُوعٍ وَنَخْلٍ طَلْعُهَا هَضِيمٌ. وَتَنْحِتُونَ مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا فَرِهِيْنَ. فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ، وَلَا تُطِيعُوا أَمْرَ الْمُسْرِفِينَ . الَّذِينَ يُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ وَلَا يُصْلِحُونَ . قَالُوا إِنَّمَا أَنْتَ مِنَ الْمُسَخَّرِينَ . مَا أَنْتَ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُنَا فَأْتِ بِآيَةٍ إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّدِقِينَ . قَالَ هَذِهِ نَاقَةً لَهَا شِرْبٌ وَلَكُمْ شَرْبُ يَوْمٍ مَّعْلُومٍ وَلَا تَمَسُّوهَا بِسُوءٍ فَيَأْخُذَكُمْ عَذَابُ يَوْمٍ عَظِيمٍ . فَعَقَرُوهَا فَأَصْبَحُوا نُدِمِينَ. فَأَخَذَهُمُ الْعَذَابُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ، وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ .
"ছামূদ সম্প্রদায় রাসূলগণকে অস্বীকার করিয়াছিল। যখন উহাদের ভ্রাতা সালিহ উহাদেরকে বলিল, তোমরা কি সাবধান হইবে না? আমি তো তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসূল। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। আমি তোমার নিকট ইহার জন্য কোন প্রতিদান চাহি না, আমার পুরস্কার তো জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট আছে। তোমাদেরকে কি নিরাপদ অবস্থায় ছাড়িয়া রাখা হইবে, যাহা এইখানে আছে উহাতে। উদ্যানে, প্রস্রবণে ও শস্যক্ষেত্রে এবং সুকোমল গুচ্ছবিশিষ্ট খর্জুর বাগানে? তোমরা তো নৈপুণ্যের সহিত পাহাড় কাটিয়া গৃহ নির্মাণ করিতেছ। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর; এবং সীমালঙ্ঘকারীদের আদেশ মান্য করিও না। যাহারা পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে, শান্তি স্থাপন করে না। উহারা বলিল, তুমি তো যাদুগ্রস্তদের অন্যতম। তুমি তো আমাদের মত একজন মানুষ। কাজেই তুমি যদি সত্যবাদী হও, একটি নিদর্শন উপস্থিত কর। সালিহ বলিল, এই একটি উষ্ট্রী, ইহার জন্য আছে পানি পানের পালা এবং তোমাদের জন্য আছে নির্ধারিত দিনে পানি পানের পালা; এবং উহার কোন অনিষ্ট সাধন করিও না; করিলে মহাদিবসের শাস্তি তোমাদের উপর আপতিত হইবে। কিন্তু উহারা উহাকে বধ করিল, পরিণামে উহারা অনুতপ্ত হইল। অতঃপর শাস্তি উহাদেরকে গ্রাস করিল। ইহাতে অবশ্যই রহিয়াছে নিদর্শন, কিন্তু উহাদের অধিকাংশই মু'মিন নহে। তোমার প্রতিপালক, তিনি তো পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু” (২৬ঃ ১৪১-১৫৯)।
মহান আল্লাহ্ সূরা আন-নামূলে বলিয়াছেন :
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا إِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ فَإِذَاهُمْ فَرِيقَانِ يَخْتَصِمُونَ، قَالَ يُقَوْمٍ لِمَ تَسْتَعْجِلُونَ بالسَّيِّئَةِ قَبْلَ الحَسَنَةِ لَوْلا تَسْتَغْفِرُونَ اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ . قَالُوا اطَّيَّرْنَا بِكَ وَبِمَنْ مَعَكَ قَالَ طَائِرُكُمْ عِنْدَ اللَّهِ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ تُفْتَنُونَ. وَكَانَ فِي الْمَدِينَةِ تِسْعَةُ رَهْطٍ يُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ وَلَا يُصْلِحُونَ قَالُوا تَقَاسَمُوا بِاللَّهِ لَنُبَيِّتَنَّهُ وَأَهْلَهُ ثُمَّ لَتَقُولَنَّ لِوَلِيْهِ مَا شهِدْنَا مَهْلِكَ أَهْلِه وَإِنَّا لَصَادِقُونَ . وَمَكَرُوا مَكْرًا وَمَكَرْنَا مَكْرًا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ . فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ مَكْرِهِمْ أَنَّا دَمَّرْنَاهُمْ وَقَوْمَهُمْ أَجْمَعِينَ . فَتِلْكَ بُيُوتُهُمْ خَاوِيَةً بِمَا ظَلَمُوا إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لِّقَوْمٍ يَعْلَمُونَ، وَأَنْجَيْنَا الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ .
"আমি অবশ্যই ছামূদ সম্প্রদায়ের নিকট তাহাদের ভ্রাতা সালিহকে পাঠাইয়াছিলাম এই আদেশসহঃ 'তোমরা আল্লাহ্ ইবাদত কর', কিন্তু উহারা বিতর্কে লিপ্ত হইল। সে বলিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কেন কল্যাণের পূর্বে অকল্যাণ ত্বরান্বিত করিতে চাহিতেছ? কেন তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছ না, যাহাতে তোমরা অনুগ্রহ ভাজন হইতে পার? উহারা বলিল, তোমাকে ও তোমার সংগে যাহারা আছে তাহাদেরকে আমরা অমংগলের কারণ মনে করি। সালিহ বলিল, তোমাদের শুভাশুভ আল্লাহর এখতিয়ারে, বস্তুত তোমরা এমন এক সম্প্রদায় যাহাদেরকে পরীক্ষা করা হইতেছে। আর সেই শহরে ছিল এমন নয় ব্যক্তি, যাহারা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করিত এবং সৎকর্ম করিত না। উহারা বলিল, তোমরা আল্লাহর নামে শপথ গ্রহণ কর, আমরা রাত্রিকালে তাহাকে ও তাহার পরিবার-পরিজনকে অবশ্যই আক্রমণ করিব; অতঃপর তাহার অভিভাবককে নিশ্চয় বলিব, তাহার পরিবার-পরিজনের হত্যা আমরা প্রত্যক্ষ করি নাই। আমরা অবশ্যই সত্যবাদী। উহারা এক চক্রান্ত করিয়াছিল এবং আমিও এক কৌশল অবলম্বন করিলাম, কিন্তু উহারা বুঝিতে পারে নাই। অতএব দেখ, উহাদের চক্রান্তের পরিণাম কী হইয়াছে--আমি অবশ্যই উহাদেরকে ও উহাদের সম্প্রদায়ের সকলকে ধ্বংস করিয়াছি। এই তো উহাদের ঘর-বাড়ী--সীমালঙ্ঘন হেতু যাহা জনশূন্য অবস্থায় পড়িয়া আছে; ইহাতে জ্ঞানী লোকদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রহিয়াছে। এবং যাহারা মু'মিন ও মুত্তাকী ছিল তাহাদেরকে আমি উদ্ধার করিয়াছি" (২৭:৪৫-৫৩)।
আল্লাহ তা'আলা সূরা হা-মীম আস-সজদায় বলেন:
وَأَمَّا ثَمُودُ فَهَدَيْنَاهُمْ فَاسْتَحَبُّوا الْعَمَى عَلَى الْهُدَى فَأَخَذَتْهُمْ صَاعِقَةُ الْعَذَابِ الْهُونِ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ. وَنَجَّيْنَا الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ .
"আর ছামূদ সম্প্রদায়ের ব্যাপার তো এই যে, আমি উহাদেরকে পথনির্দেশ করিয়াছিলাম, কিন্তু উহারা সৎপথের পরিবর্তে ভ্রান্ত পথ অবলম্বন করিয়াছিল। অতঃপর উহাদেরকে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তির বজ্র আঘাত হানিল উহাদের কৃতকর্মের পরিণামস্বরূপ। আমি উদ্ধার করিলাম তাহাদেরকে যাহারা ঈমান আনিয়াছিল এবং যাহারা তাকওয়া অবলম্বন করিত" (৪১: ১৭-১৮)।
সূরা আল-কামারে আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন:
كَذَّبَتْ ثَمُودُ بِالنُّدُرِ ، فَقَالُوا أَبَشَرًا مِّنَّا وَاحِدًا نَتَّبِعُهُ إِنَّا إِذًا لَفِي ضَلَلٍ وَسُعُرٍ ، أُلْقِيَ الذِكرُ عَلَيْهِ مِنْ بَيْنِنَا بَلْ هُوَ كَذَّابٌ أَشرُ . سَيَعْلَمُونَ غَدًا مَّنِ الْكَذَّابُ الأَشرُ . إِنَّا مُرْسِلُوا النَّا قَةٍ فِتْنَةً لَّهُمْ فَارْتَقِبْهُمْ واصطبر . وَنَبِّئْهُمْ أَنَّ الْمَاءَ قِسْمَةً بَيْنَهُمْ كُلُّ شِرْبٍ مُحْتَضَرٌ. فَنَادَوا صَاحِبَهُمْ فَتَعَاطَى فَعَقَرُ . فَكَيْفَ كَانَ عَذَابِي وَنُذُرِ . إِنَّا أَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ صَيْحَةً وَاحِدَةً فَكَانُوا كَهَشِيمِ الْمُحْتَظِرِ ، وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ .
"ছামূদ সম্প্রদায় সতর্ককারীদেরকে অস্বীকার করিয়াছিল; তাহারা বলিয়াছিল, আমরা কি আমাদেরই এক ব্যক্তির অনুসরণ করিব? তবে তো আমরা পথভ্রষ্টতায় এবং উন্মত্ততায় পতিত হইব। আমাদের মধ্যে কি তাহারই প্রতি প্রত্যাদেশ হইয়াছে? না, সে তো একজন মিথ্যাবাদী দাম্ভিক। আগামী কল্য উহারা জানিবে, কে মিথ্যাবাদী, দাম্ভিক। আমি উহাদের পরীক্ষার জন্য পাঠাইয়াছি এক উষ্ট্রী, অতএব তুমি উহাদের আচরণ লক্ষ্য কর এবং ধৈর্যশীল হও। এবং উহাদেরকে জানাইয়া দাও যে, উহাদের মধ্যে পানি বণ্টন নির্ধারিত এবং পানির অংশের জন্য প্রত্যেকে উপস্থিত হইবে পালাক্রমে। অতঃপর উহারা উহাদের এক সংগীকে আহবান করিল, সে উহাকে ধরিয়া হত্যা করিল। এরূপ কঠোর ছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী। আমি উহাদেরকে আঘাত হানিয়াছিলাম এক মহানাদ দ্বারা; ফলে উহারা হইয়া গেল খোয়াড় প্রস্তুতকারীর বিখণ্ডিত শুষ্ক শাখা-প্রশাখার ন্যায়। আমি কুরআন সহজ করিয়া দিয়াছি উপদেশ গ্রহণের জন্য। অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেহ আছে কি?" (৫৪: ২৩-৩২)।
সূরা আশ-শামসে মহান আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
كَذَّبَتْ ثَمُودُ بِطَغْوَاهَا ، إِذِ انْبَعَثَ أَشْقُهَا ، فَقَالَ لَهُمْ رَسُولُ اللهِ نَاقَةَ اللهِ وَسُفْيْهَا ، فَكَذَّبُوهُ فَعَقَرُوهَا فَدَمْدَمَ عَلَيْهِمْ رَبُّهُمْ بِذَنْبِهِمْ فَسَوْهَا . وَلَا يَخَافُ عُقْبُهَا .
"ছামূদ সম্প্রদায় অবাধ্যতাবশত অস্বীকার করিয়াছিল, উহাদের মধ্যে যে সর্বাধিক হতভাগ্য, সে যখন তৎপর হইয়া উঠিল, তখন আল্লাহ্র রাসূল উহাদেরকে বলিল, আল্লাহর উষ্ট্রী ও উহাকে পানি পান করাইবার বিষয়ে সাবধান হও। কিন্তু উহারা রাসূলকে অস্বীকার করিল এবং উহাকে কাটিয়া ফেলিল। উহাদের পাপের জন্য উহাদের প্রতিপালক উহাদেরকে সমূলে ধ্বংস করিয়া একাকার করিয়াছিলেন। এবং ইহার পরিণাম সম্পর্কে তিনি ভয় করেন না" (৯১: ১১-১৫)।
তাফসীরে মাযহারীতে উল্লেখ রহিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) হইতে বর্ণিত আছেঃ আদ সম্প্রদায় ধ্বংস হইয়া গেলে ছামূদ জাতি তাহাদের আবাসভূমি আবাদ করে এবং তথায় বসবাস করিতে থাকে। ছামূদ সম্প্রদায় খুবই প্রাচুর্যের মধ্যে জীবন যাপন করিত। ফলে তাহারাই পৃথিবীতে ফিৎনা-ফাসাদ সৃষ্টি করিল। তাহারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্য বাতিল ইলাহসমূহের ইবাদত করিতে লাগিল। আল্লাহ তা'আলা তাহাদের নিকট নবী সালিহ (আ)-কে প্রেরণ করিলেন। যুবক অবস্থায় প্রেরিত হইয়া তিনি বৃদ্ধ হইয়া গেলেন। এই দীর্ঘকাল তিনি আল্লাহর পথে নিজ সম্প্রদায়কে আহবান করিতে থাকিলেন। তবুও গুটিকয়েক দুর্বল শ্রেণীর লোক ব্যতীত আর কেহই তাঁহার অনুসরণ করিল না। সালিহ (আ) যখন বারবার স্বীয় সম্প্রদায়কে আল্লাহ্র পথে আহবান করিতেছিলেন এবং বারবার ভয়-ভীতি প্রদর্শন করিতেছিলেন তখন একদা তাঁহার সম্প্রদায় তাহার নিকট কোন অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শনের আবেদন জানাইল। সেই অলৌকিক ঘটনার দ্বারা তাহার নবী হইবার বিষয়টি স্পষ্ট হইয়া উঠে। তিনি তাহা শুনিয়া তাহাদেরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, 'তোমরা কি ধরনের অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করিবার কথা ভাবিতেছ? তাহারা বলিল, আপনি আমাদের সহিত আগামী কল্য আমাদের ঈদ উৎসবে বাহির হইবেন। এখানে উল্লেখ্য যে, ছামূদ সম্প্রদায়ের একটি উৎসবের দিন ছিল। ইহাতে তাহারা বৎসরের নির্দিষ্ট একটি দিবসে তাহাদের প্রতিমাগুলিসহ বাহির হইত। তাহারা বলিল, ঐ উৎসবে আপনি আপনার ইলাহের নিকট দু'আ করিবেন। আর আমরা আমাদের ইলাহসমূহের নিকট দু'আ করিব। যদি আপনার দু'আ কবুল হয় তাহা হইলে আমরা আপনার অনুসরণ করিব। পক্ষান্তরে যদি আমাদের দু'আ কবুল হয় তাহা হইলে আপনি আমাদের অনুসরণ করিবেন। আল্লাহর নবী সালিহ (আ) তাহাদের প্রস্তাব গ্রহণ করিলেন। ছামূদ সম্প্রদায় তাহাদের প্রতিমাসমূহ লইয়া উৎসবে রওয়ানা করিল। সালিহ (আ)ও তাহাদের সহিত রওয়ানা হইলেন। লক্ষ্যস্থলে পৌঁছিয়া তাহারা নিজেদের প্রতিমাগুলির উপাসনা করিল এবং ইহাদের নিকট প্রার্থনা করিল যে, সালিহ যেই বিষয়ের প্রতি আহবান জানাইতেছেন তাহার কোন কিছুই যেন কবুল করা না হয়। অতঃপর তদানিন্তন ছামূদ সম্প্রদায়ের সরদার জুদা ইবন আমর ইব্ন জাওয়াস বলিল (তাফসীরে মাযহারী, আরবী, ৩খ., সূরা আ'রাফ, ৩৭৭), রূহুল মা'আনীতে বলা হইয়াছে ইবন হাবরাশ (৮খ., ১৬৬, প্রাগুক্ত) আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়ায় জুনদা-এর নসবনামা আরও বাড়াইয়া বলা হইয়াছে জুনদা ইব্ন আমর ইব্ন মাহাল্লাত ইব্ন লাবীদ ইব্ন জাওয়াস (প্রাগুক্ত, ১খ., ১২৬)। হে সালিহ! যদি হিজরের পার্শ্বস্থিত আল-কাছিবা নামক শক্ত পাথর হইতে স্কুলোদর অধিক পশমযুক্ত দশ মাসের গর্ভবতী একটি উষ্ট্রী অথবা বুখতী অর্থাৎ খুরাসানী উটের আকৃতিতে একটি উষ্ট্রী সৃষ্টি করিতে পারেন তাহা হইলে আমরা আপনাকে সত্যবাদী বলিয়া স্বীকার করিব, আপনার উপর ঈমান আনিব। তাহাদের এই স্বীকারোক্তির অনুকূলে সালিহ (আ) তাহাদের নিকট হইতে ঈমান আনার পরিপূর্ণ প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করিলেন। তাহারা এই শর্তে তাঁহাকে সত্যবাদী বলিয়া মানিয়া লইতে ও তাঁহার উপর ঈমান আনিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ হইল। সালিহ (আ) দুই রাকআত সালাত আদায় করিয়া আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করিলেন। ফলে ঐ পাথর ফাটিয়া তাহার ভিতর হইতে ইহাদের প্রত্যাশিত দশ মাসের গর্ভবতী ও অধিক পশমযুক্ত একটি উষ্ট্রী বাহির হইয়া আসিল। উষ্ট্রীটির উভয় বাহুর মধ্যবর্তী স্থলে বড় কি জিনিস ছিল তাহা একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেহই জানে না। অতঃপর উষ্ট্রীটি প্রকাণ্ড একটি বাছুর প্রসব করিল। ইহা প্রত্যক্ষ করিয়া জুদা ও তাহার গোত্রের কিছু সংখ্যক লোক সালিহ (আ)-এর উপর ঈমান আনিল। তাহার অনুসরণে ছামূদ সম্প্রদায়ের অন্যান্য অভিজাত শ্রেণীর লোকজন তাঁহার উপর ঈমান আনয়নের সংকল্প করিল। কিন্তু যুআব ইব্ন আমর ইব্ন লাবীদ, তাহাদের প্রতিমাবলীর তত্ত্বাবধায়ক হবাব এবং গণক রাবাব ইন্ন মা'র (معر) (তাফসীরে মাযহারীতে রাববাব ইবন মায়মাআ) তাহাদেরকে ঈমান আনিতে বারণ করিল। উষ্ট্রীটি বাচ্চা প্রসব করিবার পর সালিহ (আ) ছামূদ জাতিকে বলিলেন: هذه ناقةُ الله "ইহা আল্লাহর উস্ত্রী", ইহার পানি পানের জন্য পালাক্রমে একদিন এবং তোমাদের একদিন নির্ধারিত করিয়া দেওয়া হইল। উষ্ট্রীটি তাহার বাছুরসহ ছামূদ সম্প্রদায়ের এলাকায় অবস্থান করিল। সে গাছপালা আহার করিত এবং পানি পান করিত, পালাক্রমে পানির ঘাটে অবতরণ করিত। তাহার পালার দিন সে আল-হিজরের কূপে মাথা রাখিত। বর্তমানে কূপটির নাম 'বি'রু'ন নাকা' (بئر الناقة)। কূপটির সম্পূর্ণ পানি পান না করা পর্যন্ত সে তাহার মাথা উত্তোলন করিত না। এক বিন্দু পানি কূপে বাকী থাকিত না। পানি পান সারিয়া সে তাহার উভয় রান মেলিয়া ধরিত যাহাতে ছামূদ সম্প্রদায় তাহাদের ইচ্ছামত দুধ দোহন করিতে পারে। তাহারা তাহার স্তন হইতে দুধ দোহন করিয়া তৃপ্তিসহকারে পান করিবার পর অবশিষ্ট দুধ সংরক্ষণ করিয়া রাখিত। সংরক্ষণ ক্লরিতে গিয়া তাহাদের সকল পাত্র ভরিয়া যাইত। যেই ঘাট দিয়া কূপে উষ্ট্রীটি অবতরণ করিত ফিরিবার সময় সে ভিন্ন পথে ফিরিয়া আসিত। অবতরণস্থল তাহার জন্য সংকীর্ণ হওয়ায় ইহা দিয়া সে ফিরিয়া আসিতে পারিত না। পরবর্তী দিনে ছামূদ জাতির পানি পানের পালা আসিলে তাহারা নিজ নিজ চাহিদামত পান করিত এবং প্রয়োজন মাফিক তাহা সংরক্ষণ করিত। যাহাতে উষ্ট্রীটির পানের দিনে তাহাদের কোন পানি সংকট দেখা না দেয়। এইভাবে তাহারা অভাবমুক্ত উন্নত জীবন যাপন করিতে লাগিল। উষ্ট্রীটির বৈশিষ্ট্য ছিল, গ্রীষ্মকালে সে মাঠে বাহির হইয়া থাকিত। ইহাতে ছামূদ সম্প্রদায়ের উট, গরু ও বকরী ইত্যাদি গৃহপালিত প্রাণী উপত্যকার বহির্ভাগ ত্যাগ করিয়া উহার অভ্যন্তরে আশ্রয় গ্রহণ করিত। ইহাতে তাহাদের গৃহপালিত পশুগুলি কষ্ট অনুভব করিত। অনুরূপ শীতকালে উষ্ট্রীটি মাঠের অভ্যন্তরে চলিয়া যাইত। ইহাতে পালিত পশুগুলি মাঠের বাহিরে পালাইয়া আসিত। ইহাতে তাহারা বেজায় কষ্ট অনুভব করিত। পালিত পশুর এই যাতনা ছিল আল্লাহ্র পক্ষ হইতে ছামূদ জাতির একটি পরীক্ষা। ইহা ছামূদ জাতির বিরাট মনোবেদনার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। তাহারা আল্লাহ্ হুকুম লঙ্ঘন করিতে উদ্যত হইল। তাহারা উষ্ট্রীটিকে হত্যা করিতে ঐক্যবদ্ধ হইল। ছামূদ সম্প্রদায়ের দুই মহিলা ছিল। একজনের নাম উনায়যাঃ বিন্ত গানম, তাহার কুনয়াত ছিল উমমু গানম। সে ছিল যুআব ইব্ন আমরের স্ত্রী। তাহার ছিল কয়েকজন মেয়ে এবং প্রচুর উট, গরু ও বক্সী। অপর মহিলার নাম সাদৃক (তাফসীরে মাযহারীতে সাদৃফ) বিনতুল মুখতার। সে ছিল অতি সুন্দরী। তাহার অনেক পালিত পশু ছিল। তাহারা দুইজনই সালিহ (আ)-এর ঘোরতর শত্রু ছিল। তাহারা উষ্ট্রীটিকে হত্যা করিতে অতি উৎসাহী ছিল। কারণ ইহা তাহাদের গৃহপালিত পশুর কষ্টের কারণ ছিল। ইহারই লক্ষ্যে সাদৃক নাম্নী মহিলাটি আল-হুবার নামক এক লোককে আহবান করিল। সে তাহাকে বলিল, যদি তুমি এই উষ্ট্রীটি বধ করিতে পার তাহা হইলে তুমি আমাকে পাইবে। হুবাব ইহা অস্বীকার করিল। অতঃপর সে তাহার চাচাত ভাই মিসদা ইব্ন মাহরাজকে বলিল, যদি তুমি উষ্ট্রীটিকে বধ করিতে পার তাহা হইলে তুমি আমাকে পাইবে। সে ইহাতে সম্মত হইল। মহিলাটি অতি সুন্দরী ও ধনবতী হইবার ফলেই তাহার এই সম্মতি। উম্মু গানম উনায়যা কুদার ইব্ন সালিফকে আহবান করিল। কুদার ছিল গৌরবর্ণ বেঁটে লোক। ধারণা করা হয় যে, সে সালিফের অবৈধ সন্তান ছিল। উনায়যাঃ তাহাকে প্রস্তাব করিল, তুমি যদি ঐ উষ্ট্রীটি হত্যা করিতে পার তাহা হইলে আমার যেই মেয়ে তোমার পছন্দ তাহাকে আমি তোমার নিকট সমর্পণ করিব। সে ছিল তৎকালীন ছামূদ সম্প্রদায়ের একজন বীর পুরুষ। সে উহাতে সম্মতি জ্ঞাপন করিল। লক্ষ্য অর্জনে কুদার ও মিসদা প্রস্তুতি গ্রহণ করিয়া স্বীয় সম্প্রদায়ের অন্যান্যদের নিকট এই ব্যাপারে সহযোগিতা প্রার্থনা করিল। তাহাদের সহযোগিতায় আরও সাত ব্যক্তি যোগ দিল। ফলে এই ষড়যন্ত্রকারীদের সংখ্যা হইল মোট নয় জন। তাহারা উষ্ট্রীটির পানি পান শেষে ফিরিয়া আসিবার অপেক্ষায় ওঁত পাতিয়া রহিল। কুদার পাথরের আড়ালে লুকাইয়া রহিল, মিসদা অন্য পথে লুকাইয়া রহিল। উষ্ট্রীটি মিসদা যেই দিকে অবস্থান গ্রহণ করিয়াছিল সেই দিক দিয়া ফিরিতে লাগিল, তখন মিসদা তাহাকে লক্ষ্য করিয়া তীর ছুঁড়িল। তীরটি তাহার পায়ের গোছায় তীব্র আঘাত হানিল। এই সময় উম্মু গানম উনায়যা বাহির হইল। সে তাহার খুব সুন্দরী এক মেয়েকে তাহার চেহারার অবগুণ্ঠন অপসারণের আদেশ করিল। সে অবগুণ্ঠন খুলিল এবং প্রলুব্ধ করিল, তখন সে উষ্ট্রীটিকে তরবারি দ্বারা আঘাত হানিয়া উহার পায়ের গোড়ালির রগ কাটিয়া ফেলিল। উষ্ট্রীটি ভূমিতে লুটাইয়া পড়িয়া তাহার বাচ্চাটিকে সতর্ক করিবার জন্য একটি চিৎকার দিল। অতঃপর কুদার উষ্ট্রীটির গলায় আঘাত হানিয়া তাহাকে বধ করিয়া ফেলিল। জনপদবাসীরা মাঠে বাহির হইয়া ইহার গোশত বণ্টন করিয়া লয় এবং রান্না করিয়া ফেলে। মায়ের এই মর্মান্তিক পরিণতি দেখিয়া তাহার বাছুরটি সুউচ্চ একটি পাহাড়ে পালাইয়া আশ্রয় গ্রহণ করে। পাহাড়টির নাম ছিল সাওর (صور), মতান্তরে ফাযা (فازه)। রূহুল মাআনীতে (প্রাগুক্ত) আছে, এই সময় আল্লাহ্ নবী সালিহ (আ) তাহাদের মধ্যে আগমন করিলেন। তাহাকে উষ্ট্রীটি বধ করিবার কথা জানানো হইল। তাঁহার সহিত জনপদের অধিবাসীরা সাক্ষাত করিয়া তাঁহার নিকট এই কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করিল। তাহারা বলিল, হে আল্লাহর নবী! এই অপকর্মটি অমুক ব্যক্তি ঘটাইয়াছে। ইহাতে আমাদের কোন দোষ নাই। সালিহ (আ) তাহাদেরকে বলিলেন, দেখ! ইহার বাহুরটিকে পাও কি না? যদি বাছুরটি পাও তাহা হইলে আশা করা যায়, তাহার মাধ্যমে শাস্তি হইতে পরিত্রাণ পাওয়া যাইবে। তাহারা ইহাকে সন্ধান করিয়া পাড়ার উপর দেখিতে পাইল। বাছুরটিকে তাহারা ধরিবার প্রস্তুতি গ্রহণ করিল। আল্লাহ তা'আলা এই সময় পাহাড়কে আদেশ দিলে তাহা আকাশ পর্যন্ত এত দীর্ঘায়িত হইল যে, পাখি পর্যন্ত সেখানে পৌঁছিতে সক্ষম হয় নাই। নবী সালিহ (আ) সেখানে গেলে তাঁহাকে দেখিয়া বাছুরটি কাঁদিতে লাগিল এবং তাহার চক্ষু দিয়া অশ্রু ঝরিতে লাগিল। সেই সময়ে বাছুরটি তিনবার চিৎকার করিল। তাহার চিৎকারের পর শক্ত একটি পাথর ফাটিয়া গেলে বাছুরটি ইহার ভিতরে প্রবেশ করিল। এই সময় সালিহ (আ) বলিলেন, প্রতিটি বেদনা বিধুর চিৎকারের বিনিময়ে একদিন করিয়া অবকাশ পাইবে।
تَمَتَّعُوا فِي دَارِكُمْ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ ذَلِكَ وَعْدٌ غَيْرُ مَكْذُوبٌ.
"তোমরা তোমাদের গৃহে তিনদিন জীবন উপভোগ করিয়া লও। ইহা একটি প্রতিশ্রুতি যাহা মিথ্যা হইবার নহে” (১১ঃ ৬৫)।
ইবন ইসহাক হইতে বর্ণিত আছে যে, উষ্ট্রীটিকে হত্যাকারী নয়জনের মধ্যে চারজন বাছুরটির অনুসরণ করিয়াছিল। তাহাদের মধ্যে মিসদা তাহার ভাই যাব ইব্ন মাহরাজও ছিল। মিসদা বাছুরটির প্রতি তীর নিক্ষেপ করিলে তাহার হৃদযন্ত্রে গিয়া আঘাত হানে। অতঃপর তাহারা বাছুরটির পা ধরিয়া টানিয়া বাহির করে। ইহাকেও হত্যা করিয়া তাহারা ইহার গোশত তাহার মায়ের গোশতের সহিত মিলায়। সালিহ (আ) তাহাদেরকে বলিলেন, "তোমরা আল্লাহ তা'আলার সম্মানিত বস্তুকে (حرمة الله) অপমান করিয়াছ। তাই তোমরা তাহার শান্তি ও পরিণাম ভোগের জন্য প্রস্তুত থাক"। তাহারা তাঁহার সহিত ঠাট্টা-বিদ্রুপ করিতে লাগিল। বলিল, এই শাস্তি কখন আসিবে? ইহার লক্ষণ কি? এইখানে উল্লেখ্য যে, ছামূদ সম্প্রদায় দিবসসমূহের নাম রাখিত এইভাবে: রবিবারকে 'আল-আওয়াল', সোমবারকে 'আল-আওন', মঙ্গলবারকে 'দিবার', বুধবারকে 'হিবার', বৃহস্পতিবারকে 'মুনিস', শুক্রবারকে 'আল-আরুবা' এবং শনিবারকে 'শিয়ার'। ছামূদেরা বুধবার দিন আল্লাহ্ উষ্ট্রীটিকে বধ করিয়াছিল। তাহাদের প্রশ্নের উত্তরে সালিহ বলিলেন, আগামীকাল বৃহস্পতিবার (তাহাদের ভাষায় মুনিস দিবসে) তোমরা হলুদ বর্ণের মুখমণ্ডল লইয়া প্রভাত করিবে। পরবর্তী দিন শুক্রবার (তাহাদের ভাষায় য়াওমুল আরুবা) লাল বর্ণের মুখমণ্ডল লইয়া তোমরা প্রভাত করিবে। পরবর্তী দিন শনিবার (তাহাদের ভাষায় য়াওমে শিয়ার) তোমাদের চেহারা কাল বর্ণের হইয়া যাইবে। অতঃপর রবিবার (তাহাদের ভাষায় য়াওমে আওয়াল) প্রভাতে তোমাদের উপর শাস্তি আপতিত হইবে। সালিহ (আ) ইহা বলিবার পর সেই নয় ব্যক্তি, যাহারা উষ্ট্রীটি হত্যা করিয়াছিল, তাহারা বলিল, আস আমরা সালিহকে হত্যা করিয়া ফেলি। কারণ যদি সে সত্যবাদী হয় তাহা হইলে আগেই তাঁহাকে হত্যা করিয়া ফেলি, আর যদি মিথাবাদী হয় তাহা হইলে তাঁহাকে তাঁহার উষ্ট্রীর সহিত মিলাইয়া দেই।
এই উদ্দেশে তাহারা রাত্রিকালে সালিহ (আ)-এর নিকট আসিল, যাহাতে তাঁহার পরিজনের উপর আক্রমণ করিতে পারে। কিন্তু ফিরিশতাগণ আক্রমণের পূর্বেই পাথর ছুড়িয়া তাহাদেরকে ধ্বংস করিয়া দিলেন। তাহাদের সংগী-সাথীরা যখন তাহাদের প্রত্যাবর্তনে বিলম্ব হইতে দেখিল তখন তাহারা সালিহ (আ)-কে বলিল, তুমিই তাহাদেরকে হত্যা করিয়াছ। অতঃপর তাহারা সালিহ (আ)-কে হত্যা করিতে মনস্থ করিল। হযরত সালিহ (আ)-এর রক্ষণার্থে তাঁহার পরিবার-পরিজন অস্ত্র সজ্জিত হইয়া দাঁড়াইল। তাহারা বলিল, "সালিহ (আ)-কে কোন অবস্থাতেই হত্যা করিতে পারিবে না। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছেন যে, তোমাদের উপর তিন দিন পর শান্তি নামিবে। তিনি তাঁহার ভবিষ্যদ্বাণীতে সত্যবাদী হইলে ইহার ফলে তোমাদের উপর তোমাদের প্রভুর ক্রোধই বৃদ্ধি পাইবে, আর মিথ্যাবাদী হইলে তোমরা যাহা ইচ্ছা তাহা করিতে পারিবে"। ঐ রাত্রিতে তাহারা সরিয়া পড়িল।
বৃহস্পতিবার সকালে তাহাদের চেহারা হলুদ বর্ণ ধারণ করিল, ছোট-বড়-নারী পুরুষ সকলের চেহারায় এই বিকৃতি ঘটিল। ইহাতে তাহারা শান্তি সম্পর্কে নিশ্চিত হইয়া গেল। সালিহ (আ) সত্য বলিয়াছেন ইহা তাহারা বুঝিতে পারিল। ফলে তাহারা সালিহ (আ)-কে হত্যা করিবার জন্য তালাশ করিতে লাগিল। এমতাবস্থায় সালিহ (আ) ছামূদের বানু গানম নামক এক গোত্রে আশ্রয় গ্রহণ করিলেন, বানু গানমের নেতা নুফায়লের নিকট অবস্থান করিতে লাগিলেন। নুফায়ল ছিল মুশরিক, তাহার কুনয়া ছিল আবূ হুদার। সে সালিহ (আ)-কে লুকাইয়া রাখিল। ছামূদ সম্প্রদায় সালিহ (আ)-কে হত্যা করিতে না পারিয়া তাঁহার অনুসারীদের উপর চড়াও হইল। তাহারা নবী সম্পর্কে তথ্য আদায় করিবার উদ্দেশে তাহাদেরকে নির্যাতন করিতে লাগিল। তাঁহার অনুসারীদের মধ্যে এক ব্যক্তির নাম ছিল মীদা ইব্ন হারাম (میدع بن هرم)। তিনি সালিহ (আ)-কে বলিলেন, হে আল্লাহর নবী! ইহারা আপনার অবস্থানস্থল সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার জন্য আমাদেরকে নির্যাতন করিতেছে। আমরা কি তাহাদেরকে আপনার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করিব? তিনি বলিলেন, হাঁ, বলিয়া দিতে পার। তুমি বল, সালিহ আমার নিকটেই আছেন। তবে তাঁহাকে আঘাত করিবার তোমাদের কোন সাধ্য নাই। তাহারা তাহাদের উপর আপতিত শাস্তি লইয়াই ব্যাকুল হইয়া পড়িল। তাহারা তাহাকে হত্যা করিবার পরিকল্পনা ত্যাগ করিতে বাধ্য হইল। চেহারার বিকৃতি সম্পর্কে একজন অপরজনকে বলাবলি করিতে লাগিল।
সন্ধ্যায় ধ্বংসের মুখামুখি ছামূদ সম্প্রদায় সমস্বরে চিৎকার দিয়া বলিয়া উঠিল, সাবধান! অবকাশের একটি দিবস অতিক্রান্ত হইল। দ্বিতীয় দিন ভোরে ইহারা স্বীয় মুখমণ্ডল রক্তিম বর্ণ ধারণ করিতে দেখিল। তাহাদের চেহারা যেন রক্তে রঞ্জিত হইয়া গিয়াছে, চিৎকার করিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে বলিতে লাগিল, এই তো আল্লাহর আযাব আসা শুরু হইয়া গেল। সন্ধ্যা হইয়া গেলে অনুরূপ সকলে মিলিয়া চিৎকার করিয়া বলিল, সাবধান! অবকাশের দুই দিন অতিক্রান্ত হইল। তৃতীয় ভোরে ঘুম হইতে জাগিয়া তাহারা তাহাদের চেহারা কৃষ্ণবর্ণের দেখিতে পাইল। চেহারা যেন আলকাতরা মাখানো ছিল। তখন সবাই মিলিয়া সমস্বরে চিৎকার করিতে করিতে বলিতে লাগলি, এখন তো আযাব অবধারিত হইয়া গিয়াছে। রবিবার দিবাগত রাতে সালিহ (আ) তাঁহার সঙ্গীদেরকে লইয়া সিরিয়া অভিমুখে রওয়ানা করিয়া ফিলিস্তীনের রামলা নামক স্থানে গিয়া অবস্থান করেন। চতুর্থ দিনে ভোর হইলে অভিশপ্ত এই ছামূদ সম্প্রদায় কাফন ও সুগন্ধি মৃতদেহে মাখাইবার জন্য তৈরী এক প্রকার মিশ্র সুগন্ধি (হাল্লত) লইয়া শান্তির প্রহর গুনিতেছিল। ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া ভূমির উপর শুইয়া গিয়া তাহারা হত বিহ্বল দৃষ্টিতে একবার আকাশ পানে আর একবার ভূমির দিকে তাকাইয়া কোন দিক দিয়া আযাব আসিতেছে তাহা দেখিতে লাগিল। রৌদ্র প্রখর হইলে মহানাদ তাহাদেরকে আঘাত করিল, ফলে উহারা নিজ নিজ গৃহে নতজানু অবস্থায় মারা গেল। তাহাদের উপর এই সময় আকাশ হইতে বিকট গর্জন আসিয়াছিল। ভূমণ্ডলে যত প্রকার ভয়ংকর ধ্বনি বিদ্যমান সবই তাহাদের উপর আপতিত হইয়াছিল। এই বিভীষিকাময় ধ্বনিতে তাহাদের অন্তর বিদীর্ণ হইয়া গিয়াছিল। এই পরিণতি হইতে উহাদের ছোট-বড় কেহই রক্ষা পাইল না। শুধু চলাফেরায় অক্ষম এক কিশোরী এই মহাধ্বংস হইতে রক্ষা পাইয়াছিল।
কিশোরীর নাম ছিল যারীয়া, রূহুল মাআনীতে যারীআ বিন্ত সালাফ (زارية بنت سلف) (তাফসীরে মাযহারী)। কোন কোন গ্রন্থে যারীকা বিনত সালাফও রহিয়াছে। আল্লাহই সম্যক জ্ঞাত। কিশোরীট ছিল কাফির। সে সালিহ (আ)-এর সহিত কঠোর শত্রুতা পোষণ করিত। স্বীয় সম্প্রদায়ের ভয়ানক পরিণতি প্রত্যক্ষ করিবার পর মহান আল্লাহ তাহার দুইটি পা সচল করিয়া দিলেন। সুতরাং সে তীব্র গতিতে এই স্থান ত্যাগ করিয়া ওয়াদিল কুরার 'ফারখ' নামক স্থানে চলিয়া গেল। ওয়াদিল কুরার অধিবাসিগণকে তাহার স্বচক্ষে দেখা ভয়াবহ পরিণতির বিবরণ প্রদান করিল। অতঃপর সে পানি চাহিল। তাহাকে পানি পান করানো হইলে সে মৃত্যুর কোলে ঢলিয়া পড়িল (আত-তাফসীরুল মাযহারী, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৩৮৭ হি., ৩খ, ৩৭৬-৩৮০; রূহুল মাআনী, বৈরূত তা. বি., ৮খ, ১৬৬-১৬৭; তাফসীরুল বাগাবী, মুলতান তা. বি, ২খ, ১৭৫)। ছানাউল্লাহ পানিপতী আরও বলেন, উষ্ট্রীটি বধ করিবার ব্যাপারে আস-সুদ্দী উল্লেখ করেন, আল্লাহ তা'আলা সালিহ (আ)-কে এই মর্মে প্রত্যাদেশ পাঠাইলেন যে, তোমার সম্প্রদায় অচিরেই তোমার উষ্ট্রী হত্যা করিবে। তিনি এই প্রত্যাদেশের কথা তাঁহার সম্প্রদায়কে অবহিত করিলেন। তাহারা বলিল, আমরা উহা করিব না। তখন সালিহ (আ) বলিলেন: অমুক ব্যক্তির অমুক মাসে একটি সন্তান জন্মগ্রহণ করিবে, পরবর্তী কালে সে-ই উষ্ট্রীটিকে হত্যা করিবে। ফলে তোমাদের ধ্বংস তাহারই কৃতকর্মের ফলে হইবে। তাহারা বলিল, অমুক মাসে আমাদের যেই সন্তান জন্মগ্রহণ করিবে আমরা উহাকে হত্যা করিয়া ফেলিব। উক্ত মাসে দশটি সন্তান প্রসব করিয়াছিল। উহারা তাহা হইতে নয়জনকে হত্যা করিয়াছিল। একটি সন্তান বাঁচিয়া গিয়াছিল। তাহার চেহারা ছিল নীল ও লাল বর্ণের। সে খুবই দ্রুত বৃদ্ধি পাইতে থাকিল। এই ছেলেটি যখন হত্যাকৃত নয়টি ছেলের জনকদের নিকট দিয়া চলাফেরা করিত তখন তাহাকে দেখিয়া তাহারা বলিত, যদি আমাদের পুত্রগুলি বাঁচিয়া থাকিত তাহা হইলে উহারা তাহার ন্যায় হইত। এই মনোবেদনায় ঐ নয়জন সন্তানহারা পিতা সালিহ (আ)-এর উপর প্রচণ্ডভাবে ক্ষিপ্ত হইল। সুতরাং তাহারা সালিহ (আ)-কে হত্যা করিবার জন্য আল্লাহ্ নামে শপথ গ্রহণ করিল। তাহারা শলাপরামর্শ করিল, আমরা ভ্রমণে বাহির হইবার ভান করিয়া অবস্থানস্থল ত্যাগ করিব। অতঃপর আমরা একটি গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করিব, যাহাতে লোকজন মনে করে আমরা ভ্রমণে গিয়াছি। রাত্রি হইলে যখন সালিহ (আ) মসজিদের উদ্দেশে বাহির হইবেন তখন আমরা তাহাকে আক্রমণ করিয়া হত্যা করিয়া ফেলিব। হত্যার কাজ সম্পন্ন করিয়া আবার আমরা গুহায় ফিরিয়া যাইব। অতঃপর আমরা গৃহে ফিরিয়া বলিব, তাহার পরিবার-পরিজনের হত্যা আমরা প্রত্যক্ষ করি নাই। আমরা অবশ্যই সত্যবাদী। ইহাতে তাহারা আমাদেরকে সত্যবাদী বলিয়া মানিয়া লইবে। মনে করিবে ইহারা তো সফরে ছিল। সালিহ (আ)-এর আবাস ছিল মসজিদে। তিনি পরিবার-পরিজনের সহিত গ্রামে থাকিতেন না। তাহার মসজিদটিকে মসজিদ সালিহ বলা হইত। ভোরবেলা স্বীয় উম্মতগণের নিকট আসিয়া তিনি তাহাদেরকে ওয়াজ-নসীহত করিতেন। সন্ধ্যা হইলে আবার মসজিদে ফিরিয়া যাইতেন। এখানে রাত্রিযাপন করিতেন। উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে ঐ নয় ব্যক্তি গুহায় প্রবেশ করিল। গুহাটি তখন ধ্বসিয়া পড়িলে তাহারা নিহত হয়। এই সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَكَرُوا مَكْرًا وَمَكَرْنَا مَكْرًا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ .
"উহারা এক চক্রান্ত করিয়াছিল এবং আমিও এক কৌশল অবলম্ব করিলাম, কিন্তু উহারা বুঝিতে পারে নাই" (২৭ঃ ৫০)।
উহাদের এই চক্রান্ত সম্পর্কে ছামূদ সম্প্রদায়ের যাহারা অবগত ছিল তাহাদেরকে প্রত্যাবর্তন করিতে না দেখিয়া তাহারা ঐ গুহার মুখে আসিয়া দেখিল উহারা ধ্বংস হইয়া গিয়োছে। তাহারা হট্টগোল করিয়া জনপদে ফিরিয়া বলিল, হে আল্লাহর বান্দাগণ! সালিহ এই নয়টি সন্তানকে হত্যা করিবার নির্দেশ দিয়াও ক্ষান্ত হইল না। সে উহাদের এই নয়জন পিতাকেও হত্যা করিয়া ফেলিল। ইহার ফলস্বরূপ জনপদবাসীরা উষ্ট্রীটিকে হত্যা করিবার ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করিল। ইবন ইসহাক বলিয়াছেন, উষ্ট্রীটিকে হত্যা করিবার পর উক্ত নয় ব্যক্তি সালিহ (আ)-কে হত্যা করিবার শপথ করিয়াছিল। আস-সুদদী ও অন্যান্যরা বলিয়াছেন, অন্যান্য ছেলেরা এক সপ্তাহে যতটুকু বৃদ্ধি পাইত, বাঁচিয়া যাওয়া যুহার নামক ঐ দশম ছেলেটি এক দিনে সেই পরিমাণ বৃদ্ধি পাইত। অন্যরা এক বৎসরে যতটুকু বৃদ্ধি পাইত সে এক মাসে সেই পরিমাণ বৃদ্ধি পাইত। সে পরিণত বয়সের অধিকারী হইলে অন্যান্য লোকদের সহিত আসন গ্রহণ করিল। উহারা মদ্যপানে অভ্যস্ত ছিল। মদ্যপানের নেশায় একদা তাহারা মত্ত হইয়া উঠিল। মদ বানানোর জন্য তাহাদের পানির প্রয়োজন ছিল। ঘটনাক্রমে এই দিনটি ছিল উষ্ট্রীর পানি পানের পালার দিন। পানি খুঁজিতে গিয়া দেখিল, উষ্ট্রীটি সব পানি পান করিয়া ফেলিয়াছে। ইহা তাহাদের অসীম ক্রোধের কারণ হইয়া দাঁড়াইল। তাহারা বলাবলি করিতে লাগিল, আমরা দুধ দিয়া কি করিব? ইহার চেয়ে যদি আমরা উষ্ট্রীটি যেই পানি পান করিতেছে তাহা লাভ করি তাহা হইলে আমাদের পালিত জন্তুগুলি তৃপ্তিতে পানি পান করিত, আমাদের কৃষি খামার ইহার দ্বারা সিঞ্চিত হইত। ইহাই আমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণকর ছিল। ইহা শুনিয়া কুদার উষ্ট্রীটিকে বধ করিবার প্রস্তাব দিলে তাহারা তাহাতে সম্মত হইল। অতঃপর সে উহাকে বধ করিয়া ফেলিল (তাফসীরুল মাযহারী, প্রাগুক্ত; তাফসীরুল বাগাবী, প্রাগুক্ত; আল-মাসঊদী, মুরূজ, ২খ, ৪৪)। 'আমার রিসালাতকে সত্যায়ন করিবে' তাহারা স্বীকারোক্তি করিলে তিনি তাহাদের নিকট হইতে কঠিন অঙ্গীকার আদায় করিলেন। তাহাদের অবিকল প্রত্যাশামত আল্লাহ্র আদেশে উষ্ট্রী নির্দিষ্ট পাথর হইতে বাহির হইয়া আসিলে আল্লাহ্র অসীম ক্ষমতা ও অত্যুজ্জ্বল অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করিয়া বহু সংখ্যক লোক সালিহ (আ)-এর উপর ঈমান আনিল। কিন্তু অধিকাংশ লোক তাহাদের পথভ্রষ্টতা হইতে ফিরিল না। প্রতিহিংসাপরায়ণতা পরিহার করিল না। ঈমানদারগণের সরদার ছিল জুনদা ইব্ন আমির ইব্ন মাহাল্লা ইবন লাবীদ ইব্ন জাওয়াস। অন্যান্য সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গও ইসলাম গ্রহণ করিবার সংকল্প করিয়াছিল। কিন্তু তাহাদেরকে যুআব ইব্ন আমর ইব্ন লাবীদ এবং খাব্বাব দুই প্রতিমা মালিক ও রাব্বার ইব্ন সামআর ইব্ন জালমাস ইসলাম গ্রহণ করিতে বারণ করিল। জুনদা তাহার চাচাত ভাই শিহাব ইব্ন্ন খালীফাকে ইসলামের দিকে আহবান করিলেন। সেও ছিল তাহাদের বংশের অভিজাত শ্রেণীর লোক। ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা করিলেও উপরিউক্ত তিন অভিশপ্ত তাহাকে বাধা প্রদান করে। ফলে সে উহাদের প্রতিই ঝুঁকিয়া পড়িয়া ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা ত্যাগ করে। এই সম্পর্কে ইব্ন কাছীর মিহরাশ ইব্ন গানামা ইবনুয যামীল (র) রচিত কবিতার কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করিয়াছেন।
وَكَانَتْ عَصَبَةٌ مِنْ ال عَمْرُو + الى دِينِ النَّبِيِّ دَعَوا شَهَابًا عَزِيزٌ ثَمُودَ كُلُّهُمْ جَمِيعًا + فَهُمْ بِأَنْ يُجِيبُ وَلَوْ أَجَابًا لَأَصْبَحَ صَالِحٌ فِيْنَا عَزِيزًا + وَمَا عَدَلُوا بِصَاحِبِهِمْ ذَوَّابًا وَلَكِنَّ الْغُوَاةَ مِنْ الحِجْرٍ + تَوَلَّوا بَعْدَ رُشْدِهِمْ ذَابًا
"আমরের (জুনদা-এর পিতা) সহিত পারিবারিক সম্পর্ক ছিল শিহাবের। আমরের পরিজন তাহাকে আল্লাহ্ নবীর দীনের প্রতি আহবান জানাইয়াছিল। সে ছিল সমগ্র ছামূদ জাতির মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশীয়। সংকল্প করিয়াছিল সালিহ (আ)-এর দাওয়াত গ্রহণ করিবার, কিন্তু গ্রহণ করিতে পারে নাই। সালিহ আমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত হইয়া যান। ছামূদ সম্প্রদায়ের কেহই উচ্চ মর্যাদায় তাহার তুল্য নহে। হিজরের অধিবাসিগণের পথভ্রষ্টরা হিদায়াত লাভের পর আবার ভয়ে ফিরিয়া গেল অথবা মাছির ন্যায় ফিরিয়া গেল” (ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, মিসর ১৪০৮ হি., ১খ, ১২৬; তাফসীরে হাককানী, দিল্লী তা. বি; ২খ, ৪০০)।
হুবাব ইব্ন আমর স্বীয় আবাসভূমি ত্যাগ করিয়া মু'মিনদের কাতারভুক্ত হইয়াছিলেন। ধ্বংসপ্রাপ্ত ছামূদ সম্প্রদায় সম্পর্কে তিনি বলেন:
كَانَتْ ثَمُودُ ذُو عِزَّةٍ وَمَكَرَمَةٍ + مَا إِنْ يُضَامُ لَهُمْ فِي النَّاسِ مِنْ جَارِ . لا يَرْهَبُونَ مِنَ الْأَعْدَاءِ حَوْلَهُمْ + وَقْعَ السُّيُوفِ وَلَا نَزْعًا بَأْوَتَارِ. فَأَهْلُكُوا فَاقَةً كَانَتْ لِرَبِّهِمْ + قَدْ انْذِرُوهَا وَكَانُوا غَيْرَ أَبْرَارِ . نادوا قداراً وَلَحْمَ السَّقَبِ بَيْنَهُمْ + هَلْ لِلْعَجُولِ وَهَلْ لِلسَّقَبِ مِنْ ثَارِ . لَمْ يَرْعَيًا صَالِحًا فِي عَفْرْنَا قَتَه + وَاخْفَرُوا الْعَهْدِ هَدْيًا أَيِّ اخْفَارٍ . فَصَادَفُوا عِنْدَهُ مِنْ رَّبِّهِ حَرَسًا + فَشُدِّخُوا رُؤُسَهُمْ شَدْخًا بِأَحْجَارٍ .
"ছামূদ সম্প্রদায় বড়ই সম্মানিত ও অভিজাত শ্রেণীর লোক ছিল। প্রতিবেশীর পক্ষ হইতে তাহাদের উপর অত্যাচার করা হইত না।
"উহারা তাহাদের আশেপাশের শত্রুদের পক্ষ হইতে তাহাদের উপর তরবারি চালানোর ভয় করিত না এবং ভষ্মীভূত বৃক্ষের ন্যায় মূলোৎপাটনেরও আশংকা করিত না।
"উহারা আল্লাহ্র একটি উষ্ট্রীকে হত্যা করিয়া ফেলিল। অথচ তাহাদেরকে এই ব্যাপারে সতর্ক করা হইয়াছিল। উহারা পুন্যবান লোক ছিল না।
"তাহারা কুদারকে আহবান করিল, এই দিকে উষ্ট্রীটির বাছুরের গোশত তাহাদের সামনে পাড়িয়া রহিয়াছিল। বাছুর হারা মা ও বাছুরের কি কোন দোষ ছিল?
"কুদার ও তাহার সঙ্গীটি উষ্ট্রীটি হত্যা করিতে সালিহ-এর পরোয়া করিল না। এই সম্প্রদায় পরিপূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিয়াছিল।
"সালিহ-এর নিকট তাহারা আল্লাহর পক্ষ হইতে প্রহরীর সম্মুখীন হইয়াছিল। অতএব চরমভাবে উহাদের মাথা পাথরের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হইয়া গিয়াছিল" (আল-মাসউদী, মুরূজুয- যাহাব, প্রাগুক্ত, ২খ, ৪৫)।
আস-সুদ্দীর বরাতে ইমাম তাবারী উষ্ট্রী সম্পর্কিত নিম্নোক্ত ঘটনা উল্লেখ করিয়াছেন। উষ্ট্রীটি যেই দিন পানি পান করিত সেই দিন সে দুইটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থান দিয়া যাত্রা করিত। এই দুইটি পাহাড়ে তাহার পদচিহ্ন রহিয়াছে। ইহা কিয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকিবে। কুদার ও মিসদা ব্যতীত উষ্ট্রীটির আরও তিনজন হত্যাকারীর নাম ইন্ন ইসহাক সূত্রে আত-তাবারী উল্লেখ করিয়াছেন। তাহারা হইল, হাবীল ইব্ মীলাগ (هويل بن مبلغ), সে ছিল কুদারের মামা, হিজরবাসীর বীরপুরুষ। দাঈর ইব্ন গানম ইন্ন দাইর (دعير بن غنم بن داعر)। সে ছিল হালওয়া ইবনুল মাহাল গোত্রের লোক। তৃতীয় ব্যক্তি হইল মিসদাহ ইব্ন মিহরাজের ভাই দাব ইবন মিহরাজ। তাবারী আবু ইসহাক হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলেন, আবূ মূসা (রা) বলিয়াছেন:
آتَيْتُ أَرْضَ ثَمُودَ فَذَرَعْتُ مَصْدَراً النَّاقَةِ فَوَجَرُ تُهُ سِتِّينَ ذِرَاعًا .
"আমি ছামুদ সম্প্রদায়ের ভূখণ্ডে আসিয়া উষ্ট্রীটির যাতায়াত পথ মাপিয়া দেখিলাম, ইহা ষাট হাত লম্বা" (তাবারী, তাফসীর, ১৩৯৮ হি. / ১৯৭৮ খৃ., ৮খ, ১৫৮-১৬২)।
তাবারী বলেন, কাতাদা বলিয়াছেন, উষ্ট্রীটি হত্যকারী লোকটি বলিয়াছিল:
لا اقْتُلُهَا حَتَّى تَرْضُوا أَجْمَعِينَ فَجَعَلُوا يَدْخُلُونَ عَلَى الْمَرْأَةِ فِي حِدْرِهَا فَيَقُلُونَ أَتَرْضِينَ فَتَقُولُ نَعَمْ والصَّبِيَّ حَتَّى رَضُوا أَجْمَعِينَ فَعَقَرُوهَا .
"উষ্ট্রীটি হত্যা করিবার ব্যাপারে তোমরা সকলেই সম্মতি প্রকাশ না করিলে আমি ইহাকে হত্যা করিব না। সুতরাং তাহারা মহিলাদের শিবিরগুলিতে প্রবেশ করিয়া এই সম্পর্কে মতামত গ্রহণ করিল। মহিলা ও শিশু সকলেই এই ব্যাপারে সম্মতি জ্ঞাপন করিল। ফলে উহারা উষ্ট্রীটিকে হত্যা করিয়াছিল” (তাবারী, তাফসীর, বৈরূত ১৩৯৮ হি. ৮খ, ১৬২)।
📄 ঘাতক নয় ব্যক্তির নাম
আল্লামা যামাখশারী বলেন, ওয়াহ্হ্ব ইন্ন মুনাব্বিহ (র) হইতে বর্ণিত এই নয়জন ঘাতকের নাম হইল: আল-হুযায়ল ইব্ন আবদ রাব্ব, গানাম ইব্ন গানম, রিয়াব ইন্ন মিহরাজ, মিসদা ইব্ন মিহরাজ, উমায়র ইব্ন কারদাবা, আসিম ইন্ন মাখরামা, সাববীত ইন্ন সাদাকা, সামআন ইন্ন সাফী (আবুস সাউদ শাম'আন), কুদার ইন্ন সালিফ। এই নয়জন ঘাতক উষ্ট্রীটিকে হত্যা করিবার পরিকল্পনা করিয়াছিল। ইহারা ছিল সালিহ (আ)-এর সম্প্রদায়ের অভিজাত শ্রেণীর লোক কিন্তু তাঁহার চরম শত্রু (আয-যামাখশারী, আল-কাশশাফ, বৈরূত তা. বি., ৩খ, ১৫২)। ইবন ইসহাক-এর বরাতে আল্লামা কুরতুবী বলেন, ঘাতকদের নেতা ছিল কুদার ইন্ন সালিফ ও মিসদা ইব্ন্ন মিহরাজ। আর সাতজন তাহাদের অনুসরণ করিয়াছিল, ইহাদের নাম সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে (বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্র. আল-কুরতুবী, তাফসীর, ৭খ, পৃ.-২১৫-১৬; আত-তাবারসী, মাজমাউল বায়ান ফী তাফসীরিল কুরআন, বৈরূত ১৪০৬ হি. / ১৯৮৬ খৃ., ৭খ, ৩৫৪)।
ইমাম বুখারী তাহার সূত্রে আবদুল্লাহ ইব্ন যাম'আ (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন:
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ زَمْعَةَ أَنَّهُ سَمِعَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَخْطُبُ وَذَكَرَ النَّاقَةَ وَالَّذِي عَقَرَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذِ انْبَعَثَ أَشْقُهَا . انْبَعَثَ لَهَا رَجُلٌ عَزِيزٌ عَارِمٌ مَنِيعٌ فِي رَهْطِهِ مِثْلَ أَبِي زَمْعَةً.
"আবদুল্লাহ ইব্ন যামআ (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে ভাষণ দিতে শুনিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার ভাষণে উষ্ট্রীটি ও তাহার হত্যাকারীদের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "উহাদের মধ্যে যে সর্বাধিক হতভাগ্য, সে যখন তৎপর হইয়া উঠিল" (৯১:১২)-এর ব্যাখ্যা হইল, তৎপর হইয়া উঠিল উষ্ট্রীটিকে বধ করিবার জন্য। বলবান, চরম দুষ্ট, স্বীয় গোত্রের অপ্রতিরোধ্য একটি লোক, সে ছিল আবূ যামআর ন্যায়” (বুখারী, কিতাবু'ত-তাফসীর, সূরা শামস, ২খ, ৭৩৭)।
📄 আবূ রিগালের ঘটনা
আল্লামা তাবারী জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন:
(جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ) قَالَ لَمَّا مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْحَجَرِ قَالَ لَا تَسْتَالُوا الْآيَاتِ فَقَدْ سَأَلَهَا قَوْمُ صَالِحٍ فَكَانَتْ تَرِدُ مِنْ هَذَا الْفَجِّ وَتَصْدُرُ مِنْ هذا الفَجِّ فَعَتَوا عَنْ أَمْرِ رَبِّهِمْ فَعَقَرُوهَا وَكَانَتْ تَشْرَبُ مَا ءَهُمْ يَوْمًا وَيَشْرَبُونَ لَبَنَهَا يَوْمًا فَعَقَرُوهَا فَأَخَذَتْهُمُ الصَّيْحَيةُ مِنْ تَحْتِ أَديمُ السَّمَاءِ مِنْهُمْ إِنَّا رَجُلًا وَاحِداً كَانَ فِي حَرَامِ اللهِ قِيلَ مَنْ هُوَ قَالَ أَبُو رِغَالٍ فَلَمَّا خَرَجَ مِنَ الْحَرَامِ أَصَابَهُ مَا أَصَابَ قَوْمَهُ .
"জাবির (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) হিজর নামক স্থান দিয়া অতিক্রম করা কালে বলিলেন: তোমরা অলৌকিক নিদর্শনাবলী (মুজিযা) চাহিও না। সালিহ সম্প্রদায় এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল। তাহাদের মুজিযাটি এই প্রশস্ত রাস্তা দিয়া গমন করিত এবং ঐ রাস্তা দিয়া (উন্ত্রী) ফিরিয়া আসিত। তাহারা আল্লাহ্র নির্দেশ লঙ্ঘন করিয়া উষ্ট্রীটিকে হত্যা করিল। উষ্ট্রীটি একদিন তাহাদের পানি পান করিত এবং উহারা একদিন উষ্ট্রীর দুধ পান করিত। ইহার কারণে উহারা ইহাকে বধ করিল। ইহার ফলে মহানাদ তাহাদেরকে আঘাত করিল। ইহার সূত্রপাত হইয়াছিল আকাশের নিম্নভাগ হইতে। তবে একটি লোক এই ভয়াবহ পরিণতি হইতে রক্ষা পাইয়াছিল। সে হারাম শরীফে (আশ্রয়াধীন) ছিল। সাহাবী জিজ্ঞাসা করিলেন, এই লোকটি কে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : আবূ রিগাল! সে যখন "হারাম" হইতে বাহির হইল তখন তাহার সম্প্রদায়ের ন্যায় সেও তাহা ভোগ করিল"।
আবদুর রায্যাক মুআম্মার সূত্রে এবং তিনি ইসমাঈল ইবন উমায়্যা সূত্রে বলেন:
إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرٌّ بِقَبْرِ أَبِي رِغَالٍ فَقَالَ أَتَدْرُونَ مَا هَذَا قَالُوا اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ قَالَ هَذَا قَبْرِ أَبِي رِغَالٍ قَالُوا فَمَنْ أَبُو رِغَالٍ قَالَ رَجُلٌ مِنْ ثَمُودَ كَانَ فِي حَرَمِ اللَّهِ فَمَنَعَهُ حَرَمُ اللَّهِ عَذَابَ اللَّهِ فَلَمَّا خَرَجَ أَصَابَهُ مَا أَصَابَ قَوْمَهُ فَدُفِنَ هَهُنَا وَدُفِنَ مَعَهُ غُصْنٌ مِنْ ذَهَبٍ فَنَزَلَ الْقَوْمُ فَابْتَدَرُوهُ بِأَسْيَافِهِمْ فَبَحَثُوا علَيْهِ فَاسْتَخْرَجُوا الغُصْنَ.
রাসূলুল্লাহ (স) আবূ রিগালের কবরের পাশ দিয়া অতিক্রম করিবার সময় সাহাবীদেরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কি জান ইহা কি? তাঁহারা বলিলেন, আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল এই ব্যাপারে সম্যক জ্ঞাত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইহা আবূ রিগালের কবর। তাহারা জিজ্ঞাসা করিলেন, আবু রিগাল কে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ছামূদ সম্প্রদায়ের এক লোক। সে আল্লাহ্ হারাম শরীফে অবস্থান করিয়াছিল। ফলে ইহা তাহাকে আল্লাহ্ শাস্তি হইতে রক্ষা করে। সে যখন উহা হইতে বাহির হইল তখন তাহার সম্প্রদায়ের যেই পরিণতি হইয়াছিল সেও উহা ভোগ করিল এবং তাহাকে ঐ স্থানে দাফন করা হইয়াছিল। দাফনের সময় তাহার সহিত স্বর্ণের একটি লম্বা টুকরাও দাফন করা হইয়াছিল। ইহা শুনিয়া সাহাবীগণ খুব দ্রুত তরবারি লইয়া কবরটি খুঁড়িয়া স্বর্ণের লম্বা টুকরাটি তাহারা বাহির করিলেন।
আবদুর রায্যাক ইমাম যুহরী সূত্রে বলেন, আবু রিগাল হইল ছাকীফের পিতা (তাবারী, জামিউল বায়ান ফী তাফসীরিল কুরআন, ৮খ, ১৬২)। আবূ রিগাল সম্পর্কিত প্রথমোক্ত হাদীছটি সম্পর্কে আল্লামা ইব্ন কাছীর বলেন, এই হাদীছটি সহীহ মুসলিমের শর্তানুযায়ী বর্ণিত। কিন্তু সিহাহ সিত্তায় ইহা বর্ণিত হয় নাই। দ্বিতীয় হাদীছ সম্পর্কে তিনি বলেন, ইহা একটি মুরসাল হাদীছ।
আবদুল্লাহ্ ইব্ন আমর (রা) হইতে বর্ণিত এক হাদীছে বলা হইয়াছে, সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাহিত তাইফের দিকে বাহির হইয়াছিলেন। অপরাপর বর্ণনাগুলিতে রহিয়াছে হিজর অভিমুখে রওয়ানার কথা। এই হাদীছটি বর্ণনা করিয়া ইবন কাছীর বলেন, আবূ দাউদের বর্ণনাও অনুরূপ। তিনি আরও বলেন, হাফিজ আবুল হাজ্জাজ আল-মিযী (র) এই হাদীছটিকে 'হাসান আযীয' বলিয়াছেন। বুহায়র ইব্ন আবূ বুহায়র একা এই হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। এই হাদীছটি ব্যতীত তাহার অন্য কোন পরিচয় নাই। ইসমাঈল ইব্ন উমায়্যা ব্যতীত তাহার নিকট হইতে অন্য কেহ হাদীছ বর্ণনা করেন নাই। আল-মিযযী বলিয়াছেন, হাদীছটিকে মারফু হিসাবে বর্ণনা করা সম্ভবত ধারণাপ্রসূত। ইহা আবদুল্লাহ্ ইব্ন আমরের উক্তি হইতে পারে (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, দারুদ-দায়্যান মিসর ১৪০৮ হি., ১৯৮৮ খৃ., ১খ., ১২৯-১৩০)। আল-মাসউদী বলেন, আবূ রিগাল তাইফ ও মক্কার মধ্যবর্তী স্থান আল-মুগাম্মাস নামক স্থানের রাস্তায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছিল। তাহার কবরকে পরবর্তী কালে প্রস্তারাঘাত করা হইত। আরবরা ইহা দ্বারা উপমা দান করিত। জারীর ইবনুল খিতফী আল-ফারাযদাক সম্পর্কে উপমাস্বরূপ বলেন:
إِذَا مَاتَ الْفَرَزْدَقُ فَارْجُمُوهُ + كَمَا تَرْمُونَ قَبْرَ أَبِي رِعَالٍ .
"আল-ফারাযদাক যখন মারা যাইবে তখন তাহাকে প্রস্তরাঘাত কর, যেইভাবে তোমরা আবূ রিগালকে প্রস্তরাঘাত কর"। আল-মাসউদী আরও বলেন: কেহ কেহ বলেন, আবূ রিগালকে সালিহ (আ) সম্পদের সাদাকা আদায়ের জন্য নিয়োগ করিয়াছিলেন। সে তাঁহার নির্দেশ অমান্য করিল এবং তাহার চরিত্র ছিল অসৎ। ফলে তাহার উপর ছাকীফ চড়াও ইহল। ছাকীফের নাম ছিল কাস্সী ইবন মুনাব্বিহ। হারাম শরীফের অধিবাসীদের সহিত তাহার অসৌজন্যমূলক আচরণের কারণে ছাকীফ আবূ রিগালকে নির্মমভাবে হত্যা করিল। গায়লান ইবন সালামা তাহার পূর্বপুরুষ ছাকীফ কর্তৃক আবু রিগালের উপর কঠোরতা অবলম্বন সম্পর্কে বলেন, আমরা নির্দয় বংশীয় লোক, আমাদের পিতা কঠোরতা অবলম্বন করিয়াছেন। এই সম্পর্কে উমায়্যা ইব্ন আবিস-সালত আছ-ছাকীফ বলেন,
نَفَوا عَنْ أَرْضِهِمْ عَدْنَانِ طَراً * وَكَانُوا لِلْقَبَائِلِ قَاهَرِيْنَا وَهُمْ قَتَلُوا الرئيسَ أَبَا رِعَالٍ + بِمَكَّةَ إِذْ يَسُوقُ بِهَا الْوَضِيْنَا .
"আদনান বংশকে তাহারা বলপূর্বক তাহাদের ভূমি হইতে বিতাড়িত করিল। ইহারা ছিল গোত্রসমূহের উপর বল প্রয়োগকারী। উহারা আবূ রিগালের মত নেতাকে হত্যা করিল। হত্যা স্থলটি ছিল মক্কায় যখন সে তথায় উৎপাত করিত"।
'আমার ইব্ন দাররাক আল-আবদী এই সম্পর্কে বলেন,
تَرَانِي إِنْ قَطَعْتُ حِبَالَ قَيْسٍ + وَخَالَفْتُ الْمُرُورَ عَلَى تَمِيمٍ . لَأَعْظَمُ فَجْرَةً مِنْ أَبِي رِغَالٍ + وَأَجْوَرُ فِي الْحُكُومَةِ مِنْ سَدُومٍ .
"তুমি আমাকে দেখিবে যদি আমি কায়সের দড়িসমূহ কাটিয়া ফেলি এবং বানু তামীমের চলাচলের বিরুদ্ধাচারণ করি। আমি আবূ রিগাল হইতে অনেক বড় দুষ্ট এবং রাজ্য পরিচালনায় সাদৃম হইতে বহু গুণ বেশি অত্যাচারী"।
মিসকীন আদ-দারিমী বলেন,
وَأَرْجُمُ قَبْرَهُ فِي كُلُّ عَامِ + كَرَجْمِ النَّاسِ قَبْرَ أَبِي رِغَالَ .
"আমি প্রতি বৎসর তাহার কবরে প্রস্তরাঘাত করি, যেইভাবে লোকে আবূ রিগালের কবরে প্রস্তরাঘাত করে" (আল-মাসউদী, মুরূজুয-যাহাব, ২খ, ৭৮-৭৯)।