📄 ছামূদ জাতির পরিচয়
বিশিষ্ট সাহাবী আবূ যার (রা) হইতে বর্ণিত আছে:
إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ وَارْبَعَةٌ مِّنَ الْعَرَبِ هُودٌ وَشُعَيْبٌ وَصَالِحٌ وَنَبِيُّكَ يَا أَبَا ذَرٍ .
"নবী করীম (স) বলিয়াছেন, চারজন নবী হইলেন আরব বংশোদ্ভূত: হৃদ, শু'আয়ব, সালিহ ও তোমার নবী (মুহাম্মাদ) হে আবূ যারর" (ছা'আলাবী, তাফসীর, ২খ., ৩১-৩২)। আলুসী ছামূদ সম্প্রদায়ের আদি মানব ছামূদ সম্পর্কে বলেন: কথিত আছে, ছামূদ ছিলেন তাসাম ও জাদীসের ভ্রাতা (রূহুল মাআনী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৩)। হিফজুর রহমান বলেন, ছামূদ সম্প্রদায় হইল নূহ (আ)-এর পুত্র সামের বংশধরগণের (সেমিটিক) একটি শাখা। সম্ভবত ইহারা প্রথম আদ জাতির ধ্বংসের পর হযরত হূদ (আ)-এর প্রাণে বাঁচিয়া যাওয়া লোকজন। উহাদেরকে দ্বিতীয় আদ বংশ বলা হয় (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ১২৩)। আরবী অভিধান লিসানুল আরাব ও তাজুল আরূসে উল্লেখ আছে যে, ছামূদ সম্প্রদায় হইল আদ সম্প্রদায়ের অবশিষ্ট লোকদের বংশধর (ইব্ন মানজুর, লিসানুল আরাব, ১খ., ৫০; আয-যাবীদী, তাজুল আরূস, ১খ., ৩১২)। জুরজী যায়দান বলেন, ইতিহাসবিদগণের অভিমত হইল, আরবজাতি বড় দুইটি ভাগে বিভক্ত ছিল। একটি হইল আরবে বায়দা, আর অপরটি আরবে বাকিয়্যা। আদ ও ছামূদ জাতি হইল আরবে বায়দা বা ধ্বংসপ্রাপ্ত আরব জাতির অন্তর্ভুক্ত (জুরজী যায়দান, তারীখুত তামাদদুনিল ইসলামী, ১খ., ১৫)। আল-মাসঊদী বলেন, ছামূদ জাতির প্রথম অধিপতি ছিল আবির ইব্ন ইরাম। সে দুই শত বৎসর রাজত্ব করিয়াছিল। তাহার পর ক্ষমতায় আরোহণ করে জুনদা ইব্ন আমর। সে সর্বসাকুল্যে তিন শত সাতাইশ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিল (আল-মাসউদী, মুরূজুয যাহাব)।
📄 ছামূদ জাতির আবাস
আল-মাসউদী বলেন, শাম (সিরিয়া) ও হিজাযের মধ্যবর্তী স্থান হইতে কৃষ্ণ সাগর উপকূলবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত স্থান ছামূদ ইব্ন আবিরের অধিকৃত ছিল। তাহাদের গৃহাদি ছিল ফাদলুন-নাকা নামক স্থানে। গৃহগুলির চিহ্ন পাহাড়ে খোদাইকৃত অবস্থায় এখনও বিদ্যমান রহিয়াছে। সিরিয়া হইতে হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করিলে পথিমধ্যে ওয়াদিল কুরার (ওয়াদি উল কুরা) নিকটবর্তী স্থানে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন অট্টালিকা পরিলক্ষিত হয় (মুরূজুয যাহাব, প্রাগুক্ত)। ইব্ন জারীর তাবারী (র) ইবন ইসহাক সূত্রে বলেন, ছামূদ সম্প্রদায়ের গৃহাদি ছিল হিজরের মরুভূমি অঞ্চলে। এই মরুময় স্থানটির নাম হইল ওয়াদিল কুরা। উহা হিজায ও শামের মধবর্তী স্থানে আঠার মাইল বিস্তৃত (তাবারী, তাফসীর, প্রাগুক্ত, ৮খ., ১৫৯)। আল্লামা কুরতুবী বলেন, কাতাদা বলিয়াছেন, ছামূد সম্প্রদায়ের আবাসভূমি ছিল মক্কা ও তাবুকের মধ্যবর্তী স্থানে (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ১০খ., ৪৬)। মাওলানা আবুল আলা মাওদূদী তাঁহার তাফহীমুল কুরআন গ্রন্থে বলেন, ছামূদ সম্প্রদায়ের আবাস ছিল উত্তর-পশ্চিম আরবের হিজর নামক এলাকায়। বর্তমানে মদীনা তায়্যিবা ও তাবৃকের মধ্যস্থিত হিজায রেলওয়ে ষ্টেশনের মধ্যে ইহা অবস্থিত। এখানেই ছামূদের কেন্দ্র ছিল। প্রাচীন কালে ইহাকে আল-হিজর বলা হইত। এই নীরব নগরীটি দেখিয়া মনে হয় কোন সময়ই এখানকার অধিবাসীর সংখ্যা চার হইতে পাঁচ লক্ষের কম ছিল না। কুরআনুল করীম অবতরণকালে হিজাযের বাণিজ্যিক কাফেলা এই স্থান দিয়া যাতায়াত করিত (তাফহীমুল কুরআন, প্রাগুক্ত, ২খ., ৪৭-৪৮)। তিনি আরও বলেন, ওয়াদিল কুরার আধুনিক নাম হইল আল-উলা। এই প্রসিদ্ধ স্থান হইতে কয়েক মাইল দূরে মদীনা তায়্যিবা ও তাবুকের মধ্যবর্তী স্থানে উত্তর দিকে ছামূদ জাতির আবাস ছিল। এখনও সেখানকার অধিবাসিগণ এই স্থানটিকে আল-হিজর বা মাদাইন সালিহ বলিয়া স্মরণ করে (তাফহীমুল কুরআন, প্রাগুক্ত, ৩খ., ৫২২)। ডঃ জাওয়াদ আলী নুওয়ায়রী রচিত নিহায়াতুল আরাব (নাহাত গ্রন্থে উদ্ধৃতি দিয়া তিনি বলেন, কবি বলিয়াছেন, আল্লাহ তা'আলা আদ জাতিকে ধ্বংস করিবার পর ছামূদ জাতি উহাদের স্থলাভিষিক্ত হয়। আদ গোত্রের আবাসভূমি আবাদ করিয়া তাহারা সেইখানে বসবাস করিতে লাগিল। ছামূদরা ছিল দশাধিক গোত্রে বিভক্ত (ডঃ জাওয়াদ আলী, আল-মুফাসসাল ফী তারীখিল আরব কাবলাল ইসলাম, পাদটীকা, ১খ., ৩২৪)। আবদুল ওয়াহহাব আন-নাজ্জার বলেন, আমার কোন এক সঙ্গী ছামূদ জাতির আবাস ভূমিতে ভ্রমণ করিয়া তাহাদের রাজকীয় প্রাসাদে প্রবেশ করিয়া দেখিতে পাইলেন, প্রাসাদটি বিশাল আকৃতির। ইহা খোদাইকৃত প্রস্তর নির্মিত (আবদুল ওয়াহহাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, ৫৮ পৃ.)। হাদরামাওতবাসীরা দাবি করে যে, ছামূদ জাতির আবাস ও গৃহাদি আদ জাতির শিল্পকর্মেরই ফসল হইয়াছে। তাহাদের এই দাবি এই কথার পরিপন্থী নহে যে, ছামূদ সম্প্রদায় স্থাপত্য শিল্পে খুবই পারদর্শী ছিল এবং প্রাসাদসমূহ তাহাদের নিজেদেরই নির্মিত। এইজন্য যে, প্রথম আদ জাতি ও দ্বিতীয় আদ জাতি প্রকৃতপক্ষে একই সম্প্রদায়ভুক্ত। সালিহ (আ) কর্তৃক স্বীয় উম্মতকে নিম্মোক্ত আহবান ইহার সমর্থক :
وَاذْكُرُوا إِذْ جَعَلَكُمْ خُلَفَاءَ مِنْ بَعْدِ عَادٍ وَبَوَاكُمْ فِي الْأَرْضِ تَتَّخِذُونَ مِنْ سُهُولِهَا قُصُورًا وَتَنْحِتُونَ الْجِبَالَ بُيُوتًا .
"স্মরণ কর, আদ জাতির পর তিনি তোমাদেরকে তাহাদের স্থলাভিষিক্ত করিয়াছেন। তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন যে, তোমরা সমতল ভূমিতে প্রাসাদ ও পাহাড় কাটিয়া বাসগৃহ নির্মাণ করিতেছ” (৭ : ৭৪; হিফজুর রহমান, কাসাসুল কুরআন, করাচী, ১৪০০ হি., ১খ., ১২৪; আবদুল ওয়াহহাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, বৈরূত তা. বি., পৃ. ৫৯)।
📄 ছামূদ জাতির সময়কাল
ছামূদ জাতির সময়কাল সম্পর্কে আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার ও মাওলানা হিফজুর রহমান বলেন, এই সম্পর্কে ইতিহাস নীরব থাকার ফলে এই জাতির সময়কাল সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্তমূলক তথ্য প্রদান করা যায় না। তবে এই কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে ইহাদের সময়কাল হইল হযরত ইবরাহীম (আ)-এর পূর্বের যমানা। ইহারা ইবরাহীম (আ)-এর মত মহান নবীর আবির্ভাবের পূর্বে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছিল। এই কথা লক্ষণীয় যে, ছামূদ জাতির আবাসসমূহের আশেপাশে এমন কতিপয় কবরের অস্তিত্ব দেখিতে পাওয়া যায় যেইগুলিতে "আরামী" ভাষায় অনেক কিছু লেখা রহিয়াছে। এই লেখাসমূহের উপর যেই তারিখ লিপিবদ্ধ রহিয়াছে তাহা হযরত ঈসা (আ)-এর জন্মের পূর্বের লেখা। ইহা হইতে এই ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হইতে পারে যে, হযরত মূসা (আ)-এর পরে ছামূদ জাতির আবির্ভাব ঘটিয়াছিল। আসলে ব্যাপারটি এরূপ নয়। এই কবরগুলি প্রকৃতপক্ষে ছামূদ জাতির কবর নয়, বরং কবরগুলি হইল ছামূদ জাতির ধ্বংসের হাজার হাজার বৎসর পর এই স্থানে আসিয়া বসতি স্থাপনকারী লোকজনের। এই সকল লোক তাহাদের সম্মানিত ব্যক্তিদের স্মৃতি রক্ষার লক্ষ্যে আরামী লিখন পদ্ধতিতে কবরগুলির উপর ফলক স্থাপন করিয়া রাখিয়াছিল। এই কবরসমূহ ছামূদ জাতিরও নয়, ছামূদ জাতির সময়কালেরও নয় (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৫৯; কাসাসুল কুরআন, পৃ. ১২৫-১২৬)। ছামূদ সম্প্রদায়ের প্রাচীনত্ব আল-কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত হইতে প্রতীয়মান হয়:
الَمْ يَأْتِكُمْ نَبَأَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ قَوْمِ نُوحٍ وَعَادٍ وَثَمُودَ وَالَّذِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ لَا يَعْلَمُهُمْ إِلَّا اللهُ .
"তোমাদের নিকট কি সংবাদ আসে নাই, তোমাদের পূর্ববর্তীদের, নূহের সম্প্রদায়ের, আদের ও ছামূদের এবং তাহাদের পূর্ববর্তীদের? উহাদের বিষয় আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেহ জানে না" (১৪:৯)।
এই আয়াতটি উদ্ধৃত করিবার পর ডঃ জাওয়াদ আলী বলেন, ইহারা এত প্রাচীন জাতি ছিল যে, ইহাদের কথা মানবজাতি বিস্মৃত হইয়া গিয়াছিল। মহান আল্লাহ ব্যতীত ইহাদের কথা অন্য কেহ জানিত না। ইহা হইতে বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমকালীন লোকজন মনে করিত ইহারা অনেক পূর্বেকার লোক (ডঃ জাওয়াদ আলী, আল-মুফাসসাল ফী তারীখিল আরাব কণবলাল ইসলাম, দারুল ইল্ম, বৈরূত ১৯৭৬ খৃ., ১খ., ৩০৯)। মিসরীয় খ্যাতিমান খৃস্টান ঐতিহাসিক জুরজী যায়দান তাহার গ্রন্থ আল-আরাব কাবলাল ইসলাম গ্রন্থে লিখিয়াছেন, প্রমাণাদি বিশ্লেষণ করিলে এবং গ্রন্থাদি অধ্যয়ন করিলে যেই তথ্য উদঘাটিত হয় তাহা হইল : সালিহ (আ)-এর সম্প্রদায়ের আদি আবাসগুলি হযরত ঈসা (আ)-এর জন্মগ্রহণের কিছু কাল পূর্বে নাবাতীয়গণের আয়ত্তে আসিয়া গিয়াছিল। হহারা ছিল বেতরাহের অধিবাসী। ইহাদের নিদর্শন ও টিলাসমূহকে অনেক প্রাচ্যবিদ লেখক প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। তাহাদের যে সকল কীর্তি পাথরসমূহে লেখা ছিল তাহারা তাহা পাঠ করিয়াছেন। সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধ্বংসাবশেষ হইল কাসরুল বিন্ত কবর বাশা কিল'আঃ ও বুরজ, ঐ শিলালিপিগুলি নাবাতী লিপিতে উৎকীর্ণ ছিল। সেখানকার কবরগুলির উপর পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকরা এই স্থানে যাহা পাইয়াছিলেন তাহা ছিল নাবাতী বর্ণমালায় খোদাইকৃত। ইহা ছিল হযরত ঈসা (আ)-এর জন্মগ্রহণের নিকটতম কালের লেখা। লিপিবদ্ধ বাক্যের বিষয়বস্তু ছিলঃ মাকবারাটি কুমকুম বিন্ত ওয়াইলা বিন্ত হারাম এবং কুমকুমের কন্যা কালীবা নিজের জন্য এবং নিজের সন্তানাদির জন্য তৈরী করিয়াছেন। ইহার ভিত্তি শুভ মাসে স্থাপন করা হইয়াছিল। ইহা নাবাতীগণের রাজা হারিছ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হইবার নবম বৎসর। এই হারিছ নিজ গোত্রকে অত্যধিক ভালবাসিতেন। সুতরাং আমায়ুশ-শারা ও আরশাঃ (?) লাত, অমেন্দ, মানূত এবং কায়সের ইহাদের উপর লানত হইবে যাহারা এই কবরগুলিকে বিক্রয় করিবে অথবা বন্ধক রাখিবে অথবা এই সমস্ত হইতে কোন অঙ্গকে বাহির করিবে কিংবা কুমকুম, তাহার কন্যা ও তাহার সন্তানাদি ব্যতীত কাউকে দাফন করিবে। যেই ব্যক্তি এই লিপির লেখার বিপরীত কিছু করিবে তাহার উপর যুশ-শারা, হুবল, মানূতের পাঁচটি অভিশাপ। যেই যাদুকর ইহার বিপরীত করিবে তাহার উপর এক হাজার হারিছী দিহরাম জরিমানা দেওয়া বাধ্যতামূলক হইবে। কিন্তু তাহার হাতে কুমকুম, কালীবা অথবা তাহার সন্তানাদির মধ্য হইতে কাহারও স্বহস্ত লিখিত স্পষ্ট অনুমতি পত্র ব্যতীত এই কবরস্থানে বাহিরের কাহাকেও দাফন করা যাইবে না। কবরস্থানটি ওয়াহবুল লাত ইবন উবাদা প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন (কাসাসুল আম্বিয়া, প্রাগুক্ত; কাসাসুল কুরআন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৬-১২৭)। ডঃ জাওয়াদ আলী আরও বলেন, ছামূদ জাতির ইতিহাস খৃস্ট পূর্বেরও অনেক আগের সময়ের সহিত সংশ্লিষ্ট।
ইহারা ছিল সেই সকল জাতির অন্তর্গত যাহারা আশুরীদের সহিত দ্বিতীয় সারগুনের রাজত্বকালে লড়াই করিয়াছিল। দ্বিতীয় সারগুন তাহাদেরকে পরাভূত করিয়া নিজ আবাসভূমি হইতে বহিষ্কার করিয়া সুমেরিয়ার দিকে পাঠাইয়াছিলেন। আশুরীগণের সহিত তাহারা যেই স্থানে যুদ্ধে লিপ্ত হইয়াছিল তাহার নাম ছিল 'বারী' (BARI)। কোন কোন গবেষক মনে করেন, পঞ্চম খৃস্টাব্দ পর্যন্ত কওমে ছামূদের সর্বশেষ বিশ্বাসযোগ্য আলোচনার কথা পাওয়া যায়। ইহাদের একটি গোত্র অশ্বারোহী হইয়া রোম যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিল (Doughty, vol. 1., p. 229; Sprenger, s. 28)। ছামূদ জাতি ঈসা (আ)-এর জন্মের পর হিজায অঞ্চলের উচ্চভূমি দূওমাতুল জানদাল, হিজর ও পশ্চিম তায়মা নামক স্থানে বসবাস করিত। বর্ণিত আছে যে, ইহারা খৃস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে আল-আওয়ারিদ ও আল-ইব্হা নামক দুইটি প্রস্তরময় অঞ্চলের ভূমির অধিবাসী ছিল (Musil, Hegaz, P. 29) ।
ঐতিহাসিক Doughty মনে করেন ছামূদ জাতি হিজর নামক যেই স্থানে বসবাস করিত তাহা এখন অনাবাদ ভূমি। বর্তমান মাদাইনে সালিহ হইল নাবাতীদের আবাসভূমি হিজর। ইহা ছামূদ সম্প্রদায়ের হিজর নহে। নাবাতীগণের রাজধানী মাদাইনে সালিহ হইল ঐ ধ্বংপ্রাপ্ত স্থান হইতে দশ মাইল দূরে (Doughty, vol, 1, পৃ. ২২৯; ডঃ জাওয়াদ আলী, আল-মুফাসসাল ফী তারীখিল আরব কাবলাল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২৬)। ইসলামী যুগ ও ইসলামে পূর্ববর্তী সময়ের সহিত ছামূদ জাতির কোন উল্লেখযোগ্য সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় না। ইব্ন খালদূন বলেন, কথিত আছে যে, ইহাদের পরবর্তী উত্তর পুরুষ ছিল আহলুর-রাস্স (اهل الرس), যাহাদের নবী ছিলেন হানজালা ইব্ন সাফওয়ান। এই অভিমত যথার্থ নহে। অনুরূপ কোন কোন কুলজি বিশারদ মনে করেন, ছাকীফ জাতি হইল ছামূদ সম্প্রদায়ের বংশোদ্ভূত। এই মতও গ্রহণযোগ্য নহে। ছাকীফ গোত্রীয় হাজ্জাজ ইব্ন ইউসুফও এই অভিমত সঠিক নহে বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন, (তারীখে ইব্ন খালদুন, বৈরূত, দারুল কুতুব ১৩৯৯ হি., ২খ., ২৩-২৪)। ইহা আসলে হাজ্জাজ ইব্ন ইউসুফ বিরোধীরা তাহার ছাকীক গোত্রকে হেয় প্রতিপন্ন করিবার জন্য রটাইয়াছে। যেহেতু হাজ্জাজ ছিলেন অত্যন্ত উগ্র প্রকৃতির শাসক। ছামূদ জাতির লিখিত অনেক তথ্যাদি ইউরোপীয় যাদুঘর ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের গ্রন্থাগার ও প্রাচ্যবিদদের লেখনীতে পাওয়া যায়। ইহা হইতে অনুমেয়, ইহারা ছিল কৃষিকাজে পারদর্শী এবং পশুপালনে অভ্যস্ত জাতি। তাহাদের লেখাসমূহে তাহারা যেই সকল প্রতিমার পূজা করিত বলিয়া উল্লেখ পাওয়া যায় তাহা হইলঃ ওয়াদ্দ, হুবাল, লাত, যুশ-শারা, ইত্যাদি (আল-মুফাসসাল ফী তারীখিল আরাব কাবলাল ইসলাম, পৃ. ৩৩০-৩৩১)।
📄 পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিতে ছামূদ জাতি
আল্লামা আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার ও মাওলানা হিফজুর রহমানের মতে পশ্চিমা প্রাচ্যবিদ ঐতিহাসিকগণ আরব জাহান সম্পর্কে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণের নামে ত্রুটিপূর্ণ তথ্য প্রদান করিয়া থাকেন। তাহারা ছামূদ সম্প্রদায় সম্পর্কে অনেক অনুসন্ধানের পর যেইসব তথ্য প্রদান করিয়াছেন তাহা বাস্তবের সহিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ছামূদ সম্প্রদায় সম্পর্কে তাহারা গবেষণা চালাইয়া দুইটি শিবিরে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছেন। এক দলের অভিমত হইল, ছামূদ সম্প্রদায় ইয়াহুদীদের একটি গোত্র যাহারা ফিলিস্তীনে না গিয়া এই স্থানেই রহিয়া গিয়াছিল। এই অভিমতটি কেবল তত্ত্ব ও তথ্যগত ভুলই নহে, বরং নিতান্তই অমূলক ও ভিত্তিহীন। কারণ সকল ইতিহাসবিদ এই ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করিয়াছেন যে, ইয়াহূদীগণের নবী মূসা (আ) বনূ ইসরাঈলকে লইয়া মিসর হইতে বাহির হইবার অনেক পূর্বেই ছামূদ জাতির আবাসসমূহ ধ্বংস হইয়া গিয়াছিল। মূসা (আ) তাঁহার কওমকে লইয়া মিসর হইতে বাহির হইবার যুগ ছামূদ জাতির ধ্বংসের যুগের কাছাকাছিও নহে। আল-কুরআনও স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করে যে, মূসা (আ)-কে ফিরআওনের লোকেরা যখন মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করিল তখন তাহার সম্প্রদায়ের একজন মুমিন ব্যক্তি স্বীয় সম্প্রদায়কে ইহা বলিয়া সতর্ক করিয়া দিলেন যে, তোমাদের পূর্ববর্তী নূহ, আদ ও ছামূদ এবং তাহাদের পরবর্তী সম্প্রদায়সমূহ তাহাদের নবীগণকে অস্বীকার করায় যেই পরিণতি ভোগ করিয়াছিল তোমাদের অবস্থাও যেন এমন না হয়। অপর এক দল প্রাচ্যবিদ বলেন, ছামূদ জাতি হইল আমালিকা বংশোদ্ভূত জাতি। ইহারা ফুরাত নদীর পশ্চিম উপকূল হইতে চলিয়া আসিয়া এখানে আবাস স্থাপন করিয়াছিল। ইহাদের কেহ কেহ মনে করেন, ইহারা হইল সেই আমালিকা জাতি যাহাদেরকে মিসরের বাদশাহ আহমাস দেশ হইতে বিতাড়িত করিয়াছিলেন। যেহেতু তাহারা মিসরে অবস্থানকালে পাথর খোদাই সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞান অর্জন করিয়াছিল, ইহার ফলে “হিজর” নামক স্থানে গিয়া পাহাড় এবং পাথর খোদাই করিয়া অনুপম দালান নির্মাণ করিয়াছিল। তবে পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, আদ ও ছামূদ জাতি সাম ইব্ নূহ (আ)-এর বংশধর। আরববাসীরা ইয়াহুদীদের ত্রুটিপূর্ণ অভিমতের অনুসরণে ইহাদেরকে আমালিকাদের অন্তর্ভুক্ত করিয়া ফেলিয়াছে। প্রকৃতপক্ষে আমালীক ইব্ন উদের ছামূদ বংশের সহিত কোন সম্পর্ক পাওয়া যায় না। ফলে এই অভিমতও সঠিক নহে। বিশেষজ্ঞগণের মতে ছামূদ জাতি হইল আদ জাতির অবশিষ্ট অংশ। ইহাই বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য অভিমত (হিফজুর রহমান, কাসাসুল কুরআন, পৃ., ১২৭; আবদুল ওয়াহহাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, বৈরূত তা. বি., ৫৯)।
ডঃ জাওয়াদ আলী বলেন, প্রাচ্যবিদগণ ছামূদ জাতির পরিচয় উদ্ঘাটনে বহু চেষ্টা চালাইয়াছেন। আশূরী দলীলপত্র ও দ্বিতীয় সারজুনের একটি দলীলে ছামুদদের নাম পাওয়া গিয়াছে। তাহারা ছামূদকে Tamudi, Thamubi, Thamudeni. ইত্যাদি বিভিন্ন নামে উল্লেখ করিয়াছেন।صخري طويل الطراف حول البحر الأريترى গ্রন্থে বলা হইয়াছে: Thamudeni-গণ উপকূলে বসবাস করিত। ইহা জাহাজ চলাচলের উপযোগী ছিল না। এখানে ঝড়ো বাতাস হইতে রক্ষা পাওয়ার জন্য নৌকাগুলির কোন আশ্রয়কেন্দ্র নাই। কোন সামুদ্রিক বন্দরও নাই যেখানে জাহাজ নোঙ্গর করে যায়। এই গ্রন্থকারের বর্ণনা হইতে বুঝা যায়, ছামূদের আবাসমূহ হিজায অঞ্চলের লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত ছিল। (Musil, Destra, P. 302, The Periples of The Erythreansea. By william vincent, London 1800, Part the second, p.262)। DioDrus ও একটু ঘুরিয়া ফিরিয়া এইরূপই বর্ণনা দিয়াছেন। (Diodorus, Bibliotheca Historica, III, 44, Musil, Deserta, P. 291)। Pliny উল্লেখ করিয়াছেন যে, Tamudaei-গণ হইল Domata এবং Haegra -এর মধ্য স্থিত। ইহা একটি শহর যাহাকে Badanatha, Baclanaza (Pliny, Natur, History (Translated By H. Racham) Vol. 2,p. 456-457, vi, 32)। টলেমির মতে ছামূদ সম্প্রদায় হইল Sarakenoi এবং Apatae-এর মধ্যবর্তী স্থানের অধিবাসীগণ। (Glaser, Skizze, 2, s. 108, Ptolemly vi 7: 14 Vi ,7: \21, V 197 Hastings, A Dictionary of the Bible, Vol i. p. 630)। এই সকল মতামত প্রমাণ করে যে, ছামূদ জাতির আবাসস্থল হইল আরবের উত্তর পশ্চিমে। টলেমির ভূগোল হইতে জানা যায় যে, ছামূদ জাতির আবাসভূমি আদ জাতির আবাসস্থল হইতে দূরে নহে। তাহাদের বসতির মধ্যবর্তী স্থানে একমাত্র সারাহকানী (Sarakeny) আবাস রহিয়াছে। এই সকল আবাসভূমি হিজাযের উচ্চভূমিতে অবস্থিত। এই অভিমতটি আরবী গ্রন্থসমূহের এই অভিমতের সহায়ক যে, ছামূদ জাতির আবাসভূমি আদ জাতির আবাসভূমির নিকটবর্তী (ডঃ জাওয়াদ আলী, আল-মুফাসসাল ফী তারিখীল আরাব কাবলাল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২৪-৩২৫)। সালিহ (আ)-এর সহিত ছামূদ জাতির সম্পর্ক আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে : وَإِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا "ছামূদ জাতির প্রতি তাহাদের ভাই সালিহকে পাঠাইয়াছিলাম" (৭ঃ৭৩)। এই স্থানে ভাই বলিতে জাতি ভাই বুঝানো হইয়াছে, ধর্মীয় নহে (তাফসীরুল বাগাবী, মূলতান তা.বি., ২খ., ১৭৪)। সালিহ (আ) ছিলেন ছামূদ জাতির মধ্যে উত্তম বংশের। তিনি ঐ জাতির প্রতি নবী হিসাবে প্রেরিত হইয়াছিলেন (আয-যামাখশারী, আল-কাশশাফ, বৈরূত তা. বি., ২খ., ৮৯)। হজরত সালিহ (আ) যখন তাঁহার গোত্রের প্রতি নবীরূপে প্রেরিত হন তখন তিনি যুবক ছিলেন। দাওয়াত দিতে দিতে তিনি বৃদ্ধ হইয়া গেলেন, তবুও তাঁহার সম্প্রদায়ের অল্প সংখ্যক লোক যাহারা সমাজে দুর্বল শ্রেণী হিসাবে বিবেচিত হইত, তাহারা ব্যতীত আর কেহই তাঁহার উপর ঈমান আনয়ন করিল না (সায়্যিদ আলুসী, রূহুল মাআনী, প্রাগুক্ত, ৮খ., ১৬৬)।