📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল-কুরআনে সালিহ ও ছামূদের কথা

📄 আল-কুরআনে সালিহ ও ছামূদের কথা


আল-কুরআনে সালিহ (আ)-এর কথা তিনটি সূরার আটটি স্থানে আসিয়াছে। (আবদুল ওয়াহহাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৯৮-এ বলা হইয়াছে, সালিহ (আ) কথা কুরআনে আসিয়াছে কিন্তু বাস্তবের সাথে ইহার মিল নাই) তাহা হইল নিম্নরূপ:
সূরা | আয়াত নম্বর | মোট
আ'রাফ | ৭৩, ৭৫, ৭৭ | ৩
হৃদ | ৬১-৬২, ৬৬,৮৯ | ৪
শু'আরা | ১৪২ | ১
সর্বমোট ৬টি
ছামূদ গোত্রের কথা নিম্নোক্ত নয়টি সূরায় রহিয়াছে: আরাফ, হৃদ, হিজর, নামল, ফুসসিলাত (হামীম আস-সিজদা), আন-নাজম, আল-কামার, আল-হাক্কা, আল-শাম্স (হিফজুর রহমান, কাসাসুল কুরআন, ১খ., ১২২)। আল-কুরআনুল করীমে কোন সময় স্বতন্ত্রভাবে আবার কোন সময় অন্যান্য গোত্রের সহিত মিলিতভাবে তাহাদের কথা আলোচিত হইয়াছে, তাহারা হইল কওমে নূহ ও কওমে আদ্‌, আসহাবুর রাসস (أَصْحَابُ الرَّسّ), কওমে লূত ও আসহাবুল আয়কা। আদ জাতির সহিত আলোচনা করিবার সময় একটিমাত্র স্থান ব্যতীত সকল স্থানেই তাহাদের কথা পূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। স্থানটি হইল: كَذَّبَتْ ثَمُودُ وَعَادُ بِالْقَارِعَة (সূরা আল-হাক্কা, আয়াত ৪)। আসহাবুর রাসসের সহিত দুইবার আলোচনা করা হইয়াছে। একবার ছামূদের কথা আগে এবং একবার পরে। যেমন وَعَادَاً وَتَمُودًا وَأَصْحَابَ الرَّسُ (সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৩৭)-এবং قَوْمٌ نُوحٍ وَأَصْحَابُ الرُّسُ وَثَمُودُ (সূরা কাফ, আয়াত ১২): কওমে লূত ও আসহাবুল আয়কা-এর সহিত আলোচনার সময় ছামূদের নাম পূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। যেমন: وَثَمُودُ وَقَوْمٌ نُوْطُ وَأَصْحَابُ الأَيْكَة (সূরা সাদ, আয়াত ১৩)। তবে কোন আয়াতেই কওমে নূহের পূর্বে ছামূদের কথা উল্লেখ করা হয় নাই (ডঃ জাওয়াদ আলী, আল-মুফাসসাল ফী তারীখিল আরাব কণবলাল ইসলাম, ১খ., ৩২২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ছামূদ শব্দের আভিধানিক বিশ্লেষণ

📄 ছামূদ শব্দের আভিধানিক বিশ্লেষণ


ثمد আরবী, শব্দের অর্থ হইল স্বল্প পানি। ছামূদ নামকরণের কারণ হইল: আমর ইবনুল আলা হইতে বর্ণিত, পানি কম হইলে বলা হইত ندا ; যেহেতু এই জাতি পানি সংকটে জর্জরিত থাকিত এই কারণে তাহাদেরকে ছামূদ বলা হইত (রূহুল মাআনী, প্রাগুক্ত)। ছামূদ জাতিকে ছামূদ বলা হয় তাহাদের ঊর্ধ্বতন পুরুষ ছামূদের নাম অনুসারে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত)। ছামূদ শব্দটি মুনসারিফ কিনা এই ব্যাপারে মতভেদ রহিয়াছে। আল্লামা কুরতুবী বলেন, শব্দটি গায়র মুনসারিফ। কারণ এই শব্দটি দ্বারা একটি গোত্রের নাম রাখা হইয়াছে। আবু হাতিমের মতে শব্দটি গায়র মুনসারিফ হইবার কারণ হইল: ইহা একটি অনারব শব্দ (عجمی)। এই অভিমতকে ত্রুটিযুক্ত বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন ইমাম নাহহাস। তিনি বলেন, শব্দটি আরবী শব্দ হইতে নির্গত, যাহার অর্থ হইল اءُ لِقَلِيْلُ অর্থাৎ স্বল্প পানি (কুরতুবী, আল-জামে লিআহকামিল কুরআন, বৈরূত তা. বি., ৭খ., ২৩৭)। আল্লামা ছা'আলাবী তাঁহার প্রণীত তাফসীর গ্রন্থে বলেন, জুমহুর উলামা ছামূদ শব্দকে একটি গোত্রের নাম হিসাবে গায়র মুনসারিফ পড়েন। কিন্তু য়াহয়া ইব্‌ন ওয়াছছাব ও আল-আ'মাশ মুনসারিফ হিসাবে পাঠ করেন (ছা'আলাবী, তাফসীর, ২খ., ৩১)। ছামূদ জাতি আদ গোত্রের কিছু কাল পর আরবের উত্তর-পূর্ব অংশে প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়া ছামূদ নামেই খ্যাতি লাভ করিয়াছিল। আরবের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত এই অংশটি মদীনা ও শাম (সিরিয়ার) দেশের মধ্যবর্তী স্থান। প্রাচীন আরববাসীরা ইহাকে হিজ্ব বলিত (আবদুল হক দেহলাবী, তাফসীর হাক্কানী, ২খ., ৪০০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ছামূদ জাতির পরিচয়

📄 ছামূদ জাতির পরিচয়


বিশিষ্ট সাহাবী আবূ যার (রা) হইতে বর্ণিত আছে:
إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ وَارْبَعَةٌ مِّنَ الْعَرَبِ هُودٌ وَشُعَيْبٌ وَصَالِحٌ وَنَبِيُّكَ يَا أَبَا ذَرٍ .
"নবী করীম (স) বলিয়াছেন, চারজন নবী হইলেন আরব বংশোদ্ভূত: হৃদ, শু'আয়ব, সালিহ ও তোমার নবী (মুহাম্মাদ) হে আবূ যারর" (ছা'আলাবী, তাফসীর, ২খ., ৩১-৩২)। আলুসী ছামূদ সম্প্রদায়ের আদি মানব ছামূদ সম্পর্কে বলেন: কথিত আছে, ছামূদ ছিলেন তাসাম ও জাদীসের ভ্রাতা (রূহুল মাআনী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৩)। হিফজুর রহমান বলেন, ছামূদ সম্প্রদায় হইল নূহ (আ)-এর পুত্র সামের বংশধরগণের (সেমিটিক) একটি শাখা। সম্ভবত ইহারা প্রথম আদ জাতির ধ্বংসের পর হযরত হূদ (আ)-এর প্রাণে বাঁচিয়া যাওয়া লোকজন। উহাদেরকে দ্বিতীয় আদ বংশ বলা হয় (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ১২৩)। আরবী অভিধান লিসানুল আরাব ও তাজুল আরূসে উল্লেখ আছে যে, ছামূদ সম্প্রদায় হইল আদ সম্প্রদায়ের অবশিষ্ট লোকদের বংশধর (ইব্‌ন মানজুর, লিসানুল আরাব, ১খ., ৫০; আয-যাবীদী, তাজুল আরূস, ১খ., ৩১২)। জুরজী যায়দান বলেন, ইতিহাসবিদগণের অভিমত হইল, আরবজাতি বড় দুইটি ভাগে বিভক্ত ছিল। একটি হইল আরবে বায়দা, আর অপরটি আরবে বাকিয়্যা। আদ ও ছামূদ জাতি হইল আরবে বায়দা বা ধ্বংসপ্রাপ্ত আরব জাতির অন্তর্ভুক্ত (জুরজী যায়দান, তারীখুত তামাদদুনিল ইসলামী, ১খ., ১৫)। আল-মাসঊদী বলেন, ছামূদ জাতির প্রথম অধিপতি ছিল আবির ইব্‌ন ইরাম। সে দুই শত বৎসর রাজত্ব করিয়াছিল। তাহার পর ক্ষমতায় আরোহণ করে জুনদা ইব্‌ন আমর। সে সর্বসাকুল্যে তিন শত সাতাইশ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিল (আল-মাসউদী, মুরূজুয যাহাব)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ছামূদ জাতির আবাস

📄 ছামূদ জাতির আবাস


আল-মাসউদী বলেন, শাম (সিরিয়া) ও হিজাযের মধ্যবর্তী স্থান হইতে কৃষ্ণ সাগর উপকূলবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত স্থান ছামূদ ইব্‌ন আবিরের অধিকৃত ছিল। তাহাদের গৃহাদি ছিল ফাদলুন-নাকা নামক স্থানে। গৃহগুলির চিহ্ন পাহাড়ে খোদাইকৃত অবস্থায় এখনও বিদ্যমান রহিয়াছে। সিরিয়া হইতে হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করিলে পথিমধ্যে ওয়াদিল কুরার (ওয়াদি উল কুরা) নিকটবর্তী স্থানে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন অট্টালিকা পরিলক্ষিত হয় (মুরূজুয যাহাব, প্রাগুক্ত)। ইব্‌ন জারীর তাবারী (র) ইবন ইসহাক সূত্রে বলেন, ছামূদ সম্প্রদায়ের গৃহাদি ছিল হিজরের মরুভূমি অঞ্চলে। এই মরুময় স্থানটির নাম হইল ওয়াদিল কুরা। উহা হিজায ও শামের মধবর্তী স্থানে আঠার মাইল বিস্তৃত (তাবারী, তাফসীর, প্রাগুক্ত, ৮খ., ১৫৯)। আল্লামা কুরতুবী বলেন, কাতাদা বলিয়াছেন, ছামূد সম্প্রদায়ের আবাসভূমি ছিল মক্কা ও তাবুকের মধ্যবর্তী স্থানে (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ১০খ., ৪৬)। মাওলানা আবুল আলা মাওদূদী তাঁহার তাফহীমুল কুরআন গ্রন্থে বলেন, ছামূদ সম্প্রদায়ের আবাস ছিল উত্তর-পশ্চিম আরবের হিজর নামক এলাকায়। বর্তমানে মদীনা তায়্যিবা ও তাবৃকের মধ্যস্থিত হিজায রেলওয়ে ষ্টেশনের মধ্যে ইহা অবস্থিত। এখানেই ছামূদের কেন্দ্র ছিল। প্রাচীন কালে ইহাকে আল-হিজর বলা হইত। এই নীরব নগরীটি দেখিয়া মনে হয় কোন সময়ই এখানকার অধিবাসীর সংখ্যা চার হইতে পাঁচ লক্ষের কম ছিল না। কুরআনুল করীম অবতরণকালে হিজাযের বাণিজ্যিক কাফেলা এই স্থান দিয়া যাতায়াত করিত (তাফহীমুল কুরআন, প্রাগুক্ত, ২খ., ৪৭-৪৮)। তিনি আরও বলেন, ওয়াদিল কুরার আধুনিক নাম হইল আল-উলা। এই প্রসিদ্ধ স্থান হইতে কয়েক মাইল দূরে মদীনা তায়্যিবা ও তাবুকের মধ্যবর্তী স্থানে উত্তর দিকে ছামূদ জাতির আবাস ছিল। এখনও সেখানকার অধিবাসিগণ এই স্থানটিকে আল-হিজর বা মাদাইন সালিহ বলিয়া স্মরণ করে (তাফহীমুল কুরআন, প্রাগুক্ত, ৩খ., ৫২২)। ডঃ জাওয়াদ আলী নুওয়ায়রী রচিত নিহায়াতুল আরাব (নাহাত গ্রন্থে উদ্ধৃতি দিয়া তিনি বলেন, কবি বলিয়াছেন, আল্লাহ তা'আলা আদ জাতিকে ধ্বংস করিবার পর ছামূদ জাতি উহাদের স্থলাভিষিক্ত হয়। আদ গোত্রের আবাসভূমি আবাদ করিয়া তাহারা সেইখানে বসবাস করিতে লাগিল। ছামূদরা ছিল দশাধিক গোত্রে বিভক্ত (ডঃ জাওয়াদ আলী, আল-মুফাসসাল ফী তারীখিল আরব কাবলাল ইসলাম, পাদটীকা, ১খ., ৩২৪)। আবদুল ওয়াহহাব আন-নাজ্জার বলেন, আমার কোন এক সঙ্গী ছামূদ জাতির আবাস ভূমিতে ভ্রমণ করিয়া তাহাদের রাজকীয় প্রাসাদে প্রবেশ করিয়া দেখিতে পাইলেন, প্রাসাদটি বিশাল আকৃতির। ইহা খোদাইকৃত প্রস্তর নির্মিত (আবদুল ওয়াহহাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, ৫৮ পৃ.)। হাদরামাওতবাসীরা দাবি করে যে, ছামূদ জাতির আবাস ও গৃহাদি আদ জাতির শিল্পকর্মেরই ফসল হইয়াছে। তাহাদের এই দাবি এই কথার পরিপন্থী নহে যে, ছামূদ সম্প্রদায় স্থাপত্য শিল্পে খুবই পারদর্শী ছিল এবং প্রাসাদসমূহ তাহাদের নিজেদেরই নির্মিত। এইজন্য যে, প্রথম আদ জাতি ও দ্বিতীয় আদ জাতি প্রকৃতপক্ষে একই সম্প্রদায়ভুক্ত। সালিহ (আ) কর্তৃক স্বীয় উম্মতকে নিম্মোক্ত আহবান ইহার সমর্থক :
وَاذْكُرُوا إِذْ جَعَلَكُمْ خُلَفَاءَ مِنْ بَعْدِ عَادٍ وَبَوَاكُمْ فِي الْأَرْضِ تَتَّخِذُونَ مِنْ سُهُولِهَا قُصُورًا وَتَنْحِتُونَ الْجِبَالَ بُيُوتًا .
"স্মরণ কর, আদ জাতির পর তিনি তোমাদেরকে তাহাদের স্থলাভিষিক্ত করিয়াছেন। তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন যে, তোমরা সমতল ভূমিতে প্রাসাদ ও পাহাড় কাটিয়া বাসগৃহ নির্মাণ করিতেছ” (৭ : ৭৪; হিফজুর রহমান, কাসাসুল কুরআন, করাচী, ১৪০০ হি., ১খ., ১২৪; আবদুল ওয়াহহাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, বৈরূত তা. বি., পৃ. ৫৯)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00