📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ছামূদের বংশপরিচয়

📄 ছামূদের বংশপরিচয়


সালিহ (আ)-এর বংশ তালিকা দুইটি স্তরে লিখিত আছে। একটি স্তর হইল তাহার হইতে তদীয় পূর্বপুরুষ ছামূদ পর্যন্ত। অপর স্তর হইল ছামূদ হইতে হযরত নূহ (আ) পর্যন্ত। দুইটি স্তরেই বংশতালিকা বর্ণনায় মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। পূর্ণ বংশ তালিকায় যে সকল নাম রহিয়াছে তাহাও একেক গ্রন্থে একেকভাবে লিখিত। ইমাম বাগাবী বর্ণিত বংশতালিকা অনুসারে সালিহ ইব্‌ন উবায়দ ইব্‌ন আসিফ ইব্‌ন মাশিহ ইবন উবায়দ ইব্‌ন হাদির ইবন ছামূদ (আল-বাগাবী, মাআলিমুত-তানযীল, ২খ., ১৭৪)। ওয়াহ্ব ইন্ন মুনাব্বিহ (র) হইতে বর্ণিত বংশতালিকা সালিহ ইবন উবায়দ ইব্‌ন জাবির ইব্‌ন ছামূদ (আল-আলুসী, রূহুল মাআনী, ৮ খ., ১৬২)। এই সম্পর্কে মওলানা হিফজুর রহমান বলেন, ইমাম বাগাবী (র) যদিও ওয়াহ্ ইন্ন মুনাব্বিহ (র)-এর অনেক পরের লোক, এমনকি তিনি তাওরাত গ্রন্থের একজন পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও বংশতালিকা বিশেষজ্ঞগণ ইমাম বাগাবীর অভিমতকে ঐতিহাসিক দিক দিয়া গ্রহণ করিয়াছেন (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ১২৩)। দ্বিতীয় স্তর ছামূদ হইতে উপরস্থ বংশতালিকা সম্পর্কেও দুইটি অভিমত রহিয়াছে। একটি হইল : ছামূদ ইব্‌ন আমির ইবন ইরম ইব্‌ন সাম ইব্‌ নূহ (আ)। অপরটি হইল: ছামূদ ইব্‌ন আদ ইব্‌ন আউস ইব্‌ন ইরম ইব্‌ন সাম ইব্‌ন নূহ (আ)। দ্বিতীয় অভিমতটিকে ইমাম ছা'লাবী প্রাধান্য দিয়াছেন (আল-আলুসী, রূহুল মাআনী, প্রাগুক্ত)। আল্লামা ইব্‌ন কাছীর সালিহ (আ)-এর বংশতালিকা নিম্নরূপ বর্ণনা করিয়াছেন : সালিহ ইব্‌ন আদ ইব্‌ন মাশিহ ইব্‌ন উবায়দ ইব্‌ন হাদির ইব্‌ন ছামূদ ইব্‌ন আবির ইবন ইরাম ইব্‌ন সাম ইব্‌ন নূহ (আ) (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১/১খ., ১২৩)। সালিহ (আ)-এর বংশতালিকা বিভিন্ন নাম সম্পর্কে বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্ন রূপ পরিলক্ষিত হয় (দ্র. ইব্‌ন কাছীর, বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, আল-কুরতুবী, আল-জামি' লিআহকামিল কুরআন, ৭খ., ২৩৮ পৃ.; আল-আলুসী, রূহুল মাআনী; ইবনুল আছীর, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ১খ., ৬৮ পৃষ্ঠায় বলা হইয়াছে মাশিজ (ماشبع), অন্যান্য গ্রন্থের সহিত ইহার মিল নাই। বুতরুস আল-বুসতানী, দাইরাতুল মা'আরিফ, বৈরূত তা. বি., ৬খ, ৩৩২; হিফজুর রহমান, কাসাসুল কুরআন, ১খ., ১২২; পৃ. ইব্‌ন খালদুন, তারীখ, বৈরুত ১৯৭৯ খৃ., ২খ., ২৩। আল-মাসউদী, মুরূজুয যাহাব; চতুর্থ সংস্করণ মিসর ১৩৮৪ বি., ২খ., ৪৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল-কুরআনে সালিহ ও ছামূদের কথা

📄 আল-কুরআনে সালিহ ও ছামূদের কথা


আল-কুরআনে সালিহ (আ)-এর কথা তিনটি সূরার আটটি স্থানে আসিয়াছে। (আবদুল ওয়াহহাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৯৮-এ বলা হইয়াছে, সালিহ (আ) কথা কুরআনে আসিয়াছে কিন্তু বাস্তবের সাথে ইহার মিল নাই) তাহা হইল নিম্নরূপ:
সূরা | আয়াত নম্বর | মোট
আ'রাফ | ৭৩, ৭৫, ৭৭ | ৩
হৃদ | ৬১-৬২, ৬৬,৮৯ | ৪
শু'আরা | ১৪২ | ১
সর্বমোট ৬টি
ছামূদ গোত্রের কথা নিম্নোক্ত নয়টি সূরায় রহিয়াছে: আরাফ, হৃদ, হিজর, নামল, ফুসসিলাত (হামীম আস-সিজদা), আন-নাজম, আল-কামার, আল-হাক্কা, আল-শাম্স (হিফজুর রহমান, কাসাসুল কুরআন, ১খ., ১২২)। আল-কুরআনুল করীমে কোন সময় স্বতন্ত্রভাবে আবার কোন সময় অন্যান্য গোত্রের সহিত মিলিতভাবে তাহাদের কথা আলোচিত হইয়াছে, তাহারা হইল কওমে নূহ ও কওমে আদ্‌, আসহাবুর রাসস (أَصْحَابُ الرَّسّ), কওমে লূত ও আসহাবুল আয়কা। আদ জাতির সহিত আলোচনা করিবার সময় একটিমাত্র স্থান ব্যতীত সকল স্থানেই তাহাদের কথা পূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। স্থানটি হইল: كَذَّبَتْ ثَمُودُ وَعَادُ بِالْقَارِعَة (সূরা আল-হাক্কা, আয়াত ৪)। আসহাবুর রাসসের সহিত দুইবার আলোচনা করা হইয়াছে। একবার ছামূদের কথা আগে এবং একবার পরে। যেমন وَعَادَاً وَتَمُودًا وَأَصْحَابَ الرَّسُ (সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৩৭)-এবং قَوْمٌ نُوحٍ وَأَصْحَابُ الرُّسُ وَثَمُودُ (সূরা কাফ, আয়াত ১২): কওমে লূত ও আসহাবুল আয়কা-এর সহিত আলোচনার সময় ছামূদের নাম পূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। যেমন: وَثَمُودُ وَقَوْمٌ نُوْطُ وَأَصْحَابُ الأَيْكَة (সূরা সাদ, আয়াত ১৩)। তবে কোন আয়াতেই কওমে নূহের পূর্বে ছামূদের কথা উল্লেখ করা হয় নাই (ডঃ জাওয়াদ আলী, আল-মুফাসসাল ফী তারীখিল আরাব কণবলাল ইসলাম, ১খ., ৩২২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ছামূদ শব্দের আভিধানিক বিশ্লেষণ

📄 ছামূদ শব্দের আভিধানিক বিশ্লেষণ


ثمد আরবী, শব্দের অর্থ হইল স্বল্প পানি। ছামূদ নামকরণের কারণ হইল: আমর ইবনুল আলা হইতে বর্ণিত, পানি কম হইলে বলা হইত ندا ; যেহেতু এই জাতি পানি সংকটে জর্জরিত থাকিত এই কারণে তাহাদেরকে ছামূদ বলা হইত (রূহুল মাআনী, প্রাগুক্ত)। ছামূদ জাতিকে ছামূদ বলা হয় তাহাদের ঊর্ধ্বতন পুরুষ ছামূদের নাম অনুসারে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত)। ছামূদ শব্দটি মুনসারিফ কিনা এই ব্যাপারে মতভেদ রহিয়াছে। আল্লামা কুরতুবী বলেন, শব্দটি গায়র মুনসারিফ। কারণ এই শব্দটি দ্বারা একটি গোত্রের নাম রাখা হইয়াছে। আবু হাতিমের মতে শব্দটি গায়র মুনসারিফ হইবার কারণ হইল: ইহা একটি অনারব শব্দ (عجمی)। এই অভিমতকে ত্রুটিযুক্ত বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন ইমাম নাহহাস। তিনি বলেন, শব্দটি আরবী শব্দ হইতে নির্গত, যাহার অর্থ হইল اءُ لِقَلِيْلُ অর্থাৎ স্বল্প পানি (কুরতুবী, আল-জামে লিআহকামিল কুরআন, বৈরূত তা. বি., ৭খ., ২৩৭)। আল্লামা ছা'আলাবী তাঁহার প্রণীত তাফসীর গ্রন্থে বলেন, জুমহুর উলামা ছামূদ শব্দকে একটি গোত্রের নাম হিসাবে গায়র মুনসারিফ পড়েন। কিন্তু য়াহয়া ইব্‌ন ওয়াছছাব ও আল-আ'মাশ মুনসারিফ হিসাবে পাঠ করেন (ছা'আলাবী, তাফসীর, ২খ., ৩১)। ছামূদ জাতি আদ গোত্রের কিছু কাল পর আরবের উত্তর-পূর্ব অংশে প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়া ছামূদ নামেই খ্যাতি লাভ করিয়াছিল। আরবের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত এই অংশটি মদীনা ও শাম (সিরিয়ার) দেশের মধ্যবর্তী স্থান। প্রাচীন আরববাসীরা ইহাকে হিজ্ব বলিত (আবদুল হক দেহলাবী, তাফসীর হাক্কানী, ২খ., ৪০০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ছামূদ জাতির পরিচয়

📄 ছামূদ জাতির পরিচয়


বিশিষ্ট সাহাবী আবূ যার (রা) হইতে বর্ণিত আছে:
إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ وَارْبَعَةٌ مِّنَ الْعَرَبِ هُودٌ وَشُعَيْبٌ وَصَالِحٌ وَنَبِيُّكَ يَا أَبَا ذَرٍ .
"নবী করীম (স) বলিয়াছেন, চারজন নবী হইলেন আরব বংশোদ্ভূত: হৃদ, শু'আয়ব, সালিহ ও তোমার নবী (মুহাম্মাদ) হে আবূ যারর" (ছা'আলাবী, তাফসীর, ২খ., ৩১-৩২)। আলুসী ছামূদ সম্প্রদায়ের আদি মানব ছামূদ সম্পর্কে বলেন: কথিত আছে, ছামূদ ছিলেন তাসাম ও জাদীসের ভ্রাতা (রূহুল মাআনী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৩)। হিফজুর রহমান বলেন, ছামূদ সম্প্রদায় হইল নূহ (আ)-এর পুত্র সামের বংশধরগণের (সেমিটিক) একটি শাখা। সম্ভবত ইহারা প্রথম আদ জাতির ধ্বংসের পর হযরত হূদ (আ)-এর প্রাণে বাঁচিয়া যাওয়া লোকজন। উহাদেরকে দ্বিতীয় আদ বংশ বলা হয় (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ১২৩)। আরবী অভিধান লিসানুল আরাব ও তাজুল আরূসে উল্লেখ আছে যে, ছামূদ সম্প্রদায় হইল আদ সম্প্রদায়ের অবশিষ্ট লোকদের বংশধর (ইব্‌ন মানজুর, লিসানুল আরাব, ১খ., ৫০; আয-যাবীদী, তাজুল আরূস, ১খ., ৩১২)। জুরজী যায়দান বলেন, ইতিহাসবিদগণের অভিমত হইল, আরবজাতি বড় দুইটি ভাগে বিভক্ত ছিল। একটি হইল আরবে বায়দা, আর অপরটি আরবে বাকিয়্যা। আদ ও ছামূদ জাতি হইল আরবে বায়দা বা ধ্বংসপ্রাপ্ত আরব জাতির অন্তর্ভুক্ত (জুরজী যায়দান, তারীখুত তামাদদুনিল ইসলামী, ১খ., ১৫)। আল-মাসঊদী বলেন, ছামূদ জাতির প্রথম অধিপতি ছিল আবির ইব্‌ন ইরাম। সে দুই শত বৎসর রাজত্ব করিয়াছিল। তাহার পর ক্ষমতায় আরোহণ করে জুনদা ইব্‌ন আমর। সে সর্বসাকুল্যে তিন শত সাতাইশ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিল (আল-মাসউদী, মুরূজুয যাহাব)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00