📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আদ জাতির ধ্বংস

📄 আদ জাতির ধ্বংস


পরিশেষে অকৃতজ্ঞ, বিদ্রোহী, নাফরমান আদ সম্প্রদায়ের অন্তিম সময় উপস্থিত হয়। অন্যায় অপকর্মের শাস্তি শুরু হয়। দেখিতে দেখিতে আদ জাতির বিশাল শান-শওকতপূর্ণ ও বিরাট বিরাট স্তম্ভসমূহ এবং বিরাট উচ্চতাসম্পন্ন অট্টালিকাপূর্ণ বসতিগুলি ধ্বংস করিয়া দেওয়া হয়। প্রথমে এই জাতিকে অনাবৃষ্টি আক্রমণ করে এবং সঙ্গে সঙ্গে দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্যের ফলে তাহারা মারা যাইতে থাকে। অতঃপর চূড়ান্ত পর্যায়ে নিকষ কাল অন্ধকারপূর্ণ প্রচণ্ড তুফান আরম্ভ হয়।, সেই তুফান সাত রাত্র ও আট দিন ধরিয়া চলিতে থাকে এবং কাওমে আদ-এর সবকিছু ধ্বংস করিয়া দেয়। সেইসব শক্তিধর ও মজবুত বাঁধনের মানুষগুলি, যাহারা নিজেদেরকে শক্তি ও সামর্থ্যের অহংকারে মূল্যায়ন করিয়া বলিত : (مَنْ أَشَدُّ مِنَّا قُوَّةً) (আমাদের চাইতে অধিক শক্তিশালী আর কে আছে?) এই গর্বিত ও অহংকারী জাতি নিশ্চিহ্ন হইয়া যায়। তাহাদের বাসগৃহসমূহ ধ্বংস্তূপে পরিণত হইল। বর্তমানে ঐ স্থানে বালির পাহাড় বা টিলা ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না।
পবিত্র কুরআন মানবজাতির উপদেশ গ্রহণের জন্য কাওমে আদ-এর কথা বারবার উল্লেখ করিয়াছে: অতঃপর যখন উহারা উহাদের উপত্যকার দিকে মেঘ আসিতে দেখিল তখন বলিতে লাগিল, 'উহা তো মেঘ, আমাদিগকে বৃষ্টি দান করিবে'। হূদ বলিলেন, 'ইহাই তো তাহা, যাহা তোমরা ত্বরাম্বিত করিতে চাহিয়াছ, ইহাতে রহিয়াছে এক ঝড়-মর্মন্তুদ শাস্তি। আল্লাহ্র নির্দেশে ইহা সমস্ত কিছুকে ধ্বংস করিয়া দিবে'। অতঃপর উহাদের পরিণাম এই হইল যে, উহাদের বসতিগুলি ছাড়া আর কিছুই রহিল না। এইভাবে আমি অপরাধী সম্প্রদায়কে প্রতিফল দিয়া থাকি। আমি উহাদিগকে যে প্রতিষ্ঠা দিয়াছিলাম, তোমাদিগকে তাহা দেই নাই। আমি উহাদিগকে দিয়াছিলাম কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয়; কিন্তু এইগুলি উহাদের কোন কাজে আসে নাই। কেননা উহারা আল্লাহ্র আয়াতসমূহকে অস্বীকার করিয়াছিল। যাহা লইয়া উহারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিত উহাই উহাদিগকে পরিবেষ্টন করিল (দ্র. ৪৬: ২৪-২৬)।
হযরত হুদ (আ) তাঁহার অনুসারী সঙ্গীগণসহ ঐ ভয়াবহ ধ্বংসলীলা হইতে আল্লাহ্র অনুগ্রহে রক্ষা পাইলেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন: "এবং যখন আমার নির্দেশ আসিল তখন আমি হুদ ও তাঁহার সঙ্গে যাহারা ঈমান আনিয়াছিল তাহাদিগকে আমার অনুগ্রহে রক্ষা করিলাম এবং রক্ষা করিলাম তাহাদিগকে কঠিন শাস্তি হইতে" (দ্র. ১১: ৫৮)। আদ সম্প্রদায়ের বিপর্যয় সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন: "এবং নিদর্শন রহিয়াছে আদের ঘটনায়, যখন আমি তাহাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করিয়াছিলাম অকল্যাণকর বায়ু। ইহা যাহা কিছুর উপর দিয়া বহিয়া গিয়াছিল, তাহাকেই চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিয়াছিল" (৫১:৪১-৪২)।
আদ সম্প্রদায়ের উপর কত ভীষণ শাস্তি প্রেরিত হইয়াছিল তাহা আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"আদ সম্প্রদায় সত্য অস্বীকার করিয়াছিল, ফলে কী কঠোর হইয়াছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী। উহাদের উপর আমি প্রেরণ করিয়াছিলাম ঝঞ্ঝা বায়ু নিরবচ্ছিন্ন দুর্ভাগ্যের দিনে। মানুষকে উহা উৎখাত করিয়াছিল উন্মুলিত খর্জুর কাণ্ডের ন্যায়" (৫৪ : ১৮-২০)।
আখিরাতের আযাবের মত দুনিয়ায়ও আযাব দিয়া আল্লাহ মানুষের জন্য নিদর্শন রাখেন। এই সম্পর্কে সূরা হা-মীম-আস-সাজদায় আল্লাহ বলেনঃ "অতঃপর আমি উহাদিগকে পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করাইবার জন্য উহাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করিয়াছিলাম ঝঞ্ঝাবায়ু অশুভ দিনে। আখিরাতের শাস্তি তো অধিকতর লাঞ্ছনাদায়ক এবং উহাদিগকে সাহায্য করা হইবে না" (৪১ : ১৬)।
সূরা আল-হাক্কায় কাওমে আদ-এর ধ্বংসের চিত্র নিম্নোক্তভাবে অংকন করা হইয়াছে : "আর আদ সম্প্রদায়, উহাদিগকে ধ্বংস করা হইয়াছিল এক প্রচণ্ড ঝঞ্ঝা বায়ু দ্বারা, যাহা তিনি উহাদের উপর প্রবাহিত করিয়াছিলেন সপ্ত রাত্রি ও অষ্ট দিবস বিরামহীনভাবে। তখন তুমি উক্ত সম্প্রদায়কে দেখিতে উহারা সেথায় লুটাইয়া পড়িয়া আছে সারশূন্য খর্জুর কাণ্ডের ন্যায়। অতঃপর উহাদের কাহাকেও তুমি বিদ্যমান দেখিতে পাও কি” (৬৯ : ৬-৮)?
হযরত হূদ (আ) ও তাঁহার অনুসারীগণ আল্লাহর রহমতে রক্ষা পান। মূর্তিপূজকদের কেহই বাঁচে নাই। সূরা আল-আ'রাফে এই সম্পর্কে আল্লাহ বলেনঃ "অতঃপর আমি তাহাকে ও তাহার সঙ্গীদিগকে আমার অনুগ্রহে উদ্ধার করিয়াছিলাম; আর আমার নিদর্শনকে যাহারা অস্বীকার করিয়াছিল এবং যাহারা মুমিন ছিল না তাহাদিগকে নির্মূল করিয়াছিলাম" (৭:৭২)।
আদ জাতির উপর আযাব আসার মুহূর্তে সংঘটিত একটি অভিনব ঘটনার বিবরণ ইব্‌ন কাছীর উল্লেখ করেন। যখন কাওমে আদ তাহাদের কুফরীর উপর অটল থাকে এবং হযরত হূদ (আ)-এর কথা অমান্য করে, তখন আল্লাহ তা'আলা তিন বৎসর পর্যন্ত তাহাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ বন্ধ রাখেন। ফলে আদ জাতি দুর্ভিক্ষ কবলিত হয় এবং তাহাদের মধ্যে হাহাকার শুরু হইয়া যায়। কা'বা শরীফ ঐ যুগেও দু'আ কবুলের জন্য বিখ্যাত ছিল। সুতরাং এই প্রত্যাশায় আদ সম্প্রদায়ের ৭০জন লোকের একটি প্রতিনিধি দল দু'আ করার জন্য কা'বা শরীফের দিকে রওয়ানা হয়। মক্কা মুআজ্জামায় ঐ সময়ে আমালিকা সম্প্রদায়ের একটি পরিবার অবস্থান করিতেছিল। তাহাদের সর্দার মুআবিয়া ইব্‌ন বাক্‌র-এর মাতা ছিল আদ সম্প্রদায়ের মেয়ে। আদ-এর প্রতিনিধি দলের লোকেরা এই আত্মীয়তার সুবাদে আমালিকার সর্দারের মেহমান হয়। তিনি তাহাদের ভালভাবে মেহমানদারী করেন। মদের সঙ্গে সঙ্গে দু'টি দাসীও মনোরঞ্জনের জন্য নিয়োজিত হয়। তাহারা যে উদ্দেশ্যে আসিয়াছিল তাহা ভুলিয়া যায় এবং আরাম-আয়েশ ও আনন্দ-স্ফূর্তিতে মগ্ন হয়। অনেক দিন অতিবাহিত হওয়ার পর মেযবানের মনে পড়ে যে, কাওমে আদ-এর কারণে যেন আবার তাহার গোত্রকে আল্লাহর গযবের শিকার হইতে না হয়। কিন্তু তিনি মেহমানদেরকে ফিরিয়া যাওয়ার জন্য বলিতে পারিতেছিলেন না। পরিশেষে তিনি কতিপয় কবিতা রচনা করিয়া দাসীদেরকে গাহিবার জন্য নির্দেশ দেন। এই কবিতায় কাওমে আদ-এর মুসিবতের কথা উল্লেখ ছিল। এই কবিতা শুনিয়া আদ-এর প্রতিনিধি দলের সদস্যদের এই স্থানে আগমনের উদ্দেশ্যের কথা স্মরণ হয়। অবশেষে তাহারা কা'বা শরীফে পৌঁছে এবং আল্লাহর নিকট কাওমে আদ-এর উপর আপতিত অনাবৃষ্টি দূর হওয়ার জন্য দু'আ করে। এই দু'আর ফলে আসমানে তিন রং-এর মেঘ প্রকাশিত হয়, যেমন কালো, সাদা ও লাল। অতঃপর আসমান হইতে একটি আওয়াজ আসে, তোমরা এই তিনটি মেঘের টুকরা হইতে যে কোন একটি নির্বাচন করিয়া লও। 'আদ মুখপাত্র কালো মেঘ পছন্দ করিল। কেননা তাহাদের ধারণায় উহার মধ্যে পানি বেশী ছিল। ইহার পর আসমান হইতে পুনরায় আওয়াজ আসে, তোমরা ধ্বংসকারী মেঘ পছন্দ করিয়াছ, যাহা সব কিছু তছনছ করিয়া দিবে।
অবশেষে এই কালো মেঘ আদ জাতির বসতির উপর প্রেরণ করা হয়, যাহা আল্লাহর আযাব হিসাবে তাহাদের উপর আট দিন ও সাত রাত্রি ধরিয়া বৃষ্টি বর্ষণ করিতে থাকে এবং সমগ্র এলাকা ধ্বংস করিয়া দেয়। কেবল হযরত হূদ (আ) ও তাঁহার সাথিগণ রক্ষা পান। ঐ সময়ে তাহারা একটি ঘরে নিরাপদে বসিয়াছিলেন (তাফসীর ইবন কাছীর, ২খ, ২২৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত হূদ (আ)-এর শেষ জীবন ও ইনতিকাল

📄 হযরত হূদ (আ)-এর শেষ জীবন ও ইনতিকাল


কাওমে 'আদ-এর ধ্বংসের পর হযরত হূদ (আ) হাদরামাওতের দিকে চলিয়া যান এবং অপর এক সূত্রমতে অবশিষ্ট জীবন তিনি ঐ স্থানেই অতিবাহিত করেন। ইনতিকালের পর ঐ স্থানেই তাঁহাকে দাফন করা হয়। হাফেজ ইব্‌ন কাছীরের তাফসীরে ইবন ইসহাকের রিওয়ায়াতকৃত হযরত আলী (রা)-র হাদীছে বলা হয় যে, তিনি হাদরামাওতের এক ব্যক্তিকে বলেন, তুমি কি হাদরামাওতের অমুক স্থানে লাল মাটির একটি টিলা দেখিয়াছ, যাহার উপর কুল ও কাঁটাযুক্ত গাছ রহিয়াছে? হাদরামী বলেন, হাঁ, ঐ স্থানটি সম্পূর্ণ এমনই। হযরত আলী (রা) বলেন, ঐ স্থানে হযরত হূদ (আ)-এর কবর রহিয়াছে। কাহারও মতে তাঁহার কবর দামিশকের জামে মসজিদের কিবলার দিকস্থ দেওয়ালের পাশে অবস্থিত।
কাসাসুল আম্বিয়ার লেখক আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার লিখেন যে, হাদরামাওতের বাসিন্দাদের বক্তব্য যুক্তিযুক্ত। কেননা আদ জাতির আবাসভূমি হাদরামাওতের সঙ্গে মিলিত, ফিলিস্তীনের সঙ্গে নহে (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৫৩)।
হযরত হূদ (আ)-এর মাযার নামে হাদ্রামাওত অঞ্চলের ক্বিম নামক স্থানের পূর্বদিকে একটি যিয়ারতগাহ অদ্যাবধি বিদ্যমান (আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী, কুরআনুল হাকীম, পৃ. ৪৬৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত হূদ (আ)-এর সন্তান-সন্তুতি

📄 হযরত হূদ (আ)-এর সন্তান-সন্তুতি


হযরত হূদ (আ)-এর দুই পুত্রের নাম উল্লেখ করা হইয়াছে। একজনের নাম পেলগ (Peleg) এবং অপরজনের নাম য়াকতান (Joktan)। য়াকতানকে আরবরা কাহতান বলে। বনী কাহতান তাঁহারই বংশধর (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ১খ., পৃ. ১৩৬; দ্র. বাইবেল, আদিপুস্তক, ১১: ১৪, পৃ. ১৩)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00