📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত হূদ (আ)-এর কর্মজীবন বা দাওয়াতী জীবন

📄 হযরত হূদ (আ)-এর কর্মজীবন বা দাওয়াতী জীবন


আল্লাহ তা'আলা হযরত হূদ (আ)-কে পৃথিবীর সবচাইতে শক্তিশালী, অহংকারী, জালেম, আল্লাহর নাফরমান মূর্তিপূজক আদ জাতির মধ্যে প্রেরণ করেন। আদ জাতি যখন তাহাদের শক্তিমত্তায় উন্মত্ত হইয়া আরব ও তৎপার্শ্ববর্তী এলাকায় লুটপাট, অসৎ কার্যকলাপ, ঝগড়া-ফাসাদ ও বিশৃঙ্খলায় লিপ্ত হইয়া পড়ে, তখন হৃদ (আ) তাহাদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত অনুগ্রহসমূহের বর্ণনা দানপূর্বক বলেন, হে আদ জাতি! আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে তাঁহার নিয়ামতের দ্বারা ভরপুর করিয়া দিয়াছেন। তোমরা সবুজ ও সতেজ অঞ্চলের মালিক। ধন-সম্পদ, বাগান, ঝর্ণা, গবাদি পশু, মোটকথা সকল জীবনোপকরণ তোমাদের জন্য সহজলভ্য। কওমে নূহের পর আল্লাহ তোমাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছেন। তাই বলিয়া ইহার অর্থ এই নহে যে, তোমরা আল্লাহর যমীনে অহংকার করিবে, দুর্বলের উপর জুলুম করিবে, মানুষের অধিকার ছিনাইয়া নিবে, নিজেদের শক্তি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করিবে, ভাল ও মন্দের মধ্যে কোন পার্থক্য করিবে না এবং তোমরা এইসব অন্যায় কেবল এই মনে করিয়া করিতেছ যে, আল্লাহ্র যমীনের উপর তোমাদের জওয়াবদিহি নেওয়ার মত আর কেহ নাই। তোমরা যদি উপরিউক্ত সকল কার্যকলাপ এবং পাপাচার পরিত্যাগপূর্বক তোমাদের চরিত্র সংশোধন কর, আল্লাহ্র নিকট পাপ মার্জনা চাহিয়া নিজেদেরকে তাঁহার মুখাপেক্ষী কর, তাহা হইলে তিনি (আল্লাহ) তোমাদের শক্তিমত্তা ও সচ্ছলতায় আরও উন্নতি দান করিবেন এবং তোমরা পরিত্রাণ লাভ করিবে। কিন্তু তোমরা যদি নিজেদেরকে সংশোধন না কর, তাহা হইলে স্মরণ রাখিও যে, আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করিয়াছেন এবং এইসব অনুগ্রহরাজি দ্বারা ভূষিত করিয়াছেন, তিনি তোমাদের বাদ দিয়া অন্য আর এক জাতিকে রাজত্ব দান করিবেন। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে হযরত হূদ (আ)-এর দাওয়াত ও তা'লীমের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে :
وَيُقَوْمِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا وَيَزِدْكُمْ قُوَّةً إِلَى قُوَّتِكُمْ وَلَا تَتَوَلَّوا مُجْرِمِينَ .
"এবং হে আমার কওম! তোমাদের পালনকর্তার নিকট তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁহার দিকেই ফিরিয়া আস। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিধারা প্রেরণ করিবেন এবং তোমাদের শক্তির উপর শক্তি বৃদ্ধি করিবেন, তোমরা অপরাধীর মত বিমুখ হইও না" (১১:৫২)।
আদ জাতি তাহাদের বসবাসের জন্য বিরাট বিরাট অট্টালিকা নির্মাণ করিত এবং তাহারা মনে করিত যে, তাহারা চিরকাল দুনিয়াতে থাকিতে পারিবে। তাহারা মানুষের প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করিত এবং দুর্বলের উপর জুলুম করিত। তাহাদের এহেন কার্যকলাপের উল্লেখ করিয়া আল্লাহ বলেনঃ
وَاذْكُرُوا إِذْ جَعَلَكُمْ خُلَفَاءَ مِنْ بَعْدِ قَوْمٍ نُوحٍ وَزَادَكُمْ فِي الْخَلْقِ بَسْطَةً فَاذْكُرُوا أَلَاءَ اللَّهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ .
"তোমরা প্রতিটি উচ্চ স্থানে নিরর্থক স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করিতেছ? এবং বৃহৎ অট্টালিকা নির্মাণ করিয়াছ, যেন তোমরা চিরকাল এই অট্টালিকায় থাকিবে। যখন তোমরা আঘাত হান, তখন জালেম ও নিষ্ঠুরের মত আঘাত হান। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। ভয় কর তাঁহাকে, যিনি তোমাদেরকে সেইসব বস্তু দিয়াছেন, যাহা তোমরা জ্বান। তিনি তোমাদেরকে দিয়াছেন চতুষ্পদ জন্তু ও সন্তান-সন্তুতি এবং উদ্যান ও ঝর্ণা" (২৬ঃ ১২৮-১৩৪)।
আদ জাতির মধ্যে অন্যায়-অপকর্ম এমনভাবে প্রোথিত ছিল এবং মূর্তিপূজা তাহাদের চিন্তা- চেতনায় ও অস্থি-মজ্জায় এমনভাবে বাসা বাঁধিয়াছিল যে, তাহাদের উপর হযরত হূদ (আ)-এর ওয়াজ-নসীহত কোন প্রভাব ফেলিতে পারে নাই। তাহারা হযরত হূদ (আ)-এর পয়গাম শ্রবণে আগ্রহী হয় নাই, বরং গর্ব ও অহংকার বশত মিথ্যার অপবাদ দিয়া তাঁহার দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে। পবিত্র কুরআনে তাহাদের বক্তব্য নিম্নোক্তভাবে উক্ত হইয়াছেঃ "আর আদ সম্প্রদায়ের ব্যাপার এই যে, তাহারা পৃথিবীতে অযথা অহংকার করিত এবং বলিত, আমাদের অপেক্ষা অধিক শক্তিধর কে আছে? তাহারা কি লক্ষ্য করে নাই যে, যে আল্লাহ তাহাদেরকে সৃষ্টি করিয়াছেন, তিনি তাহাদের অপেক্ষা শক্তিধর? বস্তুত তাহারা আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করিত” (৪১: ১৫)।
হযরত হূদ (আ) তাঁহার কওমকে উদ্দেশ্য করিয়া বলেন, হে আমার সম্প্রদায়! ফেরেশতাদেরকে রাসূল হিসাবে পাঠানো উচিত ছিল, এই মর্মে তোমাদের বক্তব্য তোমাদের মূর্খতারই পরিচায়ক। তোমাদের কওমের কাহারও উপর আল্লাহ্ পয়গাম অবতীর্ণ হওয়ায় আশ্চর্য হওয়া উচিত নহে। কেননা প্রথম হইতেই আল্লাহ্ এই বিধান চলিয়া আসিতেছে। তিনি (আল্লাহ) মানবজাতির হিদায়াতের জন্য তাহাদের মধ্য হইতেই কোন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করিয়া তাঁহার রাসূল বানাইয়া প্রেরণ করেন এবং ঐ রাসূলের মাধ্যমে সকল বান্দার নিকট তাঁহার আহকাম পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। স্বভাবসিদ্ধ নিয়ম এই যে, কোন কওমের হিদায়াতের জন্য এমন ব্যক্তিকে নির্বাচন করা উচিত, যিনি সেই কওমেরই একজন হইবেন, তাহাদের ভাষায় কথা বলিবেন, তাহাদের চরিত্র-অভ্যাস এবং সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে ভালভাবে জানেন, তাহাদের মতই জীবনযাপন করেন এবং কওমের সকলেই তাঁহাকে চিনে।
হযরত হূদ (আ)-এর উপদেশ সত্ত্বেও তাহারা তাহাদের বাপ-দাদার ধর্মে অটল থাকে। তাহরা এই কথা বলিয়া তাঁহাকে হাসি-ঠাট্টা করে যে, যেহেতু হযরত হূদ (আ) আমাদের দেবতাদের মন্দ বলেন, সেই হেতু দেবতারা তাঁহাকে কিছু করিয়াছে অর্থাৎ তাঁহার ক্ষতি করিয়াছে। এই সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে: "তাহারা (কওমে আদ) বলিল, হে হূদ! তুমি আমাদের কাছে কোন প্রমাণ নিয়া আস নাই, আমরা তোমার কথায় আমাদের দেব-দেবীদের বর্জন করিতে পারি না, আর আমরা তোমার প্রতি ঈমান আনয়নকারীও নহি। আমরা তো ইহাই বলি যে, আমাদের কোন দেবতা তোমার উপর শোচনীয় ভূত চাপাইয়া দিয়াছে। সে বলিল, আমি আল্লাহকে সাক্ষী করিতেছি এবং তোমরাও সাক্ষী থাক যে, আমার কোন সম্পর্ক নাই তাহাদের সঙ্গে, যাহাদেরকে তোমরা শরীক করিতেছ" (১১: ৫৩-৫৪)।
সূরা আল-আ'রাফ-এ কওমে হৃদ ও হযরত হূদ (আ)-এর কথোপকথনের বিষয় পরিষ্কারভাবে উক্ত হইয়াছে: "তাহার সম্প্রদায়ের (আদ) সর্দাররা যাহারা কুফরী করিয়াছিল, বলিল: আমরা তোমাকে নির্বোধ দেখিতে পাইতেছি এবং আমরা তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করি। সে বলিল: হে আমার সম্প্রদায়! আমি মোটেই নির্বোধ নহি, বরং আমি বিশ্বপ্রতিপালকের রাসূল। আমি তোমাদেরকে আমার প্রতিপালকের পয়গাম পৌঁছাই এবং আমি তোমাদের বিশ্বস্ত হিতাকাঙ্খী। তোমরা কি বিস্মিত হইতেছ যে, তোমাদের মধ্য হইতেই একজনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে উপদেশ আসিয়াছে, যাহাতে তিনি তোমাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করেন। তোমরা স্মরণ কর, যখন আল্লাহ তোমাদেরকে কাওমে নূহের পর সর্দার করিয়াছেন এবং তোমাদের দেহের বিস্তৃতি বেশী করিয়াছেন। তোমরা আল্লাহর নিয়ামতসমূহ স্মরণ কর যাহাতে তোমাদের মঙ্গল হয়। তাহারা বলিল, তুমি কি আমাদের কাছে এইজন্য আসিয়াছ যে, আমরা এক আল্লাহ্ ইবাদত করি এবং আমাদের বাপ-দাদা যাহাদের পূজা করিত, তাহাদেরকে ছাড়িয়া দেই? অতএব নিয়া আস আমাদের কাছে যাহার দ্বারা আমাদেরকে ভয় দেখাইতেছ, যদি তুমি সত্যবাদী হও” (৭ঃ ৬৬-৭০)।
হযরত হূদ (আ) তাঁহার কাওমের লোকদের সন্দেহ দূর করার জন্য পরিষ্কার ভাষায় বলেন, তোমরা এমন মনে করিও না যে, আমি কোন পদ-পদবী অথবা সম্পদ ও প্রাচুর্যের লোভ-লালসায় এইসব কথা শিক্ষা দিতেছি। এমন নহে, বরং আমি তো আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত, কেবল আল্লাহ্ পয়গাম তোমাদেরকে শুনাই এবং কোন লোভ-লালসা ছাড়াই আমার উপর অর্পিত এই অপরিহার্য দায়িত্ব পালন করিয়া যাইতেছি। তোমাদের নিকট হইতে কোন জিনিস প্রতিদান হিসাবে চাহি না। আমি তো কেবল আমার আল্লাহ্র নিকটই প্রতিদানের প্রত্যাশা করি।
হযরত হূদ (আ)-এর এই আহ্বানের পরেও আদ জাতি প্রচণ্ডভাবে তাহাদের বিরোধিতা অব্যাহত রাখে এবং তাহারা হৃদ (আ)-এর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে। এই সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে : "তাহারা বলিল, তুমি উপদেশ দাও অথবা উপদেশ নাই দাও, উভয়ই আমাদের জন্য সমান। এইসব কথাবার্তা পূর্ববর্তী লোকদের অভ্যাস বৈ কিছু নহে। আমরা শাস্তিপ্রাপ্ত হইব না" (২৬: ১৩৬-৮)
কাওমের অহংকারী লোকেরা বলিতে থাকে, আপনি আমাদের আযাবের যে ভয় দেখান সেই আযাব নিয়া আসুন। হৃদ (আ) বলেন, আযাব নিয়া আসা তো কেবল আল্লাহ্র ইচ্ছাধীন। আমি তো আল্লাহ্ দূতমাত্র। আমাকে যে পয়গাম পৌঁছানোর দায়িত্ব দেওয়া হইয়াছে, তাহা আমি শুধু পৌঁছাইয়া থাকি।
হযরত হূদ (আ)-এর এই আহ্বানের প্রত্যুত্তরে আদ-এর লোকেরা যাহা বলে, পবিত্র কুরআনে নিম্নোক্ত ভাষায় তাহা বর্ণনা করা হইয়াছে : "তাহারা বলিল, তুমি কি আমাদেরকে আমাদের দেব-দেবী হইতে নিবৃত্ত করিতে আগমন করিয়াছ? তুমি সত্যবাদী হইলে আমাদেরকে যাহার ভয় দেখাইতেছ তাহা নিয়া আস। সে বলিল, ইহার জ্ঞান তো আল্লাহর কাছেই রহিয়াছে। আমি যে বিষয়সহ প্রেরিত হইয়াছি, কেবল তাহাই তোমাদের কাছে পৌঁছাই। কিন্তু আমি দেখিতেছি, তোমরা এক মূর্খ সম্প্রদায়” (৪৬: ২২-২৩)।
হযরত হূদ (আ)-এর জওয়াবের পরিপ্রেক্ষিতে তাহাদের বক্তব্য পবিত্র কুরআনে এইভাবে উক্ত হইয়াছে : "তাহারা বলিল, হে হৃদ! তুমি আমাদের নিকট কোন প্রমাণ নিয়া আস নাই। আমরা তোমার কথায় আমাদের দেব-দেবীদের বর্জন করিতে পারি না এবং আমরা তোমাকে বিশ্বাস করি না" (১১:৫৩)।
হৃদ (আ) আদ-এর লোকদের এই চরম কথার যে জওয়াব দেন তাহা পবিত্র কুরআনে এইভাবে বর্ণনা করা হইয়াছে : "সে বলিল, তোমাদের প্রতিপালকের শাস্তি ও ক্রোধ তো তোমাদের জন্য নির্ধারিত হইয়াই আছে; তবে কি তোমরা আমার সহিত বিতর্কে লিপ্ত হইতে চাহ এমন কতকগুলি নাম সম্বন্ধে যাহা তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষগণ সৃষ্টি করিয়াছ এবং যে সম্বন্ধে আল্লাহ কোন সনদ পাঠান নাই? সুতরাং তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমিও তোমাদের সহিত প্রতীক্ষা করিতেছি" (৭: ৭১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আদ জাতির ধ্বংস

📄 আদ জাতির ধ্বংস


পরিশেষে অকৃতজ্ঞ, বিদ্রোহী, নাফরমান আদ সম্প্রদায়ের অন্তিম সময় উপস্থিত হয়। অন্যায় অপকর্মের শাস্তি শুরু হয়। দেখিতে দেখিতে আদ জাতির বিশাল শান-শওকতপূর্ণ ও বিরাট বিরাট স্তম্ভসমূহ এবং বিরাট উচ্চতাসম্পন্ন অট্টালিকাপূর্ণ বসতিগুলি ধ্বংস করিয়া দেওয়া হয়। প্রথমে এই জাতিকে অনাবৃষ্টি আক্রমণ করে এবং সঙ্গে সঙ্গে দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্যের ফলে তাহারা মারা যাইতে থাকে। অতঃপর চূড়ান্ত পর্যায়ে নিকষ কাল অন্ধকারপূর্ণ প্রচণ্ড তুফান আরম্ভ হয়।, সেই তুফান সাত রাত্র ও আট দিন ধরিয়া চলিতে থাকে এবং কাওমে আদ-এর সবকিছু ধ্বংস করিয়া দেয়। সেইসব শক্তিধর ও মজবুত বাঁধনের মানুষগুলি, যাহারা নিজেদেরকে শক্তি ও সামর্থ্যের অহংকারে মূল্যায়ন করিয়া বলিত : (مَنْ أَشَدُّ مِنَّا قُوَّةً) (আমাদের চাইতে অধিক শক্তিশালী আর কে আছে?) এই গর্বিত ও অহংকারী জাতি নিশ্চিহ্ন হইয়া যায়। তাহাদের বাসগৃহসমূহ ধ্বংস্তূপে পরিণত হইল। বর্তমানে ঐ স্থানে বালির পাহাড় বা টিলা ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না।
পবিত্র কুরআন মানবজাতির উপদেশ গ্রহণের জন্য কাওমে আদ-এর কথা বারবার উল্লেখ করিয়াছে: অতঃপর যখন উহারা উহাদের উপত্যকার দিকে মেঘ আসিতে দেখিল তখন বলিতে লাগিল, 'উহা তো মেঘ, আমাদিগকে বৃষ্টি দান করিবে'। হূদ বলিলেন, 'ইহাই তো তাহা, যাহা তোমরা ত্বরাম্বিত করিতে চাহিয়াছ, ইহাতে রহিয়াছে এক ঝড়-মর্মন্তুদ শাস্তি। আল্লাহ্র নির্দেশে ইহা সমস্ত কিছুকে ধ্বংস করিয়া দিবে'। অতঃপর উহাদের পরিণাম এই হইল যে, উহাদের বসতিগুলি ছাড়া আর কিছুই রহিল না। এইভাবে আমি অপরাধী সম্প্রদায়কে প্রতিফল দিয়া থাকি। আমি উহাদিগকে যে প্রতিষ্ঠা দিয়াছিলাম, তোমাদিগকে তাহা দেই নাই। আমি উহাদিগকে দিয়াছিলাম কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয়; কিন্তু এইগুলি উহাদের কোন কাজে আসে নাই। কেননা উহারা আল্লাহ্র আয়াতসমূহকে অস্বীকার করিয়াছিল। যাহা লইয়া উহারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিত উহাই উহাদিগকে পরিবেষ্টন করিল (দ্র. ৪৬: ২৪-২৬)।
হযরত হুদ (আ) তাঁহার অনুসারী সঙ্গীগণসহ ঐ ভয়াবহ ধ্বংসলীলা হইতে আল্লাহ্র অনুগ্রহে রক্ষা পাইলেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন: "এবং যখন আমার নির্দেশ আসিল তখন আমি হুদ ও তাঁহার সঙ্গে যাহারা ঈমান আনিয়াছিল তাহাদিগকে আমার অনুগ্রহে রক্ষা করিলাম এবং রক্ষা করিলাম তাহাদিগকে কঠিন শাস্তি হইতে" (দ্র. ১১: ৫৮)। আদ সম্প্রদায়ের বিপর্যয় সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন: "এবং নিদর্শন রহিয়াছে আদের ঘটনায়, যখন আমি তাহাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করিয়াছিলাম অকল্যাণকর বায়ু। ইহা যাহা কিছুর উপর দিয়া বহিয়া গিয়াছিল, তাহাকেই চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিয়াছিল" (৫১:৪১-৪২)।
আদ সম্প্রদায়ের উপর কত ভীষণ শাস্তি প্রেরিত হইয়াছিল তাহা আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"আদ সম্প্রদায় সত্য অস্বীকার করিয়াছিল, ফলে কী কঠোর হইয়াছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী। উহাদের উপর আমি প্রেরণ করিয়াছিলাম ঝঞ্ঝা বায়ু নিরবচ্ছিন্ন দুর্ভাগ্যের দিনে। মানুষকে উহা উৎখাত করিয়াছিল উন্মুলিত খর্জুর কাণ্ডের ন্যায়" (৫৪ : ১৮-২০)।
আখিরাতের আযাবের মত দুনিয়ায়ও আযাব দিয়া আল্লাহ মানুষের জন্য নিদর্শন রাখেন। এই সম্পর্কে সূরা হা-মীম-আস-সাজদায় আল্লাহ বলেনঃ "অতঃপর আমি উহাদিগকে পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করাইবার জন্য উহাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করিয়াছিলাম ঝঞ্ঝাবায়ু অশুভ দিনে। আখিরাতের শাস্তি তো অধিকতর লাঞ্ছনাদায়ক এবং উহাদিগকে সাহায্য করা হইবে না" (৪১ : ১৬)।
সূরা আল-হাক্কায় কাওমে আদ-এর ধ্বংসের চিত্র নিম্নোক্তভাবে অংকন করা হইয়াছে : "আর আদ সম্প্রদায়, উহাদিগকে ধ্বংস করা হইয়াছিল এক প্রচণ্ড ঝঞ্ঝা বায়ু দ্বারা, যাহা তিনি উহাদের উপর প্রবাহিত করিয়াছিলেন সপ্ত রাত্রি ও অষ্ট দিবস বিরামহীনভাবে। তখন তুমি উক্ত সম্প্রদায়কে দেখিতে উহারা সেথায় লুটাইয়া পড়িয়া আছে সারশূন্য খর্জুর কাণ্ডের ন্যায়। অতঃপর উহাদের কাহাকেও তুমি বিদ্যমান দেখিতে পাও কি” (৬৯ : ৬-৮)?
হযরত হূদ (আ) ও তাঁহার অনুসারীগণ আল্লাহর রহমতে রক্ষা পান। মূর্তিপূজকদের কেহই বাঁচে নাই। সূরা আল-আ'রাফে এই সম্পর্কে আল্লাহ বলেনঃ "অতঃপর আমি তাহাকে ও তাহার সঙ্গীদিগকে আমার অনুগ্রহে উদ্ধার করিয়াছিলাম; আর আমার নিদর্শনকে যাহারা অস্বীকার করিয়াছিল এবং যাহারা মুমিন ছিল না তাহাদিগকে নির্মূল করিয়াছিলাম" (৭:৭২)।
আদ জাতির উপর আযাব আসার মুহূর্তে সংঘটিত একটি অভিনব ঘটনার বিবরণ ইব্‌ন কাছীর উল্লেখ করেন। যখন কাওমে আদ তাহাদের কুফরীর উপর অটল থাকে এবং হযরত হূদ (আ)-এর কথা অমান্য করে, তখন আল্লাহ তা'আলা তিন বৎসর পর্যন্ত তাহাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ বন্ধ রাখেন। ফলে আদ জাতি দুর্ভিক্ষ কবলিত হয় এবং তাহাদের মধ্যে হাহাকার শুরু হইয়া যায়। কা'বা শরীফ ঐ যুগেও দু'আ কবুলের জন্য বিখ্যাত ছিল। সুতরাং এই প্রত্যাশায় আদ সম্প্রদায়ের ৭০জন লোকের একটি প্রতিনিধি দল দু'আ করার জন্য কা'বা শরীফের দিকে রওয়ানা হয়। মক্কা মুআজ্জামায় ঐ সময়ে আমালিকা সম্প্রদায়ের একটি পরিবার অবস্থান করিতেছিল। তাহাদের সর্দার মুআবিয়া ইব্‌ন বাক্‌র-এর মাতা ছিল আদ সম্প্রদায়ের মেয়ে। আদ-এর প্রতিনিধি দলের লোকেরা এই আত্মীয়তার সুবাদে আমালিকার সর্দারের মেহমান হয়। তিনি তাহাদের ভালভাবে মেহমানদারী করেন। মদের সঙ্গে সঙ্গে দু'টি দাসীও মনোরঞ্জনের জন্য নিয়োজিত হয়। তাহারা যে উদ্দেশ্যে আসিয়াছিল তাহা ভুলিয়া যায় এবং আরাম-আয়েশ ও আনন্দ-স্ফূর্তিতে মগ্ন হয়। অনেক দিন অতিবাহিত হওয়ার পর মেযবানের মনে পড়ে যে, কাওমে আদ-এর কারণে যেন আবার তাহার গোত্রকে আল্লাহর গযবের শিকার হইতে না হয়। কিন্তু তিনি মেহমানদেরকে ফিরিয়া যাওয়ার জন্য বলিতে পারিতেছিলেন না। পরিশেষে তিনি কতিপয় কবিতা রচনা করিয়া দাসীদেরকে গাহিবার জন্য নির্দেশ দেন। এই কবিতায় কাওমে আদ-এর মুসিবতের কথা উল্লেখ ছিল। এই কবিতা শুনিয়া আদ-এর প্রতিনিধি দলের সদস্যদের এই স্থানে আগমনের উদ্দেশ্যের কথা স্মরণ হয়। অবশেষে তাহারা কা'বা শরীফে পৌঁছে এবং আল্লাহর নিকট কাওমে আদ-এর উপর আপতিত অনাবৃষ্টি দূর হওয়ার জন্য দু'আ করে। এই দু'আর ফলে আসমানে তিন রং-এর মেঘ প্রকাশিত হয়, যেমন কালো, সাদা ও লাল। অতঃপর আসমান হইতে একটি আওয়াজ আসে, তোমরা এই তিনটি মেঘের টুকরা হইতে যে কোন একটি নির্বাচন করিয়া লও। 'আদ মুখপাত্র কালো মেঘ পছন্দ করিল। কেননা তাহাদের ধারণায় উহার মধ্যে পানি বেশী ছিল। ইহার পর আসমান হইতে পুনরায় আওয়াজ আসে, তোমরা ধ্বংসকারী মেঘ পছন্দ করিয়াছ, যাহা সব কিছু তছনছ করিয়া দিবে।
অবশেষে এই কালো মেঘ আদ জাতির বসতির উপর প্রেরণ করা হয়, যাহা আল্লাহর আযাব হিসাবে তাহাদের উপর আট দিন ও সাত রাত্রি ধরিয়া বৃষ্টি বর্ষণ করিতে থাকে এবং সমগ্র এলাকা ধ্বংস করিয়া দেয়। কেবল হযরত হূদ (আ) ও তাঁহার সাথিগণ রক্ষা পান। ঐ সময়ে তাহারা একটি ঘরে নিরাপদে বসিয়াছিলেন (তাফসীর ইবন কাছীর, ২খ, ২২৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত হূদ (আ)-এর শেষ জীবন ও ইনতিকাল

📄 হযরত হূদ (আ)-এর শেষ জীবন ও ইনতিকাল


কাওমে 'আদ-এর ধ্বংসের পর হযরত হূদ (আ) হাদরামাওতের দিকে চলিয়া যান এবং অপর এক সূত্রমতে অবশিষ্ট জীবন তিনি ঐ স্থানেই অতিবাহিত করেন। ইনতিকালের পর ঐ স্থানেই তাঁহাকে দাফন করা হয়। হাফেজ ইব্‌ন কাছীরের তাফসীরে ইবন ইসহাকের রিওয়ায়াতকৃত হযরত আলী (রা)-র হাদীছে বলা হয় যে, তিনি হাদরামাওতের এক ব্যক্তিকে বলেন, তুমি কি হাদরামাওতের অমুক স্থানে লাল মাটির একটি টিলা দেখিয়াছ, যাহার উপর কুল ও কাঁটাযুক্ত গাছ রহিয়াছে? হাদরামী বলেন, হাঁ, ঐ স্থানটি সম্পূর্ণ এমনই। হযরত আলী (রা) বলেন, ঐ স্থানে হযরত হূদ (আ)-এর কবর রহিয়াছে। কাহারও মতে তাঁহার কবর দামিশকের জামে মসজিদের কিবলার দিকস্থ দেওয়ালের পাশে অবস্থিত।
কাসাসুল আম্বিয়ার লেখক আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার লিখেন যে, হাদরামাওতের বাসিন্দাদের বক্তব্য যুক্তিযুক্ত। কেননা আদ জাতির আবাসভূমি হাদরামাওতের সঙ্গে মিলিত, ফিলিস্তীনের সঙ্গে নহে (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৫৩)।
হযরত হূদ (আ)-এর মাযার নামে হাদ্রামাওত অঞ্চলের ক্বিম নামক স্থানের পূর্বদিকে একটি যিয়ারতগাহ অদ্যাবধি বিদ্যমান (আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী, কুরআনুল হাকীম, পৃ. ৪৬৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত হূদ (আ)-এর সন্তান-সন্তুতি

📄 হযরত হূদ (আ)-এর সন্তান-সন্তুতি


হযরত হূদ (আ)-এর দুই পুত্রের নাম উল্লেখ করা হইয়াছে। একজনের নাম পেলগ (Peleg) এবং অপরজনের নাম য়াকতান (Joktan)। য়াকতানকে আরবরা কাহতান বলে। বনী কাহতান তাঁহারই বংশধর (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ১খ., পৃ. ১৩৬; দ্র. বাইবেল, আদিপুস্তক, ১১: ১৪, পৃ. ১৩)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00