📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আদ জাতির বাসস্থান

📄 আদ জাতির বাসস্থান


'আদ জাতির কেন্দ্রীয় আবাসভূমি 'আরবের উৎকৃষ্ট বিস্তৃত অংশ অর্থাৎ য়ামান ও হাদ্রামাওত তথা পারস্য উপসাগরের উপকূল হইতে ইরাক সীমান্ত পর্যন্ত ছিল। প্রকৃতপক্ষে তাহাদের রাজত্বের মূল কেন্দ্র ছিল য়ামান (তারীখু আরদিল কুরআন, ১খ., পৃ. ৯৯)।
কাসাসুল কুরআন গ্রন্থের গ্রন্থকারের মতে 'আদ জাতি হযরত নূহ (আ)-এর পর পৃথিবীতে আবাদ হয়। “আহকাফ” নামক বালুকাময় মরুভূমিতে তাহাদের বসতি ছিল। ঐ এলাকা হাদ্রামাওত ও য়ামানের উত্তরে য়ামান উপসাগরের (ভারত মহাসাগর সংলগ্ন) তীর ব্যাপী বিস্তৃত ছিল। এই অঞ্চল প্রাচীন কাল হইতেই বালুকাময় ছিল, না 'আদ জাতির ধ্বংসের পর বালুকাময় মরুভূমিতে পরিণত হয়, তাহা জানা যায় না। তাওরাত ইত্যাদি আসমানী গ্রন্থ 'আদ জাতি সম্পর্কে নীরব। ইতিহাসও এই প্রাচীনতম জাতি সম্পর্কে কিছু বলে না। তবে কুরআনুল কারীমই এই 'আদ জাতির অবস্থা ও বাসস্থান সম্পর্কে জানার একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।
ইব্‌ন কাছীর রচিত কাসাসুল আম্বিয়ার মতে এই 'আদ জাতি অর্থাৎ 'আদ ইব্‌ন আওস ইব্‌ন সাম ইব্‌ন নূহ ছিল একটি 'আরবী জাতিগোষ্ঠী। তাহারা আল-আহকাফে বসবাস করিত এবং আহকাফ হইল বালির পাহাড়। ইহা উমান ও হাদ্রামাওতের মধ্যবর্তী স্থলে অবস্থিত ছিল। এই স্থান সমুদ্র উপকূলে বিস্তৃত ছিল। উপকূল সংলগ্ন স্থানকে الشحر )আশ্-শিহ্‌র) বলা হইত এবং ঐ স্থানের উপত্যকার নাম مغیث )মুগীছ) (বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., পৃ. ৯৫)। পবিত্র কুরআনে 'আদ জাতির বাসস্থান কোথায় তাহা নির্দিষ্ট করিয়া বলা না হইলেও সূরা আহকাফে বলা হইয়াছে:
وَاذْكُرْ أَخَا عَادٍ إِذْ أَنْذَرَ قَوْمَهُ بِالأَحْقَافِ وَقَدْ خَلَتِ النُّذُرُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ إِلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ.
"স্মরণ কর আদ সম্প্রদায়ের ভ্রাতার কথা, যাহার পূর্বে ও পরেও সতর্ককারীরা আসিয়াছিল। সে তাহার আহকাফবাসী সম্প্রদায়কে সতর্ক করিয়াছিল এই বলিয়া, আল্লাহ ব্যতীত কাহারও ইবাদত করিও না। আমি তো তোমাদিগের জন্য মহাদিবসের শাস্তির আশংকা করিতেছি" (৪৬: ২১)।
জানা যায় যে, 'আদ জাতির নির্দিষ্ট বাসস্থান য়ামান হইতে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত দক্ষিণ 'আরব এবং পারস্য উপসাগরের তীর ঘেঁষিয়া ইরাক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মনে হয় বর্তমান য়ামান, হাদ্রামাওত, উমান, কাতার, আল-আহ্সা ইত্যাদি স্থানে 'আদ জাতির বসতি বিস্তৃত ছিল। ইহাদের কেন্দ্রস্থল ছিল আহকাফ, যাহা হাদ্রামাওতের উত্তরে, উমানের পশ্চিমে এবং রাবউল খালী'র দক্ষিণে অবস্থিত। বর্তমানে আহকাফে বালির টিলা ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। কিন্তু ঐ যুগে হয়ত আহকাফ অঞ্চল সবুজ-শ্যামল প্রান্তর ছিল। শায়খ আবদুল ওয়াহ্হাব আন্-নাজ্জার তাঁহার 'কাসাসুল আম্বিয়া' গ্রন্থে হাদ্রামাওতের সায়্যিদ 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন আহমাদের বর্ণনা উদ্ধৃত করেন যে, একবার তিনি একদল লোকের সঙ্গে প্রাচীন কালে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমূহের খোঁজ করার জন্য হাদ্রামাওতের উত্তর দিকের প্রান্তরে কর্মরত ছিলেন। তাঁহারা অনেক চেষ্টার পর বালির টিলা খোদাই করিয়া মর্মর পাথরের কতিপয় পাত্র উদ্ধার করেন। ঐ সকল পাত্রে কিলক পদ্ধতির লেখা ছিল। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে তাঁহারা খননকার্য সমাপ্ত করিতে পারেন নাই (হিফজুর রহমান, কাসাসুল কুরআন, খণ্ড ১, পৃ. ৮৯; আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৫১)। এই খননকার্য দ্বারা অনুমান করা যায় যে, 'আদ জাতি বসবাস করার সময় ঐ স্থান হয়ত বর্তমান সময়ের মত মরুময় ছিল না, বরং সবুজ, সজীব ও শ্যামল অঞ্চল ছিল। পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় তাহা বুঝা যায়:
وَاتَّقُوا الَّذِي آمَدَّكُمْ بِمَا تَعْلَمُونَ . آمَدَكُمْ بِأَنْعَامِ وَبَنِينَ وَجَنَّتٍ وَعُيُونٍ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ.
"ভয় কর তাঁহাকে যিনি তোমাদিগকে দিয়াছেন সেই সমুদয় যাহা তোমরা জ্ঞাত। তিনি তোমাদিগকে দিয়াছেন আন'আম তথা উট, গরু, মেষ, ছাগল ও সন্তান-সন্তুতি, উদ্যান ও প্রস্রবণ। আমি তোমাদিগের জন্য আশংকা করি মহাদিবসের শাস্তি" (২৬ঃ ১৩২-১৩৫)।
'আদ জাতির লোকেরা মাঠে তাঁবুর মধ্যে বসবাস করিত। ঐসব তাঁবু বিশাল উঁচু স্তম্ভের উপর স্থাপিত ছিল। অথবা তাহারা এমন উঁচু গৃহে বাস করিত, যেসব গৃহের ছাদ অত্যন্ত উঁচু স্তম্ভের উপর স্থাপিত ছিল।
সায়্যিদ সুলায়মান নদবী তাঁহার 'তারীখু আরদিল কুরআন' গ্রন্থে بلاد احقاف শিরোনামে লিখেন, য়ামামা, উমান, বাহরাইন, হাদরামাওত এবং পশ্চিম য়ামানের মধ্যবর্তী যে বিশাল প্রান্তর 'আদ্‌-দুবনা" অথবা "রাবউ'ল-খালী" নামে পরিচিত, যদিও তাহা আবাদীর উপযুক্ত নহে, কিন্তু ইহার আশেপাশে কোথায়ও কোথায়ও আবাদীযোগ্য কিছু ভূমি বিদ্যমান, বিশেষ করিয়া ঐ অংশে, যে অংশ হাদ্রামাওত হইতে নাজরান পর্যন্ত বিস্তৃত। বর্তমানে অবশ্য এই অংশটিও আবাদ নহে। তাহা সত্ত্বেও প্রাচীন কালে হাদ্রামাওত ও নাজরানের মধ্যবর্তী অংশে “আদ-ই ইরাম”-এর বিখ্যাত জাতির বসবাস ছিল। এই জাতিকে আল্লাহ নাফরমানীর কারণে ধ্বংস করিয়া দেন (তারীখু আরদিল কুরআন, খ. ১, পৃ. ৭৩)।
মুহাম্মাদ জামীল আহমাদ তাঁহার রচিত 'আম্বিয়ায়ে কুরআন' নামক গ্রন্থে 'আদ জাতির আবাসভূমির পরিচয় দিতে গিয়া বলেন, “দক্ষিণ-পূর্ব আরবে পারস্য উপসাগরীয় উপকূল হইতে ইরাক সীমান্ত এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে (আরবে) হাদ্রামাওত পর্যন্ত 'আد জাতির আবাসভূমি বিস্তৃত ছিল (অম্বিয়ায়ে কুরআন, ১খ., পৃ. ১২৪, লাহোর)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আদ জাতির পার্থিব সমৃদ্ধির বর্ণনা

📄 আদ জাতির পার্থিব সমৃদ্ধির বর্ণনা


পবিত্র কুরআনে 'আদ জাতিকে হযরত নূহ (আ)-এর পরে পৃথিবীতে আগমনকারী এবং শারীরিক শক্তি, ধনসম্পদ ও মর্যাদার ক্ষেত্রে বিশিষ্ট বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে। সর্বোপরি তাহাদেরকে কাওমে নূহের পরে দুনিয়ার খিলাফত দান করা হয়:
وَاذْكُرُوا إِذْ جَعَلَكُمْ خُلَفَاءَ مِنْ بَعْدِ قَوْمٍ نُوحٍ وَزَادَكُمْ فِي الخَلْقِ بَسْطَةً فَاذْكُرُوا أَلَاءَ اللَّهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ.
"স্মরণ কর, আল্লাহ তোমাদিগকে নূহের সম্প্রদায়ের পরে তাহাদিগের স্থলাভিষিক্ত করিয়াছেন এবং তোমাদিগের অবয়ব অন্য লোক অপেক্ষা শক্তিতে অধিক সমৃদ্ধ করিয়াছেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ্র অনুগ্রহ স্মরণ কর, হয়ত তোমরা সফলকাম হইবে" (৭ঃ ৬৯)।
বলা বাহুল্য, 'আদ জাতির লোকেরা বিশালদেহী এবং প্রচণ্ড শারীরিক শক্তির অধিকারী ছিল। ইসরাঈলী রিওয়ায়াতসমূহে তাহাদের দেহের গঠন ও শক্তি সম্পর্কে আতিরঞ্জিত কথাবার্তা বর্ণিত আছে। তবে হযরত 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন 'আব্বাস (রা) ও হযরত মুকাতিল (র) হইতে তাহাদের উচ্চতা ১২ হাত তথা ১৮ ফুট বলিয়া বর্ণনা পাওয়া যায় (তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত বাংলা অনুবাদ, পৃ. ১৪৫৪)। তাহাদের মত শক্তিশালী আর কোন জাতি তৎকালে পৃথিবীতে ছিল না। হাফেজ ইব্‌ন কাছীর লিখিয়াছেন যে, 'আদ জাতির একেকজন লোক বিরাট পাথরের চাড় হাতে উঠাইয়া শত্রু গোত্রের উপর নিক্ষেপ করিয়া ধ্বংস করিয়া দিতে পারিত। তাহারা তাহাদের সচ্ছলতা, ধন-সম্পদ ও শিল্প বিজ্ঞানের বিচারে সমসাময়িক সকল জাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ছিল। তাহাদের শান-শওকত ও সার্বিক শক্তিমত্তা তাহাদেরকে অংহকারী, অত্যাচারী ও সীমালংঘনকারী বানাইয়া দেয়। তাহাদের অধিকৃত এলাকায় তাহারা সদম্ভে বিচরণ করিত। তাহারা ক্ষুদ্র ও দুর্বল জাতিসমূহের উপর অন্যায়ভাবে কঠোর আচরণ ও জুলম করিত। তাহাদের অন্তরে আল্লাহ্ ভয় ছিল না। নিজেদের শক্তিমত্তার ক্ষেত্রে তাহারা কাহাকেও পরওয়া করিত না।
তাহারা অহংকারের সহিত বলিত, এই পৃথিবীতে আমাদের চেয়ে শক্তিশালী আর কে আছে? তাহাদের এই অন্যায় দাবি পবিত্র কুরআনে বিবৃত হইয়াছে: "আর আদ সম্প্রদায়ের ব্যাপার এই যে, উহারা পৃথিবীতে অযথা দম্ভ করিত এবং বলিত, আমাদিগের অপেক্ষা শক্তিশালী কে আছে? উহারা কি তবে লক্ষ্য করে নাই যে, যে আল্লাহ তাহাদেরকে সৃষ্টি করিয়াছেন, তিনি তাহাদের অপেক্ষা শক্তিশালী? বস্তুত তাহারা আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করিত” (৪১: ১৫)।
'আদ জাতির ঔদ্ধত্য ও অবিমৃষ্যকারিতা এমন পর্যায়ে ছিল যে, তাহারা তাহাদের উপর আপতিত আযাবের কথা বা আখিরাতের আযাবের কথা হযরত হূদ (আ)-এর মুখ হইতে শ্রবণ করার পরও দম্ভভরে কথা বলে। পবিত্র কুরআনের সূরা আহকাফে বলা হইয়াছে:
"উহারা বলিয়াছিল, 'তুমি আমাদিগকে আমাদিগের দেব-দেবীগুলির পূজা হইতে নিবৃত্ত করিতে আসিয়াছ? তুমি সত্যবাদী হইলে আমাদিগকে যাহার ভয় দেখাইতেছ তাহা আনয়ন কর" (৪৬: ২২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আদ জাতির ধর্মমত

📄 আদ জাতির ধর্মমত


আদ জাতি মূর্তি নির্মাণে পটু ছিল। তাহাদের পূর্ববর্তী মূর্তিপূজকদের মত তাহারাও বিভিন্ন দেব দেবীর মূর্তি নির্মাণ করিয়া ইহাদের পূজা করিত। তাহাদের মূর্তিসমূহের নাম ছিল: ওয়াদ্দ, সুআ, য়াগূছ, য়াউক ও নাস্ত্র। হযরত নূহ (আ)-এর কওমের পরে প্রথম মূর্তিপূজা আরম্ভকারী ছিল এই আদ জাতি বা আদ-ই ইরাম (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১, পৃ. ১২১; নাজ্জারের কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৫১)।
হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, "(আদ জাতি) এক মূর্তির পূজা করিত, উহাকে সামূদ বলা হইত এবং আর একটি মূর্তির পূজা করিত ঐ মূর্তিকে আল্-হাতার বলা হইত” (আবদুল ওয়াহ্হাব আন্-নাজজার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৫১)।
ইব্‌ন কাছীর তাঁহার কাসাসুল আম্বিয়া গ্রন্থে বলেন: নিশ্চয় আদ জাতি এবং তাহারা হইল আদ-ই উলা বা ১ম আদ জাতি। হযরত নূহ (আ)-এর তুফানের পর তাহারা ছিল প্রথম মূর্তিপূজক। তাহাদের মূর্তি ছিল তিনটি, যথা সামাদ, সামূদ ও হারা।
মোটকথা আদ জাতি মূর্তি বা দেব-দেবীর পূজায় এতই বিমূঢ় ছিল যে, তাহারা কোনক্রমেই হযরত হূদ (আ)-এর দাওয়াত গ্রহণ করিয়া এক আল্লাহয় বিশ্বাস করে নাই এবং তাঁহার ইবাদত করে নাই। তবে তাহাদের উপর আল্লাহর গযব অবতীর্ণ হওয়ার সময় তাহাদের মধ্য হইতে মুষ্টিমেয় লোক ঈমানদার ছিলেন এবং গযব হইতে নবীর সঙ্গে রক্ষা পান।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত হূদ (আ)-এর কর্মজীবন বা দাওয়াতী জীবন

📄 হযরত হূদ (আ)-এর কর্মজীবন বা দাওয়াতী জীবন


আল্লাহ তা'আলা হযরত হূদ (আ)-কে পৃথিবীর সবচাইতে শক্তিশালী, অহংকারী, জালেম, আল্লাহর নাফরমান মূর্তিপূজক আদ জাতির মধ্যে প্রেরণ করেন। আদ জাতি যখন তাহাদের শক্তিমত্তায় উন্মত্ত হইয়া আরব ও তৎপার্শ্ববর্তী এলাকায় লুটপাট, অসৎ কার্যকলাপ, ঝগড়া-ফাসাদ ও বিশৃঙ্খলায় লিপ্ত হইয়া পড়ে, তখন হৃদ (আ) তাহাদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত অনুগ্রহসমূহের বর্ণনা দানপূর্বক বলেন, হে আদ জাতি! আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে তাঁহার নিয়ামতের দ্বারা ভরপুর করিয়া দিয়াছেন। তোমরা সবুজ ও সতেজ অঞ্চলের মালিক। ধন-সম্পদ, বাগান, ঝর্ণা, গবাদি পশু, মোটকথা সকল জীবনোপকরণ তোমাদের জন্য সহজলভ্য। কওমে নূহের পর আল্লাহ তোমাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছেন। তাই বলিয়া ইহার অর্থ এই নহে যে, তোমরা আল্লাহর যমীনে অহংকার করিবে, দুর্বলের উপর জুলুম করিবে, মানুষের অধিকার ছিনাইয়া নিবে, নিজেদের শক্তি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করিবে, ভাল ও মন্দের মধ্যে কোন পার্থক্য করিবে না এবং তোমরা এইসব অন্যায় কেবল এই মনে করিয়া করিতেছ যে, আল্লাহ্র যমীনের উপর তোমাদের জওয়াবদিহি নেওয়ার মত আর কেহ নাই। তোমরা যদি উপরিউক্ত সকল কার্যকলাপ এবং পাপাচার পরিত্যাগপূর্বক তোমাদের চরিত্র সংশোধন কর, আল্লাহ্র নিকট পাপ মার্জনা চাহিয়া নিজেদেরকে তাঁহার মুখাপেক্ষী কর, তাহা হইলে তিনি (আল্লাহ) তোমাদের শক্তিমত্তা ও সচ্ছলতায় আরও উন্নতি দান করিবেন এবং তোমরা পরিত্রাণ লাভ করিবে। কিন্তু তোমরা যদি নিজেদেরকে সংশোধন না কর, তাহা হইলে স্মরণ রাখিও যে, আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করিয়াছেন এবং এইসব অনুগ্রহরাজি দ্বারা ভূষিত করিয়াছেন, তিনি তোমাদের বাদ দিয়া অন্য আর এক জাতিকে রাজত্ব দান করিবেন। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে হযরত হূদ (আ)-এর দাওয়াত ও তা'লীমের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে :
وَيُقَوْمِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا وَيَزِدْكُمْ قُوَّةً إِلَى قُوَّتِكُمْ وَلَا تَتَوَلَّوا مُجْرِمِينَ .
"এবং হে আমার কওম! তোমাদের পালনকর্তার নিকট তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁহার দিকেই ফিরিয়া আস। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিধারা প্রেরণ করিবেন এবং তোমাদের শক্তির উপর শক্তি বৃদ্ধি করিবেন, তোমরা অপরাধীর মত বিমুখ হইও না" (১১:৫২)।
আদ জাতি তাহাদের বসবাসের জন্য বিরাট বিরাট অট্টালিকা নির্মাণ করিত এবং তাহারা মনে করিত যে, তাহারা চিরকাল দুনিয়াতে থাকিতে পারিবে। তাহারা মানুষের প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করিত এবং দুর্বলের উপর জুলুম করিত। তাহাদের এহেন কার্যকলাপের উল্লেখ করিয়া আল্লাহ বলেনঃ
وَاذْكُرُوا إِذْ جَعَلَكُمْ خُلَفَاءَ مِنْ بَعْدِ قَوْمٍ نُوحٍ وَزَادَكُمْ فِي الْخَلْقِ بَسْطَةً فَاذْكُرُوا أَلَاءَ اللَّهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ .
"তোমরা প্রতিটি উচ্চ স্থানে নিরর্থক স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করিতেছ? এবং বৃহৎ অট্টালিকা নির্মাণ করিয়াছ, যেন তোমরা চিরকাল এই অট্টালিকায় থাকিবে। যখন তোমরা আঘাত হান, তখন জালেম ও নিষ্ঠুরের মত আঘাত হান। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। ভয় কর তাঁহাকে, যিনি তোমাদেরকে সেইসব বস্তু দিয়াছেন, যাহা তোমরা জ্বান। তিনি তোমাদেরকে দিয়াছেন চতুষ্পদ জন্তু ও সন্তান-সন্তুতি এবং উদ্যান ও ঝর্ণা" (২৬ঃ ১২৮-১৩৪)।
আদ জাতির মধ্যে অন্যায়-অপকর্ম এমনভাবে প্রোথিত ছিল এবং মূর্তিপূজা তাহাদের চিন্তা- চেতনায় ও অস্থি-মজ্জায় এমনভাবে বাসা বাঁধিয়াছিল যে, তাহাদের উপর হযরত হূদ (আ)-এর ওয়াজ-নসীহত কোন প্রভাব ফেলিতে পারে নাই। তাহারা হযরত হূদ (আ)-এর পয়গাম শ্রবণে আগ্রহী হয় নাই, বরং গর্ব ও অহংকার বশত মিথ্যার অপবাদ দিয়া তাঁহার দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে। পবিত্র কুরআনে তাহাদের বক্তব্য নিম্নোক্তভাবে উক্ত হইয়াছেঃ "আর আদ সম্প্রদায়ের ব্যাপার এই যে, তাহারা পৃথিবীতে অযথা অহংকার করিত এবং বলিত, আমাদের অপেক্ষা অধিক শক্তিধর কে আছে? তাহারা কি লক্ষ্য করে নাই যে, যে আল্লাহ তাহাদেরকে সৃষ্টি করিয়াছেন, তিনি তাহাদের অপেক্ষা শক্তিধর? বস্তুত তাহারা আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করিত” (৪১: ১৫)।
হযরত হূদ (আ) তাঁহার কওমকে উদ্দেশ্য করিয়া বলেন, হে আমার সম্প্রদায়! ফেরেশতাদেরকে রাসূল হিসাবে পাঠানো উচিত ছিল, এই মর্মে তোমাদের বক্তব্য তোমাদের মূর্খতারই পরিচায়ক। তোমাদের কওমের কাহারও উপর আল্লাহ্ পয়গাম অবতীর্ণ হওয়ায় আশ্চর্য হওয়া উচিত নহে। কেননা প্রথম হইতেই আল্লাহ্ এই বিধান চলিয়া আসিতেছে। তিনি (আল্লাহ) মানবজাতির হিদায়াতের জন্য তাহাদের মধ্য হইতেই কোন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করিয়া তাঁহার রাসূল বানাইয়া প্রেরণ করেন এবং ঐ রাসূলের মাধ্যমে সকল বান্দার নিকট তাঁহার আহকাম পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। স্বভাবসিদ্ধ নিয়ম এই যে, কোন কওমের হিদায়াতের জন্য এমন ব্যক্তিকে নির্বাচন করা উচিত, যিনি সেই কওমেরই একজন হইবেন, তাহাদের ভাষায় কথা বলিবেন, তাহাদের চরিত্র-অভ্যাস এবং সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে ভালভাবে জানেন, তাহাদের মতই জীবনযাপন করেন এবং কওমের সকলেই তাঁহাকে চিনে।
হযরত হূদ (আ)-এর উপদেশ সত্ত্বেও তাহারা তাহাদের বাপ-দাদার ধর্মে অটল থাকে। তাহরা এই কথা বলিয়া তাঁহাকে হাসি-ঠাট্টা করে যে, যেহেতু হযরত হূদ (আ) আমাদের দেবতাদের মন্দ বলেন, সেই হেতু দেবতারা তাঁহাকে কিছু করিয়াছে অর্থাৎ তাঁহার ক্ষতি করিয়াছে। এই সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে: "তাহারা (কওমে আদ) বলিল, হে হূদ! তুমি আমাদের কাছে কোন প্রমাণ নিয়া আস নাই, আমরা তোমার কথায় আমাদের দেব-দেবীদের বর্জন করিতে পারি না, আর আমরা তোমার প্রতি ঈমান আনয়নকারীও নহি। আমরা তো ইহাই বলি যে, আমাদের কোন দেবতা তোমার উপর শোচনীয় ভূত চাপাইয়া দিয়াছে। সে বলিল, আমি আল্লাহকে সাক্ষী করিতেছি এবং তোমরাও সাক্ষী থাক যে, আমার কোন সম্পর্ক নাই তাহাদের সঙ্গে, যাহাদেরকে তোমরা শরীক করিতেছ" (১১: ৫৩-৫৪)।
সূরা আল-আ'রাফ-এ কওমে হৃদ ও হযরত হূদ (আ)-এর কথোপকথনের বিষয় পরিষ্কারভাবে উক্ত হইয়াছে: "তাহার সম্প্রদায়ের (আদ) সর্দাররা যাহারা কুফরী করিয়াছিল, বলিল: আমরা তোমাকে নির্বোধ দেখিতে পাইতেছি এবং আমরা তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করি। সে বলিল: হে আমার সম্প্রদায়! আমি মোটেই নির্বোধ নহি, বরং আমি বিশ্বপ্রতিপালকের রাসূল। আমি তোমাদেরকে আমার প্রতিপালকের পয়গাম পৌঁছাই এবং আমি তোমাদের বিশ্বস্ত হিতাকাঙ্খী। তোমরা কি বিস্মিত হইতেছ যে, তোমাদের মধ্য হইতেই একজনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে উপদেশ আসিয়াছে, যাহাতে তিনি তোমাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করেন। তোমরা স্মরণ কর, যখন আল্লাহ তোমাদেরকে কাওমে নূহের পর সর্দার করিয়াছেন এবং তোমাদের দেহের বিস্তৃতি বেশী করিয়াছেন। তোমরা আল্লাহর নিয়ামতসমূহ স্মরণ কর যাহাতে তোমাদের মঙ্গল হয়। তাহারা বলিল, তুমি কি আমাদের কাছে এইজন্য আসিয়াছ যে, আমরা এক আল্লাহ্ ইবাদত করি এবং আমাদের বাপ-দাদা যাহাদের পূজা করিত, তাহাদেরকে ছাড়িয়া দেই? অতএব নিয়া আস আমাদের কাছে যাহার দ্বারা আমাদেরকে ভয় দেখাইতেছ, যদি তুমি সত্যবাদী হও” (৭ঃ ৬৬-৭০)।
হযরত হূদ (আ) তাঁহার কাওমের লোকদের সন্দেহ দূর করার জন্য পরিষ্কার ভাষায় বলেন, তোমরা এমন মনে করিও না যে, আমি কোন পদ-পদবী অথবা সম্পদ ও প্রাচুর্যের লোভ-লালসায় এইসব কথা শিক্ষা দিতেছি। এমন নহে, বরং আমি তো আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত, কেবল আল্লাহ্ পয়গাম তোমাদেরকে শুনাই এবং কোন লোভ-লালসা ছাড়াই আমার উপর অর্পিত এই অপরিহার্য দায়িত্ব পালন করিয়া যাইতেছি। তোমাদের নিকট হইতে কোন জিনিস প্রতিদান হিসাবে চাহি না। আমি তো কেবল আমার আল্লাহ্র নিকটই প্রতিদানের প্রত্যাশা করি।
হযরত হূদ (আ)-এর এই আহ্বানের পরেও আদ জাতি প্রচণ্ডভাবে তাহাদের বিরোধিতা অব্যাহত রাখে এবং তাহারা হৃদ (আ)-এর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে। এই সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে : "তাহারা বলিল, তুমি উপদেশ দাও অথবা উপদেশ নাই দাও, উভয়ই আমাদের জন্য সমান। এইসব কথাবার্তা পূর্ববর্তী লোকদের অভ্যাস বৈ কিছু নহে। আমরা শাস্তিপ্রাপ্ত হইব না" (২৬: ১৩৬-৮)
কাওমের অহংকারী লোকেরা বলিতে থাকে, আপনি আমাদের আযাবের যে ভয় দেখান সেই আযাব নিয়া আসুন। হৃদ (আ) বলেন, আযাব নিয়া আসা তো কেবল আল্লাহ্র ইচ্ছাধীন। আমি তো আল্লাহ্ দূতমাত্র। আমাকে যে পয়গাম পৌঁছানোর দায়িত্ব দেওয়া হইয়াছে, তাহা আমি শুধু পৌঁছাইয়া থাকি।
হযরত হূদ (আ)-এর এই আহ্বানের প্রত্যুত্তরে আদ-এর লোকেরা যাহা বলে, পবিত্র কুরআনে নিম্নোক্ত ভাষায় তাহা বর্ণনা করা হইয়াছে : "তাহারা বলিল, তুমি কি আমাদেরকে আমাদের দেব-দেবী হইতে নিবৃত্ত করিতে আগমন করিয়াছ? তুমি সত্যবাদী হইলে আমাদেরকে যাহার ভয় দেখাইতেছ তাহা নিয়া আস। সে বলিল, ইহার জ্ঞান তো আল্লাহর কাছেই রহিয়াছে। আমি যে বিষয়সহ প্রেরিত হইয়াছি, কেবল তাহাই তোমাদের কাছে পৌঁছাই। কিন্তু আমি দেখিতেছি, তোমরা এক মূর্খ সম্প্রদায়” (৪৬: ২২-২৩)।
হযরত হূদ (আ)-এর জওয়াবের পরিপ্রেক্ষিতে তাহাদের বক্তব্য পবিত্র কুরআনে এইভাবে উক্ত হইয়াছে : "তাহারা বলিল, হে হৃদ! তুমি আমাদের নিকট কোন প্রমাণ নিয়া আস নাই। আমরা তোমার কথায় আমাদের দেব-দেবীদের বর্জন করিতে পারি না এবং আমরা তোমাকে বিশ্বাস করি না" (১১:৫৩)।
হৃদ (আ) আদ-এর লোকদের এই চরম কথার যে জওয়াব দেন তাহা পবিত্র কুরআনে এইভাবে বর্ণনা করা হইয়াছে : "সে বলিল, তোমাদের প্রতিপালকের শাস্তি ও ক্রোধ তো তোমাদের জন্য নির্ধারিত হইয়াই আছে; তবে কি তোমরা আমার সহিত বিতর্কে লিপ্ত হইতে চাহ এমন কতকগুলি নাম সম্বন্ধে যাহা তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষগণ সৃষ্টি করিয়াছ এবং যে সম্বন্ধে আল্লাহ কোন সনদ পাঠান নাই? সুতরাং তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমিও তোমাদের সহিত প্রতীক্ষা করিতেছি" (৭: ৭১)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00