📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কাওমে হূদ বা আদ জাতির পরিচয়

📄 কাওমে হূদ বা আদ জাতির পরিচয়


হযরত হূদ (আ)-কে তাঁহার নিজস্ব কওম আদ-এর হিদায়াতের জন্য আল্লাহ্‌ প্রেরণ করেন।
হযরত হূদ (আ)-এর জীবন ও কর্মতৎপরতা আদ জাতিকে কেন্দ্র করিয়া আবর্তিত হইয়াছিল। ফলে হযরত হূদ (আ)-এর জীবনী আলোচনা করিতে হইলে আদ জাতি সম্পর্কে সার্বিক আলোচনা আবশ্যক। হযরত আদম (আ)-এর পর অনেক অনেক দিন অতিবাহিত হওয়ার পর আরবে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সম্পদ ও প্রাচুর্যের অধিকারী এক জাতির আবাদ ছিল, যাহাদেরকে পবিত্র কুরআনে ‘আদ জাতি’ বলা হইয়াছে। হযরত নূহ (আ)-এর প্লাবনের পর তাঁহার পুত্রদের মধ্যে অন্যতম সাম-এর বংশ আরব ও তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল। আদ জাতি ঐ বংশের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল, যাহাদের বিভিন্ন গোত্রকে امم سامية বা ‘সামী জাতিগোষ্ঠী’ বলা হইত। এই আদ জাতি ইরাম ইব্‌ন সাম ইব্‌ন নূহ (আ)-এর বংশের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় এই জাতিকে আদ-ই ইরাম বলা হইত। কুরআনে উল্লিখিত আদ ও ছামূদ জাতিদ্বয়ের বংশতালিকা উপরের দিকে ইরাম-এ গিয়া মিলিত হয়। ফলে ইরাম শব্দটি আদ ও ছামূদ উভয়ের বেলায় প্রযোজ্য।
সায়্যিদ সুলায়মান নদবী আসমানী কিতাব তাওরাত অনুযায়ী বর্ণিত قرام বংশ পরিবর্তন ছক তাঁহার গ্রন্থে উপস্থাপন করিয়াছেন এবং ঐ ছকে তিনি عاد জাতিকে (هود) امم سامية اولى বলিয়া উল্লেখ করেন। অর্থাৎ সেই আদ হযরত হূদ (আ)-এর যমানায় কওমে হূদ নামে অভিহিত ছিল এবং হযরত হূদ (আ)-এর পরবর্তী عاد ثانية - امم مسامية অর্থাৎ ثمود (ছামূদ), جرهم (জুরহুম), معين (মুঈন), طسم (তাসাম), جدیس (জাদীস) ইত্যাদি নামে উল্লেখ করেন। شجره اقوام
نوح نূহ (আ)
حام )হাম( سام )সাম( يافث )য়াফিছ( روم واصحات اللن
مجوس عیلام اشور (اسیربا) ارفجشن لود آرم مصر کوش (কোশ) (মিসর) (ইরাম) (লুদ) (আরফাখশায) (আশূর) (আয়লাম) (অগ্নিউপাসক আদ)
(অথবা)
)১ম( سامیه اولی 'সামী জাতিগোষ্ঠী’
(هود)হুদ ساميه ثانيه عاد ثانيه
ثمود - جرهم - معين - طسم - وجديس - صالح
দ্বিতীয় সামী জাতিগোষ্ঠী দ্বিতীয় আদ: ছামূদ, জুরহুম, মঈন, তাসাম ও জাদীস, সালিহ
سلح (শেলহ)
فالع (ফালিহ)
قحطان (কাহতান)
حازان (হাযান) (তারিহ [আযার]) (কাহতানী আরব গোত্রের, সাবাই গোত্র তুব্বা, হাশ-এর পিতৃকূল) ف) لوط( )ইবরাহীম( ابراهیم
اسماعیل بنو قطورا (বানু কাতৃরা) اسحاق (ইসমাঈল) (ইসহাক)
مدین واصحاب الاتيكة پیدر عرب اسماعیلیه (ودان) وشعيب )মাদয়ান ও আসহাবুল (ইসমাঈল আরবদের( আয়কা ও শু'আয়ব) পিতৃকূল)
عيشا ء اودم ঈশা আদুম يعقوب اسرائيل
(ইয়া'কূব ইসরাঈল) پیدر ایوب قیدار نافظ পیدر بنی اسرائیل (বনী ইসরাঈলের পিতৃকূল) (নাফিজ) (কায়দার) انبیا ء بنی اسرائیل (বনী ইসরাঈলের নবীগণ)
پیدر اصحاب الحجر وانصار পیدر قریش পیدر ایوب আসহাবুল হিজর ও আনসারদের পিতৃকূল) (কুরাইশদের পিতৃকূল) (আয়্যূবের পিতৃকূল) (সায়্যিদ সুলায়মান নদবী, তারীখু আরদিল কুরআন, ১খ, পৃ. ৯৪, করাচী ১৯১৫ খৃ.)।
সায়্যিদ সুলায়মান নদবীর মতে امم سامية আরবের সর্বপ্রথম ও প্রাথমিক বাসিন্দা ছিল এবং বিভিন্ন কারণে তাহারা আরবভূমি হইতে বাহির হইয়া বাবিল, মিসর, শাম (সিরিয়া) ইত্যাদি এলাকায় ছড়াইয়া পড়ে। আরব ঐতিহাসিকগণ তাহাদেরকে اسم بائدة বা ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি হিসাবে অভিহিত করেন। কেননা তাহারা তাহাদের দেশ আরব হইতে বাহির হইয়া অন্যত্র গিয়া আসমানী গযবে ধ্বংস হয়। কোন কোন ঐতিহাসিক তাহাদেরকে عرب عاربة অর্থাৎ খাঁটি ও অবিমিশ্র আরব বলিয়া চিহ্নিত করেন। ইউরোপীয় বংশবিশারদ পণ্ডিতগণ আরবের বিভিন্ন প্রাচীন জাতি-গোষ্ঠীকে কেবল সামী বলিতেন, কিন্তু 'আরবগণ তাহাদের প্রাচীন জাতিগোষ্ঠীকে পৃথক পৃথক নামে অভিহিত করেন। যেমন عاد )আদ), ثمود )ছামূদ), جرهم )জুরহুম), لحيان )লিয়ান), طسم )তাসম), جديس )জাদীস) ইত্যাদি। ঐসব গোত্রের মধ্যে আদ সবচাইতে বৃহৎ গোত্র ছিল এবং عرب بانده অর্থাৎ প্রাচীন আরবের ধ্বংসপ্রাপ্ত সকল গোত্রের মধ্যে কেবল আদ গোত্রই রাজত্বের অধিকারী ছিল। আরবদের বর্ণনা অনুযায়ী আরব ও আরবের বাহিরে বাবিল ও মিসরে তাহারা বিশাল 'রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা ছিল। আরব ঐতিহাসিকগণ উপরিউক্ত গোত্রসমূহের মূল ধারা ارم ابن سام-এর দিকে নির্দেশ করেন। তাহাদের তথ্যসূত্র অনুযায়ী প্রাচীনতম উৎস ইব্‌ন কুতায়বার কিতাবুল মাআরিফ-এ ইব্‌ন কুতায়বা এবং পরবর্তী কালের লেখক কালকাশান্দী سبائك الذهب-এর মধ্যে নিম্নোক্তরূপে উপস্থাপন করেন:
ইব্‌ন কুতায়বা (কিতাবুল মাআরিফ) আমালিক ইব্‌ন লাবিয ইব্‌ন ইরাম ইব্‌ন সাম জাদীস ইন লাবিয ইব্‌ন ইরাম ইবন সাম 'আদ ইব্‌ন 'আওদ ইব্‌ন ইরাম ইন্ন সাম ছামূদ ইব্‌ন জাছার ইন ইরাম ইন্ন সাম
কালকাশান্দী আমালীক ইব্‌ লাবিয ইব্‌ন্ন সাম জাদীস ইন ইরাম ইন্ন সাম 'আদ ইব্‌ন আওদ ইব্‌ন 'আবীল ইব্‌ ইরাম ইন্ন সাম ছামূদ ইব্‌ন জাছির ইন্ন ইরাম ইন্ন সাম তাসম ইন্ন লাবিয ইন্ন সাম
(ইব্‌ন কুতায়বা, কিতাবুল মা'আরিফ, পৃ. ১০, মিসর; আল্-কালকাশান্দী, সাবায়িকুল মাযহাব, পৃ. ১৩১৪, বোম্বাই)।
উপরে বর্ণিত বংশতালিকায় সকল গোত্রই সাম-এর বংশধর ছিল। তবে সাম-এর পরে সকলেই 'ইরাম'-এর অধস্তন ছিল। ফলে আরবের সকল গোত্রের মধ্যে আরামী উপাদানের প্রাধান্য ছিল। যেমন আরবী ভাষায় আরামী শব্দ অধিক পরিমাণে পাওয়া যায় (প্রফেসর আরনল্ড, سواء السبيل লাহোর)। এমনকি আরবের প্রাচীন শহর 'মক্কা' নামটিও আরামী (জুরজী যায়দান, পৃ. ২৪০)। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানী ইব্‌ন খালদুন বলেন,
كَانَ يُقَالُ عَادٌ إِرَمَ فَلَمَّا هَلَكُوا قِيلَ ثَمُودُ إِرَمَ فَلَمَّا هَلَكُوا قِيلَ نَمْرُودُ إِرَمَ .
"প্রথমে 'আদকে ইরাম বলা হইত। যখন তাহারা ধ্বংস হইয়া যায় তখন ছামূদ-ই ইরাম বলা হইত। যখন তাহারাও ধ্বংস হইয়া যায়, তখন নমরূদ-ই ইরাম বলা হইত" (ইব্‌ন খালদুন, ২ খ, পৃ. ৭)। পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে:
أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِعَادٍ . إِرَمَ ذَاتِ الْعِمَادِ . الَّتِي لَمْ يُخْلَقْ مِثْلُهَا فِي الْبِلادِ .
"তুমি কি দেখ নাই তোমার প্রতিপালক কি করিয়াছিলেন 'আদ বংশের ইরাম গোত্রের প্রতি, যাহারা অধিকারী ছিল সুউচ্চ প্রাসাদের, যাহার সমতুল্য কোন দেশে নির্মিত হয় নাই" (৮৯ঃ ৬-৮)!
উপরিউক্ত আয়াতে ইরাম শব্দ ব্যবহার করিয়া 'আদ গোত্রের পূর্ববর্তী বংশধর তথা প্রথম 'আদকে নির্দেশ করা হইয়াছে। তাহারা দ্বিতীয় 'আদ-এর তুলনায় 'আদ-এর পূর্বপুরুষ ইরাম-এর নিকটতম বিধায় তাহাদেরকে 'আদ-ই ইরাম নামে অভিহিত করা হইয়াছে। অনুরূপভাবে সূরা আন্-নাজম-এ তাহাদিগকে 'আদ-ই ঊলা বলা হইয়াছে:
وَأَنَّهُ أَهْلَكَ عَادَا الأُولَى وَثَمُودَ فَمَا أَبْقَى وَقَوْمَ نُوحٍ مِّنْ قَبْلُ إِنَّهُمْ كَانُوا هُمْ أَظْلَمَ وَأَطْغَى .
"আরও এই যে, তিনিই প্রাচীন 'আদ সম্প্রদায়কে ধ্বংস করিয়াছিলেন এবং ছামূদ সম্প্রদায়কেও, কাহাকেও তিনি বাকী রাখেন নাই, আর ইহাদিগের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়কেও, উহারা ছিল অতিশয় জালিম ও অবাধ্য” (৫৩ঃ ৫০-৫২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আদ শব্দটির অর্থ

📄 আদ শব্দটির অর্থ


সেমিটিক (সামী) ভাষাসমূহের মধ্যে সাহিত্যে অস্তিত্বের দিক হইতে হিব্রু প্রাচীনতম ভাষা। ইহার ফলে প্রাচীন শব্দসমূহের উৎপত্তি 'আরবী ভাষার তুলনায় 'হিব্রু ভাষায় অধিক সংরক্ষিত। হিব্রু ভাষায় 'আদ' শব্দের অর্থ 'উচ্চ ও বিখ্যাত' এবং আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ইরাম এবং ইসাম (সাম) শব্দদ্বয়ের অর্থও অনুরূপ। এই অর্থের প্রভাব আরবীতেও বিদ্যমান। ইরাম-এর অর্থ পার্বত্য / পাহাড়ী ও দিকনির্দেশক পাথর। তাওরাতে 'আদ' পুংলিঙ্গের নামের জন্য এবং স্ত্রীবাচক নামের জন্য একাধিক স্থানে আসিয়াছে, যাহার ফলে ইহা স্পষ্ট যে, প্রাচীন কালে এই নাম ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হইত (সায়্যিদ সুলায়মান নদবী, তারীখু আরদিল কুরআন, খ. ১, পৃ. ৯৭-৯৮, করাচী ১৯১৫ খৃ.)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আদ জাতির আবির্ভাবকাল

📄 আদ জাতির আবির্ভাবকাল


আদ জাতির আবির্ভাবের সময়কাল আনুমানিক ৩০০০ খৃস্টপূর্বাব্দ। কেননা 'আদকে عوض بن ارم بن سام -এর সন্তান বলা হইয়াছে। কিন্তু পবিত্র কুরআনের যে স্থানে 'আদ-এর উল্লেখ করা হইয়াছে, সেই স্থানে তাহাদেরকে কওমে নূহ-এর প্রতিনিধি বলা হইয়াছে:
وَاذْكُرُوا إِذْ جَعَلَكُمْ خُلَفَاءَ مِنْ بَعْدِ قَوْمٍ نُوحٍ وَزَادَكُمْ فِي الخَلْقِ بَسْطَةً فَاذْكُرُوا أَلَاءَ اللَّهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ .
“এবং স্মরণ কর, আল্লাহ তোমাদিগকে নূহের সম্প্রদায়ের পরে তাহাদিগের স্থলাভিষিক্ত করিয়াছেন এবং তোমাদিগের অবয়ব অন্য লোক অপেক্ষা শক্তিতে অধিকতর সমৃদ্ধ করিয়াছেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ্র অনুগ্রহ স্মরণ কর, হয়ত তোমরা সফলকাম হইবে" (৭ঃ ৬৯)।
'আদ-ই ইরাম অথবা 'আদ-ই উলা তথা আমাদের আলোচ্য 'আদ জাতির আবির্ভাবকাল ২২০০ খৃ. পূর্বাব্দ হইতে আরম্ভ হয় বলিয়া অনুমিত। 'আদ জাতির অন্তিমকাল নির্ধারণের পদ্ধতি এই যে, ১৫০০ খৃ. পূর্বাব্দে য়ামান-এ অপর একটি শক্তির উদ্ভব ঘটে এবং ঐ সময়ের কিছু পূর্বের যুগ ছিল হযরত মূসা (আ)-এর যুগ। হযরত মূসা (আ)-এর একজন অনুসারী মুমিন ব্যক্তি ফিরআওনের দরবারে বলিয়াছিলেন:
يَا قَوْمِ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ مِثْلَ يَوْمِ الأَحْزَابِ مِثْلَ دَابِ قَوْمِ نُوحٍ وَعَادٍ وَثَمُودَ وَالَّذِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ.
“হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদিগের জন্য পূর্ববর্তী সম্প্রদায়সমূহের শাস্তির দিনের অনুরূপ দুর্দিনের আশংকা করি, যেমন ঘটিয়াছিল নূহ, 'আদ, ছামূদ এবং তাহাদিগের পূর্ববর্তীদের ক্ষেত্রে” (৪০:৩০-৩১)।
সুতরাং উপরিউক্ত তথ্যাদির ভিত্তিতে 'আদ জাতির আবির্ভাবকাল ৩০০০ খৃ. পূর্বাব্দ হইলেও তাহাদের গৌরবময় যুগ খৃ. পূর্ব ২২০০ সাল হইতে খৃ. পৃ. ১৭০০ সাল পর্যন্ত ছিল। অবশ্য 'আদ জাতির নেককার লোকজন হযরত ঈসা (আ)-এর যুগ পর্যন্ত ছিলেন। গ্রীকগণ 'আদ জাতিকে عاد) عاد أديت (عادام) عاد رمثيا( ইত্যাদি নামে উল্লেখ করে, যাহারা হাদ্রামাওত ও য়ামানের বাসিন্দা ছিল। পার্থক্য নির্ধারণের জন্য ১ম যুগকে 'আদ-ই উলা এবং ২য় যুগকে 'আদ-ই ছানিয়া বলা হয় (তারীখু আরদিল কুরআন, ১খ., পৃ. ৯৮-৯৯)।
যে সকল ঐতিহাসিক আদ জাতি সম্পর্কে আলোচনা করিয়াছেন তাঁহারা লিখেন যে, হযরত ইবরাহীম (আ) যখন মক্কায় বায়তুল্লাহ্ নির্মাণ করেন এবং হযরত ইসমাঈল (আ) ও তাঁহার মাতা হযরত হাজেরা (রা)-কে ঐ স্থানে বসবাসের ব্যবস্থা করেন, তখন 'আদ জাতি ধ্বংস হইয়া গিয়াছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আদ জাতির বাসস্থান

📄 আদ জাতির বাসস্থান


'আদ জাতির কেন্দ্রীয় আবাসভূমি 'আরবের উৎকৃষ্ট বিস্তৃত অংশ অর্থাৎ য়ামান ও হাদ্রামাওত তথা পারস্য উপসাগরের উপকূল হইতে ইরাক সীমান্ত পর্যন্ত ছিল। প্রকৃতপক্ষে তাহাদের রাজত্বের মূল কেন্দ্র ছিল য়ামান (তারীখু আরদিল কুরআন, ১খ., পৃ. ৯৯)।
কাসাসুল কুরআন গ্রন্থের গ্রন্থকারের মতে 'আদ জাতি হযরত নূহ (আ)-এর পর পৃথিবীতে আবাদ হয়। “আহকাফ” নামক বালুকাময় মরুভূমিতে তাহাদের বসতি ছিল। ঐ এলাকা হাদ্রামাওত ও য়ামানের উত্তরে য়ামান উপসাগরের (ভারত মহাসাগর সংলগ্ন) তীর ব্যাপী বিস্তৃত ছিল। এই অঞ্চল প্রাচীন কাল হইতেই বালুকাময় ছিল, না 'আদ জাতির ধ্বংসের পর বালুকাময় মরুভূমিতে পরিণত হয়, তাহা জানা যায় না। তাওরাত ইত্যাদি আসমানী গ্রন্থ 'আদ জাতি সম্পর্কে নীরব। ইতিহাসও এই প্রাচীনতম জাতি সম্পর্কে কিছু বলে না। তবে কুরআনুল কারীমই এই 'আদ জাতির অবস্থা ও বাসস্থান সম্পর্কে জানার একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।
ইব্‌ন কাছীর রচিত কাসাসুল আম্বিয়ার মতে এই 'আদ জাতি অর্থাৎ 'আদ ইব্‌ন আওস ইব্‌ন সাম ইব্‌ন নূহ ছিল একটি 'আরবী জাতিগোষ্ঠী। তাহারা আল-আহকাফে বসবাস করিত এবং আহকাফ হইল বালির পাহাড়। ইহা উমান ও হাদ্রামাওতের মধ্যবর্তী স্থলে অবস্থিত ছিল। এই স্থান সমুদ্র উপকূলে বিস্তৃত ছিল। উপকূল সংলগ্ন স্থানকে الشحر )আশ্-শিহ্‌র) বলা হইত এবং ঐ স্থানের উপত্যকার নাম مغیث )মুগীছ) (বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., পৃ. ৯৫)। পবিত্র কুরআনে 'আদ জাতির বাসস্থান কোথায় তাহা নির্দিষ্ট করিয়া বলা না হইলেও সূরা আহকাফে বলা হইয়াছে:
وَاذْكُرْ أَخَا عَادٍ إِذْ أَنْذَرَ قَوْمَهُ بِالأَحْقَافِ وَقَدْ خَلَتِ النُّذُرُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ إِلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ.
"স্মরণ কর আদ সম্প্রদায়ের ভ্রাতার কথা, যাহার পূর্বে ও পরেও সতর্ককারীরা আসিয়াছিল। সে তাহার আহকাফবাসী সম্প্রদায়কে সতর্ক করিয়াছিল এই বলিয়া, আল্লাহ ব্যতীত কাহারও ইবাদত করিও না। আমি তো তোমাদিগের জন্য মহাদিবসের শাস্তির আশংকা করিতেছি" (৪৬: ২১)।
জানা যায় যে, 'আদ জাতির নির্দিষ্ট বাসস্থান য়ামান হইতে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত দক্ষিণ 'আরব এবং পারস্য উপসাগরের তীর ঘেঁষিয়া ইরাক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মনে হয় বর্তমান য়ামান, হাদ্রামাওত, উমান, কাতার, আল-আহ্সা ইত্যাদি স্থানে 'আদ জাতির বসতি বিস্তৃত ছিল। ইহাদের কেন্দ্রস্থল ছিল আহকাফ, যাহা হাদ্রামাওতের উত্তরে, উমানের পশ্চিমে এবং রাবউল খালী'র দক্ষিণে অবস্থিত। বর্তমানে আহকাফে বালির টিলা ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। কিন্তু ঐ যুগে হয়ত আহকাফ অঞ্চল সবুজ-শ্যামল প্রান্তর ছিল। শায়খ আবদুল ওয়াহ্হাব আন্-নাজ্জার তাঁহার 'কাসাসুল আম্বিয়া' গ্রন্থে হাদ্রামাওতের সায়্যিদ 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন আহমাদের বর্ণনা উদ্ধৃত করেন যে, একবার তিনি একদল লোকের সঙ্গে প্রাচীন কালে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমূহের খোঁজ করার জন্য হাদ্রামাওতের উত্তর দিকের প্রান্তরে কর্মরত ছিলেন। তাঁহারা অনেক চেষ্টার পর বালির টিলা খোদাই করিয়া মর্মর পাথরের কতিপয় পাত্র উদ্ধার করেন। ঐ সকল পাত্রে কিলক পদ্ধতির লেখা ছিল। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে তাঁহারা খননকার্য সমাপ্ত করিতে পারেন নাই (হিফজুর রহমান, কাসাসুল কুরআন, খণ্ড ১, পৃ. ৮৯; আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৫১)। এই খননকার্য দ্বারা অনুমান করা যায় যে, 'আদ জাতি বসবাস করার সময় ঐ স্থান হয়ত বর্তমান সময়ের মত মরুময় ছিল না, বরং সবুজ, সজীব ও শ্যামল অঞ্চল ছিল। পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় তাহা বুঝা যায়:
وَاتَّقُوا الَّذِي آمَدَّكُمْ بِمَا تَعْلَمُونَ . آمَدَكُمْ بِأَنْعَامِ وَبَنِينَ وَجَنَّتٍ وَعُيُونٍ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ.
"ভয় কর তাঁহাকে যিনি তোমাদিগকে দিয়াছেন সেই সমুদয় যাহা তোমরা জ্ঞাত। তিনি তোমাদিগকে দিয়াছেন আন'আম তথা উট, গরু, মেষ, ছাগল ও সন্তান-সন্তুতি, উদ্যান ও প্রস্রবণ। আমি তোমাদিগের জন্য আশংকা করি মহাদিবসের শাস্তি" (২৬ঃ ১৩২-১৩৫)।
'আদ জাতির লোকেরা মাঠে তাঁবুর মধ্যে বসবাস করিত। ঐসব তাঁবু বিশাল উঁচু স্তম্ভের উপর স্থাপিত ছিল। অথবা তাহারা এমন উঁচু গৃহে বাস করিত, যেসব গৃহের ছাদ অত্যন্ত উঁচু স্তম্ভের উপর স্থাপিত ছিল।
সায়্যিদ সুলায়মান নদবী তাঁহার 'তারীখু আরদিল কুরআন' গ্রন্থে بلاد احقاف শিরোনামে লিখেন, য়ামামা, উমান, বাহরাইন, হাদরামাওত এবং পশ্চিম য়ামানের মধ্যবর্তী যে বিশাল প্রান্তর 'আদ্‌-দুবনা" অথবা "রাবউ'ল-খালী" নামে পরিচিত, যদিও তাহা আবাদীর উপযুক্ত নহে, কিন্তু ইহার আশেপাশে কোথায়ও কোথায়ও আবাদীযোগ্য কিছু ভূমি বিদ্যমান, বিশেষ করিয়া ঐ অংশে, যে অংশ হাদ্রামাওত হইতে নাজরান পর্যন্ত বিস্তৃত। বর্তমানে অবশ্য এই অংশটিও আবাদ নহে। তাহা সত্ত্বেও প্রাচীন কালে হাদ্রামাওত ও নাজরানের মধ্যবর্তী অংশে “আদ-ই ইরাম”-এর বিখ্যাত জাতির বসবাস ছিল। এই জাতিকে আল্লাহ নাফরমানীর কারণে ধ্বংস করিয়া দেন (তারীখু আরদিল কুরআন, খ. ১, পৃ. ৭৩)।
মুহাম্মাদ জামীল আহমাদ তাঁহার রচিত 'আম্বিয়ায়ে কুরআন' নামক গ্রন্থে 'আদ জাতির আবাসভূমির পরিচয় দিতে গিয়া বলেন, “দক্ষিণ-পূর্ব আরবে পারস্য উপসাগরীয় উপকূল হইতে ইরাক সীমান্ত এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে (আরবে) হাদ্রামাওত পর্যন্ত 'আد জাতির আবাসভূমি বিস্তৃত ছিল (অম্বিয়ায়ে কুরআন, ১খ., পৃ. ১২৪, লাহোর)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00