📄 হযরত হূদ (আ)-এর বংশপরিচয়
হুদ ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন রিবাহ ইব্ন খালুদ ইব্ন 'আদ ইব্ন আওস ইব্ন ইরাম ইব্ন সাম ইব্ন নূহ (আ)। ৪র্থ পুরুষে তাঁহার পরদাদা 'আদ ইব্ন আওস-এর নামযুক্ত যে গোত্র ছিল, সেই গোত্রের সঙ্গে তিনি সম্পর্কিত ছিলেন। তাঁহার বংশলতিকা সাম ইব্ন নূহ (আ) পর্যন্ত যাইয়া হযরত ইবরাহীম (আ)-এর বংশের সহিত মিলিয়া যায়। হযরত হূদ (আ) ও সাম-এর মধ্যে ৬ পুরুষের ব্যবধান বিদ্যমান (গুলাম নবী, মুকাম্মাল কাসাসুল কুরআন, ১খ, পৃ. ৭৫)। মুহাম্মাদ জামীল আহমাদ রচিত আম্বিয়ায়ে কুরআন নামক গ্রন্থে হযরত হূদ (আ)-এর বংশলতিকা নিম্নোক্তরূপে দেখানো হইয়াছে:
حضرت نوح عليه السلام Noah Shem সাম Arpachshad ارفخشد Arphaxad Salah سلح Eber عبر حضرت هود )
উপরিউক্ত বংশলতিকায় হযরত হূদ (আ)-কে ইবার (عبر) বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। তাওরাতের বর্ণনা অনুযায়ী হুদ (আ) হযরত আদম (আ)-এর ১৪তম অধস্তন এবং হযরত নূহ (আ)-এর ৫ম অধস্তন পুরুষ (আম্বিয়ায়ে কুরআন, খ. ১, পৃ. ১২৩; বাইবেল, আদিপুস্তক, পৃ. ১৩)।
ইব্ন কাছীর রচিত কাসাসুল আম্বিয়া গ্রন্থে হযরত হূদ (আ)-এর বংশলতিকা নিম্নোক্তরূপে উল্লেখ করা হইয়াছে : হূদ ইব্ন শালিখ ইব্ন আরফাখশায ইব্ন সাম ইব্ন নূহ (আ)। কেহ বলেন, হযরত হূদ (আ) হইলেন আবির ইব্ন শালিক ইব্ন আরফাশায ইব্ন সাম ইব্ন নূহ (আ) অথবা কেহ বলেন, হূদ ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন বিরাহ ইব্ন আল-জারূদ ইব্ন 'আদ ইব্ন আওস ইব্ন ইরাম ইব্ন সাম ইব্ন নূহ (আ) (এই বংশলতিকাটি ইব্ন জারীর উল্লেখ করেন; ইব্ন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, ১খ., পৃ. ৯৫, বৈরূত ১৯৮৫ খৃ.)। হযরত হূদ (আ) 'আদ জাতির সর্বাধিক অভিজাত শাখা খালুদ বংশে জন্মগ্রহণ করেন (আয়নী, ৭ খ., কিতাবুল আম্বিয়া, উদ্ধৃতিসহ কাসাসুল কুরআন, ১খ., পৃ. ৮৯, বৈরূত ১৯৮৫ খৃ.)। হযরত হূদ (আ) আরব বংশীয় ছিলেন। এই মর্মে এক হাদীছে ইহার প্রমাণ পাওয়া যায়। সহীহ্ ইব্ন হিব্বান-এ হযরত আবূ যার (রা) কর্তৃক বর্ণিত আম্বিয়া-ই কিরামের বর্ণনা সম্বলিত দীর্ঘ হাদীছের এক স্থানে রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেন :
منهم اربعة من العرب هود وصالح وشعيب ونبيك يا أبا ذر .
"আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত নবী-রাসূলগণের মধ্যে ৪জন আরব ছিলেন: হযরত হূদ (আ), হযরত সালিহ্ (আ), হযরত শু'আয়ব (আ) এবং তোমার নবী হে আবূ যার অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ (স)" (ইব্ন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, ১খ., পৃ. ৯৫)।
হযরত হূদ (আ)-এর বংশলতিকার একটি তুলনামূলক চিত্র বিখ্যাত মিসরীয় ঐতিহাসিক আবদুল ওয়াহ্হাব আন্-নাজ্জার তাঁহার রচিত কাসাসুল আম্বিয়া গ্রন্থে তুলিয়া ধরেন :
حضرت نوح = হযরত নূহ (আ)
)সাম( سام
)আরফাক্ষীয়( أرفخشد )আরাম( عارم
)শালিহ( شالح )আওস( عوص
)আবির( عابر )আদ( عاد
)ফালিজ( فالج )আল-খালুদ( الخلود
)রাউ( رعو )রিবাহ্( رباح
)সারূজ( سروج )আবদুল্লাহ্( عبد الله
)নাহুর( ناحور )হযরত হূদ (আ( حضرت هود
)তারিখ( تارح হযরত ইবরাহীম (আ( حضرت ابراهیم
এই বংশলতিকার স্তম্ভে দৃষ্ট হয় যে, হযরত হূদ (আ) সাম-এর ৬ষ্ঠ অধস্তন পুরুষ, পক্ষান্তরে হযরত ইবরাহীম (আ) সাম-এর ৮ম অধস্তন পুরুষ (আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৫০)।
আরব বংশ বিশেষজ্ঞ আবুল বারাকাত জাওফী লিখেন, হূদ (আ)-এর পুত্র ইয়ারুব ইব্ন কাহতান পরবর্তী কালে য়ামানে পৌঁছিয়া বসতি স্থাপন করেন। য়ামানের সকল সম্প্রদায়ই তাঁহার বংশধর। আরবী ভাষার সূচনা তাঁহার নিকট হইতেই হইয়াছে এবং তাঁহার নাম অনুসারে ভাষার নাম আরবী ও এই ভাষাভাষীর নাম হইয়াছে আরব (বাহরে মুহীত; মুফতী মুহাম্মাদ শফী, মাআরিফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত বাংলা সংস্করণ, পৃ. ৪৫৪)। কিন্তু আরেকটি তথ্য এই যে, আরবী ভাষা হযরত নূহ (আ)-এর আমল হইতে প্রচলিত ছিল। নূহ (আ)-এর কিস্তীর একজন আরোহী জুরহুম নামক ব্যক্তি আরবী ভাষায় কথা বলিতেন। এই জুরহুম হইতেই মক্কা শহর আবাদ হইয়াছে। তবে ইহা সম্ভব যে, য়ামানে আরবী ভাষার সূচনা ইয়াকুব ইব্ন কাতান হইতেই হইয়াছিল (মুফতী মুহাম্মাদ শফী, মাআরিফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত বাংলা সংস্করণ, পৃ. ৪৫৪)।
ইবন 'আসাকির তাঁহার ইতিহাস গ্রন্থে এই মর্মে আনাস ইবন মালিক (রা) হইতে একটি মওকূফ হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। হযরত আনাস (রা) বলেন, যখন আল্লাহ মানবজাতিকে বাবিল-এ একত্র করিলেন, তখন তাহাদের উপর দিয়া আল্লাহ্র হুকুমে জোরে হাওয়া প্রবাহিত হইল। তাহারা তাহাদের একত্র করার কারণ জানার জন্য এক স্থানে জড় হইল। তখন এক (অদৃশ্য) ঘোষণাকারী ঘোষণা করিলেন, "তোমাদের মধ্যে যাহারা পশ্চিমকে ডাইনে, পূর্বকে বামে রাখিবে এবং পবিত্র ঘরের দিকে মুখ করিবে তাহাদের ভাষা হইবে আকাশের বাসিন্দাদের ভাষা"। তখন কাহতানের পুত্র য়া'রুব দাঁড়ান। তাহাকে সম্বোধন করিয়া বলা হয়, "হে হূদের পুত্র য়া'রুব ইব্ন কাহতান! তুমি কি সেই ব্যক্তি?” অতঃপর তিনি হইলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি "প্রাঞ্জল আরবীতে" কথা বলেন। অতঃপর একের পর এক ঘোষণা হইতে লাগিল আর লোকেরা দাঁড়াইয়া নিজেদের সম্মতি জানাইতে থাকিল। এইভাবে মানবজাতির ভাষা বাহাত্তরটি ভাষায় বিভক্ত হইল, তখন ঘোষণা বন্ধ হইল। আর পরিণতিতে কাহারও ভাষা কেহই বুঝিতে সক্ষম না হওয়ায় তাহারা যাহার যাহার নির্ধারিত এলাকায় প্রস্থান করিল। সেই কারণেই এই দেশের নাম হয় বাবিল (আ.ত.ম. মুছলেহ উদ্দীন, আরবী সাহিত্যের ইতিহাস, পৃ. ২৩২, ঢাকা ১৯৮২ খৃ.; নতুন সংস্করণ ১৯৯৫ খৃ.)।
📄 হযরত হূদ (আ)-এর নবুওয়াত লাভ
হযরত হূদ (আ) তাঁহার নিজ কওম 'আদ-এর প্রতি নবী হিসাবে প্রেরিত হন। 'আদ হযরত নূহ (আ)-এর ৫ম পুরুষের মধ্যে এবং তাঁহার পুত্র সাম-এর বংশধরের মধ্যে এক ব্যক্তির নাম। পরবর্তী পর্যায়ে আদ নামক ব্যক্তির বংশধর ও গোটা সম্প্রদায় আদ নামে খ্যাত হয়। বংশবৃদ্ধির ফলে আদ একটি জাতিতে পরিণত হয়। আদ জাতির লোকেরা ছিল সুঠামদেহী ও দীর্ঘ আকৃতিবিশিষ্ট। তাহারা প্রচণ্ড কায়িক শক্তির অধিকারী ছিল। তাহা ছাড়া আর্থিক দিক হইতেও তাহারা অত্যন্ত সমৃদ্ধিশালী ছিল। 'আদ জাতি তাহাদের সুখ-সমৃদ্ধি ও শক্তিমত্তায় গর্বিত হইয়া আল্লাহ্র নাফরমানীতে লিপ্ত হয়। ফলে তাহাদের হিদায়াতের জন্য আল্লাহ হযরত হূদ (আ)-কে নবীরূপে প্রেরণ করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, وَإِلَى عَادٍ أَخَاهُمْ هُو "আদ সম্প্রদায়ের নিকট উহাদিগের ভ্রাতা হূদকে পাঠাইয়াছিলাম"।
📄 আল-কুরআনে হযরত হূদ (আ)
পবিত্র কুরআনের ১০টি সূরায় হযরত হুদ (আ) ও তাঁহার রিসালাত সংক্রান্ত আলোচনা এবং তাঁহার কওম অর্থাৎ কওমে আদ-এর কথা বর্ণনা করা হইয়াছে। নিম্নে সূরাসমূহের নাম ও আয়াত নম্বর উল্লেখ করা হইল :
সূরা আল-আ'রাফ: আয়াত নম্বর ৬৫, ৬৬, ৬৭, ৬৮, ৬৯, ৭০, ৭১, ৭২।
সূরা হূদ: আয়াত নম্বর ৫০, ৫১,৫২, ৫৩, ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭, ৫৮, ৫৯, ৬০।
সূরা আল-মুমিনূন: ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৪, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১, ৪২।
সূরা আস-শু'আরা: আয়াত নম্বর: ১২৩, ১২৪, ১২৫, ১২৬, ১২৭, ১২৮, ১২৯, ১৩০, ১৩১, ১৩২, ১৩৩, ১৩৪, ১৩৫, ১৩৬, ১৩৭, ১৩৮, ১৩৯, ১৪০।
সূরা হা-মীম আস-সাজদা: আয়াত নম্বর ১৫, ১৬।
সূরা আয-যারিয়াত: ৪১-৪২।
সূরা আল-আহকাফ: আয়াত নম্বর ২১-২৬।
সূরা আল-কামার: আয়াত নম্বর ১৮, ১৯, ২০, ২১।
সূরা আল-হাক্কা: আয়াত নম্বর ৬, ৭,৮।
সূরা আল-ফজর: আয়াত নম্বর ৬, ৭, ৮ (আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৫৩-৫৬)।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَإِلَى عَادٍ أَخَاهُمْ هُودًا قَالَ لِقَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلهِ غَيْرُهُ أَفَلَا تَتَّقُونَ. قَالَ الْمَلَأُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَوْمِهِ إِنَّا لَنَرَكَ فِي سَفَاهَةٍ وَإِنَّا لَنَظُنُّكَ مِنَ الْكَذِبِينَ . قَالَ لِقَوْمٍ لَيْسَ بِي سَفَاهَةً وَلَكِنِّي رَسُولٌ مِنْ رَبِّ العَلَمِينَ أَبْلِغُكُمْ رِسُلَت رَبِّي وَأَنَا لَكُمْ نَاصِحٌ أَمِينٌ : أَوَعَجِبْتُمْ أَنْ جَاءَكُمْ ذِكْرٌ مِنْ رَبِّكُمْ عَلَى رَجُلٍ مِنْكُمْ لِيُنْذِرَكُمْ وَاذْكُرُوا إِذْ جَعَلَكُمْ خُلَفَاءَ مِنْ بَعْدِ قَوْمٍ نُوحٍ وَزَادَكُمْ فِي الخَلْقِ بَصْطَةً فَاذْكُرُوا أَلَاءَ اللَّهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ . قَالُوا أَجِئْتَنَا لِنَعْبُدَ اللهَ وَحْدَهُ وَنَذَرَ مَا كَانَ يَعْبُدُ أَبَاؤُنَا فَأْتِنَا بِمَا تَعِدُنَا إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّدِقِينَ. قَالَ قَدْ وَقَعَ عَلَيْكُمْ مِنْ رَبِّكُمْ رِجْسٌ وَغَضَبٌ أَتُجَادِلُونَنِي فِي أَسْمَاء سَمَّيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَأَبَاؤُكُمْ مَا نَزَّلَ اللَّهُ بِهَا مِنْ سُلطن فَانْتَظِرُوا إِنِّي مَعَكُمْ مِّنَ الْمُنْتَظِرِينَ. فَأَنْجَيْنَهُ وَالَّذِينَ مَعَهُ بِرَحْمَةٍ مِّنَّا وَقَطَعْنَا دَابِرَ الَّذِينَ كَذَّبُوا بايَتِنَا وَمَا كَانُوا مُؤْمِنِينَ.
"আদ জাতির নিকট আমি উহাদিগের ভ্রাতা হূদকে পাঠাইয়াছিলাম। সে বলিয়াছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহ্র ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ্ নাই। তোমরা কি সাবধান হইবে না? তাহার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ, যাহারা কুফরী করিয়াছিল, তাহারা বলিয়াছিল, আমরা তো দেখিতেছ তুমি নির্বোধ এবং তোমাকে আমরা تو মিথ্যাবাদী মনে করি। সে বলিল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি নির্বোধ নহি, বরং আমি জগৎসমূহের প্রতিপালকের রাসূল। আমি আমার প্রতিপালকের বাণী তোমাদিগের নিকট পৌছাইতেছি এবং আমি তোমাদিগের একজন বিশ্বস্ত হিতাকাঙ্খী। তোমরা কি বিস্মিত হইতেছ যে, তোমাদিগের নিকট তোমাদিগের একজনের মাধ্যমে তোমাদিগের প্রতিপালকের নিকট হইতে তোমাদিগকে সতর্ক করিবার জন্য উপদেশ আসিয়াছে? এবং স্মরণ কর, আল্লাহ তোমাদিগকে নূহের সম্প্রদায়ের পরে তাহাদিগের স্থলাভিষিক্ত করিয়াছেন এবং তোমাদিগের অবয়ব অন্য লোক অপেক্ষা শক্তিতে অধিকতর সমৃদ্ধ করিয়াছেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ্র অনুগ্রহ স্মরণ কর, হয়ত তোমরা সফলকাম হইবে। তাহারা বলিল, তুমি কি আমাদিগের নিকট এই উদ্দেশ্যে আসিয়াছ যে, আমরা যেন এক আল্লাহর ইবাদত করি এবং আমাদিগের পূর্বপুরুষগণ যাহার ইবাদত করিত তাহা বর্জন করি? সুতরাং তুমি সত্যবাদী হইলে আমাদিগকে যাহার ভয় দেখাইতেছ তাহা আনয়ন কর। সে বলিল, তোমাদিগের প্রতিপালকের শান্তি ও ক্রোধ তো তোমাদিগের জন্য নির্ধারিত হইয়াই আছে; তবে কি তোমরা আমার সহিত বিতর্কে লিপ্ত হইতে চাহ এমন কতগুলি নাম সম্বন্ধে যাহা তোমরা ও তোমাদিগের পিতৃপুরুষগণ সৃষ্টি করিয়াছ এবং যে সম্বন্ধে আল্লাহ কোন সনদ পাঠান নাই? সুতরাং তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমিও তোমাদিগের সহিত প্রতীক্ষা করিতেছি। অতঃপর তাহাকে ও তাহার সঙ্গীদিগকে আমার অনুগ্রহে উদ্ধার করিয়াছিলাম; আর আমার নিদর্শনকে যাহারা প্রত্যাখ্যান করিয়াছিল এবং যাহারা মুমিন ছিল না তাহাদিগকে নির্মূল করিয়াছিলাম” (৭ঃ ৬৫-৭২)।
وَإِلَى عَادٍ أَخَاهُمْ هُودًا قَالَ يُقَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهِ غَيْرُهُ إِنْ أَنْتُمْ إِلَّا مُفْتَرُونَ . يُقَوْمِ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى الَّذِي فَطَرَنِي أَفَلَا تَعْقِلُونَ. وَيُقَوْمِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا وَيَزِدكُمْ قُوَّةً إِلَى قُوَّتِكُمْ وَلَا تَتَوَلُّوا مُجْرِمِينَ . قَالُوا يهُودُ مَا جِئْتَنَا بِبَيِّنَةٍ وَمَا نَحْنُ بِتَارِكِي آلِهَتِنَا عَنْ قَوْلِكَ وَمَا نَحْنُ لَكَ بِمُؤْمِنِينَ إِنْ نَقُولُ إِلَّا اعْتَرَاكَ بَعْضُ آلِهَتِنَا بِسُوءٍ قَالَ إِنِّي أُشْهِدُ اللَّهَ وَاشْهَدُوا أَنِّي بَرِيءٌ مِّمَّا تُشْرِكُونَ مِنْ دُونِهِ فَكِيدُونِي جَمِيعًا ثُمَّ لَا تُنْظِرُونِ إِنِّي تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ رَبِّي وَرَبَّكُمْ مَا مِنْ دَابَّةٍ إِلَّا هُوَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهَا إِنَّ رَبِّي عَلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ، فَإِنْ تَوَلَّوا فَقَدْ أَبْلَغْتُكُمْ مَا أُرْسِلْتُ بِهِ إِلَيْكُمْ وَيَسْتَخْلِفُ رَبِّي قَوْمًا غَيْرَكُمْ وَلَا تَضُرُّونَهُ شَيْئًا إِنَّ رَبِّي عَلَى كُلِّ شَيْءٍ حَفِيظٌ وَلَمَّا جَاءَ أَمْرُنَا نَجَّيْنَا هُودًا وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ بِرَحْمَةٍ مِنَّا وَنَجَّيْنَهُمْ مِنْ عَذَابٍ غَلِيظ . وَتِلْكَ عَادٌ جَحَدُوا بِآيَتِ رَبِّهِمْ وَعَصَوْا رُسُلَهُ وَاتَّبَعُوا أَمْرَ كُلَّ جَبَّارٍ عَنِيدٍ. وَأُتْبِعُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا لَعْنَةً وَيَوْمَ الْقِيمَةِ أَلَا إِنَّ عَادَا كَفَرُوا رَبَّهُمْ أَلَا بُعْدًا لعَادٍ قَوْمٍ هُودٍ .
"আমি আদ জাতির নিকট উহাদিগের ভ্রাতা হৃদকে পাঠাইয়াছিলাম। সে বলিয়াছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহ্ ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের জন্য কোন ইলাহ্ নাই। তোমরা তো কেবল মিথ্যা রচনাকারী। হে আমার সম্প্রদায়! আমি ইহার পরিবর্তে তোমাদিগের নিকট পারিশ্রমিক যাজ্ঞা করি না। আমার পারিশ্রমিক আছে তাঁহারই নিকট যিনি আমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন। তোমরা কি তবুও অনুধাবন করিবে না? হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদিগের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁহার দিকেই ফিরিয়া আস। তিনি তোমাদিগের জন্য প্রচুর বারি বর্ষাইবেন। তিনি তোমাদিগকে আরও শক্তি দিয়া তোমাদিগের শক্তি বৃদ্ধি করিবেন এবং তোমরা অপরাধী হইয়া মুখ ফিরাইয়া লইও না। উহারা বলিল, হে হৃদ! তুমি আমাদিগের নিকট কোন স্পষ্ট প্রমাণ আনয়ন কর নাই, তোমার কথায় আমরা আমাদিগের ইলাহ্রদিগকে পরিত্যাগ করিবার নহি এবং আমরা তোমাতে বিশ্বাসী নহি। আমরা তো ইহাই বলি, আমাদিগের ইলাহ্রদিগের মধ্যে কেহ তোমাকে অশুভ দ্বারা আবিষ্ট করিয়াছে। সে বলিল, আমি আল্লাহকে সাক্ষী করিতেছি এবং তোমরাও সাক্ষী হও যে, আমি তাহা হইতে নির্লিপ্ত যাহাকে তোমরা আল্লাহ্ শরীক কর, আল্লাহ ব্যতীত। তোমরা সকলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কর, অতঃপর আমাকে অবকাশ দিও না। আমি নির্ভর করি আমার ও তোমাদিগের প্রতিপালক আল্লাহ্র উপর; এমন কোন জীব-জন্তু নাই, যে তাঁহার পূর্ণ আয়ত্তাধীন নহে; নিশ্চয় আমার প্রতিপালক আছেন সরল পথে। অতঃপর তোমরা মুখ ফিরাইয়া লইলেও আমি যাহাসহ তোমাদিগের নিকট প্রেরিত হইয়াছি, আমি তো তাহা তোমাদিগের নিকট পৌঁছাইয়া দিয়াছি এবং আমার প্রতিপালক তোমাদিগ হইতে ভিন্ন কোন সম্প্রদায়কে তোমাদিগের স্থলাভিষিক্ত করিবেন এবং তোমরা তাঁহার কোন ক্ষতি সাধন করিতে পারিবে না। নিশ্চয় আমার প্রতিপালক সমস্ত কিছুর রক্ষণাবেক্ষণ করেন। এবং যখন আমার নির্দেশ আসিল তখন আমি হূদ ও তাহার সঙ্গে যাহারা ঈমান আনিয়াছিল তাহাদিগকে আমার অনুগ্রহে রক্ষা করিলাম এবং রক্ষা করিলাম তাহাদিগকে কঠিন শাস্তি হইতে। এই আদ জাতি তাহাদিগের প্রতিপালকের নিদর্শনসমূহ অস্বীকার করিয়াছিল এবং অমান্য করিয়াছিল তাঁহার রাসূলগণকে এবং উহারা প্রত্যেক উদ্ধত স্বৈরাচারীর নির্দেশ অনুসরণ করিত। এই দুনিয়ায় উহাদিগকে করা হইয়াছিল লা'নতগ্রস্ত এবং লা'নতগ্রস্ত হইবে উহারা কিয়ামতের দিনেও। জানিয়া রাখ! আদ সম্প্রদায় তাহাদিগের প্রতিপালককে অস্বীকার করিয়াছিল। জানিয়া রাখ! ধ্বংসই হইল হূদের সম্প্রদায় আদের পরিণাম" (১১: ৫০-৬০)।
ثُمَّ أَنْشَأْنَا مِنْ بَعْدِهِمْ قَرْنًا أَخَرِيْنَ . فَأَرْسَلْنَا فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ اللَّهِ غَيْرُهُ أَفَلَا تَتَّقُونَ . وَقَالَ الْمَلأ مِنْ قَوْمِهِ الَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بلقاء الأخرَةِ وَاتْرَفْنَهُمْ فِي الْحَيَوةِ الدُّنْيَا مَا هُذَا إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ بَأْكُلُ مِمَّا تَأْكُلُونَ مِنْهُ وَيَشْرَبُ مِمَّا تَشْرَبُونَ . وَلَئِنْ أَطَعْتُمْ بَشَرًا مِّثْلَكُمْ إِنَّكُمْ إِذًا لَخَسِرُونَ ، أَيَعِدُكُمْ أَنَّكُمْ إِذَا مِتُّمْ وَكُنْتُمْ تُرَابًا وَعِظَامًا أَنَّكُمْ مُخْرَجُونَ . هَيْهَاتَ هَيْهَاتَ لِمَا تُوعَدُونَ إِنْ هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا نَحْنُ بِمَبْعُوثِينَ . إِنْ هُوَ إِلَّا رَجُلٌ افْتَرَى عَلَى اللهِ كَذِبًا وَمَا نَحْنُ لَهُ بِمُؤْمِنِينَ . قَالَ رَبِّ انْصُرْنِي بِمَا كَذَّبُونِ . قَالَ عَمَّا قَلِيْلٍ لَيُصْبِحُنُ نَدِمِينَ . فَأَخَذَتْهُمُ الصَّيْحَةُ بِالْحَقِّ فَجَعَلْنَهُمْ غُثَاءٌ فَبُعْدًا لِلْقَوْمِ الظَّالِمِينَ . ثُمَّ أَنْشَأْنَا مِنْ بَعْدِهِمْ قُرُونَا أَخَرِيْنَ .
"অতঃপর আমি তাহাদিগের পর অন্য এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করিয়াছিলাম এবং উহাদিগেরই একজনকে উহাদিগের নিকট রাসূল করিয়া পাঠাইয়াছিলাম। সে বলিয়াছিল, তোমরা আল্লাহ্ ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদিগের অন্য কোন ইলাহ্ নাই। তবুও কি তোমরা সাবধান হইবে না? তাহার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ, যাহারা কুফরী করিয়াছিল ও আখিরাতের সাক্ষাৎকারকে অস্বীকার করিয়াছিল এবং যাহাদিগকে আমি দিয়াছিলাম পার্থিব জীবনে প্রচুর ভোগসম্ভার, তাহারা বলিয়াছিল, সে তো তোমাদিগের মত একজন মানুষই; তোমরা যাহা আহার কর সে তো তাহাই আহার করে এবং তোমরা যাহা পান কর সেও তাহাই পান করে। যদি তোমরা তোমাদিগের মত একজন মানুষের আনুগত্য কর তবে তোমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। সে কি তোমাদিগকে এই প্রতিশ্রুতিই দেয় যে, তোমাদিগের মৃত্যু হইলে এবং তোমরা মৃত্তিকা ও অস্থিতে পরিণত হইলেও তোমাদিগকে পুনরুত্থিত করা হইবে? অসম্ভব, তোমাদিগকে যে বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছে তাহা অসম্ভব। একমাত্র পার্থিব জীবনই আমাদিগের জীবন, আমরা মরি-বাঁচি এইখানেই এবং আমরা পুনরুত্থিত হইব না। সে তো এমন এক ব্যক্তি যে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করিয়াছে এবং আমরা তাহাকে বিশ্বাস করিবার নহি। সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য কর; কারণ উহারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে। আল্লাহ বলিলেন, অচিরে উহারা অনুতপ্ত হইবেই। অতঃপর সত্যসত্যই এক বিকট আওয়াজ উহাদিগকে আঘাত করিল এবং আমি উহাদিগকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করিয়া দিলাম। সুতরাং ধ্বংস হইয়া গেল জালিম সম্প্রদায়। অতঃপর তাহাদিগের পরে আমি বহু জাতি সৃষ্টি করিয়াছি” (২৬: ৩১-৪২)।
كَذَّبَتْ عَادُ الْمُرْسَلِينَ إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ هُودٌ أَلَا تَتَّقُونَ إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ. وَمَا أَسْتَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعُلَمِينَ. أَتَبْنُونَ بِكُلِّ رِبْعِ أَيَةً تَعْبَثُونَ. وَتَتَّخِذُونَ مَصَانِعَ لَعَلَّكُمْ تَخْلُدُونَ . وَإِذَا بَطَشْتُمْ بَطَشْتُمْ جَبَّارِينَ. فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ وَاتَّقُوا الَّذِي آمَدَكُمْ بِمَا تَعْلَمُونَ آمَدَكُمْ بِأَنْعَامِ وَبَنِينَ وَجَنَّتٍ وَعُيُونٍ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ قَالُوا سَوَاءٌ عَلَيْنَا أَوَعَظَتَ أَمْ لَمْ تَكُنْ مِّنَ الْوَاعِظِينَ إِنْ هَذَا إِلَّا خُلُقُ الأَوَّلِينَ وَمَا نَحْنُ بِمُعَذَّبِينَ فَكَذَّبُوهُ فَأَهْلَكْنَهُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ.
"আদ সম্প্রদায় রাসূলগণকে অস্বীকার করিয়াছিল। যখন উহাদিগের ভ্রাতা হুদ উহাদিগকে বলিল, তোমরা কি সাবধান হইবে না? আমি তোমাদিগের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসূল। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। আমি তোমাদিগের নিকট ইহার জন্য কোন প্রতিদান চাহি না, আমার পুরস্কার তো জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট আছে। তোমরা কি প্রতিটি উচ্চ স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করিতেছ নিরর্থক? আর তোমরা প্রাসাদ নির্মাণ করিতেছ এই মনে করিয়া যে, তোমরা চিরস্থায়ী হইবে। এবং যখন তোমরা আঘাত হান তখন আঘাত হানিয়া থাক কঠোরভাবে। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। ভয় কর তাঁহাকে যিনি তোমাদিগকে দিয়াছেন সেই সমুদয় যাহা তোমরা জান। তিনি তোমাদিগকে দিয়াছেন আন'আম ও সন্তান-সন্তুতি। উদ্যান ও প্রস্রবণ। আমি তোমাদিগের জন্য আশংকা করি মহাদিবসের শাস্তির। উহারা বলিল, তুমি উপদেশ দাও অথবা না-ই দাও, উভয়ই আমাদিগের জন্য সমান। ইহা তো পূর্ববর্তীদিগেরই স্বভাব। আমরা শাস্তিপ্রাপ্তদিগের শামিল নহি। অতঃপর উহারা তাহাকে প্রত্যাখ্যান করিল এবং আমি উহাদিগকে ধ্বংস করিলাম। ইহাতে অবশ্যই আছে নিদর্শন; কিন্তু উহাদিগের অধিকাংশই মুমিন নহে। এবং তোমার প্রতিপালক, তিনি তো পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু” (২৬ : ১২৩-১৪০)।
فَأَمَّا عَادٌ فَاسْتَكْبَرُوا فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَقَالُوا مَنْ أَشَدُّ مِنَّا قُوَّةً أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّ اللَّهَ الَّذِي خَلَقَهُمْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُمْ قُوَّةً وَكَانُوا بِأَيْتِنَا يَجْحَدُونَ . فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا صَرْصَرًا فِي أَيَّامٍ نَحِسَاتٍ لِنُذِيقَهُمْ عَذَابَ الخزي في الحيوة الدُّنْيَا وَلَعَذَابُ الْآخِرَةِ أُخْرَى وَهُمْ لَا يُنْصَرُونَ .
“আর আদ সম্প্রদায়ের ব্যাপার এই যে, উহারা পৃথিবীতে অযথা দম্ভ করিত এবং বলিত, আমাদিগের অপেক্ষা শক্তিশালী কে আছে? উহারা কি তবে লক্ষ্য করে নাই যে, আল্লাহ যিনি উহাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন, তিনি উহাদিগের অপেক্ষা শক্তিশালী? অথচ উহারা আমার নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করিত। অতঃপর আমি উহাদিগকে পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করাইবার জন্য উহাদিগের বিরুদ্ধে প্রেরণ করিয়াছিলাম ঝঞ্ঝাবায়ু অশুভ দিনে। আখিরাতের শাস্তি তো অধিকতর লাঞ্ছনাদায়ক এবং উহাদিগকে সাহায্য করা হইবে না” (৪১ : ১৫-১৬)।
وَاذْكُرْ أَخَا عَادٍ إِذْ أَنْذَرَ قَوْمَهُ بِالأَحْقَافِ وَقَدْ خَلَتِ النُّذُرُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ قَالُوا أَجِئْتَنَا لِتَأْفِكَنَا عَنْ الهَتِنَا فَأْتِنَا بِمَا تَعِدُنَا إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّدِقِينَ. قَالَ إِنَّمَا الْعِلْمُ عِنْدَ اللهِ وَأَبْلِغُكُمْ مَا أُرْسِلْتُ بِهِ وَلَعَنَى أَرَاكُمْ قَوْمًا تَجْهَلُونَ، فَلَمَّا رَأَوْهُ عَارِضًا مُسْتَقْبِلَ أَوْدِيَتِهِمْ قَالُوا هذا عَارِضَ مُمْطِرُنَا بَلْ هُوَ مَا اسْتَعْجَلْتُمْ بِهِ رِيحٌ فِيهَا عَذَابٌ أَلِيمٌ . تُدَمِّرُ كُلَّ شَيْءٍ بِأَمْرِ رَبِّهَا فَأَصْبَحُوا لَا يُرَى إِلَّا مَسكِنُهُمْ كَذَلِكَ نَجْزِي القَوْمَ الْمُجْرِمِينَ. وَلَقَدْ مَكَّنَّهُمْ فِيْمَا إِنْ مَّكَّنَّكُمْ فِيْهِ وَجَعَلْنَا لَهُمْ سَمْعًا وَأَبْصَارًا وَأَفْئِدَةً فَمَا أَغْنَى عَنْهُمْ سَمْعُهُمْ وَلَا أَبْصَارُهُمْ وَلَا أَفْئِدَتُهُمْ مِنْ شَيْءٍ إِذْ كَانُوا يَجْحَدُونَ بِأَيْتِ اللهِ وَحَاقَ بِهِمْ مَا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِءُونَ.
"স্মরণ কর আদ সম্প্রদায়ের ভ্রাতার কথা, যাহার পূর্বে এবং পরেও সতর্ককারীরা আসিয়াছিল। সে তাহার আহকাফবাসী সম্প্রদায়কে সতর্ক করিয়াছিল এই বলিয়া, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত কাহারও ইবাদত করিও না। আমি তোমাদিগের জন্য মহাদিবসের শাস্তি আশংকা করিতেছি। উহারা বলিয়াছিল, তুমি আমাদিগকে আমাদিগের দেব-দেবীগুলির পূজা হইতে নিবৃত্ত করিতে আসিয়াছ? তুমি সত্যবাদী হইলে আমাদিগকে যাহার ভয় দেখাইতেছ তাহা আনয়ন কর। সে বলিল, ইহার জ্ঞান তো কেবল আল্লাহরই নিকট আছে। আমি যাহা লইয়া প্রেরিত হইয়াছি কেবল তাহাই তোমাদিগের নিকট প্রচার করি। কিন্তু আমি দেখিতেছি, তোমরা এক মূঢ় সম্প্রদায়। অতঃপর যখন তাহারা উহাদিগের উপত্যকার দিকে মেঘ আসিতে দেখিল তখন বলিতে লাগিল, উহা তো মেঘ, আমাদিগকে বৃষ্টি দান করিবে। হৃদ বলিল, ইহাই তো তাহা, যাহা তোমরা ত্বরান্বিত করিতে চাহিয়াছ, এক ঝড়, মর্মন্তুদ শাস্তি বহনকারী। আল্লাহ্র নির্দেশে ইহা সমস্ত কিছুকে ধ্বংস করিয়া দিবে। অতঃপর উহাদিগের পরিণাম এই হইল যে, উহাদিগের বসতিগুলি ছাড়া আর কিছুই রহিল না। এইভাবে আমি অপরাধী সম্প্রদায়কে প্রতিফল দিয়া থাকি। আমি উহাদিগকে যে প্রতিষ্ঠা দিয়াছিলাম তোমাদিগকে তাহা দেই নাই। আমি উহাদিগকে দিয়াছিলাম কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয়; কিন্তু এইগুলি উহাদিগের কোন কাজে আসে নাই। কেননা উহারা আল্লাহ্র আয়াতকে অস্বীকার করিয়াছিল। যাহা লইয়া উহারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিত উহাই উহাদিগকে পরিবেষ্টন করিল" (৪৬: ২১-২৬)।
وَفِي عَادٍ إِذْ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِمُ الرِّيحَ العَقِيمَ. مَا تَذَرُ مِنْ شَيْءٍ أَتَتْ عَلَيْهِ إِلَّا جَعَلَتْهُ كَالرَّحِيمِ.
"এবং নিদর্শন রহিয়াছে আদের ঘটনায়, যখন আমি তাহাদিগের বিরুদ্ধে প্রেরণ করিয়াছিলাম অকল্যাণকর বায়ু। ইহা যাহা কিছুর উপর দিয়া প্রবাহিত হইয়া গিয়াছিল তাহাকেই চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিয়াছিল" (৫১:৪১-২)।
كَذَّبَتْ عَادٌ فَكَيْفَ كَانَ عَذَابِي وَنُذُرِ . إِنَّا أَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا صَرْصَرًا فِي يَوْمٍ نَحْسٍ مُّسْتَمِرٌ. تَنْزِعُ النَّاسَ كَأَنَّهُمْ أَعْجَازُ نَخْلٍ مُّنْقَعِرٍ. فَكَيْفَ كَانَ عَذَابِي وَنُذُرِ .
"আদ সম্প্রদায় সত্য প্রত্যাখ্যান করিয়াছিল, ফলে কী কঠোর হইয়াছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী! উহাদিগের উপর আমি প্রেরণ করিয়াছিলাম ঝঞ্ঝাবায়ু নিরবচ্ছিন্ন দুর্ভাগ্যের দিনে, মানুষকে উহা উৎখাত করিয়াছিল উম্মলিত খর্জুর কাণ্ডের ন্যায়। কী কঠোর ছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী” (৫৪: ১৮-২১)।
وَأَمَّا عَادٌ فَأَهْلِكُوا بِرِيْعٍ صَرْصَرَ عَاتِيَةٍ. سَخَّرَهَا عَلَيْهِمْ سَبْعَ لَيَالٍ وَثَمُنِيَةَ أَيَّامٍ حُسُوْمًا فَتَرَى الْقَوْمَ فِيهَا صَرْعى كَأَنَّهُمْ أَعْجَازُ نَخْلٍ خَاوِيَةٍ. فَهَلْ تَرَى لَهُمْ مِنْ بَاقِيَةٍ .
"আর আদ সম্প্রদায়, উহাদিগকে ধ্বংস করা হইয়াছিল এক প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবায়ু দ্বারা, যাহা তিনি উহাদিগের উপর প্রবাহিত করিয়াছিলেন সপ্ত রাত্রি ও অষ্ট দিবস বিরামহীনভাবে। তখন তুমি উক্ত সম্প্রদায়কে দেখিত- উহারা সেথায় লুটাইয়া পড়িয়া আছে সারশূন্য বিক্ষিপ্ত খর্জুর কাণ্ডের ন্যায়। অতঃপর উহাদিগের কাহাকেও তুমি বিদ্যমান দেখিতে পাও কি" (৬৯ঃ ৬-৮)?
أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِعَادٍ : إِرَمَ ذَاتِ الْعِمَادِ . الَّتِي لَمْ يُخْلَقْ مِثْلُهَا فِي الْبِلَادِ .
"তুমি কি দেখ নাই তোমার প্রতিপালক কি করিয়াছিলেন আদ বংশের ইরাম গোত্রের প্রতি, যাহারা অধিকারী ছিল সুউচ্চ প্রাসাদের, যাহার সমতুল্য কোন দেশে নির্মিত হয় নাই" (৮৯: ৬-৮)?
📄 হাদীছ শরীফে হযরত হূদ (আ)
হাদীছে হযরত হূদ (আ)-এর বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে কতক হাদীছে হযরত হৃদ (আ)-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) এক দিন হযরত রাসূলুল্লাহ (স)-এর কিছু দাড়ি পাকা দেখিলেন এবং বিচলিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি বার্ধক্যে উপনীত হইয়াছেন! রাসূলে পাক (স) বলেন, "হাঁ" সূরা হৃদ আমাকে বৃদ্ধ করিয়া দিয়াছে” (মাআরিফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত বাংলা অনু., পৃ. ৬১৯)। এই হাদীছ হইতে বুঝা যায় যে, বিশেষত এই সূরায় হযরত নূহ (আ), হযরত হূদ (আ) ও হযরত সালিহ (আ)-এর দাওয়াতী কার্যক্রমের বর্ণনা এবং তাঁহাদের কওমের নাফরমানির কথা অবগত হইয়া মহানবী (স) বিচলিত হইয়াছিলেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত হূদ (আ) সর্বপ্রথম আরবী ভাষায় কথা বলেন। ওয়াহ্হাব ইব্ন মুনাব্বিহ মনে করেন, হযরত হূদ (আ)-এর পিতা সর্বপ্রথম আরবী ভাষায় কথা বলেন (আবদুল ওয়াহ্হাব আন্-নাজ্জার, কাসাসুল কুরআন, পৃ. ৪৯; ইব্ন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৯৫)।
সহীহ্ ইব্ন হিব্বানে হযরত আবূ যার (রা) বর্ণিত দীর্ঘ হাদীছে নবী ও রাসূলগণের বর্ণনার এক স্থানে নবী করীম (স) বলেনঃ
مِنْهُمْ أَرْبَعَةٌ مِّنَ الْعَرَبِ هُودٌ وَصَالِحٌ وَشُعَيْبٌ وَنَبِيُّكَ يَا أَبَا ذَرٍ.
"(আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত) নবী-রাসূলগণের মধ্যে ৪জন আরব ছিলেন: হযরত হূদ, হযরত সালিহ, হযরত শু'আয়ব এবং তোমার নবী, হে আবূ যার" (ইব্ন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৯৫)।
হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীছে আদ জাতি ও হযরত হূদ (আ) সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّهُمُ اتَّخَذُوا صَنَما يُقَالُ لَهُ صَمُودًا وَصَنَمًا يُقَالُ لَهُ الْهَتَارُ فَبَعَثَ اللَّهُ إِلَيْهِمْ هُودًا وَكَانَ هُودٌ مِنْ قَبِيلَةٍ يُقَالُ لَهَا الْخُلُودُ وَكَانَ مِنْ أَوْسَطَهِمْ نَسَبًا وَأَصْبَحَهُمْ وَجْهَا وَكَانَ فِي مِثْلِ أَجْسَادِهِمْ أَبْيَضُ بَادِيُّ الْعَنْفَقَةِ طَوِيلَ اللَّحْيَةِ فَدَعَاهُمْ إِلَى عِبَادَةِ اللهِ وَأَمَرَهُمْ أَنْ يُوَحِدُوهُ وَأَنْ يَكْفُوا عَنْ ظَلَمِ النَّاسِ فَأَبَوْا ذَلِكَ وَكَذَّبُوهُ وَقَالُوا ( مَنْ أَشَدُّ مِنَّا قُوَّةً) .
"হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আদ জাতি 'সামূদ' ও 'আল-হাতার' নামক দুইটি মূর্তির পূজা করিতে শুরু করে। অতঃপর আল্লাহ তাহাদের নিকট হযরত হূদ (আ)-কে নবী হিসাবে প্রেরণ করেন। তিনি খালুদ গোত্রের সন্তান ছিলেন। তিনি বংশের দিক হইতে অভিজাত এবং সুন্দর চেহারাবিশিষ্ট ছিলেন। তাঁহার শরীরের রং সাদা, চিবুক চুলপূর্ণ, দাড়ি লম্বা ছিল। তিনি তাহাদেরকে আল্লাহ্ ইবাদত করার ও তাঁহাকে একমাত্র স্রষ্টা হিসাবে মানার জন্য বলেন এবং মানুষের উপর অত্যাচার করা হইতে বিরত থাকিতে বলেন। কিন্তু তাহারা হযরত হৃদ (আ)-কে মিথ্যুক বলে এবং গর্ব করিয়া বলে, আমাদের চাইতে শক্তিশালী আর কে আছে” (তাফসীরুল মানার, খ. ৭, পৃ. ৪৯৮)!