📄 ভূমিকা
মহান আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার মানুষের হিদায়াতের জন্য অগণিত নবী-রাসূল প্রেরণ করিয়াছেন। সেই ধারাবাহিকতায় তিনি হযরত হূদ (আ)-কে তাঁহার নিজের কাওম আদ-এর প্রতি নবী হিসাবে প্রেরণ করেন। পবিত্র কুরআনে এই সম্পর্কে বলা হইয়াছে: وَإِلَى عَادٍ أَخَاهُمْ هُوداً “আদ সম্প্রদায়ের নিকট উহাদিগের ভ্রাতা হৃদকে পাঠাইয়াছিলাম" (১১:৫০)। হযরত হূদ (আ) হযরত নূহ (আ)-এর পর নবী হিসাবে আসিয়াছিলেন। হযরত আদম (আ) হইতে হযরত নূহ (আ)-এর পূর্ব পর্যন্ত প্রেরিত নবীগণের সময় শরীআতের বিস্তারিত নির্দেশাবলী নাযিল হয় নাই। ঐ পর্যায়ের নবীগণ মুখ্যত মানুষকে তাওহীদের শিক্ষা দিতেন। হযরত নূহ (আ) হইতে নবুওয়াত ও রিসালাতের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়। হযরত নূহ (আ)-এর সময়ে শরীআতের নির্দেশাবলী অবতীর্ণ হইলেও জিহাদের নির্দেশ অবতীর্ণ হয় নাই। জিহাদের বিধান হযরত মূসা (আ)-এর সময় হইতে কার্যকর হয়। জিহাদের নির্দেশের পূর্বে কোন কাওমের নিকট প্রেরিত নবী-রাসূলের বিরোধিতাকারী ঐ কাওমের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট নবী অথবা তাঁহার অনুসারীগণের পক্ষে জিহাদের কোন অবকাশ ছিল না। আল্লাহ তা'আলা ঐসব নাফরমান কাওমকে দুনিয়াবী আযাব ও গযব দিয়া ধ্বংস করিয়া দিতেন। আল্লাহ হযরত হূদ (আ)-এর কাওমকেও তাহাদের নাফরমানীর কারণে আযাব প্রেরণ করিয়া ধ্বংস করিয়া দেন।
📄 হযরত হূদ (আ)-এর জন্ম
তাওরাতে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, এবর (হৃদ) যখন জন্মগ্রহণ করেন, তখন তাঁহার পিতা শেলহ-এর বয়স ছিল ৩০ বৎসর। হযরত হূদ (আ)-এর মোট বয়স ছিল ৪৬৪ বৎসর (বাইবেল, আদিপুস্তক ১১: ১৫; আম্বিয়ায়ে কুরআন, খ. ১, পৃ. ১২৩)।
বাইবেলের বর্ণনায় যাঁহাকে এবর বলা হইয়াছে তিনিই হযরত হূদ (আ)। উক্ত বর্ণনার আলোকে তাঁহার বয়সও নির্ধারণ করা যায়। যেমন এবর (হৃদ) ৩৪ বৎসর বয়সে পেলগের জন্ম দেওয়ার পর আরও ৪৩০ বৎসর জীবিত ছিলেন। তাই তাঁহার মোট বয়স ছিল ৪৬৪ বৎসর।
হযরত হূদ (আ)-এর বংশ ও জন্ম সম্পর্কিত কিছু তথ্য ছাড়া বাইবেলের আদিপুস্তক হইতে আর কোন বিবরণ পাওয়া যায় না। এই সম্পর্কে মুহাম্মাদ জামীল আহমাদ বলেন, "হযরত হূদ (আ)-এর নবুওয়াতের তথ্য ও তাঁহার ওয়াজ-নসীহত, দাওয়াত ও তাবলীগ, তাঁহার কাওমের নাফরমানী ও বিদ্রোহ এবং সর্বশেষ তাহাদের ধ্বংস সম্পর্কিত ঘটনা পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হইয়াছে। তাওরাত এই সম্পর্কে নীরব" (আম্বিয়ায়ে কুরআন, খ.১, পৃ. ১২৪)।
📄 হযরত হূদ (আ)-এর বংশপরিচয়
হুদ ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন রিবাহ ইব্ন খালুদ ইব্ন 'আদ ইব্ন আওস ইব্ন ইরাম ইব্ন সাম ইব্ন নূহ (আ)। ৪র্থ পুরুষে তাঁহার পরদাদা 'আদ ইব্ন আওস-এর নামযুক্ত যে গোত্র ছিল, সেই গোত্রের সঙ্গে তিনি সম্পর্কিত ছিলেন। তাঁহার বংশলতিকা সাম ইব্ন নূহ (আ) পর্যন্ত যাইয়া হযরত ইবরাহীম (আ)-এর বংশের সহিত মিলিয়া যায়। হযরত হূদ (আ) ও সাম-এর মধ্যে ৬ পুরুষের ব্যবধান বিদ্যমান (গুলাম নবী, মুকাম্মাল কাসাসুল কুরআন, ১খ, পৃ. ৭৫)। মুহাম্মাদ জামীল আহমাদ রচিত আম্বিয়ায়ে কুরআন নামক গ্রন্থে হযরত হূদ (আ)-এর বংশলতিকা নিম্নোক্তরূপে দেখানো হইয়াছে:
حضرت نوح عليه السلام Noah Shem সাম Arpachshad ارفخشد Arphaxad Salah سلح Eber عبر حضرت هود )
উপরিউক্ত বংশলতিকায় হযরত হূদ (আ)-কে ইবার (عبر) বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। তাওরাতের বর্ণনা অনুযায়ী হুদ (আ) হযরত আদম (আ)-এর ১৪তম অধস্তন এবং হযরত নূহ (আ)-এর ৫ম অধস্তন পুরুষ (আম্বিয়ায়ে কুরআন, খ. ১, পৃ. ১২৩; বাইবেল, আদিপুস্তক, পৃ. ১৩)।
ইব্ন কাছীর রচিত কাসাসুল আম্বিয়া গ্রন্থে হযরত হূদ (আ)-এর বংশলতিকা নিম্নোক্তরূপে উল্লেখ করা হইয়াছে : হূদ ইব্ন শালিখ ইব্ন আরফাখশায ইব্ন সাম ইব্ন নূহ (আ)। কেহ বলেন, হযরত হূদ (আ) হইলেন আবির ইব্ন শালিক ইব্ন আরফাশায ইব্ন সাম ইব্ন নূহ (আ) অথবা কেহ বলেন, হূদ ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন বিরাহ ইব্ন আল-জারূদ ইব্ন 'আদ ইব্ন আওস ইব্ন ইরাম ইব্ন সাম ইব্ন নূহ (আ) (এই বংশলতিকাটি ইব্ন জারীর উল্লেখ করেন; ইব্ন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, ১খ., পৃ. ৯৫, বৈরূত ১৯৮৫ খৃ.)। হযরত হূদ (আ) 'আদ জাতির সর্বাধিক অভিজাত শাখা খালুদ বংশে জন্মগ্রহণ করেন (আয়নী, ৭ খ., কিতাবুল আম্বিয়া, উদ্ধৃতিসহ কাসাসুল কুরআন, ১খ., পৃ. ৮৯, বৈরূত ১৯৮৫ খৃ.)। হযরত হূদ (আ) আরব বংশীয় ছিলেন। এই মর্মে এক হাদীছে ইহার প্রমাণ পাওয়া যায়। সহীহ্ ইব্ন হিব্বান-এ হযরত আবূ যার (রা) কর্তৃক বর্ণিত আম্বিয়া-ই কিরামের বর্ণনা সম্বলিত দীর্ঘ হাদীছের এক স্থানে রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেন :
منهم اربعة من العرب هود وصالح وشعيب ونبيك يا أبا ذر .
"আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত নবী-রাসূলগণের মধ্যে ৪জন আরব ছিলেন: হযরত হূদ (আ), হযরত সালিহ্ (আ), হযরত শু'আয়ব (আ) এবং তোমার নবী হে আবূ যার অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ (স)" (ইব্ন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, ১খ., পৃ. ৯৫)।
হযরত হূদ (আ)-এর বংশলতিকার একটি তুলনামূলক চিত্র বিখ্যাত মিসরীয় ঐতিহাসিক আবদুল ওয়াহ্হাব আন্-নাজ্জার তাঁহার রচিত কাসাসুল আম্বিয়া গ্রন্থে তুলিয়া ধরেন :
حضرت نوح = হযরত নূহ (আ)
)সাম( سام
)আরফাক্ষীয়( أرفخشد )আরাম( عارم
)শালিহ( شالح )আওস( عوص
)আবির( عابر )আদ( عاد
)ফালিজ( فالج )আল-খালুদ( الخلود
)রাউ( رعو )রিবাহ্( رباح
)সারূজ( سروج )আবদুল্লাহ্( عبد الله
)নাহুর( ناحور )হযরত হূদ (আ( حضرت هود
)তারিখ( تارح হযরত ইবরাহীম (আ( حضرت ابراهیم
এই বংশলতিকার স্তম্ভে দৃষ্ট হয় যে, হযরত হূদ (আ) সাম-এর ৬ষ্ঠ অধস্তন পুরুষ, পক্ষান্তরে হযরত ইবরাহীম (আ) সাম-এর ৮ম অধস্তন পুরুষ (আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৫০)।
আরব বংশ বিশেষজ্ঞ আবুল বারাকাত জাওফী লিখেন, হূদ (আ)-এর পুত্র ইয়ারুব ইব্ন কাহতান পরবর্তী কালে য়ামানে পৌঁছিয়া বসতি স্থাপন করেন। য়ামানের সকল সম্প্রদায়ই তাঁহার বংশধর। আরবী ভাষার সূচনা তাঁহার নিকট হইতেই হইয়াছে এবং তাঁহার নাম অনুসারে ভাষার নাম আরবী ও এই ভাষাভাষীর নাম হইয়াছে আরব (বাহরে মুহীত; মুফতী মুহাম্মাদ শফী, মাআরিফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত বাংলা সংস্করণ, পৃ. ৪৫৪)। কিন্তু আরেকটি তথ্য এই যে, আরবী ভাষা হযরত নূহ (আ)-এর আমল হইতে প্রচলিত ছিল। নূহ (আ)-এর কিস্তীর একজন আরোহী জুরহুম নামক ব্যক্তি আরবী ভাষায় কথা বলিতেন। এই জুরহুম হইতেই মক্কা শহর আবাদ হইয়াছে। তবে ইহা সম্ভব যে, য়ামানে আরবী ভাষার সূচনা ইয়াকুব ইব্ন কাতান হইতেই হইয়াছিল (মুফতী মুহাম্মাদ শফী, মাআরিফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত বাংলা সংস্করণ, পৃ. ৪৫৪)।
ইবন 'আসাকির তাঁহার ইতিহাস গ্রন্থে এই মর্মে আনাস ইবন মালিক (রা) হইতে একটি মওকূফ হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। হযরত আনাস (রা) বলেন, যখন আল্লাহ মানবজাতিকে বাবিল-এ একত্র করিলেন, তখন তাহাদের উপর দিয়া আল্লাহ্র হুকুমে জোরে হাওয়া প্রবাহিত হইল। তাহারা তাহাদের একত্র করার কারণ জানার জন্য এক স্থানে জড় হইল। তখন এক (অদৃশ্য) ঘোষণাকারী ঘোষণা করিলেন, "তোমাদের মধ্যে যাহারা পশ্চিমকে ডাইনে, পূর্বকে বামে রাখিবে এবং পবিত্র ঘরের দিকে মুখ করিবে তাহাদের ভাষা হইবে আকাশের বাসিন্দাদের ভাষা"। তখন কাহতানের পুত্র য়া'রুব দাঁড়ান। তাহাকে সম্বোধন করিয়া বলা হয়, "হে হূদের পুত্র য়া'রুব ইব্ন কাহতান! তুমি কি সেই ব্যক্তি?” অতঃপর তিনি হইলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি "প্রাঞ্জল আরবীতে" কথা বলেন। অতঃপর একের পর এক ঘোষণা হইতে লাগিল আর লোকেরা দাঁড়াইয়া নিজেদের সম্মতি জানাইতে থাকিল। এইভাবে মানবজাতির ভাষা বাহাত্তরটি ভাষায় বিভক্ত হইল, তখন ঘোষণা বন্ধ হইল। আর পরিণতিতে কাহারও ভাষা কেহই বুঝিতে সক্ষম না হওয়ায় তাহারা যাহার যাহার নির্ধারিত এলাকায় প্রস্থান করিল। সেই কারণেই এই দেশের নাম হয় বাবিল (আ.ত.ম. মুছলেহ উদ্দীন, আরবী সাহিত্যের ইতিহাস, পৃ. ২৩২, ঢাকা ১৯৮২ খৃ.; নতুন সংস্করণ ১৯৯৫ খৃ.)।
📄 হযরত হূদ (আ)-এর নবুওয়াত লাভ
হযরত হূদ (আ) তাঁহার নিজ কওম 'আদ-এর প্রতি নবী হিসাবে প্রেরিত হন। 'আদ হযরত নূহ (আ)-এর ৫ম পুরুষের মধ্যে এবং তাঁহার পুত্র সাম-এর বংশধরের মধ্যে এক ব্যক্তির নাম। পরবর্তী পর্যায়ে আদ নামক ব্যক্তির বংশধর ও গোটা সম্প্রদায় আদ নামে খ্যাত হয়। বংশবৃদ্ধির ফলে আদ একটি জাতিতে পরিণত হয়। আদ জাতির লোকেরা ছিল সুঠামদেহী ও দীর্ঘ আকৃতিবিশিষ্ট। তাহারা প্রচণ্ড কায়িক শক্তির অধিকারী ছিল। তাহা ছাড়া আর্থিক দিক হইতেও তাহারা অত্যন্ত সমৃদ্ধিশালী ছিল। 'আদ জাতি তাহাদের সুখ-সমৃদ্ধি ও শক্তিমত্তায় গর্বিত হইয়া আল্লাহ্র নাফরমানীতে লিপ্ত হয়। ফলে তাহাদের হিদায়াতের জন্য আল্লাহ হযরত হূদ (আ)-কে নবীরূপে প্রেরণ করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, وَإِلَى عَادٍ أَخَاهُمْ هُو "আদ সম্প্রদায়ের নিকট উহাদিগের ভ্রাতা হূদকে পাঠাইয়াছিলাম"।