📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বৈশিষ্ট্যাবলী

📄 বৈশিষ্ট্যাবলী


নবী হিসাবে নূহ (আ) বহু বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন, যাহা অন্য কোনও নবীর মধ্যে ছিল না। তাঁহার বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ: (১) তিনিই প্রথম শরীআতের অধিকারী নবী ছিলেন; (২) তিনিই আল্লাহ্ দিকে প্রথম আহ্বানকারী; (৩) শিরক হইতে প্রথম সতর্ককারী; (৪) প্রথম দাঈ, যাঁহার উম্মাতকে তাঁহার আনীত হিদায়াত প্রত্যাখ্যানের কারণে শাস্তি দেওয়া হয়; (৫) তাঁহার দু'আর ফলে বিশ্বের সকলকে ধ্বংস করা হয়; (৬) তিনি নবী-রাসূলদের মধ্যে সর্বাধিক দীর্ঘ জীবন লাভ করিয়াছিলেন। তাই তাঁহাকে শায়খুল মুরসালীন ওয়া আকবারুল আম্বিয়া বলা হয়; (৭) তাঁহার নিজের মধ্যেই ছিল তাঁহার মুজিযা। কারণ তিনি হাজার বৎসরাধিক বয়স পাইয়াছিলেন, কিন্তু বয়সের ভারে ন্যুজ হইয়া পড়েন নাই। আর তাঁহার শারীরিক শক্তি কিছুমাত্র কম হয় নাই; (৮) দাওয়াতের কাজে তিনি প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালাইয়াছিলেন এবং তিনি দিবা-রাত্রে, প্রকাশ্যে ও গোপনে দাওয়াত দিয়াছেন; (৯) তিনি তাঁহার উম্মতের পক্ষ হইতে দীর্ঘদিন যাবত প্রহার, গালিগালাজ, তিরস্কার, ভর্ৎসনা, ঠাট্টা ও উপহাস প্রভৃতি কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করিয়াছিলেন। এইজন্য আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَقَوْمَ نُوحٍ مِّن قَبْلُ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَسَقِينَ .
"আমি ধ্বংস করিয়াছিলাম ইহাদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়কে; উহারা তো ছিল সত্যত্যাগী সম্প্রদায়” (৫১:৪৬);
(১০) আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে অঙ্গীকার ও ওহীর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় মুসতফা হিসাবে উল্লেখ করিয়াছেন। যেমন ইরশাদ হইয়াছে:
وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنْكَ وَمِنْ نُوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ (۷ : ৩৩)
"স্মরণ কর যখন আমি নবীদের নিকট হইতে অঙ্গীকার গ্রহণ করিয়াছিলাম এবং তোমার নিকট হইতেও এবং নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও মারয়াম-তনয় ঈসার নিকট হইতেও” (৩৩: ৭)। অন্যত্র ইরশাদ হইয়াছে:
إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّينَ مِنْ بَعْدِهِ
"আমি তো তোমার নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছি, যেমন নূহ ও তাহার পরবর্তী নবীগণের নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছিলাম" (৪: ১৬৩)।
(১১) যেদিন কিয়ামত কায়েম হইবে সেইদিন হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর পরে তিনি কবর হইতে উঠিবেন; (১২) তাঁহাকে আল্লাহ “কৃতজ্ঞ বান্দা”-রূপে আখ্যায়িত করেন। যথা-ইরশাদ হইয়াছে : إِنَّهُ كَانَ عَبْدًا شَكُورًا "সেতো ছিল পরম কৃতজ্ঞ বান্দা" (১৭ঃ ৩); (১৩) তাঁহাকে নৌকা প্রদান করা হইয়াছিল এবং উহার নির্মাণ জ্ঞানও শিক্ষা দেওয়া হইয়াছিল; তাঁহাকে উহাতে করিয়া হেফাজত করা হয় এবং পানির উপর দিয়া উহা চালনা করা হয়; (১৪) তাঁহাকে শান্তি ও কল্যাণ দ্বারা সম্মানিত করা হয়। যথা আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
يَا نُوحُ اهْبِطَ بِسَلَامٍ مِّنَّا وَبَرَكَاتٍ عَلَيْكَ وَعَلَى أُمَمٍ مِّمَّن مَّعَكَ (٤٨ : ١١ )
"হে নূহ! অবতরণ কর আমার পক্ষ হইতে শান্তি ও কল্যাণসহ তোমার প্রতি ও যে সমস্ত সম্প্রদায় তোমার সঙ্গে আছে তাহাদের প্রতি" (১১ঃ ৪৮)। মুহাম্মদ ইব্‌ন কা'ব আল-কুরাজী বলেন, কিয়ামত পর্যন্ত সকল মুমিন-মুমিনা এই শান্তি ও কল্যাণের অন্তর্ভুক্ত; (১৫) তাঁহার বংশধরদিগকেই আল্লাহ তা'আলা বংশ-পরম্পরায় পৃথিবীতে বিদ্যমান রাখিয়াছেন। যেমন ইরশাদ হইয়াছে:
وَجَعَلْنَا ذُرِّيَّتَهُ هُمُ الْبَاقِينَ .
"তাহার বংশধরদিগকেই আমি বিদ্যমান রাখিয়াছি বংশ-পরম্পরায়" (৩৭ঃ ৭৭)। এইজন্য তাহাকে আদম ছানী বলা হয় এবং বর্তমান মানবগোষ্ঠীর মূল ও আদি। কারণ তাঁহার তিন পুত্র, সাম, হাম ও য়াফিছ হইতেই বর্তমান মানবগোষ্ঠী বিস্তার লাভ করিয়াছে (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৬৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দৈহিক অবয়ব

📄 দৈহিক অবয়ব


হযরত নূহ (আ) ছিলেন গৌর বর্ণের, পাতলা চেহারা, লম্বা মস্তক, বড় চোখ, শক্ত ও মোটা বাহু, হাল্কা পায়ের গোছা, ভারী ও অধিক গোশতধারী উরু, মোটা নাভি, লম্বা দাড়ি ও লম্বা চওড়া ভারী শরীরবিশিষ্ট (ইব্‌ন কুতায়বা, আল-মাআরিফ, পৃ. ১৩; আল-আলুসী, রূহুল মাআনী, ২৯খ., ৬৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইনতিকালের পূর্বে নূহ (আ)-এর ওসিয়াত

📄 ইনতিকালের পূর্বে নূহ (আ)-এর ওসিয়াত


ইমাম আহমাদ (র) সুলায়মান ইবন হারব সূত্রে রাসূলুল্লাহ (স) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আল্লাহর নবী নূহ (আ)-এর মৃত্যু নিকটবর্তী হইলে তিনি স্বীয় পুত্র সামকে ডাকিয়া বলিলেন, বৎস! আমি তোমাকে দুই কাজ করিবার জন্য উপদেশ দিতেছি এবং দুই কাজ করিতে নিষেধ করিতেছি। যে দুইটি করিবার জন্য উপদেশ দিতেছি উহার একটি হইল: (১( لَا اِلَهَ اِلَّا اللهُ -এর যিকির করিবে। কারণ সাত আসমান, সাত যমীন ও উহার মধ্যবর্তী সকল কিছু যদি এক পাল্লায় রাখা হয় আর لَا اِلَهَ اِلَّا اللهُ অপর পাল্লায়, তবে لَا اِلَهَ اِلَّا اللهُ-এর পাল্লা ভারী হইবে; যদি সাত আসমান ও সাত যমীন একত্র করা হয় তবুও لَا اِلَهَ اِلَّا اللهُ উহা ভেদ করিয়া আল্লাহ্র নিকট পৌঁছিয়া যাইবে। অপর এক বর্ণনায় রহিয়াছে যে, সাত আসমান ও সাত যমীন যদি আলাদা আলাদা গোলাকার বৃত্ত হয়, তবে لَا اِلَهَ اِلَّا اللهُ উহাদিগকে মিলাইয়া দিবে; আর অপরটি হইল (২) سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ-এর যিকির করিবে। কারণ ইহা সকল সৃষ্টির দো'আ (صَلوۃ) এবং ইহার দ্বারাই তাহাদিগকে রিযিক প্রদান করা হয়। আর যে দুইটি বিষয়ে নিষেধ করিতেছি উহা হইল: (১) শিরক ও (২) কিবর অর্থাৎ আল্লাহ্র সহিত অন্য কাহাকেও শরীক করা এবং অহঙ্কার করা। যাহার অন্তরে বিন্দুমাত্র শিরক বা কিবর আছে সে জান্নাতে প্রবেশ করিবে না (ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১১৯; ঐ লেখক, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৮৯; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নূহ (আ)-এর বয়স

📄 নূহ (আ)-এর বয়স


হযরত নূহ (আ) পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা দীর্ঘজীবি রাসূল ও সর্বাপেক্ষা দীর্ঘজীবী মানব ছিলেন। এই ব্যাপারে কাহারও দ্বিমত নাই। তবে তিনি সর্বমোট কত বৎসর জীবিত ছিলেন এই ব্যাপারে বেশ কিছু মতামত পাওয়া যায়: আহলে কিতাব ও কিছু সংখ্যক আলিমের মতে নৌকায় আরোহণের সময় তাঁহার বয়স ছিল ৬০০ বৎসর, প্লাবনের পর তিনি আরও ৩৫০ বৎসর জীবিত ছিলেন। তাই তাঁহার মোট বয়স হইয়াছিল ৯৫০ বৎসর (Bible, Genesis, 7: 6; 9: 28-29; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ., ৯৬)।
ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতেও এই ধরনের একটি মত বর্ণিত আছে (ইব্‌ন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৯০; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ১২)। কিন্তু ইহা সঠিক নহে। আওন ইব্‌ন আবী শাদ্দাদের এক বর্ণনামতে নূহ (আ) প্লাবনের পর ৯৫০ বৎসর জীবিত ছিলেন এবং প্লাবনের পূর্বে তাঁহার বয়স ছিল ৩৫০ বৎসর। তদনুসারে নূহ (আ)-এর মোট বয়স ১৩০০ বৎসর (আছ-ছা'লাবী, প্রাগুক্ত)। এই মতটিও সঠিক নহে। উপরিউক্ত মতদ্বয় সঠিক না হওয়ার কারণ হইল ইহা কুরআন করীমের সুস্পষ্ট আয়াতের পরিপন্থী। কুরআন করীমের বর্ণনায় ইহা জানা যায় যে, নবুওয়াত প্রাপ্তির পর হইতে প্লাবন পর্যন্ত ৯৫০ বৎসর তিনি কওমের মধ্যে অবস্থান করত দাওয়াতী কাজ করেন। ইহার পর প্লাবন শুরু হয়। যেমন ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوْحًا إِلَى قَوْمِهِ فَلَبِثَ فِيهِمْ الْفَ سَنَةٍ إِلَّا خَمْسِينَ عَامًا فَأَخَذَهُمُ الطُّوْفَانُ وَهُمْ ظُلِمُونَ .
"আমি তো নূহকে তাহার সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করিয়াছিলাম। সে উহাদের মধ্যে অবস্থান করিয়াছিল পঞ্চাশ কম হাজার বৎসর। অতঃপর প্লাবন উহাদিগকে গ্রাস করে; কারণ উহারা ছিল সীমালংঘনকারী” (২৯: ১৪)। ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর অপর এক রিওয়ায়াতমতে নূহ (আ) ৪০ বৎসরে নবুওয়াত প্রাপ্ত হন; ৯৫০ বৎসর তিনি দাওয়াতী কাজ করেন এবং প্লাবনের পর আর ৬০ বৎসর জীবিত ছিলেন। ফলে তাঁহার মোট বয়স ৪০+৯৫০+৬০=১০৫০ বৎসর (আল-আলুসী; রূহুল-মাআনী, ১২খ., ৩৫)। মুকাতিল বলেন, নূহ (আ) ২৫০ বৎসরে নবুওয়াত প্রাপ্ত হন (মতান্তরে ১০০ ও ৫০ বৎসরে); ৯৫০ বৎসর তিনি দাওয়াতী কাজ করেন এবং প্লাবনের পর জীবিত ছিলেন ২৫০ বৎসর। সুতরাং তাঁহার মোট বয়স ছিল ১৪৫০ বৎসর (প্রাগুক্ত, ১২খ., ৩৫-৩৬; ৮খ., ১৪৯)। তবে দুই-একটি রিওয়ায়াত ব্যতীত অধিকাংশ বর্ণনামতে প্লাবনের পর তিনি ৩৫০ বৎসর জীবিত ছিলেন। ইতোপূর্বে নবুওয়াত প্রাপ্তির সময় তাঁহার বয়স সম্পর্কিত তিনটি মত উল্লেখ করা হইয়াছে। কুরআন করীমের উপরিউক্ত আয়াত-এর পরিপ্রেক্ষিতে এবং প্লাবনের পর তিনি ৩৫০ বৎসর জীবিত ছিলেন, ইহা মানিয়া লইলে (যেমন অধিকাংশ মত) বর্ণিত তিনটি মতানুযায়ী তাঁহার বয়স দাঁড়ায় নিম্নরূপঃ (১) নবুওয়াত প্রাপ্তি ৫০ বৎসর+ দাওয়াতী কাজ ৯৫০+ প্লাবনের পর ৩৫০ বৎসর মোট বয়স = ১৩৫০ বৎসর; (২) নবুওয়াত প্রাপ্তি ৩৫০ বৎসর+ দাওয়াতী কাজ ৯৫০+ প্লাবনের পর ৩৫০ বৎসর = মোট ১৬৫০ বৎসর। এক বর্ণনামতে ইহা আওন ইব্‌ন আবী শাদ্দাদের মত বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে (ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ., ৫৫; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ., ৯০)। (৩) নবুওয়াত প্রাপ্তি ৪৮০ বৎসর+ দাওয়াতী কাজ ৯৫০ বৎসর+প্লাবনের পর ৩৫০ বৎসর; মোট বয়স ১৭৮০ বৎসর। ইহাই ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর মত বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে (ইব্‌ন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৯০)। ইমাম আবু জাফর তাবারী অবশ্য এই মতটির মধ্যে দাওয়াতী সময়কাল ১২০ বৎসর বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন, যাহার ফলে তাঁহার বয়স হয় সর্বপ্রথম উল্লিখিত মতটির অনুরূপ (আত-তাবারী, তারীখ, ১খ., ৯০)। পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, এই মত সঠিক নহে।
এত দীর্ঘ বয়স পাওয়া সত্ত্বেও মৃত্যু উপস্থিত হইলে হযরত নূহ (আ)-কে যখন জিজ্ঞাসা করা হইল, দুনিয়াকে আপনি কিরূপ পাইয়াছেন? তখন ইহার উত্তরে তিনি বলিলেন, উহা এমন একটি গৃহের ন্যায় যাহার দুইটি দরজা রহিয়াছে। উহার একটি দিয়া আমি প্রবেশ করিলাম এবং অপরটি দিয়া বাহির হইলাম। এই সামান্য সময়মাত্র (ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ., ৫৮; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00