📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 প্লাবনের সমাপ্তি এবং নূহ (আ)-এর ভূমিতে অবতরণ

📄 প্লাবনের সমাপ্তি এবং নূহ (আ)-এর ভূমিতে অবতরণ


অবশেষে আল্লাহ্র নির্দেশে প্লাবন থামিয়া গেল, ভূপৃষ্ঠ হইতে পানি সরিয়া গেল ও পৃথিবী চলা-ফেরার যোগ্য হইয়া গেল। মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক-এর বর্ণনামতে আল্লাহ যখন প্লাবন বন্ধ করিতে চাহিলেন তখন পৃথিবীতে বাতাস প্রেরণ করিলেন। ফলে পানি স্থির হইয়া গেল এবং ঝর্ণাগুলির পানির প্রবাহ বন্ধ হইয়া গেল। অতঃপর ধীরে ধীরে পানিও শুকাইয়া গেল (ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১১৭; ঐ লেখক, কাসাসুল-আম্বিয়া পৃ. ৮৪)। বাইবেলেও ইহারই উল্লেখ রহিয়াছে (দ্র. Genesis: 8: 1-3)। বাইবেলের বর্ণনামতে পানি ক্রমশ সরিয়া গিয়া এক শত পঞ্চাশ দিবসের শেষে হ্রাস পাইল। তাহাতে সপ্তম মাসের সপ্তদশ রাত্রি অতিবাহিত হওয়ার পর নৌকা আশরাত (জুদী) পর্বতে আসিয়া স্থির হয়। আর দশম মাসের প্রথম দিন হইতে পাহাড়ের চূড়া দেখা যায়। অতঃপর চল্লিশ দিন অতিবাহিত হইবার পর নূহ (আ) তাঁহার নৌকার বাতায়ন খুলিয়া দিলেন। অতঃপর তিনি পানির অবস্থা জানিবার জন্য একটি দাঁড়কাক ছাড়িয়া দিলেন। সে আর ফিরিয়া আসিল না, বরং সে ইতস্তত গতায়াত করিল। অতঃপর তিনি কবুতর প্রেরণ করিলেন। সে ফিরিয়া আসিল, তাহার পা রাখার মত জায়গা পাইল না। অতঃপর তিনি হাত বাড়াইয়া উহাকে নৌকার মধ্যে প্রবেশ করাইলেন, ইহার পর সাত দিন অতিক্রান্ত হইল। অতঃপর তিনি পানির অবস্থা জানিবার জন্য আবার সেই কবুতর ছাড়িয়া দিলেন। উহা সন্ধ্যা বেলায় চঞ্চুতে করিয়া একটি যয়তুনের নবীন পাতা লইয়া ফিরিয়া আসিল। তখন নূহ (আ) বুঝিলেন যে, ভূপৃষ্ঠ হইতে পানি কমিয়া গিয়াছে। ইহার পর আর সাত দিন অপেক্ষা করিয়া আবার সেই কবুতর প্রেরণ করিলেন। অতঃপর সে আর ফিরিয়া আসিল না। তখন নূহ বুঝিলেন যে, মাটি জাগিয়া গিয়াছে। অতঃপর প্লাবন শুরুর দিন হইতে নূহের কবুতর প্রেরণ পর্যন্ত যখন এক বৎসর পূর্ণ হইল এবং দ্বিতীয় বৎসরের প্রথম মাসের প্রথম দিন আসিল তখন ভূপৃষ্ঠ দেখা গেল এবং মাটি পূর্ণরূপে জাগিয়া উঠিল। নূহ (আ)-ও নৌকার ছাদ খুলিয়া দিলেন (Genesis 8: 3-14)।
মুসলিম ঐতিহাসিকগণও সামান্য পরিবর্তনসহ অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন। তাহাদের বর্ণনা হইল: ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত, নূহ (আ)-এর সহিত নৌকায় ৮০ জন পুরুষ ছিল। তাহাদের সহিত তাহাদের স্ত্রীগণও ছিল। তাহারা ১৫০ দিন নৌকায় ছিলেন। আল্লাহ্ তা'আলা এক পর্যায়ে নৌকা মক্কার দিকে ফিরাইয়া দেন। অতঃপর ৪০ দিন যাবত উহা বায়তুল্লাহকে কেন্দ্র করিয়া ঘুরিতে থাকে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা উহাকে জুদী পর্বতের দিকে ফিরাইয়া দেন। সেখানে আসিয়া নৌকা স্থির হইয়া যায়। অতঃপর নূহ (আ) ভূপৃষ্ঠের খবর আনিবার জন্য কাক প্রেরণ করেন। সে গিয়া মরা লাশের উপর পতিত হয়, তাই আসিতে বিলম্ব করে। তখন তিনি কবুতর প্রেরণ করেন। সে তাঁহার নিকট যয়তুন বৃক্ষের পাতা লইয়া আসে এবং তাহার পায়ে কাদা মাটি লাগিয়াছিল। তখন নূহ (আ) বুঝিতে পারেন যে, পানি নামিয়া গিয়াছে। তখন আল্লাহ তা'আলা নূহ (আ)-কে তাঁহার সঙ্গীগণসহ অবতরণের নির্দেশ দিয়া বলিলেন:
يَانوحُ اهْبِطْ بِسَلَامٍ مِّنَّا وَبَرَكَاتٍ عَلَيْكَ وَعَلَى أُمَمٍ مِّمَّن مَّعَكَ وَأُمَمٌ سَنُمَتِّعُهُمْ ثُمَّ يَمَسُّهُم مِّنَّا عَذَابٌ الিম
“হে নূহ! অবতরণ কর আমার পক্ষ হইতে শান্তি ও কল্যাণসহ এবং তোমার প্রতি ও যে সমস্ত সম্প্রদায় তোমার সঙ্গে আছে তাহাদের প্রতি; অপর সম্প্রদায়সমূহকে আমি জীবন উপভোগ করিতে দিব, পরে আমার হইত মৰ্মন্তুদ শাস্তি উহাদিগকে স্পর্শ করিবে।”
ইবন ইসহাকের বর্ণনামতে প্লাবনের ২য় বৎসরের ২য় মাসের ২৬তম রজনীতে এই নির্দেশ দেওয়া হয় (ইবন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬৪)। অতঃপর নূহ (আ) ১০ মুহাররাম তারিখে পুনরায় নূতন করিয়া আল্লাহ্র পৃথিবীতে জুদী পর্বতের পাদদেশে নামিয়া আসিলেন। বিশ্বের বুকে এইবার হইলেন তিনিই প্রথম মানব। এই হিসাবে তাঁহার উপাধি “আবুল বাশার ছানী” বা “আদম ছানী” (মানুষের দ্বিতীয় আদিপিতা)-রূপে প্রসিদ্ধ হয় এবং সম্ভবত এইজন্যই হাদীছে তাঁহাকে প্রথম রাসূল (দ্র. আল-বুখারী, ২খ., ৪৭০; মুসলিম, ১খ., ১০৮) বলা হইয়াছে (হিফজুর রহমান সিউহারবী, কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৭৬)।
কাতাদা প্রমুখের বর্ণনামতে তাহারা রজব মাসের দশম দিনে নৌকায় আরোহণ করেন। অতঃপর ১৫০ দিন তাহারা নৌকায় অতিবাহিত করেন। জুদী পর্বতে তাহাদিগকে লইয়া নৌকা স্থির ছিল এক মাস। আর তাহারা নৌকা হইতে অবতরণ করেন মুহাররামের দশ তারিখ। এইজন্য উক্ত দিবসের নামকরণ করা হয় ‘আশুরা’। পৃথিবীতে অবতরণ করিয়াই তিনি তাঁহার সঙ্গী সকল মানুষ এমনকি জীব-জন্তুকেও ঐদিন আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায়স্বরূপ সাওম পালন করিবার নির্দেশ দেন (আহ্-হালাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৬১-৬২; ইবন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬৩; ঐ লেখক, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১১৬; আত্-তাবারী, তারিখ, ১খ., ১৬)। উল্লেখ্য যে, নূহ (আ) ও তাঁহার সঙ্গীগণ নৌকায় আরোহণ করিয়াও সাওম পালন করিয়াছিলেন (তাবারী, প্রাগুক্ত)।
এইখান হইতেই আশুরার সাওম চালু হয়। ইমাম ইবন জারীর তাবারী ইহার সমর্থনে একটি মারফু হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন যে, আবু হুরায়রা (রা) বলেন : একদা রাসূলুল্লাহ (স) ইয়াহুদীদের কিছু লোকের নিকট দিয়া যাইতেছিলেন, তাহারা সেই দিন সাওম পালন করিতেছিল। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “ইহা কোন্ সাওম”? তাহারা বলিল, ইহা সেইদিন যেদিন আল্লাহ্ মূসা (আ) ও বানু ইসরাঈলকে নিমজ্জিত হওয়া হইতে রক্ষা করেন এবং ফিরআউন নিমজ্জিত হয়, এই দিনে নৌকা জুদী পর্বতে স্থির হয়। অতঃপর নূহ ও মূসা (আ) এইদিনে আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করিবার জন্য সাওম পালন করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি মুসার প্রতি বেশী হকদার এবং এই দিনের সাওম পালন করার বেশী হকদার। অতঃপর তাঁহার সাহাবীদিগকে ঐদিনে সাওম পালন করিবার নির্দেশ দেন (ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১১৭; ঐ লেখক, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৬৩)।
অতঃপর নূহ (আ) সেখানে অবতরণ করিয়া জাযীরার 'কারদায়' অঞ্চলের পার্শ্বে একটি জায়গা মনোনীত করিলেন এবং সেখানে একটি জনপদের পত্তন করিলেন, যাহার নাম রাখিলেন 'ছামানীন' (অর্থাৎ ৮০)। কারণ সেখানে তিনি যাহারা তাঁহার উপর ঈমান আনয়ন করিয়াছিল তাহাদের প্রত্যেকের জন্য একখানি করিয়া গৃহ নির্মাণ করিলেন। আর তাহারা সংখ্যায় ছিল ৮০ জন। উক্ত জনপদ বর্তমানে 'সূক ছামানীন' নামে খ্যাত (আত-তাবারী, তারীখ, ১খ., ৯৬; ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ., ৫৮; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬২)। ভূমিতে অবতরণ করিবার পর নূহ (আ) হযরত আদম (আ)-এর লাশ বায়তুল মাকদিসে দাফন করেন (ইব্‌ন সাদ, তাবাকাত, ১খ., ৪২)। অতঃপর তিনি তাহাদের মধ্যে আবার দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ শুরু করেন। নূহ (আ) ইহার পর ৩৫০ বৎসর জীবিত ছিলেন (আছ-ছা'লাবী, প্রাগুক্ত)। বাইবেলেও বলা হইয়াছে যে, 'জল প্লাবনের পর নোহ তিন শত পঞ্চাশ বৎসর জীবৎ থাকিলেন (Genesis, 9: 28; বাংলা অনু. পবিত্র বাইবেল, পৃ. ১২)। কালক্রমে এক দিন তাহাদের ভাষা ৮০টি ভাষায় রূপান্তরিত হইল, যাহার একটি হইল আরবী। তাহারা একে অন্যের কথা বুঝিত না। নূহ (আ) তাহাদিগকে বুঝাইয়া দিতেন (ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১১৬; ঐ লেখক, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮৩)। এই প্লাবন-এর সময়কাল ৩২৩২ খৃ. পূ. বলিয়া অনুমান করা হয় (আবদুল মাজিদ দারয়াবাদী, মাসাইল ওয়া কিসাস, পৃ. ১০৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 প্লাবন বিশ্বের সর্বত্র না বিশেষ স্থানে হইয়াছিল

📄 প্লাবন বিশ্বের সর্বত্র না বিশেষ স্থানে হইয়াছিল


হযরত নূহ (আ)-এর সময়কার প্লাবন সমগ্র বিশ্বব্যাপী হইয়াছিল, না শুধু তাঁহার কওম যে অঞ্চলে বাস করিত সেই অঞ্চলে, এই ব্যাপারে দুইটি মত পাওয়া যায় : (১) ইসলামী চিন্তাবিদগণের একটি দল, ইয়াহূদ ও খৃস্টানদের ধর্মযাজকগণ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী, ভূতত্ত্ববিদ ও নৃতত্ত্ববিদদের একটি অংশ এই মত পোষণ করিয়াছেন যে, এই প্লাবন সমগ্র বিশ্বব্যাপী ছিল না; বরং নূহ (আ) ও তাঁহার সম্প্রদায় যে অঞ্চলে বসবাস করিত সেখানেই সীমাবদ্ধ ছিল। উক্ত অঞ্চলের আয়তন ছিল ১,৪০,০০০ (এক লক্ষ চল্লিশ হাজার) বর্গ-কিলোমিটার। তাহাদের মতে সীমাবদ্ধ অঞ্চলে হওয়ার কারণ হইল, তখনকার সময়ে জনবসতি ছিল একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। আর তাহা ছিল শুধুমাত্র নূহ (আ) ও তাঁহার সম্প্রদায় যে অঞ্চলে বাস করিত সেই অঞ্চলেই। কারণ তখনও হযরত আদম (আ)-এর বংশধর উক্ত অঞ্চল ব্যতীত অন্য কোথাও বিস্তার লাভ করে নাই। তাই তাহারাই শাস্তির উপযুক্ত ছিল এবং তাহাদের উপরই প্লাবনের শাস্তি প্রেরণ করা হয়। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে যেহেতু কোনও বাসিন্দা ছিল না, তাই সেই সকল এলাকার সহিত প্লাবনের কোন সম্পর্ক নাই।
(২) আর কিছু সংখ্যক ইসলামী চিন্তাবিদ, ভূতত্ত্ববিদ, প্রকৃতি বিজ্ঞানী ও নৃতত্ত্ববিদের মতে এই প্লাবন ছিল বিশ্বব্যাপী। আর শুধু এই একটি প্লাবনই নহে, বরং তাহাদের মতে বিশ্বে আরও কয়েকটি বড় ধরনের প্লাবন হইয়াছে। তন্মধ্যে নূহ (আ)-এর প্লাবন অন্যতম। কারণ 'জাযীরা' ও ইরাকের ভূখণ্ড ছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য উঁচু পর্বতের চূড়ায় এমন সব প্রাণীর কঙ্কাল ও হাড় পাওয়া গিয়াছে যাহার সম্পর্কে নৃতত্ত্ববিদ ও ভূবিজ্ঞানীদের অভিমত হইল, ইহারা জলজ প্রাণী। পানিতেই কেবল বসবাস করিতে পারে। পানি ছাড়া এক মুহূর্তও বাঁচিয়া থাকা তাহাদের জন্য দুষ্কর। তাই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের উঁচু পর্বত শিখরে উক্ত নিদর্শন পাওয়ায় প্রমাণিত হয় যে, কোনও কালে এমন এক সর্বগ্রাসী প্লাবন হইয়াছিল যাহার আওতা হইতে পর্বত শৃঙ্গও রেহাই পায় নাই (আবদুল-ওয়াহহাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৩৬; হিফজুর রহমান সিউহারবী, কাসাসুল-কুরআন, ১খ., ৭৬-৭৭)। আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার স্বীয় গ্রন্থে প্রথম অভিমতটিকে প্রাধান্য দিয়াছেন।
অগ্নি উপাসকগণ এই প্লাবন স্বীকার করে না। তাহারা বলে, 'জিউমিরত' (جیومرت) অর্থাৎ আদম-এর সময়কাল হইতে আমাদের রাজত্ব চলিয়া আসিতেছে। পুরুষানুক্রমে একের পর এক উহা লাভ করিয়া আসিতেছে ফীরূয ইব্‌ন য়াযদাজিরদ ইব্‌ন শাহরিয়ার পর্যন্ত। প্লাবন সংঘটিত হইলে কওমের বংশ-লতিকা বিচ্ছিন্ন হইয়া যাইত। আর কওমের রাজত্বও বিলুপ্ত হইয়া যাইত। তাহাদের কিছু সংখ্যক লোক প্লাবন স্বীকার করে এবং বলে, উহা শুধু বাবিল ও তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সংঘটিত হইয়াছিল। আর জিউমিরত-এর বংশধরদের নিবাস ছিল পূর্বাঞ্চলে। তাই তাহাদের পর্যন্ত উহা পৌঁছে নাই। আবূ জা'ফর তাবারী বলেন, আল্লাহ তা'আলা প্লাবনের যেই বিবরণ প্রদান করিয়াছেন এই ধারণা উহার পরিপন্থী। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَنَجِّيْنُهُ وَأَهْلَهُ مِنَ الْكَرْبِ العَظِيمِ. وَجَعَلْنَا ذُرِّيَّتَهُ هُمُ الْبَقِينَ .
"তাহাকে এবং তাহার পরিবারবর্গকে আমি উদ্ধার করিয়াছিলাম মহা সংকট হইতে। তাহার বংশধরদিগকেই আমি বিদ্যমান রাখিয়াছি বংশ-পরম্পরায়"।
এখানে সুস্পষ্টভাবে উল্লিখিত হইয়াছে যে, নূহ (আ)-এর বংশধরই কেবল অবশিষ্ট রহিয়াছে; অন্য কেহ নহে। সবাই নিমজ্জিত হইয়া মারা গিয়াছে (আত-তাবারী, তারীখ, ১খ., ৯৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইবাদত ও আখলাক

📄 ইবাদত ও আখলাক


হযরত নূহ (আ) ছিলেন অতিশয় ইবাদতগুযার বান্দা। স্বয়ং আল্লাহ্ তা'আলা তাহাকে "পরম কৃতজ্ঞ বান্দা" বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে:
إِنَّهُ كَانَ عَبْدًا شَكُورًا .
"সে তো ছিল পরম কৃতজ্ঞ বান্দা" (১৭:৩)।
তিনি পানাহার, উঠা-বসা, পোশাক-পরিচ্ছদ তথা তাঁহার সকল কাজ-কর্মে আল্লাহ্ হামদ ও শোকর আদায় করিতেন (ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১১৮; ঐ লেখক, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৮৬)। ইমাম আহমাদ (র) আবূ উসামা সূত্রে আনাস ইব্‌ন মালিক (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, আল্লাহ সেই বান্দার উপর সন্তুষ্ট হন যে আহার করিয়া উহার জন্য তাঁহার প্রশংসা করে; পানি পান করিয়া উহার জন্য তাঁহার প্রশংসা করে (মুসলিম, আস-সাহীহ, ২খ., ৩৫২)। আর শোকরগুযার ও প্রশংসাকারী সেই হইতে পারে যে অন্তর দ্বারা, কথা-বার্তা এবং কাজকর্মে আল্লাহ্র আনুগত্য করিয়া থাকে (প্রাগুক্ত)।
হযরত নূহ (আ) সালাত কিভাবে আদায় করিতেন তাহা জানা যায় না। তবে তাঁহার সাওম পালন করা সম্পর্কিত হাদীছের দ্বারা পরোক্ষভাবে অনুমান করা যায় যে, তিনি দুই ঈদের সালাত আদায় করিতেন। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সহিত সাওম ও হজ্জ পালন করিতেন, হাদীছের দ্বারা ইহা সুস্পষ্টরূপে জানা যায়। সাহল ইব্‌ন আবী সাহল সূত্রে আবদুল্লাহ ইব্‌ন আমর (রা) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, নূহ (আ) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা দিবস ছাঁড়া সারা বৎসরই সাওম পালন করিতেন (ইব্‌ন মাজা, ১খ., ১২৪)। তাবারানী রাওহ ইব্‌ন ফারাজ সূত্রে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আমর (রা) হইতে অনুরূপ রিওয়ায়াত করিয়াছেন (ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১খ., ১১৮)। ইহাতে অনুমিত হয় যে, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার বিধান তাহার সময়েই ছিল এবং তাঁহার হজ্জ পালন সম্পর্কেও হাদীছে সুস্পষ্ট বিবরণ রহিয়াছে। ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স) যখন হজ্জ করিতেছিলেন তখন উসফান উপত্যকায় আসিয়া আবূ বাকর (রা)-কে বলিলেন, আবূ বাকর! ইহা কোন উপত্যকা? আবূ বাকর (রা) বলিলেন, ইহা উসফান উপত্যকা। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, নূহ, হূদ ও ইবরাহীম মধ্য বয়স্ক শক্তিশালী উষ্ট্রের উপর আরোহণ করিয়া এই উপত্যকা অতিক্রম করিয়াছেন। তাহাদের সঙ্গে ছিল কিছু গাধা, যেগুলোর নাকের রশি (নাকীল) ছিল খেজুর বৃক্ষের আঁশ দ্বারা তৈরী। আর তাহাদের পরনে ছিল আবা (জুব্বা) এবং তাহাদের চাঁদর ছিল পশমের সাদা-কালো ডোরাকাটা। তাহারা বায়তুল আতীক-এ হজ্জ করেন (ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১খ., ১১৯; ঐ লেখক, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮৮)। হাফিজ ইব্‌ন কাছীর এই হাদীছ উল্লেখ করিয়া ইহাকে গরীব বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন (প্রাগুক্ত)। ইবনুল জাওযী উরওয়া ইবনুয যুবায়র (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, নূহ (আ)-এর এই হজ্জ ছিল প্লাবনের পূর্বে (দ্র. হাফিজ ইব্‌ন কাছীর কৃত কাসাসুল আম্বিয়া গ্রন্থের টীকা)।
হযরত নূহ (আ)-এর ধর্মের ইবাদত-বন্দেগী এবং বিধি-নিষেধসমূহ প্রায় সবই হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর আনীত শরীআতের অনুরূপ ছিল। কুরআন করীমের ৪২ : ১৩ নং আয়াতের দ্বারাও ইহার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাহার সাওম, হজ্জ ও দুই ঈদের সালাতের কথা পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে, যাহা রাসূলুল্লাহ্ (স) আনীত শরীআতেও রহিয়াছে। এতদ্ব্যতীত তাঁহার শরীআতের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও বিধি-নিষেধের কথা জানা যায়, যাহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর শরীআতেও রহিয়াছে। সেইগুলো হইল: (১) হুকুম দেওয়ার অধিকারী কর্তৃপক্ষকে মান্য করা; (২) আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত মহামানব তথা নবী-রাসূলদের নামের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা; (৩) শিরক তথা পৌত্তলিকতা পরিত্যাগ করা; (৪) ব্যভিচার না করা; (৫) মানুষ হত্যা না করা; (৬) দস্যুবৃত্তি না করা এবং (৭) জীবন্ত প্রাণীর গোশত ভক্ষণ না করা। এই ধরনের বিধি-নিষেধের সংখ্যা আরও ছিল। তৃতীয় শতাব্দীতেও কেহ কেহ এই সকল বিধি-নিষেধ মানিয়া চলিত, লোকসমাজে তাহারা ধার্মিক হিসাবে পরিগণিত হইত (Encyclopaedia of Religion and Ethics, vol. 9, P. 379-380)।
নূহ (আ) অন্তিমকালে তাহার জ্যেষ্ঠ পুত্র সামকে যে ওসিয়াত করিয়াছিলেন তাহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দীনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় উহার বিস্তারিত বিবরণ দ্র. "ইনতিকালের পূর্বে নূহ (আ)-এর ওসিয়াত” শিরো.]। স্বীয় পুত্রকে তিনি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর যিকির করিতে নির্দেশ দেন। মূলত ইহাকেই রাসূলুল্লাহ (স) ঈমানের কলেমা বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন এবং এই কলেমা পাঠ করিয়া কেহ ইনতিকাল করিলে সে জান্নাতে প্রবেশ করিবে বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
عن انس ان النبي صلى الله عليه وسلم ومعاذ رديفه على الرحل قال يا معاذ قال لبيك يا رسول الله وسعديك قال يا معاذ قال لبيك يا رسول الله وسعاديك قال يا معاذ قال لبيك يا رسول الله وسعديك ثلثا قال ما من احد يشهد ان لا اله الا الله وأن محمدا رسول الله صدقا من قلبه الا حرمه الله على النار قال يا رسول الله افلا اخبر به الناس فيستبشروا قال اذا يتكلوا فاخبر بها معاذ عند موته تأثما ولى الدين الخطيب ، مشكوة المصابيح - ١/١٢٤)
“আনাস (রা) হইতে বর্ণিত। নবী (স) একটি বাহনে আরোহী ছিলেন, আর মুআয (রা) তাঁহার পেছনে ছিলেন। তিনি ডাকিলেন : মু'আয! তিনি উত্তর দিলেন, লাব্বায়ক ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আমি প্রস্তুত। রাসূলুল্লাহ (স) এইভাবে তিনবার ডাকিলেন এবং মু'আয (রা) তিনবার এরূপ উত্তর দিলেন। অতঃপর তিনি বলিলেন, যে ব্যক্তিই সত্যভাবে অন্তর হইতে ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহু’-এর সাক্ষ্য দিবে এবং মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্-এর সাক্ষ্য দিবে, আল্লাহ তাহার জন্য জাহান্নাম হারাম করিয়া দিবেন। মুআয (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আমি কি ইহার সংবাদ লোকজনকে জানাইয়া দিব না যাহাতে তাহারা সুসংবাদ লাভ করে? রাসূলাল্লাহ্ (স) বলিলেন, তাহা হইলে তাহারা ইহার উপর আস্থা করিয়া বসিয়া থাকিবে। অতঃপর মুআয (রা) ইহার সংবাদ তাহার মৃত্যুর সময় (হাদীছ না পৌঁছানোর) গুনাহের ভয়ে জানাইয়া যান।”
অন্য হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
عن أبي ذر قال اتيت النبي صلى الله عليه وسلم وعليه ثوب ابيض وهو نائم ثم اتيته وقد استيقظ فقال ما من عبد قال لا اله الا الله ثم مات على ذلك الا دخل الجنة قلت وإن زنى وان سرق قال وان زنى وان سرق قلت وإن زنى وإن سرق قال وإن زنى وإن سرق قلت وإن زنى وإن سرق قال وإن زنى وإن سرق على رغم انف أبي ذر (مشكوة ١/١٤)
“আবূ যার (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (স)-এর নিকট আগমন করিলাম। তাঁহার শরীরে ছিল সাদা কাপড়, তিনি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। আবার আসিলাম তখন তিনি জাগ্রত হইয়াছেন। তিনি বলিলেন: যে ব্যক্তি لا اله الا الله বলিবে, অতঃপর ইহার উপরই ইনতিকাল করিবে সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করিবে। আমি বলিলাম, যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে? তিনি বলেন, যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে। আমি বলিলাম, যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে? তিনি বলিলেন, যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে। আমি আবারও বলিলাম, যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে? তিনি বলিলেন, যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে, আবূ যার-এর নাক ধূলায় ধূসরিত হওয়া সত্ত্বেও” (মিশকাতুল-মাসাবীহ, ১খ., ১৪; বুখারী ও মুসলিম-এর বরাতে)।
তিনি سُبْحَانَ اللَّهُ وَبِحَمْدِهِ -এর যিকির করিবার জন্য স্বীয় পুত্রকে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিলেন। রাসূলূল্লাহ (স)-ও এই কলেমার বড়ই ফযীলত বর্ণনা করিয়াছেন:
عن أبى هريرة (رض) قال قال النبي صلى الله عليه وسلم كلمتان حبيبتان الى الرحمن خفيفتان على اللسان ثقيلتان في الميزان سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ (البخاری (۲/۱۱۲۹) .
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। নবী (স) বলেন: দুইটি কলেমা রাহমান (আল্লাহ্)-এর নিকট প্রিয়, মুখে উচ্চারণ করা সহজ, আর মীযানে (দাড়িপাল্লায়) তাহা হইবে ভারী। কলেমা দুইটি হইল:
سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ . (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, ২খ., ১১২৯)।
নূহ (আ) তাঁহার ওসিয়াতে আল্লাহ্র সহিত কাহাকেও শরীক করিতে নিষেধ করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রেরিত মহাগ্রন্থ আল-কুরআনুল করীমে বহু স্থানে, বহুভাবে শিরক করিতে নিষেধ করা হইয়াছে। বলা হইয়াছে, শিরক মস্তবড় জুলুম (৩১:১৩( ان الشرك لظلم عظیم "নিশ্চয়ই শিরক চরম জুলুম"। আল্লাহ্ তা'আলা শিরক ব্যতীত সকল গুনাহ ক্ষমা করিবেন, কিন্তু শিরক-এর অপরাধ ক্ষমা করিবেন না। ইরশাদ হইয়াছে:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا .
"নিশ্চয় আল্লাহ তাঁহার সহিত শরীক করা ক্ষমা করেন না। ইহা ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাহাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন; এবং যে কেহ আল্লাহ্ শরীক করে সে এক মহাপাপ করে।" শিরক করিলে অন্যান্য ভাল আমলও নষ্ট হইয়া যায়। ইরশাদ হইয়াছে:
لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ .
"তুমি আল্লাহর শরীক স্থির করিলে তোমার কর্মই তো নিষ্ফল হইবে এবং অবশ্যই তুমি হইবে ক্ষতিগ্রস্ত।"
শিরককারীর পরিণতি হইবে জাহান্নাম, জান্নাত তাহার জন্য হারাম হইয়া যাইবে। ইরশাদ হইয়াছে (৫: ৭২):
إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَاؤُهُ النَّارُ.
"কেহ আল্লাহর শরীক করিলে আল্লাহ তাহার জন্য জান্নাত অবশ্যই নিষিদ্ধ করিবেন এবং তাহার আবাস জাহান্নাম।"
নূহ (আ) স্বীয় পুত্রকে অহঙ্কার করিতে নিষেধ করেন। আর রাসূলুল্লাহ (স) অহঙ্কারকে জান্নাত পাওয়ার অন্তরায় বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। তিনি ইরাশদ করিয়াছেন:
عن عبد الله عن النبي صلى الله عليه وسلم قال لا يدخل الجنة من كان في قلبه مثقال ذرة من كبر ولا يدخل النار من كان في قلبه مثقال ذرة من ايمان قال فقال رجل أنه يعجبنى أن يكون ثوبي حسنا ونعلى حسنا قال ان الله يحب الجمال ولكن الكبر من بطر الحق وغمص الناس الترمذي : الجامع الصحيح (۲) صفحة (۲۱) .
"আবদুল্লাহ (রা) হইতে বর্ণিত। নবী (স) বলেন: সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করিতে পারিবে না, যাহার অন্তরে বিন্দু পরিমাণ অহঙ্কার রহিয়াছে। আর জাহান্নামে প্রবেশ করিবে না সে ব্যক্তি যাহার অন্তরে বিন্দু পরিমাণ ঈমান রহিয়াছে। আবদুল্লাহ (রা) বলেন, এক ব্যক্তি বলিল, আমার তো ইহা ভালো লাগে যে, আমার পোশাক সুন্দর হউক, আমার জুতা সুন্দর হউক (ইহা কি অহঙ্কারের অন্তর্ভুক্ত)! রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, (না, ইহা তো ভাল কারণ) আল্লাহ্ সৌন্দর্য পছন্দ করেন; বরং অহঙ্কারী সেই ব্যক্তি যে সত্য প্রত্যাখ্যান করে এবং মানুষকে হেয় জ্ঞান করে।"
হযরত নূহ (আ) ছিলেন ধৈর্যের মূর্ত প্রতীক। তাই আপন কওমকে দিবারাত্র সারাক্ষণই দাওয়াত দিয়াছেন। তাঁহার কওম কাপড় মুড়ি দিয়া, কানে অঙ্গুলি প্রবেশ করাইয়া তাঁহার সে দাওয়াতের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করিয়াছে। এতদসত্ত্বেও তিনি ধৈর্যহারা হন নাই। সাড়ে নয় শত বৎসর তিনি এইভাবে সর্বদাই রোদন করিতেন, কখনও বা কওমের করুণ পরিণতির কথা স্মরণ করিয়া, কখনও নিজের অপরাধের কথা স্মরণ করিয়া। তিনি ছিলেন অতিশয় দয়ালু ও স্নেহবৎসল। তাই স্বীয় পুত্র কিন'আন কাফির হওয়া সত্ত্বেও তাহার নিশ্চিত মৃত্যু দেখিয়া তাঁহার স্নেহবাৎসল্য উথলিয়া উঠিয়াছে। তাহাকে নৌকায় আরোহণ করিয়া প্রাণ রক্ষার আহ্বান জানাইয়াছেন। কওম তাঁহাকে প্রহারে প্রহারে রক্তাক্ত করিয়া ফেলিয়াছে, বেহুঁশ হইয়া তিনি মাটিতে পড়িয়া গিয়াছেন, কিন্তু হুঁশ ফিরিতেই শরীরের ধূলি ঝাড়িয়া আবার তাহাদের নিকট গমন করিয়াছেন এবং দাওয়াত দিয়াছেন। কারণ তাহাদের মর্মন্তুদ শাস্তির কথা স্মরণ করিয়া তাঁহার হৃদয় বিগলিত হইয়াছে, তিনি স্থির থাকিতে পারেন নাই।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বৈশিষ্ট্যাবলী

📄 বৈশিষ্ট্যাবলী


নবী হিসাবে নূহ (আ) বহু বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন, যাহা অন্য কোনও নবীর মধ্যে ছিল না। তাঁহার বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ: (১) তিনিই প্রথম শরীআতের অধিকারী নবী ছিলেন; (২) তিনিই আল্লাহ্ দিকে প্রথম আহ্বানকারী; (৩) শিরক হইতে প্রথম সতর্ককারী; (৪) প্রথম দাঈ, যাঁহার উম্মাতকে তাঁহার আনীত হিদায়াত প্রত্যাখ্যানের কারণে শাস্তি দেওয়া হয়; (৫) তাঁহার দু'আর ফলে বিশ্বের সকলকে ধ্বংস করা হয়; (৬) তিনি নবী-রাসূলদের মধ্যে সর্বাধিক দীর্ঘ জীবন লাভ করিয়াছিলেন। তাই তাঁহাকে শায়খুল মুরসালীন ওয়া আকবারুল আম্বিয়া বলা হয়; (৭) তাঁহার নিজের মধ্যেই ছিল তাঁহার মুজিযা। কারণ তিনি হাজার বৎসরাধিক বয়স পাইয়াছিলেন, কিন্তু বয়সের ভারে ন্যুজ হইয়া পড়েন নাই। আর তাঁহার শারীরিক শক্তি কিছুমাত্র কম হয় নাই; (৮) দাওয়াতের কাজে তিনি প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালাইয়াছিলেন এবং তিনি দিবা-রাত্রে, প্রকাশ্যে ও গোপনে দাওয়াত দিয়াছেন; (৯) তিনি তাঁহার উম্মতের পক্ষ হইতে দীর্ঘদিন যাবত প্রহার, গালিগালাজ, তিরস্কার, ভর্ৎসনা, ঠাট্টা ও উপহাস প্রভৃতি কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করিয়াছিলেন। এইজন্য আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَقَوْمَ نُوحٍ مِّن قَبْلُ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَسَقِينَ .
"আমি ধ্বংস করিয়াছিলাম ইহাদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়কে; উহারা তো ছিল সত্যত্যাগী সম্প্রদায়” (৫১:৪৬);
(১০) আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে অঙ্গীকার ও ওহীর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় মুসতফা হিসাবে উল্লেখ করিয়াছেন। যেমন ইরশাদ হইয়াছে:
وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنْكَ وَمِنْ نُوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ (۷ : ৩৩)
"স্মরণ কর যখন আমি নবীদের নিকট হইতে অঙ্গীকার গ্রহণ করিয়াছিলাম এবং তোমার নিকট হইতেও এবং নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও মারয়াম-তনয় ঈসার নিকট হইতেও” (৩৩: ৭)। অন্যত্র ইরশাদ হইয়াছে:
إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّينَ مِنْ بَعْدِهِ
"আমি তো তোমার নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছি, যেমন নূহ ও তাহার পরবর্তী নবীগণের নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছিলাম" (৪: ১৬৩)।
(১১) যেদিন কিয়ামত কায়েম হইবে সেইদিন হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর পরে তিনি কবর হইতে উঠিবেন; (১২) তাঁহাকে আল্লাহ “কৃতজ্ঞ বান্দা”-রূপে আখ্যায়িত করেন। যথা-ইরশাদ হইয়াছে : إِنَّهُ كَانَ عَبْدًا شَكُورًا "সেতো ছিল পরম কৃতজ্ঞ বান্দা" (১৭ঃ ৩); (১৩) তাঁহাকে নৌকা প্রদান করা হইয়াছিল এবং উহার নির্মাণ জ্ঞানও শিক্ষা দেওয়া হইয়াছিল; তাঁহাকে উহাতে করিয়া হেফাজত করা হয় এবং পানির উপর দিয়া উহা চালনা করা হয়; (১৪) তাঁহাকে শান্তি ও কল্যাণ দ্বারা সম্মানিত করা হয়। যথা আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
يَا نُوحُ اهْبِطَ بِسَلَامٍ مِّنَّا وَبَرَكَاتٍ عَلَيْكَ وَعَلَى أُمَمٍ مِّمَّن مَّعَكَ (٤٨ : ١١ )
"হে নূহ! অবতরণ কর আমার পক্ষ হইতে শান্তি ও কল্যাণসহ তোমার প্রতি ও যে সমস্ত সম্প্রদায় তোমার সঙ্গে আছে তাহাদের প্রতি" (১১ঃ ৪৮)। মুহাম্মদ ইব্‌ন কা'ব আল-কুরাজী বলেন, কিয়ামত পর্যন্ত সকল মুমিন-মুমিনা এই শান্তি ও কল্যাণের অন্তর্ভুক্ত; (১৫) তাঁহার বংশধরদিগকেই আল্লাহ তা'আলা বংশ-পরম্পরায় পৃথিবীতে বিদ্যমান রাখিয়াছেন। যেমন ইরশাদ হইয়াছে:
وَجَعَلْنَا ذُرِّيَّتَهُ هُمُ الْبَاقِينَ .
"তাহার বংশধরদিগকেই আমি বিদ্যমান রাখিয়াছি বংশ-পরম্পরায়" (৩৭ঃ ৭৭)। এইজন্য তাহাকে আদম ছানী বলা হয় এবং বর্তমান মানবগোষ্ঠীর মূল ও আদি। কারণ তাঁহার তিন পুত্র, সাম, হাম ও য়াফিছ হইতেই বর্তমান মানবগোষ্ঠী বিস্তার লাভ করিয়াছে (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৬৩)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00