📄 প্লাবনের সূচনা ও তাননূর (উনান) উথলিয়া উঠার মর্ম
প্লাবনের সূচনার কথা আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন:
حَتَّى إِذَا جَاءَ أَمْرُنَا وَفَارَ التَّنُّورُ قُلْنَا احْمِلْ فِيهَا مِنْ كُلَّ زَوْجَيْنِ اثْنَيْنِ وَأَهْلَكَ إِلَّا مَنْ سَبَقَ عَلَيْهِ الْقَوْلُ وَمَنْ أَمَنَ . ( ٤٠ : ١١)
"অবশেষে যখন আমার আদেশ আসিল এবং উনান উথলিয়া উঠিল আমি বলিলাম, ইহাতে উঠাইয়া লও প্রত্যেক শ্রেণীর যুগলের দুইটি, যাহাদের বিরুদ্ধে পূর্ব সিদ্ধান্ত হইয়াছে তাহারা ব্যতীত তোমার পরিবার-পরিজনকে এবং যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদিগকে” (১১:৪০)।
এখানে উনান উথলিয়া উঠার মর্ম কি সে ব্যাপারে আলিমগণের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়।
(১) হযরত আলী ইবন আবী তালিব (রা) বলেন, ইহার অর্থ হইল ভোর হওয়া এবং চতুর্দিক, আলোকিত হইয়া যাওয়া। অর্থাৎ ভোরের আলো ছড়াইয়া পড়িলে সকলকে লইয়া নৌকায় আরোহন করিতে আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিলেন। তবে এই মতটি বিরল। অন্য কেহ এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেন নাই।
(২) ইবন আব্বাস (রা) বলেন, ইহার অর্থ হইল যমীনের উপরিভাগ তথা যমীনের উপর দিয়া পানি প্রবাহিত হওয়া। আরবগণ যমীনের উপরিভাগকে তাননূর বলিয়া অভিহিত করিয়া থাকে। সুতরাং আয়াতের অর্থ হইল, যমীনের সকল স্থান হইতে পানি উথলিয়া উঠিল, এমনকি অগ্নি প্রজ্জলিত হইবার স্থান উনান হইতেও। ইহাই অধিকাংশ আলিমের অভিমত (ইবন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১১১; পানিপতী, আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৫খ, ৮৫-৮৬)।
(৩) কাতাদা (র) বলেন, তাননূর হইল যমীনের সবচেয়ে উন্নত ও মর্যাদাসম্পন্ন স্থান;
(৪) হাসান, মুজাহিদ ও শা'বী (র) বলেন, তাননূর অর্থ হইল যেখানে রুটি তৈরী করা হয়। ইহাই অধিকাংশ মুফাস্সিরের মত। আর উহা ছিল একটি পাথরের উনান পূর্বে যাহা হাওয়া (আ)-এর ছিল (আল-কামিল, ১খ, ৫৬), পরে হাত বদল হইতে হইতে নূহ (আ)-এর নিকট আসিয়া পৌঁছে (আত-তাবারী, তারীখ, ১৯, ৯৪; পানিপতী, আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৫খ, ৮৬)। তাই ইহার অর্থ হইল, নূহ (আ)-কে বলা হইল যখন দেখিবে উক্ত উনান হইতে পানি উথলিয়া উঠিতেছে তখন তুমি ও তোমার সাথী-সঙ্গীবৃন্দ নৌকায় আরোহণ করিবে। অতঃপর তাঁহার স্ত্রী একদিন উনানে কাজ করিতেছিলেন। হঠাৎ উনান হইতে পানি উথলিয়া উঠিতে দেখিয়া তিনি নূহ (আ)-কে এই সংবাদ দিলেন (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৫৮)।
এই উনানটি কোথায় অবস্থিত ছিল সেই ব্যাপারে মতভেদ রহিয়াছেঃ (১) মুজাহিদ (র) বলেন, উহা ছিল কৃফার প্রান্ত সীমায়। এই ব্যাপারে সুদ্দী (র) শা'বী (র) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি আল্লাহ্র কসম করিয়া বলিতেন যে, উনান কুফার প্রান্তেই উথলিয়া উঠিয়াছিল। তিনি আরও বলেন, নূহ (আ) কূফার মসজিদের অভ্যন্তরেই নৌকা তৈরী করেন। আর উনান ছিল মসজিদের প্রবেশ পথের ডাইন দিকে যাহা কিনদা গোত্রের দরজার সহিত মিলিত ছিল। উনান উথলিয়া উঠা ছিল নূহ (আ)-এর জন্য তাঁহার কওম ধ্বংস হওয়ার একটি আলামত ও দলীল। (২) আলী ইবন আবী তালিব (রা) বলেন, কুফার মসজিদের কিনদা গোত্রের দরজার দিক হইতেই উনান উথলিয়া উঠিয়াছিল। (৩) মুকাতিল (র) বলেন, ইহা ছিল আদম (আ)-এর উনান। ইহা শাম (বর্তমান সিরিয়া)-এর আয়ন বিরদ নামক স্থানে অবস্থিত ছিল। (৪) ইবন আব্বাস (রা) বলেন, উনানটি ছিল ভারতবর্ষে। ইবন জারীর, ইবনুল মুনযির, ইবন আবী হাতিম, আবুশ-শায়খ ও আল-হাকিম ইহা বর্ণনা করত ইহাকে সহীহ বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন। কাতাদার বর্ণনামতে ইহা জাযীরাতুল আরবে ছিল (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৫৮; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৯৪-৯৫; পানিপতী, আত-তাফসীরুল-মাজহারী, ৫খ, ৮৬; ইবন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৭৪; ঐ লেখক, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১১১; ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৫৬)।
📄 প্লাবনের মুহূর্তে নূহ (আ)-এর দু'আ
অতঃপর সকলকে লইয়া নূহ (আ) যখন নৌযানে আরোহণ করিলেন তখন আল্লাহ্র নির্দেশে এই দু'আ পাঠ করিলেন:
بِسْمِ اللَّهِ مَجْرِهَا وَمُرْسُهَا إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ.
"আল্লাহর নামে ইহার গতি ও স্থিতি। আমার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (১১:৪১)।
আল্লাহ্র নির্দেশে তিনি আরও বলিলেন:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي نَجْنَا مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ.
"সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্রই, যিনি আমাদিগকে উদ্ধার করিয়াছেন জালিম সম্প্রদায় হইতে” (২৩: ২৮)।
তিনি আল্লাহ্র নির্দেশে তাঁহার নিকট দু'আ করিলেন:
رَبِّ انْزِلْنِي مُنْزَلًا مُبَارَكًا وَأَنْتَ خَيْرُ الْمُنْزِلِينَ.
"হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমনভাবে অবতরণ করাও যাহা হইবে কল্যাণকর; আর তুমিই শ্রেষ্ঠ অবতরণকারী" (২৩: ২৯)।
📄 মহাপ্লাবন
অতঃপর সকলের নৌযানে আরোহণ সমাপ্ত হইলে আল্লাহ্র নির্দেশে প্লাবন শুরু হইল। ইবন জারীর প্রমুখের বর্ণনামতে, গ্রীক হিসাব অনুযায়ী 'আব' মাসের ১৩ তারিখে উক্ত প্লাবন শুরু হয়। আরবী রজব মাসের দশ তারিখে (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬০; ইবন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ১১২)। তখন পৃথিবীর সকল প্রস্রবণ, কূপ ও জলাশয় এবং বড় বড় নদী-নালা ফুঁসিয়া উঠিল। আকাশ হইতে ৪০ দিন ৪০ রাত্র অবিরল ধারায় বৃষ্টিপাত হইতে থাকিল। অতঃপর প্রবল বেগে পানি বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। ইহাই আল্লাহ তা'আলা কুরআন করীমে ইরশাদ করিয়াছেনঃ "আমি উন্মুক্ত করিয়া দিলাম আকাশের দ্বার প্রবল বারি বর্ষণে এবং মৃত্তিকা হইতে উৎসারিত করিলাম প্রস্রবণ; অতঃপর সকল পানি মিলিত হইল এক পরিকল্পনা অনুসারে" (৫৪ : ১১-১২)। এইভাবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নৌকা ভাসিল (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬০; ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ., ৫৬-৫৭; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৯৪)।
এইভাবে পানি কেবল বৃদ্ধিই পাইতে লাগিল, এমনকি সকল পাহাড়-পর্বত ডুবিয়া গেল। ইবন আব্বাস (রা)-এর বর্ণনামতে, এই প্লাবনে পৃথিবীর পানি সর্বোচ্চ পাহাড় হইতে ১৫ হাত উপরে উঠিয়া যায়। বাইবেলে এই কথাই বলা হইয়াছে। মতান্তরে পাহাড় হইতে ৮০ হাত উপরে পানি উঠিয়া যায় (Genesis, 6:20)। পর্বত-প্রমাণ তরঙ্গ প্রবাহিত হইতে লাগিল। উহার মধ্য দিয়া নূহ (আ)-এর নৌযান উক্ত পানিতে ভাসিতে লাগিল (১১: ৪২)। নৌযানখানি পানির উপর ৬ হাত ভাসিয়া ছিল (ইব্ন সাদ, ১খ, ৪১), অবশিষ্ট ২৪ হাত পানির নীচে নিমজ্জিত ছিল। এইভাবে ভাসমান অবস্থায় নৌকা চলিতে লাগিল। কোথায়ও উহা স্থির থাকিল না। ৬ মাস এইভাবে নৌকা ভাসিতে থাকিল। অতঃপর উহা হারামের নিকট আসিল, কিন্তু উহাতে প্রবেশ করিল না, বরং এক সপ্তাহ যাবৎ উহার চতুর্পার্শ্বে ঘুরিতে লাগিল। ইহা ছিল সেই ঘর যাহার কেন্দ্র রক্ষা করিবার জন্য আল্লাহ তা'আলা উহাকে ৪র্থ আসমানে উঠাইয়া লইয়াছিলেন। ইহা ছিল জান্নাতের ইয়াকৃত দ্বারা তৈরী। জিবরীল (আ) হাজরে আসওয়াদকে আবূ কুবায়স পর্বতে উঠাইয়া রাখিয়াছিলেন। ইবরাহীম (আ)-এর বায়তুল্লাহ নির্মাণ পর্যন্ত উহা সেখানেই ছিল। অতঃপর তিনি উহা স্বস্থানে স্থাপন করেন (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬০; ইব্ন সাদ, তাবাকাত, ১খ, ৪১; ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৫৬)।
এইভাবে ভাসিতে ভাসিতে উহা জুদী পর্বতে গিয়া স্থির হইল (জুদী পর্বতের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ পরে আসিতেছে)। অবশেষে আল্লাহর সিদ্ধান্ত কার্যকর হইবার পর পৃথিবীকে পানি গ্রাস করিয়া লইতে এবং আকাশকে বারি বর্ষণ হইতে ক্ষান্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্লাবন শুরু হইতে পানি গ্রাস করা পর্যন্ত সময় ছিল ছয় মাস (ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৫৭)। ইবন আব্বাস (রা) বলেন, নূহ (আ)-এর নৌকা জুদী পর্বতে স্থির হয়, আর পৃথিবীতে যাহা কিছু ছিল, কাফির-মুশরিক, প্রাণীকুল ও গাছপালা সবই ধ্বংস হইয়া যায়। তাই নূহ (আ) ও তাঁহার সঙ্গে নৌকায় যাহারা ছিল তাহারা ব্যতীত পৃথিবীতে আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না (আছ-ছা'লাবী, কাসাস, পৃ. ৬০)। ইহাই কুরআন করীমে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন:
وَقِيلَ يَأَرْضُ ابْلَعِي مَاءَكِ وَيَسَمَاءُ أَقْلِعِي وَغِيضَ الْمَاءُ وَقُضِيَ الْأَمْرُ وَاسْتَوَتْ عَلَى الْجُودِي وَقِيلَ بعدا لِلْقَوْمِ الظَّلِمِينَ (٤٤ - ١١)
"ইহার পর বলা হইল, হে পৃথিবী! তুমি তোমার পানি গ্রাস করিয়া লও এবং হে আকাশ! ক্ষান্ত হও। ইহার পর বন্যা প্রশমিত হইল এবং কার্য সমাপ্ত হইল। নৌকা জুদী পর্বতের উপর স্থির হইল এবং বলা হইল, জালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হউক” (১১:৪৪)।
উল্লেখ্য যে, কাতাদা প্রমুখের বর্ণনামতে নৌকা জুদী পর্বতে স্থির ছিল এক মাস (ইবন কাছীর, কাসাস, পৃ. ৮৩; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১১৬)।
ইন জারীর তাবারী, ছা'লাবী ও ইবন কাছীর প্রমুখ নৌযান ও প্লাবন সম্পর্কে নূহ (আ)-এর তনয় হাম-এর যবানীতে একটি রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন। তাহা হইল, আলী ইব্ন যায়দ ইব্ন জুদআন সূত্রে ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, হাওয়ারীগণ একবার ঈসা ইবন মারয়াম (আ)-কে বলিল, আপনি যদি এমন এক ব্যক্তিকে আমাদের সম্মুখে জীবিত করিতেন যিনি নূহ (আ)-এর নৌকা স্বচক্ষে দেখিয়াছিলেন, অতঃপর সেই সম্পর্কে আমাদিগকে অবহিত করিতেন। ঈসা (আ) তাহাদিগকে লইয়া চলিতে চলিতে একটি'মাটির স্তূপের নিকট আসিলেন। অতঃপর উহা হইতে একমুষ্টি মাটি লইয়া বলিলেন, ثُمَّ باذن الله (আল্লাহর হুকুমে দাঁড়াইয়া যাও)। ইহা বলিতেই তিনি মস্তক হইতে মাটি ঝাড়িতে ঝাড়িতে দাঁড়াইয়া গেলেন। তিনি তখন বৃদ্ধ হইয়া গিয়াছিলেন। ঈসা (আ) তাহাকে বলিলেন, তুমি কি এই অবস্থায়ই ইনতিকাল করিয়াছিলে? তিনি বলিলেন, না, আমি যুবা অবস্থায়ই মারা যাই। কিন্তু আমি মনে করিলাম বুঝি কিয়ামত হইয়া গিয়াছে। সেই আতঙ্কেই আমি বৃদ্ধ হইয়া গিয়াছি। ঈসা (আ) তাহাকে বলিলেন, "নূহ (আ)-এর নৌকার বিবরণ দাও।” তিনি বলিলেন, 'উহার দৈর্ঘ্য ছিল ১২০০ হাত এবং প্রস্থ ছিল ৬০০ হাত। উহা ছিল তিন তলাবিশিষ্ট। এক তলায় ছিল চতুষ্পদ জন্তু ও হিংস্র প্রাণী, আর এক তলায় ছিল মানুষ, অপর এক তলায় ছিল পক্ষীকুল। চতুষ্পদ জন্তুর বিষ্টা যখন বাড়িয়া গেল তখন আল্লাহ্ তা'আলা নূহ (আ)-কে ওহী পাঠাইলেন যে, হাতীর লেজে আঘাত কর। তিনি আঘাত করিলেন, তখন উহা হইতে একটি নর শূকর ও একটি মাদি শূকর বাহির হইল। ইহারা সকল বিষ্টা খাইয়া ফেলিল। অতঃপর যখন ইঁদুরের উপদ্রব বৃদ্ধি পাইল এবং উহারা নৌকার রশিসমূহ কাটিয়া ফেলিতে লাগিল তখন আল্লাহ তা'আলা নূহ (আ)-এর নিকট ওহী পাঠাইলেন যে, সিংহের চক্ষুদয়ের মধ্যখানে আঘাত কর। অতঃপর তিনি সেখানে আঘাত করিলে উহার নাক দিয়া একটি নর ও একটি মাদি বিড়াল বাহির হইল এবং ইঁদুরের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িয়া উহাদিগকে খাইয়া ফেলিল। ঈসা (আ) তাহাকে বলিলেন যে, নূহ (আ) কিভাবে জানিলেন যে, জনপদ ও শহর শুকাইয়া গিয়াছে? তিনি বলিলেন, “তিনি খবর আনিবার জন্য প্রথমে কাক প্রেরণ করেন। অতঃপর উহা মরা লাশ পাইয়া উহাতে বসিয়া পড়ে এবং ফিরিয়া আসার পরিবর্তে সেখানেই মশগুল হইয়া পড়ে। তখন নূহ (আ) উহার প্রতি বদদোআ করেন যেন তাহার অন্তরে ভীতির সৃষ্টি হয়। এইজন্য উহা মানুষের পোষ মানে না এবং ঘরে আসিতে পারে না। অতঃপর তিনি কবুতর প্রেরণ করিলেন। উহা ঠোঁটে করিয়া যয়তুনের পাতা এবং পায়ে করিয়া কাদা মাটি লইয়া আসিল। তখন তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, শহর ও জনপদ শুকাইয়া গিয়াছে। তখন তিনি কবুতরের গলায় সবুজের মালা পরাইয়া দিলেন যাহা এখনও পরিদৃষ্ট হয় এবং উহার জন্য দোআ করিলেন যেন সে ভালবাসা ও নিরাপত্তা লাভ করে। এইজন্য উহা মানুষের পোষ মানে এবং ঘরের সহিত সম্পৃক্ত থাকে।” তাহারা বলিল, “হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা ইহাকে আমাদের পরিবারের নিকট লইয়া যাই না কেন? সে আমাদের সহিত, উঠা বসা করিবে এবং আমাদের সহিত কথাবার্তা বলিবে।” তিনি বলিলেন, যাহার রিযিক নাই সে কিভাবে তোমাদের সঙ্গে যাইবে? অতঃপর তাহাকে বলিলেন, عد باذن الله "আল্লাহ্র নির্দেশে পূর্বের রূপে ফিরিয়া যাও।" তখন সে আবার মাটি হইয়া গেল (ইব্ন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৮২-৮৩; ঐ লেখক, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১১৬; আত-তাবারী, ১খ., ৯১-৯২; ঐ লেখক, তাফসীর, ১২খ., ২২; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬১; পানিপতী, আত-তাফসীরুল-মাজহারী, ৫খ., ৯০)। হাফিজ ইব্ন কাছীর এই রিওয়ায়াত বর্ণনার পর এই সম্পর্কে মন্তব্য করিয়াছেন যে, ইহা চূড়ান্ত পর্যায়ের বিরল (غریب جدا) (দ্র. তাহার রচিত কাসাসুল-আম্বিয়া ও আল-বিদায়া ও নিহায়া, প্রাগুক্ত)।
📄 নূহ (আ) তনয় কিনআনের অবস্থা
আল্লাহ্ তা'আলা নূহ (আ)-কে প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন যে, তিনি তাঁহার পরিবার-পরিজন ও মুমিনদিগকে রক্ষা করিবেন। নূহ (আ)-এর এক পুত্রের নাম ছিল য়াম, যাহাকে কিনআন বলা হইয়াছে। সে ছিল কাফির, ঈমান আনে নাই। ফলে সে নৌকায়ও আরোহণ করে নাই। প্লাবনে ডুবিয়া তাহার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী দেখিয়া নূহ (আ)-এর পিতৃ-হৃদয় স্নেহ বিগলিত হইয়া উঠিল। তিনি নিতান্ত স্নেহভরে পুত্রকে ডাকিলেন এবং আরোহণ করিতে বলিলেন। কাফিরদের সঙ্গী হইতে নিষেধ করিলেন। কিন্তু সে উহা প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিল যে, সে পাহাড়ে গিয়া আশ্রয় লইবে। নূহ (আ) বলিলেন, আল্লাহ্ আযাব হইতে আজ কেহই রক্ষা করিতে পারিবে না। তিনি যাহার প্রতি রহম করিবেন কেবল সেই রক্ষা পাইবে। অতঃপর বিশাল এক তরঙ্গ আসিয়া দুইজনের মধ্যে অন্তরায় সৃষ্টি করিল। অতঃপর সে নিমজ্জিতদের অন্তর্ভুক্ত হইল (১১:৪২-৪৩)। তখন নূহ (আ) তাহার ব্যাপারে আল্লাহ্র নিকট অনুযোগ [কোন কোন মুফাসসিরের মতে কিনআন নিমজ্জিত হইবার পূর্বে নূহ (আ) আল্লাহকে সম্বোধন করিয়া ইহা বলেন। সেক্ষেত্রে ইহা অনুযোগ না হইয়া বরং স্বীয় পুত্রের জন্য সুপারিশ হইবে] করিলেন এবং তাহাকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করাইয়া দিয়া বলিলেন, 'হে আমার প্রতিপালক! আমার পুত্র আমার পরিবারভুক্ত এবং আপনার প্রতিশ্রুতি সত্য। আর আপনি তো বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক' (১১: ৪৫)। উল্লেখ্য যে, "পরিবারভুক্ত" লোকের দ্বারা আল্লাহ তা'আলা সৎকর্মপরায়ণ ও তাঁহার অনুসারীবৃন্দকে বুঝাইয়াছিলেন: কিন্তু নূহ (আ) আপন বৈবাহিক সূত্রে সৃষ্ট পরিবার বুঝিয়াছিলেন, সেইজন্য ঐরূপ অনুযোগ বা সুপারিশ করিয়াছিলেন, তাই আল্লাহ তা'আলা ইহাতে অসন্তোষ প্রকাশ করিয়া তাহাকে বলিলেন, 'হে নূহ! সে তো তোমার পরিবারভুক্ত নহে। সে তো অসৎকর্মপরায়ণ। সুতরাং যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নাই সে বিষয়ে আমাকে অনুরোধ করিও না। আমি তোমাকে উপদেশ দিতেছি। তুমি যেন অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত না হও' (১১:৪৬)। অতঃপর নূহ (আ) নিজের ভুল বুঝিতে পারিয়া লজ্জিত ও অনুতপ্ত হইলেন এবং আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। বলিলেন, 'হে আমার প্রতিপালক! যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নাই সে বিষয়ে যাহাতে আপনাকে অনুরোধ না করি, এইজন্য আপনার শরণ লইতেছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন এবং আমাকে দয়া না করেন তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হইব' (১১:৪৭)।
উক্ত সর্বগ্রাসী প্লাবন হইতে কোন কাফিরই প্রাণে রক্ষা পায় নাই, সকলেই পানিতে নিমজ্জিত হইয়া প্রাণ হারাইয়াছিল। কোন কাফির মুশরিকের প্রতি সেই সময় আল্লাহ্ তা'আলা দয়া প্রদর্শন করেন নাই। ইন্ন জারীর তাবারী ও ইব্ন আবী হাতিম প্রমুখ ইয়া'কূব ইব্ন্ন মুহাম্মাদ আয-যুহরী সূত্রে আইশা (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আল্লাহ তা'আলা যদি নূহ (আ) সম্প্রদায়ের কাহারও প্রতি দয়া প্রদর্শন করিতেন তবে অবশ্যই সেই শিশুটির মায়ের প্রতি দয়া করিতেন। তাহার ঘটনা এই ছিল যে, প্লাবনের পানি যখন রাস্তাঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়া গেল তখন এক শিশুর মাতা ভয় পাইয়া গেল। সে শিশুটিকে ভীষণ ভালবাসিত। অতঃপর সে শিশুটিকে লইয়া পাহাড়ে আশ্রয় নিতে গেল এবং পাহাড়ের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত আরোহণ করিল। সে পর্যন্ত পানি পৌছিলে সে শিশুটিকে লইয়া পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করিল। পানি যখন তাহার পা পর্যন্ত পৌঁছিল তখন সে শিশুটিকে দুই হাত উঁচু করিয়া ধরিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হইল না, মা ও শিশু উভয়েই নিমজ্জিত হইল (ইব্ন জারীর আত-তাবারী, তারীখ, ১খ., ৯১; ঐ লেখক, তাফসীর, ১২খ., ২১-২২; ইব্ন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৭৮-৭৯; ঐ লেখক, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১১৩-১১৪; আছ-ছালাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬০)।
কোন কোন ইতিহাসবেত্তা ও মুফাসসির এই বিষয়ে এক অলীক ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন যে, উজ ইব্ন ইনাক নামক এক অসম্ভব দীর্ঘাকৃতির লোক উক্ত প্লাবন হইতে নৌকায় আরোহণ না করিয়াও রক্ষা পাইয়াছিল। তাহাদের বর্ণনামতে, উজ ইব্ন 'ইনাক' নূহ (আ)-এর পূর্বকাল হইতে মূসা (আ)-এর সময়কাল পর্যন্ত জীবিত ছিল। সে ছিল কাফির, অহঙ্কারী ও উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। সে ৩,৩৩৩ হাত লম্বা ছিল। এত দীর্ঘ হওয়ার কারণে সে সমুদ্রের তলদেশ হইতে মাছ ধরিয়া তাহা সরাসরি সূর্যের কাছে ধরিয়া উহার তাপে ভুনা করিয়া খাইত। সে নূহ (আ)-কে নৌকায় তুলিবার অনুরোধ করে, কিন্তু সে কাফির থাকায় নূহ (আ) তাহার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। অতঃপর প্লাবন শুরু হইলে প্লাবনের পানি তাহার হাঁটুর উপর উঠিতে পারে নাই। ফলে সে নিমজ্জিত হওয়া হইতে রক্ষা পায় (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬০-৬১; ইব্ন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৭৯; ঐ লেখক, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১১৪; আল-আলুসী, রূহুল-মাআনী, ১২খ., ৬২; আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৫খ., ৯০)। এক বর্ণনামতে তাহার রক্ষা পাওয়ার কারণ ছিল, নূহ (আ) নৌকা তৈরীর জন্য সেগুন কাঠের প্রয়োজন অনুভব করেন। কিন্তু তিনি কোথাও উহা পাইতেছিলেন না। 'উজ তাহাকে শাম হইতে উহা বহন করিয়া আনিয়া দেয়। এইজন্য আল্লাহ তা'আলা তাহাকে নিমজ্জিত হওয়া হইতে রক্ষা করেন (আত-তাফসীরুল মাজহারী, প্রাগুক্ত)। কিন্তু এই ঘটনা একদিকে যেমন যুক্তিগ্রাহ্য নহে, অপরদিকে তেমনি সুস্পষ্ট কুরআন-হাদীছের পরিপন্থী। যুক্তিগ্রাহ্য এইজন্য নহে যে, স্বয়ং নূহ (আ)-এর ঔরসজাত পুত্র কিনআন তাহার কুফরীর কারণে রক্ষা পায় নাই, নূহ (আ)-এর সুপারিশ সত্ত্বেও। অথচ তাহার পিতা একজন সম্মানিত নবী ও আল্লাহ্ প্রিয় বান্দা, আর উজ তো এক অহংকারী কাফির। অপরদিকে একজন অসহায় নারী ও নিষ্পাপ শিশুর প্রতি আল্লাহ তা'আলা দয়া প্রদর্শন করেন নাই, আর এহেন একজন কাফির, মুশরিককে আল্লাহ্ দয়া প্রদর্শন করিয়া রক্ষা করিবেন, ইহা কোনও সুস্থ বিবেক গ্রহণ করিতে পারে না। আর কাষ্ঠ বহন করিয়া আনার বিষয়টিও স্বীকৃত নহে। কারণ অধিকাংশ বর্ণনামতে নূহ (আ) নিজেই বৃক্ষ রোপণ করিয়াছিলেন এবং উক্ত বৃক্ষের কাঠ দ্বারাই নৌকা তৈরী করা হয়। আর উহা কুরআন হাদীছের- পরিপন্থী এইজন্য যে, নূহ (আ)-এর প্রার্থনা ছিল:
رَبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَافِرِينَ دَيَّارًا .
পৃথিবীতে বসবাসকারী কোন কাফির যেন নিস্তার না পায় (৭১: ২৬)। আর এই দু'আই কবূল হইয়াছিল আল্লাহ্র দরবারে। তাই উজ ইব্ন ইনাক কাফির হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে নিস্তার পাইতে পারে? অপরদিকে আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন যে, মুমিন বান্দা ছাড়া অন্য সকলকে আমি নিমজ্জিত করিয়াছিলাম (৩৭: ৮১-৮২)। সুতরাং উজ ইন্ন ইনাক-এর প্লাবন হইতে রক্ষা পাইয়া মূসা (আ)-এর যুগ পর্যন্ত জীবিত থাকার বিষয়টি কোন ক্রমেই সমর্থনযোগ্য নহে।
অপরদিকে তাহার যে অসম্ভব রকমের দীর্ঘাকৃতির কথা বর্ণনা করা হইয়াছে তাহা সহীহ হাদীছের পরিপন্থী। কারণ রাসূলুল্লাহ (স) বলেন:
ان الله خلق ادم وطوله ستون ذراعا ثم لم يزل الخلق ينقص حتى الان
"আল্লাহ্ তা'আলা আদম (আ)-কে ষাট হাত লম্বা করিয়া সৃষ্টি করিয়াছিলেন। অতঃপর বর্তমান পর্যন্ত মানুষের দৈর্ঘ্য কেবল হ্রাস পাইতেছে" (আস-সাহীহ, ১খ., ৪৬৮)।
ইহাতে মিথ্যার লেশমাত্র নাই। সুতরাং ইহার ব্যত্যয় হইবার নহে (ইব্ন কাছীর; কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৯-৮০; ঐ লেখক, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১১৪; পানিপতী, আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৫খ., ৯০-৯১)। তাই বলা যায় যে, এই ঘটনা ইয়াহূদ-নাসারাদের মনগড়া কল্প-কাহিনী বৈ আর কিছুই নহে।