📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নৌকায় আরোহণ

📄 নৌকায় আরোহণ


নৌযান তৈরীর কাজ সমাপ্ত হইলে আল্লাহ তা'আলা ওহী পাঠাইলেন যে, উহাতে উঠাইয়া লও প্রত্যেক শ্রেণীর যুগলের দুইটি, যাহাদের বিরুদ্ধে পূর্ব সিদ্ধান্ত হইয়াছে তাহারা ব্যতীত তোমার পরিবার-পরিজনকে এবং যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদিগকে (১১ : ৪০)। প্রাণীকুলের প্রত্যেক জাতের একজোড়া করিয়া তোলার নির্দেশ এজন্য দিয়াছিলেন যাহাতে উহাদের বংশ বিলুপ্ত হইয়া না যায়। বাইবেলে বলা হইয়াছে যে, শুচি পশুর সাত জোড়া এবং অশুচি পশুর এক জোড়া নৌকায় উঠাও (Genesis, 7 : 2-3); ইহা যুক্তিসঙ্গত বলিয়া মনে হয় না। কারণ বংশ সংরক্ষণের জন্য এক জোড়াই যথেষ্ট। অতঃপর স্থলভাগ ও জলভাগ এবং পর্বত ও সমভূমির সকল জীব-জন্তুকে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার নিকট একত্র করিয়া দিলেন। এক বর্ণনামতে ৪০ দিবা-রাত্র অবিরল ধারায় বৃষ্টি হয়। ফলে হিংস্র প্রাণী, জীবজন্তু ও পক্ষীকুল নূহ (আ)-এর নিকট আসিয়া জড়ো হয়। অতঃপর তিনি উহাদের জোড়ায় জোড়ায় নৌকায় তোলেন এবং আদম (আ)-এর লাশও তোলেন। অতঃপর নারী-পুরুষের মধ্যখানে পর্দা হিসাবে উহা রাখিয়া দেন (ইবন সা'দ, তাবাকাত, ১খ, ৪১)। ইবন জারীর আত-তাবারী ও ইবনুল আছীর প্রমুখ ইবন আব্বাস (রা) হইতেও অনুরূপ একটি রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন (আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৯৪; ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৫৭-৫৮)।
কোন তলায় কোন জীব আরোহণ করে সেই ব্যাপারেও মতভেদ রহিয়াছে। এক বর্ণনামতে নীচ তলায় জীবজন্তু, দ্বিতীয় তলায় মানুষ ও রসদপত্র এবং তৃতীয় তলায় পক্ষীকুলকে আরোহণ করান হয় (ইবন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৩; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১১০; পানিপতী, আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৫খ, ৮৫)। অপর এক বর্ণনামতে জীবজন্তু দ্বিতীয় তলায় এবং মানুষ উপরের তলায় আরোহণ করে। তাহাদের সহিত স্নেহভরে তোতা পাখীকেও লওয়া হয় যাহাতে অন্য কোন প্রাণী তাহাকে হত্যা না করে (আছ-ছা'লাবী, কাসাস, পৃ. ৫৯)। অন্য এক বর্ণনামতে নূহ (আ) পক্ষীকুলকে নীচের তলায় এবং হিংস্র প্রাণী ও অন্যান্য জীবজন্তুকে মধ্যের তলায় আরোহণ করান। আর নিজে ও তাঁহার সঙ্গীরা উপরের তলায় আরোহণ করেন (ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ., ৫৭)। কাযী ছানাউল্লাহ পানিপতী স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে শারহু খুলাসাতিল মাসীর গ্রন্থের বরাতে উল্লেখ করিয়াছেন যে, নীচ তলায় আরোহণ করে পক্ষীকুল, হিংস্র প্রাণী ও অন্যান্য সকল জীবজন্তু, মধ্যের তলায় ছিল খাদ্য, পানীয় ও কাপড়-চোপড়। আর উপরের তলায় আরোহণ করে মানবমণ্ডলী (আত-তাফসীরুল-মাজহারী, ৫খ, ৮৫)। তবে সর্বপ্রথম বর্ণিত মতটি যুক্তিযুক্ত ও সঠিক বলিয়া মনে হয়। কারণ চতুষ্পদ জন্তুর জন্য নিচের তলায় আরোহণ সুবিধাজনক, আর পক্ষীকুলের জন্য উপরের তলাই সুবিধাজনক আর মানুষ তো যে কোন তলাতেই আরোহণ করিতে পারে।
ইবন আব্বাস (রা)-এর একটি রিওয়ায়াত অনুসারে সর্বপ্রথম নৌযানে আরোহণ করে পক্ষীকুলের মধ্যে তোতা পাখি এবং সর্বশেষ আরোহণ করে প্রাণীকুলের মধ্যে গাধা। ইবলীস উহার লেজ ধরিয়া আরোহণ করে। গাধা যখন নৌকায় প্রবেশচ্ছিল তখন ইবলীস উহার লেজ ধরিলে গাধা তাহার পা তুলিতে পারিতেছিল না। তখন নূহ (আ) ধমক দিয়া বলিলেন, ধিক তোমার! প্রবেশ কর যদিও শয়তান তোমার সঙ্গে থাকে। নূহ (আ)-এর মুখ দিয়া অকস্মাৎ ইহা বাহির হইয়া পড়িয়াছিল। শয়তান এই সুযোগে গাধার সহিত নৌকায় প্রবেশ করিল। নূহ (আ) তাহাকে নৌকায় দেখিয়া বলিলেন, তুই কেন আসিলি, হে আল্লাহর দুশমন! শয়তান বলিল, কেন! আপনি বলেন নাই, প্রবেশ কর, যদিও শয়তান তোমার সঙ্গে থাকে? অনেকের ধারণামতে শয়তান নৌকার উপরিভাগে ছিল (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৫৯; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৯৩; ঐ লেখক, তাফসীর, ১২খ, ২৩; ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৫৬-৫৭; পানিপতী, আত-তাফসীরুল-মাজহারী, ৫খ, ৮৭)।
মালিক ইব্‌ন সুলায়মান আন-নাহবারী বলেন, নৌকায় যখন সকল জীবজন্তু আরোহণ করিতেছিল তখন সর্প ও বিচ্ছু নূহ (আ)-এর নিকট আসিয়া বলিল, আমাদিগকেও আরোহণ করান। তিনি বলিলেন, তোমরা তো ক্ষতি, কষ্ট ও বিপদের কারণ। তাই আমি তোমাদিগকে আরোহণ করাইব না। তাহারা বলিল, আমাদিগকে আরোহণ করিতে দিন, আমরা আপনাকে এই প্রতিশ্রুতি দিতেছি যে, যাহারা আপনার স্মরণ করিবে তাহাদের কাহাকেও আমরা কোনরূপ ক্ষতি করিব না। এইজন্যই যে উহাদের ক্ষতির ভয় পায় সে যদি এই আয়াত তেলাওয়াত করে (৩৭:৭৯)
سَلَامٌ عَلَى نُوحٍ فِي الْعَالَمِينَ . إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ . إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِينَ .
তবে উহারা তাহার কোন ক্ষতি করে না (আছ-ছা'লাবী, প্রাগুক্ত; পানিপতী, আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৫খ, ৮৭-৮৮)।
ওয়াহব ইবন মুনাব্বিহ (র) বলেন, আল্লাহ যখন নূহ (আ)-কে প্রত্যেক প্রাণীর একজোড়া করিয়া নৌকায় আরোহণ করার নির্দেশ দিলেন তখন নূহ (আ) বলিলেন, সিংহ ও গাভী কিভাবে একত্র করিব? আল্লাহ তা'আলা তাহাকে বলিলেন, কে তাহাদের মধ্যে শত্রুতা পয়দা করিয়া দিয়াছে? নূহ (আ) বলিলেন, ওগো আমার প্রতিপালক! তুমিই। আল্লাহ বলিলেন, আমি তাহাদের মধ্যে ভালবাসা ও সমঝোতা পয়দা করিয়া দিব, ফলে একে অন্যের ক্ষতি করিবে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা সিংহকে জ্বরগ্রস্ত করিয়া দিলেম। তখন সে নিজকে লইয়াই ব্যস্ত রহিল (প্রাগুক্ত, আল-আলুসী, রূহুল-মা'আনী, ১২খ, ৫৪)।
ইবন আবী হাতিম সূত্রে যায়দ ইবন আসলাম (রা) তাঁহার পিতা হইতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, নূহ (আ) যখন নৌকায় প্রত্যেক প্রাণীর একজোড়া করিয়া তুলিলেন, তখন তাহার সঙ্গীগণ বলিল, আমরা কিভাবে নিশ্চিত ও প্রশান্তিতে থাকিব অথচ আমাদের সহিত সিংহ রহিয়াছে! অতঃপর আল্লাহ তা'আলা সিংহকে জ্বরে আক্রান্ত করিয়া দিলেন। পৃথিবীর বুকে ইহাই ছিল প্রথম জ্বর। অতঃপর তাহারা ইঁদুর সম্পর্কে অভিযোগ করিয়া বলিল যে, উহা তো আমাদের খাদ্য দ্রব্য ও মালপত্র বিনষ্ট করিয়া ফেলিবে। তখন আল্লাহ তা'আলা সিংহের প্রতি প্রত্যাদেশ করিলে উহা হাঁচি দিল। ইহা হইতে বিড়াল বাহির হইল। বিড়ালের ভয়ে ইঁদুর আত্মগোপন করিয়া রহিল। এই বর্ণনার সনদটি মুরসাল (ইবন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৪; ঐ লেখক, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১খ, ১১১; ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৫৭; আল-আলুসী, রূহুল-মা'আনী, ১২খ, ৫৩)।
হযরত নূহ (আ)-এর সহিত কতজন মুমিন নৌকায় আরোহণ করিয়াছিল সেই ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। (১) ইবন আব্বাস (রা)-এর বর্ণনামতে তাহারা ছিল স্ত্রী-পুরুষ মিলিয়া ৮০ জন, যাহাদের একজনের নাম ছিল জুরহুম এবং তাহাদের সঙ্গে তাহাদের মহিলারাও ছিল। তাহার অপর এক বর্ণনায় সর্বমোট ৮০ জনের কথা বলা হইয়াছে যাহার ব্যাখ্যা হইল: শাম, হাম, য়াফিছ ও তাহাদের স্ত্রীগণ, নূহ (আ)-এর পত্নী এবং শীছ (আ) বংশের অন্য ৭০ জন। (২) মুকাতিল-এর বর্ণনামতে ৭২ জন পুরুষ ও নারী। নূহ (আ)-এর তিন পুত্র ও তাহাদের স্ত্রীগণ এই মোট ৭৮ জন, যাহাদের অর্ধেক পুরুষ ও অর্ধেক ছিল নারী। (৩) কা'ব আল-আহবার-এর বর্ণনামতে ৭২ জন। (৪) ইবন ইসহাকের বর্ণনামতে মহিলা ছাড়া ছিল দশজন : নূহ (আ), তাঁহার তিন পুত্র সাম, হাম, য়াফিছ এবং তাঁহার উপর ঈমান আনয়নকারী ছয়জন এবং ইহাদের স্ত্রীগণ অর্থাৎ দশজন পুরুষ ও দশজন মহিলা মোট ২০ জন। (৫) কাতাদা, ইবন জুরায়জ ও মুহাম্মাদ ইবন কা'ব আল-কুরাজীর বর্ণনামতে নৌকায় নূহ (আ), তাঁহার স্ত্রী, তাঁহার তিন পুত্র সাম, হাম, য়াফিছ এবং তাহাদের তিন পত্নী এই মোট ৮ জন ছাড়া আর কেহ ছিল না। (৬) আ'মাশ-এর বর্ণনামতে ৭ জন। নূহ (আ), তাঁহার তিন পুত্র ও তাহাদের তিন পত্নী। তিনি তাহাদের মধ্যে নূহ (আ)-এর স্ত্রীর কথা উল্লেখ করেন নাই (আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৯৫; ইবন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৭৫; ঐ লেখক, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১১১; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৫৯; ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৫৬; ছানাউল্লাহ পানিপতী, আত-তাফসীরুল-মাজহারী, ৫খ, ৮৭)। তবে শেষোক্ত মত দুইটি সঠিক নহে এবং তাহা গ্রহণযোগ্যও হইতে পারে না। কারণ ইহা স্পষ্টতই কুরআন করীমের পরিপন্থী। আয়াতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রহিয়াছে যে, তাঁহার পরিবার-পরিজন ছাড়াও তাঁহার উপর ঈমান আনয়নকারীদের একটি দলও ছিল। ইরশাদ হইয়াছে:
قُلْنَا احْمِلْ فِيهَا مِنْ كُلِّ زَوْجَيْنِ اثْنَيْنِ وَأَهْلَكَ إِلَّا مَنْ سَبَقَ عَلَيْهِ الْقَوْلُ وَمَنْ أَمَنَ . (٤٠ : ١١)
"আমি বলিলাম, ইহাতে উঠাইয়া লও প্রত্যেক শ্রেণীর যুগলের দুইটি, যাহাদের বিরুদ্ধে পূর্ব সিদ্ধান্ত হইয়াছে তাহারা ব্যতীত তোমার পরিবার-পরিজনকে এবং যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদিগকে” (১১:৪০)।
অপর বর্ণর্ণাগুলির মধ্যে ৮০ জনের বর্ণনাটিই সঠিক বলিয়া মনে হয়। কারণ নৌযান হইতে অবতরণ করিয়া তিনি যে লোকালয়ের পত্তন করেন উহার নাম রাখেন 'ছামানীন' যাহা 'সূক ছামানীন (৮০ জনের বাজার) নামে খ্যাত। ইহাতে বুঝা যায়, নূহ (আ)-এর সাথী-সঙ্গিগণ সংখ্যায় ৮০ জন ছিল। ইহাই অধিকাংশ আলিমের মত।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 প্লাবনের সূচনা ও তাননূর (উনান) উথলিয়া উঠার মর্ম

📄 প্লাবনের সূচনা ও তাননূর (উনান) উথলিয়া উঠার মর্ম


প্লাবনের সূচনার কথা আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন:
حَتَّى إِذَا جَاءَ أَمْرُنَا وَفَارَ التَّنُّورُ قُلْنَا احْمِلْ فِيهَا مِنْ كُلَّ زَوْجَيْنِ اثْنَيْنِ وَأَهْلَكَ إِلَّا مَنْ سَبَقَ عَلَيْهِ الْقَوْلُ وَمَنْ أَمَنَ . ( ٤٠ : ١١)
"অবশেষে যখন আমার আদেশ আসিল এবং উনান উথলিয়া উঠিল আমি বলিলাম, ইহাতে উঠাইয়া লও প্রত্যেক শ্রেণীর যুগলের দুইটি, যাহাদের বিরুদ্ধে পূর্ব সিদ্ধান্ত হইয়াছে তাহারা ব্যতীত তোমার পরিবার-পরিজনকে এবং যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদিগকে” (১১:৪০)।
এখানে উনান উথলিয়া উঠার মর্ম কি সে ব্যাপারে আলিমগণের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়।
(১) হযরত আলী ইবন আবী তালিব (রা) বলেন, ইহার অর্থ হইল ভোর হওয়া এবং চতুর্দিক, আলোকিত হইয়া যাওয়া। অর্থাৎ ভোরের আলো ছড়াইয়া পড়িলে সকলকে লইয়া নৌকায় আরোহন করিতে আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিলেন। তবে এই মতটি বিরল। অন্য কেহ এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেন নাই।
(২) ইবন আব্বাস (রা) বলেন, ইহার অর্থ হইল যমীনের উপরিভাগ তথা যমীনের উপর দিয়া পানি প্রবাহিত হওয়া। আরবগণ যমীনের উপরিভাগকে তাননূর বলিয়া অভিহিত করিয়া থাকে। সুতরাং আয়াতের অর্থ হইল, যমীনের সকল স্থান হইতে পানি উথলিয়া উঠিল, এমনকি অগ্নি প্রজ্জলিত হইবার স্থান উনান হইতেও। ইহাই অধিকাংশ আলিমের অভিমত (ইবন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১১১; পানিপতী, আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৫খ, ৮৫-৮৬)।
(৩) কাতাদা (র) বলেন, তাননূর হইল যমীনের সবচেয়ে উন্নত ও মর্যাদাসম্পন্ন স্থান;
(৪) হাসান, মুজাহিদ ও শা'বী (র) বলেন, তাননূর অর্থ হইল যেখানে রুটি তৈরী করা হয়। ইহাই অধিকাংশ মুফাস্সিরের মত। আর উহা ছিল একটি পাথরের উনান পূর্বে যাহা হাওয়া (আ)-এর ছিল (আল-কামিল, ১খ, ৫৬), পরে হাত বদল হইতে হইতে নূহ (আ)-এর নিকট আসিয়া পৌঁছে (আত-তাবারী, তারীখ, ১৯, ৯৪; পানিপতী, আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৫খ, ৮৬)। তাই ইহার অর্থ হইল, নূহ (আ)-কে বলা হইল যখন দেখিবে উক্ত উনান হইতে পানি উথলিয়া উঠিতেছে তখন তুমি ও তোমার সাথী-সঙ্গীবৃন্দ নৌকায় আরোহণ করিবে। অতঃপর তাঁহার স্ত্রী একদিন উনানে কাজ করিতেছিলেন। হঠাৎ উনান হইতে পানি উথলিয়া উঠিতে দেখিয়া তিনি নূহ (আ)-কে এই সংবাদ দিলেন (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৫৮)।
এই উনানটি কোথায় অবস্থিত ছিল সেই ব্যাপারে মতভেদ রহিয়াছেঃ (১) মুজাহিদ (র) বলেন, উহা ছিল কৃফার প্রান্ত সীমায়। এই ব্যাপারে সুদ্দী (র) শা'বী (র) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি আল্লাহ্র কসম করিয়া বলিতেন যে, উনান কুফার প্রান্তেই উথলিয়া উঠিয়াছিল। তিনি আরও বলেন, নূহ (আ) কূফার মসজিদের অভ্যন্তরেই নৌকা তৈরী করেন। আর উনান ছিল মসজিদের প্রবেশ পথের ডাইন দিকে যাহা কিনদা গোত্রের দরজার সহিত মিলিত ছিল। উনান উথলিয়া উঠা ছিল নূহ (আ)-এর জন্য তাঁহার কওম ধ্বংস হওয়ার একটি আলামত ও দলীল। (২) আলী ইবন আবী তালিব (রা) বলেন, কুফার মসজিদের কিনদা গোত্রের দরজার দিক হইতেই উনান উথলিয়া উঠিয়াছিল। (৩) মুকাতিল (র) বলেন, ইহা ছিল আদম (আ)-এর উনান। ইহা শাম (বর্তমান সিরিয়া)-এর আয়ন বিরদ নামক স্থানে অবস্থিত ছিল। (৪) ইবন আব্বাস (রা) বলেন, উনানটি ছিল ভারতবর্ষে। ইবন জারীর, ইবনুল মুনযির, ইবন আবী হাতিম, আবুশ-শায়খ ও আল-হাকিম ইহা বর্ণনা করত ইহাকে সহীহ বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন। কাতাদার বর্ণনামতে ইহা জাযীরাতুল আরবে ছিল (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৫৮; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৯৪-৯৫; পানিপতী, আত-তাফসীরুল-মাজহারী, ৫খ, ৮৬; ইবন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৭৪; ঐ লেখক, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১১১; ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৫৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 প্লাবনের মুহূর্তে নূহ (আ)-এর দু'আ

📄 প্লাবনের মুহূর্তে নূহ (আ)-এর দু'আ


অতঃপর সকলকে লইয়া নূহ (আ) যখন নৌযানে আরোহণ করিলেন তখন আল্লাহ্র নির্দেশে এই দু'আ পাঠ করিলেন:
بِسْمِ اللَّهِ مَجْرِهَا وَمُرْسُهَا إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ.
"আল্লাহর নামে ইহার গতি ও স্থিতি। আমার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (১১:৪১)।
আল্লাহ্র নির্দেশে তিনি আরও বলিলেন:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي نَجْنَا مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ.
"সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্রই, যিনি আমাদিগকে উদ্ধার করিয়াছেন জালিম সম্প্রদায় হইতে” (২৩: ২৮)।
তিনি আল্লাহ্র নির্দেশে তাঁহার নিকট দু'আ করিলেন:
رَبِّ انْزِلْنِي مُنْزَلًا مُبَارَكًا وَأَنْتَ خَيْرُ الْمُنْزِلِينَ.
"হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমনভাবে অবতরণ করাও যাহা হইবে কল্যাণকর; আর তুমিই শ্রেষ্ঠ অবতরণকারী" (২৩: ২৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মহাপ্লাবন

📄 মহাপ্লাবন


অতঃপর সকলের নৌযানে আরোহণ সমাপ্ত হইলে আল্লাহ্র নির্দেশে প্লাবন শুরু হইল। ইবন জারীর প্রমুখের বর্ণনামতে, গ্রীক হিসাব অনুযায়ী 'আব' মাসের ১৩ তারিখে উক্ত প্লাবন শুরু হয়। আরবী রজব মাসের দশ তারিখে (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬০; ইবন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ১১২)। তখন পৃথিবীর সকল প্রস্রবণ, কূপ ও জলাশয় এবং বড় বড় নদী-নালা ফুঁসিয়া উঠিল। আকাশ হইতে ৪০ দিন ৪০ রাত্র অবিরল ধারায় বৃষ্টিপাত হইতে থাকিল। অতঃপর প্রবল বেগে পানি বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। ইহাই আল্লাহ তা'আলা কুরআন করীমে ইরশাদ করিয়াছেনঃ "আমি উন্মুক্ত করিয়া দিলাম আকাশের দ্বার প্রবল বারি বর্ষণে এবং মৃত্তিকা হইতে উৎসারিত করিলাম প্রস্রবণ; অতঃপর সকল পানি মিলিত হইল এক পরিকল্পনা অনুসারে" (৫৪ : ১১-১২)। এইভাবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নৌকা ভাসিল (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬০; ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ., ৫৬-৫৭; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৯৪)।
এইভাবে পানি কেবল বৃদ্ধিই পাইতে লাগিল, এমনকি সকল পাহাড়-পর্বত ডুবিয়া গেল। ইবন আব্বাস (রা)-এর বর্ণনামতে, এই প্লাবনে পৃথিবীর পানি সর্বোচ্চ পাহাড় হইতে ১৫ হাত উপরে উঠিয়া যায়। বাইবেলে এই কথাই বলা হইয়াছে। মতান্তরে পাহাড় হইতে ৮০ হাত উপরে পানি উঠিয়া যায় (Genesis, 6:20)। পর্বত-প্রমাণ তরঙ্গ প্রবাহিত হইতে লাগিল। উহার মধ্য দিয়া নূহ (আ)-এর নৌযান উক্ত পানিতে ভাসিতে লাগিল (১১: ৪২)। নৌযানখানি পানির উপর ৬ হাত ভাসিয়া ছিল (ইব্‌ন সাদ, ১খ, ৪১), অবশিষ্ট ২৪ হাত পানির নীচে নিমজ্জিত ছিল। এইভাবে ভাসমান অবস্থায় নৌকা চলিতে লাগিল। কোথায়ও উহা স্থির থাকিল না। ৬ মাস এইভাবে নৌকা ভাসিতে থাকিল। অতঃপর উহা হারামের নিকট আসিল, কিন্তু উহাতে প্রবেশ করিল না, বরং এক সপ্তাহ যাবৎ উহার চতুর্পার্শ্বে ঘুরিতে লাগিল। ইহা ছিল সেই ঘর যাহার কেন্দ্র রক্ষা করিবার জন্য আল্লাহ তা'আলা উহাকে ৪র্থ আসমানে উঠাইয়া লইয়াছিলেন। ইহা ছিল জান্নাতের ইয়াকৃত দ্বারা তৈরী। জিবরীল (আ) হাজরে আসওয়াদকে আবূ কুবায়স পর্বতে উঠাইয়া রাখিয়াছিলেন। ইবরাহীম (আ)-এর বায়তুল্লাহ নির্মাণ পর্যন্ত উহা সেখানেই ছিল। অতঃপর তিনি উহা স্বস্থানে স্থাপন করেন (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬০; ইব্‌ন সাদ, তাবাকাত, ১খ, ৪১; ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৫৬)।
এইভাবে ভাসিতে ভাসিতে উহা জুদী পর্বতে গিয়া স্থির হইল (জুদী পর্বতের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ পরে আসিতেছে)। অবশেষে আল্লাহর সিদ্ধান্ত কার্যকর হইবার পর পৃথিবীকে পানি গ্রাস করিয়া লইতে এবং আকাশকে বারি বর্ষণ হইতে ক্ষান্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্লাবন শুরু হইতে পানি গ্রাস করা পর্যন্ত সময় ছিল ছয় মাস (ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৫৭)। ইবন আব্বাস (রা) বলেন, নূহ (আ)-এর নৌকা জুদী পর্বতে স্থির হয়, আর পৃথিবীতে যাহা কিছু ছিল, কাফির-মুশরিক, প্রাণীকুল ও গাছপালা সবই ধ্বংস হইয়া যায়। তাই নূহ (আ) ও তাঁহার সঙ্গে নৌকায় যাহারা ছিল তাহারা ব্যতীত পৃথিবীতে আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না (আছ-ছা'লাবী, কাসাস, পৃ. ৬০)। ইহাই কুরআন করীমে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন:
وَقِيلَ يَأَرْضُ ابْلَعِي مَاءَكِ وَيَسَمَاءُ أَقْلِعِي وَغِيضَ الْمَاءُ وَقُضِيَ الْأَمْرُ وَاسْتَوَتْ عَلَى الْجُودِي وَقِيلَ بعدا لِلْقَوْمِ الظَّلِمِينَ (٤٤ - ١١)
"ইহার পর বলা হইল, হে পৃথিবী! তুমি তোমার পানি গ্রাস করিয়া লও এবং হে আকাশ! ক্ষান্ত হও। ইহার পর বন্যা প্রশমিত হইল এবং কার্য সমাপ্ত হইল। নৌকা জুদী পর্বতের উপর স্থির হইল এবং বলা হইল, জালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হউক” (১১:৪৪)।
উল্লেখ্য যে, কাতাদা প্রমুখের বর্ণনামতে নৌকা জুদী পর্বতে স্থির ছিল এক মাস (ইবন কাছীর, কাসাস, পৃ. ৮৩; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১১৬)।
ইন জারীর তাবারী, ছা'লাবী ও ইবন কাছীর প্রমুখ নৌযান ও প্লাবন সম্পর্কে নূহ (আ)-এর তনয় হাম-এর যবানীতে একটি রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন। তাহা হইল, আলী ইব্‌ন যায়দ ইব্‌ন জুদআন সূত্রে ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, হাওয়ারীগণ একবার ঈসা ইবন মারয়াম (আ)-কে বলিল, আপনি যদি এমন এক ব্যক্তিকে আমাদের সম্মুখে জীবিত করিতেন যিনি নূহ (আ)-এর নৌকা স্বচক্ষে দেখিয়াছিলেন, অতঃপর সেই সম্পর্কে আমাদিগকে অবহিত করিতেন। ঈসা (আ) তাহাদিগকে লইয়া চলিতে চলিতে একটি'মাটির স্তূপের নিকট আসিলেন। অতঃপর উহা হইতে একমুষ্টি মাটি লইয়া বলিলেন, ثُمَّ باذن الله (আল্লাহর হুকুমে দাঁড়াইয়া যাও)। ইহা বলিতেই তিনি মস্তক হইতে মাটি ঝাড়িতে ঝাড়িতে দাঁড়াইয়া গেলেন। তিনি তখন বৃদ্ধ হইয়া গিয়াছিলেন। ঈসা (আ) তাহাকে বলিলেন, তুমি কি এই অবস্থায়ই ইনতিকাল করিয়াছিলে? তিনি বলিলেন, না, আমি যুবা অবস্থায়ই মারা যাই। কিন্তু আমি মনে করিলাম বুঝি কিয়ামত হইয়া গিয়াছে। সেই আতঙ্কেই আমি বৃদ্ধ হইয়া গিয়াছি। ঈসা (আ) তাহাকে বলিলেন, "নূহ (আ)-এর নৌকার বিবরণ দাও।” তিনি বলিলেন, 'উহার দৈর্ঘ্য ছিল ১২০০ হাত এবং প্রস্থ ছিল ৬০০ হাত। উহা ছিল তিন তলাবিশিষ্ট। এক তলায় ছিল চতুষ্পদ জন্তু ও হিংস্র প্রাণী, আর এক তলায় ছিল মানুষ, অপর এক তলায় ছিল পক্ষীকুল। চতুষ্পদ জন্তুর বিষ্টা যখন বাড়িয়া গেল তখন আল্লাহ্ তা'আলা নূহ (আ)-কে ওহী পাঠাইলেন যে, হাতীর লেজে আঘাত কর। তিনি আঘাত করিলেন, তখন উহা হইতে একটি নর শূকর ও একটি মাদি শূকর বাহির হইল। ইহারা সকল বিষ্টা খাইয়া ফেলিল। অতঃপর যখন ইঁদুরের উপদ্রব বৃদ্ধি পাইল এবং উহারা নৌকার রশিসমূহ কাটিয়া ফেলিতে লাগিল তখন আল্লাহ তা'আলা নূহ (আ)-এর নিকট ওহী পাঠাইলেন যে, সিংহের চক্ষুদয়ের মধ্যখানে আঘাত কর। অতঃপর তিনি সেখানে আঘাত করিলে উহার নাক দিয়া একটি নর ও একটি মাদি বিড়াল বাহির হইল এবং ইঁদুরের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িয়া উহাদিগকে খাইয়া ফেলিল। ঈসা (আ) তাহাকে বলিলেন যে, নূহ (আ) কিভাবে জানিলেন যে, জনপদ ও শহর শুকাইয়া গিয়াছে? তিনি বলিলেন, “তিনি খবর আনিবার জন্য প্রথমে কাক প্রেরণ করেন। অতঃপর উহা মরা লাশ পাইয়া উহাতে বসিয়া পড়ে এবং ফিরিয়া আসার পরিবর্তে সেখানেই মশগুল হইয়া পড়ে। তখন নূহ (আ) উহার প্রতি বদদোআ করেন যেন তাহার অন্তরে ভীতির সৃষ্টি হয়। এইজন্য উহা মানুষের পোষ মানে না এবং ঘরে আসিতে পারে না। অতঃপর তিনি কবুতর প্রেরণ করিলেন। উহা ঠোঁটে করিয়া যয়তুনের পাতা এবং পায়ে করিয়া কাদা মাটি লইয়া আসিল। তখন তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, শহর ও জনপদ শুকাইয়া গিয়াছে। তখন তিনি কবুতরের গলায় সবুজের মালা পরাইয়া দিলেন যাহা এখনও পরিদৃষ্ট হয় এবং উহার জন্য দোআ করিলেন যেন সে ভালবাসা ও নিরাপত্তা লাভ করে। এইজন্য উহা মানুষের পোষ মানে এবং ঘরের সহিত সম্পৃক্ত থাকে।” তাহারা বলিল, “হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা ইহাকে আমাদের পরিবারের নিকট লইয়া যাই না কেন? সে আমাদের সহিত, উঠা বসা করিবে এবং আমাদের সহিত কথাবার্তা বলিবে।” তিনি বলিলেন, যাহার রিযিক নাই সে কিভাবে তোমাদের সঙ্গে যাইবে? অতঃপর তাহাকে বলিলেন, عد باذن الله "আল্লাহ্র নির্দেশে পূর্বের রূপে ফিরিয়া যাও।" তখন সে আবার মাটি হইয়া গেল (ইব্‌ন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৮২-৮৩; ঐ লেখক, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১১৬; আত-তাবারী, ১খ., ৯১-৯২; ঐ লেখক, তাফসীর, ১২খ., ২২; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬১; পানিপতী, আত-তাফসীরুল-মাজহারী, ৫খ., ৯০)। হাফিজ ইব্‌ন কাছীর এই রিওয়ায়াত বর্ণনার পর এই সম্পর্কে মন্তব্য করিয়াছেন যে, ইহা চূড়ান্ত পর্যায়ের বিরল (غریب جدا) (দ্র. তাহার রচিত কাসাসুল-আম্বিয়া ও আল-বিদায়া ও নিহায়া, প্রাগুক্ত)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00