📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল্লাহ্র নির্দেশে জাহাজ নির্মাণ

📄 আল্লাহ্র নির্দেশে জাহাজ নির্মাণ


স্বীয় কাওম সম্পর্কিত নূহ (আ)-এর এই দো'আ আল্লাহ তা'আলা কবুল করিলেন (৩৭ঃ৭৫) এবং তাহাকে জানাইয়া দিলেন যে, তিনি কাফির মুশরিকদিগকে এক মহাপ্লাবনে নিমজ্জিত করিয়া ধ্বংস করিবেন। আর তাঁহাকে ও তাঁহার অনুসারী মু'মিনদিগকে জাহাজে আরোহণ করাইয়া রক্ষা করিবেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা সরাসরি নিজের তত্ত্বাবধানে জাহাজ তৈরীর নির্দেশ দিলেন (১১:৩৭)।
ইমাম ছা'লাবী জাহাজ তৈরীর বিবরণ এইভাবে দিয়াছেনঃ তখনও পর্যন্ত যেহেতু নৌযান ব্যবহার শুরু হয় নাই, তাই নূহ (আ) কৌতুহলী হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আমার প্রতিপালক! নৌযান কি? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, একটি কাষ্ঠ নির্মিত গৃহ যাহা পানির উপর চলে। নূহ (আ) বলিলেন, হে প্রতিপালক! কাষ্ঠ কোথায় পাইব? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, হে নূহ! আমি যাহা চাই তাহা করিতে সক্ষম। নূহ (আ) বলিলেন, হে আমার প্রতিপালক! বৃক্ষ কোথায় পাইব? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, একটি বৃক্ষ তুমি রোপণ কর। অতঃপর তিনি একটি সেগুন, মতান্তরে দেবদারু (আল-বিদায়া, ১খ, ১১০) আর বাইবেলে বর্ণিত হইয়াছে গোফর বৃক্ষ (Genesis; 6:14) রোপণ করিলেন, অতঃপর চল্লিশ বৎসর মতান্তরে এক শত বৎসর (আল-বিদায়া, প্রাগুক্ত) কাটিয়া গেল। এই সময়কালে তিনি কওমের উপর বদদো'আ করা হইতে বিরত রহিলেন। কোন কোন ঐতিহাসিক ও মুফাসসিরের বর্ণনামতে এই সময়কাল পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা তাহাদের মহিলাদিগকে বন্ধ্যা করিয়া রাখিলেন। ফলে তাহাদের আর কোন সন্তান পয়দা হইল না (ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৫৬; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৫৭)। প্রকৃতপক্ষে ইহা একটি ইসরাঈলী রিওয়ায়াত।
কোনও বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য সূত্রে ইহার উল্লেখ নাই। ঐতিহাসিক ও মুফাসসিরগণ সম্ভবত এই ধারণার বশবর্তী হইয়া উহা বর্ণনা করিয়াছেন যে, জন্মের ধারা চালু থাকিলে অনেক নিষ্পাপ শিশুই পিতামাতার সহিত প্লাবনে মৃত্যুবরণ করিবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নিষ্পাপ শিশুকে শাস্তি হইতে রক্ষা করিবার জন্য এই জাতীয় বর্ণনার প্রয়োজন নাই। কারণ আল্লাহ্ নিয়ম হইল, কোনও অঞ্চলে আযাব আসিলে সেখানকার ছোট-बড়, ধনী-গরীব, যুবা-বৃদ্ধ, পাপী-নিষ্পাপ নির্বিশেষে সকলে উহাতে ধ্বংস হয়। অতঃপর পাপিষ্ঠদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতই বরবাদ হইয়া যায়। আর নিষ্পাপদের জন্য ইহা হয় সৌভাগ্যের ব্যাপার। কারণ তাহারা দুঃখ-কষ্টের জগত হইতে চিরস্থায়ী শান্তির জগতে উপনীত হয়। তাই নূহ (আ)-এর সম্প্রদায়ের যুবা-বৃদ্ধ-শিশু সকলেই প্লাবনে নিশ্চিহ্ন হইয়া যায় (হিফজুর রহমান সিউহারবী, কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৮৪-৮৫)।
অতঃপর বৃক্ষটি যখন পূর্ণতা প্রাপ্ত হইল, সালমান (রা)-এর বর্ণনামতে ৪ বৎসর হইল (আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৯১), তখন আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে উহা কাটিবার নির্দেশ দিলেন। তিনি উহা কাটিয়া রৌদ্রে শুকাইলেন এবং বলিলেন, হে আমার प्रतिপালক! ইহা দ্বারা কিভাবে আমি উক্ত গৃহ নির্মাণ করিব? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, উহাকে তিনটি আকৃতিতে বিন্যস্ত কর, উহার মাথা মোরগের ন্যায়, পেট পাখির পেটের ন্যায় এবং লেজ অনেকটা মোরগের লেজের মত বানাও। উহা বদ্ধ আকৃতির বানাও। দরজাগুলি বানাও উহার দুই পার্শ্বে। উহাকে ত্রিতলবিশিষ্ট বানাও। ৮০ হাত দৈর্ঘ্য, ৫০ হাত প্রস্থ এবং উচ্চতায় ৩০ হাত বানাও। ইহা আহলে কিতাবদের বর্ণনা বলিয়া ইমাম ছা'লাবী উল্লেখ করিয়াছেন (পৃ. ৫৭)। কিন্তু বাইবেলে ৩০০ হাত দৈর্ঘ্য, ৫০ হাত প্রস্থ এবং ৩০ হাত উচ্চতার কথা উল্লেখ রহিয়াছে (দ্র. Genesis, 6:15)। এই ব্যাপারে আরও বিস্তারিত বর্ণনা পরে আসিতেছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা নূহ (আ)-কে জাহাজ তৈয়ার করা শিক্ষাদান করিতে জিবরীল (আ)-কে প্রেরণ করিলেন। নূহ (আ) কাঠ কাটিয়া উহাতে পেরেক ঢুকাইয়া জাহাজের আকৃতি বানাইতে লাগিলেন (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৫৭; ছানাউল্লাহ পানীপতি, আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৫খ, ৮৪)। আর তাঁহার কওমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ যখনই তাঁহার নিকট দিয়া গমন করিত তখনই ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিত (১১ঃ ৩৮)। তাহারা বলিত, নূহ! তুমি নবুওয়াতের দাবি করিয়া এখন কাঠমিস্ত্রি হইয়া গিয়াছ! তাহারা আরও বলিত, এই পাগলের কাণ্ড দেখ, কাষ্ঠ দিয়া ঘর বানাইতেছে যাহা নাকি পানির উপর দিয়া চলিবে! এই মরুভূমিতে পানি কোথা হইতে আসিবে! এই বলিয়া তাহারা পরস্পর হাসাহাসি করিত (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, প্রাগুক্ত; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৬১)। নূহ (আ) ও তাহাদের পরিণতি সম্পর্কে উদাসীনতা এবং আল্লাহর নাফরমানীতে অটল থাকার ধৃষ্টতা দেখিয়া তাহাদের পন্থায় উত্তর দিতেন, তোমরা যদি আমাদিগকে উপহাস কর তবে আমরাও তোমাদিগকে উপহাস করিব, যেমন তোমরা উপহাস করিতেছ এবং তোমরা অচিরে জানিতে পারিবে কাহার উপর আসিবে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি (১১: ৩৮-৩৯)। অতঃপর তিনি নিজ কাজে মনোনিবেশ করিতেন। আল্লাহ তা'আলা পূর্বেই তাঁহাকে ইহাদের বিষয় জানাইয়া দিয়া বলিয়াছিলেন, "তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার প্রত্যাদেশ অনুযায়ী নৌকা নির্মাণ কর। আর যাহারা সীমা লঙ্ঘন করিয়াছে তাহাদের সম্পর্কে আমাকে কিছু বলিও না; তাহারা তো নিমজ্জিত হইবে" (১১: ৩৭)। তাহাদের ব্যাপারে নূহ (আ)-এর দো'আ কবুল হইয়াছিল এবং আল্লাহ্র সিদ্ধান্ত স্থির হইয়াছিল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা নূহ (আ)-কে নৌকা নির্মাণ কর্ম তাড়াতাড়ি সমাপ্ত করিবার জন্য প্রত্যাদেশ পাঠাইলেন এবং বলিলেন, পাপিষ্ঠদের প্রতি আমার ক্রোধ বৃদ্ধি পাইতেছে। সুতরাং নৌকা নির্মাণ কর্ম তাড়াতাড়ি সম্পাদন কর। তখন নূহ (আ) দুইজন কাঠমিস্ত্রি ভাড়া করিলেন এবং তাঁহার পুত্র সাম, হাম ও য়াফিছও নৌকা বানাইতে লাগিয়া গেলেন। অতঃপর তিনি উহার নির্মাণ কর্ম সমাপ্ত করেন। কত বৎসরে উহা সমাপ্ত হয় সে ব্যাপারে অনেক মতভেদ রহিয়াছে। যায়দ ইবন আসলাম (রা)-এর বর্ণনামতে রোপণ ও কর্তনে ১০০ (এক শত) বৎসর অতিবাহিত হয় এবং নৌকা নির্মাণে আরও এক শত বৎসর ব্যয় হয়। অন্য এক বর্ণনামতে বৃক্ষ লাগানোর পর ৪০ বৎসর ব্যয় হয়। কা'ব আল-আহবারের এক বর্ণনাতে নূহ (আ) ৩০ বৎসরে নৌকা নির্মাণ করেন (ছানাউল্লাহ পানীপতি, তাফসীরুল-মাজহারী, ৫খ, ৮৫)। কিন্তু কা'ব হইতে অপর একটি বর্ণনা পাওয়া যায় ৪০ বৎসরের (আল-আলুসী, রূহুল-মা'আনী, ১২খ, ৫০)। মুজাহিদের বর্ণনামতে ৩ বৎসরে নির্মাণকর্ম সমাপ্ত হয়। এতদ্ব্যতীত ৬০ ও ৪০০ বৎসরের বর্ণনাও পাওয়া যায় (প্রাগুক্ত)। আর ইবন আব্বাস (রা) হইতে একটি রিওয়ায়াত পাওয়া যায় যে, দুই বৎসরে তিনি নির্মাণ কর্ম সমাপ্ত করেন (আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৫খ, ৮৪)। এই মতটিই অধিকতর যুক্তিযুক্ত বলিয়া মনে হয়। উক্ত নৌকার পার্শ্বে আল্লাহ তা'আলা আলকাতরার একটি প্রস্রবণ প্রবাহিত করিয়া ছিলেন যাহা টগবগ করিতেছিল। অতঃপর নৌকার ভিতর ও বাহিরের দিকে উক্ত আলকাতরা দ্বারা প্রলেপ দেওয়া হইল এবং লৌহ কীলক দ্বারা মজবুত করা হইল (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৫৮)। ইহাই কুরআন করীমে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন, "আর আমি তাহাকে আরোহণ করাইলাম কাষ্ঠ ও কীলক নির্মিত এক নৌযানে" (৫৪: ১৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নৌযানের আকৃতি

📄 নৌযানের আকৃতি


পূর্বেই বর্ণিত হইয়াছে যে, উক্ত নৌকার অগ্র ও পশ্চাৎ ভাগ ছিল মোরগের মাথা ও লেজের আকৃতিসম্পন্ন এবং মধ্যভাগ ছিল পাখির পেটের ন্যায়। ইমাম ছাওরীর বর্ণনামতে উহার বুক ছিল সরু, যাহাতে পানি ভেদ করিয়া চলিতে পারে (ইব্‌ন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৭৩)। উক্ত নৌকার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা কতটুকু ছিল সে সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে: বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী উহার দৈর্ঘ ছিল ৩০০ হাত, প্রস্থ ৫০ হাত এবং উচ্চতা ৩০ হাত (Genesis, 6:15)। অধিকাংশ মুফাসসির ও মুহাদ্দিছ এই মতটিই গ্রহণ করিয়াছেন। ইবন্ মারদূয়া সামুরা ইবন জুনদূব (রা) সূত্রে এবং 'আবদ ইব্‌ন হুমায়দ, ইবনুল-মুনযির ও আবুশ-শায়খ কাতাদা হইতে অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন। ইমাম বাগাবী ইবন আব্বাস (রা) সূত্র হইতেও অনুরূপ একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। কাযী ছানাউল্লাহ পানিপতি তাঁহার আত-তাফসীরুল মাজহারী গ্রন্থে ইহাকেই প্রসিদ্ধ মত বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (দ্র. ছানাউল্লাহ পানিপতী, আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৫খ, ৮৪-৮৫)। দাহ্হাক সূত্রে বর্ণিত ইবন আব্বাস (রা)-এর অপর এক মতে দৈর্ঘ্য ৬০০ হাত, প্রস্থ ৩৩০ হাত এবং উচ্চতা ৩৩ হাত (ছা'লাবী, কাসাস, পৃ. ৫৮)। ইবন আব্বাস (রা)-এর আরও একটি রিওয়ায়াত রহিয়াছে, সেই মতে দৈর্ঘ্য ১২০০ হাত, প্রস্থ ৬০০ হাত (ইবন কাছীর, কাসাস, পৃ. ৭৩)। ইমাম বাগাবী ও ইবন জারীর তাবারী প্রমুখ হাসান বাসরী (র) হইতে অনুরূপ মত বর্ণনা করিয়াছেন (আল-আলুসী, রূহুল মা'আনী, ১২খ, ৫০; পানিপতী, আত-তাফসীরু'ল-মাজহারী, ৫খ, ৮৫; ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৫৬)। শামীর বর্ণনামতে নৌকার দৈর্ঘ্য ৮০ হাত, প্রস্থ ৫০ হাত এবং উচ্চতা ছিল ৩০ হাত (প্রাগুক্ত)। ইবন আব্বাস (রা)-এর একটিমাত্র রিওয়ায়াত ছাড়া আর সকলেই এই ব্যাপারে একমত যে, উক্ত নৌকার উচ্চতা ছিল ৩০ হাত। ইহার তিনটি তলা ছিল। প্রত্যেক তলার উচ্চতা ছিল ১০ হাত। ইহার দরজা ছিল প্রন্থের দিকে যাহার উপর পর্দা ছিল (ইবন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৩; ঐ লেখক, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১ খ., ১১০)। ছাদের এক হাত নিচে ছিল বাতায়ন (বাইবেল, আদিপুস্তক ৬: ১৬; বাংলা অনু, বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি, ঢাকা, পৃ. ৮)।
এখানে উল্লেখ্য যে, হাত বলিতে ইবন সা'দের মতে নূহ (আ)-এর পিতার দাদার হাত বুঝানো হইয়াছে (দ্র. তাবাকাত, ১খ, ৪১)। ছানাউল্লাহ পানিপতী বলেন, হাতের সীমানা হইল কাঁধের সীমানা জোড়া পর্যন্ত (তাফসীরুল মাজহারী, ৫খ, ৮৫)। হাফিজ ইবন কাছীর উল্লেখ করিয়াছেন যে, এমন বিশাল এক নৌকা তৈরী হইল, যাহার দৃষ্টান্ত পূর্বেও কখনও ছিল না, পরবর্তীতেও হইবে না (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৭১; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১০৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নৌকায় আরোহণ

📄 নৌকায় আরোহণ


নৌযান তৈরীর কাজ সমাপ্ত হইলে আল্লাহ তা'আলা ওহী পাঠাইলেন যে, উহাতে উঠাইয়া লও প্রত্যেক শ্রেণীর যুগলের দুইটি, যাহাদের বিরুদ্ধে পূর্ব সিদ্ধান্ত হইয়াছে তাহারা ব্যতীত তোমার পরিবার-পরিজনকে এবং যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদিগকে (১১ : ৪০)। প্রাণীকুলের প্রত্যেক জাতের একজোড়া করিয়া তোলার নির্দেশ এজন্য দিয়াছিলেন যাহাতে উহাদের বংশ বিলুপ্ত হইয়া না যায়। বাইবেলে বলা হইয়াছে যে, শুচি পশুর সাত জোড়া এবং অশুচি পশুর এক জোড়া নৌকায় উঠাও (Genesis, 7 : 2-3); ইহা যুক্তিসঙ্গত বলিয়া মনে হয় না। কারণ বংশ সংরক্ষণের জন্য এক জোড়াই যথেষ্ট। অতঃপর স্থলভাগ ও জলভাগ এবং পর্বত ও সমভূমির সকল জীব-জন্তুকে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার নিকট একত্র করিয়া দিলেন। এক বর্ণনামতে ৪০ দিবা-রাত্র অবিরল ধারায় বৃষ্টি হয়। ফলে হিংস্র প্রাণী, জীবজন্তু ও পক্ষীকুল নূহ (আ)-এর নিকট আসিয়া জড়ো হয়। অতঃপর তিনি উহাদের জোড়ায় জোড়ায় নৌকায় তোলেন এবং আদম (আ)-এর লাশও তোলেন। অতঃপর নারী-পুরুষের মধ্যখানে পর্দা হিসাবে উহা রাখিয়া দেন (ইবন সা'দ, তাবাকাত, ১খ, ৪১)। ইবন জারীর আত-তাবারী ও ইবনুল আছীর প্রমুখ ইবন আব্বাস (রা) হইতেও অনুরূপ একটি রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন (আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৯৪; ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৫৭-৫৮)।
কোন তলায় কোন জীব আরোহণ করে সেই ব্যাপারেও মতভেদ রহিয়াছে। এক বর্ণনামতে নীচ তলায় জীবজন্তু, দ্বিতীয় তলায় মানুষ ও রসদপত্র এবং তৃতীয় তলায় পক্ষীকুলকে আরোহণ করান হয় (ইবন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৩; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১১০; পানিপতী, আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৫খ, ৮৫)। অপর এক বর্ণনামতে জীবজন্তু দ্বিতীয় তলায় এবং মানুষ উপরের তলায় আরোহণ করে। তাহাদের সহিত স্নেহভরে তোতা পাখীকেও লওয়া হয় যাহাতে অন্য কোন প্রাণী তাহাকে হত্যা না করে (আছ-ছা'লাবী, কাসাস, পৃ. ৫৯)। অন্য এক বর্ণনামতে নূহ (আ) পক্ষীকুলকে নীচের তলায় এবং হিংস্র প্রাণী ও অন্যান্য জীবজন্তুকে মধ্যের তলায় আরোহণ করান। আর নিজে ও তাঁহার সঙ্গীরা উপরের তলায় আরোহণ করেন (ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ., ৫৭)। কাযী ছানাউল্লাহ পানিপতী স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে শারহু খুলাসাতিল মাসীর গ্রন্থের বরাতে উল্লেখ করিয়াছেন যে, নীচ তলায় আরোহণ করে পক্ষীকুল, হিংস্র প্রাণী ও অন্যান্য সকল জীবজন্তু, মধ্যের তলায় ছিল খাদ্য, পানীয় ও কাপড়-চোপড়। আর উপরের তলায় আরোহণ করে মানবমণ্ডলী (আত-তাফসীরুল-মাজহারী, ৫খ, ৮৫)। তবে সর্বপ্রথম বর্ণিত মতটি যুক্তিযুক্ত ও সঠিক বলিয়া মনে হয়। কারণ চতুষ্পদ জন্তুর জন্য নিচের তলায় আরোহণ সুবিধাজনক, আর পক্ষীকুলের জন্য উপরের তলাই সুবিধাজনক আর মানুষ তো যে কোন তলাতেই আরোহণ করিতে পারে।
ইবন আব্বাস (রা)-এর একটি রিওয়ায়াত অনুসারে সর্বপ্রথম নৌযানে আরোহণ করে পক্ষীকুলের মধ্যে তোতা পাখি এবং সর্বশেষ আরোহণ করে প্রাণীকুলের মধ্যে গাধা। ইবলীস উহার লেজ ধরিয়া আরোহণ করে। গাধা যখন নৌকায় প্রবেশচ্ছিল তখন ইবলীস উহার লেজ ধরিলে গাধা তাহার পা তুলিতে পারিতেছিল না। তখন নূহ (আ) ধমক দিয়া বলিলেন, ধিক তোমার! প্রবেশ কর যদিও শয়তান তোমার সঙ্গে থাকে। নূহ (আ)-এর মুখ দিয়া অকস্মাৎ ইহা বাহির হইয়া পড়িয়াছিল। শয়তান এই সুযোগে গাধার সহিত নৌকায় প্রবেশ করিল। নূহ (আ) তাহাকে নৌকায় দেখিয়া বলিলেন, তুই কেন আসিলি, হে আল্লাহর দুশমন! শয়তান বলিল, কেন! আপনি বলেন নাই, প্রবেশ কর, যদিও শয়তান তোমার সঙ্গে থাকে? অনেকের ধারণামতে শয়তান নৌকার উপরিভাগে ছিল (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৫৯; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৯৩; ঐ লেখক, তাফসীর, ১২খ, ২৩; ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৫৬-৫৭; পানিপতী, আত-তাফসীরুল-মাজহারী, ৫খ, ৮৭)।
মালিক ইব্‌ন সুলায়মান আন-নাহবারী বলেন, নৌকায় যখন সকল জীবজন্তু আরোহণ করিতেছিল তখন সর্প ও বিচ্ছু নূহ (আ)-এর নিকট আসিয়া বলিল, আমাদিগকেও আরোহণ করান। তিনি বলিলেন, তোমরা তো ক্ষতি, কষ্ট ও বিপদের কারণ। তাই আমি তোমাদিগকে আরোহণ করাইব না। তাহারা বলিল, আমাদিগকে আরোহণ করিতে দিন, আমরা আপনাকে এই প্রতিশ্রুতি দিতেছি যে, যাহারা আপনার স্মরণ করিবে তাহাদের কাহাকেও আমরা কোনরূপ ক্ষতি করিব না। এইজন্যই যে উহাদের ক্ষতির ভয় পায় সে যদি এই আয়াত তেলাওয়াত করে (৩৭:৭৯)
سَلَامٌ عَلَى نُوحٍ فِي الْعَالَمِينَ . إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ . إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِينَ .
তবে উহারা তাহার কোন ক্ষতি করে না (আছ-ছা'লাবী, প্রাগুক্ত; পানিপতী, আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৫খ, ৮৭-৮৮)।
ওয়াহব ইবন মুনাব্বিহ (র) বলেন, আল্লাহ যখন নূহ (আ)-কে প্রত্যেক প্রাণীর একজোড়া করিয়া নৌকায় আরোহণ করার নির্দেশ দিলেন তখন নূহ (আ) বলিলেন, সিংহ ও গাভী কিভাবে একত্র করিব? আল্লাহ তা'আলা তাহাকে বলিলেন, কে তাহাদের মধ্যে শত্রুতা পয়দা করিয়া দিয়াছে? নূহ (আ) বলিলেন, ওগো আমার প্রতিপালক! তুমিই। আল্লাহ বলিলেন, আমি তাহাদের মধ্যে ভালবাসা ও সমঝোতা পয়দা করিয়া দিব, ফলে একে অন্যের ক্ষতি করিবে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা সিংহকে জ্বরগ্রস্ত করিয়া দিলেম। তখন সে নিজকে লইয়াই ব্যস্ত রহিল (প্রাগুক্ত, আল-আলুসী, রূহুল-মা'আনী, ১২খ, ৫৪)।
ইবন আবী হাতিম সূত্রে যায়দ ইবন আসলাম (রা) তাঁহার পিতা হইতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, নূহ (আ) যখন নৌকায় প্রত্যেক প্রাণীর একজোড়া করিয়া তুলিলেন, তখন তাহার সঙ্গীগণ বলিল, আমরা কিভাবে নিশ্চিত ও প্রশান্তিতে থাকিব অথচ আমাদের সহিত সিংহ রহিয়াছে! অতঃপর আল্লাহ তা'আলা সিংহকে জ্বরে আক্রান্ত করিয়া দিলেন। পৃথিবীর বুকে ইহাই ছিল প্রথম জ্বর। অতঃপর তাহারা ইঁদুর সম্পর্কে অভিযোগ করিয়া বলিল যে, উহা তো আমাদের খাদ্য দ্রব্য ও মালপত্র বিনষ্ট করিয়া ফেলিবে। তখন আল্লাহ তা'আলা সিংহের প্রতি প্রত্যাদেশ করিলে উহা হাঁচি দিল। ইহা হইতে বিড়াল বাহির হইল। বিড়ালের ভয়ে ইঁদুর আত্মগোপন করিয়া রহিল। এই বর্ণনার সনদটি মুরসাল (ইবন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৪; ঐ লেখক, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১খ, ১১১; ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৫৭; আল-আলুসী, রূহুল-মা'আনী, ১২খ, ৫৩)।
হযরত নূহ (আ)-এর সহিত কতজন মুমিন নৌকায় আরোহণ করিয়াছিল সেই ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। (১) ইবন আব্বাস (রা)-এর বর্ণনামতে তাহারা ছিল স্ত্রী-পুরুষ মিলিয়া ৮০ জন, যাহাদের একজনের নাম ছিল জুরহুম এবং তাহাদের সঙ্গে তাহাদের মহিলারাও ছিল। তাহার অপর এক বর্ণনায় সর্বমোট ৮০ জনের কথা বলা হইয়াছে যাহার ব্যাখ্যা হইল: শাম, হাম, য়াফিছ ও তাহাদের স্ত্রীগণ, নূহ (আ)-এর পত্নী এবং শীছ (আ) বংশের অন্য ৭০ জন। (২) মুকাতিল-এর বর্ণনামতে ৭২ জন পুরুষ ও নারী। নূহ (আ)-এর তিন পুত্র ও তাহাদের স্ত্রীগণ এই মোট ৭৮ জন, যাহাদের অর্ধেক পুরুষ ও অর্ধেক ছিল নারী। (৩) কা'ব আল-আহবার-এর বর্ণনামতে ৭২ জন। (৪) ইবন ইসহাকের বর্ণনামতে মহিলা ছাড়া ছিল দশজন : নূহ (আ), তাঁহার তিন পুত্র সাম, হাম, য়াফিছ এবং তাঁহার উপর ঈমান আনয়নকারী ছয়জন এবং ইহাদের স্ত্রীগণ অর্থাৎ দশজন পুরুষ ও দশজন মহিলা মোট ২০ জন। (৫) কাতাদা, ইবন জুরায়জ ও মুহাম্মাদ ইবন কা'ব আল-কুরাজীর বর্ণনামতে নৌকায় নূহ (আ), তাঁহার স্ত্রী, তাঁহার তিন পুত্র সাম, হাম, য়াফিছ এবং তাহাদের তিন পত্নী এই মোট ৮ জন ছাড়া আর কেহ ছিল না। (৬) আ'মাশ-এর বর্ণনামতে ৭ জন। নূহ (আ), তাঁহার তিন পুত্র ও তাহাদের তিন পত্নী। তিনি তাহাদের মধ্যে নূহ (আ)-এর স্ত্রীর কথা উল্লেখ করেন নাই (আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৯৫; ইবন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৭৫; ঐ লেখক, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১১১; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৫৯; ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৫৬; ছানাউল্লাহ পানিপতী, আত-তাফসীরুল-মাজহারী, ৫খ, ৮৭)। তবে শেষোক্ত মত দুইটি সঠিক নহে এবং তাহা গ্রহণযোগ্যও হইতে পারে না। কারণ ইহা স্পষ্টতই কুরআন করীমের পরিপন্থী। আয়াতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রহিয়াছে যে, তাঁহার পরিবার-পরিজন ছাড়াও তাঁহার উপর ঈমান আনয়নকারীদের একটি দলও ছিল। ইরশাদ হইয়াছে:
قُلْنَا احْمِلْ فِيهَا مِنْ كُلِّ زَوْجَيْنِ اثْنَيْنِ وَأَهْلَكَ إِلَّا مَنْ سَبَقَ عَلَيْهِ الْقَوْلُ وَمَنْ أَمَنَ . (٤٠ : ١١)
"আমি বলিলাম, ইহাতে উঠাইয়া লও প্রত্যেক শ্রেণীর যুগলের দুইটি, যাহাদের বিরুদ্ধে পূর্ব সিদ্ধান্ত হইয়াছে তাহারা ব্যতীত তোমার পরিবার-পরিজনকে এবং যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদিগকে” (১১:৪০)।
অপর বর্ণর্ণাগুলির মধ্যে ৮০ জনের বর্ণনাটিই সঠিক বলিয়া মনে হয়। কারণ নৌযান হইতে অবতরণ করিয়া তিনি যে লোকালয়ের পত্তন করেন উহার নাম রাখেন 'ছামানীন' যাহা 'সূক ছামানীন (৮০ জনের বাজার) নামে খ্যাত। ইহাতে বুঝা যায়, নূহ (আ)-এর সাথী-সঙ্গিগণ সংখ্যায় ৮০ জন ছিল। ইহাই অধিকাংশ আলিমের মত।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 প্লাবনের সূচনা ও তাননূর (উনান) উথলিয়া উঠার মর্ম

📄 প্লাবনের সূচনা ও তাননূর (উনান) উথলিয়া উঠার মর্ম


প্লাবনের সূচনার কথা আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন:
حَتَّى إِذَا جَاءَ أَمْرُنَا وَفَارَ التَّنُّورُ قُلْنَا احْمِلْ فِيهَا مِنْ كُلَّ زَوْجَيْنِ اثْنَيْنِ وَأَهْلَكَ إِلَّا مَنْ سَبَقَ عَلَيْهِ الْقَوْلُ وَمَنْ أَمَنَ . ( ٤٠ : ١١)
"অবশেষে যখন আমার আদেশ আসিল এবং উনান উথলিয়া উঠিল আমি বলিলাম, ইহাতে উঠাইয়া লও প্রত্যেক শ্রেণীর যুগলের দুইটি, যাহাদের বিরুদ্ধে পূর্ব সিদ্ধান্ত হইয়াছে তাহারা ব্যতীত তোমার পরিবার-পরিজনকে এবং যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদিগকে” (১১:৪০)।
এখানে উনান উথলিয়া উঠার মর্ম কি সে ব্যাপারে আলিমগণের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়।
(১) হযরত আলী ইবন আবী তালিব (রা) বলেন, ইহার অর্থ হইল ভোর হওয়া এবং চতুর্দিক, আলোকিত হইয়া যাওয়া। অর্থাৎ ভোরের আলো ছড়াইয়া পড়িলে সকলকে লইয়া নৌকায় আরোহন করিতে আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিলেন। তবে এই মতটি বিরল। অন্য কেহ এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেন নাই।
(২) ইবন আব্বাস (রা) বলেন, ইহার অর্থ হইল যমীনের উপরিভাগ তথা যমীনের উপর দিয়া পানি প্রবাহিত হওয়া। আরবগণ যমীনের উপরিভাগকে তাননূর বলিয়া অভিহিত করিয়া থাকে। সুতরাং আয়াতের অর্থ হইল, যমীনের সকল স্থান হইতে পানি উথলিয়া উঠিল, এমনকি অগ্নি প্রজ্জলিত হইবার স্থান উনান হইতেও। ইহাই অধিকাংশ আলিমের অভিমত (ইবন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১১১; পানিপতী, আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৫খ, ৮৫-৮৬)।
(৩) কাতাদা (র) বলেন, তাননূর হইল যমীনের সবচেয়ে উন্নত ও মর্যাদাসম্পন্ন স্থান;
(৪) হাসান, মুজাহিদ ও শা'বী (র) বলেন, তাননূর অর্থ হইল যেখানে রুটি তৈরী করা হয়। ইহাই অধিকাংশ মুফাস্সিরের মত। আর উহা ছিল একটি পাথরের উনান পূর্বে যাহা হাওয়া (আ)-এর ছিল (আল-কামিল, ১খ, ৫৬), পরে হাত বদল হইতে হইতে নূহ (আ)-এর নিকট আসিয়া পৌঁছে (আত-তাবারী, তারীখ, ১৯, ৯৪; পানিপতী, আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৫খ, ৮৬)। তাই ইহার অর্থ হইল, নূহ (আ)-কে বলা হইল যখন দেখিবে উক্ত উনান হইতে পানি উথলিয়া উঠিতেছে তখন তুমি ও তোমার সাথী-সঙ্গীবৃন্দ নৌকায় আরোহণ করিবে। অতঃপর তাঁহার স্ত্রী একদিন উনানে কাজ করিতেছিলেন। হঠাৎ উনান হইতে পানি উথলিয়া উঠিতে দেখিয়া তিনি নূহ (আ)-কে এই সংবাদ দিলেন (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৫৮)।
এই উনানটি কোথায় অবস্থিত ছিল সেই ব্যাপারে মতভেদ রহিয়াছেঃ (১) মুজাহিদ (র) বলেন, উহা ছিল কৃফার প্রান্ত সীমায়। এই ব্যাপারে সুদ্দী (র) শা'বী (র) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি আল্লাহ্র কসম করিয়া বলিতেন যে, উনান কুফার প্রান্তেই উথলিয়া উঠিয়াছিল। তিনি আরও বলেন, নূহ (আ) কূফার মসজিদের অভ্যন্তরেই নৌকা তৈরী করেন। আর উনান ছিল মসজিদের প্রবেশ পথের ডাইন দিকে যাহা কিনদা গোত্রের দরজার সহিত মিলিত ছিল। উনান উথলিয়া উঠা ছিল নূহ (আ)-এর জন্য তাঁহার কওম ধ্বংস হওয়ার একটি আলামত ও দলীল। (২) আলী ইবন আবী তালিব (রা) বলেন, কুফার মসজিদের কিনদা গোত্রের দরজার দিক হইতেই উনান উথলিয়া উঠিয়াছিল। (৩) মুকাতিল (র) বলেন, ইহা ছিল আদম (আ)-এর উনান। ইহা শাম (বর্তমান সিরিয়া)-এর আয়ন বিরদ নামক স্থানে অবস্থিত ছিল। (৪) ইবন আব্বাস (রা) বলেন, উনানটি ছিল ভারতবর্ষে। ইবন জারীর, ইবনুল মুনযির, ইবন আবী হাতিম, আবুশ-শায়খ ও আল-হাকিম ইহা বর্ণনা করত ইহাকে সহীহ বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন। কাতাদার বর্ণনামতে ইহা জাযীরাতুল আরবে ছিল (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৫৮; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৯৪-৯৫; পানিপতী, আত-তাফসীরুল-মাজহারী, ৫খ, ৮৬; ইবন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৭৪; ঐ লেখক, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ১১১; ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৫৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00