📄 দাওয়াত ও তাবলীগ
নবৃওয়াত প্রাপ্ত হইয়া হযরত নূহ (আ) তাঁহার কওমকে জানাইলেন যে, তিনি আল্লাহ্ পক্ষ হইতে একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী (৭১ : ২), তাহাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসূল (৬ : ১০৭)। বিভিন্নভাবে তিনি তাহাদিগকে বুঝাইতে লাগিলেন। তাহাদিগকে অন্য সব উপাস্য পরিত্যাগ করিয়া এক আল্লাহ্ ইবাদত করিতে বলিলেন। ইহা অমান্য করিলে তাহাদের উপর আযাব অবতীর্ণ হইবে, সেই ব্যাপারে সতর্কও করিলেন, “হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ্ ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোনও ইলাহ নাই। আমি তোমাদের জন্য মহাদিনের শাস্তির আশঙ্কা করিতেছি" (৭ঃ ৫৯)। তিনি শুধু তাহাদিগকে শাস্তির ভয়ই দেখাইলেন না, বরং আল্লাহ্র ইবাদত করিলে এবং তাঁহার (নূহ-এর) আনুগত্য করিলে তাহাদের কৃত অপরাধসমূহ ক্ষমা করিয়া দেওয়ার এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দেওয়ার ঘোষণাও দিলেন (৭১: ৩-৪)। তিনি তাহাদিগকে পার্থিব পুরস্কার ও সুখ-শান্তি প্রাপ্তির আশ্বাস দিলেন এবং তাহাদের প্রতি প্রদত্ত আল্লাহ্ তা'আলার নি'মাতসমূহের বিস্তারিত বর্ণনা দিলেন। তিনি বলিলেন, "তাহার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিলে তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করিবেন, তোমাদিগকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতিতে সমৃদ্ধ করিবেন, তোমাদের জন্য উদ্যান স্থাপন করিবেন এবং নদী-নালা প্রবাহিত করিবেন" (৭১: ১০-১২)। অতঃপর তাহাদের প্রতি আল্লাহ্র বিশেষ দান ও অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করিয়া তাহাদিগকে মৃদু ভর্ৎসনা করিলেন, “তো তোমাদের কি হইয়াছে যে, তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করিতে চাহিতেছ না। অথচ তিনিই তো তোমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন পর্যায়ক্রমে। তোমরা কি লক্ষ্য কর নাই, আল্লাহ কিভাবে সৃষ্টি করিয়াছেন সপ্ত স্তরে বিন্যস্ত আকাশমণ্ডলী এবং সেথায় চন্দ্রকে স্থাপন করিয়াছেন আলোরূপে ও সূর্যকে স্থাপন করিয়াছেন প্রদীপরূপে? তিনি তোমাদিগকে উদ্ভূত করিয়াছেন মৃত্তিকা হইতে, অতঃপর উহাতে তিনি তোমাদিগকে প্রত্যাবৃত্ত করিবেন ও পরে পুনরুত্থিত করিবেন এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য ভূমিকে করিয়াছেন বিস্তৃত যাহাতে তোমরা চলাফেরা করিতে পার প্রশস্ত পথে” (৭১: ১৩-২০)।
তাহারা তাহাদের নিজেদের মধ্যে হইতেই একজন লোক এই দায়িত্ব পাইয়াছে জানিয়া বিস্ময় প্রকাশ করিল (৭: ৬৩) এবং বলিল, আমরা তোমাকে তো আমাদের মত মানুষ ব্যতীত কিছু দেখিতেছিনা; আমরা তো দেখিতেছি তোমার অনুসরণ করিতেছে তাহারাই যাহারা আমাদের মধ্যে বাহ্য দৃষ্টিতেই অধম এবং আমরা আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব দেখিতেছি না; বরং আমরা তোমাদিগকে মিথ্যাবাদী মনে করি (১১: ২৭)। অতঃপর সকলে মিলিয়া তাঁহাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করিল (২: ৬৪)।
দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে হযরত নূহ (আ) নিরলস পরিশ্রম করেন। তাঁহার সাধ্যমত সমস্ত উপায়-উপকরণ তিনি অবলম্বন করেন। তিনি দিবা-রাত্র, প্রকাশ্যে ও গোপনে উচ্চস্বরে (৭১: ৫-৯) সর্ববিধ পন্থায় কওমকে দাওয়াত দেন, কিন্তু স্বল্প সংখ্যক দরিদ্র ও নিম্ন শ্রেণীর লোক ছাড়া কেহই তাহার দাওয়াতে কর্ণপাত করিল না; বরং তাহাদের সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এবং ধনী শ্রেণীর লোকেরা তাহাকে স্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত (৭ঃ ৫৯) বলিয়া আখ্যায়িত করিল, তাঁহাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করিল। তাঁহাকে একজন সামান্য মানুষ এবং তাঁহার অনুসারীদিগকে নিম্ন শ্রেণীর লোক বলিয়া তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করিল। তাহারা তাঁহাকে উন্মত্ত বলিয়া অপবাদ দিল, আবার কখনও তাঁহাকে শ্রেষ্ঠত্ব লাভের আকাঙ্খী বলিয়া দোষারোপ করিল এবং তাঁহার ব্যাপারে কিছুকাল অপেক্ষা করার জন্য নিজেরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়া বলিল, আল্লাহ ইচ্ছা করিলে তো একজন ফেরেশতাই পাঠাইতেন (২৩: ২৪-২৫; ৫৪:৯)।
অবশেষে তাহারা নূহ (আ)-এর একনিষ্ঠ অনুসারী দরিদ্র ও নিম্নশ্রেণীর লোকদিগকে দূরে সরাইয়া দেওয়ার প্রস্তাব করিল। কিন্তু নূহ (আ) দৃঢ়তার সহিত এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিলেন, মুমিনদিগকে তাড়াইয়া দেওয়া আমার কাজ নহে (২৬ঃ ১১৪)। তাহারা নিশ্চিতভাবে তাহাদের প্রতিপালকের সাক্ষাত লাভ করিবে (১১: ২৯)। তাহাদিগকে তাড়াইয়া দিলে আল্লাহ তা'আলা অসন্তুষ্ট হইবেন। পরোক্ষভাবে ইহাও বলিলেন, আমি যদি তাহাদেরকে তাড়াইয়া দেই তবে আল্লাহ্ শান্তি হইতে আমাকে কে রক্ষা করিবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করিবে না (১১: ৩০)।
তিনি আরো বলিলেন, "উহারা কি করিত তাহা আমার জানা নাই। উহাদের হিসাব গ্রহণ তো আমার প্রতিপালকেরই কাজ; যদি তোমরা বুঝিতে" (২৬ঃ ১১২-১১৩)! তিনি বলিলেন, এই সকল দুর্বল ও নিম্নশ্রেণীর লোক যাহারা মনে-প্রাণে আল্লাহর উপর ঈমান আনিয়াছে তাহারা তাহাদের (সম্প্রদায়ের) নিকট এইজন্য তুচ্ছ ও হেয় যে, উহারা তাহাদের ন্যায় সম্পদ ও বিত্তশালী নহে। আর এজন্যই তাহাদের (কাফিরদের) ধারণায় তাহারা (দরিদ্র মুমিনগণ) কল্যাণ বা সৌভাগ্য লাভ করিতে পারিবে না। কারণ তাহাদের ধারণামতে সৌভাগ্য ও কল্যাণ সম্পদের মধ্যে নিহিত; দরিদ্রতার মধ্যে নহে। প্রকৃতপক্ষে ইহাদের বিষয়টি আল্লাহ্র উপর ন্যস্ত, যিনি তাহাদের অন্তর সম্পর্কে জ্ঞাত। কারণ আল্লাহ প্রদত্ত সৌভাগ্য ও হিদায়াত বাহ্যিক ধন-সম্পদের উপর নির্ভরশীল নহে; বরং অন্তরের নির্মলতা, নিয়তের ইখলাস ও আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উপর নির্ভরশীল।
নূহ (আ) বিভিন্নভাবে তাহাদিগকে বুঝাইলেন যে, তিনি পার্থিব কোন স্বার্থে (দাওয়াত ও তাবলীগের) কাজ করিতেছেন না। তিনি তাহাদের নিকট কোন সম্পদ বা কোন পদ ও পদবী চাহিতেছেন না। এই মহতী কাজের বিনিময় তো আল্লাহই তাহাকে প্রদান করিবেন (১১: ২৯)। তিনি তাহাদিগকে বুঝাইলেন যে, তাহার কাছে না আল্লাহর ধন-ভাণ্ডার আছে, আর না তিনি অদৃশ্য সম্বন্ধে অবগত; আর না তিনি কোন ফেরেশতা (১১: ৩১)। তিনি একজন মানুষ মাত্র, আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে আল্লাহ্ বিধান ও নির্দেশের প্রতি তাহাদিগকে দাওয়াত ও তাবলীগের জন্যই মনোনীত করিয়াছেন।
কিন্তু কোন যুক্তিই তাহারা গ্রহণ করিল না, কোনভাবেই তাহারা দাওয়াত কবুল করিল না; বরং উক্ত দাওয়াতকে ঝগড়া ও বিতণ্ডারূপে আখ্যায়িত করিয়া বলিল, হে নূহ! তুমি আমাদের সহিত অতিরিক্ত বিতণ্ডা করিয়াছ। তাই নিতান্ত তাচ্ছিল্য ও অবিশ্বাসভরে তাহারা বলিল, তুমি যদি সত্যবাদী হও, তবে যাহার ভয় দেখাইতেছ তাহা আনয়ন কর (১১: ৩২)। নূহ (আ) ইহার উত্তরে বলিলেন, "ইচ্ছা করিলে আল্লাহ্ই তোমাদের নিকট উপস্থিত করিবেন এবং তোমরা উহা ব্যর্থ করিতে পারিবে না” (১১: ৩৩)। অবশেষে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছিল যে, নূহ (আ) যখনই তাহাদিগকে আল্লাহ্ দিকে দাওয়াত দিতেন তখনই তাহারা তাঁহার কোন কথাই যাহাতে কর্ণকুহরে না পৌঁছে সেইজন্য কানে আঙ্গুলি প্রবেশ করাইত। আর তাঁহাকে যাহাতে দেখিতে না হয় সেইজন্য নিজদিগকে কাপড়ে আবৃত করিয়া ফেলিত এবং জিদ ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করিতে লাগিল (৭১ঃ ৭)। এক পর্যায়ে তাঁহাকে পাগল বলিয়া ভীতি প্রদর্শন করিল (৫৪: ৯) এবং এই কাজ হইতে বিরত না থাকিলে তাঁহাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করিবার হুমকিও দিল (২৬ঃ ১১৬)।
📄 নূহ (আ)-এর নৈরাশ্য এবং আল্লাহ কর্তৃক শান্ত্বনা দান
এইভাবে সাড়ে নয় শত বৎসর তিনি অসীম ধৈর্যের সহিত তাহাদিগকে দাওয়াত দিলেন (২৯: ১৪)। কিন্তু তাহাদের স্বভাব-চরিত্রের কোনই পরিবর্তন হইল না। নূহ (আ)-এর যুক্তিপূর্ণ ও আন্তরিক দাওয়াত তাহাদের হৃদয়ে একটুও দাগ কাটিল না। তাহারা নিজেরা তো গ্রহণ করিলই না, সন্তানদিগকেও তাহারা ওসিয়াত করিয়া যাইত যেন তাহারা নূহ (আ)-এর দাওয়াত গ্রহণ না করে (আল-বিদায়া, ১খ., ১০৯)। ইব্ন ইসহাক প্রমুখ নূহ (আ)-এর প্রতি তাঁহার সম্প্রদায়ের রূঢ় আচরণের কথা বিস্তারিতভাবে তুলিয়া ধরিয়াছেন। দাহ্হাক সূত্রে ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, নূহ (আ)-এর সম্প্রদায় তাঁহাকে আটক করিয়া প্রহার করিত, গলায় ফাঁস দিত। ফলে তিনি বেহুঁশ হইয়া পড়িয়া যাইতেন। অতঃপর হুঁশ ফিরিয়া আসিলে বলিতেন, হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা কর এবং আমার কওমকেও। কারণ তাহারা অজ্ঞ। অতঃপর তিনি গোসল করিতেন এবং কওমের নিকট গিয়া আবার তাহাদিগকে দাওয়াত দিতেন। এমনিভাবে তাহারা স্বীয় পাপে প্রতিনিয়ত ডুবিয়া রহিল। তাহাদের অপরাধ গুরুতর হইতে লাগিল। নূহ (আ) ও তাহাদের মধ্যকার এই আচরণ দীর্ঘায়িত হইতে লাগিল। এই মুসীবত তাঁহার জন্য কঠিন আকার ধারণ করিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পর্যন্ত তিনি প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন; কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম পূর্বের তুলনায় আরও বেশী অপরাধী ও দুষ্কৃতকারী হইতে লাগিল, এমনকি পরবর্তী প্রজন্ম বলিতে লাগিল, এই লোকটি আমাদের বাপ-দাদাদের সময়ে এইরূপ পাগল ছিল। তাহারা ইহার কোন কথাই গ্রহণ করিত না।
তাঁহার কওম যে উত্তরোত্তর কেবল খারাপই হইতেছিল ইহার স্বপক্ষে ঐতিহাসিক ও মুফাসসিরগণ একটি ঘটনার অবতারণা করিয়াছেন। একবার এক লোক তাহার পুত্রকে কোলে লইয়া লাঠিতে ভর করিয়া নূহ (আ)-এর নিকট আগমন করিল এবং লোকটি তাহার পুত্রকে বলিল, বৎস! এই বৃদ্ধকে ভালমত দেখিয়া নাও। সে যেন তোমাকে কখনও ধোঁকা দিতে না পারে। ছেলেটি বলিল, পিতা! লাঠিখানি আমাকে দাও। লোকটি লাঠিখানি তাহার হাতে দিল। ছেলেটি আবার বলিল, আমাকে মাটিতে নামাইয়া দাও। লোকটি তাহাকে মাটিতে নামাইয়া দিল। সে হাঁটিয়া নূহ (আ)-এর কাছে গেল এবং লাঠি দিয়া তাঁহাকে প্রহার করিল। মনের দুঃখে নূহ (আ) তখন বলিলেন, হে আমার প্রতিপালক! তোমার বান্দারা আমার সহিত কীরূপ আচরণ করিতেছে তাহা তুমি দেখিতেছ। তাহাদিগকে যদি তুমি রাখিতে চাও তবে তাহাদিগকে হেদায়াত দান কর। আর যদি তাহা না হয় তবে তাহাদের ব্যাপারে তোমার ফয়সালা করা পর্যন্ত আমাকে ধৈর্য ধারণের তাওফীক দাও। তুমি তো উত্তম ফয়সালাকারী। তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সান্ত্বনা দিয়া এবং কওমের শেষ অবস্থা জানাইয়া দিয়া তাঁহার নিকট ওহী পাঠাইলেন, যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহারা ব্যতীত তোমার সম্প্রদায়ের অন্য কেহ কখনো ঈমান আনিবে না। সুতরাং তাহারা যাহা করে তজ্জন্য তুমি দুঃখিত হইও না (১১: ৩৭; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৫৬-৫৭; আত-তাবারী, জামি'উল বায়ান ফী তাফসীরিল কুরআন, ১২ খ, ২২; ঐ লেখক, তারীখুল-উমাম ওয়াল মুলুক, ১খ, ৯২; ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৫৫; আল-আলুসী, রূহুল-মা'আনী, ১২খ, ৪৮)। তিনি আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করিলেন, "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য কর। কারণ উহারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলিতেছে” (২৩: ২৬)।" আমি তো অসহায়, অতএব তুমি প্রতিবিধান কর" (৫৪: ১০)।
📄 কওমের বিরুদ্ধে নূহ (আ)-এর বদদোআ
নূহ (আ) তাহাদের ঈমান আনয়নের ব্যাপারে নিরাশ হইয়া গেলেন এবং আল্লাহ্র নিকট হইতে জানিতে পারিলেন যে, তাহাদের দাওয়াত কবুল না করা তাঁহার দাওয়াত পৌছানোর কোন ত্রুটির কারণে নহে, বরং অমান্যকারীদের অহংকার ও অবাধ্যতার ফল এবং তাহারা কেহই আর কখনও ঈমান আনিবে না। তাহারা পৃথিবীতে থাকিলে কোন ফলোদয় হইবে না, বরং ধনেজনে বর্ধিত হইয়া পাপাচার আরও বৃদ্ধি করিবে। তাই তাহাদিগকে আর অবকাশ না দেওয়ার জন্য আল্লাহ্র নিকট দো'আ করিলেন, হে আমার প্রতিপালক! পৃথিবীতে কাফিরগণের মধ্য হইতে কোন গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিও না। তুমি উহাদিগকে অব্যাহতি দিলে উহারা তোমার বান্দাদিগকে বিভ্রান্ত করিবে এবং জন্ম দিতে থাকিবে কেবল দুষ্কৃতকারী ও কাফির (৭১: ২৬-২৭)। কিন্তু সাথে সাথে স্বীয় পিতামাতা এবং তাহার অনুসারী মু'মিনদের ক্ষমার জন্য দো'আ করিলেন, হে আমার প্রতিপালক! তুমি ক্ষমা কর আমাকে, আমার পিতামাতাকে এবং যাহারা মু'মিন হইয়া আমার গৃহে প্রবেশ করে তাহাদিগকে এবং মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারীদিগকে (৭১: ২৮)। উল্লেখ্য যে, তাঁহার প্রতি ঈমান আনয়নকারীদের সংখ্যা ছিল অতি নগণ্য। কাহারও মতে নারী-পুরুষ মিলিয়া ৪০ জন, কাহারও মতে ৬০ জন, আবার কাহারও মতে ৮০ জন (আবদুল ওয়াহহাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩৫; আল-আলুসী, রূহুল-মা'আনী, ১২ খ, ৫৫)।
📄 আল্লাহ্র নির্দেশে জাহাজ নির্মাণ
স্বীয় কাওম সম্পর্কিত নূহ (আ)-এর এই দো'আ আল্লাহ তা'আলা কবুল করিলেন (৩৭ঃ৭৫) এবং তাহাকে জানাইয়া দিলেন যে, তিনি কাফির মুশরিকদিগকে এক মহাপ্লাবনে নিমজ্জিত করিয়া ধ্বংস করিবেন। আর তাঁহাকে ও তাঁহার অনুসারী মু'মিনদিগকে জাহাজে আরোহণ করাইয়া রক্ষা করিবেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা সরাসরি নিজের তত্ত্বাবধানে জাহাজ তৈরীর নির্দেশ দিলেন (১১:৩৭)।
ইমাম ছা'লাবী জাহাজ তৈরীর বিবরণ এইভাবে দিয়াছেনঃ তখনও পর্যন্ত যেহেতু নৌযান ব্যবহার শুরু হয় নাই, তাই নূহ (আ) কৌতুহলী হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আমার প্রতিপালক! নৌযান কি? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, একটি কাষ্ঠ নির্মিত গৃহ যাহা পানির উপর চলে। নূহ (আ) বলিলেন, হে প্রতিপালক! কাষ্ঠ কোথায় পাইব? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, হে নূহ! আমি যাহা চাই তাহা করিতে সক্ষম। নূহ (আ) বলিলেন, হে আমার প্রতিপালক! বৃক্ষ কোথায় পাইব? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, একটি বৃক্ষ তুমি রোপণ কর। অতঃপর তিনি একটি সেগুন, মতান্তরে দেবদারু (আল-বিদায়া, ১খ, ১১০) আর বাইবেলে বর্ণিত হইয়াছে গোফর বৃক্ষ (Genesis; 6:14) রোপণ করিলেন, অতঃপর চল্লিশ বৎসর মতান্তরে এক শত বৎসর (আল-বিদায়া, প্রাগুক্ত) কাটিয়া গেল। এই সময়কালে তিনি কওমের উপর বদদো'আ করা হইতে বিরত রহিলেন। কোন কোন ঐতিহাসিক ও মুফাসসিরের বর্ণনামতে এই সময়কাল পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা তাহাদের মহিলাদিগকে বন্ধ্যা করিয়া রাখিলেন। ফলে তাহাদের আর কোন সন্তান পয়দা হইল না (ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৫৬; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৫৭)। প্রকৃতপক্ষে ইহা একটি ইসরাঈলী রিওয়ায়াত।
কোনও বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য সূত্রে ইহার উল্লেখ নাই। ঐতিহাসিক ও মুফাসসিরগণ সম্ভবত এই ধারণার বশবর্তী হইয়া উহা বর্ণনা করিয়াছেন যে, জন্মের ধারা চালু থাকিলে অনেক নিষ্পাপ শিশুই পিতামাতার সহিত প্লাবনে মৃত্যুবরণ করিবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নিষ্পাপ শিশুকে শাস্তি হইতে রক্ষা করিবার জন্য এই জাতীয় বর্ণনার প্রয়োজন নাই। কারণ আল্লাহ্ নিয়ম হইল, কোনও অঞ্চলে আযাব আসিলে সেখানকার ছোট-बড়, ধনী-গরীব, যুবা-বৃদ্ধ, পাপী-নিষ্পাপ নির্বিশেষে সকলে উহাতে ধ্বংস হয়। অতঃপর পাপিষ্ঠদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতই বরবাদ হইয়া যায়। আর নিষ্পাপদের জন্য ইহা হয় সৌভাগ্যের ব্যাপার। কারণ তাহারা দুঃখ-কষ্টের জগত হইতে চিরস্থায়ী শান্তির জগতে উপনীত হয়। তাই নূহ (আ)-এর সম্প্রদায়ের যুবা-বৃদ্ধ-শিশু সকলেই প্লাবনে নিশ্চিহ্ন হইয়া যায় (হিফজুর রহমান সিউহারবী, কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৮৪-৮৫)।
অতঃপর বৃক্ষটি যখন পূর্ণতা প্রাপ্ত হইল, সালমান (রা)-এর বর্ণনামতে ৪ বৎসর হইল (আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৯১), তখন আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে উহা কাটিবার নির্দেশ দিলেন। তিনি উহা কাটিয়া রৌদ্রে শুকাইলেন এবং বলিলেন, হে আমার प्रतिপালক! ইহা দ্বারা কিভাবে আমি উক্ত গৃহ নির্মাণ করিব? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, উহাকে তিনটি আকৃতিতে বিন্যস্ত কর, উহার মাথা মোরগের ন্যায়, পেট পাখির পেটের ন্যায় এবং লেজ অনেকটা মোরগের লেজের মত বানাও। উহা বদ্ধ আকৃতির বানাও। দরজাগুলি বানাও উহার দুই পার্শ্বে। উহাকে ত্রিতলবিশিষ্ট বানাও। ৮০ হাত দৈর্ঘ্য, ৫০ হাত প্রস্থ এবং উচ্চতায় ৩০ হাত বানাও। ইহা আহলে কিতাবদের বর্ণনা বলিয়া ইমাম ছা'লাবী উল্লেখ করিয়াছেন (পৃ. ৫৭)। কিন্তু বাইবেলে ৩০০ হাত দৈর্ঘ্য, ৫০ হাত প্রস্থ এবং ৩০ হাত উচ্চতার কথা উল্লেখ রহিয়াছে (দ্র. Genesis, 6:15)। এই ব্যাপারে আরও বিস্তারিত বর্ণনা পরে আসিতেছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা নূহ (আ)-কে জাহাজ তৈয়ার করা শিক্ষাদান করিতে জিবরীল (আ)-কে প্রেরণ করিলেন। নূহ (আ) কাঠ কাটিয়া উহাতে পেরেক ঢুকাইয়া জাহাজের আকৃতি বানাইতে লাগিলেন (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৫৭; ছানাউল্লাহ পানীপতি, আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৫খ, ৮৪)। আর তাঁহার কওমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ যখনই তাঁহার নিকট দিয়া গমন করিত তখনই ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিত (১১ঃ ৩৮)। তাহারা বলিত, নূহ! তুমি নবুওয়াতের দাবি করিয়া এখন কাঠমিস্ত্রি হইয়া গিয়াছ! তাহারা আরও বলিত, এই পাগলের কাণ্ড দেখ, কাষ্ঠ দিয়া ঘর বানাইতেছে যাহা নাকি পানির উপর দিয়া চলিবে! এই মরুভূমিতে পানি কোথা হইতে আসিবে! এই বলিয়া তাহারা পরস্পর হাসাহাসি করিত (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, প্রাগুক্ত; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৬১)। নূহ (আ) ও তাহাদের পরিণতি সম্পর্কে উদাসীনতা এবং আল্লাহর নাফরমানীতে অটল থাকার ধৃষ্টতা দেখিয়া তাহাদের পন্থায় উত্তর দিতেন, তোমরা যদি আমাদিগকে উপহাস কর তবে আমরাও তোমাদিগকে উপহাস করিব, যেমন তোমরা উপহাস করিতেছ এবং তোমরা অচিরে জানিতে পারিবে কাহার উপর আসিবে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি (১১: ৩৮-৩৯)। অতঃপর তিনি নিজ কাজে মনোনিবেশ করিতেন। আল্লাহ তা'আলা পূর্বেই তাঁহাকে ইহাদের বিষয় জানাইয়া দিয়া বলিয়াছিলেন, "তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার প্রত্যাদেশ অনুযায়ী নৌকা নির্মাণ কর। আর যাহারা সীমা লঙ্ঘন করিয়াছে তাহাদের সম্পর্কে আমাকে কিছু বলিও না; তাহারা তো নিমজ্জিত হইবে" (১১: ৩৭)। তাহাদের ব্যাপারে নূহ (আ)-এর দো'আ কবুল হইয়াছিল এবং আল্লাহ্র সিদ্ধান্ত স্থির হইয়াছিল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা নূহ (আ)-কে নৌকা নির্মাণ কর্ম তাড়াতাড়ি সমাপ্ত করিবার জন্য প্রত্যাদেশ পাঠাইলেন এবং বলিলেন, পাপিষ্ঠদের প্রতি আমার ক্রোধ বৃদ্ধি পাইতেছে। সুতরাং নৌকা নির্মাণ কর্ম তাড়াতাড়ি সম্পাদন কর। তখন নূহ (আ) দুইজন কাঠমিস্ত্রি ভাড়া করিলেন এবং তাঁহার পুত্র সাম, হাম ও য়াফিছও নৌকা বানাইতে লাগিয়া গেলেন। অতঃপর তিনি উহার নির্মাণ কর্ম সমাপ্ত করেন। কত বৎসরে উহা সমাপ্ত হয় সে ব্যাপারে অনেক মতভেদ রহিয়াছে। যায়দ ইবন আসলাম (রা)-এর বর্ণনামতে রোপণ ও কর্তনে ১০০ (এক শত) বৎসর অতিবাহিত হয় এবং নৌকা নির্মাণে আরও এক শত বৎসর ব্যয় হয়। অন্য এক বর্ণনামতে বৃক্ষ লাগানোর পর ৪০ বৎসর ব্যয় হয়। কা'ব আল-আহবারের এক বর্ণনাতে নূহ (আ) ৩০ বৎসরে নৌকা নির্মাণ করেন (ছানাউল্লাহ পানীপতি, তাফসীরুল-মাজহারী, ৫খ, ৮৫)। কিন্তু কা'ব হইতে অপর একটি বর্ণনা পাওয়া যায় ৪০ বৎসরের (আল-আলুসী, রূহুল-মা'আনী, ১২খ, ৫০)। মুজাহিদের বর্ণনামতে ৩ বৎসরে নির্মাণকর্ম সমাপ্ত হয়। এতদ্ব্যতীত ৬০ ও ৪০০ বৎসরের বর্ণনাও পাওয়া যায় (প্রাগুক্ত)। আর ইবন আব্বাস (রা) হইতে একটি রিওয়ায়াত পাওয়া যায় যে, দুই বৎসরে তিনি নির্মাণ কর্ম সমাপ্ত করেন (আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৫খ, ৮৪)। এই মতটিই অধিকতর যুক্তিযুক্ত বলিয়া মনে হয়। উক্ত নৌকার পার্শ্বে আল্লাহ তা'আলা আলকাতরার একটি প্রস্রবণ প্রবাহিত করিয়া ছিলেন যাহা টগবগ করিতেছিল। অতঃপর নৌকার ভিতর ও বাহিরের দিকে উক্ত আলকাতরা দ্বারা প্রলেপ দেওয়া হইল এবং লৌহ কীলক দ্বারা মজবুত করা হইল (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৫৮)। ইহাই কুরআন করীমে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন, "আর আমি তাহাকে আরোহণ করাইলাম কাষ্ঠ ও কীলক নির্মিত এক নৌযানে" (৫৪: ১৩)।