📄 হাদীছে হযরত নূহ (আ)
হযরত নূহ (আ) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাদীছে খুব বেশি বর্ণনা পাওয়া যায় না। তাঁহার সম্পর্কে হাদীছে নিম্নলিখিত বর্ণনা পাওয়া যায় :
عن ابي هريرة ( رض ) قال كنا مع النبي صلى الله عليه وسلم .... يقول ادم إذهبوا الى نوح فيأتون نوحا فيقولون يانوح انت اول الرسل الى اهل الارض وسماك الله عبدا شكورا الا ترى الى ما نحن فيه الا ترى الى ما بلغنا الا تشفع لنا الى ربك فيقول ربي قد غضب اليوم غضبا لم يغضبه قبله مثله ولا يغضب بعده مثله نفسي نفسي ايتوا النبي (البخاري - الصحيح جلد ۱ صفحه (٤٧٠) وفي رواية مسلم ولكن ائتوتوا ابراهيم عليه السلام الذي اتخذه الله خليلا (مسلم : الصحيح ج | صفحه (۱۰۸)
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, "একদা আমরা নবী (স)-এর সঙ্গে ছিলাম। [তিনি কিয়ামতের দিনের বর্ণনা দেন যে, সেই দিনের ভয়াবহতা হইতে রক্ষা পাইবার জন্য লোকজন আল্লাহ্র নিকট সুপারিশ করিবার জন্য বিভিন্ন নবীর দ্বারস্থ হইবে। এই পর্যায়ে তাহারা আদম (আ)-এর নিকট গিয়া আল্লাহ্র নিকট সুপারিশ করার অনুরোধ করিলে আদম (আ) বলিবেন তোমরা নূহ (আ)-এর নিকট যাও। তখন তাহারা নূহের নিকট গিয়া বলিবে, 'হে নূহ! বিশ্ববাসীর নিকট আপনি প্রথম রাসূল। আর আল্লাহ আপনার নাম রাখিয়াছেন "কৃতজ্ঞ বান্দা" আপনি দেখিতেছেন না, আমরা কি অবস্থায় নিপতিত! আপনি দেখিতেছেন না আমাদের কি কষ্ট হইতেছে! আমাদের জন্য আপনার প্রতিপালকের নিকট সুপারিশ করুন। তিনি বলিলেন, আমার প্রতিপালক আজ এমন ক্রোধান্বিত হইয়াছেন যে, এইরূপ ক্রোধান্বিত তিনি ইতোপূর্বে কোন দিন হন নাই, পরেও কোন দিন হইবেন না। নাফসী! নাফসী! তোমরা আমার বংশধরের কাছে যাও। মুসলিম ও ইব্ন মাজা গ্রন্থে এই স্থলে ইবরাহীম (আ)-এর নাম উল্লেখ রহিয়াছে যে, তোমরা ইবরাহীমের কাছে যাও, আল্লাহ্ যাহাকে খলীল (বন্ধু)-রূপে গ্রহণ করিয়াছিলেন (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, ১খ., ৪৭০; মুসলিম, আস-সাহীহ, ১খ,, ১০৮; ইব্ন মাজা, আস-সুনান, পৃ. ৩২৯-৩৩০; তিরমিযী, আল-জামি, ২খ, ৬৬)।
عن ابي سعيد (رض) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم يجيئ نوح وأمته فيقول الله هل بلغت فيقول نعم اى رب فيقول لامته هل بلغكم فيقولون لا ماجاءنا من نبي فيقول لنوح من يشهد لك فيقول محمد وامته فتشهد انه قد بلغ وهو قوله وكذلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا
আবূ সাঈদ খুদরী (রা) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, (কিয়ামতের দিন) নূহ (আ)-ও তাঁহার উম্মত (ময়দানে) আসিবে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলিবেন, তুমি কি (হিদায়াতের বাণী ও আমার দীনের দাওয়াত) পৌঁছাইয়াছ? তিনি বলিবেন, হাঁ, হে আমার প্রতিপালক! অতঃপর তিনি (আল্লাহ) তাঁহার উম্মতকে বলিবেন, সে কি তোমাদের নিকট পৌছাইয়াছে? তাহারা বলিবে, না, আমাদের কাছে কোন নবী আসে নাই। তখন তিনি নূহকে বলিবেন, তোমার সাক্ষী কে? তিনি বলিবেন, মুহাম্মাদ (স)-ও তাঁহার উম্মত। তখন আমরা সাক্ষী দিব যে, তিনি (হিদায়াতের বাণী) পৌঁছাইয়াছেন। ইহাই আয়াতে বর্ণিত হইয়াছে: “এইভাবে আমি তোমাদিগকে এক মধ্যপন্থী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি, যাহাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ এবং রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হইবে" (আয়াত দ্র. ২: ১৪৩; হাদীছ দ্র. আল-বুখারী, আস-সাহীহ, ১খ., ৪৭০)।
قال ابن عمر (رض) قام رسول الله صلى الله عليه وسلم في الناس فاثنى على الله بما هو اهله ثم ذكر الدجال فقال اني لانذركموه وما من نبي الا أنذر قومه لقد أنذر نوح قومه
ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স) একবার লোক সমাবেশে দাঁড়াইলেন, অতঃপর আল্লাহ্র যথাযথ প্রশংসা করিলেন। অতঃপর দাজ্জালের প্রসংগ উল্লেখ করিয়া বলিলেন, 'আমি তোমাদিগকে তাহার সম্পর্কে সতর্ক করিব। প্রত্যেক নবীই (তাহার সম্পর্কে) আপন সম্প্রদায়কে সতর্ক করিয়াছেন। নূহ (আ)-ও তাঁহার সম্প্রদায়কে সতর্ক করিয়াছিলেন” (আল-বুখারী আস-সাহীহ, ১খ., ৪৭০)।
عن عبد الله ابن عمرو قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول صام نوح الدهر الا يوم عيد الفطر ويوم عيد الاضحى ابن ماجه : السنن (١/١٢٤)
'আবদুল্লাহ্ ইব্ন 'আমর (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি, নূহ (আ) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিবস ব্যতীত সারা বৎসর সাওম পালন করিতেন (ইবন মাজা, আস-সুনান, ১খ., ১২৪)।
একটি হাদীছে হযরত নূহ (আ)-এর নাম উল্লেখ না থাকিলেও হাদীস বিশারদ ও ভাষ্যকারগণের মতে উক্ত হাদীছে নূহ (আ)-এর কথাই বর্ণনা করা হইয়াছে। হাদীসটি হইল:
قال عبد الله كأني انظر الى النبي صلى الله عليه وسلم يحكى نبيا من الأنبياء ضربه قومه فادموه وهو يمسح الدم عن وجهه ويقول اللهم اغفر لقومى فانهم لا يعلمون البخاري : الصحيح (١/٤٩٥)
আব্দুল্লাহ্ (রা) বলেন, আমি যেন নবী (স)-কে দেখিতেছি যে, তিনি বর্ণনা করিতেছেন: নবীদিগের মধ্য হইতে একজন নবীকে তাঁহার সম্প্রদায় প্রহারে রক্তাক্ত করিয়া ফেলিয়াছে আর তিনি স্বীয় মুখমণ্ডল হইতে রক্ত মুছিয়া বলিতেছিলেন, 'হে আল্লাহ্! আমার সম্প্রদায়কে ক্ষমা কর। কেননা তাহারা অজ্ঞ' (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, ১খ., ৪৯৫)।
📄 বাইবেলে হযরত নূহ (আ)
বাইবেলের পুরাতন নিয়ম (Old Testament)-এর ৬-১০ অনুচ্ছেদ ব্যাপী হযরত নূহ (আ) সম্পর্কে আলোচনা করা হইয়াছে। সেখানে বেশির ভাগ বর্ণনাই প্লাবন সম্পর্কিত। এতদ্ব্যতীত তাঁহার পরবর্তী বংশের তালিকা ও বিবরণ প্রদান করা হইয়াছে। বাইবেলের বর্ণনা নিম্নরূপ:
লেমক এক শত বিরাশী বৎসর বয়সে উপনীত হইলে তাহার এক পুত্র জন্মগ্রহণ করে যাহার নাম তিনি নোহ [বিশ্রাম] রাখিলেন। কেননা তিনি কহিলেন, সদাপ্রভু কর্তৃক অভিশপ্ত ভূমি হইতে আমাদের যে শ্রম ও হস্তের ক্লেশ হয়, তদ্বিষয়ে আমাদিগকে সান্ত্বনা করিবে; নোহের জন্ম দিলে পর লেমক পাঁচ শত পঁচানব্বই বৎসর জীবিত থাকিয়া আরও পুত্র-কন্যার জন্ম দিলেন; সর্বশুদ্ধ লেমকের সাত শত সাতাত্তর বৎসর বয়স হইলে তাহার মৃত্যু হইল। পরে নোহ পাঁচ শত বৎসর বয়সে শেম, হাম ও যেফতের জন্ম দিলেন (Genesis, 5 : 28-32; বাংলা অনুপবিত্র বাইবেলে, আদিপুস্তক, পৃ. ৭)।
নোহ ও জল প্লাবনের বৃত্তান্ত
এইরূপে যখন ভূমণ্ডলে মনুষ্যদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। আর সদাপ্রভু কহিলেন, আমি যে মনুষ্যকে সৃষ্টি করিয়াছি, তাহাকে ভূমণ্ডল হইতে উচ্ছিন্ন করিব; মনুষ্যের সহিত পশু, সরীসৃপ, জীব ও আকাশের পক্ষীদিগকেও উচ্ছিন্ন করিব। কেননা তাহাদের নির্মাণ প্রযুক্ত আমার অনুশোচনা হইতেছে। (কিন্তু) নোহ সদাপ্রভুর দৃষ্টিতে অনুগ্রহপ্রাপ্ত হইলেন। নোহের বংশ-বৃত্তান্ত এই: নোহ তাৎকালীন লোকদের মধ্যে ধার্মিক ও সিদ্ধলোক ছিলেন, নোহ, শেম, হাম ও যেফৎ নামে তিন পুত্রের জন্ম দেন। তৎকালে পৃথিবী ঈশ্বরের দৃষ্টিতে ভ্রষ্ট, পৃথিবী দৌরাত্ম্যে পরিপূর্ণ ছিল। আর ঈশ্বর পৃথিবীতে দৃষ্টিপাত করিলেন, আর দেখ ইহা ভ্রষ্ট হইয়াছে, কেননা পৃথিবীস্থ সমুদয় প্রাণী ভ্রষ্টাচারী হইয়াছিল। তখন ঈশ্বর নোহকে কহিলেন, আমি সকল প্রাণীকে ধ্বংস করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছি, কেননা তাহাদের দ্বারা পৃথিবী দৌরাত্ম্যে পরিপূর্ণ হইয়াছে; আর দেখ আমি পৃথিবীর সহিত তাহাদিগকে বিনষ্ট করিব। তুমি গোদর কাষ্ঠ দ্বারা এক জাহাজ নির্মাণ করিবে ও তাহার ভিতরে ও বাহিরে ধুনা দিয়া লেপন করিবে। এই প্রকারে তাহা নির্মাণ করিবে। জাহাজ দৈর্ঘ্যে তিন শত হাত, প্রস্থে পাঁচ শত হাত ও উচ্চতায় ত্রিশ হাত হইবে। আর তাহার ছাদের এক হাত নীচে বাতায়ন প্রস্তুত করিয়া রাখিবে ও জাহাজের পার্শ্বে দ্বার রাখিবে; তাহার প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা নির্মাণ করিবে। আর দেখ আকাশের নীচে প্রাণবায়ু বিশিষ্ট যত জীব-জন্তু আছে সকলকে বিনষ্ট করণার্থে আমি পৃথিবীর উপরে জল প্লাবন আনিব, পৃথিবীস্থ সকলে প্রাণ ত্যাগ করিবে। কিন্তু তোমার সহিত আমি নিজস্ব নিয়ম স্থির করিব; তুমি আপন পুত্রগণ, স্ত্রী ও পুত্রবধূদিগকে সংগে লইয়া সেই জাহাজে প্রবেশ করিবে। আর বংশবিশিষ্ট সমস্ত জীব-জন্তুর স্ত্রী-পুরুষ জোড়া জোড়া লইয়া তাহাদের প্রাণ রক্ষার্থে নিজের সহিত সেই জাহাজে প্রবেশ করাইবে। সর্ব জাতীয় পক্ষী ও সর্বজাতীয় পশু ও সর্ব জাতীয় ভূচর সরীসৃপ জোড়া জোড়া প্রাণ রক্ষার্থে তোমার নিকটে প্রবেশ করিবে। আর তোমার ও তাহাদের আহারার্থে তুমি সর্বপ্রকার খাদ্য সামগ্রী আনিয়া আপনার নিকটে সঞ্চয় করিবে। তাহাতে নোহ সেইরূপ করিলেন, ঈশ্বরের আজ্ঞানুসারেই সকল কর্ম করিলেন (Genesis 6: 1-22; বাংলা অনু. পবিত্র বাইবেল, আদিপুস্তক, পৃ. ৭-৮; ঈষৎ পরিবর্তনসহ)।
আর সদাপ্রভু নোহকে কহিলেন, তুমি সপরিবারে জাহাজে প্রবেশ কর, কেননা এই কালের লোকদের মধ্যে আমার সাক্ষাতে তোমাকেই ধার্মিক দেখিয়াছি। তুমি শুচি পশুর স্ত্রী-पुरुष লইয়া প্রত্যেক জাতির সাত সাত জোড়া এবং অশুচি পশুর স্ত্রী-পুরুষ লইয়া প্রত্যেক জাতির এক এক জোড়া এবং আকাশের পক্ষীদিগেরও স্ত্রী-पुरुष লইয়া প্রত্যেক জাতির সাত সাত জোড়া সমস্ত ভূমণ্ডলে তাহাদের বংশ রক্ষার্থে নিজের সঙ্গে রাখ। কেননা সাত দিনের পর আমি পৃথিবীতে চল্লিশ দিবা-রাত্র বৃষ্টি বর্ষাইয়া আমার সৃষ্টি যাবতীয় প্রাণীকে ভূমণ্ডল হইতে উচ্ছিন্ন করিব। তখন নোহ সদাপ্রভুর আজ্ঞানুসারেই সকল কর্ম করিলেন। নোহের ছয় শত বৎসর বয়সে পৃথিবীতে জল প্লাবন হইল, জল প্লাবন হইতে রক্ষা পাওয়ার জন্য নোহ ও তাহার পুত্রগণ এবং তাহার স্ত্রী ও পুত্রবধূগণ জাহাজে প্রবেশ করিলেন। নোহের প্রতি ঈশ্বরের আজ্ঞানুসারে শুচি অশুচি পশুর এবং পক্ষীর ও ভূমিতে গমনশীল যাবতীয় জীবের স্ত্রী-पुरुष জোড়া জোড়া জাহাজে নোহের নিকট প্রবেশ করিল। পরে সেই সাত দিন গত হইলে পৃথিবীতে জল প্লাবন হইল। নোহের বয়সের ছয় শত বৎসরের দ্বিতীয় মাসের সপ্তদশ দিনে মহা জলধির সমস্ত স্রোতধারা উথলিয়া উঠিল এবং আকাশের বাতায়ন সকল মুক্ত; তাহাতে পৃথিবীতে চল্লিশ দিবারাত্র মহাবৃষ্টি হইল। সেই দিন নোহ এবং শেম, হাম ও যেফৎ নামে নোহের পুত্রগণ এবং তাহাদের সহিত نোহের স্ত্রী ও তিন পুত্রবধূ জাহাজে প্রবেশ করিলেন। আর তাহাদের সহিত সর্ব জাতীয় বন্য পশু, সর্ব জাতীয় গ্রাম্য পশু, সর্ব জাতীয় ভূচর সরীসৃপ জীব ও সর্ব জাতীয় পক্ষী, সর্ব জাতীয় খেচর, প্রাণবায়ুবিশিষ্ট সর্ব প্রকার জীব-জন্তু জোড়া জোড়া জাহাজে নোহের নিকট প্রবেশ করিল। ফলত তাহার প্রতি ঈশ্বরের আজ্ঞানুসারে সমস্ত প্রাণীর স্ত্রী-পুরুষ প্রবেশ করিল। পরে সদাপ্রভু তাহার পশ্চাৎদ্বার বন্ধ করিলেন। আর চল্লিশ দিন পর্যন্ত পৃথিবীতে জল প্লাবন হইল, তাহাতে পানি বৃদ্ধি পাইয়া জাহাজ ভাসাইলে তাহা মৃত্তিকা ছাড়িয়া উঠিল। পরে পানি প্রবল হইয়া পৃথিবীতে অতিশয় বৃদ্ধি পাইল এবং জাহাজ পানির উপর ভাসিতে থাকিল। আর পৃথিবীতে পানি অত্যন্ত প্রবল হইল, আকাশ মণ্ডলের অধঃস্থিত সকল মহাপর্বত নিমগ্ন হইল। তাহার উপরে পনের হাত পানি উঠিয়া প্রবল হইল, পর্বত সকল নিমগ্ন হইল। তাহাতে ভূচর যাবতীয় প্রাণী-পক্ষী, গ্রাম্য ও বন্য পশু, ভূচর সরীসৃপ সকল এবং মনুষ্য সকল মরিল। এইরূপে ভূমণ্ডল নিবাসী সমস্ত প্রাণী-মনুষ্য, পশু সরীসৃপ জীব ও আকাশীয় পক্ষী সকল উচ্ছিন্ন হইল, কেবল নোহ ও তাহার সঙ্গী জাহাজস্থ প্রাণীরা বাঁচিলেন। আর পানি পৃথিবীর উপরে এক শত পঞ্চাশ দিন পর্যন্ত প্রবল থাকিল (Genesis, 7: 1-24; বাংলা অনু, পবিত্র বাইবেল, আদিপুস্তক পৃ. ৯)।
আর ঈশ্বর নোহকে ও জাহাজে স্থিত তাহার সঙ্গী পশ্বাদি যাবতীয় প্রাণীকে স্মরণ করিলেন, ঈশ্বর পৃথিবীতে বায়ু বহাইলেন, তাহাতে পানি থামিল। আর জলধির স্রোতধারা ও আকাশের বাতায়ন সকল বন্ধ এবং আকাশের মহাবৃষ্টি নিবৃত্ত হইল। আর পানি ক্রমশ ভূমির উপর হইতে সরিয়া গিয়া এক শত পঞ্চাশ দিনের শেষে হ্রাস পাইল। তাহাতে সপ্তম মাসে, সপ্তদশ দিনে অরারর্যের পর্বতের উপরে জাহাজ লাগিয়া রহিল। পরে দশম মাস পর্যন্ত পানি ক্রমশ সরিয়া হ্রাস পাইল। ঐ দশম মাসের প্রথম দিনে পর্বতগুলোর শৃঙ্গ দেখা গেল।
আর চল্লিশ দিন গত হইলে নোহ আপনার নির্মিত জাহাজের বাতায়ন খুলিয়া একটি দাঁড় কাক ছাড়িয়া দিলেন; তাহাতে সে উড়িয়া ভূমির উপরস্থ পানি শুষ্ক না হওয়া পর্যন্ত ইতস্ততঃ গতায়াত করিল। আর ভূমির উপরে পানি হ্রাস পাইয়াছে কি না তাহা জানিবার জন্য তিনি নিজের নিকট হইতে এক কপোত ছাড়িয়া দিলেন। তাহাতে সমস্ত পৃথিবী পানিতে আচ্ছাদিত থাকায় কপোত পদার্পণের স্থান পাইল না, তাই জাহাজে তাহার নিকটে ফিরিয়া আসিল। তখন তিনি হাত বাড়াইয়া উহাকে ধরিলেন এবং জাহাজের ভিতরে আপনার নিকট রাখিলেন। পরে তিনি আর সাত দিন বিলম্ব করিয়া জাহাজ হইতে সেই কপোত পুনর্বার ছাড়িয়া দিলেন এবং কপোতটি সন্ধ্যাকালে তাহার নিকট ফিরিয়া আসিল; তাহার চঞ্চুতে জিত বৃক্ষের একটি নবীন পত্র ছিল; উহাতে নোহ বুঝিলেন, ভূমির উপরে পানি হ্রাস পাইয়াছে। পরে তিনি আর সাত দিন বিলম্ব করিয়া সেই কপোত ছাড়িয়া দিলেন। তখন সে তাঁহার নিকটে আর ফিরিয়া আসিল না। [নোহের বয়সের] ছয় শত এক বৎসরের প্রথম মাসের প্রথম দিনে পৃথিবীর উপরে পানি শুষ্ক হইল; তাহাতে জাহাজের ছাদ খুলিয়া দৃষ্টিপাত করিলেন, ভূতল নির্জল। পরে দ্বিতীয় মাসের সাতাইশতম দিনে ভূমি শুষ্ক হইল (প্রাগুক্ত, ৪: ১-১৪, বাংলা আদিপুস্তক, পৃ. ৯-১০)।
নোহের সহিত কৃত ঈশ্বরের নিয়ম
পরে ঈশ্বর নোহকে কহিলেন, তুমি নিজ স্ত্রী, পুত্রগণ ও পুত্র-বধূগণকে সঙ্গে লইয়া জাহাজ হইতে বাহিরে যাও। আর তোমার সঙ্গী পশু, পক্ষী ও ভূচর সরীসৃপ প্রভৃতি মাংসময় যত জীব-জন্তু আছে, সেই সকলকে তোমার সঙ্গে বাহিরে আন, তাহারা পৃথিবীকে প্রাণীময় করুক এবং পৃথিবী প্রজাবন্ত ও বহু বংশ হউক। তখন নোহ নিজ পুত্রগণ এবং নিজ স্ত্রী ও পুত্র বধূগণকে সঙ্গে লইয়া বাহির হইলেন। আর স্ব-স্ব জাতি অনুসারে প্রত্যেক পশু, সরীসৃপ জীব ও পক্ষী, সমস্ত ভূচর প্রাণী জাহাজ হইতে বাহির হইল। পরে নোহ সদাপ্রভুর উদ্দেশ্যে যজ্ঞবেদি নির্মাণ করিলেন এবং সর্ব প্রকার শুচি পশুর ও সর্বপ্রকার শুচি পক্ষীর মধ্যে কতকগুলো লইয়া বেদির উপরে হোম করিলেন (Genesis, 8: 15-22; বাংলা অনু. পবিত্র বাইবেল, আদিপুস্তক, পৃ. ১০-১১)।
পরে ঈশ্বর নোহকে ও তাহার পুত্রগণকে এই আশীর্বাদ করিলেন, তোমরা প্রজাবন্ত ও বহু বংশ হও, পৃথিবী পরিপূর্ণ কর। পৃথিবীর যাবতীয় প্রাণী ও আকাশের যাবতীয় পক্ষী তোমাদের হইতে ভীত ও ত্রাসযুক্ত হইবে; সমস্ত ভূচর জীব ও সমুদ্রের সমস্ত মৎস্য শুদ্ধ, সে সকল তোমাদেরই হস্তে সমর্পিত। প্রত্যেক গমনশীল প্রাণী তোমাদের খাদ্য হইবে; আমি হরিৎ, ঔষধির ন্যায় সে সকল তোমাদিগকে দিলাম কিন্তু স্বপ্রাণ অর্থাৎ সরক্তমাংস ভোজন করিও না। আর তোমাদের রক্তপাত হইলে আমি তোমাদের প্রাণের পক্ষে তাহার পরিশোধ অবশ্যই লইব; সকল পশুর নিকটে তাহার পরিশোধ লইব এবং মনুষ্যের ভ্রাতা মনুষ্যের নিকটে আমি মনুষ্যের প্রাণের পরিশোধ লইব; যে কেহ মনুষ্যের রক্তপাত করিবে, মনুষ্য কর্তৃক তাহার রক্তপাত করা যাইবে; কেননা ঈশ্বর নিজ প্রতিমূর্তিতে মনুষ্যকে নির্মাণ করিয়াছেন। তোমরা প্রজাবন্ত হও ও বহু বংশ হও, পৃথিবীকে প্রাণীময় কর ও তন্মধ্যে বর্ধিষ্ণু হও।
পরে ঈশ্বর নোহকে ও তাহার সঙ্গী পুত্রগণকে কহিলেন, দেখ তোমাদের সহিত তোমাদের ভাবী বংশের সহিত ও তোমাদের সঙ্গী যাবতীয় প্রাণীর সহিত, পক্ষী এবং গ্রাম্য ও বন্য পশু, পৃথিবীস্থ যত প্রাণী জাহাজ হইতে বাহির হইয়াছে, তাহাদের সহিত আমি আমার নিয়ম স্থির করি। আমি তোমাদের সহিত আমার নিয়ম স্থির করি; জল প্লাবন দ্বারা সমস্ত প্রাণী আর উচ্ছিন্ন হইবে না এবং পৃথিবীর বিনাশার্থে জল প্লাবন আর হইবে না। ঈশ্বর আরও কহিলেন, আমি তোমাদের সহিত ও তোমাদের সঙ্গী যাবতীয় প্রাণীর সহিত চিরস্থায়ী পুরুষ-পরম্পরার জন্য যে নিয়ম স্থির করিলাম, তাহার চিহ্ন এই। আমি মেঘে আপন ধনু স্থাপন করি তাহাই পৃথিবীর সহিত আমার নিয়মের চিহ্ন হইবে। যখন আমি পৃথিবীর উর্দ্ধে মেঘের সঞ্চার করিব, তখন সেই ধনু মেঘে দৃষ্ট হইবে। তাহাতে তোমাদের সহিত ও মাংসময় সমস্ত প্রাণীর সহিত আমার যে নিয়ম আছে তাহারা আমার স্মরণ হইবে এবং সকল প্রাণীর বিনাশার্থ জল প্লাবন আর হইবে না। আর মেঘ ধনুক হইলে আমি তাহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিব; তাহাতে মাংসময় যত প্রাণী পৃথিবীতে আছে, তাহাদের সহিত ঈশ্বরের যে চিরস্থায়ী নিয়ম তাহা আমি স্মরণ করিব। ঈশ্বর নোহকে কহিলেন, পৃথিবীস্থ সমস্ত প্রাণীর সহিত আমার স্থাপিত নিয়মের এই চিহ্ন হইবে।
নোহের তিন পুত্রের বিবরণ
নোহের যে পুত্রেরা জাহাজ হইতে বাহির হইলেন, তাহাদের নাম শেম, হাম ও যেফৎ; সেই হাম কনানের পিতা। এই তিনজন নোহের পুত্র; ইহাদেরই বংশ সমস্ত পৃথিবীতে ব্যাপ্ত হইল। জল প্লাবনের পরে নোহ তিন শত পঞ্চাশ বৎসর জীবিত থাকিলেন। সবশুদ্ধ নোহের নয় শত পঞ্চাশ বৎসর বয়স হইলে তাহার মৃত্যু হইল (Genesis, 9: 1-29; বাংলা অনু. পবিত্র বাইবেল, আদিপুস্তক, পৃ. ১১-১২)।
📄 হযরত নূহ (আ)-এর সম্প্রদায়
ইন জুবায়র (মৃ. ১২১৭ খৃ.) প্রমুখের বর্ণনামতে নূহ (আ)-এর সম্প্রদায়কে বানু রাসিব বলা হইত (ইব্ন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১০১)। প্রবীণ ঐতিহাসিক ইমাম আছ-ছা'আলাবী (মৃ. ৪২৭/১০৩৫ সন) তাঁহার আরাইসুল-মাজালিস গ্রন্থে ইহাদের পূর্বপুরুষের বিস্তারিত পরিচয় তুলিয়া ধরিয়াছেন। তবে উহা গারীব (বিরল বর্ণনা)-এর পর্যায়ভুক্ত বলিয়া মনে হয়। কারণ নির্ভরযোগ্য ইতিহাস গ্রন্থসমূহে উক্ত বিবরণ পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, নূহ (আ)-এর সম্প্রদায় ছিল কাবীল-এর বংশধর এবং শীছ (আ)-এর বংশধরের মধ্যে যাহারা উহাদের আনুগত্য করিয়াছিল তাহারা। প্রকৃতপক্ষে শীছ (আ)-এর বংশের লোকের সহিত কাবীলের বংশের রক্ত মিলিত হইয়া যে সম্প্রদায়ের জন্ম হয় তাহারাই ছিল নূহ (আ)-এর সম্প্রদায়। ইব্ন আব্বাস (রা) এই ইতিহাস বর্ণনা করিতে গিয়া বলেন, হযরত আদম (আ)-এর বংশের দুইটি ধারা ছিল, যাহার একটি সমতল ভূমিতে বসবাস করিত এবং অপরটি পর্বতে। পর্বতের পুরুষগণ ছিল সুশ্রী ও সুদর্শন আর মহিলাগণ কুৎসিত। অপরপক্ষে সমতল ভূমির মহিলাগণ ছিল সুন্দরী ও রূপসী আর পুরুষগণ কুশ্রী। ইবলীস একদিন এক গোলামের আকৃতি ধারণ করিয়া সমতল ভূমির এক ব্যক্তির নিকট আসিল, অতঃপর তাহার নিকট মজুরী খাটিবার বন্দোবস্ত করিল। সে তাহার সেবা করিত। ইবলীস একদিন রাখালদের বাঁশির ন্যায় একটি বাঁশি বানাইল। উহা হইতে এমন এক আওয়াজ বাহির হইতে লাগিল যাহা লোকে ইতোপূর্বে আর কখনও শোনে নাই। উক্ত আওয়াজ পার্শ্ববর্তী লোকজনের কানে পৌঁছিলে তাহারা উহা শুনিবার জন্য তাহার নিকট আসিল, অতঃপর তাহারা উহাকে উৎসবরূপে গ্রহণ করিল। সেখানে বৎসরে একবার তাহারা জড়ো হইত এবং নারী-পুরুষ খোলামেলাভাবে মিলিত হইত। পর্বতে বসবাসকারী এক ব্যক্তি অকস্মাৎ তাহাদের উৎসবের দিনে তাহাদের নিকট আসিয়া পড়িল এবং মহিলা ও তাহাদের সৌন্দর্য দর্শন করিল, অতঃপর ফিরিয়া আসিয়া সাথি-সঙ্গীদিগকে অবহিত করিল। অতঃপর তাহারা ইহাদের নিকট চলিয়া আসিল এবং ইহাদের সহিত একত্রে অবস্থান করিতে লাগিল। এইভাবে তাহাদের মধ্যে অশ্লীলতা ও অপকর্ম ছড়াইয়া পড়িল। ইহাই আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন : وَلَا تَبَرِّجْنَ تَبَرُّجَ الجاهلية الأولى (৩৩:৩৩) “আর প্রাচীন যুগের মত নিজদিগকে প্রদর্শন করিয়া বেড়াইবে না।”
ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, আদম (আ) ওসীয়ত করিয়াছিলেন যে, শীছ-এর বংশধর কাবীল-এর বংশধরকে যেন বিবাহ না করে। শীছ (আ)-এর বংশধর ইহা খুবই গুরুত্বের সহিত পালন করিত, এমনকি তাহারা নিজদের বাসস্থানে পাহারাদার নিযুক্ত করিয়াছিল যাহাতে কাবীলের বংশধরদের কেহ তাহাদের নিকটেও না আসিতে পারে। একদা শীছ (আ)-এর বংশধরের এক শত লোক বলিল, দেখি না আমাদের চাচার বংশধরেরা কি করিতেছে। এই বলিয়া সেই এক শত পুরুষ সমতল ভূমির সুন্দরী মহিলাদের নিকট নামিয়া আসিল। অতঃপর সেখানকার মহিলারা তাহাদিগকে বরণ করিয়া লইল। বেশ কিছু দিন এইভাবে অতিবাহিত হইয়া গেল। অতঃপর আর এক শতজন বলিল, দেখি না আমাদের ভ্রাতাগণ সেখানে কী করিতেছে। এই বলিয়া তাহারা পর্বত হইতে তাহাদের নিকট নামিয়া আসিল। তাহাদিগকেও মহিলারা বরণ করিয়া লইল। অতঃপর শীছ-এর বংশধর সকলেই নামিয়া আসিল। এইভাবে তাহারা পাপাচারে লিপ্ত হইল এবং পরস্পরে বিবাহ-শাদী করিল। পরস্পরে মিলিয়া-মিশিয়া তাহারা একাকার হইয়া গেল। এইরূপে কাবীলের বংশধর বৃদ্ধি পাইয়া পৃথিবী ভরিয়া তুলিল এবং তাহারা নানারূপ পাপাচার শুরু করিয়া পৃথিবী ভরিয়া দিল (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৫৬)। কোনও কোনও ঐতিহাসিকের বর্ণনামতে কাবীলের বংশধর এতদূর পাপাচারী হইয়াছিল যে, তাহারা 'অগ্নিপূজা' করিত। কিন্তু ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত বুখারীর হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, হযরত আদম (আ) হইতে নূহ (আ) পর্যন্ত সময়কালের সকলেই ইসলাম ও হক-এর উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাই কাবীলের বংশধর মুশরিক হওয়ার বর্ণনা সঠিক বলিয়া মানিয়া লওয়া যায় না (ইব্ন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১০১)। হইতে পারে তাহারা শিরক ব্যতীত অন্যান্য পাপাচার করিত এবং নূহ (আ)-এর সময়ে আসিয়া তাহারা ওয়াদ্দ, সুওয়া, য়াগুছ, য়াউক ও নাসর নামীয় মূর্তিসমূহের পূজা করিত। তাহার সম্প্রদায় শিরক তথা মূর্তিপূজা শুরু করিয়া দেয়। পৃথিবীর বুকে ইহাই ছিল সর্বপ্রথম মূর্তিপূজা। ইহার সূচনা সম্পর্কে ইমাম বুখারী (র) ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে হাদীছ রিওয়ায়াত করিয়াছেন যে, ওয়াদ্দ, সুওয়া, য়াগুছ, য়াউক ও নাসর ছিল নূহ সম্প্রদায়ের সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিবর্গের নাম। তাহারা ইনতিকাল করিলে শয়তান তাহাদের পরামর্শ দিল যে, তাহারা যে সকল স্থানে উপবেশন করিত সেখানে তাহাদের প্রতিকৃতি স্থাপন কর এবং সেগুলোকে উহাদের নামেই নামকরণ কর। তাহারা এইরূপ করিল। কিন্তু তখন উহাদের উপাসনা করা হইত না। অতঃপর এই সকল লোক যখন ইনতিকাল করিল এবং এই প্রতিকৃতি স্থাপনের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞাত লোক পৃথিবী হইতে বিদায় লইয়া গেল তখন তাহাদের উপাসনা করা শুরু হইয়া গেল। ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, নূহ সম্প্রদায়ের এই মূর্তিপূজা পরবর্তীতে সমগ্র আরব জাহানে বিস্তার লাভ করে (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, ২৩ খ., ৭৩২)। ইকরিমা, দাহহাক, কাতাদা, ইবন ইসহাক প্রমুখও এইরূপ বর্ণনা করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১খ., ১০৫)। এই বিষয়টিই মুসলিম ঐতিহাসিকগণ আরও বিস্তারিত ও বিশদভাবে বর্ণনা করিয়াছেন যে, ইহাদের মধ্যে ওয়াদ্দ ছিলেন বয়ঃজ্যেষ্ঠ এবং বেশি নেককার ও জনপ্রিয়। তিনি ছিলেন বাবিল নিবাসী। তাহার ইনতিকালে লোকজন খুবই মর্মাহত ও শোকাভিভূত হইয়া পড়িল। তাহারা তাহার কবরের পাশে ঘুরিয়া ঘুরিয়া হা-হুতাশ করিতে লাগিল।
ইবলীস তাহাদের এই মাতম ও হা-হুতাশ দেখিয়া একজন মানুষের আকৃতিতে আসিয়া বলিল, এই ব্যক্তির প্রতি আমি তোমাদের আক্ষেপ ও হা-হুতাশ দেখিতেছি। আমি কি তোমাদিগকে এই ব্যক্তির একটি প্রতিকৃতি বানাইয়া দিব, যাহা তোমরা তোমাদের মজলিসে রাখিয়া উহার মাধ্যমে তাহাকে স্মরণ করিবে? তাহারা বলিল, হাঁ। অতঃপর ইবলীস তাহাদের জন্য তাহার অনুরূপ একটি প্রতিকৃতি বানাইয়া দিল। তাহারা উহা তাহাদের মজলিসে রাখিয়া দিল এবং উহার মাধ্যমে তাহাকে স্মরণ করিতে লাগিল। উহার প্রতি তাহাদের স্মরণের এইরূপ অবস্থা দেখিয়া ইবলীস বলিল, আরও ভালমত স্মরণ করিবার সুবিধার্থে তোমাদের প্রত্যেকের ঘরে রাখিবার জন্য আমি কি ইহার অনুরূপ একটি করিয়া মূর্তি তৈয়ার করিয়া দিব? তাহারা বলিল, হাঁ। অতঃপর সে প্রত্যেকের ঘরে অনুরূপ একটি করিয়া মূর্তি বানাইয়া দিল এবং তাহারাও যথারীতি উহার মাধ্যমে তাহাকে স্মরণ করিতে লাগিল। তাহাদের সন্তানগণ তাহাদের এইরূপ কর্ম দেখিতে লাগিল। এমনিভাবে তাহাদের নূতন নূতন বংশধর আসিতে লাগিল এবং উহাকে স্মরণের উক্ত পদ্ধতিও পরিবর্তিত হইতে লাগিল। এক সময় ইবলীস তাহাদিগকে বুঝাইল যে, পূর্ববর্তিগণ তো ইহারই উপাসনা করিত এবং ইহারই নিকট বৃষ্টি প্রার্থনা করিত। ইহা শুনিয়া তাহারা ইহাকেই উপাস্য বানাইয়া ফেলিল এবং আল্লাহকে ছাড়িয়া ইহারই ইবাদত করিতে লাগিল। তাই আল্লাহ ব্যতীত সর্বপ্রথম যাহার ইবাদত করা হয় তাহা হইল এই ওয়াদুদ-এর মূর্তি, যাহাকে তাহারা ওয়াদ্দ নামেই আখ্যায়িত করিয়াছিল (ইব্ন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১০৫-১০৬; আল-আলুসী, রূহুল-মা'আনী, ২৯ খ., ৭৭)। উল্লিখিত অন্যান্য মূর্তিগুলোরও তাহারা একই পন্থায় ইবাদত করিতে শুরু করে। এই কথাই একটি হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে যে, উম্মুল মুমিনীন উম্মু সালামা ও উম্মু হাবীবা (রা) যখন তাঁহাদের হাবশায় দেখা মারিয়া নামক গির্জার সৌন্দর্য ও উহার অভ্যন্তরে রক্ষিত মূর্তিগুলোর কথা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উল্লেখ করিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ঐ সকল জাতির মধ্যকার কোনও নেককার লোক ইনতিকাল করিলে তাহারা তাহার কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করিত, অতঃপর উহাতে এই সকল মূর্তি স্থাপন করিত। আল্লাহ্র নিকট উহারাই হইল সর্বনিকৃষ্ট সৃষ্টি (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১০৬; আল-বুখারী, ১খ., ১৭৯; মুসলিম, আস-সাহীহ, ১খ., ২০১)।
মোটকথা, নূহ (আ)-এর সময়ে আসিয়া তাঁহার সম্প্রদায় সর্বপ্রকারের পাপাচার শুরু করিয়া দেয়। তাই কেহ কেহ বলিয়াছেন, নূহ সম্প্রদায় আল্লাহ্র অপছন্দনীয় ও অসন্তুষ্টিমূলক কাজ, যথা অশ্লীল কাজে লিপ্ত হওয়া, মদ্য পান করা, আল্লাহর ইবাদত পরিত্যাগ করিয়া খেল-তামাশায় মত্ত হওয়া প্রভৃতিতে সকলেই ঐক্যবদ্ধ ছিল (ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ., ৫৪)।
📄 নবুওয়াত প্রাপ্তি
উক্ত সম্প্রদায় যখন এইরূপে বিভিন্ন ধরনের পাপাচারে লিপ্ত হইল, বিভিন্ন মূর্তির পূজা করিতে শুরু করিল এবং তাহাদের মধ্যে গোমরাহী ও কুফরী ব্যাপকভাবে ছড়াইয়া পড়িল, তখন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের প্রতি দয়াপরবশ হইয়া তাহাদের হিদায়াতের জন্য হযরত নূহ (আ)-কে নবী ও রাসূলরূপে প্রেরণ করেন। তিনি হযরত ইদরীস (আ)-এর পরবর্তী নবী এবং পৃথিবীর প্রথম রাসূল। যেমন বুখারী ও মুসলিম-এর হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত শাফায়াতের হাদীছে উল্লেখ করা হইয়াছে (দ্র. মুসলিম, আস-সাহীহ, ১খ., ১০৮; আল-বুখারী, আস-সাহীহ, ১খ., ৪৭০)।
নবুওয়াত প্রাপ্তির সময় নূহ (আ)-এর বয়স কত ছিল এই ব্যাপারে মতভেদ রহিয়াছে। আল্লামা আলুসী তাঁহার তাফসীর গ্রন্থ রূহুল মা'আনীতে ইব্ন আব্বাস (রা)-এর একটি মত উদ্ধৃত করিয়াছেন যে, তখন নূহ (আ)-এর বয়স ছিল ৪০ বৎসর (দ্র. রূহুল মা'আনী, ১২খ., ৩৫)। ইমাম ইবন জারীর তাবারী ইব্ন আব্বাস (রা)-এর মতে ৪৮০ বৎসর বয়সে নূহ (আ) নবৃওয়াত প্রাপ্ত হন বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (আত-তাবারী, তারীখ, ১খ., ৯০)। মুকাতিল-এর বর্ণনামতে ১০০ বৎসর, এতদ্ব্যতীত ৫০, ২৫০, ৩৫০ বৎসর বলিয়াও মতামত পাওয়া যায় (দ্র. আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৫৬; ইব্ন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১০১; ইবন সা'দ, তাবাকাত, ১খ., ৪০; আল-আলুসী, রূহুল মা'আনী, ৮খ., ১৪৯, ১২খ., ৩৫-৩৬)।