📄 কুরআন কারীমে হযরত নূহ (আ)
আল-কুরআনুল করীমের বিরাট একটি অংশ হযরত নূহ (আ)-এর আলোচনায় পূর্ণ। তাঁহার দাওয়াত ও তাবলীগ, কওমের নাফরমানী, নৌযান তৈরী, মহাপ্লাবন, কাফিরদের ধ্বংস এবং নূহ (আ) ও তাঁহার অনুসারীদের রক্ষা পাওয়া প্রভৃতি বিষয়ে বহু স্থানে আলোচনা করা হইয়াছে। একটি পূর্ণ সূরাতেই তাঁহার আলোচনা করা হইয়াছে যাহার নামকরণ করা হইয়াছে নূহ (আ)-এর নামে (দ্র. ২৯ পারা ৭১ নং সূরা)। কুরআন করীমের ৪৩ স্থানে তাঁহার নাম উল্লেখ করা হইয়াছে। তন্মধ্যে সূরা আ'রাফ, সূরা হুদ, সূরা আল-মু'মিনূন, সূরা আশ-শু'আরা, সূরা আল-কামার ও সূরা নূহ-এ বিস্তারিত আলোচনা করা হইয়াছে। কুরআন করীমের যেসকল সূরা ও আয়াতে তাঁহার বর্ণনা আসিয়াছে উহার একটি ছক নিম্নরূপঃ
সূরা নং | সূরার নাম | আয়াত নং
৩ | আল-ইমরান | ৩৩-৩৪
৪ | আন-নিসা | ১৬৩
৬ | আল-আন'আম | ৮৪
৭ | আল-আ'রাফ | ৫৯-৬৪, ৬৯
৯ | আত-তাওবা | ৭০
১০ | ইউনুস | ৭১
১১ | হুদ | ২৫-৩৪, ৩৬-৪৮, ৮৯
১৪ | ইবরাহীম | ৯
১৭ | বনী ইসরাঈল | ৩, ১৭
১৯ | মারয়াম | ৫৮
২১ | আল-আম্বিয়া | ৭৬-৭৭
২২ | আল-হাজ্জ | ৪২
২৩ | আল-মু'মিনূন | ২৩-২৪
২৫ | আল-ফুরকান | ৩৭
২৬ | আশ-শু'আরা | ১০৫, ১০৬, ১১৬
২৯ | আল-'আনকাবূত | ১৪-১৫
৩৩ | আল-আহযাব | ৭
৩৭ | আস-সাফ্ফাত | ৭৫-৮৩
৩৮ | সাদ | ১২
৪০ | আল-মু'মিন | ৫, ৩১
৪২ | আশ-শূরা | ১৩
৫০ | কাফ | ১২-১৪
৫১ | আয-যারিয়াত | ৪৬
৫২ | আন-নাজম | ৫২
৫৪ | আল-কামার | ৯-১৬
৫৭ | আল-হাদীদ | ২৬
৬৬ | আত-তাহরীম | ১০
৭১ | নূহ | ১-২৮
(সংশোধনীসহ হিফজুর রহমান সিউহারবী, করাচী, ১৯৬৫, ১খ., ৩১)। তবে সূরা আ'রাফ, হুদ, মু'মিনূন, শু'আরা, কামার ও নূহ এই ৬টি সূরাতে নূহ (আ) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হইয়াছে। সূরার ধারাবাহিকতানুযায়ী তাঁহার আলোচনা নিম্নরূপ:
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعَالَمِينَ . ذُرِّيَّةً بَعْضُهَا مِنْ بَعْضٍ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ. (৩:৩৩-৩৪)
“নিশ্চয় আল্লাহ্ আদমকে, নূহকে ও ইবরাহীমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরকে বিশ্বজগতে মনোনীত করিয়াছেন। ইহারা একে অপরের বংশধর। আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ” (৩: ৩৩-৩৪)।
اِنَّ اللّٰهَ اصْطَفٰى اٰدَمَ وَّ نُوْحًا وَّاٰلَ اِبْرٰهِيْمَ وَ اٰلَ عِمْرٰنَ عَلَى الْعٰلَمِيْنَ
“আমি তো তোমার নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছি যেমন নূহ ও তাহার পরবর্তী নবীগণের নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছিলাম” (৪: ১৬৩)।
اِنَّآ اَوْحَيْنَا اِلَيْكَ كَمَا اَوْحَيْنَا اِلٰى نُوْحٍ وَّالنَّبِيّٖنَ مِنْ بَعْدِهٖ ۚ
وَوَهَبْنَا لَهٗ اِسْحٰقَ وَيَعْقُوْبَ كُلًّا هَدَيْنَا ۚ وَنُوْحًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهٖ دَاوٗدَ وَسُلَيْمٰنَ وَاَيُّوْبَ وَيُوْسُفَ وَمُوْسٰى وَهٰرُوْنَ ۚ وَكَذٰلِكَ نَجْزِى الْمُحْسِنِيْنَۙ
“পূর্বে নূহকেও সপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম এবং তাহার বংশধর দাউদ, সুলায়মান, আইয়ুব, ইউসুফ, মুসা ও হারুনকেও। আর এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদিগকে পুরস্কৃত করি” (৬:৮৪)।
وَلَقَدْ اَرْسَلْنَا نُوْحًا اِلٰى قَوْمِهٖ فَقَالَ يٰقَوْمِ اعْبُدُوا اللّٰهَ مَا لَكُمْ مِّنْ اِلٰهٍ غَيْرُهٗ ۚ اِنِّىْ اَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيْمٍ قَالَ الْمَلَاُ مِنْ قَوْمِهٖ اِنَّا لَنَرٰكَ فِيْ ضَلٰلٍ مُّبِيْنٍ قَالَ يٰقَوْمِ لَيْسَ بِيْ ضَلٰلَةٌ وَّلٰكِنِّىْ رَسُوْلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعٰلَمِيْنَ اُبَلِّغُكُمْ رِسٰلٰتِ رَبِّيْ وَاَنْصَحُ لَكُمْ وَاَعْلَمُ مِنَ اللّٰهِ مَا لَا تَعْلَمُوْنَ اَوَعَجِبْتُمْ اَنْ جَاۗءَكُمْ ذِكْرٌ مِّنْ رَّبِّكُمْ عَلٰى رَجُلٍ مِّنْكُمْ لِيُنْذِرَكُمْ وَلِتَتَّقُوْا وَلَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ فَكَذَّبُوْهُ فَاَنْجَيْنٰهُ وَالَّذِيْنَ مَعَهٗ فِى الْفُلْكِ وَاَغْرَقْنَا الَّذِيْنَ كَذَّبُوْا بِاٰيٰتِنَا ۗ اِنَّهُمْ كَانُوْا قَوْمًا عَمِيْنَ۠ (৭:৫৯-৬৪)
আমি তো নূহকে পাঠাইয়াছিলাম তাহার সম্প্রদায়ের নিকট এবং সে বলিয়াছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ্র ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ্ নাই। আমি তোমাদের জন্য মহাদিনের শাস্তির আশংকা করিতেছি। তাহার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ বলিয়াছিল, আমরা তো তোমাকে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখিতেছি। সে বলিয়াছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আমাতে কোন ভ্রান্তি নাই, বরং আমি তো জগতসমূহের প্রতিপালকের রাসূল। আমার প্রতিপালকের বাণী আমি তোমাদের নিকট পৌঁছাইতেছি ও তোমাদিগকে হিতোপদেশ দিতেছি এবং তোমরা যাহা জান না আমি তাহা আল্লাহ্র নিকট হইতে জানি। তোমরা কি বিস্মিত হইতেছ যে, তোমাদেরই একজনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে তোমাদের নিকট উপদেশ আসিয়াছে যাহাতে সে তোমাদিগকে সতর্ক করে? তোমরা সাবধান হও এবং তোমরা অনুগ্রহ লাভ কর। অতঃপর তাহারা তাহাকে মিথ্যাবাদী বলে। তাহাকে ও তাহার সঙ্গে যাহারা তরণীতে ছিল আমি তাহাদিগকে উদ্ধার করি এবং যাহারা আমার নিদর্শন অস্বীকার করিয়াছিল তাহাদিগকে নিমজ্জিত করি। তাহারা তো ছিল এক অন্ধ সম্প্রদায়” (৭:৫৯-৬৪)।
وَاذْكُرُوْٓا اِذْ جَعَلَكُمْ خُلَفَاۗءَ مِنْ بَعْدِ قَوْمِ نُّوْحٍ وَّزَادَكُمْ فِى الْخَلْقِ بَسْطَةً ۖ
“এবং স্মরণ কর, আল্লাহ্ তোমাদিগকে নূহের সম্প্রদায়ের পরে তাহাদের স্থলাভিষিক্ত করিয়াছেন এবং তোমাদের দৈহিক গঠনে অধিকতর হৃষ্টপুষ্ট বলিষ্ঠ করিয়াছেন” (৭:৬৯)।
الَمْ يَأْتِهِمْ نَبَأُ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ قَوْمٍ نُوْحٍ وَعَادٍ وَثَمُودَ وَقَوْمِ إِبْرَاهِيْمَ وَأَصْحَابِ مَدْيَنَ وَالْمُؤْتَفِكَاتِ أَتَتْهُمْ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَتِ فَمَا كَانَ اللهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ . (۹:٧٠)
"উহাদের পূর্ববর্তী নূহ, আদ ও ছামূদের সম্প্রদায়, ইবরাহীমের সম্প্রদায় এবং মাদয়ান ও বিধ্বস্ত নগরের অধিবাসিগণের সংবাদ কি উহাদের নিকট আসে নাই? উহাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনসহ উহাদের রাসূলগণ আসিয়াছিল। আল্লাহ এমন নহেন যে, তাহাদের উপর জুলুম করেন, কিন্তু উহারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করে" (৯ : ৭০)।
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَا نُوْحٍ إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ إِنْ كَانَ كَبُرَ عَلَيْكُمْ مَقَامِي وَتَذْكِيرِي بِأَيْتِ اللَّهِ فَعَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْتُ فَاجْمِعُوا أَمْرَكُمْ وَشُرَكَاءَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُنْ أَمْرُكُمْ عَلَيْكُمْ غُمَّةٌ ثُمَّ اقْضُوا إِلَى وَلَا تُنْظِرُونَ (۱۰:۷۱)
"উহাদিগকে নূহ-এর বৃত্তান্ত শোনাও। সে তাহার সম্প্রদায়কে বলিয়াছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আমার অবস্থিতি ও আল্লাহ্ নিদর্শন দ্বারা আমার উপদেশ দান তোমাদের নিকট যদি দুঃসহ হয় তবে আমি তো আল্লাহর উপর নির্ভর করি। তোমরা যাহাদিগকে শরীক করিয়াছ তৎসহ তোমাদের কর্তব্য স্থির করিয়া লও, পরে যেন কর্তব্য বিষয়ে তোমাদের কোন সংশয় না থাকে। আমার সম্বন্ধে তোমাদের কর্ম নিষ্পন্ন করিয়া ফেল এবং আমাকে অবকাশ দিও না" (১০ : ৭১)।
فَإِنْ تَوَلَّيْتُمْ فَمَا سَأَلْتُكُمْ مِنْ أَجْرِ إِنْ أَجْرِيَ إِلا عَلَى اللهِ وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ. فَكَذَّبُوْهُ فَنَجَّيْنَهُ وَمَنْ مَّعَهُ فِي الْفُلْكِ وَأَغْرَقْنَا الَّذِينَ كَذَّبُوا بِأَيْتِنَا فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُنْذِرِينَ (۷۳-۱۰:۷۲)
"অতঃপর তোমরা মুখ ফিরাইয়া লইলে লইতে পার, তোমাদের নিকট আমি তো কোন পারিশ্রমিক চাহি নাই, আমার পারিশ্রমিক আছে আল্লাহ্র নিকট। আমি তো আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হইতে আদিষ্ট হইয়াছি। আর উহারা তাহাকে মিথ্যাবাদী বলে; অতঃপর তাহাকে স্থলাভিষিক্ত করি আর যাহারা আর নিদর্শন প্রত্যাখ্যান করিয়াছিল তাহাদিগকে নিমজ্জিত করি। সুতরাং দেখ, যাহাদিগকে সতর্ক করা হইয়াছিল তাহাদের পরিণাম কী হইয়াছিল” (১০ : ৭২-৭৩)।
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوْحًا إِلَى قَوْمِهِ إِنِّي لَكُمْ نَذِيرٌ مُّبِينٌ . أَنْ لَا تَعْبُدُوا إِلا اللَّهَ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ الیم . فَقَالَ الْمَلَأُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَوْمِهِ مَا نَرَاكَ إِلا بَشَرًا مِّثْلَنَا وَمَا نَرَاكَ اتَّبَعَكَ إِلا الَّذِينَ هُمْ أَرَاذِلْنَا بَادِيَ الرأي وَمَا نَرَى لَكُمْ عَلَيْنَا مِنْ فَضْلٍ بَلْ نَظُنُّكُمْ كَذِبِينَ . قَالَ يُقَوْمِ أَرَتَيْتُمْ إِنْ كُنْتُ عَلَى بَيِّنَةٍ مِّنْ رَّبِّي وَأَتْنِي رَحْمَةً مِّنْ عِنْدِهِ فَعُمِّيَتْ عَلَيْكُمْ أَنُلْزِمُكُمُوْهَا وَأَنْتُمْ لَهَا كَارِهُوْنَ . وَيَا قَوْمِ لَا أَسْتَلُكُمْ عَلَيْهِ مَالًا إِنْ أَجْرِيَ إِلا عَلَى اللهِ وَمَا أَنَا بِطَارِدِ الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّهُمْ مُلْقُوا رَبِّهِمْ وَلَكِنِّى أَرَاكُمْ قَوْمًا تَجْهَلُونَ وَيُقَوْمٍ مَنْ يَنْصُرُنِي مِنَ الله إِنْ طَرَدْتُهُمْ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ ، وَلَا أَقُولُ لَكُمْ عِنْدِي خَزَائِنُ اللهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَا أَقُولُ إِنِّي مَلَكٌ وَلَا أَقُولُ لِلَّذِينَ تَزْدَرِي أَعْيُنُكُمْ لَنْ يُؤْتِيَهُمُ اللهُ خَيْرًا اللهُ أَعْلَمُ بِمَا فِي أَنْفُسِهِمْ إِنِّي إِذًا لَمِنَ الظَّلِمِينَ ، قَالُوا يَا نُوحُ قَدْ جُدَلْتَنَا فَاكْثَرْتَ جِدَالَنَا فَأْتِنَا بِمَا تَعِدُنَا إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّدِقِينَ . قَالَ إِنَّمَا يَأْتِيْكُمْ بِهِ اللَّهُ إِنْ شَاءَ وَمَا أَنْتُمْ بِمُعْجِزِينَ. وَلَا يَنْفَعُكُمْ نُصْحِي إِنْ أَرَدْتُ أَنْ أَنْصَحَ لَكُمْ إِنْ كَانَ اللهُ يُرِيدُ أَنْ يُغْوِيَكُمْ هُوَ رَبُّكُمْ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ . أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَهُ قُلْ إِنِ افْتَرَيْتُهُ فَعَلَى إِجْرَامِي وَأَنَا بَرِيءٌ مِّمَّا تُجْرِمُونَ . وَأُوحِيَ إِلَى نُوحٍ أَنَّهُ لَنْ يُؤْمِنَ مِنْ قَوْمِكَ إِلَّا مَنْ قَدْ أَمَنَ فَلَا تَبْتَئِسْ بِمَا كَانُوا يَفْعَلُوْنَ . وَاصْنَعِ الْفُلْكَ بِأَعْيُنِنَا وَوَحْيِنَا وَلَا تُخَاطِبْنِي فِي الَّذِينَ ظَلَمُوا أَنَّهُمْ مُغْرَقُونَ . وَيَصْنَعُ الْفُلْكَ وَكُلَّمَا مَرَّ عَلَيْهِ مَلَاً مِّنْ قَوْمِهِ سَخَرُوا مِنْهُ قَالَ إِنْ تَسْخَرُوا مِنَّا فَإِنَّا نَسْخَرُ مِنْكُمْ كَمَا تَسْخَرُونَ . فَسَوْفَ تَعْلَمُونَ مَنْ يَأْتِيْهِ عَذَابٌ يُخْزِيهِ وَيَحِلُّ عَلَيْهِ عَذَابٌ مُّقِيمٌ. حَتَّى إِذَا جَاءَ أَمْرُنَا وَفَارَ التَّنُّورُ قُلْنَا احْمِلْ فِيهَا مِنْ كُلُّ زَوْجَيْنِ اثْنَيْنِ وَأَهْلَكَ الأَ مَنْ سَبَقَ عَلَيْهِ الْقَوْلُ وَمَنْ أَمَنْ وَمَا أَمَنَ مَعَهُ إِلَّا قَلِيلٌ ، وَقَالَ ارْكَبُوا فِيهَا بِسْمِ اللهِ مَجْرِهَا وَمُرْسُهَا إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ. وَهِيَ تَجْرِي بِهِمْ فِي مَوْجٌ كَالْجِبَالِ وَنَادَى نُوحٌ ابْنَهُ وَكَانَ فِي مَعْزِلٍ يُبْنَى ارْكَبْ مَعَنَا وَلَا تَكُنْ مَعَ الْكَفِرِينَ . قَالَ سَاوِى إِلَى جَبَلٍ يَعْصِمُنِي مِنَ الْمَاءِ قَالَ لَا عَاصِمَ الْيَوْمَ مِنْ أَمْرِ اللهِ إِلا مَنْ رَّحِمَ وَحَالَ بَيْنَهُمَا الْمَوْجُ فَكَانَ مِنَ الْمُغْرَقِينَ، وَقِيلَ يَا أَرْضُ ابْلَعِي مَاءَكِ وَيَا سَمَاءُ أَقْلِعِي وَغِيضَ الْمَاءُ وَقُضِيَ الْأَمْرُ وَاسْتَوَتْ عَلَى الْجُودِي وَقِيلَ بُعْداً لِلْقَوْمِ الظَّلِمِينَ. وَنَادَى نُوحٌ رَبَّهُ فَقَالَ رَبِّ إِنَّ ابْنِي مِنْ أَهْلِي وَإِنَّ وَعْدَكَ الْحَقُّ وَأَنْتَ أَحْكَمُ الْحَكِمِينَ ، قَالَ يُنُوحُ إِنَّهُ لَيْسَ مِنْ أَهْلِكَ إِنَّهُ عَمَلٌ غَيْرُ صَالِحٍ فَلَا تَسْتَلْنِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنِّي أَعِظُكَ أَنْ تَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ . قَالَ رَبِّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَسْتَلْكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُنْ مِّنَ الْخَسِرِينَ ، قِيلَ يُنُوحُ اهْبِطَ بِسَلَام مِّنَّا وَبَرَكَت عَلَيْكَ وَعَلَى أُمَمٍ مِّمَّنْ مَّعَكَ وَأُمَمٌ سَنُمَتْعُهُمْ ثُمَّ يَمَسُّهُمْ مِنَّا عَذَابٌ اليم. (٤٨ - ١١:٢٥)
"আমি তো নূহকে তাহার সম্প্রদায়ের নিকট পাঠাইয়াছিলাম। সে বলিয়াছিল, আমি অবশ্যই তোমাদের জন্য প্রকাশ্য সতর্ককারী, যেন তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অপর কিছুর ইবাদত না কর; আমি তো তোমাদের জন্য মর্মন্তুদ দিবসের শাস্তির আশংকা করি। তাহার সম্প্রদায়ের প্রধানেরা, যাহারা ছিল কাফির, তাহারা বলিল, আমরা তোমাকে তো আমাদের মত মানুষ ব্যতীত কিছু দেখিতেছি না; আমরা তো দেখিতেছি তোমার অনুসরণ করিতেছে তাহারাই, যাহারা আমাদের মধ্যে বাহ্য দৃষ্টিতেই অধম এবং আমরা আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব দেখিতেছি না, বরং আমরা তোমাদিগকে মিথ্যাবাদী মনে করি। সে বলিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে বল, আমি যদি আমার প্রতিপালক প্রেরিত স্পষ্ট নিদর্শনে প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং তিনি যদি আমাকে তাঁহার নিজ অনুগ্রহ হইতে দান করিয়া থাকেন, আর ইহা তোমাদের নিকট গোপন রাখা হইয়াছে, আমি কি এই বিষয়ে তোমাদিগকে বাধ্য করিতে পারি, যখন তোমরা ইহা অপসন্দ কর? হে আমার সম্প্রদায়! ইহার পরিবর্তে আমি তোমাদের নিকট ধন-সম্পদ যাজ্ঞা করি না। আমার পারিশ্রমিক তো আল্লাহ্র নিকট এবং মুমিনদিগকে তাড়াইয়া দেওয়া আমার কাজ নয়। তাহারা নিশ্চিতভাবে তাহাদের প্রতিপালকের সাক্ষাত লাভ করিবে। কিন্তু আমি তো দেখিতেছি তোমরা এক অজ্ঞ সম্প্রদায়। হে আমার সম্প্রদায়! আমি যদি তাহাদিগকে তাড়াইয়া দেই, তবে আল্লাহ হইতে আমাকে কে রক্ষা করিবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করিবে না? আমি তোমাদিগকে বলি না, আমার নিকট আল্লাহর ধন-ভাণ্ডার আছে আর না অদৃশ্য সম্বন্ধে আমি অবগত এবং আমি ইহাও বলি না যে, আমি ফেরেশতা।
তোমাদের দৃষ্টিতে যাহারা হেয় তাহাদের সম্বন্ধে আমি বলি না যে, আল্লাহ তাহাদিগকে কখনই মঙ্গল দান করিবেন না; তাহাদের অন্তরে যাহা আছে তাহা আল্লাহ সম্যক অবগত। তাহা হইলে আমি অবশ্যই জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হইব। তাহারা বলিল, হে নূহ! তুমি তো আমাদের সহিত বিতণ্ডা করিয়াছ, তুমি বিতণ্ডা করিয়াছ আমাদের সহিত অতিমাত্রায়; সুতরাং তুমি সত্যবাদী হইলে আমাদিগকে যাহার ভয় দেখাইতেছ তাহা আনয়ন কর। সে বলিল, ইচ্ছা করিলে আল্লাহই উহা তোমাদের নিকট উপস্থিত করিবেন এবং তোমরা উহা ব্যর্থ করিতে পারিবে না। আমি তোমাদিগকে উপদেশ দিতে চাহিলেও আমার উপদেশ তোমাদের উপকারে আসিবে না, যদি আল্লাহ তোমাদিগকে বিভ্রান্ত করিতে চাহেন। তিনিই তোমাদের প্রতিপালক এবং তাঁহারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন।
তাহারা কি বলে যে, সে ইহা রচনা করিয়াছে? বল, আমি যদি ইহা রচনা করিয়া থাকি, তবে আমি আমার অপরাধের জন্য দায়ী হইব। তোমরা যে অপরাধ করিতেছ তাহা হইতে আমি দায়মুক্ত। নূহের প্রতি প্রত্যাদেশ হইয়াছিল, যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহারা ব্যতীত তোমার সম্প্রদায়ের অন্য কেহ কখনও ঈমান আনিবে না, সুতরাং তাহারা যাহা করে তজ্জন্য তুমি দুঃখিত হইও না। তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার প্রত্যাদেশ অনুযায়ী নৌকা নির্মাণ কর এবং যাহারা সীমালংঘন করিয়াছে তাহাদের সম্পর্কে তুমি আমাকে কিছু বলিও না; তাহারা তো নিমজ্জিত হইবে। সে নৌকা নির্মাণ করিতে লাগিল এবং যখনই তাহার সম্প্রদায়ের প্রধানেরা তাহার নিকট দিয়া যাইত, তাহাকে উপহাস করিত। সে বলিত, তোমরা যদি আমাকে উপহাস কর তবে আমরাও তোমাদিগকে উপহাস করিব। যেমন তোমরা উপহাস করিতেছ এবং তোমরা অচিরে জানিতে পারিবে, কাহার উপর আসিবে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আর কাহার উপর আপতিত হইবে স্থায়ী শাস্তি।
অবশেষে যখন আমার আদেশ আসিল এবং উনান উথলিয়া উঠিল; আমি বলিলাম, ইহাতে উঠাইয়া লও প্রত্যেক শ্রেণীর যুগলের দুইটি, যাহাদের বিরুদ্ধে পূর্ব সিদ্ধান্ত হইয়াছে তাহারা ব্যতীত তোমার পরিবার-পরিজনকে এবং যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদিগকে। তাহার সংগে ঈমান আনিয়াছিল অল্প কয়েকজন। সে বলিল, ইহাতে আরোহণ কর, "আল্লাহর নামে ইহার গতি ও স্থিতি, আমার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু"। পর্বত প্রমাণ তরঙ্গের মধ্যে ইহা তাহাদিগকে লইয়া বহিয়া চলিল। নূহ তাহার পুত্রকে, যে পৃথক ছিল, আহবান করিয়া বলিল, হে আমার পুত্র! আমাদের সঙ্গে আরোহণ কর এবং কাফিরদের সঙ্গী হইও না। সে বলিল, আমি এমন এক পর্বতে আশ্রয় লইব যাহা আমাকে প্লাবন হইতে রক্ষা করিবে। সে বলিল, আজ আল্লাহ্ হুকুম হইতে রক্ষা করিবার কেহ নাই, তবে যাহাকে আল্লাহ দয়া করিবেন সে ব্যতীত। ইহার পর তরঙ্গ উহাদিগকে বিচ্ছিন্ন করিয়া দিল এবং সে নিমজ্জিতদের অন্তর্ভুক্ত হইল। ইহার পর বলা হইল, হে পৃথিবী! তুমি তোমার পানি গ্রাস করিয়া লও এবং হে আকাশ! ক্ষান্ত হও। ইহার পর বন্যা প্রশমিত হইল এবং কার্য সমাপ্ত হইল, নৌকা জুদী পর্বতের উপর স্থির হইল এবং বলা হইল, জালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হউক। নূহ তাহার প্রতিপালককে সম্বোধন করিয়া বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার পুত্র আমার পরিবারভুক্ত এবং আপনার প্রতিশ্রুতি সত্য, আর আপনি তো বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক। তিনি বলিলেন, হে নূহ! সে তো তোমার পরিবারভুক্ত নহে। সে অবশ্যই অসৎকর্মপরায়ণ। সুতরাং যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নাই সে বিষয়ে আমাকে অনুরোধ করিও না। আমি তোমাকে উপদেশ দিতেছি, তুমি যেন অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত না হও। সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক! যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নাই, সে বিষয়ে যাহাতে আপনাকে অনুরোধ না করি, এইজন্য আমি আপনার শরণ লইতেছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন এবং আমাকে দয়া না করেন, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হইব। বলা হইল, হে নূহ! অবতরণ কর আমার পক্ষ হইতে শান্তি ও কল্যাণসহ এবং তোমার প্রতি ও যে সমস্ত সম্প্রদায় তোমার সঙ্গে আছে তাহাদের প্রতি; অপর সম্প্রদায়সমূহকে আমি জীবন উপভোগ করিতে দিব, পরে আমা হইতে মর্মন্তুদ শাস্তি উহাদিগকে স্পর্শ করিবে” (১১: ২৫-৪৮)।
وَيَا قَوْمِ لَا يَجْرِمَنَّكُمْ شِقَاقِي أَنْ يُصِيبَكُمْ مِثْلُ مَا أَصَابَ قَوْمَ نُوحٍ .
"হে আমার সম্প্রদায়! আমার সহিত বিরোধ যেন কিছুতেই তোমাদিগকে এমন অপরাধ না করায় যাহাতে তোমাদের উপর তাহার অনুরূপ বিপদ আপতিত হইবে, যাহা আপতিত হইয়াছিল নূহের সম্প্রদায়ের উপর" (১১:৮৯)।
الَمْ يَأْتِكُمْ نَبَأُ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ قَوْمِ نُوحٍ وَعَادٍ وَثَمُودَ وَالَّذِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ لَا يَعْلَمُهُمْ إِلَّا اللَّهُ جَاءَتْهُمْ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَتِ فَرَدُّوا أَيْدِيَهُمْ فِي أَفْوَاهِهِمْ وَقَالُوا إِنَّا كَفَرْنَا بِمَا أُرْسِلْتُمْ بِهِ وَإِنَّا لَفِي شَكٍّ مِّمَّا تَدْعُونَنَا إِلَيْهِ مُرِيبُ. (١٤:٩)
"তোমাদের নিকট কি সংবাদ আসে নাই তোমাদের পূর্ববর্তীদের, নূহের সম্প্রদায়ের, আদের ও ছামূদের এবং তাহাদের পূর্ববর্তীদের? উহাদের বিষয় আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেহ জানে না, উহাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনসহ উহাদের রাসূল আসিয়াছিল, উহারা উহাদের হাত উহাদের মুখে স্থাপন করিত এবং বলিত, যাহাসহ তোমরা প্রেরিত হইয়াছ তাহা আমরা অবশ্যই অস্বীকার করি এবং আমরা অবশ্যই বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রহিয়াছি সে বিষয়ে, যাহার প্রতি তোমরা আমাদিগকে আহবান করিতেছ” (১৪: ৯)।
ذُرِّيَّةً مَنْ حَمَلْنَا مَعَ نُوحٍ إِنَّهُ كَانَ عَبْدًا شَكُورًا .
“হে তাহাদের বংশধর! যাহাদিগকে আমি নূহের সহিত আরোহণ করাইয়াছিলাম; সে তো ছিল পরম কৃতজ্ঞ বান্দা" (১৭ঃ৩)।
وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِنَ الْقُرُونِ مِنْ بَعْدِ نُوحٍ وَكَفَى بِرَبِّكَ بِذُنُوبِ عِبَادِهِ خَبِيرًا بَصِيرًا . (۱۷:۱۷)
"নূহের পর আমি কত মানবগোষ্ঠী ধ্বংস করিয়াছি! তোমার প্রতিপালকই তাঁহার বান্দাদের পাপাচরণের সংবাদ রাখা ও পর্যবেক্ষণের জন্য যথেষ্ট" (১৭: ১৭)।
أولَئِكَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ مِنْ ذُرِّيَةِ أَدَمَ وَمِمَّنْ حَمَلْنَا مَعَ نُوحٍ وَمِنْ ذُرِّيَّةِ إِبْرَاهِيمَ واسْرَائِيلَ وَمِمَّنْ هَدَيْنَا وَاجْتَبَيْنَا إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ أَيْتُ الرَّحْمَنِ خَرُّوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا . (١٩:٥٨)
"ইহারাই তাহারা, নবীদের মধ্যে যাহাদিগকে আল্লাহ অনুগ্রহ করিয়াছেন, আদমের বংশ হইতে ও যাহাদিগকে আমি নূহের সহিত নৌকায় আরোহণ করাইয়াছিলাম এবং ইবরাহীম ও ইসমাঈলের বংশোদ্ভূত ও যাহাদিগকে আমি পথনির্দেশ করিয়াছিলাম ও মনোনীত করিয়াছিলাম; তাহাদের নিকট দয়াময়ের আয়াত আবৃত্তি করা হইলে তাহারা সিজদায় লুটাইয়া পড়িত ক্রন্দন করিতে করিতে” (১৯:৫৮)।
وَنُوحًا إِذْ نَادَى مِنْ قَبْلُ فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَنَجْيْنَهُ وَأَهْلَهُ مِنَ الْكَرْبِ العَظِيمِ. وَنَصْرْتُهُ مِنَ الْقَوْمِ الَّذِينَ كَذَبُوا بِأَيْتِنَا أَنَّهُمْ كَانُوا قَوْمَ سَوْءٍ فَأَعْرَقْنَهُمْ أَجْمَعِينَ (٧٧-٢١:٦٧)
"স্মরণ কর নূহকে; পূর্বে সে যখন আহ্বান করিয়াছিল তখন আমি সাড়া দিয়াছিলাম তাহার আহ্বানে এবং তাহাকে ও তাহার পরিবারবর্গকে মহাসংকট হইতে উদ্ধার করিয়াছিলাম এবং আমি তাহাকে সাহায্য করিয়াছিলাম সেই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যাহারা আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করিয়াছিল; নিশ্চয়ই উহারা ছিল এক মন্দ সম্প্রদায়। এইজন্য উহাদের সকলকেই আমি নিমজ্জিত করিয়াছিলাম” (২১:৭৬-৭৭)।
وَإِنْ تُكَذِّبُوكَ فَقَدْ كَذَّبَتْ قَبْلَهُمْ قَوْمُ نُوحٍ وَعَادٌ وَثَمُودُ . (٢٢:٤٢)
"এবং লোকেরা যদি তোমাকে অস্বীকার করে তবে উহাদের পূর্বে অস্বীকার করিয়াছিল তো নূহ, 'আদ ও ছামূদের সম্প্রদায়" (২২:৪২)!
ولَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوْحًا إِلَى قَوْمِهِ فَقَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَالَكُمْ مِّنْ الهُ غَيْرُهُ أَفَلَا تَتَّقُونَ، فَقَالَ الْمَلَؤُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَوْمِهِ مَا هَذَا إِلَّا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُرِيدُ أَنْ يَتَفَضَّلَ عَلَيْكُمْ وَلَوْ شَاءَ اللهُ لَأَنْزَلَ مَلَئِكَةً مَّا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي أَبَائِنَا الْأَوَّلِينَ إِنْ هُوَ إِلا رَجُلٌ بِهِ جِنَّةٌ فَتَرَبَّصُوا بِهِ حَتَّى حِينٍ . قَالَ رَبِّ انْصُرْنِي بِمَا كَذَّبُونِ. فَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِ ان اصنع الفُلْكَ بِأَعْيُنِنَا وَوَحْيِنَا فَإِذَا جَاءَ أَمْرُنَا وَفَارَ التَّنُّورُ فَاسْلُكَ فِيهَا مِنْ كُلِّ زَوْجَيْنِ اثْنَيْنِ وَأَهْلَكَ إِلَّا مَنْ سَبَقَ عَلَيْهِ الْقَوْلُ مِنْهُمْ وَلَا تُخَاطِبْنِي فِي الَّذِينَ ظَلَمُوا إِنَّهُمْ مُغْرَقُونَ . فَإِذَا اسْتَوَيْتَ أَنْتَ وَمَنْ مَّعَكَ علَى الْفُلْكِ فَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي نَجَّانَا مِنَ الْقَوْمِ الظَّلِمِينَ . وَقُلْ رَّبِّ أَنْزِلْنِي مُنْزَلَا مُبْرَكًا وَأَنْتَ خَيْرُ الْمُنْزِلِينَ .
"আমি নূহকে পাঠাইয়াছিলাম তাহার সম্প্রদায়ের নিকট। সে বলিয়াছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ নাই। তবুও কি তোমরা সাবধান হইবে না? তাহার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ, যাহারা কুফরী করিয়াছিল, তাহারা বলিল, এতো তোমাদের মত একজন মানুষই, তোমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করিতে চাহিতেছে, আল্লাহ ইচ্ছা করিলে ফেরেশতাই পাঠাইতেন। আমরা তো আমাদের পূর্বপুরুষগণের কালে এইরূপ ঘটিয়াছে, একথা শুনি নাই। এতো এমন লোক যাহাকে উন্মত্ততা পাইয়া বসিয়াছে; সুতরাং তোমরা ইহার সম্পর্কে কিছুকাল অপেক্ষা কর। নূহ বলিয়াছিল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য কর, কারণ উহারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলিতেছে। অতঃপর আমি তাহার নিকট ওহী পাঠাইলাম, তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার ওহী অনুযায়ী নৌযান নির্মাণ কর, অতঃপর যখন আমার আদেশ আসিবে ও উনুন উথলিয়া উঠিবে তখন উঠাইয়া লইও প্রত্যেক জীবের এক এক জোড়া এবং তোমার পরিবার-পরিজনকে, তাহাদিগকে ছাড়া যাহাদের বিরুদ্ধে পূর্বে সিদ্ধান্ত হইয়াছে। আর তাহাদের সম্পর্কে তুমি আমাকে কিছু বলিও না যাহারা জুলুম করিয়াছে। তাহারা তো নিমজ্জিত হইবে। যখন তুমি ও তোমার সঙ্গীরা নৌযানে আসন গ্রহণ করিবে তখন বলিও, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্রই যিনি আমাদিগকে উদ্ধার করিয়াছেন জালিম সম্প্রদায় হইতে। আরও বলিও, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমনভাবে অবতরণ করাও যাহা হইবে কল্যাণকর; আর তুমিই শ্রেষ্ঠ অবতরণকারী” (২৩: ২৩-২৯)।
وَقَوْمَ نُوحٍ لَمَّا كَذَّبُوا الرُّسُلَ أَغْرَقْنَهُمْ وَجَعَلْتُهُمْ لِلْناسِ آيَةً وَأَعْتَدْنَا لِلظَّلِمِينَ عَذَابًا أَلِيمًا .
"এবং নূহের সম্প্রদায়কেও সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করিয়াছিলাম, যখন তাহারা রাসূলগণের প্রতি মিথ্যা আরোপ করিল তখন আমি উহাদিগকে নিমজ্জিত করিলাম এবং উহাদিগকে মানবজাতির জন্য নিদর্শনস্বরূপ করিয়া রাখিলাম। জালিমদের জন্য আমি মর্মন্তুদ শাস্তি প্রস্তুত করিয়া রাখিয়াছি" (২৫:৩৭)।
كَذَّبَتْ قَوْمُ نُوحٍ الْمُرْسَلِينَ إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ نُوحٌ أَلَا تَتَّقُونَ . إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ ، فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ. وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرِ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَلَمِينَ . فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ . قَالُوا أَنُؤْمِنُ لَكَ وَاتَّبَعَكَ الْأَرْذَلُونَ . قَالَ وَمَا عِلْمِي بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ . إِنْ أَنَا إِلا نَذِيرٌ مُبِينٌ. قَالُوا لَئِنْ لَّمْ تَنْتَهِ يُنُوحُ لَتَكُونَنَّ مِنَ الْمَرْجُوْمِينَ . قَالَ رَبِّي إِنَّ قَوْمِي كَذَّبُونِ . فَافْتَحْ بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ فَتْحًا وَنَجِّنِي وَمَنْ مَّعِيَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ. فَأَنْجَيْنَهُ وَمَنْ مَّعَهُ فِي الْفُلْكِ الْمَشْحُونِ . ثُمَّ أَعْرَقْنَا بَعْدُ الْبَقِينَ.
"নূহের সম্প্রদায় রাসূলগণের প্রতি মিথ্যারোপ করিয়াছিল। যখন উহাদের ভ্রাতা নূহ উহাদিগকে বলিল, তোমরা কি সাবধান হইবে না? আমি তো তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসূল। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। আমি তোমাদের নিকট ইহার জন্য কোন প্রতিদান চাহি না। আমার পুরস্কার তো জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট আছে। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। উহারা বলিল, আমরা কি তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিব অথচ ইতরজনেরা তোমার অনুসরণ করিতেছে? নূহ বলিল, উহারা কী করিত তাহা আমার জানা নাই। উহাদের হিসাব গ্রহণ তো আমার প্রতিপালকেরই কাজ; যদি তোমরা বুঝিতে! মুমিনদিগকে তাড়াইয়া দেওয়া আমার কাজ নহে। আমি তো কেবল একজন স্পষ্ট সতর্ককারী। উহারা বলিল, হে নূহ! তুমি যদি নিবৃত্ত না হও তবে তুমি অবশ্যই প্রস্তরাঘাতে নিহতদের শামিল হইবে। নূহ বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় তো আমাকে অস্বীকার করিতেছে। সুতরাং তুমি আমার ও উহাদের মধ্যে স্পষ্ট মীমাংসা করিয়া দাও এবং আমাকে ও আমার সহিত যে সব মুমিন আছে, তাহাদিগকে রক্ষা কর। অতঃপর আমি তাহাকে ও তাহার সঙ্গে যাহারা ছিল, তাহাদিগকে রক্ষা করিলাম বোঝাই নৌযানে; তৎপর অবশিষ্ট সকলকে নিমজ্জিত করিলাম" (২৬: ১০৫-১২০)।
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا الى قَوْمِهِ فَلَبِثَ فِيهِمْ أَلْفَ سَنَةٍ إِلا خَمْسِينَ عَامًا فَأَخَذَهُمُ الطُّوفَانُ وَهُمْ ظُلِمُونَ . فَانْجَيْنَهُ وَأَصْحَابَ السَّفِينَة وَجَعَلْنَهَا آيَةً للعلمين. (٢٩:١٤-١٥)
"আমি নূহকে তাহার সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করিয়াছিলাম। সে উহাদের মধ্যে অবস্থান করিয়াছিল পঞ্চাশ কম হাজার বৎসর। অতঃপর প্লাবন উহাদিগকে গ্রাস করে, কারণ উহারা ছিল সীমালংঘনকারী। অতঃপর আমি তাহাকে এবং যাহারা নৌযানে আরোহণ করিয়াছিল তাহাদিগকে রক্ষা করিলাম এবং বিশ্বজগতের জন্য ইহাকে করিলাম একটি নিদর্শন” (২৯: ১৪-১৫)।
وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّنَ مِيْثَاقَهُمْ وَمِنْكَ وَمِنْ نُوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَأَخَذْنَا مِنْهُمْ مِيثَاقًا غليظا .
"স্মরণ কর, যখন আমি নবীদের নিকট হইতে অঙ্গীকার গ্রহণ করিয়াছিলাম এবং তোমার নিকট হইতেও এবং নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও মারয়াম-তনয় ঈসার নিকট হইতেও-তাহাদের নিকট হইতে গ্রহণ করিয়াছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার" (৩৩: ৭)।
وَلَقَدْ نَادَانَا نُوحٌ فَلَنِعْمَ الْمُجِيبُونَ. وَنَجَّيْنُهُ وَاهْلَهُ مِنَ الكَرْبِ العَظِيمِ. وَجَعَلْنَا ذُرِّيَّتَهُ هُمُ الْبَقِينَ. وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ . سَلْمٌ عَلَى نُوحٍ فِي العُلَمِينَ إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا المُؤْمِنِينَ . ثُمَّ أَغْرَقْنَا الْأَخَرِينَ.
"নূহ আমাকে আহ্বান করিয়াছিল, আর আমি কত উত্তম সাড়া দানকারী। তাহাকে এবং তাহার পরিবারবর্গকে আমি উদ্ধার করিয়াছিলাম মহাসংকট হইতে। তাহার বংশধরদিগকেই আমি বিদ্যমান রাখিয়াছি বংশপরম্পরায়, আমি ইহা পরবর্তীদের স্মরণে রাখিয়াছি। সমগ্র বিশ্বের মধ্যে নূহের প্রতি শান্তি বর্ষিত হউক। এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদিগকে পুরস্কৃত করিয়া থাকি, সে ছিল আমার মুমিন বান্দাদের অন্যতম। অন্য সকলকে আমি নিমজ্জিত করিয়াছিলাম" (৩৭: ৭৫-৮২)।
كَذَّبَتْ قَبْلَهُمْ قَوْمٌ نُوحٍ .
"ইহাদের পূর্বেও রাসূলদিগকে অস্বীকার করিয়াছিল নূহের সম্প্রদায়” (৩৮: ১২)।
كذبتْ قَبْلَهُمْ قَوْمٌ نُوحٍ وَالْأَحْزَابُ مِنْ بَعْدِهِمْ وَهَمَّتْ كُلُّ أُمَّةٍ بِرَسُولِهِمْ لِيَأْخُذُوهُ وَجَدَلُوا بِالْبَاطِلِ لِيُدْحِضُوا بِهِ الْحَقَّ فَأَخَذْتُهُمْ فَكَيْفَ كَانَ عِقَابِ .
"ইহাদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায় এবং তাহাদের পরে অন্যান্য দলও অস্বীকার করিয়াছিল। প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজ নিজ রাসূলকে আবদ্ধ করিবার অভিসন্ধি করিয়াছিল এবং উহারা অসার তর্কে লিপ্ত হইয়াছিল, উহা দ্বারা সত্যকে ব্যর্থ করিয়া দিবার জন্য। ফলে আমি উহাদিগকে পাকড়াও করিলাম এবং কত কঠোর ছিল আমার শান্তি" (৪০:৫)।
شَرَعَ لَكُمْ مِّنَ الدِّيْنِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا . (٤٢:١٣)
"তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করিয়াছেন দীন যাহার নির্দেশ দিয়াছিলেন নূহকে" (৪২:১৩)।
كذبتْ قَبْلَهُمْ قَوْمٌ نُوحٍ وَأَصْحَابُ الرَّسِّ وَثَمُودُ ، وَعَادٌ وَفِرْعَوْنُ وَإِخْوَانُ لُوطٍ وَأَصْحَابُ الأَيْكَةِ وَقَوْمُ تُبَّعِ كُلُّ كَذَبَ الرُّسُلَ فَحَقَّ وَعِيدِ .
"উহাদের পূর্বেও সত্য প্রত্যাখ্যান করিয়াছিল নূহের সম্প্রদায়, রাস্স ও ছামূদ সম্প্রদায়, আদ, ফিরআওন ও লূত সম্প্রদায় এবং আয়কার অধিবাসী ও তুব্বা' সম্প্রদায়; উহারা সকলেই রাসূলদিগকে মিথ্যাবাদী বলিয়াছিল, ফলে উহাদের উপর আমার শান্তি আপতিত হইয়াছে" (৫০:১২-১৪)।
وَقَوْمَ نُوحٍ مِّنْ قَبْلُ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَاسِقِينَ .
"আমি ধ্বংস করিয়াছিলাম ইহাদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়কে, উহারা তো ছিল সত্যত্যাগী সম্প্রদায়" (৫১:৪৬)।
وَقَوْمَ نُوحٍ مِنْ قَبْلُ إِنَّهُمْ كَانُوا هُمْ أَظْلَمَ وَأَطْغَى
"আর ইহাদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়কেও (তিনি ধ্বংস করিয়াছিলেন), উহারা ছিল অতিশয় জালিম ও অবাধ্য” (৫৩ঃ ৫২)।
كَذَّبَتْ قَبْلَهُمْ قَوْمٌ نُوحٍ فَكَذَّبُوا عَبْدَنَا وَقَالُوا مَجْنُونٌ وَازْدُجِرَ . فَدَعَا رَبَّهُ أَنِّي مَغْلُوبٌ فَانْتَصِرْ فَفَتَحْنَا أَبْوَابَ السَّمَاءِ بِمَاءٍ مُنْهَمِرٍ . وَفَجَّرْنَا الأَرْضَ عُيُونًا فَالْتَقَى الْمَاءُ عَلَى أَمْرٍ قَدْ قُدِرَ، وَحَمَلْتُهُ عَلَى ذَاتِ الواح ودُسُرٌ تَجْرِي بِأَعْيُنِنَا جَزَاء لَمَنْ كَانَ كُفِرَ . وَلَقَدْ تَرَكْنُهَا أَيَةً فَهَلْ مِنْ مُّدَّكِرٍ، فَكَيْفَ كَانَ عَذَابِي ونذر .
"ইহাদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়ও অস্বীকার করিয়াছিল- অস্বীকার করিয়াছিল আমার বান্দাকে আর বলিয়াছিল, এতো এক পাগল। আর তাহাকে ভীতি প্রদর্শন করা হইয়াছিল। তখন সে তাহার প্রতিপালককে আহ্বান করিয়া বলিয়াছিল, আমি তো অসহায়, অতএব তুমি প্রতিবিধান কর। ফলে আমি উন্মুক্ত করিয়া দিলাম আকাশের দ্বার প্রর্বল বারি বর্ষণে এবং মৃত্তিকা হইতে উৎসারিত করিলাম প্রস্রবণ; অতঃপর সকল পানি মিলিত হইল এক পরিকল্পনা অনুসারে। তখন নূহকে আরোহণ করাইলাম কাষ্ঠ ও কীলক নির্মিত এক নৌযানে, যাহা চলিত আমার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে; ইহা পুরস্কার তাহার জন্য যে প্রত্যাখ্যাত হইয়াছিল। আমি ইহাকে রাখিয়া দিয়াছি এক নিদর্শনরূপে; অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেহ আছে কি? কী কঠোর ছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী” (৫৪: ৯-১৬)।
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا وَأَبْرَهِيمَ وَجَعَلْنَا فِي ذُرِّيَّتُهُمَا النُّبُوَّةَ وَالْكِتَابَ فَمِنْهُمْ مُهْتَدٍ وَكَثِيرٌ مِّنْهُمْ فَاسِقُونَ.
"আমি নূহ এবং ইবরাহীমকে রসূলরূপে প্রেরণ করিয়াছিলাম এবং আমি তাহাদের বংশধরগণের জন্য স্থির করিয়াছিলাম নুবৃওয়াত ও কিতাব, কিন্তু উহাদের অল্পই সৎপথ অবলম্বন করিয়াছিল এবং অধিকাংশই ছিল সত্যত্যাগী” (৫৭ঃ ২৬)।
ضَرَبَ اللهُ مَثَلاً لِلَّذِينَ كَفَرُوا امْرَأَتَ نُوحٍ وَامْرَأَتَ لُوطٍ كَانَتَا تَحْتَ عَبْدَيْنِ مِنْ عِبَادِنَا صَالِحَيْنِ فَخَانَتَاهُمَا فَلَمْ يُغْنِيَا عَنْهُمَا مِنَ اللهِ شَيْئًا وَقِبْلَ ادْخُلَا النَّارَ مَعَ الدَّاخِلِينَ.
"আল্লাহ কাফিরদের জন্য নূহের স্ত্রী ও লূতের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত দিতেছেন, উহারা ছিল আমার বান্দাদের মধ্যে দুই সৎকর্মপরায়ণ বান্দার অধীন। কিন্তু উহারা তাহাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছিল। ফলে নূহ ও লূত উহাদিগকে আল্লাহ্ শাস্তি হইতে রক্ষা করিতে পারিল না এবং উহাদিগকে বলা হইল, তোমরা উভয়ে প্রবেশকারীদের সহিত জাহান্নামে প্রবেশ কর" (৬৬ঃ ১০)।
إِنَّا أَرْسَلْنَا نُوْحًا إِلَى قَوْمِهِ أَنْ أَنْذِرْ قَوْمَكَ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ. قَالَ يُقَوْمِ إِنِّي لَكُمْ نَذِيرٌ مبين . أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاتَّقُوهُ وَأَطِيعُونِ . يَغْفِرْ لَكُمْ مِّنْ ذُنُوبِكُمْ وَيُؤَخِّرُكُمْ إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى إِنَّ أَجَلَ اللَّهِ إِذَا جَاءَ لَا يُؤَخِّرُ لَوْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ . قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْمِي لَيْلًا وَنَهَارًا فَلَمْ يَزِدْهُمْ دُعَاءَ الأَ فِرَاراً ، وَإِنِّي كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُوا أَصَابِعَهُمْ فِي أَذَانِهِمْ وَاسْتَغْشَوا ثِيَابَهُمْ وَأَصَرُّوا وَاسْتَكْبَرُوا اسْتِكْبَارًا . ثُمَّ إِنِّي دَعَوْتُهُمْ جِهَاراً . ثُمَّ إِنِّي أَعْلَنْتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَاراً . فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا . يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا ، وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا ، مَا لَكُمْ لَا تَرْجُونَ لله وَقَارًا . وَقَدْ خَلَقَكُمْ أَطْوَاراً . أَلَمْ تَرَوْا كَيْفَ خَلَقَ اللهُ سَبْعَ سَمُوتِ طَبَاقًا . وَجَعَلَ الْقَمَرَ فِيهِنَّ نُورًا وَجَعَلَ الشَّمْسَ سِرَاجًا . وَاللَّهُ أَنْبَتَكُمْ مِّنَ الْأَرْضِ نَبَاتًا ، ثُمَّ يُعِيدُكُمْ فِيهَا وَيُخْرِجُكُمْ إِخْرَاجًا . وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ بِسَاطًا . لَتَسْلُكُوا مِنْهَا سُبُلاً فِجَاجًا . قَالَ نُوحٌ رَّبِّ إِنَّهُمْ عَصَوْنِي وَاتَّبَعُوا مَنْ لَّمْ يَزِدْهُ مَالُهُ وَوَلَدُهُ إِلا خَسَارًا ، وَمَكَرُوا مَكْرًا كُبَّارًا ، وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ الهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدَا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُونَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا . وَقَدْ أَضَلُّوا كَثِيرًا وَلَا تَزِدِ الظَّلِمِينَ الأَضَلَّنَا . مِّمَّا خَطِيئَتِهِمْ أَغْرِقُوا فَأُدْخِلُوا نَّارًا فَلَمْ يَجِدُوا لَهُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْصَارًا ، وَقَالَ نُوحٌ رَّبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَفِرِينَ دَيَّارًا . إِنَّكَ إِنْ تَذَرْهُمْ يُضِلُّوا عِبَادَكَ وَلَا يَلِدُوا إِلا فَاجِرًا كَفَّارًا ، رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَنْ دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ وَلَا تَزِدِ الظلمين الا تباراً .
"আমি নূহকে প্রেরণ করিয়াছিলাম তাহার সম্প্রদায়ের প্রতি এই নির্দেশসহ, তুমি তোমার সম্প্রদায়কে সতর্ক কর তাহাদের প্রতি মর্মন্তুদ শাস্তি আসিবার পূর্বে। সে বলিয়াছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তো তোমাদের জন্য স্পষ্ট সতর্ককারী, এই বিষয়ে যে, তোমরা আল্লাহ্ ইবাদত কর ও তাহাকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর; তিনি তোমাদের পাপ ক্ষমা করিবেন এবং তিনি তোমাদিগকে অবকাশ দিবেন এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত। নিশ্চয় আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত কাল উপস্থিত হইলে উহা বিলম্বিত হয় না; যদি তোমরা ইহা জানিতে। সে বলিয়াছিল, হে আমার প্রতিপালক! আমি তো আমার সম্প্রদায়কে দিবারাত্রি আহ্বান করিয়াছি, কিন্তু আমার আহ্বান উহাদের পলায়ন প্রবণতাই বৃদ্ধি করিয়াছে। আমি যখনই উহাদিগকে আহ্বান করি যাহাতে তুমি উহাদিগকে ক্ষমা কর, উহারা কানে আঙ্গুলী দেয়, বস্ত্রাবৃত করে নিজদিগকে ও জিদ করিতে থাকে এবং অতিশয় ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে। অতঃপর আমি উহাদিগকে আহ্বান করিয়াছি প্রকাশ্যে। পরে আমি উচ্চস্বরে প্রচার করিয়াছি ও উপদেশ দিয়াছি গোপনে। বলিয়াছি, তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা প্রার্থনা কর, তিনি তো মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করিবেন, তিনি তোমাদিগকে সমৃদ্ধ করিবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করিবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করিবেন নদী-নালা। তোমাদের কী হইয়াছে যে, তোমরা আল্লাহ্ শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করিতে চাহিতেছ না! অথচ তিনিই তো তোমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন পর্যায়ক্রমে। তোমরা কি লক্ষ্য কর নাই? আল্লাহ কিভাবে সৃষ্টি করিয়াছেন সপ্ত স্তরে বিন্যস্ত আকাশমণ্ডলী? এবং সেথায় চন্দ্রকে স্থাপন করিয়াছেন আলোরূপে আর সূর্যকে স্থাপন করিয়াছেন প্রদীপরূপে; তিনি তোমাদিগকে উদ্ভূত করিয়াছেন মৃত্তিকা হইতে। অতপর উহাতে তিনি তোমাদিগকে প্রত্যাবৃত্ত করিবেন এবং পরে পুনরুত্থিত করিবেন। আর আল্লাহ্ তোমাদের জন্য ভূমিকে করিয়াছেন বিস্তৃত, যাহাতে তোমরা চলাফেরা করিতে পার প্রশস্ত পথে। নূহ বলিয়াছিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় তো আমাকে অমান্য করিয়াছে এবং অনুসরণ করিয়াছে এমন লোকের যাহার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি তাহার ক্ষতি ব্যতীত আর কিছুই বৃদ্ধি করে নাই। আর উহারা ভয়ানক ষড়যন্ত্র করিয়াছিল এবং বলিয়াছিল, তোমরা কখনও পরিত্যাগ করিও না তোমাদের দেব-দেবীকে; পরিত্যাগ করিও না ওয়াদ্দ, সুওয়া'আ, ইয়াগৃছ, ইয়াউক ও নাসরকে। উহারা অনেককে বিভ্রান্ত করিয়াছে। সুতরাং তুমি জালিমদের বিভ্রান্তি ব্যতীত আর কিছুই বৃদ্ধি করিও না। উহাদের অপরাধের জন্য উহাদিগকে নিমজ্জিত করা হইয়াছিল এবং পরে উহাদিগকে দাখিল করা হইয়াছিল অগ্নিতে, অতঃপর উহারা কাহাকেও আল্লাহ্ মুকাবিলায় পায় নাই সাহায্যকারী। নূহ আরও বলিয়াছিল, হে আমার প্রতিপালক! পৃথিবীতে কাফিরগণের মধ্য হইতে কোন গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিও না। তুমি উহাদিগকে অব্যাহতি দিলে উহারা তোমার বান্দাদিগকে বিভ্রান্ত করিবে এবং জন্ম দিতে থাকিবে কেবল দৃষ্কৃতিকারী ও কাফির। হে আমার প্রতিপালক! তুমি ক্ষমা কর আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং যাহারা মু'মিন হইয়া আমার গৃহে প্রবেশ করে তাহাদিগকে এবং মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারীদিগকে; আর জালিমদের শুধু ধ্বংসই বৃদ্ধি কর" (৭১: ১-২৮)।
📄 হাদীছে হযরত নূহ (আ)
হযরত নূহ (আ) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাদীছে খুব বেশি বর্ণনা পাওয়া যায় না। তাঁহার সম্পর্কে হাদীছে নিম্নলিখিত বর্ণনা পাওয়া যায় :
عن ابي هريرة ( رض ) قال كنا مع النبي صلى الله عليه وسلم .... يقول ادم إذهبوا الى نوح فيأتون نوحا فيقولون يانوح انت اول الرسل الى اهل الارض وسماك الله عبدا شكورا الا ترى الى ما نحن فيه الا ترى الى ما بلغنا الا تشفع لنا الى ربك فيقول ربي قد غضب اليوم غضبا لم يغضبه قبله مثله ولا يغضب بعده مثله نفسي نفسي ايتوا النبي (البخاري - الصحيح جلد ۱ صفحه (٤٧٠) وفي رواية مسلم ولكن ائتوتوا ابراهيم عليه السلام الذي اتخذه الله خليلا (مسلم : الصحيح ج | صفحه (۱۰۸)
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, "একদা আমরা নবী (স)-এর সঙ্গে ছিলাম। [তিনি কিয়ামতের দিনের বর্ণনা দেন যে, সেই দিনের ভয়াবহতা হইতে রক্ষা পাইবার জন্য লোকজন আল্লাহ্র নিকট সুপারিশ করিবার জন্য বিভিন্ন নবীর দ্বারস্থ হইবে। এই পর্যায়ে তাহারা আদম (আ)-এর নিকট গিয়া আল্লাহ্র নিকট সুপারিশ করার অনুরোধ করিলে আদম (আ) বলিবেন তোমরা নূহ (আ)-এর নিকট যাও। তখন তাহারা নূহের নিকট গিয়া বলিবে, 'হে নূহ! বিশ্ববাসীর নিকট আপনি প্রথম রাসূল। আর আল্লাহ আপনার নাম রাখিয়াছেন "কৃতজ্ঞ বান্দা" আপনি দেখিতেছেন না, আমরা কি অবস্থায় নিপতিত! আপনি দেখিতেছেন না আমাদের কি কষ্ট হইতেছে! আমাদের জন্য আপনার প্রতিপালকের নিকট সুপারিশ করুন। তিনি বলিলেন, আমার প্রতিপালক আজ এমন ক্রোধান্বিত হইয়াছেন যে, এইরূপ ক্রোধান্বিত তিনি ইতোপূর্বে কোন দিন হন নাই, পরেও কোন দিন হইবেন না। নাফসী! নাফসী! তোমরা আমার বংশধরের কাছে যাও। মুসলিম ও ইব্ন মাজা গ্রন্থে এই স্থলে ইবরাহীম (আ)-এর নাম উল্লেখ রহিয়াছে যে, তোমরা ইবরাহীমের কাছে যাও, আল্লাহ্ যাহাকে খলীল (বন্ধু)-রূপে গ্রহণ করিয়াছিলেন (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, ১খ., ৪৭০; মুসলিম, আস-সাহীহ, ১খ,, ১০৮; ইব্ন মাজা, আস-সুনান, পৃ. ৩২৯-৩৩০; তিরমিযী, আল-জামি, ২খ, ৬৬)।
عن ابي سعيد (رض) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم يجيئ نوح وأمته فيقول الله هل بلغت فيقول نعم اى رب فيقول لامته هل بلغكم فيقولون لا ماجاءنا من نبي فيقول لنوح من يشهد لك فيقول محمد وامته فتشهد انه قد بلغ وهو قوله وكذلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا
আবূ সাঈদ খুদরী (রা) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, (কিয়ামতের দিন) নূহ (আ)-ও তাঁহার উম্মত (ময়দানে) আসিবে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলিবেন, তুমি কি (হিদায়াতের বাণী ও আমার দীনের দাওয়াত) পৌঁছাইয়াছ? তিনি বলিবেন, হাঁ, হে আমার প্রতিপালক! অতঃপর তিনি (আল্লাহ) তাঁহার উম্মতকে বলিবেন, সে কি তোমাদের নিকট পৌছাইয়াছে? তাহারা বলিবে, না, আমাদের কাছে কোন নবী আসে নাই। তখন তিনি নূহকে বলিবেন, তোমার সাক্ষী কে? তিনি বলিবেন, মুহাম্মাদ (স)-ও তাঁহার উম্মত। তখন আমরা সাক্ষী দিব যে, তিনি (হিদায়াতের বাণী) পৌঁছাইয়াছেন। ইহাই আয়াতে বর্ণিত হইয়াছে: “এইভাবে আমি তোমাদিগকে এক মধ্যপন্থী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি, যাহাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ এবং রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হইবে" (আয়াত দ্র. ২: ১৪৩; হাদীছ দ্র. আল-বুখারী, আস-সাহীহ, ১খ., ৪৭০)।
قال ابن عمر (رض) قام رسول الله صلى الله عليه وسلم في الناس فاثنى على الله بما هو اهله ثم ذكر الدجال فقال اني لانذركموه وما من نبي الا أنذر قومه لقد أنذر نوح قومه
ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স) একবার লোক সমাবেশে দাঁড়াইলেন, অতঃপর আল্লাহ্র যথাযথ প্রশংসা করিলেন। অতঃপর দাজ্জালের প্রসংগ উল্লেখ করিয়া বলিলেন, 'আমি তোমাদিগকে তাহার সম্পর্কে সতর্ক করিব। প্রত্যেক নবীই (তাহার সম্পর্কে) আপন সম্প্রদায়কে সতর্ক করিয়াছেন। নূহ (আ)-ও তাঁহার সম্প্রদায়কে সতর্ক করিয়াছিলেন” (আল-বুখারী আস-সাহীহ, ১খ., ৪৭০)।
عن عبد الله ابن عمرو قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول صام نوح الدهر الا يوم عيد الفطر ويوم عيد الاضحى ابن ماجه : السنن (١/١٢٤)
'আবদুল্লাহ্ ইব্ন 'আমর (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি, নূহ (আ) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিবস ব্যতীত সারা বৎসর সাওম পালন করিতেন (ইবন মাজা, আস-সুনান, ১খ., ১২৪)।
একটি হাদীছে হযরত নূহ (আ)-এর নাম উল্লেখ না থাকিলেও হাদীস বিশারদ ও ভাষ্যকারগণের মতে উক্ত হাদীছে নূহ (আ)-এর কথাই বর্ণনা করা হইয়াছে। হাদীসটি হইল:
قال عبد الله كأني انظر الى النبي صلى الله عليه وسلم يحكى نبيا من الأنبياء ضربه قومه فادموه وهو يمسح الدم عن وجهه ويقول اللهم اغفر لقومى فانهم لا يعلمون البخاري : الصحيح (١/٤٩٥)
আব্দুল্লাহ্ (রা) বলেন, আমি যেন নবী (স)-কে দেখিতেছি যে, তিনি বর্ণনা করিতেছেন: নবীদিগের মধ্য হইতে একজন নবীকে তাঁহার সম্প্রদায় প্রহারে রক্তাক্ত করিয়া ফেলিয়াছে আর তিনি স্বীয় মুখমণ্ডল হইতে রক্ত মুছিয়া বলিতেছিলেন, 'হে আল্লাহ্! আমার সম্প্রদায়কে ক্ষমা কর। কেননা তাহারা অজ্ঞ' (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, ১খ., ৪৯৫)।
📄 বাইবেলে হযরত নূহ (আ)
বাইবেলের পুরাতন নিয়ম (Old Testament)-এর ৬-১০ অনুচ্ছেদ ব্যাপী হযরত নূহ (আ) সম্পর্কে আলোচনা করা হইয়াছে। সেখানে বেশির ভাগ বর্ণনাই প্লাবন সম্পর্কিত। এতদ্ব্যতীত তাঁহার পরবর্তী বংশের তালিকা ও বিবরণ প্রদান করা হইয়াছে। বাইবেলের বর্ণনা নিম্নরূপ:
লেমক এক শত বিরাশী বৎসর বয়সে উপনীত হইলে তাহার এক পুত্র জন্মগ্রহণ করে যাহার নাম তিনি নোহ [বিশ্রাম] রাখিলেন। কেননা তিনি কহিলেন, সদাপ্রভু কর্তৃক অভিশপ্ত ভূমি হইতে আমাদের যে শ্রম ও হস্তের ক্লেশ হয়, তদ্বিষয়ে আমাদিগকে সান্ত্বনা করিবে; নোহের জন্ম দিলে পর লেমক পাঁচ শত পঁচানব্বই বৎসর জীবিত থাকিয়া আরও পুত্র-কন্যার জন্ম দিলেন; সর্বশুদ্ধ লেমকের সাত শত সাতাত্তর বৎসর বয়স হইলে তাহার মৃত্যু হইল। পরে নোহ পাঁচ শত বৎসর বয়সে শেম, হাম ও যেফতের জন্ম দিলেন (Genesis, 5 : 28-32; বাংলা অনুপবিত্র বাইবেলে, আদিপুস্তক, পৃ. ৭)।
নোহ ও জল প্লাবনের বৃত্তান্ত
এইরূপে যখন ভূমণ্ডলে মনুষ্যদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। আর সদাপ্রভু কহিলেন, আমি যে মনুষ্যকে সৃষ্টি করিয়াছি, তাহাকে ভূমণ্ডল হইতে উচ্ছিন্ন করিব; মনুষ্যের সহিত পশু, সরীসৃপ, জীব ও আকাশের পক্ষীদিগকেও উচ্ছিন্ন করিব। কেননা তাহাদের নির্মাণ প্রযুক্ত আমার অনুশোচনা হইতেছে। (কিন্তু) নোহ সদাপ্রভুর দৃষ্টিতে অনুগ্রহপ্রাপ্ত হইলেন। নোহের বংশ-বৃত্তান্ত এই: নোহ তাৎকালীন লোকদের মধ্যে ধার্মিক ও সিদ্ধলোক ছিলেন, নোহ, শেম, হাম ও যেফৎ নামে তিন পুত্রের জন্ম দেন। তৎকালে পৃথিবী ঈশ্বরের দৃষ্টিতে ভ্রষ্ট, পৃথিবী দৌরাত্ম্যে পরিপূর্ণ ছিল। আর ঈশ্বর পৃথিবীতে দৃষ্টিপাত করিলেন, আর দেখ ইহা ভ্রষ্ট হইয়াছে, কেননা পৃথিবীস্থ সমুদয় প্রাণী ভ্রষ্টাচারী হইয়াছিল। তখন ঈশ্বর নোহকে কহিলেন, আমি সকল প্রাণীকে ধ্বংস করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছি, কেননা তাহাদের দ্বারা পৃথিবী দৌরাত্ম্যে পরিপূর্ণ হইয়াছে; আর দেখ আমি পৃথিবীর সহিত তাহাদিগকে বিনষ্ট করিব। তুমি গোদর কাষ্ঠ দ্বারা এক জাহাজ নির্মাণ করিবে ও তাহার ভিতরে ও বাহিরে ধুনা দিয়া লেপন করিবে। এই প্রকারে তাহা নির্মাণ করিবে। জাহাজ দৈর্ঘ্যে তিন শত হাত, প্রস্থে পাঁচ শত হাত ও উচ্চতায় ত্রিশ হাত হইবে। আর তাহার ছাদের এক হাত নীচে বাতায়ন প্রস্তুত করিয়া রাখিবে ও জাহাজের পার্শ্বে দ্বার রাখিবে; তাহার প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা নির্মাণ করিবে। আর দেখ আকাশের নীচে প্রাণবায়ু বিশিষ্ট যত জীব-জন্তু আছে সকলকে বিনষ্ট করণার্থে আমি পৃথিবীর উপরে জল প্লাবন আনিব, পৃথিবীস্থ সকলে প্রাণ ত্যাগ করিবে। কিন্তু তোমার সহিত আমি নিজস্ব নিয়ম স্থির করিব; তুমি আপন পুত্রগণ, স্ত্রী ও পুত্রবধূদিগকে সংগে লইয়া সেই জাহাজে প্রবেশ করিবে। আর বংশবিশিষ্ট সমস্ত জীব-জন্তুর স্ত্রী-পুরুষ জোড়া জোড়া লইয়া তাহাদের প্রাণ রক্ষার্থে নিজের সহিত সেই জাহাজে প্রবেশ করাইবে। সর্ব জাতীয় পক্ষী ও সর্বজাতীয় পশু ও সর্ব জাতীয় ভূচর সরীসৃপ জোড়া জোড়া প্রাণ রক্ষার্থে তোমার নিকটে প্রবেশ করিবে। আর তোমার ও তাহাদের আহারার্থে তুমি সর্বপ্রকার খাদ্য সামগ্রী আনিয়া আপনার নিকটে সঞ্চয় করিবে। তাহাতে নোহ সেইরূপ করিলেন, ঈশ্বরের আজ্ঞানুসারেই সকল কর্ম করিলেন (Genesis 6: 1-22; বাংলা অনু. পবিত্র বাইবেল, আদিপুস্তক, পৃ. ৭-৮; ঈষৎ পরিবর্তনসহ)।
আর সদাপ্রভু নোহকে কহিলেন, তুমি সপরিবারে জাহাজে প্রবেশ কর, কেননা এই কালের লোকদের মধ্যে আমার সাক্ষাতে তোমাকেই ধার্মিক দেখিয়াছি। তুমি শুচি পশুর স্ত্রী-पुरुष লইয়া প্রত্যেক জাতির সাত সাত জোড়া এবং অশুচি পশুর স্ত্রী-পুরুষ লইয়া প্রত্যেক জাতির এক এক জোড়া এবং আকাশের পক্ষীদিগেরও স্ত্রী-पुरुष লইয়া প্রত্যেক জাতির সাত সাত জোড়া সমস্ত ভূমণ্ডলে তাহাদের বংশ রক্ষার্থে নিজের সঙ্গে রাখ। কেননা সাত দিনের পর আমি পৃথিবীতে চল্লিশ দিবা-রাত্র বৃষ্টি বর্ষাইয়া আমার সৃষ্টি যাবতীয় প্রাণীকে ভূমণ্ডল হইতে উচ্ছিন্ন করিব। তখন নোহ সদাপ্রভুর আজ্ঞানুসারেই সকল কর্ম করিলেন। নোহের ছয় শত বৎসর বয়সে পৃথিবীতে জল প্লাবন হইল, জল প্লাবন হইতে রক্ষা পাওয়ার জন্য নোহ ও তাহার পুত্রগণ এবং তাহার স্ত্রী ও পুত্রবধূগণ জাহাজে প্রবেশ করিলেন। নোহের প্রতি ঈশ্বরের আজ্ঞানুসারে শুচি অশুচি পশুর এবং পক্ষীর ও ভূমিতে গমনশীল যাবতীয় জীবের স্ত্রী-पुरुष জোড়া জোড়া জাহাজে নোহের নিকট প্রবেশ করিল। পরে সেই সাত দিন গত হইলে পৃথিবীতে জল প্লাবন হইল। নোহের বয়সের ছয় শত বৎসরের দ্বিতীয় মাসের সপ্তদশ দিনে মহা জলধির সমস্ত স্রোতধারা উথলিয়া উঠিল এবং আকাশের বাতায়ন সকল মুক্ত; তাহাতে পৃথিবীতে চল্লিশ দিবারাত্র মহাবৃষ্টি হইল। সেই দিন নোহ এবং শেম, হাম ও যেফৎ নামে নোহের পুত্রগণ এবং তাহাদের সহিত نোহের স্ত্রী ও তিন পুত্রবধূ জাহাজে প্রবেশ করিলেন। আর তাহাদের সহিত সর্ব জাতীয় বন্য পশু, সর্ব জাতীয় গ্রাম্য পশু, সর্ব জাতীয় ভূচর সরীসৃপ জীব ও সর্ব জাতীয় পক্ষী, সর্ব জাতীয় খেচর, প্রাণবায়ুবিশিষ্ট সর্ব প্রকার জীব-জন্তু জোড়া জোড়া জাহাজে নোহের নিকট প্রবেশ করিল। ফলত তাহার প্রতি ঈশ্বরের আজ্ঞানুসারে সমস্ত প্রাণীর স্ত্রী-পুরুষ প্রবেশ করিল। পরে সদাপ্রভু তাহার পশ্চাৎদ্বার বন্ধ করিলেন। আর চল্লিশ দিন পর্যন্ত পৃথিবীতে জল প্লাবন হইল, তাহাতে পানি বৃদ্ধি পাইয়া জাহাজ ভাসাইলে তাহা মৃত্তিকা ছাড়িয়া উঠিল। পরে পানি প্রবল হইয়া পৃথিবীতে অতিশয় বৃদ্ধি পাইল এবং জাহাজ পানির উপর ভাসিতে থাকিল। আর পৃথিবীতে পানি অত্যন্ত প্রবল হইল, আকাশ মণ্ডলের অধঃস্থিত সকল মহাপর্বত নিমগ্ন হইল। তাহার উপরে পনের হাত পানি উঠিয়া প্রবল হইল, পর্বত সকল নিমগ্ন হইল। তাহাতে ভূচর যাবতীয় প্রাণী-পক্ষী, গ্রাম্য ও বন্য পশু, ভূচর সরীসৃপ সকল এবং মনুষ্য সকল মরিল। এইরূপে ভূমণ্ডল নিবাসী সমস্ত প্রাণী-মনুষ্য, পশু সরীসৃপ জীব ও আকাশীয় পক্ষী সকল উচ্ছিন্ন হইল, কেবল নোহ ও তাহার সঙ্গী জাহাজস্থ প্রাণীরা বাঁচিলেন। আর পানি পৃথিবীর উপরে এক শত পঞ্চাশ দিন পর্যন্ত প্রবল থাকিল (Genesis, 7: 1-24; বাংলা অনু, পবিত্র বাইবেল, আদিপুস্তক পৃ. ৯)।
আর ঈশ্বর নোহকে ও জাহাজে স্থিত তাহার সঙ্গী পশ্বাদি যাবতীয় প্রাণীকে স্মরণ করিলেন, ঈশ্বর পৃথিবীতে বায়ু বহাইলেন, তাহাতে পানি থামিল। আর জলধির স্রোতধারা ও আকাশের বাতায়ন সকল বন্ধ এবং আকাশের মহাবৃষ্টি নিবৃত্ত হইল। আর পানি ক্রমশ ভূমির উপর হইতে সরিয়া গিয়া এক শত পঞ্চাশ দিনের শেষে হ্রাস পাইল। তাহাতে সপ্তম মাসে, সপ্তদশ দিনে অরারর্যের পর্বতের উপরে জাহাজ লাগিয়া রহিল। পরে দশম মাস পর্যন্ত পানি ক্রমশ সরিয়া হ্রাস পাইল। ঐ দশম মাসের প্রথম দিনে পর্বতগুলোর শৃঙ্গ দেখা গেল।
আর চল্লিশ দিন গত হইলে নোহ আপনার নির্মিত জাহাজের বাতায়ন খুলিয়া একটি দাঁড় কাক ছাড়িয়া দিলেন; তাহাতে সে উড়িয়া ভূমির উপরস্থ পানি শুষ্ক না হওয়া পর্যন্ত ইতস্ততঃ গতায়াত করিল। আর ভূমির উপরে পানি হ্রাস পাইয়াছে কি না তাহা জানিবার জন্য তিনি নিজের নিকট হইতে এক কপোত ছাড়িয়া দিলেন। তাহাতে সমস্ত পৃথিবী পানিতে আচ্ছাদিত থাকায় কপোত পদার্পণের স্থান পাইল না, তাই জাহাজে তাহার নিকটে ফিরিয়া আসিল। তখন তিনি হাত বাড়াইয়া উহাকে ধরিলেন এবং জাহাজের ভিতরে আপনার নিকট রাখিলেন। পরে তিনি আর সাত দিন বিলম্ব করিয়া জাহাজ হইতে সেই কপোত পুনর্বার ছাড়িয়া দিলেন এবং কপোতটি সন্ধ্যাকালে তাহার নিকট ফিরিয়া আসিল; তাহার চঞ্চুতে জিত বৃক্ষের একটি নবীন পত্র ছিল; উহাতে নোহ বুঝিলেন, ভূমির উপরে পানি হ্রাস পাইয়াছে। পরে তিনি আর সাত দিন বিলম্ব করিয়া সেই কপোত ছাড়িয়া দিলেন। তখন সে তাঁহার নিকটে আর ফিরিয়া আসিল না। [নোহের বয়সের] ছয় শত এক বৎসরের প্রথম মাসের প্রথম দিনে পৃথিবীর উপরে পানি শুষ্ক হইল; তাহাতে জাহাজের ছাদ খুলিয়া দৃষ্টিপাত করিলেন, ভূতল নির্জল। পরে দ্বিতীয় মাসের সাতাইশতম দিনে ভূমি শুষ্ক হইল (প্রাগুক্ত, ৪: ১-১৪, বাংলা আদিপুস্তক, পৃ. ৯-১০)।
নোহের সহিত কৃত ঈশ্বরের নিয়ম
পরে ঈশ্বর নোহকে কহিলেন, তুমি নিজ স্ত্রী, পুত্রগণ ও পুত্র-বধূগণকে সঙ্গে লইয়া জাহাজ হইতে বাহিরে যাও। আর তোমার সঙ্গী পশু, পক্ষী ও ভূচর সরীসৃপ প্রভৃতি মাংসময় যত জীব-জন্তু আছে, সেই সকলকে তোমার সঙ্গে বাহিরে আন, তাহারা পৃথিবীকে প্রাণীময় করুক এবং পৃথিবী প্রজাবন্ত ও বহু বংশ হউক। তখন নোহ নিজ পুত্রগণ এবং নিজ স্ত্রী ও পুত্র বধূগণকে সঙ্গে লইয়া বাহির হইলেন। আর স্ব-স্ব জাতি অনুসারে প্রত্যেক পশু, সরীসৃপ জীব ও পক্ষী, সমস্ত ভূচর প্রাণী জাহাজ হইতে বাহির হইল। পরে নোহ সদাপ্রভুর উদ্দেশ্যে যজ্ঞবেদি নির্মাণ করিলেন এবং সর্ব প্রকার শুচি পশুর ও সর্বপ্রকার শুচি পক্ষীর মধ্যে কতকগুলো লইয়া বেদির উপরে হোম করিলেন (Genesis, 8: 15-22; বাংলা অনু. পবিত্র বাইবেল, আদিপুস্তক, পৃ. ১০-১১)।
পরে ঈশ্বর নোহকে ও তাহার পুত্রগণকে এই আশীর্বাদ করিলেন, তোমরা প্রজাবন্ত ও বহু বংশ হও, পৃথিবী পরিপূর্ণ কর। পৃথিবীর যাবতীয় প্রাণী ও আকাশের যাবতীয় পক্ষী তোমাদের হইতে ভীত ও ত্রাসযুক্ত হইবে; সমস্ত ভূচর জীব ও সমুদ্রের সমস্ত মৎস্য শুদ্ধ, সে সকল তোমাদেরই হস্তে সমর্পিত। প্রত্যেক গমনশীল প্রাণী তোমাদের খাদ্য হইবে; আমি হরিৎ, ঔষধির ন্যায় সে সকল তোমাদিগকে দিলাম কিন্তু স্বপ্রাণ অর্থাৎ সরক্তমাংস ভোজন করিও না। আর তোমাদের রক্তপাত হইলে আমি তোমাদের প্রাণের পক্ষে তাহার পরিশোধ অবশ্যই লইব; সকল পশুর নিকটে তাহার পরিশোধ লইব এবং মনুষ্যের ভ্রাতা মনুষ্যের নিকটে আমি মনুষ্যের প্রাণের পরিশোধ লইব; যে কেহ মনুষ্যের রক্তপাত করিবে, মনুষ্য কর্তৃক তাহার রক্তপাত করা যাইবে; কেননা ঈশ্বর নিজ প্রতিমূর্তিতে মনুষ্যকে নির্মাণ করিয়াছেন। তোমরা প্রজাবন্ত হও ও বহু বংশ হও, পৃথিবীকে প্রাণীময় কর ও তন্মধ্যে বর্ধিষ্ণু হও।
পরে ঈশ্বর নোহকে ও তাহার সঙ্গী পুত্রগণকে কহিলেন, দেখ তোমাদের সহিত তোমাদের ভাবী বংশের সহিত ও তোমাদের সঙ্গী যাবতীয় প্রাণীর সহিত, পক্ষী এবং গ্রাম্য ও বন্য পশু, পৃথিবীস্থ যত প্রাণী জাহাজ হইতে বাহির হইয়াছে, তাহাদের সহিত আমি আমার নিয়ম স্থির করি। আমি তোমাদের সহিত আমার নিয়ম স্থির করি; জল প্লাবন দ্বারা সমস্ত প্রাণী আর উচ্ছিন্ন হইবে না এবং পৃথিবীর বিনাশার্থে জল প্লাবন আর হইবে না। ঈশ্বর আরও কহিলেন, আমি তোমাদের সহিত ও তোমাদের সঙ্গী যাবতীয় প্রাণীর সহিত চিরস্থায়ী পুরুষ-পরম্পরার জন্য যে নিয়ম স্থির করিলাম, তাহার চিহ্ন এই। আমি মেঘে আপন ধনু স্থাপন করি তাহাই পৃথিবীর সহিত আমার নিয়মের চিহ্ন হইবে। যখন আমি পৃথিবীর উর্দ্ধে মেঘের সঞ্চার করিব, তখন সেই ধনু মেঘে দৃষ্ট হইবে। তাহাতে তোমাদের সহিত ও মাংসময় সমস্ত প্রাণীর সহিত আমার যে নিয়ম আছে তাহারা আমার স্মরণ হইবে এবং সকল প্রাণীর বিনাশার্থ জল প্লাবন আর হইবে না। আর মেঘ ধনুক হইলে আমি তাহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিব; তাহাতে মাংসময় যত প্রাণী পৃথিবীতে আছে, তাহাদের সহিত ঈশ্বরের যে চিরস্থায়ী নিয়ম তাহা আমি স্মরণ করিব। ঈশ্বর নোহকে কহিলেন, পৃথিবীস্থ সমস্ত প্রাণীর সহিত আমার স্থাপিত নিয়মের এই চিহ্ন হইবে।
নোহের তিন পুত্রের বিবরণ
নোহের যে পুত্রেরা জাহাজ হইতে বাহির হইলেন, তাহাদের নাম শেম, হাম ও যেফৎ; সেই হাম কনানের পিতা। এই তিনজন নোহের পুত্র; ইহাদেরই বংশ সমস্ত পৃথিবীতে ব্যাপ্ত হইল। জল প্লাবনের পরে নোহ তিন শত পঞ্চাশ বৎসর জীবিত থাকিলেন। সবশুদ্ধ নোহের নয় শত পঞ্চাশ বৎসর বয়স হইলে তাহার মৃত্যু হইল (Genesis, 9: 1-29; বাংলা অনু. পবিত্র বাইবেল, আদিপুস্তক, পৃ. ১১-১২)।
📄 হযরত নূহ (আ)-এর সম্প্রদায়
ইন জুবায়র (মৃ. ১২১৭ খৃ.) প্রমুখের বর্ণনামতে নূহ (আ)-এর সম্প্রদায়কে বানু রাসিব বলা হইত (ইব্ন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১০১)। প্রবীণ ঐতিহাসিক ইমাম আছ-ছা'আলাবী (মৃ. ৪২৭/১০৩৫ সন) তাঁহার আরাইসুল-মাজালিস গ্রন্থে ইহাদের পূর্বপুরুষের বিস্তারিত পরিচয় তুলিয়া ধরিয়াছেন। তবে উহা গারীব (বিরল বর্ণনা)-এর পর্যায়ভুক্ত বলিয়া মনে হয়। কারণ নির্ভরযোগ্য ইতিহাস গ্রন্থসমূহে উক্ত বিবরণ পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, নূহ (আ)-এর সম্প্রদায় ছিল কাবীল-এর বংশধর এবং শীছ (আ)-এর বংশধরের মধ্যে যাহারা উহাদের আনুগত্য করিয়াছিল তাহারা। প্রকৃতপক্ষে শীছ (আ)-এর বংশের লোকের সহিত কাবীলের বংশের রক্ত মিলিত হইয়া যে সম্প্রদায়ের জন্ম হয় তাহারাই ছিল নূহ (আ)-এর সম্প্রদায়। ইব্ন আব্বাস (রা) এই ইতিহাস বর্ণনা করিতে গিয়া বলেন, হযরত আদম (আ)-এর বংশের দুইটি ধারা ছিল, যাহার একটি সমতল ভূমিতে বসবাস করিত এবং অপরটি পর্বতে। পর্বতের পুরুষগণ ছিল সুশ্রী ও সুদর্শন আর মহিলাগণ কুৎসিত। অপরপক্ষে সমতল ভূমির মহিলাগণ ছিল সুন্দরী ও রূপসী আর পুরুষগণ কুশ্রী। ইবলীস একদিন এক গোলামের আকৃতি ধারণ করিয়া সমতল ভূমির এক ব্যক্তির নিকট আসিল, অতঃপর তাহার নিকট মজুরী খাটিবার বন্দোবস্ত করিল। সে তাহার সেবা করিত। ইবলীস একদিন রাখালদের বাঁশির ন্যায় একটি বাঁশি বানাইল। উহা হইতে এমন এক আওয়াজ বাহির হইতে লাগিল যাহা লোকে ইতোপূর্বে আর কখনও শোনে নাই। উক্ত আওয়াজ পার্শ্ববর্তী লোকজনের কানে পৌঁছিলে তাহারা উহা শুনিবার জন্য তাহার নিকট আসিল, অতঃপর তাহারা উহাকে উৎসবরূপে গ্রহণ করিল। সেখানে বৎসরে একবার তাহারা জড়ো হইত এবং নারী-পুরুষ খোলামেলাভাবে মিলিত হইত। পর্বতে বসবাসকারী এক ব্যক্তি অকস্মাৎ তাহাদের উৎসবের দিনে তাহাদের নিকট আসিয়া পড়িল এবং মহিলা ও তাহাদের সৌন্দর্য দর্শন করিল, অতঃপর ফিরিয়া আসিয়া সাথি-সঙ্গীদিগকে অবহিত করিল। অতঃপর তাহারা ইহাদের নিকট চলিয়া আসিল এবং ইহাদের সহিত একত্রে অবস্থান করিতে লাগিল। এইভাবে তাহাদের মধ্যে অশ্লীলতা ও অপকর্ম ছড়াইয়া পড়িল। ইহাই আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন : وَلَا تَبَرِّجْنَ تَبَرُّجَ الجاهلية الأولى (৩৩:৩৩) “আর প্রাচীন যুগের মত নিজদিগকে প্রদর্শন করিয়া বেড়াইবে না।”
ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, আদম (আ) ওসীয়ত করিয়াছিলেন যে, শীছ-এর বংশধর কাবীল-এর বংশধরকে যেন বিবাহ না করে। শীছ (আ)-এর বংশধর ইহা খুবই গুরুত্বের সহিত পালন করিত, এমনকি তাহারা নিজদের বাসস্থানে পাহারাদার নিযুক্ত করিয়াছিল যাহাতে কাবীলের বংশধরদের কেহ তাহাদের নিকটেও না আসিতে পারে। একদা শীছ (আ)-এর বংশধরের এক শত লোক বলিল, দেখি না আমাদের চাচার বংশধরেরা কি করিতেছে। এই বলিয়া সেই এক শত পুরুষ সমতল ভূমির সুন্দরী মহিলাদের নিকট নামিয়া আসিল। অতঃপর সেখানকার মহিলারা তাহাদিগকে বরণ করিয়া লইল। বেশ কিছু দিন এইভাবে অতিবাহিত হইয়া গেল। অতঃপর আর এক শতজন বলিল, দেখি না আমাদের ভ্রাতাগণ সেখানে কী করিতেছে। এই বলিয়া তাহারা পর্বত হইতে তাহাদের নিকট নামিয়া আসিল। তাহাদিগকেও মহিলারা বরণ করিয়া লইল। অতঃপর শীছ-এর বংশধর সকলেই নামিয়া আসিল। এইভাবে তাহারা পাপাচারে লিপ্ত হইল এবং পরস্পরে বিবাহ-শাদী করিল। পরস্পরে মিলিয়া-মিশিয়া তাহারা একাকার হইয়া গেল। এইরূপে কাবীলের বংশধর বৃদ্ধি পাইয়া পৃথিবী ভরিয়া তুলিল এবং তাহারা নানারূপ পাপাচার শুরু করিয়া পৃথিবী ভরিয়া দিল (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৫৬)। কোনও কোনও ঐতিহাসিকের বর্ণনামতে কাবীলের বংশধর এতদূর পাপাচারী হইয়াছিল যে, তাহারা 'অগ্নিপূজা' করিত। কিন্তু ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত বুখারীর হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, হযরত আদম (আ) হইতে নূহ (আ) পর্যন্ত সময়কালের সকলেই ইসলাম ও হক-এর উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাই কাবীলের বংশধর মুশরিক হওয়ার বর্ণনা সঠিক বলিয়া মানিয়া লওয়া যায় না (ইব্ন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১০১)। হইতে পারে তাহারা শিরক ব্যতীত অন্যান্য পাপাচার করিত এবং নূহ (আ)-এর সময়ে আসিয়া তাহারা ওয়াদ্দ, সুওয়া, য়াগুছ, য়াউক ও নাসর নামীয় মূর্তিসমূহের পূজা করিত। তাহার সম্প্রদায় শিরক তথা মূর্তিপূজা শুরু করিয়া দেয়। পৃথিবীর বুকে ইহাই ছিল সর্বপ্রথম মূর্তিপূজা। ইহার সূচনা সম্পর্কে ইমাম বুখারী (র) ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে হাদীছ রিওয়ায়াত করিয়াছেন যে, ওয়াদ্দ, সুওয়া, য়াগুছ, য়াউক ও নাসর ছিল নূহ সম্প্রদায়ের সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিবর্গের নাম। তাহারা ইনতিকাল করিলে শয়তান তাহাদের পরামর্শ দিল যে, তাহারা যে সকল স্থানে উপবেশন করিত সেখানে তাহাদের প্রতিকৃতি স্থাপন কর এবং সেগুলোকে উহাদের নামেই নামকরণ কর। তাহারা এইরূপ করিল। কিন্তু তখন উহাদের উপাসনা করা হইত না। অতঃপর এই সকল লোক যখন ইনতিকাল করিল এবং এই প্রতিকৃতি স্থাপনের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞাত লোক পৃথিবী হইতে বিদায় লইয়া গেল তখন তাহাদের উপাসনা করা শুরু হইয়া গেল। ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, নূহ সম্প্রদায়ের এই মূর্তিপূজা পরবর্তীতে সমগ্র আরব জাহানে বিস্তার লাভ করে (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, ২৩ খ., ৭৩২)। ইকরিমা, দাহহাক, কাতাদা, ইবন ইসহাক প্রমুখও এইরূপ বর্ণনা করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১খ., ১০৫)। এই বিষয়টিই মুসলিম ঐতিহাসিকগণ আরও বিস্তারিত ও বিশদভাবে বর্ণনা করিয়াছেন যে, ইহাদের মধ্যে ওয়াদ্দ ছিলেন বয়ঃজ্যেষ্ঠ এবং বেশি নেককার ও জনপ্রিয়। তিনি ছিলেন বাবিল নিবাসী। তাহার ইনতিকালে লোকজন খুবই মর্মাহত ও শোকাভিভূত হইয়া পড়িল। তাহারা তাহার কবরের পাশে ঘুরিয়া ঘুরিয়া হা-হুতাশ করিতে লাগিল।
ইবলীস তাহাদের এই মাতম ও হা-হুতাশ দেখিয়া একজন মানুষের আকৃতিতে আসিয়া বলিল, এই ব্যক্তির প্রতি আমি তোমাদের আক্ষেপ ও হা-হুতাশ দেখিতেছি। আমি কি তোমাদিগকে এই ব্যক্তির একটি প্রতিকৃতি বানাইয়া দিব, যাহা তোমরা তোমাদের মজলিসে রাখিয়া উহার মাধ্যমে তাহাকে স্মরণ করিবে? তাহারা বলিল, হাঁ। অতঃপর ইবলীস তাহাদের জন্য তাহার অনুরূপ একটি প্রতিকৃতি বানাইয়া দিল। তাহারা উহা তাহাদের মজলিসে রাখিয়া দিল এবং উহার মাধ্যমে তাহাকে স্মরণ করিতে লাগিল। উহার প্রতি তাহাদের স্মরণের এইরূপ অবস্থা দেখিয়া ইবলীস বলিল, আরও ভালমত স্মরণ করিবার সুবিধার্থে তোমাদের প্রত্যেকের ঘরে রাখিবার জন্য আমি কি ইহার অনুরূপ একটি করিয়া মূর্তি তৈয়ার করিয়া দিব? তাহারা বলিল, হাঁ। অতঃপর সে প্রত্যেকের ঘরে অনুরূপ একটি করিয়া মূর্তি বানাইয়া দিল এবং তাহারাও যথারীতি উহার মাধ্যমে তাহাকে স্মরণ করিতে লাগিল। তাহাদের সন্তানগণ তাহাদের এইরূপ কর্ম দেখিতে লাগিল। এমনিভাবে তাহাদের নূতন নূতন বংশধর আসিতে লাগিল এবং উহাকে স্মরণের উক্ত পদ্ধতিও পরিবর্তিত হইতে লাগিল। এক সময় ইবলীস তাহাদিগকে বুঝাইল যে, পূর্ববর্তিগণ তো ইহারই উপাসনা করিত এবং ইহারই নিকট বৃষ্টি প্রার্থনা করিত। ইহা শুনিয়া তাহারা ইহাকেই উপাস্য বানাইয়া ফেলিল এবং আল্লাহকে ছাড়িয়া ইহারই ইবাদত করিতে লাগিল। তাই আল্লাহ ব্যতীত সর্বপ্রথম যাহার ইবাদত করা হয় তাহা হইল এই ওয়াদুদ-এর মূর্তি, যাহাকে তাহারা ওয়াদ্দ নামেই আখ্যায়িত করিয়াছিল (ইব্ন কাছীর, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৬৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১০৫-১০৬; আল-আলুসী, রূহুল-মা'আনী, ২৯ খ., ৭৭)। উল্লিখিত অন্যান্য মূর্তিগুলোরও তাহারা একই পন্থায় ইবাদত করিতে শুরু করে। এই কথাই একটি হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে যে, উম্মুল মুমিনীন উম্মু সালামা ও উম্মু হাবীবা (রা) যখন তাঁহাদের হাবশায় দেখা মারিয়া নামক গির্জার সৌন্দর্য ও উহার অভ্যন্তরে রক্ষিত মূর্তিগুলোর কথা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উল্লেখ করিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ঐ সকল জাতির মধ্যকার কোনও নেককার লোক ইনতিকাল করিলে তাহারা তাহার কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করিত, অতঃপর উহাতে এই সকল মূর্তি স্থাপন করিত। আল্লাহ্র নিকট উহারাই হইল সর্বনিকৃষ্ট সৃষ্টি (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১০৬; আল-বুখারী, ১খ., ১৭৯; মুসলিম, আস-সাহীহ, ১খ., ২০১)।
মোটকথা, নূহ (আ)-এর সময়ে আসিয়া তাঁহার সম্প্রদায় সর্বপ্রকারের পাপাচার শুরু করিয়া দেয়। তাই কেহ কেহ বলিয়াছেন, নূহ সম্প্রদায় আল্লাহ্র অপছন্দনীয় ও অসন্তুষ্টিমূলক কাজ, যথা অশ্লীল কাজে লিপ্ত হওয়া, মদ্য পান করা, আল্লাহর ইবাদত পরিত্যাগ করিয়া খেল-তামাশায় মত্ত হওয়া প্রভৃতিতে সকলেই ঐক্যবদ্ধ ছিল (ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ., ৫৪)।