📄 নামকরণ
একজন বিশিষ্ট নবী ও রাসূল। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে "পরম কৃতজ্ঞ বান্দা" বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে, ن كَانَ عَبْدًا شَكُورًا। "সে তো ছিল পরম কৃতজ্ঞ বান্দা" (১৭:৩)। হাদীছে তাঁহাকে প্রথম রাসূল বলিয়া আখ্যায়িত করা হইয়াছে (দ্র. আল-বুখারী, আস-সাহীহ, ১খ., ৪৭০; মুসলিম, আস-সাহীহ, ১খ., ১০৮; তিরমিযী, সুনান, ২খ., ৬৬; ইব্ন মাজা, ৩২৯-৩০)।
আল-কুরআনুল করীমে نَوْحُ -রূপে এবং বাইবেলে Noah-রূপে লিখিত হইয়াছে। এতদ্ব্যতীত Noe-রূপেও ইহা লিখিত হইয়া থাকে [দ্র. Encyclopaedia Britannica (Index), vol. vii, 366]। শব্দটি হিব্রু, যাহার অর্থ হইল বিশ্রাম, আরাম। এই নামকরণের কারণ এইভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, পিতা লেমক (লামিক) তাঁহার নাম রাখেন নোহ। কেননা তিনি (নূহ-এর পিতা লামিক) কহিলেন, সদাপ্রভু কর্তৃক অভিশপ্ত ভূমি হইতে আমাদের যে শ্রম ও হস্তের ক্লেশ হয় তদ্বিষয়ে এ আমাদিগকে সান্ত্বনা করিবে (Genesis, 5: 29; বাংলা অনু. পবিত্র বাইবেল, বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি, ঢাকা, পৃ. ৭)।
নূহ নামকরণ সম্পর্কে আল্লামা আলুসী ইকরিমা ও মুকাতিল প্রমুখ মুফাসসিরের কয়েকটি অভিমত উল্লেখ করেন। তাঁহারা ইহাকে আরবী (نياحة ক্রন্দন করা) ধাতু হইতে উদ্ভূত বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। এমতাবস্থায় وেن-এর অর্থ হইল অধিক ক্রন্দনকারী। তাঁহারা নূহ (আ)-এর অধিক ক্রন্দনের কয়েকটি কারণ বর্ণনা করিয়াছেন: (১) উম্মতের ধ্বংসের জন্য দু'আ করায় পরবর্তী জীবনে তিনি অধিক ক্রন্দন করিতেন; (২) স্বীয় পুত্রের জন্য আল্লাহ্র নিকট সুপারিশ করার অপরাধ স্মরণ করিয়া (যাহার বিস্তারিত বিবরণ পরে আসিতেছে); (৩) একবার কুষ্ঠ রোগগ্রস্ত একটি কুকুরের নিকট দিয়া যাওয়ার সময় কুকুরটিকে লক্ষ্য করিয়া তিনি বলিলেন, إحسا یا قبیح "দূর হ হে কুশ্রী"! ইহাতে আল্লাহ্ তাহাকে বলেন, "তুমি কি আমাকে মন্দ বলিলে, না কুকুরটিকে?" এই অনুশোচনায় তিনি অধিক ক্রন্দন করিতেন; (৪) কওমের কুফরীতে বাড়াবাড়ি করায়। যখনই তিনি তাহাদিগকে দাওয়াত দিতেন আর তাহারা তাহা প্রত্যাখ্যান করিত তখনই তিনি ক্রন্দন করিতেন। এক বর্ণনামতে ইহার পূর্বে তাঁহার নাম ছিল "আস-সাকান", মতান্তরে আবদুল জব্বার। এই সকল রিওয়ায়াত বর্ণনা করার পর আল্লামা আলুসী (র) নিজেই মন্তব্য করিয়াছেন যে, এই সকল রিওয়ায়াত গ্রহণযোগ্য নহে; বরং নূহ তাঁহার জন্মের সময়কারই নাম। আর ইহা نباحة ধাতু হইতে উদ্ভূত নহে (রূহুল-মা'আলী, ৮খ., ১৪৯)। কারণ শব্দটি আদৌ আরবী নহে।
📄 জন্ম ও বংশপরিচয়
ঐতিহাসিক ও সীরাতবিদগণের মতে তাঁহার বংশ-৫৪লতিকা হইল: নূহ ইব্ন লামিক ইব্ন মাতৃশালিহ ইব্ন খানূখ বা আখনূখ (ইদরীস আ) ইব্ন য়ারুদ ইব্ন মাহলাঈল ইব্ন কীনান ইব্ন আনূশ ইব্ন শীছ (আ) ইব্ন আদম (আ) (ইব্ন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৫৯; ঐ লেখক, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া; আবদুল ওয়াহহাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩০)। তিনি হযরত আদম (আ)-এর দশম পুরুষে স্বীয় পিতা লামিক-এর ১৮২ বৎসর বয়সকালে জন্মগ্রহণ করেন (Bible, Genesis 5 : 29; Encyclopaedia of Religion, Vol. 10, P. 460; Encyclopaedia Americana, Vol. 20, P. 392)। তবে আদম (আ) হইতে ঠিক কত বৎসর পর তাঁহার জন্ম হয় এই ব্যাপারে বহু মতামত পাওয়া যায়। ইবন জারীর তাবারীর বর্ণনামতে হযরত আদম (আ)-এর ইনতিকালের ১২৬ বৎসর পর হযরত নূহ (আ) জন্মগ্রহণ করেন। পূর্ববর্তী আহলে কিতাবদের ইতিহাসের বর্ণনামতে ১৪৬ বৎসর (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১০০-১০১; ঐ লেখক, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৫৯)। হাফিজ ইব্ন হিব্বান তাঁহার আস-সাহীহ গ্রন্থে আবূ উমামা (রা) হইতে যে হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন তদনুযায়ী উভয়ের ব্যবধান হইল দশ শতাব্দী। কারণ তিনি বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আদম কি নবী ছিলেন? রাসূলুল্লাহ (স) উত্তর দিলেন, হাঁ। লোকটি জিজ্ঞাসা করিল, তাঁহার মধ্যে এবং নূহ (আ)-এর মধ্যে ব্যবধান কত? দশ শতাব্দী (عشرة قرون) (প্রাগুক্ত)। সাহীহ আল-বুখারীতে ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে যে, ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, আদম ও নূহ (আ)-এর মধ্যে দশ কারন (عشرة قرون) ব্যবধান। ইহার মধ্যবর্তী সকলেই ইসলামের উপর ছিল (প্রাগুক্তঃ আল-বিদায়া, ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ১০১)। এখন কা’রন শব্দ দ্বারা যদি ১০০ বৎসর বুঝানো হইয়া থাকে, যাহা সচরাচর ব্যবহৃত হয়, তবে উভয়ের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়ায় এক হাজার বৎসর; আর উহা দ্বারা যদি জাতি তথা মানব সম্প্রদায় বুঝানো হইয়া থাকে, যেমন কুরআন করীমের বহু স্থানে ব্যবহৃত হইয়াছে, যথা [১৭: ১৭] وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِنَ الْقُرُوْنِ مِنْ بَعْدِ نُوْحٍ, "নূহের পর আমি কত মানব গোষ্ঠী ধ্বংস করিয়াছি” [২৩ : ৩১] ثُمَّ أَنْشَأْنَا مِنْ بَعْدِهِمْ قَرْنَا أَخَرِينَ "অতঃপর তাহাদের পরে অন্য এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করিয়াছিলাম" (২৩:৩১(; وَكَمْ أَهْلَكْنَا قَبْلُهُمْ مِنْ قَرْن "তাহাদের পূর্বে আমি কত মানবগোষ্ঠীকে বিনাশ করিয়াছি” (২৬:৩৭(; وَقُرُونًا بَيْنَ ذَلِكَ كَثِيرًا “এবং উহাদের অন্তর্বর্তীকালীন বহু সম্প্রদায়কেও"। অনুরূপভাবে হাদীছেও ব্যবহৃত হইয়াছে: خَيْرُ الْقُرُونِ قَرْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُوْنَهُمْ "সর্বোত্তম জাতি হইল আমার সহিত যাহারা আছে; অতঃপর তাহাদের পরপরই যাহারা আসিবে; অতঃপর তাহাদের পরপরই যাহারা আসিবে"।
তবে উভয়ের মধ্যে কয়েক হাজারের ব্যবধান হইবে। কারণ তখন অর্থ দাঁড়াইবে নূহ (আ)-এর পূর্বে দীর্ঘকাল যাবৎ কয়েক পুরুষ পৃথিবী আবাদ করিয়াছে (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া, ১খ., ১০১; ঐ লেখক, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৫৯-৬০)। হাফিজ ইব্ন কাছীরের এই শেষোক্ত ব্যাখ্যাটি গ্রহণ না করিয়া قرن শব্দ দ্বারা যদি জাতি তথা পুরুষ বা বংশপরম্পরা বুঝানো হইয়াছে বলিয়া ধরা হয় তাহা ইলে عشرة قرون -এর অর্থ দাঁড়াইবে দশ পুরুষ যাহা ইতিহাস ও কুলজি শাস্ত্রের সহিতও খাপ খায়। সুতরাং এই অর্থ গ্রহণই যুক্তিযুক্ত বলিয়া মনে হয়। বাইবেলের হিব্রু, সামী ও গ্রীক ভাষার কপিসমূহে বহু মতভেদ পরিলক্ষিত হয়, যাহার সবই অনুমান নির্ভর বলিয়া মনে হয়। বাইবেলে বর্ণিত নূহ (আ)-এর পূর্বপুরুষদের সময়কালের একটি ছক নিম্নে প্রদত্ত হইল:
পুত্র শীছ (আ)-এর জন্মের সময় আদম (আ)-এর বয়স ১৩০ বৎসর
" আনূশ (আ) " শীছ (আ) " ১০৫ "
কীনান (আ) " আনূশ (আ) " ৯০ "
মাহলাঈল (আ) " কীনান (আ) " ৭০ "
য়ারুদ (আ) " মাহলাঈল (আ) " " ৬৫ "
আখনূখ (আ) " য়ারুদ (আ) " ১৬২ "
মাতুশালিহ (আ) " " আখনূখ (আ) " ৬৫ "
লামিক (আ) " মাতুশালিহ (আ)" " ১৮৭ "
নূহ (আ) " লামিক (আ) " ১৮২
হযরত আদম (আ)-এর সৃষ্টি হইতে নূহ (আ)-এর জন্ম পর্যন্ত সময়কাল ১০৫৬ বৎসর, হযরত আদম (আ)-এর ইনতিকালের সময় তাঁহার বয়স ৯৩০ বৎসর। হযরত আদম (আ)-এর ইনতিকাল হইতে নূহ (আ)-এর জন্ম পর্যন্ত সময়কাল ১০২৬ বৎসর (Bible, Genesis, 5: 1-32; আবদুল ওয়াহহাব আন-নাজজার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩০; হিফজর রাহমান সিউহারবী, কাসাসুল-কুরআন, ১খ., ৬৪)।
📄 কুরআন কারীমে হযরত নূহ (আ)
আল-কুরআনুল করীমের বিরাট একটি অংশ হযরত নূহ (আ)-এর আলোচনায় পূর্ণ। তাঁহার দাওয়াত ও তাবলীগ, কওমের নাফরমানী, নৌযান তৈরী, মহাপ্লাবন, কাফিরদের ধ্বংস এবং নূহ (আ) ও তাঁহার অনুসারীদের রক্ষা পাওয়া প্রভৃতি বিষয়ে বহু স্থানে আলোচনা করা হইয়াছে। একটি পূর্ণ সূরাতেই তাঁহার আলোচনা করা হইয়াছে যাহার নামকরণ করা হইয়াছে নূহ (আ)-এর নামে (দ্র. ২৯ পারা ৭১ নং সূরা)। কুরআন করীমের ৪৩ স্থানে তাঁহার নাম উল্লেখ করা হইয়াছে। তন্মধ্যে সূরা আ'রাফ, সূরা হুদ, সূরা আল-মু'মিনূন, সূরা আশ-শু'আরা, সূরা আল-কামার ও সূরা নূহ-এ বিস্তারিত আলোচনা করা হইয়াছে। কুরআন করীমের যেসকল সূরা ও আয়াতে তাঁহার বর্ণনা আসিয়াছে উহার একটি ছক নিম্নরূপঃ
সূরা নং | সূরার নাম | আয়াত নং
৩ | আল-ইমরান | ৩৩-৩৪
৪ | আন-নিসা | ১৬৩
৬ | আল-আন'আম | ৮৪
৭ | আল-আ'রাফ | ৫৯-৬৪, ৬৯
৯ | আত-তাওবা | ৭০
১০ | ইউনুস | ৭১
১১ | হুদ | ২৫-৩৪, ৩৬-৪৮, ৮৯
১৪ | ইবরাহীম | ৯
১৭ | বনী ইসরাঈল | ৩, ১৭
১৯ | মারয়াম | ৫৮
২১ | আল-আম্বিয়া | ৭৬-৭৭
২২ | আল-হাজ্জ | ৪২
২৩ | আল-মু'মিনূন | ২৩-২৪
২৫ | আল-ফুরকান | ৩৭
২৬ | আশ-শু'আরা | ১০৫, ১০৬, ১১৬
২৯ | আল-'আনকাবূত | ১৪-১৫
৩৩ | আল-আহযাব | ৭
৩৭ | আস-সাফ্ফাত | ৭৫-৮৩
৩৮ | সাদ | ১২
৪০ | আল-মু'মিন | ৫, ৩১
৪২ | আশ-শূরা | ১৩
৫০ | কাফ | ১২-১৪
৫১ | আয-যারিয়াত | ৪৬
৫২ | আন-নাজম | ৫২
৫৪ | আল-কামার | ৯-১৬
৫৭ | আল-হাদীদ | ২৬
৬৬ | আত-তাহরীম | ১০
৭১ | নূহ | ১-২৮
(সংশোধনীসহ হিফজুর রহমান সিউহারবী, করাচী, ১৯৬৫, ১খ., ৩১)। তবে সূরা আ'রাফ, হুদ, মু'মিনূন, শু'আরা, কামার ও নূহ এই ৬টি সূরাতে নূহ (আ) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হইয়াছে। সূরার ধারাবাহিকতানুযায়ী তাঁহার আলোচনা নিম্নরূপ:
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعَالَمِينَ . ذُرِّيَّةً بَعْضُهَا مِنْ بَعْضٍ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ. (৩:৩৩-৩৪)
“নিশ্চয় আল্লাহ্ আদমকে, নূহকে ও ইবরাহীমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরকে বিশ্বজগতে মনোনীত করিয়াছেন। ইহারা একে অপরের বংশধর। আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ” (৩: ৩৩-৩৪)।
اِنَّ اللّٰهَ اصْطَفٰى اٰدَمَ وَّ نُوْحًا وَّاٰلَ اِبْرٰهِيْمَ وَ اٰلَ عِمْرٰنَ عَلَى الْعٰلَمِيْنَ
“আমি তো তোমার নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছি যেমন নূহ ও তাহার পরবর্তী নবীগণের নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছিলাম” (৪: ১৬৩)।
اِنَّآ اَوْحَيْنَا اِلَيْكَ كَمَا اَوْحَيْنَا اِلٰى نُوْحٍ وَّالنَّبِيّٖنَ مِنْ بَعْدِهٖ ۚ
وَوَهَبْنَا لَهٗ اِسْحٰقَ وَيَعْقُوْبَ كُلًّا هَدَيْنَا ۚ وَنُوْحًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهٖ دَاوٗدَ وَسُلَيْمٰنَ وَاَيُّوْبَ وَيُوْسُفَ وَمُوْسٰى وَهٰرُوْنَ ۚ وَكَذٰلِكَ نَجْزِى الْمُحْسِنِيْنَۙ
“পূর্বে নূহকেও সপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম এবং তাহার বংশধর দাউদ, সুলায়মান, আইয়ুব, ইউসুফ, মুসা ও হারুনকেও। আর এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদিগকে পুরস্কৃত করি” (৬:৮৪)।
وَلَقَدْ اَرْسَلْنَا نُوْحًا اِلٰى قَوْمِهٖ فَقَالَ يٰقَوْمِ اعْبُدُوا اللّٰهَ مَا لَكُمْ مِّنْ اِلٰهٍ غَيْرُهٗ ۚ اِنِّىْ اَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيْمٍ قَالَ الْمَلَاُ مِنْ قَوْمِهٖ اِنَّا لَنَرٰكَ فِيْ ضَلٰلٍ مُّبِيْنٍ قَالَ يٰقَوْمِ لَيْسَ بِيْ ضَلٰلَةٌ وَّلٰكِنِّىْ رَسُوْلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعٰلَمِيْنَ اُبَلِّغُكُمْ رِسٰلٰتِ رَبِّيْ وَاَنْصَحُ لَكُمْ وَاَعْلَمُ مِنَ اللّٰهِ مَا لَا تَعْلَمُوْنَ اَوَعَجِبْتُمْ اَنْ جَاۗءَكُمْ ذِكْرٌ مِّنْ رَّبِّكُمْ عَلٰى رَجُلٍ مِّنْكُمْ لِيُنْذِرَكُمْ وَلِتَتَّقُوْا وَلَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ فَكَذَّبُوْهُ فَاَنْجَيْنٰهُ وَالَّذِيْنَ مَعَهٗ فِى الْفُلْكِ وَاَغْرَقْنَا الَّذِيْنَ كَذَّبُوْا بِاٰيٰتِنَا ۗ اِنَّهُمْ كَانُوْا قَوْمًا عَمِيْنَ۠ (৭:৫৯-৬৪)
আমি তো নূহকে পাঠাইয়াছিলাম তাহার সম্প্রদায়ের নিকট এবং সে বলিয়াছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ্র ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ্ নাই। আমি তোমাদের জন্য মহাদিনের শাস্তির আশংকা করিতেছি। তাহার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ বলিয়াছিল, আমরা তো তোমাকে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখিতেছি। সে বলিয়াছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আমাতে কোন ভ্রান্তি নাই, বরং আমি তো জগতসমূহের প্রতিপালকের রাসূল। আমার প্রতিপালকের বাণী আমি তোমাদের নিকট পৌঁছাইতেছি ও তোমাদিগকে হিতোপদেশ দিতেছি এবং তোমরা যাহা জান না আমি তাহা আল্লাহ্র নিকট হইতে জানি। তোমরা কি বিস্মিত হইতেছ যে, তোমাদেরই একজনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে তোমাদের নিকট উপদেশ আসিয়াছে যাহাতে সে তোমাদিগকে সতর্ক করে? তোমরা সাবধান হও এবং তোমরা অনুগ্রহ লাভ কর। অতঃপর তাহারা তাহাকে মিথ্যাবাদী বলে। তাহাকে ও তাহার সঙ্গে যাহারা তরণীতে ছিল আমি তাহাদিগকে উদ্ধার করি এবং যাহারা আমার নিদর্শন অস্বীকার করিয়াছিল তাহাদিগকে নিমজ্জিত করি। তাহারা তো ছিল এক অন্ধ সম্প্রদায়” (৭:৫৯-৬৪)।
وَاذْكُرُوْٓا اِذْ جَعَلَكُمْ خُلَفَاۗءَ مِنْ بَعْدِ قَوْمِ نُّوْحٍ وَّزَادَكُمْ فِى الْخَلْقِ بَسْطَةً ۖ
“এবং স্মরণ কর, আল্লাহ্ তোমাদিগকে নূহের সম্প্রদায়ের পরে তাহাদের স্থলাভিষিক্ত করিয়াছেন এবং তোমাদের দৈহিক গঠনে অধিকতর হৃষ্টপুষ্ট বলিষ্ঠ করিয়াছেন” (৭:৬৯)।
الَمْ يَأْتِهِمْ نَبَأُ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ قَوْمٍ نُوْحٍ وَعَادٍ وَثَمُودَ وَقَوْمِ إِبْرَاهِيْمَ وَأَصْحَابِ مَدْيَنَ وَالْمُؤْتَفِكَاتِ أَتَتْهُمْ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَتِ فَمَا كَانَ اللهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ . (۹:٧٠)
"উহাদের পূর্ববর্তী নূহ, আদ ও ছামূদের সম্প্রদায়, ইবরাহীমের সম্প্রদায় এবং মাদয়ান ও বিধ্বস্ত নগরের অধিবাসিগণের সংবাদ কি উহাদের নিকট আসে নাই? উহাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনসহ উহাদের রাসূলগণ আসিয়াছিল। আল্লাহ এমন নহেন যে, তাহাদের উপর জুলুম করেন, কিন্তু উহারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করে" (৯ : ৭০)।
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَا نُوْحٍ إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ إِنْ كَانَ كَبُرَ عَلَيْكُمْ مَقَامِي وَتَذْكِيرِي بِأَيْتِ اللَّهِ فَعَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْتُ فَاجْمِعُوا أَمْرَكُمْ وَشُرَكَاءَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُنْ أَمْرُكُمْ عَلَيْكُمْ غُمَّةٌ ثُمَّ اقْضُوا إِلَى وَلَا تُنْظِرُونَ (۱۰:۷۱)
"উহাদিগকে নূহ-এর বৃত্তান্ত শোনাও। সে তাহার সম্প্রদায়কে বলিয়াছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আমার অবস্থিতি ও আল্লাহ্ নিদর্শন দ্বারা আমার উপদেশ দান তোমাদের নিকট যদি দুঃসহ হয় তবে আমি তো আল্লাহর উপর নির্ভর করি। তোমরা যাহাদিগকে শরীক করিয়াছ তৎসহ তোমাদের কর্তব্য স্থির করিয়া লও, পরে যেন কর্তব্য বিষয়ে তোমাদের কোন সংশয় না থাকে। আমার সম্বন্ধে তোমাদের কর্ম নিষ্পন্ন করিয়া ফেল এবং আমাকে অবকাশ দিও না" (১০ : ৭১)।
فَإِنْ تَوَلَّيْتُمْ فَمَا سَأَلْتُكُمْ مِنْ أَجْرِ إِنْ أَجْرِيَ إِلا عَلَى اللهِ وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ. فَكَذَّبُوْهُ فَنَجَّيْنَهُ وَمَنْ مَّعَهُ فِي الْفُلْكِ وَأَغْرَقْنَا الَّذِينَ كَذَّبُوا بِأَيْتِنَا فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُنْذِرِينَ (۷۳-۱۰:۷۲)
"অতঃপর তোমরা মুখ ফিরাইয়া লইলে লইতে পার, তোমাদের নিকট আমি তো কোন পারিশ্রমিক চাহি নাই, আমার পারিশ্রমিক আছে আল্লাহ্র নিকট। আমি তো আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হইতে আদিষ্ট হইয়াছি। আর উহারা তাহাকে মিথ্যাবাদী বলে; অতঃপর তাহাকে স্থলাভিষিক্ত করি আর যাহারা আর নিদর্শন প্রত্যাখ্যান করিয়াছিল তাহাদিগকে নিমজ্জিত করি। সুতরাং দেখ, যাহাদিগকে সতর্ক করা হইয়াছিল তাহাদের পরিণাম কী হইয়াছিল” (১০ : ৭২-৭৩)।
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوْحًا إِلَى قَوْمِهِ إِنِّي لَكُمْ نَذِيرٌ مُّبِينٌ . أَنْ لَا تَعْبُدُوا إِلا اللَّهَ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ الیم . فَقَالَ الْمَلَأُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَوْمِهِ مَا نَرَاكَ إِلا بَشَرًا مِّثْلَنَا وَمَا نَرَاكَ اتَّبَعَكَ إِلا الَّذِينَ هُمْ أَرَاذِلْنَا بَادِيَ الرأي وَمَا نَرَى لَكُمْ عَلَيْنَا مِنْ فَضْلٍ بَلْ نَظُنُّكُمْ كَذِبِينَ . قَالَ يُقَوْمِ أَرَتَيْتُمْ إِنْ كُنْتُ عَلَى بَيِّنَةٍ مِّنْ رَّبِّي وَأَتْنِي رَحْمَةً مِّنْ عِنْدِهِ فَعُمِّيَتْ عَلَيْكُمْ أَنُلْزِمُكُمُوْهَا وَأَنْتُمْ لَهَا كَارِهُوْنَ . وَيَا قَوْمِ لَا أَسْتَلُكُمْ عَلَيْهِ مَالًا إِنْ أَجْرِيَ إِلا عَلَى اللهِ وَمَا أَنَا بِطَارِدِ الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّهُمْ مُلْقُوا رَبِّهِمْ وَلَكِنِّى أَرَاكُمْ قَوْمًا تَجْهَلُونَ وَيُقَوْمٍ مَنْ يَنْصُرُنِي مِنَ الله إِنْ طَرَدْتُهُمْ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ ، وَلَا أَقُولُ لَكُمْ عِنْدِي خَزَائِنُ اللهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَا أَقُولُ إِنِّي مَلَكٌ وَلَا أَقُولُ لِلَّذِينَ تَزْدَرِي أَعْيُنُكُمْ لَنْ يُؤْتِيَهُمُ اللهُ خَيْرًا اللهُ أَعْلَمُ بِمَا فِي أَنْفُسِهِمْ إِنِّي إِذًا لَمِنَ الظَّلِمِينَ ، قَالُوا يَا نُوحُ قَدْ جُدَلْتَنَا فَاكْثَرْتَ جِدَالَنَا فَأْتِنَا بِمَا تَعِدُنَا إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّدِقِينَ . قَالَ إِنَّمَا يَأْتِيْكُمْ بِهِ اللَّهُ إِنْ شَاءَ وَمَا أَنْتُمْ بِمُعْجِزِينَ. وَلَا يَنْفَعُكُمْ نُصْحِي إِنْ أَرَدْتُ أَنْ أَنْصَحَ لَكُمْ إِنْ كَانَ اللهُ يُرِيدُ أَنْ يُغْوِيَكُمْ هُوَ رَبُّكُمْ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ . أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَهُ قُلْ إِنِ افْتَرَيْتُهُ فَعَلَى إِجْرَامِي وَأَنَا بَرِيءٌ مِّمَّا تُجْرِمُونَ . وَأُوحِيَ إِلَى نُوحٍ أَنَّهُ لَنْ يُؤْمِنَ مِنْ قَوْمِكَ إِلَّا مَنْ قَدْ أَمَنَ فَلَا تَبْتَئِسْ بِمَا كَانُوا يَفْعَلُوْنَ . وَاصْنَعِ الْفُلْكَ بِأَعْيُنِنَا وَوَحْيِنَا وَلَا تُخَاطِبْنِي فِي الَّذِينَ ظَلَمُوا أَنَّهُمْ مُغْرَقُونَ . وَيَصْنَعُ الْفُلْكَ وَكُلَّمَا مَرَّ عَلَيْهِ مَلَاً مِّنْ قَوْمِهِ سَخَرُوا مِنْهُ قَالَ إِنْ تَسْخَرُوا مِنَّا فَإِنَّا نَسْخَرُ مِنْكُمْ كَمَا تَسْخَرُونَ . فَسَوْفَ تَعْلَمُونَ مَنْ يَأْتِيْهِ عَذَابٌ يُخْزِيهِ وَيَحِلُّ عَلَيْهِ عَذَابٌ مُّقِيمٌ. حَتَّى إِذَا جَاءَ أَمْرُنَا وَفَارَ التَّنُّورُ قُلْنَا احْمِلْ فِيهَا مِنْ كُلُّ زَوْجَيْنِ اثْنَيْنِ وَأَهْلَكَ الأَ مَنْ سَبَقَ عَلَيْهِ الْقَوْلُ وَمَنْ أَمَنْ وَمَا أَمَنَ مَعَهُ إِلَّا قَلِيلٌ ، وَقَالَ ارْكَبُوا فِيهَا بِسْمِ اللهِ مَجْرِهَا وَمُرْسُهَا إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ. وَهِيَ تَجْرِي بِهِمْ فِي مَوْجٌ كَالْجِبَالِ وَنَادَى نُوحٌ ابْنَهُ وَكَانَ فِي مَعْزِلٍ يُبْنَى ارْكَبْ مَعَنَا وَلَا تَكُنْ مَعَ الْكَفِرِينَ . قَالَ سَاوِى إِلَى جَبَلٍ يَعْصِمُنِي مِنَ الْمَاءِ قَالَ لَا عَاصِمَ الْيَوْمَ مِنْ أَمْرِ اللهِ إِلا مَنْ رَّحِمَ وَحَالَ بَيْنَهُمَا الْمَوْجُ فَكَانَ مِنَ الْمُغْرَقِينَ، وَقِيلَ يَا أَرْضُ ابْلَعِي مَاءَكِ وَيَا سَمَاءُ أَقْلِعِي وَغِيضَ الْمَاءُ وَقُضِيَ الْأَمْرُ وَاسْتَوَتْ عَلَى الْجُودِي وَقِيلَ بُعْداً لِلْقَوْمِ الظَّلِمِينَ. وَنَادَى نُوحٌ رَبَّهُ فَقَالَ رَبِّ إِنَّ ابْنِي مِنْ أَهْلِي وَإِنَّ وَعْدَكَ الْحَقُّ وَأَنْتَ أَحْكَمُ الْحَكِمِينَ ، قَالَ يُنُوحُ إِنَّهُ لَيْسَ مِنْ أَهْلِكَ إِنَّهُ عَمَلٌ غَيْرُ صَالِحٍ فَلَا تَسْتَلْنِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنِّي أَعِظُكَ أَنْ تَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ . قَالَ رَبِّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَسْتَلْكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُنْ مِّنَ الْخَسِرِينَ ، قِيلَ يُنُوحُ اهْبِطَ بِسَلَام مِّنَّا وَبَرَكَت عَلَيْكَ وَعَلَى أُمَمٍ مِّمَّنْ مَّعَكَ وَأُمَمٌ سَنُمَتْعُهُمْ ثُمَّ يَمَسُّهُمْ مِنَّا عَذَابٌ اليم. (٤٨ - ١١:٢٥)
"আমি তো নূহকে তাহার সম্প্রদায়ের নিকট পাঠাইয়াছিলাম। সে বলিয়াছিল, আমি অবশ্যই তোমাদের জন্য প্রকাশ্য সতর্ককারী, যেন তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অপর কিছুর ইবাদত না কর; আমি তো তোমাদের জন্য মর্মন্তুদ দিবসের শাস্তির আশংকা করি। তাহার সম্প্রদায়ের প্রধানেরা, যাহারা ছিল কাফির, তাহারা বলিল, আমরা তোমাকে তো আমাদের মত মানুষ ব্যতীত কিছু দেখিতেছি না; আমরা তো দেখিতেছি তোমার অনুসরণ করিতেছে তাহারাই, যাহারা আমাদের মধ্যে বাহ্য দৃষ্টিতেই অধম এবং আমরা আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব দেখিতেছি না, বরং আমরা তোমাদিগকে মিথ্যাবাদী মনে করি। সে বলিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে বল, আমি যদি আমার প্রতিপালক প্রেরিত স্পষ্ট নিদর্শনে প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং তিনি যদি আমাকে তাঁহার নিজ অনুগ্রহ হইতে দান করিয়া থাকেন, আর ইহা তোমাদের নিকট গোপন রাখা হইয়াছে, আমি কি এই বিষয়ে তোমাদিগকে বাধ্য করিতে পারি, যখন তোমরা ইহা অপসন্দ কর? হে আমার সম্প্রদায়! ইহার পরিবর্তে আমি তোমাদের নিকট ধন-সম্পদ যাজ্ঞা করি না। আমার পারিশ্রমিক তো আল্লাহ্র নিকট এবং মুমিনদিগকে তাড়াইয়া দেওয়া আমার কাজ নয়। তাহারা নিশ্চিতভাবে তাহাদের প্রতিপালকের সাক্ষাত লাভ করিবে। কিন্তু আমি তো দেখিতেছি তোমরা এক অজ্ঞ সম্প্রদায়। হে আমার সম্প্রদায়! আমি যদি তাহাদিগকে তাড়াইয়া দেই, তবে আল্লাহ হইতে আমাকে কে রক্ষা করিবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করিবে না? আমি তোমাদিগকে বলি না, আমার নিকট আল্লাহর ধন-ভাণ্ডার আছে আর না অদৃশ্য সম্বন্ধে আমি অবগত এবং আমি ইহাও বলি না যে, আমি ফেরেশতা।
তোমাদের দৃষ্টিতে যাহারা হেয় তাহাদের সম্বন্ধে আমি বলি না যে, আল্লাহ তাহাদিগকে কখনই মঙ্গল দান করিবেন না; তাহাদের অন্তরে যাহা আছে তাহা আল্লাহ সম্যক অবগত। তাহা হইলে আমি অবশ্যই জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হইব। তাহারা বলিল, হে নূহ! তুমি তো আমাদের সহিত বিতণ্ডা করিয়াছ, তুমি বিতণ্ডা করিয়াছ আমাদের সহিত অতিমাত্রায়; সুতরাং তুমি সত্যবাদী হইলে আমাদিগকে যাহার ভয় দেখাইতেছ তাহা আনয়ন কর। সে বলিল, ইচ্ছা করিলে আল্লাহই উহা তোমাদের নিকট উপস্থিত করিবেন এবং তোমরা উহা ব্যর্থ করিতে পারিবে না। আমি তোমাদিগকে উপদেশ দিতে চাহিলেও আমার উপদেশ তোমাদের উপকারে আসিবে না, যদি আল্লাহ তোমাদিগকে বিভ্রান্ত করিতে চাহেন। তিনিই তোমাদের প্রতিপালক এবং তাঁহারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন।
তাহারা কি বলে যে, সে ইহা রচনা করিয়াছে? বল, আমি যদি ইহা রচনা করিয়া থাকি, তবে আমি আমার অপরাধের জন্য দায়ী হইব। তোমরা যে অপরাধ করিতেছ তাহা হইতে আমি দায়মুক্ত। নূহের প্রতি প্রত্যাদেশ হইয়াছিল, যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহারা ব্যতীত তোমার সম্প্রদায়ের অন্য কেহ কখনও ঈমান আনিবে না, সুতরাং তাহারা যাহা করে তজ্জন্য তুমি দুঃখিত হইও না। তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার প্রত্যাদেশ অনুযায়ী নৌকা নির্মাণ কর এবং যাহারা সীমালংঘন করিয়াছে তাহাদের সম্পর্কে তুমি আমাকে কিছু বলিও না; তাহারা তো নিমজ্জিত হইবে। সে নৌকা নির্মাণ করিতে লাগিল এবং যখনই তাহার সম্প্রদায়ের প্রধানেরা তাহার নিকট দিয়া যাইত, তাহাকে উপহাস করিত। সে বলিত, তোমরা যদি আমাকে উপহাস কর তবে আমরাও তোমাদিগকে উপহাস করিব। যেমন তোমরা উপহাস করিতেছ এবং তোমরা অচিরে জানিতে পারিবে, কাহার উপর আসিবে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আর কাহার উপর আপতিত হইবে স্থায়ী শাস্তি।
অবশেষে যখন আমার আদেশ আসিল এবং উনান উথলিয়া উঠিল; আমি বলিলাম, ইহাতে উঠাইয়া লও প্রত্যেক শ্রেণীর যুগলের দুইটি, যাহাদের বিরুদ্ধে পূর্ব সিদ্ধান্ত হইয়াছে তাহারা ব্যতীত তোমার পরিবার-পরিজনকে এবং যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদিগকে। তাহার সংগে ঈমান আনিয়াছিল অল্প কয়েকজন। সে বলিল, ইহাতে আরোহণ কর, "আল্লাহর নামে ইহার গতি ও স্থিতি, আমার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু"। পর্বত প্রমাণ তরঙ্গের মধ্যে ইহা তাহাদিগকে লইয়া বহিয়া চলিল। নূহ তাহার পুত্রকে, যে পৃথক ছিল, আহবান করিয়া বলিল, হে আমার পুত্র! আমাদের সঙ্গে আরোহণ কর এবং কাফিরদের সঙ্গী হইও না। সে বলিল, আমি এমন এক পর্বতে আশ্রয় লইব যাহা আমাকে প্লাবন হইতে রক্ষা করিবে। সে বলিল, আজ আল্লাহ্ হুকুম হইতে রক্ষা করিবার কেহ নাই, তবে যাহাকে আল্লাহ দয়া করিবেন সে ব্যতীত। ইহার পর তরঙ্গ উহাদিগকে বিচ্ছিন্ন করিয়া দিল এবং সে নিমজ্জিতদের অন্তর্ভুক্ত হইল। ইহার পর বলা হইল, হে পৃথিবী! তুমি তোমার পানি গ্রাস করিয়া লও এবং হে আকাশ! ক্ষান্ত হও। ইহার পর বন্যা প্রশমিত হইল এবং কার্য সমাপ্ত হইল, নৌকা জুদী পর্বতের উপর স্থির হইল এবং বলা হইল, জালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হউক। নূহ তাহার প্রতিপালককে সম্বোধন করিয়া বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার পুত্র আমার পরিবারভুক্ত এবং আপনার প্রতিশ্রুতি সত্য, আর আপনি তো বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক। তিনি বলিলেন, হে নূহ! সে তো তোমার পরিবারভুক্ত নহে। সে অবশ্যই অসৎকর্মপরায়ণ। সুতরাং যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নাই সে বিষয়ে আমাকে অনুরোধ করিও না। আমি তোমাকে উপদেশ দিতেছি, তুমি যেন অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত না হও। সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক! যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নাই, সে বিষয়ে যাহাতে আপনাকে অনুরোধ না করি, এইজন্য আমি আপনার শরণ লইতেছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন এবং আমাকে দয়া না করেন, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হইব। বলা হইল, হে নূহ! অবতরণ কর আমার পক্ষ হইতে শান্তি ও কল্যাণসহ এবং তোমার প্রতি ও যে সমস্ত সম্প্রদায় তোমার সঙ্গে আছে তাহাদের প্রতি; অপর সম্প্রদায়সমূহকে আমি জীবন উপভোগ করিতে দিব, পরে আমা হইতে মর্মন্তুদ শাস্তি উহাদিগকে স্পর্শ করিবে” (১১: ২৫-৪৮)।
وَيَا قَوْمِ لَا يَجْرِمَنَّكُمْ شِقَاقِي أَنْ يُصِيبَكُمْ مِثْلُ مَا أَصَابَ قَوْمَ نُوحٍ .
"হে আমার সম্প্রদায়! আমার সহিত বিরোধ যেন কিছুতেই তোমাদিগকে এমন অপরাধ না করায় যাহাতে তোমাদের উপর তাহার অনুরূপ বিপদ আপতিত হইবে, যাহা আপতিত হইয়াছিল নূহের সম্প্রদায়ের উপর" (১১:৮৯)।
الَمْ يَأْتِكُمْ نَبَأُ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ قَوْمِ نُوحٍ وَعَادٍ وَثَمُودَ وَالَّذِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ لَا يَعْلَمُهُمْ إِلَّا اللَّهُ جَاءَتْهُمْ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَتِ فَرَدُّوا أَيْدِيَهُمْ فِي أَفْوَاهِهِمْ وَقَالُوا إِنَّا كَفَرْنَا بِمَا أُرْسِلْتُمْ بِهِ وَإِنَّا لَفِي شَكٍّ مِّمَّا تَدْعُونَنَا إِلَيْهِ مُرِيبُ. (١٤:٩)
"তোমাদের নিকট কি সংবাদ আসে নাই তোমাদের পূর্ববর্তীদের, নূহের সম্প্রদায়ের, আদের ও ছামূদের এবং তাহাদের পূর্ববর্তীদের? উহাদের বিষয় আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেহ জানে না, উহাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনসহ উহাদের রাসূল আসিয়াছিল, উহারা উহাদের হাত উহাদের মুখে স্থাপন করিত এবং বলিত, যাহাসহ তোমরা প্রেরিত হইয়াছ তাহা আমরা অবশ্যই অস্বীকার করি এবং আমরা অবশ্যই বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রহিয়াছি সে বিষয়ে, যাহার প্রতি তোমরা আমাদিগকে আহবান করিতেছ” (১৪: ৯)।
ذُرِّيَّةً مَنْ حَمَلْنَا مَعَ نُوحٍ إِنَّهُ كَانَ عَبْدًا شَكُورًا .
“হে তাহাদের বংশধর! যাহাদিগকে আমি নূহের সহিত আরোহণ করাইয়াছিলাম; সে তো ছিল পরম কৃতজ্ঞ বান্দা" (১৭ঃ৩)।
وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِنَ الْقُرُونِ مِنْ بَعْدِ نُوحٍ وَكَفَى بِرَبِّكَ بِذُنُوبِ عِبَادِهِ خَبِيرًا بَصِيرًا . (۱۷:۱۷)
"নূহের পর আমি কত মানবগোষ্ঠী ধ্বংস করিয়াছি! তোমার প্রতিপালকই তাঁহার বান্দাদের পাপাচরণের সংবাদ রাখা ও পর্যবেক্ষণের জন্য যথেষ্ট" (১৭: ১৭)।
أولَئِكَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ مِنْ ذُرِّيَةِ أَدَمَ وَمِمَّنْ حَمَلْنَا مَعَ نُوحٍ وَمِنْ ذُرِّيَّةِ إِبْرَاهِيمَ واسْرَائِيلَ وَمِمَّنْ هَدَيْنَا وَاجْتَبَيْنَا إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ أَيْتُ الرَّحْمَنِ خَرُّوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا . (١٩:٥٨)
"ইহারাই তাহারা, নবীদের মধ্যে যাহাদিগকে আল্লাহ অনুগ্রহ করিয়াছেন, আদমের বংশ হইতে ও যাহাদিগকে আমি নূহের সহিত নৌকায় আরোহণ করাইয়াছিলাম এবং ইবরাহীম ও ইসমাঈলের বংশোদ্ভূত ও যাহাদিগকে আমি পথনির্দেশ করিয়াছিলাম ও মনোনীত করিয়াছিলাম; তাহাদের নিকট দয়াময়ের আয়াত আবৃত্তি করা হইলে তাহারা সিজদায় লুটাইয়া পড়িত ক্রন্দন করিতে করিতে” (১৯:৫৮)।
وَنُوحًا إِذْ نَادَى مِنْ قَبْلُ فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَنَجْيْنَهُ وَأَهْلَهُ مِنَ الْكَرْبِ العَظِيمِ. وَنَصْرْتُهُ مِنَ الْقَوْمِ الَّذِينَ كَذَبُوا بِأَيْتِنَا أَنَّهُمْ كَانُوا قَوْمَ سَوْءٍ فَأَعْرَقْنَهُمْ أَجْمَعِينَ (٧٧-٢١:٦٧)
"স্মরণ কর নূহকে; পূর্বে সে যখন আহ্বান করিয়াছিল তখন আমি সাড়া দিয়াছিলাম তাহার আহ্বানে এবং তাহাকে ও তাহার পরিবারবর্গকে মহাসংকট হইতে উদ্ধার করিয়াছিলাম এবং আমি তাহাকে সাহায্য করিয়াছিলাম সেই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যাহারা আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করিয়াছিল; নিশ্চয়ই উহারা ছিল এক মন্দ সম্প্রদায়। এইজন্য উহাদের সকলকেই আমি নিমজ্জিত করিয়াছিলাম” (২১:৭৬-৭৭)।
وَإِنْ تُكَذِّبُوكَ فَقَدْ كَذَّبَتْ قَبْلَهُمْ قَوْمُ نُوحٍ وَعَادٌ وَثَمُودُ . (٢٢:٤٢)
"এবং লোকেরা যদি তোমাকে অস্বীকার করে তবে উহাদের পূর্বে অস্বীকার করিয়াছিল তো নূহ, 'আদ ও ছামূদের সম্প্রদায়" (২২:৪২)!
ولَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوْحًا إِلَى قَوْمِهِ فَقَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَالَكُمْ مِّنْ الهُ غَيْرُهُ أَفَلَا تَتَّقُونَ، فَقَالَ الْمَلَؤُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَوْمِهِ مَا هَذَا إِلَّا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُرِيدُ أَنْ يَتَفَضَّلَ عَلَيْكُمْ وَلَوْ شَاءَ اللهُ لَأَنْزَلَ مَلَئِكَةً مَّا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي أَبَائِنَا الْأَوَّلِينَ إِنْ هُوَ إِلا رَجُلٌ بِهِ جِنَّةٌ فَتَرَبَّصُوا بِهِ حَتَّى حِينٍ . قَالَ رَبِّ انْصُرْنِي بِمَا كَذَّبُونِ. فَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِ ان اصنع الفُلْكَ بِأَعْيُنِنَا وَوَحْيِنَا فَإِذَا جَاءَ أَمْرُنَا وَفَارَ التَّنُّورُ فَاسْلُكَ فِيهَا مِنْ كُلِّ زَوْجَيْنِ اثْنَيْنِ وَأَهْلَكَ إِلَّا مَنْ سَبَقَ عَلَيْهِ الْقَوْلُ مِنْهُمْ وَلَا تُخَاطِبْنِي فِي الَّذِينَ ظَلَمُوا إِنَّهُمْ مُغْرَقُونَ . فَإِذَا اسْتَوَيْتَ أَنْتَ وَمَنْ مَّعَكَ علَى الْفُلْكِ فَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي نَجَّانَا مِنَ الْقَوْمِ الظَّلِمِينَ . وَقُلْ رَّبِّ أَنْزِلْنِي مُنْزَلَا مُبْرَكًا وَأَنْتَ خَيْرُ الْمُنْزِلِينَ .
"আমি নূহকে পাঠাইয়াছিলাম তাহার সম্প্রদায়ের নিকট। সে বলিয়াছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ নাই। তবুও কি তোমরা সাবধান হইবে না? তাহার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ, যাহারা কুফরী করিয়াছিল, তাহারা বলিল, এতো তোমাদের মত একজন মানুষই, তোমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করিতে চাহিতেছে, আল্লাহ ইচ্ছা করিলে ফেরেশতাই পাঠাইতেন। আমরা তো আমাদের পূর্বপুরুষগণের কালে এইরূপ ঘটিয়াছে, একথা শুনি নাই। এতো এমন লোক যাহাকে উন্মত্ততা পাইয়া বসিয়াছে; সুতরাং তোমরা ইহার সম্পর্কে কিছুকাল অপেক্ষা কর। নূহ বলিয়াছিল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য কর, কারণ উহারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলিতেছে। অতঃপর আমি তাহার নিকট ওহী পাঠাইলাম, তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার ওহী অনুযায়ী নৌযান নির্মাণ কর, অতঃপর যখন আমার আদেশ আসিবে ও উনুন উথলিয়া উঠিবে তখন উঠাইয়া লইও প্রত্যেক জীবের এক এক জোড়া এবং তোমার পরিবার-পরিজনকে, তাহাদিগকে ছাড়া যাহাদের বিরুদ্ধে পূর্বে সিদ্ধান্ত হইয়াছে। আর তাহাদের সম্পর্কে তুমি আমাকে কিছু বলিও না যাহারা জুলুম করিয়াছে। তাহারা তো নিমজ্জিত হইবে। যখন তুমি ও তোমার সঙ্গীরা নৌযানে আসন গ্রহণ করিবে তখন বলিও, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্রই যিনি আমাদিগকে উদ্ধার করিয়াছেন জালিম সম্প্রদায় হইতে। আরও বলিও, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমনভাবে অবতরণ করাও যাহা হইবে কল্যাণকর; আর তুমিই শ্রেষ্ঠ অবতরণকারী” (২৩: ২৩-২৯)।
وَقَوْمَ نُوحٍ لَمَّا كَذَّبُوا الرُّسُلَ أَغْرَقْنَهُمْ وَجَعَلْتُهُمْ لِلْناسِ آيَةً وَأَعْتَدْنَا لِلظَّلِمِينَ عَذَابًا أَلِيمًا .
"এবং নূহের সম্প্রদায়কেও সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করিয়াছিলাম, যখন তাহারা রাসূলগণের প্রতি মিথ্যা আরোপ করিল তখন আমি উহাদিগকে নিমজ্জিত করিলাম এবং উহাদিগকে মানবজাতির জন্য নিদর্শনস্বরূপ করিয়া রাখিলাম। জালিমদের জন্য আমি মর্মন্তুদ শাস্তি প্রস্তুত করিয়া রাখিয়াছি" (২৫:৩৭)।
كَذَّبَتْ قَوْمُ نُوحٍ الْمُرْسَلِينَ إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ نُوحٌ أَلَا تَتَّقُونَ . إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ ، فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ. وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرِ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَلَمِينَ . فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ . قَالُوا أَنُؤْمِنُ لَكَ وَاتَّبَعَكَ الْأَرْذَلُونَ . قَالَ وَمَا عِلْمِي بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ . إِنْ أَنَا إِلا نَذِيرٌ مُبِينٌ. قَالُوا لَئِنْ لَّمْ تَنْتَهِ يُنُوحُ لَتَكُونَنَّ مِنَ الْمَرْجُوْمِينَ . قَالَ رَبِّي إِنَّ قَوْمِي كَذَّبُونِ . فَافْتَحْ بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ فَتْحًا وَنَجِّنِي وَمَنْ مَّعِيَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ. فَأَنْجَيْنَهُ وَمَنْ مَّعَهُ فِي الْفُلْكِ الْمَشْحُونِ . ثُمَّ أَعْرَقْنَا بَعْدُ الْبَقِينَ.
"নূহের সম্প্রদায় রাসূলগণের প্রতি মিথ্যারোপ করিয়াছিল। যখন উহাদের ভ্রাতা নূহ উহাদিগকে বলিল, তোমরা কি সাবধান হইবে না? আমি তো তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসূল। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। আমি তোমাদের নিকট ইহার জন্য কোন প্রতিদান চাহি না। আমার পুরস্কার তো জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট আছে। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। উহারা বলিল, আমরা কি তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিব অথচ ইতরজনেরা তোমার অনুসরণ করিতেছে? নূহ বলিল, উহারা কী করিত তাহা আমার জানা নাই। উহাদের হিসাব গ্রহণ তো আমার প্রতিপালকেরই কাজ; যদি তোমরা বুঝিতে! মুমিনদিগকে তাড়াইয়া দেওয়া আমার কাজ নহে। আমি তো কেবল একজন স্পষ্ট সতর্ককারী। উহারা বলিল, হে নূহ! তুমি যদি নিবৃত্ত না হও তবে তুমি অবশ্যই প্রস্তরাঘাতে নিহতদের শামিল হইবে। নূহ বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় তো আমাকে অস্বীকার করিতেছে। সুতরাং তুমি আমার ও উহাদের মধ্যে স্পষ্ট মীমাংসা করিয়া দাও এবং আমাকে ও আমার সহিত যে সব মুমিন আছে, তাহাদিগকে রক্ষা কর। অতঃপর আমি তাহাকে ও তাহার সঙ্গে যাহারা ছিল, তাহাদিগকে রক্ষা করিলাম বোঝাই নৌযানে; তৎপর অবশিষ্ট সকলকে নিমজ্জিত করিলাম" (২৬: ১০৫-১২০)।
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا الى قَوْمِهِ فَلَبِثَ فِيهِمْ أَلْفَ سَنَةٍ إِلا خَمْسِينَ عَامًا فَأَخَذَهُمُ الطُّوفَانُ وَهُمْ ظُلِمُونَ . فَانْجَيْنَهُ وَأَصْحَابَ السَّفِينَة وَجَعَلْنَهَا آيَةً للعلمين. (٢٩:١٤-١٥)
"আমি নূহকে তাহার সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করিয়াছিলাম। সে উহাদের মধ্যে অবস্থান করিয়াছিল পঞ্চাশ কম হাজার বৎসর। অতঃপর প্লাবন উহাদিগকে গ্রাস করে, কারণ উহারা ছিল সীমালংঘনকারী। অতঃপর আমি তাহাকে এবং যাহারা নৌযানে আরোহণ করিয়াছিল তাহাদিগকে রক্ষা করিলাম এবং বিশ্বজগতের জন্য ইহাকে করিলাম একটি নিদর্শন” (২৯: ১৪-১৫)।
وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّنَ مِيْثَاقَهُمْ وَمِنْكَ وَمِنْ نُوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَأَخَذْنَا مِنْهُمْ مِيثَاقًا غليظا .
"স্মরণ কর, যখন আমি নবীদের নিকট হইতে অঙ্গীকার গ্রহণ করিয়াছিলাম এবং তোমার নিকট হইতেও এবং নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও মারয়াম-তনয় ঈসার নিকট হইতেও-তাহাদের নিকট হইতে গ্রহণ করিয়াছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার" (৩৩: ৭)।
وَلَقَدْ نَادَانَا نُوحٌ فَلَنِعْمَ الْمُجِيبُونَ. وَنَجَّيْنُهُ وَاهْلَهُ مِنَ الكَرْبِ العَظِيمِ. وَجَعَلْنَا ذُرِّيَّتَهُ هُمُ الْبَقِينَ. وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ . سَلْمٌ عَلَى نُوحٍ فِي العُلَمِينَ إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا المُؤْمِنِينَ . ثُمَّ أَغْرَقْنَا الْأَخَرِينَ.
"নূহ আমাকে আহ্বান করিয়াছিল, আর আমি কত উত্তম সাড়া দানকারী। তাহাকে এবং তাহার পরিবারবর্গকে আমি উদ্ধার করিয়াছিলাম মহাসংকট হইতে। তাহার বংশধরদিগকেই আমি বিদ্যমান রাখিয়াছি বংশপরম্পরায়, আমি ইহা পরবর্তীদের স্মরণে রাখিয়াছি। সমগ্র বিশ্বের মধ্যে নূহের প্রতি শান্তি বর্ষিত হউক। এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদিগকে পুরস্কৃত করিয়া থাকি, সে ছিল আমার মুমিন বান্দাদের অন্যতম। অন্য সকলকে আমি নিমজ্জিত করিয়াছিলাম" (৩৭: ৭৫-৮২)।
كَذَّبَتْ قَبْلَهُمْ قَوْمٌ نُوحٍ .
"ইহাদের পূর্বেও রাসূলদিগকে অস্বীকার করিয়াছিল নূহের সম্প্রদায়” (৩৮: ১২)।
كذبتْ قَبْلَهُمْ قَوْمٌ نُوحٍ وَالْأَحْزَابُ مِنْ بَعْدِهِمْ وَهَمَّتْ كُلُّ أُمَّةٍ بِرَسُولِهِمْ لِيَأْخُذُوهُ وَجَدَلُوا بِالْبَاطِلِ لِيُدْحِضُوا بِهِ الْحَقَّ فَأَخَذْتُهُمْ فَكَيْفَ كَانَ عِقَابِ .
"ইহাদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায় এবং তাহাদের পরে অন্যান্য দলও অস্বীকার করিয়াছিল। প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজ নিজ রাসূলকে আবদ্ধ করিবার অভিসন্ধি করিয়াছিল এবং উহারা অসার তর্কে লিপ্ত হইয়াছিল, উহা দ্বারা সত্যকে ব্যর্থ করিয়া দিবার জন্য। ফলে আমি উহাদিগকে পাকড়াও করিলাম এবং কত কঠোর ছিল আমার শান্তি" (৪০:৫)।
شَرَعَ لَكُمْ مِّنَ الدِّيْنِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا . (٤٢:١٣)
"তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করিয়াছেন দীন যাহার নির্দেশ দিয়াছিলেন নূহকে" (৪২:১৩)।
كذبتْ قَبْلَهُمْ قَوْمٌ نُوحٍ وَأَصْحَابُ الرَّسِّ وَثَمُودُ ، وَعَادٌ وَفِرْعَوْنُ وَإِخْوَانُ لُوطٍ وَأَصْحَابُ الأَيْكَةِ وَقَوْمُ تُبَّعِ كُلُّ كَذَبَ الرُّسُلَ فَحَقَّ وَعِيدِ .
"উহাদের পূর্বেও সত্য প্রত্যাখ্যান করিয়াছিল নূহের সম্প্রদায়, রাস্স ও ছামূদ সম্প্রদায়, আদ, ফিরআওন ও লূত সম্প্রদায় এবং আয়কার অধিবাসী ও তুব্বা' সম্প্রদায়; উহারা সকলেই রাসূলদিগকে মিথ্যাবাদী বলিয়াছিল, ফলে উহাদের উপর আমার শান্তি আপতিত হইয়াছে" (৫০:১২-১৪)।
وَقَوْمَ نُوحٍ مِّنْ قَبْلُ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَاسِقِينَ .
"আমি ধ্বংস করিয়াছিলাম ইহাদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়কে, উহারা তো ছিল সত্যত্যাগী সম্প্রদায়" (৫১:৪৬)।
وَقَوْمَ نُوحٍ مِنْ قَبْلُ إِنَّهُمْ كَانُوا هُمْ أَظْلَمَ وَأَطْغَى
"আর ইহাদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়কেও (তিনি ধ্বংস করিয়াছিলেন), উহারা ছিল অতিশয় জালিম ও অবাধ্য” (৫৩ঃ ৫২)।
كَذَّبَتْ قَبْلَهُمْ قَوْمٌ نُوحٍ فَكَذَّبُوا عَبْدَنَا وَقَالُوا مَجْنُونٌ وَازْدُجِرَ . فَدَعَا رَبَّهُ أَنِّي مَغْلُوبٌ فَانْتَصِرْ فَفَتَحْنَا أَبْوَابَ السَّمَاءِ بِمَاءٍ مُنْهَمِرٍ . وَفَجَّرْنَا الأَرْضَ عُيُونًا فَالْتَقَى الْمَاءُ عَلَى أَمْرٍ قَدْ قُدِرَ، وَحَمَلْتُهُ عَلَى ذَاتِ الواح ودُسُرٌ تَجْرِي بِأَعْيُنِنَا جَزَاء لَمَنْ كَانَ كُفِرَ . وَلَقَدْ تَرَكْنُهَا أَيَةً فَهَلْ مِنْ مُّدَّكِرٍ، فَكَيْفَ كَانَ عَذَابِي ونذر .
"ইহাদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়ও অস্বীকার করিয়াছিল- অস্বীকার করিয়াছিল আমার বান্দাকে আর বলিয়াছিল, এতো এক পাগল। আর তাহাকে ভীতি প্রদর্শন করা হইয়াছিল। তখন সে তাহার প্রতিপালককে আহ্বান করিয়া বলিয়াছিল, আমি তো অসহায়, অতএব তুমি প্রতিবিধান কর। ফলে আমি উন্মুক্ত করিয়া দিলাম আকাশের দ্বার প্রর্বল বারি বর্ষণে এবং মৃত্তিকা হইতে উৎসারিত করিলাম প্রস্রবণ; অতঃপর সকল পানি মিলিত হইল এক পরিকল্পনা অনুসারে। তখন নূহকে আরোহণ করাইলাম কাষ্ঠ ও কীলক নির্মিত এক নৌযানে, যাহা চলিত আমার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে; ইহা পুরস্কার তাহার জন্য যে প্রত্যাখ্যাত হইয়াছিল। আমি ইহাকে রাখিয়া দিয়াছি এক নিদর্শনরূপে; অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেহ আছে কি? কী কঠোর ছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী” (৫৪: ৯-১৬)।
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا وَأَبْرَهِيمَ وَجَعَلْنَا فِي ذُرِّيَّتُهُمَا النُّبُوَّةَ وَالْكِتَابَ فَمِنْهُمْ مُهْتَدٍ وَكَثِيرٌ مِّنْهُمْ فَاسِقُونَ.
"আমি নূহ এবং ইবরাহীমকে রসূলরূপে প্রেরণ করিয়াছিলাম এবং আমি তাহাদের বংশধরগণের জন্য স্থির করিয়াছিলাম নুবৃওয়াত ও কিতাব, কিন্তু উহাদের অল্পই সৎপথ অবলম্বন করিয়াছিল এবং অধিকাংশই ছিল সত্যত্যাগী” (৫৭ঃ ২৬)।
ضَرَبَ اللهُ مَثَلاً لِلَّذِينَ كَفَرُوا امْرَأَتَ نُوحٍ وَامْرَأَتَ لُوطٍ كَانَتَا تَحْتَ عَبْدَيْنِ مِنْ عِبَادِنَا صَالِحَيْنِ فَخَانَتَاهُمَا فَلَمْ يُغْنِيَا عَنْهُمَا مِنَ اللهِ شَيْئًا وَقِبْلَ ادْخُلَا النَّارَ مَعَ الدَّاخِلِينَ.
"আল্লাহ কাফিরদের জন্য নূহের স্ত্রী ও লূতের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত দিতেছেন, উহারা ছিল আমার বান্দাদের মধ্যে দুই সৎকর্মপরায়ণ বান্দার অধীন। কিন্তু উহারা তাহাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছিল। ফলে নূহ ও লূত উহাদিগকে আল্লাহ্ শাস্তি হইতে রক্ষা করিতে পারিল না এবং উহাদিগকে বলা হইল, তোমরা উভয়ে প্রবেশকারীদের সহিত জাহান্নামে প্রবেশ কর" (৬৬ঃ ১০)।
إِنَّا أَرْسَلْنَا نُوْحًا إِلَى قَوْمِهِ أَنْ أَنْذِرْ قَوْمَكَ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ. قَالَ يُقَوْمِ إِنِّي لَكُمْ نَذِيرٌ مبين . أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاتَّقُوهُ وَأَطِيعُونِ . يَغْفِرْ لَكُمْ مِّنْ ذُنُوبِكُمْ وَيُؤَخِّرُكُمْ إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى إِنَّ أَجَلَ اللَّهِ إِذَا جَاءَ لَا يُؤَخِّرُ لَوْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ . قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْمِي لَيْلًا وَنَهَارًا فَلَمْ يَزِدْهُمْ دُعَاءَ الأَ فِرَاراً ، وَإِنِّي كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُوا أَصَابِعَهُمْ فِي أَذَانِهِمْ وَاسْتَغْشَوا ثِيَابَهُمْ وَأَصَرُّوا وَاسْتَكْبَرُوا اسْتِكْبَارًا . ثُمَّ إِنِّي دَعَوْتُهُمْ جِهَاراً . ثُمَّ إِنِّي أَعْلَنْتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَاراً . فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا . يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا ، وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا ، مَا لَكُمْ لَا تَرْجُونَ لله وَقَارًا . وَقَدْ خَلَقَكُمْ أَطْوَاراً . أَلَمْ تَرَوْا كَيْفَ خَلَقَ اللهُ سَبْعَ سَمُوتِ طَبَاقًا . وَجَعَلَ الْقَمَرَ فِيهِنَّ نُورًا وَجَعَلَ الشَّمْسَ سِرَاجًا . وَاللَّهُ أَنْبَتَكُمْ مِّنَ الْأَرْضِ نَبَاتًا ، ثُمَّ يُعِيدُكُمْ فِيهَا وَيُخْرِجُكُمْ إِخْرَاجًا . وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ بِسَاطًا . لَتَسْلُكُوا مِنْهَا سُبُلاً فِجَاجًا . قَالَ نُوحٌ رَّبِّ إِنَّهُمْ عَصَوْنِي وَاتَّبَعُوا مَنْ لَّمْ يَزِدْهُ مَالُهُ وَوَلَدُهُ إِلا خَسَارًا ، وَمَكَرُوا مَكْرًا كُبَّارًا ، وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ الهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدَا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُونَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا . وَقَدْ أَضَلُّوا كَثِيرًا وَلَا تَزِدِ الظَّلِمِينَ الأَضَلَّنَا . مِّمَّا خَطِيئَتِهِمْ أَغْرِقُوا فَأُدْخِلُوا نَّارًا فَلَمْ يَجِدُوا لَهُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْصَارًا ، وَقَالَ نُوحٌ رَّبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَفِرِينَ دَيَّارًا . إِنَّكَ إِنْ تَذَرْهُمْ يُضِلُّوا عِبَادَكَ وَلَا يَلِدُوا إِلا فَاجِرًا كَفَّارًا ، رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَنْ دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ وَلَا تَزِدِ الظلمين الا تباراً .
"আমি নূহকে প্রেরণ করিয়াছিলাম তাহার সম্প্রদায়ের প্রতি এই নির্দেশসহ, তুমি তোমার সম্প্রদায়কে সতর্ক কর তাহাদের প্রতি মর্মন্তুদ শাস্তি আসিবার পূর্বে। সে বলিয়াছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তো তোমাদের জন্য স্পষ্ট সতর্ককারী, এই বিষয়ে যে, তোমরা আল্লাহ্ ইবাদত কর ও তাহাকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর; তিনি তোমাদের পাপ ক্ষমা করিবেন এবং তিনি তোমাদিগকে অবকাশ দিবেন এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত। নিশ্চয় আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত কাল উপস্থিত হইলে উহা বিলম্বিত হয় না; যদি তোমরা ইহা জানিতে। সে বলিয়াছিল, হে আমার প্রতিপালক! আমি তো আমার সম্প্রদায়কে দিবারাত্রি আহ্বান করিয়াছি, কিন্তু আমার আহ্বান উহাদের পলায়ন প্রবণতাই বৃদ্ধি করিয়াছে। আমি যখনই উহাদিগকে আহ্বান করি যাহাতে তুমি উহাদিগকে ক্ষমা কর, উহারা কানে আঙ্গুলী দেয়, বস্ত্রাবৃত করে নিজদিগকে ও জিদ করিতে থাকে এবং অতিশয় ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে। অতঃপর আমি উহাদিগকে আহ্বান করিয়াছি প্রকাশ্যে। পরে আমি উচ্চস্বরে প্রচার করিয়াছি ও উপদেশ দিয়াছি গোপনে। বলিয়াছি, তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা প্রার্থনা কর, তিনি তো মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করিবেন, তিনি তোমাদিগকে সমৃদ্ধ করিবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করিবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করিবেন নদী-নালা। তোমাদের কী হইয়াছে যে, তোমরা আল্লাহ্ শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করিতে চাহিতেছ না! অথচ তিনিই তো তোমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন পর্যায়ক্রমে। তোমরা কি লক্ষ্য কর নাই? আল্লাহ কিভাবে সৃষ্টি করিয়াছেন সপ্ত স্তরে বিন্যস্ত আকাশমণ্ডলী? এবং সেথায় চন্দ্রকে স্থাপন করিয়াছেন আলোরূপে আর সূর্যকে স্থাপন করিয়াছেন প্রদীপরূপে; তিনি তোমাদিগকে উদ্ভূত করিয়াছেন মৃত্তিকা হইতে। অতপর উহাতে তিনি তোমাদিগকে প্রত্যাবৃত্ত করিবেন এবং পরে পুনরুত্থিত করিবেন। আর আল্লাহ্ তোমাদের জন্য ভূমিকে করিয়াছেন বিস্তৃত, যাহাতে তোমরা চলাফেরা করিতে পার প্রশস্ত পথে। নূহ বলিয়াছিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় তো আমাকে অমান্য করিয়াছে এবং অনুসরণ করিয়াছে এমন লোকের যাহার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি তাহার ক্ষতি ব্যতীত আর কিছুই বৃদ্ধি করে নাই। আর উহারা ভয়ানক ষড়যন্ত্র করিয়াছিল এবং বলিয়াছিল, তোমরা কখনও পরিত্যাগ করিও না তোমাদের দেব-দেবীকে; পরিত্যাগ করিও না ওয়াদ্দ, সুওয়া'আ, ইয়াগৃছ, ইয়াউক ও নাসরকে। উহারা অনেককে বিভ্রান্ত করিয়াছে। সুতরাং তুমি জালিমদের বিভ্রান্তি ব্যতীত আর কিছুই বৃদ্ধি করিও না। উহাদের অপরাধের জন্য উহাদিগকে নিমজ্জিত করা হইয়াছিল এবং পরে উহাদিগকে দাখিল করা হইয়াছিল অগ্নিতে, অতঃপর উহারা কাহাকেও আল্লাহ্ মুকাবিলায় পায় নাই সাহায্যকারী। নূহ আরও বলিয়াছিল, হে আমার প্রতিপালক! পৃথিবীতে কাফিরগণের মধ্য হইতে কোন গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিও না। তুমি উহাদিগকে অব্যাহতি দিলে উহারা তোমার বান্দাদিগকে বিভ্রান্ত করিবে এবং জন্ম দিতে থাকিবে কেবল দৃষ্কৃতিকারী ও কাফির। হে আমার প্রতিপালক! তুমি ক্ষমা কর আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং যাহারা মু'মিন হইয়া আমার গৃহে প্রবেশ করে তাহাদিগকে এবং মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারীদিগকে; আর জালিমদের শুধু ধ্বংসই বৃদ্ধি কর" (৭১: ১-২৮)।
📄 হাদীছে হযরত নূহ (আ)
হযরত নূহ (আ) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাদীছে খুব বেশি বর্ণনা পাওয়া যায় না। তাঁহার সম্পর্কে হাদীছে নিম্নলিখিত বর্ণনা পাওয়া যায় :
عن ابي هريرة ( رض ) قال كنا مع النبي صلى الله عليه وسلم .... يقول ادم إذهبوا الى نوح فيأتون نوحا فيقولون يانوح انت اول الرسل الى اهل الارض وسماك الله عبدا شكورا الا ترى الى ما نحن فيه الا ترى الى ما بلغنا الا تشفع لنا الى ربك فيقول ربي قد غضب اليوم غضبا لم يغضبه قبله مثله ولا يغضب بعده مثله نفسي نفسي ايتوا النبي (البخاري - الصحيح جلد ۱ صفحه (٤٧٠) وفي رواية مسلم ولكن ائتوتوا ابراهيم عليه السلام الذي اتخذه الله خليلا (مسلم : الصحيح ج | صفحه (۱۰۸)
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, "একদা আমরা নবী (স)-এর সঙ্গে ছিলাম। [তিনি কিয়ামতের দিনের বর্ণনা দেন যে, সেই দিনের ভয়াবহতা হইতে রক্ষা পাইবার জন্য লোকজন আল্লাহ্র নিকট সুপারিশ করিবার জন্য বিভিন্ন নবীর দ্বারস্থ হইবে। এই পর্যায়ে তাহারা আদম (আ)-এর নিকট গিয়া আল্লাহ্র নিকট সুপারিশ করার অনুরোধ করিলে আদম (আ) বলিবেন তোমরা নূহ (আ)-এর নিকট যাও। তখন তাহারা নূহের নিকট গিয়া বলিবে, 'হে নূহ! বিশ্ববাসীর নিকট আপনি প্রথম রাসূল। আর আল্লাহ আপনার নাম রাখিয়াছেন "কৃতজ্ঞ বান্দা" আপনি দেখিতেছেন না, আমরা কি অবস্থায় নিপতিত! আপনি দেখিতেছেন না আমাদের কি কষ্ট হইতেছে! আমাদের জন্য আপনার প্রতিপালকের নিকট সুপারিশ করুন। তিনি বলিলেন, আমার প্রতিপালক আজ এমন ক্রোধান্বিত হইয়াছেন যে, এইরূপ ক্রোধান্বিত তিনি ইতোপূর্বে কোন দিন হন নাই, পরেও কোন দিন হইবেন না। নাফসী! নাফসী! তোমরা আমার বংশধরের কাছে যাও। মুসলিম ও ইব্ন মাজা গ্রন্থে এই স্থলে ইবরাহীম (আ)-এর নাম উল্লেখ রহিয়াছে যে, তোমরা ইবরাহীমের কাছে যাও, আল্লাহ্ যাহাকে খলীল (বন্ধু)-রূপে গ্রহণ করিয়াছিলেন (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, ১খ., ৪৭০; মুসলিম, আস-সাহীহ, ১খ,, ১০৮; ইব্ন মাজা, আস-সুনান, পৃ. ৩২৯-৩৩০; তিরমিযী, আল-জামি, ২খ, ৬৬)।
عن ابي سعيد (رض) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم يجيئ نوح وأمته فيقول الله هل بلغت فيقول نعم اى رب فيقول لامته هل بلغكم فيقولون لا ماجاءنا من نبي فيقول لنوح من يشهد لك فيقول محمد وامته فتشهد انه قد بلغ وهو قوله وكذلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا
আবূ সাঈদ খুদরী (রা) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, (কিয়ামতের দিন) নূহ (আ)-ও তাঁহার উম্মত (ময়দানে) আসিবে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলিবেন, তুমি কি (হিদায়াতের বাণী ও আমার দীনের দাওয়াত) পৌঁছাইয়াছ? তিনি বলিবেন, হাঁ, হে আমার প্রতিপালক! অতঃপর তিনি (আল্লাহ) তাঁহার উম্মতকে বলিবেন, সে কি তোমাদের নিকট পৌছাইয়াছে? তাহারা বলিবে, না, আমাদের কাছে কোন নবী আসে নাই। তখন তিনি নূহকে বলিবেন, তোমার সাক্ষী কে? তিনি বলিবেন, মুহাম্মাদ (স)-ও তাঁহার উম্মত। তখন আমরা সাক্ষী দিব যে, তিনি (হিদায়াতের বাণী) পৌঁছাইয়াছেন। ইহাই আয়াতে বর্ণিত হইয়াছে: “এইভাবে আমি তোমাদিগকে এক মধ্যপন্থী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি, যাহাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ এবং রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হইবে" (আয়াত দ্র. ২: ১৪৩; হাদীছ দ্র. আল-বুখারী, আস-সাহীহ, ১খ., ৪৭০)।
قال ابن عمر (رض) قام رسول الله صلى الله عليه وسلم في الناس فاثنى على الله بما هو اهله ثم ذكر الدجال فقال اني لانذركموه وما من نبي الا أنذر قومه لقد أنذر نوح قومه
ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স) একবার লোক সমাবেশে দাঁড়াইলেন, অতঃপর আল্লাহ্র যথাযথ প্রশংসা করিলেন। অতঃপর দাজ্জালের প্রসংগ উল্লেখ করিয়া বলিলেন, 'আমি তোমাদিগকে তাহার সম্পর্কে সতর্ক করিব। প্রত্যেক নবীই (তাহার সম্পর্কে) আপন সম্প্রদায়কে সতর্ক করিয়াছেন। নূহ (আ)-ও তাঁহার সম্প্রদায়কে সতর্ক করিয়াছিলেন” (আল-বুখারী আস-সাহীহ, ১খ., ৪৭০)।
عن عبد الله ابن عمرو قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول صام نوح الدهر الا يوم عيد الفطر ويوم عيد الاضحى ابن ماجه : السنن (١/١٢٤)
'আবদুল্লাহ্ ইব্ন 'আমর (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি, নূহ (আ) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিবস ব্যতীত সারা বৎসর সাওম পালন করিতেন (ইবন মাজা, আস-সুনান, ১খ., ১২৪)।
একটি হাদীছে হযরত নূহ (আ)-এর নাম উল্লেখ না থাকিলেও হাদীস বিশারদ ও ভাষ্যকারগণের মতে উক্ত হাদীছে নূহ (আ)-এর কথাই বর্ণনা করা হইয়াছে। হাদীসটি হইল:
قال عبد الله كأني انظر الى النبي صلى الله عليه وسلم يحكى نبيا من الأنبياء ضربه قومه فادموه وهو يمسح الدم عن وجهه ويقول اللهم اغفر لقومى فانهم لا يعلمون البخاري : الصحيح (١/٤٩٥)
আব্দুল্লাহ্ (রা) বলেন, আমি যেন নবী (স)-কে দেখিতেছি যে, তিনি বর্ণনা করিতেছেন: নবীদিগের মধ্য হইতে একজন নবীকে তাঁহার সম্প্রদায় প্রহারে রক্তাক্ত করিয়া ফেলিয়াছে আর তিনি স্বীয় মুখমণ্ডল হইতে রক্ত মুছিয়া বলিতেছিলেন, 'হে আল্লাহ্! আমার সম্প্রদায়কে ক্ষমা কর। কেননা তাহারা অজ্ঞ' (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, ১খ., ৪৯৫)।