📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কুরআন মজীদে হযরত ইদরীস (আ)

📄 কুরআন মজীদে হযরত ইদরীস (আ)


কুরআন মজীদের শুধু দুই জায়গায় হযরত ইদ্রীস (আ) সম্বন্ধে উল্লেখ রহিয়াছে :
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِدْرِيسَ . إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا نَّبِيًّا ، وَرَفَعْنَاهُ مَكَانًا عَلِيًّا .
"এবং স্মরণ কর এই কিতাবে ইদ্রীসের কথা, সে ছিল সত্যনিষ্ঠ নবী এবং আমি তাহাকে উন্নীত করিয়াছিলাম উচ্চ মর্যাদায়” (১৯৪ঃ ৫৬)।
وَاسْمَعِيلَ وَإِدْرِيسَ وَذَالْكِفْلِ طَ كُلٌّ مِّنَ الصَّبِرِينَ ، وَأَدْخَلْتُهُمْ فِي رَحْمَتِنَا إِنَّهُمْ مِّنَ الصلحين *
"এবং স্মরণ কর ইসমাঈল, ইদ্রীস ও যুলকিফ্ল-এর কথা; তাহাদের প্রত্যেকেই ছিল ধৈর্যশীল এবং তাহাদিগকে আমি আমার অনুগ্রহভাজন করিয়াছিলাম। তাহারা ছিল সৎকর্ম-পরায়ণদিগের অন্তর্ভুক্ত” (২১:৮৫-৮৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াত প্রাপ্তি ও দীনের প্রচারে আত্মনিয়োগ

📄 নবুওয়াত প্রাপ্তি ও দীনের প্রচারে আত্মনিয়োগ


হযরত শীছ (আ)-এর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে তাঁহার সম্প্রদায়ের কিছু সংখ্যক লোক ঈমান আনয়ন করিয়াছিল। অতঃপর তাহারা নিজ গোত্রের অপরাপর মুশরিক ও মূর্তিপূজকদের দেখাদেখি হযরত শীছ (আ)-এর মূর্তি তৈরি করিয়া উহার পূজা করিতে থাকে। এইভাবে তাহারা পথভ্রষ্ট হইয়া মুশরিকে পরিণত হইয়া যায়। অতঃপর আল্লাহ্ তাআলা তাহাদের হিদায়াতের জন্য তাহাদের মধ্য হইতে হযরত ইদ্রীস (আ)-কে নবুওয়ত দান করেন এবং তাহাদেরকে হিদায়াতের নির্দেশ দান করেন (আনওয়ারে আম্বিয়া, পৃ. ২১)।
নবুওয়ত প্রাপ্তির পর তিনি তাহাদিগকে আল্লাহ্ দীন, একত্ববাদ এবং আল্লাহ্ ইবাদতের প্রতি আহবান জানান। নেক আমলের মাধ্যমে তিনি লোকদিগকে জাহান্নামের আগুন হইতে মুক্তির জন্য উৎসাহিত করেন। তিনি তাহাদেরকে বিশেষ পদ্ধতিতে সালাত আদায় করা এবং নির্দিষ্ট দিনসমূহে (আইয়ামে বীদ) সওম পালনের জন্য হুকুম করেন। পার্থিব দৌলতের প্রতি আসক্ত না হওয়া, সর্ব ব্যাপারে আদল ও ইনসাফ কায়েম করা এবং আল্লাহর দীনের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্য তিনি তাঁহার সম্প্রদায়কে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেন। দুর্বল ও অসহায় লোকদিগকে সাহায্য করার নিমিত্ত যাকাত প্রদানের জন্য নির্দেশ দেন। উপরন্তু তিনি তাহাদিগকে নাপাকী হইতে পবিত্রতা অর্জন করা, কুকুর ও শূকর ভক্ষণ না করা এবং মাদক দ্রব্য গ্রহণ না করার ব্যাপারে কঠোর বিধান প্রদান করেন। এমনিভাবে বিশেষ বিশেষ সময়ে ঈদ তথা আনন্দ উৎসব উদযাপন এবং বিশেষ ধরনের নেক আমল করার জন্য তিনি তাকীদ করিতেন। হযরত ইদ্রীস (আ) তিন ধরনের বস্তু আল্লাহ্ নামে মানত ও কুরবানী করার জন্য নির্দেশ দিতেন : সুগন্ধি দ্রব্যের ধুয়া, জীব কুরবানী করা এবং মদ।
দার্শনিকদের বিপরীতমুখী বর্ণনায় বিস্মিত হইতে হয়। একদিকে তাহারা হযরত ইদ্রীস (আ)-এর শরীআতে মদ হারাম বলিয়া উক্তি করেন এবং অপর দিকে তিনি আল্লাহ্ নামে মদ উৎসর্গ করিবার জন্য উপদেশ দিতেন বলিয়াও বর্ণনা করেন। এতদ্ব্যতীত মৌসুমের প্রথম ফল ও ফুল আল্লাহ্ নামে উৎসর্গ করাকেও প্রয়োজনীয় মনে করা হইত। ফুলের মধ্যে গোলাপ, শস্য বীজের মধ্যে গম এবং ফলের মধ্যে আঙ্গুরের অগ্রাধিকার ছিল (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ২৬-২৭; আনওয়ারে আম্বিয়া, পৃ. ২১; কাসাসুল কুরআন, ১ম খণ্ড, পৃ. ৯৬-৯৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হিজরত

📄 হিজরত


নবুওয়াত প্রাপ্তির পর হযরত ইদরীস (আ) দীনের প্রচার ও প্রসারের আপ্রাণ চেষ্টা চালাইয়া যান। কিছু সংখ্যক লোক তাঁহার কথা বিশ্বাস করে এবং তাঁহার উপর ঈমান আনয়ন করে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তাঁহার দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে এবং তাঁহার বিরোধিতা শুরু করে। ফলে হযরত ইদরীস (আ) নিজ এলাকা হইতে হিজরত করিয়া অন্যত্র চলিয়া যাইতে মনস্থ করিলেন এবং নিজের অনুগামীদেরকেও হিজরত করিতে বলিলেন। ইদ্রীস (আ)-এর অনুসারিগণ যখন এই কথা শুনিলেন তখন তাহারা জন্মভূমি ত্যাগ করা দুঃসাধ্য কাজ মনে করিয়া বলিল, বাবিল শহরের মত অনুরূপ শহর আমরা কোথায় পাইব?
অতঃপর হযরত ইদরীস (আ) তাহাদিগকে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, আমরা যদি আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে হিজরত করি তবে আমাদিগকে সেইখানেও রিযিক দান করা হইবে। অতঃপর তিনি ও তাঁহার অনুসারিগণ মিসরের উদ্দেশে বাবিল শহর ত্যাগ করিলেন। এই ক্ষুদ্র দলটি যখন নীল নদ অববাহিকার সুজলা-সুফলা অঞ্চল দেখিতে পাইল তখন তাহারা আনন্দিত হইল এবং এই উৎকৃষ্ট স্থানটিকে নির্বাচন করিয়া তাহারা নীল নদের পার্শ্বেই বসবাস করিতেন লাগিল। এখানে পৌছিয়া হযরত ইদ্রীস (আ) আল্লাহ্ পয়গাম তথা সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে বাধা প্রদান করার দায়িত্ব পালনে ব্রতী হইলেন। কথিত আছে যে, তাঁহার যমানায় বাহাত্তরটি ভাষা প্রচলিত ছিল। তিনি আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে উপরিউক্ত সব ভাষায়ই অভিজ্ঞ ছিলেন এবং তিনি প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাহাদের ভাষায় দাওয়াত দিতেন এবং শিক্ষা দান করিতেন (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ২৫-২৬; কাসাসুল কুরআন, ১ম খণ্ড, পৃ. ৯৪-৯৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ইদরীস (আ)-এর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা

📄 হযরত ইদরীস (আ)-এর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা


নবুওয়াতের সাথে সাথে আল্লাহ্ তাআলা হযরত ইদ্রীস (আ)-কে জাগতিক বহু জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারীও করিয়াছিলেন। হযরত ইদ্রীস (আ)-ই সর্বপ্রথম জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রবর্তন করিয়াছিলেন। আল্লাহ্ তাআলা তাঁহাকে সৌরজগত এবং নক্ষত্রসমূহের পারস্পরিক আকর্ষণ ও বিকর্ষণের গুরুত্ব ও রহস্য শিক্ষা দিয়াছিলেন। তারীখুল হুকামা গ্রন্থে উল্লেখ রহিয়াছে যে, হযরত নূহ (আ)-এর সময়ের তুফানের পূর্বে জ্ঞানের যত প্রসার ও ব্যাপ্তি ঘটিয়াছিল তাহার প্রধান পুরোধা ছিলেন হযরত ইদ্রীস (আ)। একদল জ্ঞানী ব্যক্তি এমনও ধারণা করেন যে, দর্শন শাস্ত্রের পুস্তকসমূহে যে সমস্ত জ্ঞান-গভীর আলোচনা এবং নক্ষত্রসমূহের গতিবিধির যে বিবরণ পাওয়া যায় তাহা সর্বপ্রথম হযরত ইদ্রীস (আ)-ই বলিয়াছেন। আল্লাহ্ ইবাদতের জন্য ইবাদতখানা নির্মাণ, চিকিৎসা শাস্ত্রের আবিষ্কার, যমীন ও আসমানের যাবতীয় বস্তু সম্বন্ধে যথোপযোগী কবিতা রচনার মাধ্যমে স্বীয় মতামত প্রকাশও তাঁহারই অমর কার্যাবলীর অন্তর্গত। তিনি সর্বপ্রথম তুফান সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন এবং বলিয়াছিলেন, আমাকে দেখান হইয়াছে একটি "আসমানী মুসীবত", যাহার পানি ও আগুন ভূমণ্ডলকে গ্রাস করিবে। ইহা দেখিয়া তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের এবং শিল্প ও প্রযুক্তির বিলুপ্তি সম্বন্ধে শংকিত হইয়া পড়িলেন। অতঃপর তিনি মিসরে আহ্রাম ( اهرام ) এবং বারাবী ( برابی ) অর্থাৎ মজবুত অট্টালিকা নির্মাণ করিয়া উহাতে সমস্ত শিল্প ও তৎসম্পর্কিত নব আবিষ্কৃত যন্ত্রপাতিসমূহের নকশা তৈয়ার করিলেন এবং যাবতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয় তথ্যাবলী তাহাতে অংকিত করিলেন, যাহাতে এই শিল্প ও বিদ্যা চিরদিনের জন্য সংরক্ষিত থাকে এবং ধ্বংসের হাত হইতে রক্ষা পাইয়া যায়। তবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিল্প-প্রযুক্তি রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে হযরত ইদ্রীস (আ) সম্বন্ধে যেসব বর্ণনার উল্লেখ পাওয়া যায়, তাহার মধ্যে কিছুটা অতিরঞ্জন থাকিতে পারে বলিয়া অনেকে উল্লেখ করিয়াছেন (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ২৮-২৯; কাসাসুল কুরআন, ১ম খণ্ড, পৃ. ১০০-১০১; আনওয়ারে আম্বিয়া; পৃ. ২২; মুহাম্মাদ জামীল আহমাদ, আম্বিয়া-ই কুরআন, ১খ., পৃ. ৭৮-৮৩)।
মিসরে অবস্থানকালে স্বীয় সম্প্রদায়ের লোকদিগকে ধর্মের প্রতি আহ্বান করা ছাড়াও তিনি দেশ শাসন, শহরের জীবন যাপন পদ্ধতি এবং একত্রে জীবন যাপনের নিয়ম-পদ্ধতি শিক্ষা দিয়াছিলেন। এই শিক্ষা প্রদানের জন্য তিনি প্রত্যেক সম্প্রদায় হইতে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করিয়া তাহাদিগকে দেশ শাসন ও এতদসম্পর্কিত মূলনীতি শিক্ষা দিতেন। তাহারা এই বিষয়ে জ্ঞান অর্জনপূর্বক নিজ নিজ সম্প্রদায়ে প্রত্যাবর্তন করিয়া উক্ত নীতিমালার আলোকে শহর ও গ্রামগুলিকে আবাদ করিলেন। তাহাদের আবাদকৃত শহরের ন্যূনতম সংখ্যা হইল দুই শতের মত। ইহার মধ্যে ক্ষুদ্রতম শহরটির নাম ছিল রাহা (رها), যাহার ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান। তিনি তাঁহার শাসিত ভূখণ্ডকে চারি ভাগে বিভক্ত করিয়া প্রত্যেক অংশের জন্য একজন করিয়া শাসনকর্তা নিযুক্ত করিয়াছিলেন। তাহাদিকে তিনি দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে আল্লাহ্র বিধান অনুসরণের হুকুম দিয়াছিলেন। এইসব শাসকদের মধ্যে চারজনের নাম: (১) ঈলাওয়াস (ایلاوس) (২) যূস (زوس), (৩) ইসকিলীবৃস (اسقليبوس) ও (৪) যূস আমূন (زوس امون) অথবা ঈলাওয়াস আমুন (ایلاوس امون) অথবা বস্‌সীলুখাস (بسيلوخس)।
হযরত ইদরীস (আ) ইলম ও আমলের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহর বান্দাদিগকে তিন ভাগে বিভক্ত করিয়াছিলেন: (১) জ্যোতিষী, (২) রাজা ও (৩) প্রজা। জ্যোতিষীদের মর্যাদা সকলের ঊর্ধ্বে ছিল। কেননা তাহাকে আল্লাহর দরবারে নিজের ব্যাপারসহ রাজা ও প্রজার ব্যাপারেও জবাবদিহি করিতে হইবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ছিল রাজা। কেননা তাহাকে নিজের এবং রাজত্ব সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ের জবাবদিহি করিতে হইবে। আর তৃতীয় পর্যায়ে ছিল প্রজা। কেননা তাহাকে শুধু নিজের ব্যাপারে জবাবদিহি করিতে হইবে। উল্লেখ্য যে, আল্লাহর বান্দাদের এই পর্যায়ক্রমিক মর্যাদাভেদ কর্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ছিল- বংশ ও খান্দানের পার্থক্যের প্রেক্ষিতে নহে (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ২৬-২৭; কাসাসুল কুরআন, ১ম খণ্ড, পৃ. ৯৫-৯৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00