📄 দাওয়াত ও তাবলীগ
নুবৃওয়াত প্রাপ্তির পর হযরত শীছ (আ) নিজের ও কাবীলের বংশধরদের মধ্যে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ শুরু করেন। তিনি তাহাদেরকে সত্য পথ প্রদর্শন করেন এবং নেক কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। এই সময় লোকজন দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া যায়। একদল তাহার অনুসরণ ও আনুগত্য করে এবং অপর দল কাবীলের বংশধরদের আনুগত্য করে। কাবীলের বংশধরদের কিছু অংশ শীছ (আ)-এর দাওয়াতে সৎপথ প্রাপ্ত হয়, কিন্তু অন্যরা অবাধ্যতার উপর অটল থাকে (দা. মা. ই., ১১খ, ৮৫১)। তাহারা আল্লাহকে ছাড়িয়া অগ্নিপূজা করিত যাহা শুরু হইয়াছিল কাবীলের জীবদ্দশাতেই। ইমাম ছা'লাবী বর্ণনা করেন যে, হাবীলকে হত্যার পর কাবীল ভয়ে য়ামান চলিয়া যায়। ইবলীস সেখানে গমন করিয়া তাহাকে বলে যে, অগ্নি হাবীলের কুরবানী এইজন্য কবুল ও গ্রাস করিয়াছিল যে, সে অগ্নির সেবা ও উপাসনা করিত। তাই তুমি তোমার ও তোমার পরবর্তী বংশের জন্য একখানি গৃহ নির্মাণ করিয়া তথায় অগ্নি স্থাপন কর। ইহা শুনিয়া কাবীল ঐরূপ গৃহ নির্মাণ করিয়া তথায় অগ্নি স্থাপন করিল এবং উহার উপাসনা করিতে লাগিল। সেই হইতে অগ্নিপূজা শুরু হইয়াছিল (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৪৮)। শীছ (আ)-এর সময়েও কাবীলের কতক বংশধর অগ্নিপূজায় রত ছিল। আর যাহারা শীছ (আ)-এর আনুগত্য করিয়াছিল পরবর্তীতে শীছ (আ)-এর ইনতিকালের পর তাহারাও পথভ্রষ্ট হইয়া যায়। এই কওমকেই সঠিক পথের সন্ধান দেওয়ার জন্য শীছ (আ)-এর অধস্তন ৫ম পুরুষ আখনূখ তথা ইদরীস (আ)-কে নবীরূপে প্রেরণ করা হয় (আনওয়ারে আম্বিয়া, পৃ. ১১)।
হযরত শীছ (আ)-এর বহু জ্ঞানগর্ভ ও মূল্যবান উপদেশ বর্ণিত রহিয়াছে (দা.মা.ই., ১১খ, ৮৫১)। তিনি বলিতেন, “আল্লাহকে সর্বদা স্মরণ করিবে। ন্যায়-অন্যায় বিচার করিয়া চলিবে। পিতা-মাতাকে সম্মান করিবে। তাহাদের সেবা-শুশ্রূষা করিবে। ভ্রাতৃত্বভাব রক্ষা করিবে। রিপুর বশীভূত হইয়া ক্রোধকে প্রশ্রয় দিবে না। অভাবগ্রস্ত ও দীন-দুঃখীকে মুক্ত হস্তে দান করিবে। সদয় ব্যবহার করিবে। পাপকার্য হইতে বিরত থাকিবে। বিপদাপদ, বিপর্যয় ও দুর্যোগে ধৈর্য ধারণ করিবে। আল্লাহ্র প্রতি নির্ভরশীল হইবে। আল্লাহ্র করুণার জন্য কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিবে” (কাজী এ. এফ. মফিজ উদ্দীন আহমদ, কাছাছুল কুরআন, পৃ. ৭৭-৭৮)।
📄 বাসস্থান
Encyclopaedia of Islam-এর নিবন্ধকার CL. Huart-এর বর্ণনামতে তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় সিরিয়ায় কাটান। সেখানেই তিনি জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন বলিয়া একই বর্ণনা রহিয়াছে (E. J. Brills, First Encyclopaedia of Islam, vol. vii, 358)। কিন্তু এই বর্ণনা একেবারেই অমূলক ও ভিত্তিহীন। কারণ শীছ (আ) পিতার প্রিয়তম পুত্র ছিলেন। তাই তিনি সর্বদা আদম (আ)-এর সান্নিধ্যে থাকিয়া তাঁহার খিদমত করেন বলিয়া প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন উত্তর কালের বর্ণনামতে, একদা হযরত আদম (আ)-এর অসুখের সময় জান্নাতের তৈল ও যায়তুন ফল খাওয়ার জন্য তাঁহার বাসনা জাগিল। তিনি স্বীয় পুত্র শীছকে সায়না পর্বতে আল্লাহ্র নিকট হইতে তাহা চাহিয়া আনিবার জন্য প্রেরণ করিলেন। সেখানে আল্লাহ তাঁহাকে বলিলেন, তোমার পাত্র আগাইয়া ধর। অতঃপর মুহূর্তের মধ্যে উহা আদম (আ)-এর কাঙ্খিত জিনিসে পূর্ণ হইয়া গেল। অতঃপর আদম (আ) নিজের শরীরে উক্ত তৈল মালিশ করিলেন এবং কয়েকটি যায়তুন ফল খাইলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সুস্থ হইয়া গেলেন (পৃ. গ্র.)। এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে, শীছ (আ) স্বীয় পিতা আদম (আ)-এর সান্নিধ্যে থাকিতেন। আর আদম (আ) মক্কা শরীফে বসবাস করেন, সেখানেই ইনতিকাল করেন এবং আবূ কুবায়স পর্বতের পাদদেশে তাঁহাকে দাফন করা হয় (পৃ. গ্র.; ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৯৮)। ইহা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, হযরত শীছ (আ) মক্কাতেই বসবাস করেন, সিরিয়ায় নহে। খ্যাতনামা ঐতিহাসিক ও সীরাত বিশারদ ইবনুল আহীর সুস্পষ্টভাবে এই মত ব্যক্ত করিয়া বলেন, তিনি মক্কায় বসবাস করিতেন এবং প্রতি বৎসর হজ্জ ও উমরা পালন করেন (ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, ৪৭)। এতদ্ব্যতীত তাঁহার কর্মকাণ্ড দ্বারাও ইহা প্রমাণিত হয়। যেমন হযরত শীছ (আ)-ই প্রথম মাটি ও প্রস্তর দ্বারা কা'বা শরীফ নির্মাণ করেন। ইতোপূর্বে সেখানে আদম (আ)-এর জন্য একটি তাঁবু ছিল যাহা আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদের মাধ্যমে জান্নাত হইতে আনাইয়া সেখানে স্থাপন করাইয়াছিলেন (ইব্ন কুতায়বা, আল-মা'আরিফ, পৃ. ১২)।
📄 বিবাহ
ইবন ইসহাক-এর বর্ণনামতে স্বীয় ভগ্নী হাযূরার সহিত হযরত শীছ (আ)-এর বিবাহ হয় (দা.মা.ই., ১১খ, ৮৫০)। তখনকার নিয়ম ছিল হাওওয়া (আ) একসঙ্গে একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দিতেন। তাই এক গর্ভের পুত্রের সহিত অন্য গর্ভের কন্যার বিবাহ হইত (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ৪৪-৪৫)।
📄 ইনতিকাল
শেষ জীবনে হযরত শীছ (আ) রোগাক্রান্ত হইয়া পড়িলে স্বীয় পুত্র আনূশকে ডাকিয়া ওসিয়ত করেন। অতঃপর মক্কায়ই ৯১২ বৎসর বয়সে ইনতিকাল করেন এবং আবূ কুবায়স পর্বতের গুহায় স্বীয় পিতা-মাতার পার্শ্বে তাঁহাকে দাফন করা হয় (ইবনুল আছীর, আল-কামিল, খ, ৪৭; দা. মা. ই., ১১খ, ৮৫০)।