📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জন্ম ও বংশপরিচয়

📄 জন্ম ও বংশপরিচয়


*বিশ্বের প্রথম মানব হযরত আদম (আ)-এর তৃতীয় পুত্র ও খলীফা। শীছ শব্দটি (شیٹ) মূলত হিব্রু। ইহার ইংরাজী রূপ Seth, Sheth এবং আরবী রূপ شيت। অর্থ “আল্লাহ্র দান”। হযরত আদম (আ)-এর দ্বিতীয় পুত্র হাবীল-এর মর্মান্তিকভাবে নিহত হওয়ার পাঁচ বৎসর পর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সেইজন্য হযরত আদম (আ) ইহাকে আল্লাহ্র দানরূপে গণ্য করিয়া উক্ত নামকরণ করেন (ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৯৮)। ঐতিহাসিক আল-মাসউদী তাঁহার মুরূজু'য-যাহার গ্রন্থে বিষয়টির আরও বিস্তারিত বিবরণ এইভাবে প্রদান করিয়াছেন যে, হাবীলের নিহত হইবার সংবাদ পাইয়া আদম (আ) যখন খুবই বিষণ্ণ ও ম্রিয়মান হইয়া পড়েন তখন আল্লাহ তা'আলা ওয়াহয়ির মাধ্যমে তাঁহাকে সন্তান লাভের সুসংবাদ প্রদান করেন। সাথে সাথে তাঁহাকে তাসবীহ-তাহলীল করিতে এবং পবিত্রাবস্থায় স্ত্রী-গমন করিতে নির্দেশ দেন। এইভাবে হযরত হাওওয়া (আ) গর্ভবতী হন এবং তাঁহার মুখমণ্ডলে নূরের ঝলক দেখা যায়। অবশেষে তিনি অতিশয় সুশ্রী ও চরিত্রবান একটি সন্তানের জন্ম দেন। হাওওয়া (আ)-এর নূরের ঝলক তাঁহার মধ্যে স্থানান্তরিত হয়। আদম (আ) তাঁহার এই পুত্রের নাম রাখেন শীছ (১খ, ৪৭)। হযরত আদম (আ)-এর ১৩০ বৎসর বয়সকালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন (বাইবেলের আদিপুস্তক, ৫: ৩-৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বাইবেলে হযরত শীছ (আ)

📄 বাইবেলে হযরত শীছ (আ)


বাইবেলে শীছ (আ)-এর জন্ম, সন্তান লাভ ও মৃত্যু সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদান করা হইয়াছে, যাহা নিম্নরূপঃ “আর আদম পুনর্বার আপন স্ত্রীর পরিচয় লইলে তিনি পুত্র প্রসব করিলেন ও তাহার নাম শেথ রাখিলেন, কেননা [তিনি কহিলেন], কয়িন কর্তৃক হত হেবলের পরিবর্তে সদাপ্রভু আমাকে আর এক সন্তান দিলেন। পরে শেথেরও পুত্র জন্মিল, আর তিনি তাহার নাম ইনোশ রাখিলেন (বাইবেলের আদি পুস্তক, পৃ. ৬)।
পরে আদম এক শত ত্রিশ বৎসর বয়সে আপনার সাদৃশ্যে ও প্রতিমূর্তিতে পুত্রের জন্ম দিয়া তাহার নাম শেথ রাখিলেন (আদিপুস্তক, পৃ. ৬)।
শেথ এক শত পাঁচ বৎসর বয়সে ইনোশের জন্ম দিলেন। ইনোশের জন্ম দিলে পর শেথ আট শত সাত বৎসর জীবৎ থাকিয়া আরও পুত্র-কন্যার জন্ম দিলেন। সর্বশুদ্ধ শেথের নয়শত বার বৎসর বয়স হইলে তাঁহার মৃত্যু হইল (আদিপুস্তক, পৃ. ৭)। ইব্‌ন কাছীর-এর বর্ণনামতে শীছের এক শত পঁয়ষট্টি বৎসর বয়সে ইনোশ (?)-এর জন্ম হয় (আল-বিদায়া, ১খ, ৯৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খিলাফত ও নবুওয়াত লাভ

📄 খিলাফত ও নবুওয়াত লাভ


হযরত আদম (আ)-এর ইনতিকালের সময় তিনি স্বীয় পুত্র শীছকে নিজের খলীফা মনোনীত করিয়া যান এবং তাঁহাকে অবহিত করেন যে, তাঁহার ইনতিকালের পর তিনি আল্লাহ্র 'হুজ্জাত' ও পৃথিবীর খলীফা, আল্লাহ্ হক ওয়াসীদের নিকট প্রত্যর্পণকারী এবং তাঁহার সন্তানদের মধ্যে যাহাদের ইনতিকাল হয় তিনি তাহাদের মধ্যে দ্বিতীয় (অল-মাসউদী, মুরূজুয-যাহাব, ১খ, ৪৮)। আদম (আ) তাহাকে দিবারাত্রির হিসাব ও উহার প্রতিটি মুহূর্তের ইবাদত শিক্ষা দেন। পরবর্তী কালে সংঘটিতব্য মহাপ্লাবন [দ্র. নূহ (আ) নিবন্ধ) সম্পর্কেও তিনি তাহাকে অবহিত করেন (ইবনুল আহীর, আল-কামিল, ১খ, ৪৩; ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৯৮)। ইমাম ছা'লাবীর বর্ণনামতে আদম (আ) স্বীয় পুত্র শীছ (আ)-কে যে ওসিয়ত করিয়া যান তাহা লিখিত আকারে তাহার নিকট প্রদান করেন এবং কাবীলের বংশধরদের নিকট হইতে উহা গোপন রাখিবার নির্দেশ দেন (আছ-ছা'লাবী, আরাইসুল-মাজালিস বা কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৪৯)। হযরত আদম (আ)-এর ওসিয়ত অনুযায়ী তাঁহার ইনতিকালের পর শাসন ক্ষমতা হযরত শীহ (আ)-এর উপর অর্পিত হয়। তিনি জনগণের মধ্যে শাসনকার্য পরিচালনা করেন এবং পিতার ও নিজের প্রতি নাযিলকৃত সহীফা অনুযায়ী শরীআত চালু করেন (আল-মাসউদী, মুরূজুয-যাহাব, ১খ, ৪৮)।
কুরআন করীমে হযরত শীছ (আ)-এর নুবুওয়াত বা অন্য কোনও বিষয়ে কোন উল্লেখ নাই। তাঁহার নুবুওয়াতের কথা আবূ যার (রা) বর্ণিত একটি হাদীছ হইতে জানা যায়, যাহা ইব্‌ন হিব্বান তাঁহার 'সাহীহ' গ্রন্থে মারফু'রূপে রিওয়ায়াত করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) হইতে বর্ণিত: আল্লাহ তা'আলা এক শত সাহীফা ও চারখানা কিতাব অবতীর্ণ করেন। তন্মধ্যে ৫০ খানা সাহীফা হযরত শীছ (আ)-এর উপর নাযিল করেন (ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৯৯; কাযী যায়নু'ল-আবিদীন মীরাঠী, কাসাসুল-কুরআন, পৃ. ৪১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দাওয়াত ও তাবলীগ

📄 দাওয়াত ও তাবলীগ


নুবৃওয়াত প্রাপ্তির পর হযরত শীছ (আ) নিজের ও কাবীলের বংশধরদের মধ্যে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ শুরু করেন। তিনি তাহাদেরকে সত্য পথ প্রদর্শন করেন এবং নেক কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। এই সময় লোকজন দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া যায়। একদল তাহার অনুসরণ ও আনুগত্য করে এবং অপর দল কাবীলের বংশধরদের আনুগত্য করে। কাবীলের বংশধরদের কিছু অংশ শীছ (আ)-এর দাওয়াতে সৎপথ প্রাপ্ত হয়, কিন্তু অন্যরা অবাধ্যতার উপর অটল থাকে (দা. মা. ই., ১১খ, ৮৫১)। তাহারা আল্লাহকে ছাড়িয়া অগ্নিপূজা করিত যাহা শুরু হইয়াছিল কাবীলের জীবদ্দশাতেই। ইমাম ছা'লাবী বর্ণনা করেন যে, হাবীলকে হত্যার পর কাবীল ভয়ে য়ামান চলিয়া যায়। ইবলীস সেখানে গমন করিয়া তাহাকে বলে যে, অগ্নি হাবীলের কুরবানী এইজন্য কবুল ও গ্রাস করিয়াছিল যে, সে অগ্নির সেবা ও উপাসনা করিত। তাই তুমি তোমার ও তোমার পরবর্তী বংশের জন্য একখানি গৃহ নির্মাণ করিয়া তথায় অগ্নি স্থাপন কর। ইহা শুনিয়া কাবীল ঐরূপ গৃহ নির্মাণ করিয়া তথায় অগ্নি স্থাপন করিল এবং উহার উপাসনা করিতে লাগিল। সেই হইতে অগ্নিপূজা শুরু হইয়াছিল (আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৪৮)। শীছ (আ)-এর সময়েও কাবীলের কতক বংশধর অগ্নিপূজায় রত ছিল। আর যাহারা শীছ (আ)-এর আনুগত্য করিয়াছিল পরবর্তীতে শীছ (আ)-এর ইনতিকালের পর তাহারাও পথভ্রষ্ট হইয়া যায়। এই কওমকেই সঠিক পথের সন্ধান দেওয়ার জন্য শীছ (আ)-এর অধস্তন ৫ম পুরুষ আখনূখ তথা ইদরীস (আ)-কে নবীরূপে প্রেরণ করা হয় (আনওয়ারে আম্বিয়া, পৃ. ১১)।
হযরত শীছ (আ)-এর বহু জ্ঞানগর্ভ ও মূল্যবান উপদেশ বর্ণিত রহিয়াছে (দা.মা.ই., ১১খ, ৮৫১)। তিনি বলিতেন, “আল্লাহকে সর্বদা স্মরণ করিবে। ন্যায়-অন্যায় বিচার করিয়া চলিবে। পিতা-মাতাকে সম্মান করিবে। তাহাদের সেবা-শুশ্রূষা করিবে। ভ্রাতৃত্বভাব রক্ষা করিবে। রিপুর বশীভূত হইয়া ক্রোধকে প্রশ্রয় দিবে না। অভাবগ্রস্ত ও দীন-দুঃখীকে মুক্ত হস্তে দান করিবে। সদয় ব্যবহার করিবে। পাপকার্য হইতে বিরত থাকিবে। বিপদাপদ, বিপর্যয় ও দুর্যোগে ধৈর্য ধারণ করিবে। আল্লাহ্র প্রতি নির্ভরশীল হইবে। আল্লাহ্র করুণার জন্য কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিবে” (কাজী এ. এফ. মফিজ উদ্দীন আহমদ, কাছাছুল কুরআন, পৃ. ৭৭-৭৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00