📄 নবীগণের মাসূম হওয়ার দলীলসমূহ
(১) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ .
"যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করিল, প্রকৃতপক্ষে সে আল্লাহ্রই আনুগত করিল" (৪:৮০)।
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ .
"তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর, যাহাতে তোমরা কৃপা লাভ করিতে পার" (৩ঃ ১৩২)।
প্রথমোক্ত আয়াতে রাসূলের আনুগত্যকে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার নিজের আনুগত্য বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। বলাবাহুল্য, কোন গায়ের মা'সূম ব্যক্তির আনুগত্যকে স্বয়ং আল্লাহ্র আনুগত্য বলিয়া অভিহিত করা চলে না। আল্লাহ্ আনুগত্য ও রাসূলের আনুগত্যকে কেবল তখনই অভিন্ন বলা যাইতে পারে যখন রাসূল আল্লাহ তা'আলার অবাধ্যতা হইতে সর্বতোভাবে মুক্ত থাকিবেন। আয়াতে তাগিদসূচক শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে, যাহাতে কেহ আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের মধ্যে পার্থক্য না করে। অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা সুস্পষ্টভাবে বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَنْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَنْ يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا ، أُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا .
"যাহারা আল্লাহকে অস্বীকার করে ও তাঁহার রাসূলগণকেও এবং আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলগণের মধ্যে ঈমানের ব্যাপারে তারতম্য করিতে চাহে এবং বলে, আমরা কতককে বিশ্বাস করি এবং কতককে অবিশ্বাস করি, আর তাহারা মধ্যবর্তী কোন পথ অবলম্বন করিতে চাহে, ইহারাই প্রকৃত কাফির" (৪:১৫০-১৫১)।
দ্বিতীয়ক্ত আয়াতে নিঃশর্তভাবে রাসূলের আনুগত্যের হুকুম দেওয়া হইয়াছে এবং তজ্জন্য রহমতের ওয়াদা করা হইয়াছে। বলা বাহুল্য, কোন গায়ের মা'সূম ব্যক্তির নিঃশর্ত আনুগত্যের নির্দেশ দেওয়া হয় নাই, বরং তাহাদের আনুগত্যের নির্দেশ প্রদানকালে আনুগত্যের মাপকাঠি দেওয়া হইয়াছে এইভাবে:
السمع والطاعة حق مالم يؤمر بمعصية فاذا امر بمعصية فلا سمع ولا طاعة (بخاري)
"আমীরের আনুগত্য ততক্ষণ পর্যন্ত জরুরী যতক্ষণ পর্যন্ত কোন পাপাচারের হুকুম আমীর না দেয়। কিন্তু আমীর যখন কোন পাপাচারের নির্দেশ দিবে তখন আর তাহার আনুগত্য করা চলিবে না" (বুখারী)।
পক্ষান্তরে যে সমস্ত আয়াতে নবীর আনুগত্যের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে, কোথায়ও এরূপ বলা হয় নাই যে, যাবৎ না কোন পাপাচারের নির্দেশ দেওয়া হয়। ইহা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা গেল যে, নবীর কোন কাজ পাপাচার বা মা'সিয়ত হইতেই পারে না, যাহাতে আমীর ও খলীফাগণের মত তাঁহাদের আনুগত্যের ব্যাপারেও শর্ত আরোপ করিতে হয়। অনুরূপভাবে বুঝা গেল যে, কোন গায়ের মা'সূম ব্যক্তির নিঃশর্ত আনুগত্য রহমতের কারণও হইতে পারে না।
(২) নবীগণ যদি পাপাচার হইতে মা'সূম না হইতেন তাহা হইলে তাঁহারা সাক্ষী হিসাবে গ্রহণযোগ্য হইতেন না। কেননা পাপাচারীরা ফাসিক হইয়া থাকে এবং ফাসিকের সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأَ فَتَبَيَّنُوا
"যদি কোন ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের নিকট কোন সংবাদ লইয়া আসে তবে তোমরা উহা যাচাই করিয়া লইবে” (৪৯:৬)।
তাহা হইলে কিয়ামতের দিন অন্যান্য উম্মতের মুকাবিলায় নবীগণের সাক্ষ্য কিভাবে গ্রহণযোগ্য হইবে? অথচ কুরআন শরীফে আছে যে, প্রত্যেক নবী কিয়ামতের দিন নিজ নিজ উম্মতের সম্পর্কে সাক্ষ্য দিবেন। যেমন আল্লাহ বলেন:
فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٌ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا
"যখন আমি প্রত্যেক উম্মত হইতে একজন সাক্ষী উপস্থিত করিব এবং তোমাকে উহাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করিব তখন কী অবস্থা হইবে" (৪:৪১)?
(৩) নবীর কাজ হইল মানুষকে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে আহবান করা। এখন তাঁহারা নিজেরাই যদি আল্লাহ্ বাধ্য-অনুগত বান্দা না হন তাহা হইলে তো তাঁহারা আল্লাহর ভর্ৎসনার উপযুক্ত হইবেন। যেমন কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে:
أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ أَنْفُسَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ .
"তোমরা কি মানুষকে সৎকার্যের নির্দেশ দাও আর নিজেদেরকে বিস্মৃত হও, অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন কর! তবে কি তোমরা বুঝ না" (২:৪৪)?
لِمَ تَقُولُونَ مَالَا تَفْعَلُوْنَ . كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ
"তোমরা যাহা কর না তাহা তোমরা কেন বল এবং তোমরা যাহা কর না তোমাদের তাহা বলা আল্লাহ্র নিকট অতিশয় অসন্তোষজনক" (৬১: ২-৩)।
অথচ এরূপ আচরণ একজন সাধারণ বক্তা ও নিম্নমানের আলিমের পক্ষেও সমীচীন নহে। নবী-রাসূলগণের পক্ষে তাহা কী করিয়া শোভন হইতে পারে?
(৪) পাপাচার সংঘটিত হইয়া থাকে শয়তানের আনুগত্যের কারণে। নবীগণ যদি মাসুম না হন তাহা হইলে তাহাদেরকে শয়তানের আনুগত্যকারী সাব্যস্ত করিতে হয়। যেমন আল্লাহ বলিয়াছেন:
وَلَقَدْ صَدَّقَ عَلَيْهِمْ إِبْلِيسُ ظَنَّهُ فَاتَّبَعُوهُ إِلَّا فَرِيقًا مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ
"উহাদের সম্পর্কে ইবলীস তাহার ধারণা সত্য প্রমাণ করিল, ফলে উহাদের মধ্যে একটি মুমিন দল ব্যতীত সকলেই তাহার অনুসরণ করিল" (৩৪: ২০)।
অথচ নবীগণকে প্রেরণের উদ্দেশ্যই হইল শয়তানের অনুসরণ হইতে লোকজনকে রক্ষা করা।
(৫) নবীগণ মা'সূম না হইলে তাহাদের তুলনায় যাহারা নবী নন তাহাদের শ্রেষ্ঠতর হওয়া প্রমাণিত হয়। কেননা উক্ত আয়াতে মুমিনদের একটি দলকে উহার ব্যতিক্রম বলা হইয়াছে। সুতরাং তাঁহারা নবীগণের চাইতেও উত্তম প্রতিপন্ন হইবেন। কেননা ঐ মতে নবীগণ যেখানে শয়তানের অনুসরণ হইতে আত্মরক্ষা করিতে পারিবেন না, সেখানে তাহারা কঠোর তাকওয়া ও ঈমানের দৃঢ়তার পরিচয় দিয়াছেন। আর আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন :
إِنَّ أَكْرَمَكُم عِنْدَ اللهِ أَتْقَاكُمْ .
"তোমাদের মধ্যকার অধিকতর তাকওয়ার অধিকারীরাই আল্লাহ্র নিকট অধিকতর মর্যাদার অধিকারী” (৪৯: ১৩)
(৬) আল্লাহ তা'আলা বান্দাদিগকে দুই ভাগে ভাগ করিয়াছেনঃ হিযবুল্লাহ বা আল্লাহ্র দল এবং হিযবুশ শয়তান বা শয়তানের দল। প্রথমোক্ত দল বলিয়া অভিহিত করিয়া আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"ওহে! আল্লাহ্র দলই সফলকাম দল" (৫৮: ২২)।
أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
"ওহে! আল্লাহ্র দলই বিজয়ী” (৫: ৫৬)।
فَإِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْغَالِبُونَ .
"ওহে! শয়তানের দলই ক্ষতিগ্রস্ত" (৫৮: ১৯)।
أَلَا إِنَّ حِزْبَ الشَّيْطَانِ هُمُ الْخَاسِرُونَ .
সুতরাং নবীগণের পাপাচারে লিপ্ত হওয়া সম্ভব হইলে আল্লাহ্র দলের পরিবর্তে তাহাদেরকে শয়তানের দলবর্তী এবং ক্ষতিগ্রস্ত হইতে হয় (নাউযু বিল্লাহ)। ইহা তো কখনও হইতে পারে না।
(৭)। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে স্বয়ং ইবলীসের উক্তি উদ্ধৃত করিয়াছেন এইভাবে:
فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ إِلَّا عِبَادِكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ
"আপনার ক্ষমতার শপথ! আমি উহাদের সকলকেই পথভ্রষ্ট করিব, তবে উহাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদিগকে নহে” (৩৮: ৮২-৮৩)।
আর সর্বদিক দিয়া একনিষ্ঠ বান্দা কেবল নবী-রাসূলগণই, যেমন হযরত ইবরাহীম, হযরত ইসহাক ও হযরত ইয়া'কূব (আ) সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
إِنَّا أَخْلَصْنَاهُمْ بِخَالِصَة ذِكْرَى الدَّارِ .
এবং হযরত ইউসুফ (আ) সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ .
(দ্র. ৩৮:৪৬ ও ১২: ২৪)।
উক্ত আয়াতসমূহে এবং কুরআনুল করীমের আরও অনেক স্থানে নবী-রাসূলগণকে আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে।
(৮)। আল্লাহ তা'আলা কুরআন শরীফের বিভিন্ন স্থানে নবী-রাসূলগণকে মুস্তফা ও মুজতাবা নির্বাচিত, মনোনীত, বাছাইকৃত ও বিশেষ মর্যাদাবান পুণ্যবান বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন:
وَأَنَّهُمْ عِنْدَنَا لَمِنَ الْمُصْطَفَيْنَ الْأَخْيَارِ .
"নিঃসন্দেহে তাহারা ছিল আমার মনোনীত উত্তম বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত” (৩৮:৪৭)।
وَاذْكُرْ اسْمَعِيلَ وَالْيَسَعَ وَذَا لَكِفْلِ كُلٌّ مِّنَ الأَخْيَارِ .
"স্মরণ কর ইসমাঈল, আল-ইয়াসা ও যুল-কিফলের কথা, ইহারা প্রত্যেকেই ছিল সজ্জন" (৩৮:৪৮)।
লক্ষণীয়, তাহাদের কোন বিশেষ গুণের কথা উল্লেখ করিয়া তাঁহাদেরকে মনোনীত ও মর্যাদাশীল বান্দা বলিয়া অভিহিত করা হয় নাই, বরং সামগ্রিকভাবে তাঁহাদেরকে মনোনীতরূপে ঘোষণা করা হইয়াছে। এহেন নির্বাচিত ও মনোনীত বান্দাগণ যে আল্লাহ্র অবাধ্যতায় লিপ্ত হইতে পারেন না, তাহা বলাই বাহুল্য।
(৯)। আল্লাহ তা'আলা নবী-রাসূলগণ সম্পর্কে বলিয়াছেন:
يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ .
"তাহারা কল্যাণকর কাজে ধাবিত হয়" (৩ঃ ১১৪)।
লক্ষণীয় خیرات শব্দটিকে ال যোগে বর্ণনা করা হইয়াছে। এই ال ব্যাকরণে ال استغراقی বা সম্পূর্ণবোধক অব্যয় বলা হয়, যাহরা অর্থ হইতেছে তাঁহারা সর্বপ্রকার কল্যাণেরই আধার, অকল্যাণকর কিছু তাঁহাদের দ্বারা হইতে পারে না।
(১০) প্রত্যেক পাপীতাপীর ব্যাপারেই 'যালিম' শব্দটি প্রযোজ্য। কুরআন শরীফের অনেক স্থানেই পাপীদিগকে 'যালিম' বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে। সুতরাং কোন নবী যদি কোন অবাধ্যতায় লিপ্ত হইতেন, তাহা হইলে তাঁহার ব্যাপারেও উহা প্রযোজ্য হইত। কোন যালিম-এর পক্ষে নবী হওয়া কখনও সম্ভবপর নহে। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ
"আমার প্রতিশ্রুতি যালিমদের প্রতি প্রযোজ্য নহে” (২: ১২৪)।
উক্ত আয়াতে عَهْدْ শব্দ দ্বারা যদি নবুওয়াত উদ্দিষ্ট হইয়া থাকে, তাহা হইলে পাপাচারী ও যালিম যে নবী হইতে পারে না তাহা তো স্পষ্ট কথা। আর যদি ইহার অর্থ 'ইমামত' বা নেতৃত্ব হইয়া থাকে, যেমনটি তাফসীর জালালায়নে উক্ত হইয়াছে, তবে ইহার দ্বারা যালিমের পক্ষে নবী হওয়া যে অসম্ভব তাহা আরও জোরদারভাবে প্রমাণিত হয়। কেননা ইমামতের তুলনায় নবুওয়াতের মর্যাদা এতই অধিক যে, বিন্দুর সাথে সিন্ধুর তুলনাও এখানে অচল। এমতাবস্থায় যালিম যদি 'ইমাম' বা নেতাই হইতে না পারে, নবী হইবে কেমন করিয়া?
(১১) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ
"আল্লাহ তা'আলা সেই পবিত্র সত্তা যিনি নিরক্ষর সম্প্রদায়ের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করিয়াছেন তাহাদেরই মধ্য হইতে যিনি তাহাদেরকে তাঁহার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করিয়া শুনাইবেন এবং তাহাদেরকে পবিত্র করিবেন" (৬২: ২)।
নবী নিজেই যদি আত্মিকভাবে বিশুদ্ধ না হইয়া পাপাচারী হন তাহা হইলে তাঁহার দ্বারা অন্যদের শুদ্ধি কেমন করিয়া সাধিত হইতে পারে?
(১২) নবী আল্লাহ্র পক্ষ হইতে উম্মতের জন্য উসওয়ায়ে হাসানা (সুন্দরতম আদর্শ) এবং আল্লাহ তা'আলার পসন্দসই চারিত্রিক গুণাবলীর আধার হইয়া থাকেন, যাহাতে লোকজন বিনা আপত্তিতে চোখ বুজিয়া তাঁহাকে অনুসরণ করিতে এবং তাঁহার প্রতিটি কথা ও কাজকে নিজেদের জন্য আদর্শরূপে গ্রহণ করিতে পারে। আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ لَمَنْ كَانَ يَرْجُوا اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا ...
"তোমাদের মধ্যে যাহারা আল্লাহ ও শেষ বিচারের দিনকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণ স্মরণ করে তাহাদের জন্য অবশ্যই উত্তম আদর্শ রহিয়াছে রাসূলুল্লাহর মধ্যে" (৩৩: ২১)।
বলা বাহুল্য, আল্লাহ তা'আলা পছন্দনীয় স্বভাব-চরিত্র, তাঁহার আনুগত্যের নমুনা এবং আল্লাহ্র ভয় অন্তরে পোষণকারীদের আদর্শ কেবল এমন ব্যক্তিই হইতে পারেন যিনি আল্লাহ তা'আলার নাফরমানী হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র হইবেন।
(১৩) কোন ব্যক্তি যদি নবীর বর্তমানে কোন কাজ করে এবং নবী তাহা লক্ষ্য করিয়াও চুপ থাকেন বা মৌন সমর্থন দেন তবে তাঁহার ঐ মৌনতাই ঐ কাজটি বৈধ হওয়ার প্রমাণরূপে সকল দলমতের মুসলমানদের কাছে গ্রহণযোগ্য। ইহাতে প্রতীয়মান হয় যে, নবীর মৌন সমর্থনই কোন কাজকে আল্লাহ্ বিরুদ্ধাচরণের সীমা হইতে বৈধতার গণ্ডীর মধ্যে নিয়া আসে। এমতাবস্থায় তাঁহার নিজের করা কাজ কেমন করিয়া আল্লাহ্ তা'আলার অবাধ্যতা বলিয়া গণ্য হইতে পারে?
(১৪) কতক লোক যখন নিজেদের সম্পর্কে দাবি করিল যে, তাহারা আল্লাহর প্রিয়ভাজন, তখন আয়াত নাযিল হইল:
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ .
"তুমি বলিয়া দাও (হে রাসূল), যদি তোমরা প্রকৃতই আল্লাহকে ভালবাস তবে আমার অনুসরণ কর, তাহা হইলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসিবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করিয়া দিবেন" (৩ঃ৩১)।
উক্ত আয়াতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুসরণকে আল্লাহ নিজের ভালবাসার মাপকাঠি সাব্যস্ত করিয়াছেন। তারপর তাঁহার অনুসরণের বিনিময়ে দুইটি অঙ্গীকার করিয়াছেন। ইহার একটি হইল, যদি তোমরা আমার নবীর অনুসরণ কর, তাহা হইলে আমি তোমাদেরকে আমার প্রিয়পাত্ররূপে গ্রহণ করিব। দ্বিতীয়ত, তোমাদের গুনাহরাশিও মাফ করিয়া দিব।
বলা বাহুল্য, আল্লাহ তা'আলার ভালবাসার মাপকাঠি এমন পুণ্যাত্মা ব্যক্তির অনুসরণই হইতে পারে যিনি মা'সূম হইবেন। একজন গায়র ম'সূমের আনুগত্য মহান আল্লাহর ভালবাসা লাভের এবং গুনাহসমূহের ক্ষমার কারণ হইতে পারে না (দ্র. ইস্মাতুল আম্বিয়া আরবী, পৃ. ৪-১০; ফখরুদ্দীন রাযী (৫৪৩-৬০৬হি); মা'আরিফুল কুরআন (উর্দু), ১খ, পৃ. ৯৯-১১৩; ইদরীস কান্দেহলভী প্রণীত মাকতাবায়ে উছমানীয়া বায়তুল হাম্দ, লাহোর, ২য় মুদ্রণ, ১৯৮২ খৃ.)।