📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইসমাত বা নিষ্পাপ হওয়ার অর্থ

📄 ইসমাত বা নিষ্পাপ হওয়ার অর্থ


ইসমত হইতেছে বাহিরে ও অভ্যন্তরে নফস তথা রিপু ও শয়তানের হস্তক্ষেপ হইতে পবিত্র ও মুক্ত থাকা। নফস এবং শয়তানই হইতেছে মা'সিয়াত বা পাপাচারের উৎস বা মূল হেতু। আর মা'সিয়াত বা পাপাচার হইতে মুক্ত থাকার নামই হইতেছে ইস্মত। মা'সূম ঐ সত্তা যাঁহার মন ও মনন, বিশ্বাস ও ই'তিকাদ, ইচ্ছা-আকাঙ্খা, আচার-আচরণ, অভ্যাস-ইবাদত লেনদেন, কথাবার্তা, ক্রিয়াকর্ম সবকিছু নফস ও শয়তানের হস্তক্ষেপ হইতে সর্বতোভাবে মুক্ত। গায়বী হিফাযত দ্বারা তিনি সংরক্ষিত থাকেন। তাঁহার দ্বারা এমন কিছু সংঘটিত হইতে পারে না যদ্বারা তাঁহার ইসমত কোনভাবে বিঘ্নিত ও ক্লেদাক্ত হইতে পারে। আল্লাহ তা'আলা সদয় দৃষ্টি এবং ফেরেশতাগণের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান তাঁহাকে ঘিরিয়া থাকে যাহা তাঁহাকে পদে পদে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং হকের সামান্যতম পরিপন্থী প্রবণতা হইতেও তাঁহাকে ফিরাইয়া রাখে। আল্লাহ তা'আলা কুরআনুল কারীমে আম্বিয়ায়ে কিরামকে "মুসতাফায়নাল আখয়ার" (মনোনীত উত্তম বান্দা; দ্র. ৩৮ : ৪৭) ও "ইবাদুল মুখলাসীন" (একনিষ্ঠ বান্দা; দ্র. ৩৮ : ৪০) বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন, যাহা তাঁহাদের প্রতি আল্লাহর সার্বিক সন্তুষ্টি এবং তাহাদের ঐকান্তিক নিষ্ঠার প্রমাণবহ। মুখলাস বা মুখলিস শব্দ কেবল তাঁহার জন্যই প্রযোজ্য যাহার মধ্যে গায়রুল্লাহ্ বিন্দুমাত্র প্রভাব নাই, পূর্ণ মাত্রায় আল্লাহ্র জন্য নিবেদিত। অর্থাৎ তাহারা শয়তানী উপাদান হইতে সর্বোতোভাবে মুক্ত, পবিত্র। সুতরাং নবী অবশ্যই সর্বপ্রকার সগীরা ও কবীরা গুনাহ হইতে মুক্ত ও সর্বপ্রকার ক্লেদ হইতে পবিত্র বা মা'সূম হইবেন ইহাই স্বাভাবিক। আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴿ إِلَّا مَنِ ارْتَضَىٰ مِن رَّسُولٍ ﴾ (৭২: ২৭)-এর মধ্যে مِن বর্ণনামূলক (بينانيه) এবং رَّسُول শব্দটি অনির্দিষ্ট বাচক (نكرة) -রূপে আসিয়াছে। এই বর্ণনাভঙ্গি দ্বারা ইহা সুস্পষ্ট যে, নবী মাত্রই আল্লাহ তা'আলার পসন্দনীয় এবং মনোনীত বান্দা। তাঁহার প্রত্যেকটি আমল-আখলাক, স্বভাব-চরিত্র, আচার-আচরণ, হাল-অবস্থা সর্বদিক হইতে আল্লাহ তা'আলার নিকট পসন্দনীয় এবং তিনি সর্বতোভাবে একমাত্র আল্লাহরই বান্দা। উক্ত আয়াতে বর্ণিত সন্তুষ্টি কোনক্রমেই আংশিক সন্তুষ্টি নহে। কেননা কোন না কোন দিক দিয়া প্রত্যেক মুসলমানই আল্লাহর সার্বিক ও পূর্ণ মাত্রার সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত হয়, আর পূর্ণ মাত্রায় এই সন্তুষ্টি কেবল ঐ বান্দাগণই লাভ করিতে পারেন যাহাদের যাহির-বাতিন নফস তথা রিপু এবং শয়তানের বন্দেগী ও আনুগত্য হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র। মা'সিয়াত তথা পাপ-পঙ্কিলতা হইতে এই সার্বিক মুক্ত থাকার নামই হইতেছে ইস্মত, পাপ হইতে মুক্ত থাকা। আম্বিয়া কিরামের বিশেষণরূপে ইস্তিফা ও ইরতিদা শব্দ দুইটির প্রয়োগও প্রণিধান যোগ্য। শব্দ দুইটি باب افتعال -এর مصدر বা ক্রিয়ামূল। নিজের জন্য নির্দিষ্ট কোন ব্যাপার বুঝাইতে ইহা ব্যবহৃত হইয়া থাকে। যেমন اکتيال اتزان শব্দ দুইটি নিজের জন্য ওজন করিয়া লওয়া ও মাপিয়া লওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। পক্ষান্তরে وزن و كيل শব্দ দুইটি নিজের-পরের সকলের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী:
وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ . وَإِذَا كَالُوهُمْ أَوْ وَزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ .
ইহাতে নিজেদের জন্য মাপিয়া নেওয়াকে إذا اكتالوا এবং অন্যদের জন্য মাপিয়া লওয়াকে کالوهم ও অন্যদের জন্য ওজন করিয়া লওয়াকে وزنوهم বলা হইয়াছে (অর্থাৎ যাহারা নিজেদের জন্য মাপিয়া বা ওজন করিয়া লইতে পরিপূর্ণভাবে কড়ায়- গণ্ডায় আদায় করিয়া লয়, আর অন্যদের জন্য মাপিতে বা ওজন করিতে কম করিয়া দেয়, উক্ত আয়াতে তাহাদের নিন্দা করা হইয়াছে)। ব্যকরণের এই নিয়ম অনুসারেই, اِرْتِضَاء ও اِصْطِفَاء শব্দদ্বয়ের দ্বারা নিজের জন্য বাছিয়া লওয়া ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করা বুঝান হইয়াছে। অন্যত্র ঐ একই অর্থে বলা হইয়াছে:
"আমি তোমাকে নিজের জন্য পছন্দ করিয়া লইয়াছি (হে রাসূল)" وَاصْطَنَعْتُكَ لِنَفْسِي .
মোটকথা, আম্বিয়ায়ে কিরাম (আ) তাঁহাদের সকল আখলাক, আদাত, ইবাদাত, মুআমালাত, আচার-আচরণ ও কথায়-বার্তায় আপদমস্তক আল্লাহ তা'আলার পসন্দনীয় এবং যাহিরে-বাতিনে শয়তানী হস্তক্ষেপ ও রিপুর তাড়না হইতে মুক্ত ও পবিত্র থাকেন। একটি মুহূর্তের জন্যও তাঁহারা আল্লাহ্ করুণা, সাহায্য ও তত্ত্বাবধান হইতে বিচ্ছিন্ন হন না। এইজন্যই বিনা প্রশ্নে শর্তহীনভাবে আম্বিয়ায়ে কিরামের আনুগত্য করা ফরয, তাহাদের প্রতিটি কথা ও কাজ গ্রহণীয় এবং তাঁহাদের আনুগত্য বর্জন চিরস্থায়ী দুর্ভাগ্যের এবং ইহলোকে-পরলোকে সমূহ ক্ষতির কারণ। মানবিক কারণে যদি নবী-রাসূলগণের দ্বারা কখনো কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটিয়াও যায়, তবে তাহা বাহির হইতে আসে, তাঁহাদের নিজেদের অভ্যন্তর হইতে নহে। যেমন পানির মধ্যে উষ্ণতা বাহির হইতে আসিয়া থাকে, স্বভাবগতভাবে উহাতে কেবল শীতলতাই থাকে, উষ্ণতার নামমাত্র থাকে না। এইজন্য পানি যতই গরম হউক না কেন, আগুনে উহা ঢালিয়া দেওয়া মাত্র তাহা নির্বাপিত হইয়া যায়। অনুরূপ আম্বিয়ায়ে কিরামের অন্তর্লোক পাপাচারের উৎস-উপাদান (নফস ও শয়তান) হইতে সর্বতোভাবে মুক্ত ও পবিত্র। বাহিরের আছরের ফলে কখনও তাঁহাদের দ্বারা কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি হইয়া গেলেও কুদরতের অদৃশ্য হাত তাঁহাদের ইসমতের চেহারা হইতে সেই বহিরাগত ধুলাবালি ঝাড়িয়া পরিষ্কার করিয়া দেয়। ফলে নবুওয়াতের চেহারা পূর্বের তুলনায় পরিচ্ছন্নতর ও উজ্জ্বলতর হইয়া ঝলমলাইয়া উঠে। ইউসুফ (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ .
"এইভাবে আমি তাহাকে মন্দ কর্ম ও অশ্লীলতা হইতে বিরত রাখিবার জন্য নিদর্শন দেখাইয়াছিলাম। সে তো ছিল আমার বিশুদ্ধচিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত” (১২: ২৪)। উক্ত আয়াতে আমাদের পূর্ববর্তী বক্তব্যের যথার্থতাই প্রতীয়মান হয়। কেননা উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন যে, তিনি গর্হিত কর্ম ও অশ্লীলতাকে ইউসুফ (আ) হইতে দূরে রাখিয়াছেন। তিনি বলেন নাই যে, তিনি ইউসুফকে গর্হিত কর্ম ও অশ্লীলতা হইতে দূরে রাখিয়াছেন। ফিরাইয়া রাখা, দূরে রাখা বা হটাইয়া দেওয়ার ব্যাপারটা তাহার জন্যই প্রযোজ্য হইতে পারে, যে নিজে সেদিকে অগ্রসর হইতে উদ্যত হয়। উক্ত আয়াতের বক্তব্য দ্বারা বুঝা গেল যে, গর্হিত কর্ম ও অশ্লীলতা ইউসুফ (আ)-এর দিকে ধাবিত হইতে চাহিতেছিল। আল্লাহ তা'আলা তাহা ফিরাইয়া রাখিলেন। ইউসুফ (আ) সেদিকে অগ্রসর হইতে প্রয়াস পান নাই।
মোটকথা, বাহিরের প্রভাবে ভুলরশত আম্বিয়ায়ে কিরামের দ্বারা যেসব ত্রুটি-বিচ্যুদ্ধি হইয়া যায়, *বাহ্যত তাহাকে 'ইস্সিয়ান বা মা'সিয়াত (পাপ বা অপরাধ) বলিয়া অভিহিত করা যায় অথবা বলা যায়, তাহাদের উচ্চ মর্যাদার দিকে লক্ষ্য রাখিয়া ঐগুলিকেও পাপ বা অপরাধ বলিয়া অভিহিত করা হইয়া থাকে, যদিও বাস্তবিকপক্ষে উহা অপরাধ নহে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মাসিয়াত বা পাপ কি?

📄 মাসিয়াত বা পাপ কি?


আল্লাহ্ হুকুম পালন না করা মাত্রই মা'সিয়ত বা গুনাহ নহে, বরং জ্ঞাতসারে ও ইচ্ছাকৃতভাবে যে বিরুদ্ধাচরণ করা হইয়া থাকে, ভুলক্রমে বা অনিচ্ছকৃতভাবে নহে, তাহাই পাপ বা গুনাহ। এইজন্যই ওযরখাহী করিতে গিয়া বলা হইয়া থাকে, আমি ভুলিয়া গিয়াছিলাম অথবা আমি বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই। যদি ভুলক্রমে বা ভুল বুঝাবুঝির কারণে সংঘটিত ত্রুটি-বিচ্যুতিও পাপ বলিয়া অভিহিত হয়, তাহা হইলে ওযরখাহির ক্ষেত্রে আমি ভুলিয়া গিয়াছিলাম বা বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই বলার কোন অর্থই হয় না। যে ভুলত্রুটি ভুলক্রমে সংঘটিত হইয়া যায় তাহাকে মা'সিয়াত বা গুনাহ না বলিয়া উহাকে বলা হয় পদস্খলন (১১)। হযরত আদম (আ)-এর নিষিদ্ধ ফল খাওয়াও ছিল ভুলবশত। কুরআনুল কারীমে বলা হইয়াছে :
فَنَسِي وَلَمْ نَجِدْ لَهُ عَزْمًا
"তারপর সে (আদম) ভুলিয়া গেল, আর আমি তাহার মধ্যে দৃঢ়তা পাইলাম না" (২: ১১৫)।
হযরত আদম (আ) তখন আল্লাহ তা'আলা تَقْربًا هذه الشَّجَرَةَ "এ গাছের কাছেও তোমরা দুইজন ঘেষিও না" বলিয়া যে নিষেধাজ্ঞা জারী করিয়াছিলেন উহাও সেই সময় ভুলিয়া গিয়াছিলেন। শয়তান যে চিরশত্রু তাহাও তখন তাঁহার স্মরণ ছিল না। আল্লাহ তা'আলা যে পূর্বাহ্নেই বলিয়া রাখিয়াছিলেন:
فَلَا يُخْرِجَنَّكُمَا مِنَ الْجَنَّةِ فَتَشْقَى
"তোমাদেরকে সে যেন বেহেশত হইতে বাহির করিয়া না দেয়, দিলে তোমরা দুর্ভোগে নিপতিত হইবে" (২: ১১৭), তাহাও তখন তাঁহার স্মরণ ছিল না। সুতরাং যাহা ঘটিয়াছে ভুলক্রমেই ঘটিয়াছে। উহাকে পাপ বা অপরাধ বলিয়া অভিহিত করাই ভুল। হযরত আদম ও হাওয়া (আ) উভয়ে জান্নাতের জন্যই আত্মহারা ছিলেন। এইজন্য ইবলীসের শপথ শুনিয়া তাঁহারা তাহার প্রতারণার শিকার হইয়া গেলেন এবং ভাবিলেন, স্বয়ং আল্লাহর নাম লইয়া কেহ মিথ্যা বলিতে পারে না। উপরন্তু আদম (আ)-এর নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ ছিল আল্লাহ্র প্রতি অনুরাগ-মহব্বতেরই কারণে, জান্নাতে আল্লাহর নৈকট্য চিরস্থায়ী হইবার আকাঙ্খায়। কুরআন মজীদের আয়াতাংশ যেমন শয়তানের উক্তি হিসাবে বর্ণিত হইয়াছে:
مَا نَهَاكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ إِلا أَنْ تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ
"তোমরা দুইজনে ফেরেশতা হইয়া যাও অথবা স্থায়ী হইয়া যাও এইজন্যই তোমাদের প্রভু তোমাদেরকে এই বৃক্ষ হইতে নিষেধ করিয়াছেন" (৭ঃ ২০)।
আল্লাহ্ নামে শপথ করার কারণে আদম (আ) এই ভুলে নিপতিত হইয়াছিলেন :
وَقَاسَمَهُمَا إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ .
"এবং সে (শয়তান) তাহাদের দুইজনের নিকট শপথ করিয়া বলিল, নিশ্চয় আমি তোমাদের দুইজনের হিতাকাঙ্খীদের একজন" (৭ঃ ২১)।
তখন হযরত আদম (আ)-এর মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ হইল না যে, মহান আল্লাহ্র পবিত্র নাম লইয়াও কেহ মিথ্যা শপথ করিতে পারে, মিথ্যা কথা বলিতে পারে। তিনি মনে করিলেন, আল্লাহ্র কোন বান্দাই তাঁহার পবিত্র ও মহান নাম লইয়া মিথ্যা শপথ করিতে পারে না। সুতরাং বুঝা গেল যে, হযরত আদম (আ)-এর উক্ত কাজ বিরুদ্ধাচরণের উদ্দেশ্যে বা রিপুর তাড়নায় ছিল না। তাই উহাকে গুনাহ বা অপরাধ বলা যাইবে না বরং উহাকে তাঁহার পদস্খলনই বলিতে হইবে। আল্লাহ তা'আলার বাণী فَأَزَلْهُمَا الشَّيْطَانُ ٢ فَدَكَّاهُمَا بِغُرُورِ -এর উভয় ক্ষেত্রেই উহা যে তাঁহার পদস্খলন ও ভুলবশত ছিল, তাঁহার আল্লাহ্র নাফরমানীর ইচ্ছা ছিল না সেদিকেই ইঙ্গিত করা হইয়াছে।
সুতরাং কুরআনুল কারীমের যে সমস্ত আয়াতে উহাকে তাঁহার বিরুদ্ধাচরণ বা অপরাধ বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে উহা কেবল যাহেরী সুরত হিসাবেই বলা হইয়াছে, প্রকৃত অর্থে নহে অথবা তাঁহার উচ্চ মর্যাদার অনুপাতে উহাকে 'ইসয়ান বা অপরাধ বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে।
নবী-রাসূলগণের ক্ষেত্রে উত্তম কাজ ছাড়িয়া অনুত্তম বা তাহার চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের কাজ করাই এমন যেমনটি অন্যদের জন্য অপরাধমূলক কর্ম (দ্র. খিয়ালী-এর মোল্লা আবদুল হাকীমের লিখিত পাদটীকা)।
নবী-রাসূলগণের ত্রুটির অর্থ হইতেছে উত্তম ও শ্রেষ্ঠতরটির স্থলে ভুলবশত তাহাদের অপেক্ষাকৃত অনুত্তমটি করিয়া বসা। আর অন্যদের ত্রুটির অর্থ হক ও হিদায়াতের স্থলে বাতিল বা গোমরাহীর মধ্যে লিপ্ত হইয়া পড়া। উম্মতের আলিমগণের সর্ববাদীসম্মত মতে আম্বিয়ায়ে কিরাম এই জাতীয় ত্রুটি বা অপরাধ হইতে মুক্ত, মা'সূম। তাঁহাদের ইজতিহাদগত ত্রুটির অর্থ হইতেছে ভুলবশত উত্তম ও শ্রেষ্ঠতরটির স্থলে অপেক্ষাকৃত অনুত্তম তাঁহাদের দ্বারা সংঘটিত হইয়া যাওয়া।
হযরত আদম (আ)-এর পদস্খলন (JI) ততটুকুই। তাহা না হইয়া (আল্লাহ্ আশ্রয় চাই) তাঁহারা যদি লোভের বশবর্তী ও রিপুর অনুবর্তী হইতেন, তাহা হইলে আল্লাহ তা'আলা আমাদের উপর তাহাদের নিঃশর্ত ও অকুণ্ঠ আনুগত্য কখনও ফরয বা অপরিহার্য করিয়া দিতেন না আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে তাঁহাদের অনুকরণের নির্দেশ দিয়া বলিতেন নাঃ
أولئِكَ الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ فَبِهُدَاهُمُ اقْتَدِهُ .
"ইহারাই হইতেছে সেই সব ব্যক্তি যাহাদেরকে স্বয়ং আল্লাহ হিদায়াত দান করিয়াছেন, সুতরাং (তুমি ওহে রাসূল) তাহাদেরই অনুকরণ কর" (৬: ৯০) (দ্র. আল-মু'তামাদ ফি'ল-মু'তাকাদ-তাওরীশী প্রণীত)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মাসূম বা নিষ্পাপ হওয়ার ক্ষেত্রসমূহ

📄 মাসূম বা নিষ্পাপ হওয়ার ক্ষেত্রসমূহ


ইমাম রাযী (র) বলেন, ইসমতের সম্পর্ক চারটি ব্যাপারের সহিত:
(১) আকাইদ (বিশ্বাস)
(২) আহকাম (আদেশ-নিষেধের তাবলীগ)
(৩) ফাতওয়া ও ইজতিহাদ;
(৪) কার্যকলাপ, আচার-আচরণ, অভ্যাস ও স্বভাব-চরিত্র।
(১) আকাইদ সম্পর্কে গোটা মুসলিম উম্মাহর সর্ববাদীসম্মত মত এই যে, নবী-রাসূলগণ একেবারে গোড়া হইতেই সহজাতভাবে তাওহীদ ও ঈমানের অধিকারী হইয়া থাকেন। ভূমিষ্ঠ কাল হইতেই তাঁহাদের অন্তর কুফর ও শিরকের ক্লেদমুক্ত এবং ইয়াকীন ও বিশ্বাসে পরিপূর্ণ থাকে। তাঁহাদের মুবারক চেহারাসমূহ সর্বদা মারিফাত ও আল্লাহর নৈকট্যের জ্যোতিতে উদ্ভাসিত থাকে। আজ পর্যন্ত ইতিহাসে ইহার কোন প্রামণ পাওয়া যায় নাই যে, আল্লাহ তা'আলা যে পবিত্র আত্মা মনীষিগণকে নবুওয়াত ও রিসালাত দানে ধন্য করিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যকার কোন একজনও জীবনের কোন পর্যায়ে শিরক ও কুফরের কলুষতায় নিপতিত হইয়াছেন। আল্লাহ তা'আলার বাণী:
وَلَقَدْ أَتَيْنَا إِبْرَاهِيمَ رُشْدَهُ مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا بِهِ عَالِمِينَ.
"ইবরাহীমকে আমি পূর্ব হইতেই হিদায়াত দান করিয়াছিলাম এবং আমি তাহার সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত ছিলাম” (২১ : ৫১)। ইহা দ্বারা সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, নবুওয়াত লাভের পূর্বে যদিও নবীগণ নবী পদবাচ্য হন না, তবুও তাঁহারা তখনও আল্লাহ কামিল ওলী এবং নৈকট্যধন্য অবশ্যই থাকেন। তাঁহাদের সেই বিলায়াত এত উচ্চ মানের হয় যে, অন্য ওলীগণ তাঁহাদের তুলনায় সমুদ্রের সম্মুখে বারি বিন্দুসমও গণ্য হন না। এইজন্য উম্মতে মুহাম্মাদীর আলিমগণ এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত যে, আম্বিয়ায়ে কিরামের অন্তরে কুফর ও গুমরাহির উপস্থিতি অসম্ভব।
(২) তাবলীগে আহকাম বা আদেশ-নিষেধের প্রচারে নবী-রাসূলগণ যে মা'সূম এ ব্যাপারে গোটা উম্মত একমত। এই ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁহাদের কোন ভুলভ্রান্তির শিকার হওয়া বা মনের অজান্তে ভুলক্রমে তাবলীগের ক্ষেত্রে তাহাদের মিথ্যা বা বিকৃতির আশ্রয় লওয়া অসম্ভব। এই ব্যাপারে তাঁহারা সর্বতোভাবে মা'সূম ও পবিত্র। তাঁহাদের সুস্থ বা অসুস্থ অবস্থায় অনুরাগ বা বিরাগের ক্ষেত্রে কোন অবস্থায়ই ওহী প্রচারের ব্যাপারে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাঁহাদের কোনরূপ মিথ্যা বা ছলচাতুরীর আশ্রয় লওয়া একটি অসম্ভব ব্যাপার। নচেৎ অকুণ্ঠচিত্তে ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় ফেরেশতাগণের কঠোর প্রহরার ব্যবস্থা থাকিত, যাহাতে শয়তানের কোনরূপ হস্তক্ষেপ, ভেজাল বা মিথ্যার সংমিশ্রণ ওহীর সহিত না ঘটিতে পারে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন :
عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَدًا إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَسُولٍ فَإِنَّهُ يَسْلُكُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ رَصَدًا ، لِيَعْلَمَ أَنْ قَدْ أَبْلَغُوا رِسَالَاتِ رَبِّهِمْ وَأَحَاطَ بِهَا لَدَيْهِمْ وَأَحْصَى كُلَّ شَيْءٍ عَدَدَا .
"তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা; তিনি তাঁহার অদৃশ্যের জ্ঞান কাহারও নিকট প্রকাশ করেন না তাঁহার মনোনীত রাসূল ব্যতীত। সেই ক্ষেত্রে আল্লাহ রাসূলের অগ্র ও পশ্চাতে প্রহরী নিয়োজিত করেন, রাসূলগণ তাহাদের প্রতিপালকের বাণী পৌঁছাইয়া দিয়াছেন কিনা জানিবার জন্য। রাসূলগণের নিকট যাহা আছে তাহা তাঁহার জ্ঞানগোচর এবং তিনি সমস্ত কিছুর বিস্তারিত হিসাব রাখেন" (৭২ : ২৬-২৮)।
(৩) ফাতওয়া ও ইজতিহাদের ব্যাপারে উলামায়ে ইসলামের মত হইতেছে, আম্বিয়ায়ে কিরাম যে সমস্ত ব্যাপারে ওহী অবতীর্ণ হয় নাই এমন ব্যাপারসমূহে কখনও কখনও ইজতিহাদও করিতেন। কখনও সেই সব ইজতিহাদে ভুলত্রুটি হইয়া গেলে সাথে সাথে ওহীর মাধ্যমে তাঁহাদিগকে সতর্ক করিয়া দেওয়া হইত। নবী-রাসূলের পক্ষ হইতে ইজতিহাদগত কোন ত্রুটি হইয়া যাইবে অথচ আল্লাহ্ পক্ষ হইতে তাঁহাকে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হইবে না এমনটি হইতেই পারে না।
(৪) কার্যকলাপ ও আচার-আচরণের ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত-এর অভিমত এই যে, নবী-রাসূলগণ কবীরা গুনাহ হইতে সর্বতোভাবে মুক্ত ও পবিত্র, অবশ্য সগীরা বা অনুত্তম পর্যায়ের কাজ কখনো ভুলবশত বা অজ্ঞাতসারে হইয়া যাইতে পারে। বাহ্যিকভাবে তাহা অপরাধ বলিয়া মনে হইলেও ঐগুলির দ্বারাও শরীআতের কোন কোন হুকুম ব্যক্ত করাই উদ্দেশ্য। উদাহরণস্বরূপ বলা যাইতে পারে, যুহর বা আসরের নামাযে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভুল (সাহু) হইয়া যাওয়া। বাহ্যত উহা ভুল বলিয়া দেখা গেলেও ইহার দ্বারা প্রকৃতপক্ষে সিজদায়ে সহো শিক্ষা দেওয়াই উদ্দেশ্য ছিল। নবী করীম (স)-এর নামাযে সাহু না হইলে উম্মত সিজদায়ে সাহুর মাআলা কীভাবে শিক্ষা লাভ করিত? অনুরূপভাবে 'লায়লাতুত তা'রীছ' নামে মশহুর রাত্রিতে তাঁহার নামায কাযা না হইলে উম্মত কাযা নামায আদায়ের মাআলা কোথা হইতে লাভ করিত? এই হিসাবে ঐ সাহু বা ভুলিয়া যাওয়াটাও ছিল আল্লাহ্র দয়া ও সাক্ষাত রহমত। এইজন্য হযরত আবূ বক্র (রা) বলিতেন : "হায়, যদি আমি মুহাম্মাদের ভুলত্রুটিই হইতাম"! অর্থাৎ মহানবী (স)-এর ভুল ও আমার হাজার নির্ভুল হইতে উত্তম। আল্লাহ তা'আলার বাণী:
يَا لَيْتَنِي كُنْتُ سَهْوَ مُحَمَّدٍ
سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنْسَى إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ .
"নিশ্চয় আমি তোমাকে পাঠ করাইব, ফলে তুমি বিস্মৃত হইবে না, আল্লাহ যাহা ইচ্ছা করেন তাহা ব্যতীত" (৮৭ : ৬-৭)।
এই আয়াত দ্বারাও সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, নবীর ভুলিয়া যাওয়ার মধ্যেও কোন না কোন তাৎপর্য নিহিত থাকে। মানুষ হিসাবে নবী-রাসূলগণেরও ভুলত্রুটি হইয়া থাকে। তাহা এইজন্য যে, তিনি যতক্ষণ পর্যন্ত মানবরূপে থাকিবেন, মানবীয় বৈশিষ্ট্যাবলী হইতে ততক্ষণ পর্যন্ত মুক্ত থাকা সম্ভব নহে: ক্ষুধা-তৃষ্ণা আছে, আনন্দ-উৎফুল্লতাও আছে, হাসি-কান্না আছে, অনুরাগ-বিরাগও আছে। আল্লাহ তা'আলা বাণী:
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ .
"বল আমি তোমাদেরই মত মানুষ" (১৮: ১১০)।
ইহার মধ্যে তাহার ইঙ্গিত রহিয়াছে অর্থাৎ নবী হওয়া সত্ত্বেও আমি মানুষই, ফেরেশতা নই। তোমাদেরই মত পানাহার করিয়া থাকি এবং মানবীয় প্রয়োজনাদি মিটাইবার উদ্দেশে হাট-বাজারেও গিয়া থাকি। এইসব কিছুই মানবীয় বৈশিষ্ট্য। এইগুলিও নবুওয়াত ও রিসালতের পরিপন্থী নহে। অবশ্য নবী-রাসূলগণের ভুল-ত্রুটি স্থায়ী হয় না, মানবীয় কারণে কখনও কোন ভুলচুক হইয়া গেলেও তাহা ঐ একবারই, জীবনে আর কোন দিন সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি হয় না। যেমন হাদীসে আছেঃ
لا يلدغ المؤمن من جحر مرتين
"মুমিন কখনও একই গর্তে দুইবার পা দেয় না।"
অনুরূপ হযরত আদম (আ)-এর উক্ত নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণও ছিল মানবীয় ভুলের ফসল। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَنَسِيَ وَلَمْ نَجِدْ لَهُ عَزْمًا
আদম (আ) বিস্তৃত হইলেন এবং আল্লাহর নিষেধ ও শয়তানের শত্রুতার কথা তাঁহার স্মরণে রহিল না। অবাধ্যতার ইচ্ছা তাঁহার মোটেও ছিল না। কেবল শয়তানের কসমের দ্বারাই তিনি প্রতারিত হন। হাদীছে আছে : (المؤمن غر كريم) মুমিন প্রতারিত হইয়া পড়ে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيْمَا أَخْطَنْتُمْ بِهِ وَلَكِنْ مَّا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ .
"তোমরা কোন ভুল করিলে তোমাদের কোন অপরাধ নাই, কিন্তু তোমাদের অন্তরে সঙ্কল্প থাকিলে অপরাধ হইবে" (৩৩:৫)।
উক্ত আয়াত অনুসারে অনিচ্ছাকৃত ভুলত্রুটিতে যেখান গুনাহ নাই, সেখানে উহা 'ইসমতের' পরিপন্থী নহে। এই কারণেই রোযা অবস্থায় ভুলক্রমে পানাহার করিয়া ফেলিলে উহাতে রোযা ভঙ্গ হয় না। হযরত আদম (আ)-এর অন্তর যেহেতু পবিত্র এবং আল্লাহ ভক্তিতে পরিপূর্ণ ছিল তাই শয়তান যখন বলিল:
إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِيْنَ
(নিশ্চিতভাবেই আমি তো তোমাদের হিতাকাঙ্খীদের একজন; ৭: ২১), তখন তিনি কল্পনাও করিতে পারেন নাই যে, স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার নামে কেহ মিথ্যা কসম করিতে পারে। এই প্রতারণার মাধ্যমে শয়তান আদম (আ)-এর পদস্খলন ঘটায়। কুরআন শরীফের ভাষায়:
فَدَلَّا هُمَا بِغُرُورٍ
"শয়তান তাহাদের দুইজনকে ধোঁকা দিয়া অধঃপতিত করিল" (৭: ২২)। غُرُورٌ শব্দটি ব্যবহারের দ্বারা সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, এই মা'সিয়াত বা অপরাধটির মূলে রহিয়াছে ধোঁকা বা প্রতারণা। নতুবা আদমের তাহাতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না। তিনি বরং আল্লাহ তা'আলার আরও ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্খী ও তজ্জন্য প্রয়াসী ছিলেন। আনুগত্যের বাহানায় শয়তান তাঁহাকে বিরুদ্ধাচরণের অপরাধে লিপ্ত করে। কিন্তু এই অপরাধটি কেবল বাহ্যিকভাবেই অপরাধ ছিল। প্রকৃতপক্ষে তাহা ছিল মহা নি'মত ও অনন্ত রহমত। উহার উদ্দেশ্য ছিল গুনাহগারদেরকে তওবা ও ইস্তিগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনার পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়া। যেমন মহানবী (স)-এর নামাযে ভুলের দ্বারা সাহু সিজদা শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, তেমনি আদম (আ)-এর ত্রুটির দ্বারা আদম সন্তানদেরকে তওবা-ইসতিগফার শিক্ষা দানই উদ্দেশ্য। যখন কোন আদম সন্তানের দ্বারা কোন পাপকার্য সংঘটিত হইয়া পড়ে, অমনি সে তাহার আধিপিতা আদম (আ)-এর ন্যায় কান্নাকাটি ও আহাজারির সহিত আল্লাহ তা'আলার দরবারে লুটাইয়া পড়িবে। সে শয়তানের মত উল্টা তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হইবে না। যদি আদম (আ)-এর দ্বারা কোন ভুলই সংঘটিত না হইত, তাহা হইলে আদম-সন্তানগণ তওবা-ইস্তিগফারের শিক্ষা কেমন করিয়া লাভ করিত?
শায়খ আবদুল ওয়াহআব শা'রানী (র) বলেন, "আল্লাহ তা'আলার ইল্ম-এর মধ্যে সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য দুইটিই ছিল। তাঁহার হিকমত ছিল এই যে, দুইটিরই সূচনা হইয়া যাইবে। তাহা তিনি সৌভাগ্যের উদ্বোধন আদম (আ)-এর দ্বারাই করাইলেন এবং যুগপৎভাবে দুর্ভাগ্যের উদ্বোধন শয়তানের দ্বারা করাইলেন।"
হাদীছ শরীফে আসিয়াছে, যে ব্যক্তি কোন সুন্নাতে হাসানা বা শুভ রীতির সূচনা করে, উহার উপর আমলকারী সকলের সওয়াবের সমপরিমাণ ছওয়াব সেই সূচনাকারীও লাভ করিয়া থাকে। যতদিন পর্যন্ত সেই শুভ কর্মটি চালু থাকিবে, ততদিন পর্যন্ত সে ঐ ছওয়াব পাইতে থাকিবে। অনুরূপ হযরত আদম (আ) এই পৃথিবীতে তওবা ও ইস্তিগফার তথা আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করার ও ক্ষমা প্রার্থনার বরকতময় সুন্নাত বা রীতি প্রবর্তন করিয়াছেন। কিয়ামত পর্যন্ত যত লোক তওবা ও ইস্তিগফার করিয়া আল্লাহ তা'আলার দরবারে কান্নাকাটি করিবে, তাহাদের সকলের সওয়াবের ভাগ তিনিও লাভ করিবেন এবং আল্লাহ্র দরবারে তাঁহার মর্যাদা বৃদ্ধি পাইতে থাকিবে।
পক্ষান্তরে ইবলীস অস্বীকৃতি জ্ঞাপন ও অহমিকা প্রকাশের (সুন্নাতে সায়্যিআ) বা অশুভ রীতির প্রবর্তন করে। কিয়ামত পর্যন্ত যত ব্যক্তি আল্লাহর আদেশের প্রতি বিমুখতা প্রদর্শন ও অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করিবে, ততই ইবলীসের প্রতি লা'নত বৃদ্ধি পাইতে থাকিবে। এইজন্য যে, সে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারি কাফির ও দাম্ভিভকদের পথপ্রদর্শক এবং আল্লাহ তা'আলার বিধান হইতে বিমুখতা প্রদর্শনকারীদের অগ্রপথিক। শায়খ মহীউদ্দীন ইবনুল আরাবীর মুর্শিদ শায়খ আবুল আব্বাস আরীনী প্রায়ই বলিতেন, (আল্লাহ পানাহ্) হযরত আদম (আ) আল্লাহ তা'আলার অবাধ্যতা করেন নাই, বরং তাঁহার পৃষ্ঠদেশে সুপ্ত তাঁহার হতভাগা সন্তানরাই এই অবাধ্যতার কারণ। কেননা হযরত আদম (আ)-এর পৃষ্ঠদেশ সেই নৌযানের মত ছিল, যাহাতে তাঁহার সমস্ত পুণ্যবান ও পাপাচারী সন্তানরা সওয়ার ছিল।
হাফিয ইবন কায়্যিম (র) বলেন, আল্লাহ তা'আলা কখনও কখনও তাঁহার কোন বান্দার মঙ্গলের উদ্দেশ্যে তাহাকে কোন পাপাচার ও মা'সিয়াতে লিপ্ত করেন। প্রকৃত প্রস্তাবে উহা দ্বারা তিনি তাহার একটি বাতিনী রোগের চিকিৎসা করেন। সেই রোগটি হইতেছে আত্মশ্লাঘা বা অহমিকা। এমতাবস্থায় একটি ত্রুটি বা বিচ্যুতি হাজার ইবাদতের চাইতে অধিকতর উপকারী প্রমাণিত হয়।
ইহা সর্বজনবিদিত যে, কোন কোন সময় সুস্বাস্থ্য এতটা উপকারী প্রতিপন্ন হয় না, যতটা উপকারী প্রতিপন্ন হয় রোগ-ব্যাধি। এইজন্য যে, রোগের সূচনা হওয়ামাত্র তাহার চিকিৎসা ও প্রতিবিধানের প্রতি মনোযোগ আকৃষ্ট হয় এবং দক্ষ চিকিৎসকের মাধ্যমেই শরীর পূর্বের তুলনায় অধিকতর নিরোগ হইয়া যায়। তারপর নানা সুস্বাদু ও পুষ্টিকর বলবর্ধক ঔষধ, পথ্য সেবনে ও আহার্য-পানীয় গ্রহণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পূর্বের তুলনায় অধিকতর সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হইয়া উঠে।
অনুরূপ হযরত আদম (আ)-এর উক্ত পদস্খলনের পর উপর্যুপরি তিন শত বৎসর পর্যন্ত তওবা-ইস্তিগফার ও আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটির মধ্যে কাটাইয়া দেওয়াটা তাঁহার মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হইয়া যায়। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَعَصَى آدَمُ رَبَّهُ فَغَوى . ثُمَّ اجْتَبَاهُ رَبُّهُ فَتَابَ عَلَيْهِ وَهَدَى
"আদম তাহার প্রতিপালকের হুকুম অমান্য করিল, ফলে সে দুর্ভোগে পতিত হইল। ইহার পর তাহার প্রতিপালক তাহাকে মনোনীত করিলেন, তাহার তওবা কবুল করিলেন ও তাহাকে পথনির্দেশ করিলেন" (২০ : ১২১-১২২)।
আল্লাহ তা'আলা কুরআনুল কারীমে নবী-রাসূলগণের পদস্খলনের কথা এইজন্য বর্ণনা করিয়াছেন যাহাতে লোকে ধারণা করিতে পারে যে, তাঁহারা কত উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন এবং আল্লাহ তা'আলার কতই না নৈকট্য-প্রাপ্ত বান্দা ছিলেন যে সামান্য ব্যাপারে তাঁহাদের প্রতি সতর্কবাণী উচ্চারিত হইয়াছে। তাঁহারও সর্বদা আল্লাহ তা'আলার অসন্তুষ্টির ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকিতেন। নবী-রাসূলগণের এই ভুলভ্রান্তিগুলিই প্রকৃতপক্ষে তাঁহাদের মা'সূম হওয়ার প্রমাণবহ।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবীগণের মাসূম হওয়ার দলীলসমূহ

📄 নবীগণের মাসূম হওয়ার দলীলসমূহ


(১) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ .
"যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করিল, প্রকৃতপক্ষে সে আল্লাহ্রই আনুগত করিল" (৪:৮০)।
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ .
"তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর, যাহাতে তোমরা কৃপা লাভ করিতে পার" (৩ঃ ১৩২)।
প্রথমোক্ত আয়াতে রাসূলের আনুগত্যকে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার নিজের আনুগত্য বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। বলাবাহুল্য, কোন গায়ের মা'সূম ব্যক্তির আনুগত্যকে স্বয়ং আল্লাহ্র আনুগত্য বলিয়া অভিহিত করা চলে না। আল্লাহ্ আনুগত্য ও রাসূলের আনুগত্যকে কেবল তখনই অভিন্ন বলা যাইতে পারে যখন রাসূল আল্লাহ তা'আলার অবাধ্যতা হইতে সর্বতোভাবে মুক্ত থাকিবেন। আয়াতে তাগিদসূচক শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে, যাহাতে কেহ আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের মধ্যে পার্থক্য না করে। অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা সুস্পষ্টভাবে বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَنْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَنْ يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا ، أُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا .
"যাহারা আল্লাহকে অস্বীকার করে ও তাঁহার রাসূলগণকেও এবং আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলগণের মধ্যে ঈমানের ব্যাপারে তারতম্য করিতে চাহে এবং বলে, আমরা কতককে বিশ্বাস করি এবং কতককে অবিশ্বাস করি, আর তাহারা মধ্যবর্তী কোন পথ অবলম্বন করিতে চাহে, ইহারাই প্রকৃত কাফির" (৪:১৫০-১৫১)।
দ্বিতীয়ক্ত আয়াতে নিঃশর্তভাবে রাসূলের আনুগত্যের হুকুম দেওয়া হইয়াছে এবং তজ্জন্য রহমতের ওয়াদা করা হইয়াছে। বলা বাহুল্য, কোন গায়ের মা'সূম ব্যক্তির নিঃশর্ত আনুগত্যের নির্দেশ দেওয়া হয় নাই, বরং তাহাদের আনুগত্যের নির্দেশ প্রদানকালে আনুগত্যের মাপকাঠি দেওয়া হইয়াছে এইভাবে:
السمع والطاعة حق مالم يؤمر بمعصية فاذا امر بمعصية فلا سمع ولا طاعة (بخاري)
"আমীরের আনুগত্য ততক্ষণ পর্যন্ত জরুরী যতক্ষণ পর্যন্ত কোন পাপাচারের হুকুম আমীর না দেয়। কিন্তু আমীর যখন কোন পাপাচারের নির্দেশ দিবে তখন আর তাহার আনুগত্য করা চলিবে না" (বুখারী)।
পক্ষান্তরে যে সমস্ত আয়াতে নবীর আনুগত্যের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে, কোথায়ও এরূপ বলা হয় নাই যে, যাবৎ না কোন পাপাচারের নির্দেশ দেওয়া হয়। ইহা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা গেল যে, নবীর কোন কাজ পাপাচার বা মা'সিয়ত হইতেই পারে না, যাহাতে আমীর ও খলীফাগণের মত তাঁহাদের আনুগত্যের ব্যাপারেও শর্ত আরোপ করিতে হয়। অনুরূপভাবে বুঝা গেল যে, কোন গায়ের মা'সূম ব্যক্তির নিঃশর্ত আনুগত্য রহমতের কারণও হইতে পারে না।
(২) নবীগণ যদি পাপাচার হইতে মা'সূম না হইতেন তাহা হইলে তাঁহারা সাক্ষী হিসাবে গ্রহণযোগ্য হইতেন না। কেননা পাপাচারীরা ফাসিক হইয়া থাকে এবং ফাসিকের সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأَ فَتَبَيَّنُوا
"যদি কোন ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের নিকট কোন সংবাদ লইয়া আসে তবে তোমরা উহা যাচাই করিয়া লইবে” (৪৯:৬)।
তাহা হইলে কিয়ামতের দিন অন্যান্য উম্মতের মুকাবিলায় নবীগণের সাক্ষ্য কিভাবে গ্রহণযোগ্য হইবে? অথচ কুরআন শরীফে আছে যে, প্রত্যেক নবী কিয়ামতের দিন নিজ নিজ উম্মতের সম্পর্কে সাক্ষ্য দিবেন। যেমন আল্লাহ বলেন:
فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٌ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا
"যখন আমি প্রত্যেক উম্মত হইতে একজন সাক্ষী উপস্থিত করিব এবং তোমাকে উহাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করিব তখন কী অবস্থা হইবে" (৪:৪১)?
(৩) নবীর কাজ হইল মানুষকে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে আহবান করা। এখন তাঁহারা নিজেরাই যদি আল্লাহ্ বাধ্য-অনুগত বান্দা না হন তাহা হইলে তো তাঁহারা আল্লাহর ভর্ৎসনার উপযুক্ত হইবেন। যেমন কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে:
أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ أَنْفُسَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ .
"তোমরা কি মানুষকে সৎকার্যের নির্দেশ দাও আর নিজেদেরকে বিস্মৃত হও, অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন কর! তবে কি তোমরা বুঝ না" (২:৪৪)?
لِمَ تَقُولُونَ مَالَا تَفْعَلُوْنَ . كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ
"তোমরা যাহা কর না তাহা তোমরা কেন বল এবং তোমরা যাহা কর না তোমাদের তাহা বলা আল্লাহ্র নিকট অতিশয় অসন্তোষজনক" (৬১: ২-৩)।
অথচ এরূপ আচরণ একজন সাধারণ বক্তা ও নিম্নমানের আলিমের পক্ষেও সমীচীন নহে। নবী-রাসূলগণের পক্ষে তাহা কী করিয়া শোভন হইতে পারে?
(৪) পাপাচার সংঘটিত হইয়া থাকে শয়তানের আনুগত্যের কারণে। নবীগণ যদি মাসুম না হন তাহা হইলে তাহাদেরকে শয়তানের আনুগত্যকারী সাব্যস্ত করিতে হয়। যেমন আল্লাহ বলিয়াছেন:
وَلَقَدْ صَدَّقَ عَلَيْهِمْ إِبْلِيسُ ظَنَّهُ فَاتَّبَعُوهُ إِلَّا فَرِيقًا مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ
"উহাদের সম্পর্কে ইবলীস তাহার ধারণা সত্য প্রমাণ করিল, ফলে উহাদের মধ্যে একটি মুমিন দল ব্যতীত সকলেই তাহার অনুসরণ করিল" (৩৪: ২০)।
অথচ নবীগণকে প্রেরণের উদ্দেশ্যই হইল শয়তানের অনুসরণ হইতে লোকজনকে রক্ষা করা।
(৫) নবীগণ মা'সূম না হইলে তাহাদের তুলনায় যাহারা নবী নন তাহাদের শ্রেষ্ঠতর হওয়া প্রমাণিত হয়। কেননা উক্ত আয়াতে মুমিনদের একটি দলকে উহার ব্যতিক্রম বলা হইয়াছে। সুতরাং তাঁহারা নবীগণের চাইতেও উত্তম প্রতিপন্ন হইবেন। কেননা ঐ মতে নবীগণ যেখানে শয়তানের অনুসরণ হইতে আত্মরক্ষা করিতে পারিবেন না, সেখানে তাহারা কঠোর তাকওয়া ও ঈমানের দৃঢ়তার পরিচয় দিয়াছেন। আর আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন :
إِنَّ أَكْرَمَكُم عِنْدَ اللهِ أَتْقَاكُمْ .
"তোমাদের মধ্যকার অধিকতর তাকওয়ার অধিকারীরাই আল্লাহ্র নিকট অধিকতর মর্যাদার অধিকারী” (৪৯: ১৩)
(৬) আল্লাহ তা'আলা বান্দাদিগকে দুই ভাগে ভাগ করিয়াছেনঃ হিযবুল্লাহ বা আল্লাহ্র দল এবং হিযবুশ শয়তান বা শয়তানের দল। প্রথমোক্ত দল বলিয়া অভিহিত করিয়া আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"ওহে! আল্লাহ্র দলই সফলকাম দল" (৫৮: ২২)।
أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
"ওহে! আল্লাহ্র দলই বিজয়ী” (৫: ৫৬)।
فَإِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْغَالِبُونَ .
"ওহে! শয়তানের দলই ক্ষতিগ্রস্ত" (৫৮: ১৯)।
أَلَا إِنَّ حِزْبَ الشَّيْطَانِ هُمُ الْخَاسِرُونَ .
সুতরাং নবীগণের পাপাচারে লিপ্ত হওয়া সম্ভব হইলে আল্লাহ্র দলের পরিবর্তে তাহাদেরকে শয়তানের দলবর্তী এবং ক্ষতিগ্রস্ত হইতে হয় (নাউযু বিল্লাহ)। ইহা তো কখনও হইতে পারে না।
(৭)। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে স্বয়ং ইবলীসের উক্তি উদ্ধৃত করিয়াছেন এইভাবে:
فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ إِلَّا عِبَادِكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ
"আপনার ক্ষমতার শপথ! আমি উহাদের সকলকেই পথভ্রষ্ট করিব, তবে উহাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদিগকে নহে” (৩৮: ৮২-৮৩)।
আর সর্বদিক দিয়া একনিষ্ঠ বান্দা কেবল নবী-রাসূলগণই, যেমন হযরত ইবরাহীম, হযরত ইসহাক ও হযরত ইয়া'কূব (আ) সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
إِنَّا أَخْلَصْنَاهُمْ بِخَالِصَة ذِكْرَى الدَّارِ .
এবং হযরত ইউসুফ (আ) সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ .
(দ্র. ৩৮:৪৬ ও ১২: ২৪)।
উক্ত আয়াতসমূহে এবং কুরআনুল করীমের আরও অনেক স্থানে নবী-রাসূলগণকে আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে।
(৮)। আল্লাহ তা'আলা কুরআন শরীফের বিভিন্ন স্থানে নবী-রাসূলগণকে মুস্তফা ও মুজতাবা নির্বাচিত, মনোনীত, বাছাইকৃত ও বিশেষ মর্যাদাবান পুণ্যবান বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন:
وَأَنَّهُمْ عِنْدَنَا لَمِنَ الْمُصْطَفَيْنَ الْأَخْيَارِ .
"নিঃসন্দেহে তাহারা ছিল আমার মনোনীত উত্তম বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত” (৩৮:৪৭)।
وَاذْكُرْ اسْمَعِيلَ وَالْيَسَعَ وَذَا لَكِفْلِ كُلٌّ مِّنَ الأَخْيَارِ .
"স্মরণ কর ইসমাঈল, আল-ইয়াসা ও যুল-কিফলের কথা, ইহারা প্রত্যেকেই ছিল সজ্জন" (৩৮:৪৮)।
লক্ষণীয়, তাহাদের কোন বিশেষ গুণের কথা উল্লেখ করিয়া তাঁহাদেরকে মনোনীত ও মর্যাদাশীল বান্দা বলিয়া অভিহিত করা হয় নাই, বরং সামগ্রিকভাবে তাঁহাদেরকে মনোনীতরূপে ঘোষণা করা হইয়াছে। এহেন নির্বাচিত ও মনোনীত বান্দাগণ যে আল্লাহ্র অবাধ্যতায় লিপ্ত হইতে পারেন না, তাহা বলাই বাহুল্য।
(৯)। আল্লাহ তা'আলা নবী-রাসূলগণ সম্পর্কে বলিয়াছেন:
يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ .
"তাহারা কল্যাণকর কাজে ধাবিত হয়" (৩ঃ ১১৪)।
লক্ষণীয় خیرات শব্দটিকে ال যোগে বর্ণনা করা হইয়াছে। এই ال ব্যাকরণে ال استغراقی বা সম্পূর্ণবোধক অব্যয় বলা হয়, যাহরা অর্থ হইতেছে তাঁহারা সর্বপ্রকার কল্যাণেরই আধার, অকল্যাণকর কিছু তাঁহাদের দ্বারা হইতে পারে না।
(১০) প্রত্যেক পাপীতাপীর ব্যাপারেই 'যালিম' শব্দটি প্রযোজ্য। কুরআন শরীফের অনেক স্থানেই পাপীদিগকে 'যালিম' বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে। সুতরাং কোন নবী যদি কোন অবাধ্যতায় লিপ্ত হইতেন, তাহা হইলে তাঁহার ব্যাপারেও উহা প্রযোজ্য হইত। কোন যালিম-এর পক্ষে নবী হওয়া কখনও সম্ভবপর নহে। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ
"আমার প্রতিশ্রুতি যালিমদের প্রতি প্রযোজ্য নহে” (২: ১২৪)।
উক্ত আয়াতে عَهْدْ শব্দ দ্বারা যদি নবুওয়াত উদ্দিষ্ট হইয়া থাকে, তাহা হইলে পাপাচারী ও যালিম যে নবী হইতে পারে না তাহা তো স্পষ্ট কথা। আর যদি ইহার অর্থ 'ইমামত' বা নেতৃত্ব হইয়া থাকে, যেমনটি তাফসীর জালালায়নে উক্ত হইয়াছে, তবে ইহার দ্বারা যালিমের পক্ষে নবী হওয়া যে অসম্ভব তাহা আরও জোরদারভাবে প্রমাণিত হয়। কেননা ইমামতের তুলনায় নবুওয়াতের মর্যাদা এতই অধিক যে, বিন্দুর সাথে সিন্ধুর তুলনাও এখানে অচল। এমতাবস্থায় যালিম যদি 'ইমাম' বা নেতাই হইতে না পারে, নবী হইবে কেমন করিয়া?
(১১) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ
"আল্লাহ তা'আলা সেই পবিত্র সত্তা যিনি নিরক্ষর সম্প্রদায়ের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করিয়াছেন তাহাদেরই মধ্য হইতে যিনি তাহাদেরকে তাঁহার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করিয়া শুনাইবেন এবং তাহাদেরকে পবিত্র করিবেন" (৬২: ২)।
নবী নিজেই যদি আত্মিকভাবে বিশুদ্ধ না হইয়া পাপাচারী হন তাহা হইলে তাঁহার দ্বারা অন্যদের শুদ্ধি কেমন করিয়া সাধিত হইতে পারে?
(১২) নবী আল্লাহ্র পক্ষ হইতে উম্মতের জন্য উসওয়ায়ে হাসানা (সুন্দরতম আদর্শ) এবং আল্লাহ তা'আলার পসন্দসই চারিত্রিক গুণাবলীর আধার হইয়া থাকেন, যাহাতে লোকজন বিনা আপত্তিতে চোখ বুজিয়া তাঁহাকে অনুসরণ করিতে এবং তাঁহার প্রতিটি কথা ও কাজকে নিজেদের জন্য আদর্শরূপে গ্রহণ করিতে পারে। আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ لَمَنْ كَانَ يَرْجُوا اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا ...
"তোমাদের মধ্যে যাহারা আল্লাহ ও শেষ বিচারের দিনকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণ স্মরণ করে তাহাদের জন্য অবশ্যই উত্তম আদর্শ রহিয়াছে রাসূলুল্লাহর মধ্যে" (৩৩: ২১)।
বলা বাহুল্য, আল্লাহ তা'আলা পছন্দনীয় স্বভাব-চরিত্র, তাঁহার আনুগত্যের নমুনা এবং আল্লাহ্র ভয় অন্তরে পোষণকারীদের আদর্শ কেবল এমন ব্যক্তিই হইতে পারেন যিনি আল্লাহ তা'আলার নাফরমানী হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র হইবেন।
(১৩) কোন ব্যক্তি যদি নবীর বর্তমানে কোন কাজ করে এবং নবী তাহা লক্ষ্য করিয়াও চুপ থাকেন বা মৌন সমর্থন দেন তবে তাঁহার ঐ মৌনতাই ঐ কাজটি বৈধ হওয়ার প্রমাণরূপে সকল দলমতের মুসলমানদের কাছে গ্রহণযোগ্য। ইহাতে প্রতীয়মান হয় যে, নবীর মৌন সমর্থনই কোন কাজকে আল্লাহ্ বিরুদ্ধাচরণের সীমা হইতে বৈধতার গণ্ডীর মধ্যে নিয়া আসে। এমতাবস্থায় তাঁহার নিজের করা কাজ কেমন করিয়া আল্লাহ্ তা'আলার অবাধ্যতা বলিয়া গণ্য হইতে পারে?
(১৪) কতক লোক যখন নিজেদের সম্পর্কে দাবি করিল যে, তাহারা আল্লাহর প্রিয়ভাজন, তখন আয়াত নাযিল হইল:
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ .
"তুমি বলিয়া দাও (হে রাসূল), যদি তোমরা প্রকৃতই আল্লাহকে ভালবাস তবে আমার অনুসরণ কর, তাহা হইলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসিবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করিয়া দিবেন" (৩ঃ৩১)।
উক্ত আয়াতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুসরণকে আল্লাহ নিজের ভালবাসার মাপকাঠি সাব্যস্ত করিয়াছেন। তারপর তাঁহার অনুসরণের বিনিময়ে দুইটি অঙ্গীকার করিয়াছেন। ইহার একটি হইল, যদি তোমরা আমার নবীর অনুসরণ কর, তাহা হইলে আমি তোমাদেরকে আমার প্রিয়পাত্ররূপে গ্রহণ করিব। দ্বিতীয়ত, তোমাদের গুনাহরাশিও মাফ করিয়া দিব।
বলা বাহুল্য, আল্লাহ তা'আলার ভালবাসার মাপকাঠি এমন পুণ্যাত্মা ব্যক্তির অনুসরণই হইতে পারে যিনি মা'সূম হইবেন। একজন গায়র ম'সূমের আনুগত্য মহান আল্লাহর ভালবাসা লাভের এবং গুনাহসমূহের ক্ষমার কারণ হইতে পারে না (দ্র. ইস্মাতুল আম্বিয়া আরবী, পৃ. ৪-১০; ফখরুদ্দীন রাযী (৫৪৩-৬০৬হি); মা'আরিফুল কুরআন (উর্দু), ১খ, পৃ. ৯৯-১১৩; ইদরীস কান্দেহলভী প্রণীত মাকতাবায়ে উছমানীয়া বায়তুল হাম্দ, লাহোর, ২য় মুদ্রণ, ১৯৮২ খৃ.)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00