📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবী ও রাসূলের পরিচয়

📄 নবী ও রাসূলের পরিচয়


নবী শব্দটি আরবী ধাতু হইতে নির্গত, যাহার অর্থ সংবাদ। নবীগণ যেহেতু আল্লাহর পক্ষ হইতে সংবাদ বাহকের দায়িত্ব পালন করেন, এইজন্য তাঁহাদিগকে নবী (বহুবচনে আম্বিয়া) বলা হইয়া থাকে।
আল্লামা রাগিব ইসফাহানী বলেন: "নবুওয়াত হইতেছে আল্লাহ ও তদীয় বোধসম্পন্ন বান্দাদের মধ্যকার দৌতীকর্ম, যাহাতে তাহাদের পরকাল ও ইহকালের জীবনের ব্যাধিসমূহ দূরীভূত হয়।”
কিন্তু নবী শব্দটি তিনি همزه বিহীনভাবে نبی রূপে লিখিয়াছেন এবং ইহার আলোচনায় লিখিয়াছেন: নবী শব্দটি همزة বিহীন, তবে ব্যাকরণবিদগণ বলিয়াছেন মূলে همزة ছিল, পরে তাহা পরিত্যক্ত হয়। কতক আলিম বলিয়াছেন, শব্দটি আরবী نبوۃ শব্দমূল হইতে উদ্ভূত, যাহার অর্থ সমগ্র মানব সমাজে উচ্চ মর্যাদার আসন। দলীল হইতেছে আল্লাহ্ বাণী:
وَرَفَعْنَاهُ مَكَانًا عَلِيًّا .
“আমি তাহাকে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী করিয়াছি” (১৯:৫৭)।
সুতরাং همزة বিহীন نبی শব্দটি همযুক্ত نبی হইতে বলিষ্ঠতর। কেননা نبأ যাহার সংবাদ দেওয়া হয় তাহার সবটাই মর্যাদাপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ হয় না। এইজন্যই নবী করমী (স) যখন লক্ষ্য করিলেন যে, এক ব্যক্তি তাঁহাদের প্রতি বিদ্বেষবশত তাঁহাকে همزه যোগ বা نبی الله বলিয়া সম্বোধন করিল তখন সাথে সাথে তিনি বলিয়া উঠিলেন : ওহে, আমি نبئ الله নহি, আমি হইতেছি نبی الله (আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল কুরআন, পৃ. ৪৮২, বৈরূত সং)।
রাসূল শব্দটি আরবী رسالة শব্দমূল হইতে নির্গত, যাহার অর্থ দৌত্যকর্ম বা সংবাদ বহন করা। রাসূলগণ যেহেতু সৃষ্টিজগতের নিকট আল্লাহ তা'আলার পয়গাম বহন করিয়া আনেন, তাই তাঁহাদিগকে রাসূল বলা হইয়া থাকে। মূলত নবী ও রাসূল শব্দ দুইটি প্রায় অভিন্ন অর্থ বহন করিলেও উভয়ের মধ্যে পরিভাষাগত কিছুটা পার্থক্য বিদ্যমান। আল্লামা তাফতাযানী (র) বলেন :
“রাসূল হইতেছেন সেই সত্তা যাঁহাকে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার সৃষ্ট জগতের প্রতি তাঁহার বিধিবিধানের প্রচারের জন্য প্রেরণ করিয়াছেন। তাঁহার প্রতি কিতাব নাযিলের শর্ত আরোপ করা হইয়া থাকে অর্থাৎ তাঁহার প্রতি কোন কিতাব অবতীর্ণ হইলেই কেবল তাঁহাকে রাসূল বলা যায়। পক্ষান্তরে নবীর কিতাব লাভ শর্ত নহে। কেননা নবী শব্দটি ব্যাপকতর অর্থবোধক (শরহু আকাইদিন নাসাফী, পৃ. ২৪, চট্টগ্রাম মুদ্রণ)।
কিন্তু উক্ত সংজ্ঞা সম্পূর্ণ যথার্থ বলিয়া মনে হয় না। কেননা কুরআন শরীফে হযরত ইসমাঈল (আ) সম্পর্কেও উক্ত হইয়াছে :
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَبِ اسْمَعِيلَ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُولًا نَبِيًّا .
“স্মরণ কর এই কিতাবে ইসমাঈলের কথা, সে তো ছিল প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী এবং সে ছিল রাসূল নবী” (১৯:৫৪)।
লক্ষণীয়, নাযিলকৃত আসমানী কিতাবের সংখ্যা সর্বসাকুল্যে ১০৪। প্রধান চারিখানা তাওরাত, যাবুর, ইনজীল ও আল-কুরআন যথাক্রমে হযরত মূসা (আ), হযরত দাউদ (আ), হযরত ঈসা (আ) ও নবীকুল শিরোমনি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি নাযিল হয় এবং বাকি এক শতখানা, যেগুলিকে সহীফা নামে অভিহিত করা হইয়াছে, যথাক্রমে নাযিল হয় :
আদম (আ)-এর প্রতি ১০খানা;
শীছ (আ)-এর প্রতি ৫০খানা;
ইদরীস (আ)-এর প্রতি ৩০খানা এবং
ইবরাহীম (আ)-এর প্রতি ১০খানা।
অথচ রাসূলের সংখ্যা হাদীছমতে ৩১৩। অন্য কথায় কিতাব ও সহীফাপ্রাপ্ত রাসূলের সংখ্যা মাত্র ৮, অবশিষ্ট ৩০৫ জন রাসূলের প্রতি কোন কিতাবই অবতীর্ণ হয় নাই। এতদসত্ত্বেও আল্লাহ্ রাসূল (স) তাঁহাদিগকে রাসূল বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। উল্লিখিত ৩১৩ জনের মধ্যে ২৫ জন রাসূলের নাম কুরআনুল কারীমে উল্লেখ হইয়াছে।
মুফতী মুহাম্মাদ শফী (র) বলেন, 'নবী ও রাসূল-এর সংজ্ঞা সম্পর্কে বিভিন্ন অভিমত রহিয়াছে। বিভিন্ন আয়াত সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করিয়া আমি যাহা উপলব্ধি করিয়াছি তাহা এই যে, উক্ত দুইটি শব্দের মধ্যে 'মানতিক' শাস্ত্রের পরিভাষায় نسبۃ عموم خصوص من وجه নামক সম্পর্ক বিদ্যমান। অর্থাৎ কোন কোন দিক হইতে নবী শব্দটিই অধিকতর ব্যাপক—আবার কোন কোন দিক হইতে রাসূল শব্দই অধিকতর ব্যাপক।
“রাসূল হইতেছেন সেই প্রেরিত পুরুষ যিনি তাঁহার সম্প্রদায়কে নূতন শরীআতের বার্তা পৌঁছাইয়া থাকেন। এই শরীআত তাঁহার নিজের জন্যও নূতন হইতে পারে, যেমন তাওরাত প্রভৃতি, আবার তাঁহার নিজের বেলায় নূতন না হইলেও কেবল তাঁহার উম্মতের বেলায়ও নূতন হইতে পারে। যেমন ইসমাঈল (আ)-এর শরীআত; উহা মূলত ইবরাহীম (আ)-এর পুরাতন শরীআতই ছিল, কিন্তু তিনি যে জুরহুম সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হইয়াছিলেন তাহাদের জন্য উহা নূতন শরীআত ছিল। কেননা পূর্বে তাহাদের কাছে এই শরীআতের বার্তা পৌছে নাই। হযরত ইসমাঈল (আ)-এর মাধ্যমেই উহা তাহাদের কাছে সর্বপ্রথম পৌঁছে। এই অর্থের দিক হইতে বিবেচনা করিলে রাসূলকে যে নবী হইতে হইবে এমন কোন কথা নাই। যেমন ফেরেশতাগণ, তাহাদের ক্ষেত্রে রাসূল শব্দটি প্রযোজ্য হইলেও তাঁহারা নবী নহেন। ঈসা (আ)-এর প্রেরিত বার্তাবাহকগণের ক্ষেত্রেও ঐ একই কথা প্রযোজ্য।
إِذْ جَاءَهَ الْمُرْسَلُونَ .
আয়াতে তাহাদিগকে রাসূল অভিধায় অভিহিত করা হইয়াছে, কিন্তু তাহারা নবী ছিলেন না। পক্ষান্তরে নবী হইতেছেন সেই প্রেরিত পুরুষ যিনি ওহী লাভ করিয়া থাকেন—তিনি নূতন শরীআতের তাবলীগ করুন অথবা পুরাতন শরীআতের। যেমন বনী ইসরাঈলের অধিকাংশ নবীই মূসা (আ)-এর শরীআতের তাবলীগ করিতেন। এই হিসাবে 'রাসূল' শব্দের মধ্যে নবীর তুলনায় ব্যাপ্তি বেশি। আর অন্য হিসাবে নবী শব্দটিই 'রাসূল'-এর তুলনায় ব্যাপকতর। رَسُولٌ نَبِيًّا শব্দ দুইটি যেখানে আয়াতে পাশাপাশি একত্রে ব্যবহৃত হইয়াছে সেখানে তো কোন সমস্যা নাই। কিন্তু যেখানে শব্দ দুইটি একটি আরেকটির মুকাবিলায় ভিন্ন ভিন্ন অর্থবোধকরূপে আসিয়াছে, যেমন (۲۲ : ۵۲) وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ وَلَا نَبِيٍّ আয়াতে?
এখানে পূর্বাপর বিবেচনায় নবী শব্দটি বলিতে ঐ সত্তাই বুঝিতে হইবে যিনি তাঁহার পূর্ববর্তী শরীআতের তাবলীগ করেন” (মা'আরিফুল কুরআন, ৬খ, পৃ. ৪২; দারুল মা'আরিফ, করাচী ১৪১৬ হি.)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইসমাতে আম্বিয়া

📄 ইসমাতে আম্বিয়া


নবীগণ যে নিষ্পাপ হইয়া থাকেন, ইহাও একটি সর্বসম্মত আকীদা। তারপরও আদম (আ) কী করিয়া আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ অমান্য করিতে পারিলেন, এই প্রশ্নটি কাহারও মনে উদিত হওয়া স্বাভাবিক।
এই প্রসঙ্গে আলোচনা করিতে যাইয়া আল্লামা ইদরীস কান্দলবী (র) ইসমত (عصمت) ও মা'সিয়াত (معصیت) তথা নিষ্পাপত্ব ও অবাধ্যতা শব্দদ্বয়ের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করিয়াছেন। চমৎকারভাবে তিনি লিখেন:
"হকপন্থীগণের সর্ববাদীসম্মত আকীদা এই যে, নবী-রাসূলগণ (আ) আল্লাহ তা'আলার অবাধ্যতা হইতে সর্বতোভাবে পবিত্র ও নিষ্পাপ। তাঁহারা সর্বপ্রকার গুনাহ হইতে মুক্ত। ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁহাদের দ্বারা আল্লাহ তা'আলার অবাধ্যতা সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ্ অবাধ্যতা যদি তাঁহাদের পক্ষে সম্ভবই হইত তাহা হইলে আল্লাহ তা'আলা তদীয় মাখলুককে নিঃশর্তভাবে তাঁহাদের আনুগত্য করার নির্দেশ দিতেন না, তাঁহাদের আনুগত্যকে তাঁহার নিজের আনুগত্য বলিয়া অভিহিত করিতেন না এবং আম্বিয়া কিরামের হাতে আনুগত্যের শপথকে তাঁহার নিজের হাতে আনুগত্যের শপথ বলিয়া অভিহিত করিতেন না। আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন:
وَمَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ .
"যে রাসূলের আনুগত্য করিল সে আল্লাহরই আনুগত্য করিল" (৪৮: ১০)।
إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ .
"যাহারা তোমার হাতে আনুগত্যের শপথ করিল তাহারা আল্লাহ্রই হাতে আনুগত্যের শপথ করিল। আল্লাহ্ হাত তাহাদের হাতের উপর থাকে" (৪৮: ১০)।
বলা বাহুল্য, কুরআন দ্বারাও প্রমাণিত যে, এই নিঃশর্ত আনুগত্যের আদেশ কোন বিশেষ ব্যাপারের মধ্যে সীমাদ্ধ নহে, বরং 'আকাইদ হইতে আমলসমূহ' পর্যন্ত প্রতিটি আকীদা-আমলে ও আচরণে নবীর আনুগত্য অপরিহার্য। ইহার হেতু এই যে, আম্বিয়া কিরামের সত্তা ও তাঁহাদের স্বভাবচরিত্র অত্যন্ত পবিত্র হইয়া থাকে। আম্বিয়া কিরামের স্বভাব-চরিত্র ফেরেশতাকূলের অনুরূপ। ইসমত বা নিষ্পাপত্ব হইতেছে ফেরেশতাগণের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য, আর আম্বিয়া কিরাম ফেরেশতাকুলের তুলনায় উত্তম ও অধিকতর বরণীয়। হযরত আদম (আ)-এর ঘটনাবলী ইহার জাজ্জ্বল্যমান প্রমাণ। এই ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, হযরত আদম (আ) মা'সূম (নিষ্পাপ), ফেরেশতাগণের তুলনায় উত্তম ও অধিকতর মর্যাদাশীল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইসমাত বা নিষ্পাপ হওয়ার অর্থ

📄 ইসমাত বা নিষ্পাপ হওয়ার অর্থ


ইসমত হইতেছে বাহিরে ও অভ্যন্তরে নফস তথা রিপু ও শয়তানের হস্তক্ষেপ হইতে পবিত্র ও মুক্ত থাকা। নফস এবং শয়তানই হইতেছে মা'সিয়াত বা পাপাচারের উৎস বা মূল হেতু। আর মা'সিয়াত বা পাপাচার হইতে মুক্ত থাকার নামই হইতেছে ইস্মত। মা'সূম ঐ সত্তা যাঁহার মন ও মনন, বিশ্বাস ও ই'তিকাদ, ইচ্ছা-আকাঙ্খা, আচার-আচরণ, অভ্যাস-ইবাদত লেনদেন, কথাবার্তা, ক্রিয়াকর্ম সবকিছু নফস ও শয়তানের হস্তক্ষেপ হইতে সর্বতোভাবে মুক্ত। গায়বী হিফাযত দ্বারা তিনি সংরক্ষিত থাকেন। তাঁহার দ্বারা এমন কিছু সংঘটিত হইতে পারে না যদ্বারা তাঁহার ইসমত কোনভাবে বিঘ্নিত ও ক্লেদাক্ত হইতে পারে। আল্লাহ তা'আলা সদয় দৃষ্টি এবং ফেরেশতাগণের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান তাঁহাকে ঘিরিয়া থাকে যাহা তাঁহাকে পদে পদে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং হকের সামান্যতম পরিপন্থী প্রবণতা হইতেও তাঁহাকে ফিরাইয়া রাখে। আল্লাহ তা'আলা কুরআনুল কারীমে আম্বিয়ায়ে কিরামকে "মুসতাফায়নাল আখয়ার" (মনোনীত উত্তম বান্দা; দ্র. ৩৮ : ৪৭) ও "ইবাদুল মুখলাসীন" (একনিষ্ঠ বান্দা; দ্র. ৩৮ : ৪০) বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন, যাহা তাঁহাদের প্রতি আল্লাহর সার্বিক সন্তুষ্টি এবং তাহাদের ঐকান্তিক নিষ্ঠার প্রমাণবহ। মুখলাস বা মুখলিস শব্দ কেবল তাঁহার জন্যই প্রযোজ্য যাহার মধ্যে গায়রুল্লাহ্ বিন্দুমাত্র প্রভাব নাই, পূর্ণ মাত্রায় আল্লাহ্র জন্য নিবেদিত। অর্থাৎ তাহারা শয়তানী উপাদান হইতে সর্বোতোভাবে মুক্ত, পবিত্র। সুতরাং নবী অবশ্যই সর্বপ্রকার সগীরা ও কবীরা গুনাহ হইতে মুক্ত ও সর্বপ্রকার ক্লেদ হইতে পবিত্র বা মা'সূম হইবেন ইহাই স্বাভাবিক। আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴿ إِلَّا مَنِ ارْتَضَىٰ مِن رَّسُولٍ ﴾ (৭২: ২৭)-এর মধ্যে مِن বর্ণনামূলক (بينانيه) এবং رَّسُول শব্দটি অনির্দিষ্ট বাচক (نكرة) -রূপে আসিয়াছে। এই বর্ণনাভঙ্গি দ্বারা ইহা সুস্পষ্ট যে, নবী মাত্রই আল্লাহ তা'আলার পসন্দনীয় এবং মনোনীত বান্দা। তাঁহার প্রত্যেকটি আমল-আখলাক, স্বভাব-চরিত্র, আচার-আচরণ, হাল-অবস্থা সর্বদিক হইতে আল্লাহ তা'আলার নিকট পসন্দনীয় এবং তিনি সর্বতোভাবে একমাত্র আল্লাহরই বান্দা। উক্ত আয়াতে বর্ণিত সন্তুষ্টি কোনক্রমেই আংশিক সন্তুষ্টি নহে। কেননা কোন না কোন দিক দিয়া প্রত্যেক মুসলমানই আল্লাহর সার্বিক ও পূর্ণ মাত্রার সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত হয়, আর পূর্ণ মাত্রায় এই সন্তুষ্টি কেবল ঐ বান্দাগণই লাভ করিতে পারেন যাহাদের যাহির-বাতিন নফস তথা রিপু এবং শয়তানের বন্দেগী ও আনুগত্য হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র। মা'সিয়াত তথা পাপ-পঙ্কিলতা হইতে এই সার্বিক মুক্ত থাকার নামই হইতেছে ইস্মত, পাপ হইতে মুক্ত থাকা। আম্বিয়া কিরামের বিশেষণরূপে ইস্তিফা ও ইরতিদা শব্দ দুইটির প্রয়োগও প্রণিধান যোগ্য। শব্দ দুইটি باب افتعال -এর مصدر বা ক্রিয়ামূল। নিজের জন্য নির্দিষ্ট কোন ব্যাপার বুঝাইতে ইহা ব্যবহৃত হইয়া থাকে। যেমন اکتيال اتزان শব্দ দুইটি নিজের জন্য ওজন করিয়া লওয়া ও মাপিয়া লওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। পক্ষান্তরে وزن و كيل শব্দ দুইটি নিজের-পরের সকলের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী:
وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ . وَإِذَا كَالُوهُمْ أَوْ وَزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ .
ইহাতে নিজেদের জন্য মাপিয়া নেওয়াকে إذا اكتالوا এবং অন্যদের জন্য মাপিয়া লওয়াকে کالوهم ও অন্যদের জন্য ওজন করিয়া লওয়াকে وزنوهم বলা হইয়াছে (অর্থাৎ যাহারা নিজেদের জন্য মাপিয়া বা ওজন করিয়া লইতে পরিপূর্ণভাবে কড়ায়- গণ্ডায় আদায় করিয়া লয়, আর অন্যদের জন্য মাপিতে বা ওজন করিতে কম করিয়া দেয়, উক্ত আয়াতে তাহাদের নিন্দা করা হইয়াছে)। ব্যকরণের এই নিয়ম অনুসারেই, اِرْتِضَاء ও اِصْطِفَاء শব্দদ্বয়ের দ্বারা নিজের জন্য বাছিয়া লওয়া ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করা বুঝান হইয়াছে। অন্যত্র ঐ একই অর্থে বলা হইয়াছে:
"আমি তোমাকে নিজের জন্য পছন্দ করিয়া লইয়াছি (হে রাসূল)" وَاصْطَنَعْتُكَ لِنَفْسِي .
মোটকথা, আম্বিয়ায়ে কিরাম (আ) তাঁহাদের সকল আখলাক, আদাত, ইবাদাত, মুআমালাত, আচার-আচরণ ও কথায়-বার্তায় আপদমস্তক আল্লাহ তা'আলার পসন্দনীয় এবং যাহিরে-বাতিনে শয়তানী হস্তক্ষেপ ও রিপুর তাড়না হইতে মুক্ত ও পবিত্র থাকেন। একটি মুহূর্তের জন্যও তাঁহারা আল্লাহ্ করুণা, সাহায্য ও তত্ত্বাবধান হইতে বিচ্ছিন্ন হন না। এইজন্যই বিনা প্রশ্নে শর্তহীনভাবে আম্বিয়ায়ে কিরামের আনুগত্য করা ফরয, তাহাদের প্রতিটি কথা ও কাজ গ্রহণীয় এবং তাঁহাদের আনুগত্য বর্জন চিরস্থায়ী দুর্ভাগ্যের এবং ইহলোকে-পরলোকে সমূহ ক্ষতির কারণ। মানবিক কারণে যদি নবী-রাসূলগণের দ্বারা কখনো কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটিয়াও যায়, তবে তাহা বাহির হইতে আসে, তাঁহাদের নিজেদের অভ্যন্তর হইতে নহে। যেমন পানির মধ্যে উষ্ণতা বাহির হইতে আসিয়া থাকে, স্বভাবগতভাবে উহাতে কেবল শীতলতাই থাকে, উষ্ণতার নামমাত্র থাকে না। এইজন্য পানি যতই গরম হউক না কেন, আগুনে উহা ঢালিয়া দেওয়া মাত্র তাহা নির্বাপিত হইয়া যায়। অনুরূপ আম্বিয়ায়ে কিরামের অন্তর্লোক পাপাচারের উৎস-উপাদান (নফস ও শয়তান) হইতে সর্বতোভাবে মুক্ত ও পবিত্র। বাহিরের আছরের ফলে কখনও তাঁহাদের দ্বারা কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি হইয়া গেলেও কুদরতের অদৃশ্য হাত তাঁহাদের ইসমতের চেহারা হইতে সেই বহিরাগত ধুলাবালি ঝাড়িয়া পরিষ্কার করিয়া দেয়। ফলে নবুওয়াতের চেহারা পূর্বের তুলনায় পরিচ্ছন্নতর ও উজ্জ্বলতর হইয়া ঝলমলাইয়া উঠে। ইউসুফ (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ .
"এইভাবে আমি তাহাকে মন্দ কর্ম ও অশ্লীলতা হইতে বিরত রাখিবার জন্য নিদর্শন দেখাইয়াছিলাম। সে তো ছিল আমার বিশুদ্ধচিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত” (১২: ২৪)। উক্ত আয়াতে আমাদের পূর্ববর্তী বক্তব্যের যথার্থতাই প্রতীয়মান হয়। কেননা উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন যে, তিনি গর্হিত কর্ম ও অশ্লীলতাকে ইউসুফ (আ) হইতে দূরে রাখিয়াছেন। তিনি বলেন নাই যে, তিনি ইউসুফকে গর্হিত কর্ম ও অশ্লীলতা হইতে দূরে রাখিয়াছেন। ফিরাইয়া রাখা, দূরে রাখা বা হটাইয়া দেওয়ার ব্যাপারটা তাহার জন্যই প্রযোজ্য হইতে পারে, যে নিজে সেদিকে অগ্রসর হইতে উদ্যত হয়। উক্ত আয়াতের বক্তব্য দ্বারা বুঝা গেল যে, গর্হিত কর্ম ও অশ্লীলতা ইউসুফ (আ)-এর দিকে ধাবিত হইতে চাহিতেছিল। আল্লাহ তা'আলা তাহা ফিরাইয়া রাখিলেন। ইউসুফ (আ) সেদিকে অগ্রসর হইতে প্রয়াস পান নাই।
মোটকথা, বাহিরের প্রভাবে ভুলরশত আম্বিয়ায়ে কিরামের দ্বারা যেসব ত্রুটি-বিচ্যুদ্ধি হইয়া যায়, *বাহ্যত তাহাকে 'ইস্সিয়ান বা মা'সিয়াত (পাপ বা অপরাধ) বলিয়া অভিহিত করা যায় অথবা বলা যায়, তাহাদের উচ্চ মর্যাদার দিকে লক্ষ্য রাখিয়া ঐগুলিকেও পাপ বা অপরাধ বলিয়া অভিহিত করা হইয়া থাকে, যদিও বাস্তবিকপক্ষে উহা অপরাধ নহে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মাসিয়াত বা পাপ কি?

📄 মাসিয়াত বা পাপ কি?


আল্লাহ্ হুকুম পালন না করা মাত্রই মা'সিয়ত বা গুনাহ নহে, বরং জ্ঞাতসারে ও ইচ্ছাকৃতভাবে যে বিরুদ্ধাচরণ করা হইয়া থাকে, ভুলক্রমে বা অনিচ্ছকৃতভাবে নহে, তাহাই পাপ বা গুনাহ। এইজন্যই ওযরখাহী করিতে গিয়া বলা হইয়া থাকে, আমি ভুলিয়া গিয়াছিলাম অথবা আমি বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই। যদি ভুলক্রমে বা ভুল বুঝাবুঝির কারণে সংঘটিত ত্রুটি-বিচ্যুতিও পাপ বলিয়া অভিহিত হয়, তাহা হইলে ওযরখাহির ক্ষেত্রে আমি ভুলিয়া গিয়াছিলাম বা বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই বলার কোন অর্থই হয় না। যে ভুলত্রুটি ভুলক্রমে সংঘটিত হইয়া যায় তাহাকে মা'সিয়াত বা গুনাহ না বলিয়া উহাকে বলা হয় পদস্খলন (১১)। হযরত আদম (আ)-এর নিষিদ্ধ ফল খাওয়াও ছিল ভুলবশত। কুরআনুল কারীমে বলা হইয়াছে :
فَنَسِي وَلَمْ نَجِدْ لَهُ عَزْمًا
"তারপর সে (আদম) ভুলিয়া গেল, আর আমি তাহার মধ্যে দৃঢ়তা পাইলাম না" (২: ১১৫)।
হযরত আদম (আ) তখন আল্লাহ তা'আলা تَقْربًا هذه الشَّجَرَةَ "এ গাছের কাছেও তোমরা দুইজন ঘেষিও না" বলিয়া যে নিষেধাজ্ঞা জারী করিয়াছিলেন উহাও সেই সময় ভুলিয়া গিয়াছিলেন। শয়তান যে চিরশত্রু তাহাও তখন তাঁহার স্মরণ ছিল না। আল্লাহ তা'আলা যে পূর্বাহ্নেই বলিয়া রাখিয়াছিলেন:
فَلَا يُخْرِجَنَّكُمَا مِنَ الْجَنَّةِ فَتَشْقَى
"তোমাদেরকে সে যেন বেহেশত হইতে বাহির করিয়া না দেয়, দিলে তোমরা দুর্ভোগে নিপতিত হইবে" (২: ১১৭), তাহাও তখন তাঁহার স্মরণ ছিল না। সুতরাং যাহা ঘটিয়াছে ভুলক্রমেই ঘটিয়াছে। উহাকে পাপ বা অপরাধ বলিয়া অভিহিত করাই ভুল। হযরত আদম ও হাওয়া (আ) উভয়ে জান্নাতের জন্যই আত্মহারা ছিলেন। এইজন্য ইবলীসের শপথ শুনিয়া তাঁহারা তাহার প্রতারণার শিকার হইয়া গেলেন এবং ভাবিলেন, স্বয়ং আল্লাহর নাম লইয়া কেহ মিথ্যা বলিতে পারে না। উপরন্তু আদম (আ)-এর নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ ছিল আল্লাহ্র প্রতি অনুরাগ-মহব্বতেরই কারণে, জান্নাতে আল্লাহর নৈকট্য চিরস্থায়ী হইবার আকাঙ্খায়। কুরআন মজীদের আয়াতাংশ যেমন শয়তানের উক্তি হিসাবে বর্ণিত হইয়াছে:
مَا نَهَاكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ إِلا أَنْ تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ
"তোমরা দুইজনে ফেরেশতা হইয়া যাও অথবা স্থায়ী হইয়া যাও এইজন্যই তোমাদের প্রভু তোমাদেরকে এই বৃক্ষ হইতে নিষেধ করিয়াছেন" (৭ঃ ২০)।
আল্লাহ্ নামে শপথ করার কারণে আদম (আ) এই ভুলে নিপতিত হইয়াছিলেন :
وَقَاسَمَهُمَا إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ .
"এবং সে (শয়তান) তাহাদের দুইজনের নিকট শপথ করিয়া বলিল, নিশ্চয় আমি তোমাদের দুইজনের হিতাকাঙ্খীদের একজন" (৭ঃ ২১)।
তখন হযরত আদম (আ)-এর মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ হইল না যে, মহান আল্লাহ্র পবিত্র নাম লইয়াও কেহ মিথ্যা শপথ করিতে পারে, মিথ্যা কথা বলিতে পারে। তিনি মনে করিলেন, আল্লাহ্র কোন বান্দাই তাঁহার পবিত্র ও মহান নাম লইয়া মিথ্যা শপথ করিতে পারে না। সুতরাং বুঝা গেল যে, হযরত আদম (আ)-এর উক্ত কাজ বিরুদ্ধাচরণের উদ্দেশ্যে বা রিপুর তাড়নায় ছিল না। তাই উহাকে গুনাহ বা অপরাধ বলা যাইবে না বরং উহাকে তাঁহার পদস্খলনই বলিতে হইবে। আল্লাহ তা'আলার বাণী فَأَزَلْهُمَا الشَّيْطَانُ ٢ فَدَكَّاهُمَا بِغُرُورِ -এর উভয় ক্ষেত্রেই উহা যে তাঁহার পদস্খলন ও ভুলবশত ছিল, তাঁহার আল্লাহ্র নাফরমানীর ইচ্ছা ছিল না সেদিকেই ইঙ্গিত করা হইয়াছে।
সুতরাং কুরআনুল কারীমের যে সমস্ত আয়াতে উহাকে তাঁহার বিরুদ্ধাচরণ বা অপরাধ বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে উহা কেবল যাহেরী সুরত হিসাবেই বলা হইয়াছে, প্রকৃত অর্থে নহে অথবা তাঁহার উচ্চ মর্যাদার অনুপাতে উহাকে 'ইসয়ান বা অপরাধ বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে।
নবী-রাসূলগণের ক্ষেত্রে উত্তম কাজ ছাড়িয়া অনুত্তম বা তাহার চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের কাজ করাই এমন যেমনটি অন্যদের জন্য অপরাধমূলক কর্ম (দ্র. খিয়ালী-এর মোল্লা আবদুল হাকীমের লিখিত পাদটীকা)।
নবী-রাসূলগণের ত্রুটির অর্থ হইতেছে উত্তম ও শ্রেষ্ঠতরটির স্থলে ভুলবশত তাহাদের অপেক্ষাকৃত অনুত্তমটি করিয়া বসা। আর অন্যদের ত্রুটির অর্থ হক ও হিদায়াতের স্থলে বাতিল বা গোমরাহীর মধ্যে লিপ্ত হইয়া পড়া। উম্মতের আলিমগণের সর্ববাদীসম্মত মতে আম্বিয়ায়ে কিরাম এই জাতীয় ত্রুটি বা অপরাধ হইতে মুক্ত, মা'সূম। তাঁহাদের ইজতিহাদগত ত্রুটির অর্থ হইতেছে ভুলবশত উত্তম ও শ্রেষ্ঠতরটির স্থলে অপেক্ষাকৃত অনুত্তম তাঁহাদের দ্বারা সংঘটিত হইয়া যাওয়া।
হযরত আদম (আ)-এর পদস্খলন (JI) ততটুকুই। তাহা না হইয়া (আল্লাহ্ আশ্রয় চাই) তাঁহারা যদি লোভের বশবর্তী ও রিপুর অনুবর্তী হইতেন, তাহা হইলে আল্লাহ তা'আলা আমাদের উপর তাহাদের নিঃশর্ত ও অকুণ্ঠ আনুগত্য কখনও ফরয বা অপরিহার্য করিয়া দিতেন না আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে তাঁহাদের অনুকরণের নির্দেশ দিয়া বলিতেন নাঃ
أولئِكَ الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ فَبِهُدَاهُمُ اقْتَدِهُ .
"ইহারাই হইতেছে সেই সব ব্যক্তি যাহাদেরকে স্বয়ং আল্লাহ হিদায়াত দান করিয়াছেন, সুতরাং (তুমি ওহে রাসূল) তাহাদেরই অনুকরণ কর" (৬: ৯০) (দ্র. আল-মু'তামাদ ফি'ল-মু'তাকাদ-তাওরীশী প্রণীত)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00