📄 ইবলীস শয়তান প্রসঙ্গ
ইমাম তাবারী (র) বলেন, ইবলীস শব্দটি আরবী ইবলাস শব্দ হইতে উদ্ভুত। ইহার শাব্দিক অর্থ কল্যাণ হইতে নিরাশ হওয়া, অনুতাপ, অনুশোচনা ও দুঃখ-দুশ্চিন্তা করা।
এই মর্মে আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত আছে, ইবলীসের এই নামকরণ করা হইয়াছে এই জন্য যে, আল্লাহ্ তাহাকে সর্বপ্রকার কল্যাণ হইতে নিরাশ করিয়াছেন এবং তাহাকে বিতাড়িত শয়তানে পরিণত করিয়াছেন। তাহার পাপাচারের শাস্তিস্বরূপ ইহা করা হইয়াছে।
সুদ্দী হইতে বর্ণিত, ইবলীসের প্রকৃত নাম ছিল হারিছ। সত্য হইতে নিরাশ হইয়া নিজেকে পরিবর্তিত করার জন্য তাহার নাম হয় ইবলীস। কুরআন শরীফেও এই অর্থে আয়াত আসিয়াছে :
قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِنْ أَخَذَ اللَّهُ سَمْعَكُمْ وَأَبْصَارَكُمْ وَخَتَمَ عَلَى قُلُوبِكُمْ مَّنْ إِلَّهُ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيَكُمْ بِهِ أَنْظُرْ كَيْفَ نُصَرِّفُ الآيَتِ ثُمَّ هُمْ يَصْدِقُونَ .
"তাহাদেরকে যে উপদেশ দেওয়া হইয়াছিল তাহারা যখন তাহা বিস্মৃত হইল তখন আমি তাহাদের জন্য সমস্ত কিছুর দ্বার উন্মুক্ত করিয়া দিলাম। অবশেষে তাহাদেরকে যাহা দেওয়া হইল যখন তাহারা তাহাতে উল্লসিত হইল তখন অকস্মাৎ তাহাদেরকে ধরিলাম, ফলে তখনি তাহারা নিরাশ হইল" (৬:৪৬)।
সূরা কাহফ্ফের আয়াতে তাহার পরিচয় এইভাবে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হইয়াছে:
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلْئِكَةِ اسْجُدُوا لِأَدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا ابْلِيْسَ كَانَ مِنَ الْجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِ أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِي وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ بِئْسَ لِلمَظْلِمِينَ بَدَلًا .
"এবং স্মরণ কর, আমি যখন ফেরেশতাগণকে বলিয়াছিলাম আদমের প্রতি সিজদা কর, তখন তাহারা সকলেই সিজদা করিল ইসলীস ব্যতীত; সে জিন্নদের একজন ছিল। সে তাহার প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করিল। তবে কি তোমরা আমার পরিবর্তে উহাকে এবং উহার বংশধরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করিতেছ? উহারা তো তোমাদের শত্রু। যালিমদের এই বিনিময় কত নিকৃষ্ট" (১৮:৫০)।
উক্ত আয়াত হইতে কয়েকটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে জানা গেল:
(১) ইবলীস জিন্ন জাতির অন্তর্ভুক্ত। (২) উহার বংশবিস্তারও হইয়া থাকে, তাই জিন্ন জাতির মধ্যেও যৌন চেতনা, বিবাহশাদী প্রভৃতির প্রচলন রহিয়াছে। (৩) কোন কোন মানুষ জিন্নদিগকে ও তাহাদের প্রধান ইবলীসকে আল্লাহ্ স্থলে নিজেদের অভিভাবক ও কর্মবিধায়করূপে মান্য করিয়া থাকে। (৪) ইবলীস ও তাহার বংশধরদের অনুসারীরা যালিম-অনাচারী, তাহাদের মন্দ পরিণতি রহিয়াছে। (৫) শয়তান জিন্নরাও ইবলীস; মানুষের শত্রু।
ইবলীসকে আল্লাহ্ পৃথিবী ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত অবকাশ দিয়া রাখিয়াছেন যেন সে তাহার সাধ্যমত মানুষকে পথভ্রষ্টকারী শয়তান বাহিনীকে দিক-দিগন্তে ছাড়িয়া দেয়। জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) বর্ণিত হাদীছে আছে:
ইবলীসের সিংহাসন সমুদ্র বক্ষে, সে তাহার বাহিনী প্রতিদিন মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য প্রেরণ করে। সুতরাং তাহার কাছে সর্বাধিক ঘনিষ্ঠ হইতেছে, যে মানুষকে সর্বাধিক পথভ্রষ্ট করিতে পারে (মুসনাদ আহমাদ-এর বরাতে আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৫৩)।
'ইবলীস' শব্দটি কুরআন শরীফের ১১টি স্থানে ব্যবহৃত হইয়াছে। যথাঃ ২ সূরা বাকারা ৩৪ ৭ আল-আ'রাফ ১১ ১৫ আল-হিজর ৩১-৩২ ১৭ আল-ইসরা ৬১ ১৮ আল-কাহ্ফ্ফ ৫০ ২০ তা-হা ১১৬ ২৬ শু'আরা ৯৫ ৩৪ সাবা ২০ ৩৮ সাদ ৭৪-৭৫
বিভিন্ন হাদীছের দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ্ নাম স্মরণ না করিয়া পানাহার করিলে বা ঘরে প্রবেশ করিলে, বাম হাতে দাঁড়ানো অবস্থায় পানাহার করিলে, ঘরে আল্লাহকে স্মরণ না করিলে এবং আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে শয়তান তাহার প্রভাব বিস্তার করিয়া থাকে। অনুরূপ ধর্মের নামে নব-আবিষ্কৃত রীতিনীতি তথা বেদাতী কার্যকলাপে লিপ্ত করিয়া তওবা হইতে বিমুখ রাখিয়া শয়তান শ্রেণীর জিন্নরা মানুষকে ভ্রষ্টতায় ডুবাইয়া রাখে। উহাদের কবল হইতে রক্ষা পাওয়ার বিভিন্ন ব্যবস্থার কথাও হাদীছে বিস্তারিত আলোচিত হইয়াছে।
📄 নবুওয়াত ও রিসালাত
কুরআন শরীফে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হইয়াছে :
وَإِنْ مِّنْ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٌ .
"এমন কোন সম্প্রদায় নাই, যাহার নিকট সতর্ককারী প্রেরণ করা হয় নাই" (৩৫: ২৪)। এই نذیر (সতর্ককারী) শব্দের ব্যাখ্যা তাফসীরে জালালাইন শরীফে করা হইয়াছে এইভাবেঃ
نَبِيُّ يُنْذِرُهَا .
"নবী, যিনি সেই সম্প্রদায়কে সতর্ক করেন" (পৃ. ৫৭৭, আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া চীন কর্তৃক প্রকাশিত, পিকিং মুদ্রণ ১৪০২/১৯৮২)।
অন্যত্র বলা হইয়াছে:
وَ لَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَ اجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ.
“আল্লাহর ইবাদত করিবার ও তাগূতকে বর্জন করিবার নির্দেশ দিবার জন্য আমি তো প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠাইয়াছি” (১৬: ৩৬)।
মানবজাতিকে স্রষ্টার পক্ষ হইতে সতর্ককারী ও পথপ্রদর্শকরূপে আগমনকারী উক্ত মহামানবগণকে কুরআনুল কারীমে নবী ও রাসূলরূপে অভিহিত করা হইয়াছে। আদম (আ) নবী বা রাসূল ছিলেন কিনা সেই আলোচনায় প্রবৃত্ত হওয়ার পূর্বেই নবুওয়াত ও রিসালাতের অর্থ কী, নবী ও রাসূলের পার্থক্যই বা কী তাহা সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
আল্লাহ তা'আলা নবী-রাসূল প্রেরণের পটভূমি ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করেন এইভাবে:
كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللَّهُ النَّبِيِّنَ مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ وَاَنْزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ وَمَا اخْتَلَفَ فِيهِ إِلَّا الَّذِينَ أُوتُوهُ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمُ الْبَيِّنَتُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ فَهَدَى اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا لِمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِهِ وَاللَّهُ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ.
'সমস্ত মানুষ ছিল একই উম্মত। অতঃপর আল্লাহ নবীগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেন। মানুষেরা যে বিষয়ে মতভেদ করিত তাহাদের মধ্যে সে বিষয়ে মীমাংসার জন্য তিনি তাহাদের সহিত সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেন এবং যাহাদিগকে তাহা দেওয়া হইয়াছিল, স্পষ্ট নিদর্শন তাহাদের নিকট আসিবার পরে, তাহারা শুধু পরস্পর বিদ্বেষবশত সেই বিষয়ে বিরোধিতা করিত। যাহারা বিশ্বাস করে, তাহারা যে বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করিত, আল্লাহ তাহাদিগকে সে বিষয়ে নিজ অনুগ্রহে সত্য পথে পরিচালিত করেন। আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা সরল পথে পরিচালিত করেন" (২: ২১৩)।
উক্ত আয়াত হইতে প্রতীয়মান হয় যে,
(ক) প্রথমে মানবজাতি এক অভিন্ন উম্মত ও সত্য পথের অনুসারী ছিল;
(খ) কালক্রমে তাহাদের মধ্যে মতবিরোধ শুরু হয়;
(গ) মানবজাতির মধ্যে সৃষ্ট কলহ ও হানাহানি বন্ধ করিয়া তাহাদিগকে বিবাদ-বিসংবাদ মিটাইয়া দিয়া সঠিক পথে পরিচালনার জন্য নবী-রাসূলগণের আগমন ঘটে।
(ঘ) তাহাদের সাথে হিদায়াতের গ্রন্থাদিও নাযিল করা হয়;
(ঙ) কিতাব অবতীর্ণ হওয়ার পরও একদল বিদ্বেষবশত কলহ-বিবাদ ও হানাহানিতে লিপ্ত থাকে;
(চ) ঈমানদার বান্দাগণ নবী-রাসূলগণের হিদায়াত গ্রহণ করিয়া ধন্য হইয়াছেন।
(ছ) নবী-রাসূলগণ পুণ্যবানদের জন্য সুসংবাদদাতা এবং পাপী-তাপী অবাধ্যদের জন্য সতর্ককারীরূপেই বিশ্বে আবির্ভূত হইয়াছেন। এই শেষোক্ত বক্তব্যটি অন্য আয়াতে আরও স্পষ্টভাবে ব্যক্ত হইয়াছে:
رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا .
"আমি সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী রাসূল প্রেরণ করিয়াছি, যাহাতে রাসূল আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোন অভিযোগ না থাকে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়" (৪ : ১৬৫)।
এই নবুওয়াত ও রিসালাত আল্লাহ তা'আলার বিশেষ দান। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
مَا يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَبِ وَلَا الْمُشْرِكِينَ أَنْ يُنَزِّلَ عَلَيْكُمْ مِنْ خَيْرٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَاللَّهُ يَخْتَصُّ بِرَحْمَتِهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ العَظِيمِ.
"কিতাবীদের মধ্যে যাহারা কুফরী করিয়াছে তাহারা এবং মুশরিকরা ইহা চাহেনা যে, তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে তোমাদের প্রতি কোন কল্যাণ অবতীর্ণ হউক। অথচ আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা নিজ রহমতের জন্য বিশেষরূপে মনোনীত করেন এবং আল্লাহ মহা অনুগ্রহণকারী" (২ : ১০৫)।
তাফসীরবিদগণ বলেন, আয়াতে উক্ত (خیر) কল্যাণ) বলিতে ওহী এবং 'বিশেষ রহমত' বলিতে নবুওয়াত বুঝানো হইয়াছে (দ্র. তাফসীর জালালাইন, পৃ. ২২, চীনা মুদ্রণ, ১৪০২/১৯৮২)। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
اللَّهُ يَصْطَفِي مِنَ الْمَلَئِكَةِ رُسُلًا وَمِنَ النَّاسِ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ .
"আল্লাহ ফেরেশতাদের মধ্য হইতে মনোনীত করেন বাণীবাহক এবং মানুষের মধ্য হইতেও; আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা" (২২ : ৭৫)।
📄 নবী ও রাসূলের পরিচয়
নবী শব্দটি আরবী ধাতু হইতে নির্গত, যাহার অর্থ সংবাদ। নবীগণ যেহেতু আল্লাহর পক্ষ হইতে সংবাদ বাহকের দায়িত্ব পালন করেন, এইজন্য তাঁহাদিগকে নবী (বহুবচনে আম্বিয়া) বলা হইয়া থাকে।
আল্লামা রাগিব ইসফাহানী বলেন: "নবুওয়াত হইতেছে আল্লাহ ও তদীয় বোধসম্পন্ন বান্দাদের মধ্যকার দৌতীকর্ম, যাহাতে তাহাদের পরকাল ও ইহকালের জীবনের ব্যাধিসমূহ দূরীভূত হয়।”
কিন্তু নবী শব্দটি তিনি همزه বিহীনভাবে نبی রূপে লিখিয়াছেন এবং ইহার আলোচনায় লিখিয়াছেন: নবী শব্দটি همزة বিহীন, তবে ব্যাকরণবিদগণ বলিয়াছেন মূলে همزة ছিল, পরে তাহা পরিত্যক্ত হয়। কতক আলিম বলিয়াছেন, শব্দটি আরবী نبوۃ শব্দমূল হইতে উদ্ভূত, যাহার অর্থ সমগ্র মানব সমাজে উচ্চ মর্যাদার আসন। দলীল হইতেছে আল্লাহ্ বাণী:
وَرَفَعْنَاهُ مَكَانًا عَلِيًّا .
“আমি তাহাকে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী করিয়াছি” (১৯:৫৭)।
সুতরাং همزة বিহীন نبی শব্দটি همযুক্ত نبی হইতে বলিষ্ঠতর। কেননা نبأ যাহার সংবাদ দেওয়া হয় তাহার সবটাই মর্যাদাপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ হয় না। এইজন্যই নবী করমী (স) যখন লক্ষ্য করিলেন যে, এক ব্যক্তি তাঁহাদের প্রতি বিদ্বেষবশত তাঁহাকে همزه যোগ বা نبی الله বলিয়া সম্বোধন করিল তখন সাথে সাথে তিনি বলিয়া উঠিলেন : ওহে, আমি نبئ الله নহি, আমি হইতেছি نبی الله (আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল কুরআন, পৃ. ৪৮২, বৈরূত সং)।
রাসূল শব্দটি আরবী رسالة শব্দমূল হইতে নির্গত, যাহার অর্থ দৌত্যকর্ম বা সংবাদ বহন করা। রাসূলগণ যেহেতু সৃষ্টিজগতের নিকট আল্লাহ তা'আলার পয়গাম বহন করিয়া আনেন, তাই তাঁহাদিগকে রাসূল বলা হইয়া থাকে। মূলত নবী ও রাসূল শব্দ দুইটি প্রায় অভিন্ন অর্থ বহন করিলেও উভয়ের মধ্যে পরিভাষাগত কিছুটা পার্থক্য বিদ্যমান। আল্লামা তাফতাযানী (র) বলেন :
“রাসূল হইতেছেন সেই সত্তা যাঁহাকে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার সৃষ্ট জগতের প্রতি তাঁহার বিধিবিধানের প্রচারের জন্য প্রেরণ করিয়াছেন। তাঁহার প্রতি কিতাব নাযিলের শর্ত আরোপ করা হইয়া থাকে অর্থাৎ তাঁহার প্রতি কোন কিতাব অবতীর্ণ হইলেই কেবল তাঁহাকে রাসূল বলা যায়। পক্ষান্তরে নবীর কিতাব লাভ শর্ত নহে। কেননা নবী শব্দটি ব্যাপকতর অর্থবোধক (শরহু আকাইদিন নাসাফী, পৃ. ২৪, চট্টগ্রাম মুদ্রণ)।
কিন্তু উক্ত সংজ্ঞা সম্পূর্ণ যথার্থ বলিয়া মনে হয় না। কেননা কুরআন শরীফে হযরত ইসমাঈল (আ) সম্পর্কেও উক্ত হইয়াছে :
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَبِ اسْمَعِيلَ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُولًا نَبِيًّا .
“স্মরণ কর এই কিতাবে ইসমাঈলের কথা, সে তো ছিল প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী এবং সে ছিল রাসূল নবী” (১৯:৫৪)।
লক্ষণীয়, নাযিলকৃত আসমানী কিতাবের সংখ্যা সর্বসাকুল্যে ১০৪। প্রধান চারিখানা তাওরাত, যাবুর, ইনজীল ও আল-কুরআন যথাক্রমে হযরত মূসা (আ), হযরত দাউদ (আ), হযরত ঈসা (আ) ও নবীকুল শিরোমনি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি নাযিল হয় এবং বাকি এক শতখানা, যেগুলিকে সহীফা নামে অভিহিত করা হইয়াছে, যথাক্রমে নাযিল হয় :
আদম (আ)-এর প্রতি ১০খানা;
শীছ (আ)-এর প্রতি ৫০খানা;
ইদরীস (আ)-এর প্রতি ৩০খানা এবং
ইবরাহীম (আ)-এর প্রতি ১০খানা।
অথচ রাসূলের সংখ্যা হাদীছমতে ৩১৩। অন্য কথায় কিতাব ও সহীফাপ্রাপ্ত রাসূলের সংখ্যা মাত্র ৮, অবশিষ্ট ৩০৫ জন রাসূলের প্রতি কোন কিতাবই অবতীর্ণ হয় নাই। এতদসত্ত্বেও আল্লাহ্ রাসূল (স) তাঁহাদিগকে রাসূল বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। উল্লিখিত ৩১৩ জনের মধ্যে ২৫ জন রাসূলের নাম কুরআনুল কারীমে উল্লেখ হইয়াছে।
মুফতী মুহাম্মাদ শফী (র) বলেন, 'নবী ও রাসূল-এর সংজ্ঞা সম্পর্কে বিভিন্ন অভিমত রহিয়াছে। বিভিন্ন আয়াত সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করিয়া আমি যাহা উপলব্ধি করিয়াছি তাহা এই যে, উক্ত দুইটি শব্দের মধ্যে 'মানতিক' শাস্ত্রের পরিভাষায় نسبۃ عموم خصوص من وجه নামক সম্পর্ক বিদ্যমান। অর্থাৎ কোন কোন দিক হইতে নবী শব্দটিই অধিকতর ব্যাপক—আবার কোন কোন দিক হইতে রাসূল শব্দই অধিকতর ব্যাপক।
“রাসূল হইতেছেন সেই প্রেরিত পুরুষ যিনি তাঁহার সম্প্রদায়কে নূতন শরীআতের বার্তা পৌঁছাইয়া থাকেন। এই শরীআত তাঁহার নিজের জন্যও নূতন হইতে পারে, যেমন তাওরাত প্রভৃতি, আবার তাঁহার নিজের বেলায় নূতন না হইলেও কেবল তাঁহার উম্মতের বেলায়ও নূতন হইতে পারে। যেমন ইসমাঈল (আ)-এর শরীআত; উহা মূলত ইবরাহীম (আ)-এর পুরাতন শরীআতই ছিল, কিন্তু তিনি যে জুরহুম সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হইয়াছিলেন তাহাদের জন্য উহা নূতন শরীআত ছিল। কেননা পূর্বে তাহাদের কাছে এই শরীআতের বার্তা পৌছে নাই। হযরত ইসমাঈল (আ)-এর মাধ্যমেই উহা তাহাদের কাছে সর্বপ্রথম পৌঁছে। এই অর্থের দিক হইতে বিবেচনা করিলে রাসূলকে যে নবী হইতে হইবে এমন কোন কথা নাই। যেমন ফেরেশতাগণ, তাহাদের ক্ষেত্রে রাসূল শব্দটি প্রযোজ্য হইলেও তাঁহারা নবী নহেন। ঈসা (আ)-এর প্রেরিত বার্তাবাহকগণের ক্ষেত্রেও ঐ একই কথা প্রযোজ্য।
إِذْ جَاءَهَ الْمُرْسَلُونَ .
আয়াতে তাহাদিগকে রাসূল অভিধায় অভিহিত করা হইয়াছে, কিন্তু তাহারা নবী ছিলেন না। পক্ষান্তরে নবী হইতেছেন সেই প্রেরিত পুরুষ যিনি ওহী লাভ করিয়া থাকেন—তিনি নূতন শরীআতের তাবলীগ করুন অথবা পুরাতন শরীআতের। যেমন বনী ইসরাঈলের অধিকাংশ নবীই মূসা (আ)-এর শরীআতের তাবলীগ করিতেন। এই হিসাবে 'রাসূল' শব্দের মধ্যে নবীর তুলনায় ব্যাপ্তি বেশি। আর অন্য হিসাবে নবী শব্দটিই 'রাসূল'-এর তুলনায় ব্যাপকতর। رَسُولٌ نَبِيًّا শব্দ দুইটি যেখানে আয়াতে পাশাপাশি একত্রে ব্যবহৃত হইয়াছে সেখানে তো কোন সমস্যা নাই। কিন্তু যেখানে শব্দ দুইটি একটি আরেকটির মুকাবিলায় ভিন্ন ভিন্ন অর্থবোধকরূপে আসিয়াছে, যেমন (۲۲ : ۵۲) وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ وَلَا نَبِيٍّ আয়াতে?
এখানে পূর্বাপর বিবেচনায় নবী শব্দটি বলিতে ঐ সত্তাই বুঝিতে হইবে যিনি তাঁহার পূর্ববর্তী শরীআতের তাবলীগ করেন” (মা'আরিফুল কুরআন, ৬খ, পৃ. ৪২; দারুল মা'আরিফ, করাচী ১৪১৬ হি.)।
📄 ইসমাতে আম্বিয়া
নবীগণ যে নিষ্পাপ হইয়া থাকেন, ইহাও একটি সর্বসম্মত আকীদা। তারপরও আদম (আ) কী করিয়া আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ অমান্য করিতে পারিলেন, এই প্রশ্নটি কাহারও মনে উদিত হওয়া স্বাভাবিক।
এই প্রসঙ্গে আলোচনা করিতে যাইয়া আল্লামা ইদরীস কান্দলবী (র) ইসমত (عصمت) ও মা'সিয়াত (معصیت) তথা নিষ্পাপত্ব ও অবাধ্যতা শব্দদ্বয়ের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করিয়াছেন। চমৎকারভাবে তিনি লিখেন:
"হকপন্থীগণের সর্ববাদীসম্মত আকীদা এই যে, নবী-রাসূলগণ (আ) আল্লাহ তা'আলার অবাধ্যতা হইতে সর্বতোভাবে পবিত্র ও নিষ্পাপ। তাঁহারা সর্বপ্রকার গুনাহ হইতে মুক্ত। ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁহাদের দ্বারা আল্লাহ তা'আলার অবাধ্যতা সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ্ অবাধ্যতা যদি তাঁহাদের পক্ষে সম্ভবই হইত তাহা হইলে আল্লাহ তা'আলা তদীয় মাখলুককে নিঃশর্তভাবে তাঁহাদের আনুগত্য করার নির্দেশ দিতেন না, তাঁহাদের আনুগত্যকে তাঁহার নিজের আনুগত্য বলিয়া অভিহিত করিতেন না এবং আম্বিয়া কিরামের হাতে আনুগত্যের শপথকে তাঁহার নিজের হাতে আনুগত্যের শপথ বলিয়া অভিহিত করিতেন না। আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন:
وَمَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ .
"যে রাসূলের আনুগত্য করিল সে আল্লাহরই আনুগত্য করিল" (৪৮: ১০)।
إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ .
"যাহারা তোমার হাতে আনুগত্যের শপথ করিল তাহারা আল্লাহ্রই হাতে আনুগত্যের শপথ করিল। আল্লাহ্ হাত তাহাদের হাতের উপর থাকে" (৪৮: ১০)।
বলা বাহুল্য, কুরআন দ্বারাও প্রমাণিত যে, এই নিঃশর্ত আনুগত্যের আদেশ কোন বিশেষ ব্যাপারের মধ্যে সীমাদ্ধ নহে, বরং 'আকাইদ হইতে আমলসমূহ' পর্যন্ত প্রতিটি আকীদা-আমলে ও আচরণে নবীর আনুগত্য অপরিহার্য। ইহার হেতু এই যে, আম্বিয়া কিরামের সত্তা ও তাঁহাদের স্বভাবচরিত্র অত্যন্ত পবিত্র হইয়া থাকে। আম্বিয়া কিরামের স্বভাব-চরিত্র ফেরেশতাকূলের অনুরূপ। ইসমত বা নিষ্পাপত্ব হইতেছে ফেরেশতাগণের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য, আর আম্বিয়া কিরাম ফেরেশতাকুলের তুলনায় উত্তম ও অধিকতর বরণীয়। হযরত আদম (আ)-এর ঘটনাবলী ইহার জাজ্জ্বল্যমান প্রমাণ। এই ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, হযরত আদম (আ) মা'সূম (নিষ্পাপ), ফেরেশতাগণের তুলনায় উত্তম ও অধিকতর মর্যাদাশীল।