📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মানবজাতির হেফাজতে ফেরেশতাকুল

📄 মানবজাতির হেফাজতে ফেরেশতাকুল


কুরআন-হাদীছের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, ফেরেশতাগণ আল্লাহর পক্ষ হইতে মানবজাতির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও পালন করিয়া থাকেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ
لَهُ مُعَقِّبَتٌ مِّنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُونَهُ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ .
"মানুষের জন্য তাহার সম্মুখে ও পশ্চাতে একের পর এক প্রহরী থাকে; উহারা আল্লাহ্র আদেশে তাহার রক্ষণাবেক্ষণ করে" (১৩:১১)।
সহীহ বুখারীর হাদীছে বলা হইয়াছে, ফেরেশতাগণের দুইটি জামাআত মানুষের হিফাযতের উদ্দেশ্যে নিয়োজিত রহিয়াছেন। একদল রাত্রির বেলায় এবং অপরদল দিনের বেলায় হিফাযতের দায়িত্ব পালন করিয়া থাকেন। ফজরের ও আসরের সময় উভয় দল একত্র হইয়া থাকেন। ফজরের নামাযের পর রাত্রিকালের দায়িত্ব পালনকারিগণ বিদায় নেন এবং দিনের প্রহরিগণ দায়িত্বভার বুঝিয়া লন। আসরের নামাযের পর যখন ঐ দল বিদায় হইয়া যায় তখন রাত্রিবেলার প্রহরী ফেরেশতাগণ আসিয়া দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
আবু দাউদের বর্ণনায় হযরত আলী (রা) হইতে বর্ণিত আছে, প্রত্যেক মানুষের জন্য এমন হিফাযতকারী ফেরেশতা রহিয়াছেন যাহারা তাহার উপর প্রাচীর ভাঙিয়া পড়ারূপে নিপতিত হওয়া বা হিংস্র প্রাণী কর্তৃক আক্রান্ত হওয়া হইতে তাহাকে হিফাযত করিয়া থাকেন। তবে কাহারও নির্ধারিত ভাগ্য আসিয়া পড়িলে হিফাযতকারী ফেরেশতাগণ সরিয়া দাঁড়ান (রূহুল মা'আনী, ১৩খ, পৃ. ১১৩)।
হযরত উছমান (রা)-এর রিওয়ায়াতে ইবনে জারীর বর্ণিত হাদীছ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, ফেরেশতাগণ শুধু পার্থিব অনিষ্ট হইতেই নয়, পারলৌকিক ব্যাপারসমূহেও মানুষের হিফাযতের, তাহাদেরকে পাপকর্ম হইতে রক্ষার এবং পূণ্য কর্মে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করার কাজে নিয়োজিত থাকেন, এমনকি তাহার দ্বারা কোন পাপকর্ম সাধিত হইলে তাহারা তাহাকে তওবার জন্য অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করিয়া থাকেন। এতদসত্ত্বেও যদি সে পাপকর্মে লিপ্ত হয় এবং তওবা না করে তাহা হইলে তাহার পাপকর্ম লিপিবদ্ধ করেন (তু. পূ. গ্র.)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আরশবাহী ফেরেশতাকুল

📄 আরশবাহী ফেরেশতাকুল


ইহারা আল্লাহ্র আরশ বহনের সৌভাগ্যের অধিকারী অত্যন্ত সম্মানিত ফেরেশতা। তাঁহাদের সংখ্যা চারিজন। কিয়ামতের সময় আরও চারিজন তাঁহাদের সহিত যুক্ত হইবেন। কুরআন শরীফে তাঁহাদের কথা উল্লিখিত হইয়াছে এইভাবে:
الَّذِينَ يَحْمِلُوْنَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا .
"যাহারা আরশ ধারণ করিয়া আছে এবং যাহারা ইহার চতুষ্পার্শ্ব ঘিরিয়া আছে তাহারা তাহাদের প্রতিপালকের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে প্রশংসার সহিত এবং তাহাতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে" (৪০:৭)।
কিয়ামতের দিন আশরবাহী ফেরেশতার সংখ্যা আটজন হওয়ার কথাটি এইভাবে উল্লিখিত হইয়াছে:
وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٍ ثَمَنِيَةٌ .
"এবং সেইদিন আটজন ফেরেশতা তোমার প্রতিপালকের আরশকে ধারণ করিবে তাহাদের ঊর্ধ্বে” (৬৯: ১৭)।
অনুরূপভাবে হাদীছে আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষাকারী ও ছিন্নকারীদের সংক্রান্ত এবং পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতাদের প্রসঙ্গও বর্ণিত হইয়াছে (দ্র. আল-লু'লু' ওয়া'ল-মারজান, ৩খ, পৃ. ২০৮ ও ২খ, পৃ. ২২৭-২৮)।
সুতরাং ফেরেশতাগণের প্রতি বিশ্বাস ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আল্লাহ্ তা'আলা পূণ্যকর্মের তালিকায় ইহার উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি বলেনঃ
وَلَكِنَّ الْبِرِّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَئِكَةِ وَالْكِتُبِ وَالنَّبِيِّينَ .
"বরং পূণ্য আছে কেহ আল্লাহতে, পরকালে, ফেরেশতাকূলে, সমস্ত কিতাবে এবং নবীগণের প্রতি ঈমান আনয়ন করিলে" (২: ১৭৭)।
إِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّيْنِ عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيدٌ . مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلُ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
"স্মরণ রাখিও! দুই গ্রহণকারী ফেরেশতা তাহার ডানে ও বামে বসিয়া তাহার কর্ম নিপিবদ্ধ করে। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তাহার জন্য তৎপর প্রহরী তাহার নিকটেই রহিয়াছে” (৫০: ১৭-১৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জিন্ন জাতি

📄 জিন্ন জাতি


কুরআন শরীফের ৭টি স্থানে জান্নরূপে এবং ২২টি স্থানে জিন্নরূপে শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে। মানব ও জিন্ন সৃষ্টির উপাদান সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الإِنْسَانَ مِنْ صَلْصَالٍ مِّنْ حَمَاءٍ مُسْنُونَ وَالْجَانَّ خَلَقْنَهُ مِنْ قَبْلُ مِنْ نَّارِ السَّمُومِ .
"আমি তো মানুষ সৃষ্টি করিয়াছি ছাঁচে ঢালা শুষ্ক ঠনঠনা মৃত্তিকা হইতে এবং ইহার পূর্বে সৃষ্টি করিয়াছি জিন্ন অত্যুষ্ণ অগ্নি হইতে" (১৫: ২৬-২৭)।
লক্ষণীয়, উভয় স্থানেই মানুষ সৃষ্টির উপাদান শুষ্ক ঠনঠনা মাটি এবং জিন্ন সৃষ্টির উপাদান আগুন বলা হইয়াছে। দ্বিতীয় আয়াতে জিন্ন জাতিকে মানবজাতির পূর্বেই সৃষ্টি করার উল্লেখ রহিয়াছে।
হযরত আইশা (রা) হইতে বর্ণিত হাদীছে আছে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলিয়াছেন: ফেরেশতাগণ নূর হইতে সৃষ্টি, জিন্নজাতি আগুন হইতে সৃষ্টি এবং আদমকে সৃষ্টি করা হইয়াছে সেই উপাদান হইতে যাহা তোমাদেরকে বর্ণনা করা হইয়াছে (মুসলিম, খ. পৃ.)।
তাফসীর বিশারদগণ বলেন, জিন্ন জাতিকে আদম (আ)-এর পূর্বে সৃষ্টি করা হয়। তাহারও পূর্বে হিন্ ও বিন্ জাতির বাস ছিল এই পৃথিবীতে। আল্লাহ্ তা'আলা জিন্ন জাতিকে তাহাদের উপর আধিপত্য দান করেন। তখন তাহারা পূর্বোক্ত জাতি দুইটিকে হত্যা করে এবং পৃথিবী বক্ষ হইতে উচ্ছেদ করিয়া নিজেরাই পৃথিবীতে বসবাস করিতে থাকে।
ইবন 'আব্বাস, ইবন মাসউদ (রা) প্রমুখ সাহাবী হইতে বর্ণিত আছে যে, সৃষ্টিকর্ম সমাপ্ত করিয়া আল্লাহ্ তা'আলা যখন আরশে সমাসীন হইলেন তখন তিনি ইবলীসকে পৃথিবীর ফেরেশতাদের প্রধান নিযুক্ত করেন। সে ছিল ফেরেশতাদেরই জিন্ন নামক গোত্রের একজন। তাহারা জান্নাতের রক্ষী ছিল বলিয়া তাহাদেরকে জিন্ন বলা হইত। ইবলীস তাহার সঙ্গী ফেরেশতাগণকে সঙ্গে লইয়া জান্নাতের এই রক্ষীর দায়িত্ব পালন করিত। তখন তাহার অন্তরে এই ভাবের উদ্রেক হয় যে, ফেরেশতাদের উপর তাহার প্রাধান্য থাকার কারণেই সে এই মর্যাদার অধিকারী হইতে পারিয়াছে। দাহ্হাক (র) ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন, জিন্ন জাতি যখন পৃথিবীতে ফিৎনা-ফাসাদ ও রক্তপাত করিতে শুরু করে তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাহাদেরকে দমন করার উদ্দেশ্যে ইবলীসকে তাহার ফেরেশতা বাহিনীসহ প্রেরণ করিলেন। তাহারা আসিয়া উহাদিগকে হত্যা করে এবং পৃথিবীর মূল ভূখণ্ড হইতে সাগরের দ্বীপমালায় তাড়াইয়া দেয়। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩য় সংস্করণ, ১৯৭৯, ১খ, পৃ. ৫৫)।
ইবন আব্বাস (রা)-এর বর্ণনা হইতে জানা যায়, আল্লাহ্র অবাধ্য হওয়ার পূর্বে ইবলীসের নাম ছিল আযাযীল। সে ছিল পৃথিবীর অধিবাসী। চারি ডানা বিশিষ্ট ফেরেশতাদের সে সর্দার ছিল। পৃথিবী ও দুনিয়ার আকাশে তাহার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল। গোত্রবংশের দিক হইতে সে অন্যান্য ফেরেশতাদের চাইতে অগ্রগণ্য ছিল। জ্ঞান-গরিমা, উদ্যম ও অধ্যবসায়ে সে ছিল সকল ফেরেশতার অগ্রণী।
হাসান বাসরী (র) বলেন: ইবলীস এক মুহূর্তের জন্যও ফেরেশতা ছিল না, বরং সে ছিল জিন্নদের আদি পিতা, যেমনটি আদম (আ) মানবজাতির আদি পিতা। শাহর ইবন হাওশাব (র) ও অন্যরা বলেন, ফেরেশতাগণ যে জিন্ন জাতিকে পৃথিবী হইতে বিতাড়িত করিয়াছিলেন, তাহাদের মধ্য হইতে তাহাকে তাঁহারা বন্দী করিয়া আসমানে লইয়া গিয়াছিলেন। ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে সে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হইয়াছিল, কিন্তু আল্লাহ্র আদেশ মত আদম (আ)-কে সিজদা না করার কারণে মর্যাদাহারা ও বিতাড়িত হইয়াছিল।
জিন্নরা মানুষের মত পানাহার ও বংশ বিস্তার করিয়া থাকে। তাহাদের মধ্যেও মুমিন ও কাফির তথা বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী উভয় শ্রেণী রহিয়াছে। কেননা, কুরআন শরীফের সূরা জিন্ন-এ জিন্নদের ভাষ্যই উদ্ধৃত হইয়াছে এইভাবে:
وَأَنَّا مِنَّا الصَّلِحُونَ وَمِنَّا دُونَ ذَلِكَ كُنَّا طَرَائِقَ قِدَدًا . وَأَنَّا ظَنَنَّا أَنْ لَنْ نُعْجِزَ اللَّهَ فِي الْأَرْضِ وَلَنْ نُعْجِزَهُ هَرَبًا ، وَأَنَّا لَمَّا سَمِعْنَا الهُدى أَمَنَّا بِهِ فَمَنْ يُؤْمِنْ بِرَبِّهِ فَلَا يَخَافُ بَخْسًا وَلَا رَهَقًا . وَأَنَّا مِنَّا الْمُسْلِمُونَ وَمِنَّا القُسِطُونَ فَمَنْ أَسْلَمَ فَأُولَئِكَ تَحَرُوا رَشَدًا . وَأَمَّا الْقَسِطُونَ فَكَانُوا لِجَهَنَّمَ حَطَبًا .
"আমাদের কতক সৎকর্মপরায়ণ এবং কতক ইহার ব্যতিক্রম। আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথের অনুসারী। এখন আমরা বুঝিয়াছি যে, আমরা পৃথিবীতে আল্লাহকে পরাভূত করিতে পারিব না এবং পলায়ন করিয়াও তাঁহাকে ব্যর্থ করিতে পারিব না। আমরা যখন পথনির্দেশক বাণী শুনিলাম তাহাতে ঈমান আনিলাম। যে ব্যক্তি তাহার প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনে তাহার কোন ক্ষতি ও কোন অন্যায়ের আশঙ্কা থাকিবে না। আমাদের কতক আত্মসমর্পণকারী এবং কতক সীমালঙ্ঘনকারী; যাহারা আত্মসমর্পণ করে তাহারা সুচিন্তিতভাবে সত্য পথ বাছিয়া লয়। অপরপক্ষে সীমালঙ্ঘনকারীরা তো জাহান্নামেরই ইন্ধন" (৭২: ১১-১৫)।
তাফসীরে মাযহারীতে আছে: কুরআন পাকে যাহাদেরকে শয়তান বলা হইয়াছে, বস্তুত তাহারা দুষ্ট শ্রেণীর জিন্ন। জিন্ন ও ফেরেশতাগণের অস্তিত্ব কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত। তাই ইহা অস্বীকার করা কুফরী (তাফসীর মা'আরিফুল কুরআন, ৮খ, পৃ. ৫৭৪; সূরা জিনের তাফসীর প্রসঙ্গ)।
মানব ও জিন্ন জাতির সৃষ্টির উদ্দেশ্য কুরআন শরীফের যে আয়াতে ব্যক্ত হইয়াছে তাহাতে যেমন জিন্ন ও মানব জাতিকে এক কাতারে এক সাথে রাখা হইয়াছে, তেমনি তাহাদের পুরস্কার-তিরস্কার সংক্রান্ত অন্য এক আয়াতেও তাহাদের কথা অভিন্নভাবে বর্ণিত হইয়াছে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
أولَئِكَ الَّذِينَ حَقٌّ عَلَيْهِمُ الْقَوْلُ فِي أُمَمٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِمْ مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ إِنَّهُمْ كَانُوا خَسِرِينَ. وَلِكُلِّ دَرَجَتْ مِمَّا عَمِلُوا وَلِيُوَفِّيَهُمْ أَعْمَالَهُمْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ .
"ইহাদের পূর্বে যে জিন্ন ও মানব সম্প্রদায় গত হইয়াছে, তাহাদের মত ইহাদের প্রতিও আল্লাহ্ উক্তি সত্য হইয়াছে। ইহারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। প্রত্যেকের মর্যাদা তাহার কর্মানুযায়ী; ইহা এই জন্য যে, আল্লাহ্ প্রত্যেকের কর্মের পূর্ণ প্রতিফল দিবেন এবং তাহাদের প্রতি অবিচার করা হইবে না" (৪৬: ১৮-১৯)।
জিন্নদের আমলের প্রতিফল লাভ সম্পর্কে তাফসীরে মাযহারীতে বিস্তারিত আলোচনা রহিয়াছে। কাফির জিন্নদেরকে জান্নাত দ্বারা পুরস্কৃত করা হইবে, অথবা কেবল জাহান্নামের আগুন হইতে নিষ্কৃতি দিয়াই পুরস্কৃত করা হইবে, এই ব্যাপারে মতানৈক্য রহিয়াছে। কেননা আয়াতে আছে:
يقَوْمَنَا أَجِيبُوا دَاعِيَ اللهِ وَآمِنُوا بِهِ يَغْفِرْ لَكُمْ مِّنْ ذُنُوبِكُمْ وَيُجِرُكُمْ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ.
"হে আমাদের সম্প্রদায়! আল্লাহ্ দিকে আহ্বানকারীর প্রতি সাড়া দাও এবং তাহার প্রতি ঈমান আন। আল্লাহ্ তোমাদের পাপ ক্ষমা করিবেন এবং মর্মন্তুদ শাস্তি হইতে তোমাদেরকে রক্ষা করিবেন" (৪৬: ৩১)।
এখানে জান্নাতের সুসংবাদ তাহাদেরকে দেওয়া হয় নাই। ইমাম আবু হানীফা (র) এই মত পোষণ করিতেন। আবার ইমাম মালিক ও ইব্‌ন আবী লায়লার মত অনেকেই মানুষের মত তাহাদেরকেও জান্নাত দ্বারা পুরস্কৃত করা হইবে বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন।
আবুশ শায়খকে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল যে, জিন্ন জাতি কি জান্নাতের সুখভোগ করিবে? জবাবে তিনি বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা ইলহামস্বরূপ তাহাদের অন্তরে যিকর দান করিবেন, তাহারা উহা দ্বারা মানুষের জান্নাতভোগের মত সুখশান্তি লাভ করিবেন। এই ব্যাপারে আবুশ শায়খ যেন জিন্ন জাতিকে ফেরেশতাগণের দলভুক্ত করিয়া দিলেন।
ইবনুল মুনযির বলেন, আমি হামযা ইব্‌ন হাবীবকে জিজ্ঞাসা করিলাম, জিন্ন জাতি কি জান্নাতের সুখ-শান্তির অধিকারী হইবে? তিনি হাঁ-সূচক জবাব দেন এবং দলীলস্বরূপ তিলাওয়াত করেন:
فِيهِنَّ قَاصِرَاتُ الطَّرْفِ لَمْ يَطْمِثْهُنَّ اِنْسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌّ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ .
"(বেহেশতের সুখ-সামগ্রীর) সেই সকলের মধ্যে রহিয়াছে বহু আনত-নয়না (হুর) যাহাদেরকে পূর্বে কোন মানুষ অথবা জিন্ন স্পর্শ করে নাই" (৫৫ঃ ৫৬)।
অর্থাৎ মানুষের জন্য মানুষের উপযোগী হুর এবং জিন্নের জন্য জিন্নের উপযোগী হুর থাকিবে (করাচীর দারুল ইশা'আত মুদ্রিত তাফসীর মাযহারী, ১২খ, ১৩০-১৩১ সূরা জিন্নের তাফসীর প্রসঙ্গ)।
সূরা আর-রাহমানের নিম্নলিখিত আয়াত দ্বারাও জিন্নদের জান্নাত প্রাপ্তির দলীল দেওয়া হইয়া থাকে, যাহাতে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتُنِ ، فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ .
"আর যে আল্লাহ্র সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে, তাহার জন্য রহিয়াছে দুইটি উদ্যান। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন্ অনুগ্রহ অস্বীকার করিবে” (৫৫:৪৬-৪৭)।
এখানে আল্লাহ্ তা'আলা জান্নাতের কথা অনুগ্রহস্বরূপ উল্লেখ করিয়াছেন। তাহারা যদি জান্নাত লাভের সুযোগ না পাইত, তাহা হইলে আল্লাহ্ তা'আলা অনুগ্রহস্বরূপ উহার উল্লেখ করিতেন না এবং উহা তাহাদের প্রতি অনুগ্রহ বলিয়া প্রকাশ করিতেন না। আল্লামা ইব্‌ন কাছীর (র) বলেন:
অর্থাৎ এই একটি দলীল প্রমাণ হিসাবে এই বিষয়ে যথেষ্ট (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৫২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইবলীস শয়তান প্রসঙ্গ

📄 ইবলীস শয়তান প্রসঙ্গ


ইমাম তাবারী (র) বলেন, ইবলীস শব্দটি আরবী ইবলাস শব্দ হইতে উদ্ভুত। ইহার শাব্দিক অর্থ কল্যাণ হইতে নিরাশ হওয়া, অনুতাপ, অনুশোচনা ও দুঃখ-দুশ্চিন্তা করা।
এই মর্মে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত আছে, ইবলীসের এই নামকরণ করা হইয়াছে এই জন্য যে, আল্লাহ্ তাহাকে সর্বপ্রকার কল্যাণ হইতে নিরাশ করিয়াছেন এবং তাহাকে বিতাড়িত শয়তানে পরিণত করিয়াছেন। তাহার পাপাচারের শাস্তিস্বরূপ ইহা করা হইয়াছে।
সুদ্দী হইতে বর্ণিত, ইবলীসের প্রকৃত নাম ছিল হারিছ। সত্য হইতে নিরাশ হইয়া নিজেকে পরিবর্তিত করার জন্য তাহার নাম হয় ইবলীস। কুরআন শরীফেও এই অর্থে আয়াত আসিয়াছে :
قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِنْ أَخَذَ اللَّهُ سَمْعَكُمْ وَأَبْصَارَكُمْ وَخَتَمَ عَلَى قُلُوبِكُمْ مَّنْ إِلَّهُ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيَكُمْ بِهِ أَنْظُرْ كَيْفَ نُصَرِّفُ الآيَتِ ثُمَّ هُمْ يَصْدِقُونَ .
"তাহাদেরকে যে উপদেশ দেওয়া হইয়াছিল তাহারা যখন তাহা বিস্মৃত হইল তখন আমি তাহাদের জন্য সমস্ত কিছুর দ্বার উন্মুক্ত করিয়া দিলাম। অবশেষে তাহাদেরকে যাহা দেওয়া হইল যখন তাহারা তাহাতে উল্লসিত হইল তখন অকস্মাৎ তাহাদেরকে ধরিলাম, ফলে তখনি তাহারা নিরাশ হইল" (৬:৪৬)।
সূরা কাহফ্ফের আয়াতে তাহার পরিচয় এইভাবে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হইয়াছে:
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلْئِكَةِ اسْجُدُوا لِأَدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا ابْلِيْسَ كَانَ مِنَ الْجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِ أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِي وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ بِئْسَ لِلمَظْلِمِينَ بَدَلًا .
"এবং স্মরণ কর, আমি যখন ফেরেশতাগণকে বলিয়াছিলাম আদমের প্রতি সিজদা কর, তখন তাহারা সকলেই সিজদা করিল ইসলীস ব্যতীত; সে জিন্নদের একজন ছিল। সে তাহার প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করিল। তবে কি তোমরা আমার পরিবর্তে উহাকে এবং উহার বংশধরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করিতেছ? উহারা তো তোমাদের শত্রু। যালিমদের এই বিনিময় কত নিকৃষ্ট" (১৮:৫০)।
উক্ত আয়াত হইতে কয়েকটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে জানা গেল:
(১) ইবলীস জিন্ন জাতির অন্তর্ভুক্ত। (২) উহার বংশবিস্তারও হইয়া থাকে, তাই জিন্ন জাতির মধ্যেও যৌন চেতনা, বিবাহশাদী প্রভৃতির প্রচলন রহিয়াছে। (৩) কোন কোন মানুষ জিন্নদিগকে ও তাহাদের প্রধান ইবলীসকে আল্লাহ্ স্থলে নিজেদের অভিভাবক ও কর্মবিধায়করূপে মান্য করিয়া থাকে। (৪) ইবলীস ও তাহার বংশধরদের অনুসারীরা যালিম-অনাচারী, তাহাদের মন্দ পরিণতি রহিয়াছে। (৫) শয়তান জিন্নরাও ইবলীস; মানুষের শত্রু।
ইবলীসকে আল্লাহ্ পৃথিবী ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত অবকাশ দিয়া রাখিয়াছেন যেন সে তাহার সাধ্যমত মানুষকে পথভ্রষ্টকারী শয়তান বাহিনীকে দিক-দিগন্তে ছাড়িয়া দেয়। জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ (রা) বর্ণিত হাদীছে আছে:
ইবলীসের সিংহাসন সমুদ্র বক্ষে, সে তাহার বাহিনী প্রতিদিন মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য প্রেরণ করে। সুতরাং তাহার কাছে সর্বাধিক ঘনিষ্ঠ হইতেছে, যে মানুষকে সর্বাধিক পথভ্রষ্ট করিতে পারে (মুসনাদ আহমাদ-এর বরাতে আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৫৩)।
'ইবলীস' শব্দটি কুরআন শরীফের ১১টি স্থানে ব্যবহৃত হইয়াছে। যথাঃ ২ সূরা বাকারা ৩৪ ৭ আল-আ'রাফ ১১ ১৫ আল-হিজর ৩১-৩২ ১৭ আল-ইসরা ৬১ ১৮ আল-কাহ্ফ্ফ ৫০ ২০ তা-হা ১১৬ ২৬ শু'আরা ৯৫ ৩৪ সাবা ২০ ৩৮ সাদ ৭৪-৭৫
বিভিন্ন হাদীছের দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ্ নাম স্মরণ না করিয়া পানাহার করিলে বা ঘরে প্রবেশ করিলে, বাম হাতে দাঁড়ানো অবস্থায় পানাহার করিলে, ঘরে আল্লাহকে স্মরণ না করিলে এবং আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে শয়তান তাহার প্রভাব বিস্তার করিয়া থাকে। অনুরূপ ধর্মের নামে নব-আবিষ্কৃত রীতিনীতি তথা বেদাতী কার্যকলাপে লিপ্ত করিয়া তওবা হইতে বিমুখ রাখিয়া শয়তান শ্রেণীর জিন্নরা মানুষকে ভ্রষ্টতায় ডুবাইয়া রাখে। উহাদের কবল হইতে রক্ষা পাওয়ার বিভিন্ন ব্যবস্থার কথাও হাদীছে বিস্তারিত আলোচিত হইয়াছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00