📄 ফেরেশতাগণের উল্লেখ আল-কুরআনে
আসমানী কিতাব ও হিদায়াতে বিশ্বাসীদের জন্য ফেরেশতাদের অস্তিত্ব ও তাহাদের ভূমিকা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কুরআন শরীফের অসংখ্য স্থানে ইহাদের আলোচনা আসিয়াছে। কুরআন শরীফের ১০টি স্থানে 'মালাকুন', তিনটি স্থানে 'মালাকান', দুইটি স্থানে 'মালাকায়ন' (দ্বি-বচনে), ৬৮টি স্থানে 'মালাইকা' এবং ৫টি স্থানে 'মালাইকাতুহু'-রূপে ইহার ব্যবহার পরিলক্ষিত হয় (মুহাম্মদ ফুওয়াদ আবদুল বাকী, আল-মু'জাম আল-মুফাহ্রাস, পৃ. ৬৭৪।
কাসাসুল আম্বিয়া প্রণেতা আবদুল ওয়াহ্হাব আনাজ্জার কুরআন শরীফের ৮৬টি সূরায় উক্ত মালাকুন বা মালাইকা শব্দের উল্লেখ ৮৮ বার রহিয়াছে বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন-যাহার চিত্র নিম্নরূপ:
সূরার ক্রমিক নং | সূরার নাম | আয়াত নম্বরসমূহ
(২) | আল-বাকারা | ৩০, ৩১, ৩৪, ৯ ১৬১, ১৭৭, ২১০, ২৪৮, ২৮৫
(৩) | আলে ইমরান | ১৮, ৩৯, ৪২, ৪৫, ৮০, ৮৭, ১২৪
(৪) | সূরা নিসা | ৯৭, ১৩৬, ১৬৬, ১৭২
(৬) | সূরা আন'আম | ৮, ৯, ৫০, ৯৩, ১১১, ১৯৮
(৭) | সূরা আ'রাফ | ১১, ২০
(৮) | সূরা আনফাল | ৯, ১২, ৫০
(১১) | সূরা হুদ | ১২, ৩১
(১২) | সূরা ইউসুফ | ৩১
(১৩) | সূরা রা'দ | ১৩, ২৩
(১৫) | আল-হিজর | ৭, ৮, ২৮, ৩০
(১৬) | সূরা নাহল | ২, ২৮, ৩২, ৩৩, ৪৯
(১৭) | সূরা কাফ্ফ | ৫০
উক্ত আয়াতসমূহ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, ফেরেশতা আল্লাহর অতি নৈকট্যপ্রাপ্ত সম্মানিত সৃষ্টি। আল্লাহ্ তা'আলা নূরের দ্বারা তাহাদেরকে সৃষ্টি করিয়াছেন। বিভিন্ন আয়াতে তাহাদের বিবিধ বৈশিষ্ট্য ও দায়িত্বের কথা উল্লিখিত হইয়াছে। যেমন, সূরা ফাতিরে শুরুতেই আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
الْحَمْدُ للهِ فَاطِرِ السَّمواتِ وَالأَرْضِ جَاعِلِ الْمَلَكَةِ رُسُلًا أُولِى أَجْنِحَة مَثْنَى وَثُلكَ وَرُبَعَ يَزِيدُ فِي الْخَلْقِ مَا يَشَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ .
"সকল প্রশংসা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্রই, যিনি বাণীবাহক করেন ফেরেশতাদেরকে, যাহারা দুই দুই, তিন তিন অথবা চার চার পক্ষবিশিষ্ট। তিনি সৃষ্টিতে যাহা ইচ্ছা বৃদ্ধি করেন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান" (৩৫:১)।
বিভিন্ন স্তরের ফেরেশতাদের বিভিন্ন সংখ্যক পাখা বা ডানা বিশিষ্ট করিয়া সৃষ্টি করা হইয়াছে। কিন্তু ঐ ডানাসমূহের সংখ্যা চারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নহে, বরং কোন কোন ফেরেশতাকে আল্লাহ্ তা'আলা অনেক বেশি সংখ্যক ডানাও দান করিয়াছেন। যেমন বুখারী, মুসলিম ও তিরমিযী শরীফের এক হাদীছে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন, একদা নবী করীম (সা) জিবরাঈল (আ)-কে ছয়শত ডানাবিশিষ্ট অবস্থায় প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। তিরমিযী শরীফে উদ্ধৃত হযরত আয়েশা (রা) বর্ণিত হাদীছে আছে, জিবরাঈল (আ)-কে মহানবী (সা) দুইবার ছয়শত ডানাসহ এমন অবস্থায় দেখিয়াছেন যে, গোটা দিগন্ত তাহার ডানাসমূহে ঢাকা পড়িয়া গিয়াছিল [তাফহীমূল কুরআন, খ. ৪, পৃ. ২১৮ ও মুখতাসার, ইব্ন কাছীর (সাবৃনী), ৩খ, পৃ. ১৩৮]।
সূরা আস-সাফফাত-এর প্রারম্ভে উল্লিখিত হইয়াছে:
والصفت صفا . فالزاجرات زَجْرًا . فالتليت ذكراً .
"শপথ তাহাদের যাহারা সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান ও যাহারা মেঘমালার কঠোর পরিচালক এবং যাহারা যিকির আবৃত্তিতে রত” (৩৭:১-৩)।
উক্ত আয়াতসমূহের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আল্লামা ইন্ন কাছীর (র) বলেনঃ
ইবন মাসউদ (রা) বলেন: ইহারা হইতেছেন ফেরেশতাগণ। ইহা ইব্ন আব্বাস (রা), মাসরূক, সাঈদ ইব্ন জুবায়র, ইকরিমা, মুজাহিদ, সুদ্দী ও কাতাদা (র) প্রমুখেরও অভিমত।
📄 ফেরেশতাকুলের মধ্যে চারজন সর্বশ্রেষ্ঠ
(১) জিবরাঈল আলায়হিস সালাম: তাঁহাকে 'রূহুল কুদুস' নামেও অভিহিত করা হইয়া থাকে। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার মর্যাদা, শক্তিমত্তা ও আমানতদারী বা বিশ্বস্ততার কথা উল্লেখ করিয়া বলেন:
إنَّهُ لَقَولُ رَسُولٍ كَرِيمٍ ذِي قُوَّةٍ عِنْدَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينِ : مُطَاعِ ثُمَّ آمِيْن:
"নিশ্চয় এই কুরআন সম্মানিত বার্তাবহের আনীত বাণী-যে সামর্থ্যশালী, আরশের মালিকের নিকট মর্যাদাসম্পন্ন, যাহাকে সেথায় মান্য করা হয়, যে বিশ্বাসভাজন" (৮১: ১৯-২১)।
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে সর্বোত্তম কাজ অর্থাৎ তাঁহার এবং তাঁহার সম্মানিত রাসূলগণের মধ্যে দৌত্যকর্মের জন্য বিশেষভাবে মনোনীত করিয়াছেন। তাই তিনি পৃথিবীতে উহা লইয়া আগমন করিতেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَإِنَّهُ لَتَنْزِيلُ رَبِّ الْعَلَمِينَ . نَزَلَ بِهِ الرُّوْحُ الأَمِينُ عَلَى قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنْذِرِينَ بِلِسَانٍ عَرَبِي مبين.
"নিশ্চয় আল-কুরআন জগতসমূহের প্রতিপালক হইতে অবতীর্ণ। জিবরাঈল ইহা লইয়া অবতীর্ণ হইয়াছে তোমার হৃদয়ে, যাহাতে তুমি সতর্ককারী হইতে পার" (২৬ঃ ১৯২-১৯৪)।
সহীহ হাদীছের বর্ণনামতে, তিনি সৃষ্টিজগতের ইতিহাসে সর্বদীর্ঘ ও সর্বোত্তম সফর অর্থাৎ ইসরা ও মিরাজে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সফরসঙ্গীরূপে প্রথমে মক্কা শরীফের মাসজিদুল হারাম হইতে বায়তুল মাকদিস পর্যন্ত এবং তারপর সেখান হইতে সিদ্রাতুল মুস্তাহা পর্যন্ত সফর করেন, যাহা ঊর্ধ্ব জগতের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থিত (দ্র. আল-লু'লু' ও ওয়াল-মারজান (সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীছ চয়নিকা গ্রন্থ, ১খ, পৃ. ৩৫-৩৯; বুখারী, ১খ, ৯২-৯৪; মুসলিম, ১খ, ৯৯-১০১; আরও দ্র. তাফসীর গ্রন্থসমূহে সূরা ইস্রা-এর তাফসীর)।
(২) মীকাঈল (আ): 'আকীদাতুত তাহাবিয়া গ্রন্থে তাঁহার সম্পর্কে আছে, "তাঁহার উপর বৃষ্টিপাতের দায়িত্ব ন্যস্ত রহিয়াছে যদ্বারা মর্তভূমি, বৃক্ষলতা এবং প্রাণী জগতের প্রাণ রক্ষা হয়" (শারহু আকীদাতিত-তাহাবিয়া, ২খ, পৃ. ৪০৮)।
(৩) আযরাঈল (আ): তিনি সৃষ্টিকূলের রূহ কবযের দায়িত্বে নিযুক্ত। এই কাজে তাঁহার সহযোগীরূপে আরও অনেক ফেরেশতা নিয়োজিত রহিয়াছেন। কুরআন শরীফের নিম্নোক্ত আয়াতে উল্লিখিত হইয়াছে:
حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ تَوَفَّتْهُ رُسُلُنَا وَهُمْ لَا يُفَرِّطُوْنَ .
"অবশেষে যখন তোমাদের কাহারও মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন আমার প্রেরিতরা তাহার মৃত্যু ঘটায় এবং তাহারা কোন ত্রুটি করে না" (৬:৬১)।
ইহাদের মধ্যেও একজন রহমতের এবং অপরজন আযাব বা শাস্তির ফেরেশতা। নেককার বান্দাদের জান কবযের জন্য সৌম্যমূর্তিসম্পন্ন রহমতের ফেরেশতাগণ এবং বদকার বা পাপচারীদের জান কবযের জন্য বীভৎস রূপধারী কঠোর প্রকৃতির আযাবের ফেরেশতাগণ আগমন করিয়া থাকেন, যাহার বিস্তারিত বিবরণ হাদীছের বর্ণনায় পাওয়া যায় (দ্র. সহীহ, মুসলিম, ৮খ, পৃ. ১৬২, বৈরূত সং)। আয়াতে 'আমার প্রেরিতরা কোন ত্রুটি করে না' বলিয়া এই সত্যের দিকেই ইঙ্গিত করা হইয়াছে যে, নেককার বান্দাদের জান কবযে সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করিতে এবং পাপাচারীদের জান কবযে কঠোরতা অবলম্বনে ফেরেশতাগণ ত্রুটি করেন না বলা হইয়াছে (দ্র. আকীদাতুল মুমিন, পৃ. ১৯৩, আবু বকর আল-জাযাইরী প্রণীত)।
(৪) ইসরাফীল (আ) : কিয়ামতের সময় তিনি সিঙ্গায় ফুঁক দিবেন। তখন বিশ্ব ধ্বংস হইয়া যাইবে। পরে পুনরায় সিঙ্গায় ফুঁক দিবেন যাহাতে পুনরুত্থান বা হাশর সংঘটিত হইবে ও সৃষ্টিকূলের হিসাব-নিকাশ তথা বিচার সম্পন্ন হইবে।
‘কিরামান কাতিবীন’ বলিয়া ফেরেশতাগণের কথা কুরআন শরীফে উল্লিখিত হইয়াছে এইভাবে:
وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحفِظِينَ كِرَامًا كَاتَبِينَ يَعْلَمُونَ مَا تَفْعَلُوْنَ
"অবশ্যই আছে তোমার জন্য তত্ত্বাবধায়কগণ, সম্মানিত লিপিকরবৃন্দ; তাহারা জানে তোমরা যাহা কর" (৮২: ১১-১২)।
অন্যত্র তাঁহাদের প্রসঙ্গ বলা হইয়াছে এইভাবে:
إِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّينِ عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيْدُ . مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
"স্মরণ রাখিও, দুই গ্রহণকারী ফেরেশতা তাহার (মানুষের) দক্ষিণে ও বামে বসিয়া তাহার কর্ম লিপিবদ্ধ করে। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তাহার জন্য তৎপর প্রহরী তাহার নিকটেই রহিয়াছে" (৫০:১৭-১৮)।
কিয়ামতের দিন বেহেশতীগণকে অভ্যর্থনা জানানো বা দোযখীদিগকে দোযখের দিকে হাঁকাইয়া লইয়া যাওয়ার কাজ বা নবী-রাসূলগণের আনুগত্য করিয়া পার্থিব জীবন সুন্দরভাবে পরিচালনা করিয়া চিরস্থায়ী শান্তির আবাসভূমি বেহেশত লাভে ব্যর্থতার জন্য তিরস্কারও করিবেন এই ফেরেশতাগণ। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
وَسِيقَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ زُمَرًا حَتَّى إِذَا جَاءُوهَا فُتِحَتْ أَبْوَابُهَا وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا أَلَمْ يَأْتِكُمْ رُسُلٌ مِنْكُمْ يَتْلُوْنَ عَلَيْكُمْ أَيْتِ رَبِّكُمْ وَيُنْذِرُونَكُمْ لِقَاءَ يَوْمِكُمْ هَذَا قَالُوا بَلَى وَلَكِنْ حَقَّتْ كَلِمَةُ الْعَذَابِ عَلَى الكفرين. قِيلَ ادْخُلُوا أَبْوَابَ جَهَنَّمَ خُلِدِينَ فِيهَا فَبِئْسَ مَثْوَى الْمُتَكَبِّرِينَ. وَسِيقَ الَّذِينَ اتَّقُوا رَبِّهِمْ إِلَى الْجَنَّةِ زُمَرًا حَتَّى إِذَا جَاءُوهَا وَفُتِحَتْ أَبْوَابُهَا وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا سَلَّمٌ عَلَيْكُمْ طِبْتُمْ فَادْخُلُوهَا خُلِدِيْنَ، وَقَالُوا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي صَدَقَنَا وَعْدَهُ وَأَوْرَثَنَا الْأَرْضَ نَتَبَوا مِنَ الْجَنَّةِ حَيْثُ نَشَاءُ فَنِعْمَ أَجْرُ الْعَمِلِينَ، وَتَرَى الْمَلْئِكَةَ حَافِينَ مِنْ حَوْلِ الْعَرْشِ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَقُضِيَ بَيْنَهُمْ بِالْحَقِّ وَقِيلَ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ .
"কাফিরদেরকে জাহান্নামের দিকে দলে দলে হাঁকাইয়া লইয়া যাওয়া হইবে। যখন উহারা জাহান্নামের নিকট উপস্থিত হইবে তখন ইহার প্রবেশদ্বারগুলি খুলিয়া দেওয়া হইবে এবং জাহান্নামের রক্ষীরা উহাদেরকে বলিবে, 'তোমাদের নিকট কি তোমাদের মধ্য হইতে রাসূল আসে নাই, যাহারা তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের আয়াতসমূহ আবৃত্তি করিত এবং এই দিনের সাক্ষাত সম্বন্ধে তোমাদেরকে সতর্ক করিত'? উহারা বলিবে, 'অবশ্যই আসিয়াছিল'; বস্তুত কাফিরদের প্রতি শাস্তির কথা বাস্তবায়িত হইয়াছে। উহাদেরকে বলা হইবে, জাহান্নামের দ্বারসমূহে প্রবেশ কর উহাতে স্থায়ীভাবে অবস্থিতির জন্য। কত নিকৃষ্ট উদ্ধতদের আবাসস্থল! যাহারা তাহাদের প্রতিপালককে ভয় করিত তাহাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে লইয়া যাওয়া হইবে। যখন তাহারা জান্নাতের নিকট উপস্থিত হইবে, ইহার দ্বারসমূহ খুলিয়া দেওয়া হইবে এবং জান্নাতের রক্ষীরা তাহাদেরকে বলিবে, ‘তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা সুখী হও এবং জান্নাতে প্রবেশ কর স্থায়ীভাবে অবস্থিতির জন্য।’ তাহারা প্রবেশ করিয়া বলিবে, ‘প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদের প্রতি তাঁহার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করিয়াছেন এবং আমাদেরকে অধিকারী করিয়াছেন এই ভূমির; আমরা জান্নাতে যেথায় ইচ্ছা বসবাস করি’। সদাচারীদের পুরস্কার কত উত্তম! এবং তুমি ফেরেশতাদেরকে দেখিতে পাইবে যে, উহারা ‘আরশের চতুষ্পার্শ্ব ঘিরিয়া উহাদের প্রতিপালকের সপ্রশংসা পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করিতেছে। আর তাহাদের বিচার করা হইবে ন্যায়ের সহিত। বলা হইবে, সকল প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্র প্রাপ্য” (৩৯: ৭১-৭৫)।
উক্ত আয়াতসমূহ হইতে জান্নাতের রক্ষী, জাহান্নামের রক্ষী এবং আরশবাহী ফেরেশতাকূলের অস্তিত্ব সম্পর্কেও স্পষ্টভাবে জানা গেল। জান্নাতের রক্ষীরূপে নিযুক্ত ফেরেশতাকূলের প্রধানের নাম রিদওয়ান এবং জাহান্নামের রক্ষীকূলের প্রধানের নাম মালিক (দ্র. আকীদাতু’ল-মু’মিন, পৃ. ১৯৪)।
কবরে মুনকার-নাকীর কর্তৃক মৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের কথাও হাদীছে বিবৃত হইয়াছে।
মুফতী মুহাম্মাদ শফী’ (র) সূরা ইয়াসীন-এর ২৭ নং আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে সাহাবী হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীছ উদ্ধৃত করিয়াছেন। ইহাতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, মুমিনকে কবরে প্রশ্ন করার ভয়ঙ্কর মুহূর্তেও সে আল্লাহর অনুগ্রহে কালেমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু"র উপর প্রতিষ্ঠিত থাকিবে এবং উহার সাক্ষ্য দিবে। তারপর يُثَبِّتُ اللهُ الَّذِينَ آمَنُواْ بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الآخِرَةِ (১৪:২৭) আয়াতটি তিলাওয়াত করিয়া তিনি বলেন, এই আয়াতে উহার কথাই বলা হইয়াছে। হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) ছাড়াও প্রায় চল্লিশজন সাহাবী হইতে এই বিষয়ে বহু হাদীছ বর্ণিত হইয়াছে। ইব্ন কাছীর স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে এইগুলি সবিস্তারে বর্ণনা করিয়াছেন (দ্র. জালালুদ্দীন সুয়ূতী, আত-তাছবীত ইনদাত তাব্রীত, শারহু’স্-সুদূর")।
মৃত্যু ও দাফনের পর কবরে পুনর্জীবন লাভ, ফেরেশতাগণের প্রশ্নোত্তর এবং সেই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে পুরস্কার বা শান্তিলাভের ব্যাপারটি কুরআন পাকের দশটি আয়াতে ইঙ্গিতে এবং রাসূলুল্লাহ (সা) হইতে বর্ণিত ৭০ খানা প্রসিদ্ধ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত (দ্র. মাআরিফুল কুরআন, উক্ত আয়াতের তাফসীরে)।
📄 মানবজাতির হেফাজতে ফেরেশতাকুল
কুরআন-হাদীছের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, ফেরেশতাগণ আল্লাহর পক্ষ হইতে মানবজাতির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও পালন করিয়া থাকেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ
لَهُ مُعَقِّبَتٌ مِّنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُونَهُ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ .
"মানুষের জন্য তাহার সম্মুখে ও পশ্চাতে একের পর এক প্রহরী থাকে; উহারা আল্লাহ্র আদেশে তাহার রক্ষণাবেক্ষণ করে" (১৩:১১)।
সহীহ বুখারীর হাদীছে বলা হইয়াছে, ফেরেশতাগণের দুইটি জামাআত মানুষের হিফাযতের উদ্দেশ্যে নিয়োজিত রহিয়াছেন। একদল রাত্রির বেলায় এবং অপরদল দিনের বেলায় হিফাযতের দায়িত্ব পালন করিয়া থাকেন। ফজরের ও আসরের সময় উভয় দল একত্র হইয়া থাকেন। ফজরের নামাযের পর রাত্রিকালের দায়িত্ব পালনকারিগণ বিদায় নেন এবং দিনের প্রহরিগণ দায়িত্বভার বুঝিয়া লন। আসরের নামাযের পর যখন ঐ দল বিদায় হইয়া যায় তখন রাত্রিবেলার প্রহরী ফেরেশতাগণ আসিয়া দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
আবু দাউদের বর্ণনায় হযরত আলী (রা) হইতে বর্ণিত আছে, প্রত্যেক মানুষের জন্য এমন হিফাযতকারী ফেরেশতা রহিয়াছেন যাহারা তাহার উপর প্রাচীর ভাঙিয়া পড়ারূপে নিপতিত হওয়া বা হিংস্র প্রাণী কর্তৃক আক্রান্ত হওয়া হইতে তাহাকে হিফাযত করিয়া থাকেন। তবে কাহারও নির্ধারিত ভাগ্য আসিয়া পড়িলে হিফাযতকারী ফেরেশতাগণ সরিয়া দাঁড়ান (রূহুল মা'আনী, ১৩খ, পৃ. ১১৩)।
হযরত উছমান (রা)-এর রিওয়ায়াতে ইবনে জারীর বর্ণিত হাদীছ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, ফেরেশতাগণ শুধু পার্থিব অনিষ্ট হইতেই নয়, পারলৌকিক ব্যাপারসমূহেও মানুষের হিফাযতের, তাহাদেরকে পাপকর্ম হইতে রক্ষার এবং পূণ্য কর্মে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করার কাজে নিয়োজিত থাকেন, এমনকি তাহার দ্বারা কোন পাপকর্ম সাধিত হইলে তাহারা তাহাকে তওবার জন্য অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করিয়া থাকেন। এতদসত্ত্বেও যদি সে পাপকর্মে লিপ্ত হয় এবং তওবা না করে তাহা হইলে তাহার পাপকর্ম লিপিবদ্ধ করেন (তু. পূ. গ্র.)।
📄 আরশবাহী ফেরেশতাকুল
ইহারা আল্লাহ্র আরশ বহনের সৌভাগ্যের অধিকারী অত্যন্ত সম্মানিত ফেরেশতা। তাঁহাদের সংখ্যা চারিজন। কিয়ামতের সময় আরও চারিজন তাঁহাদের সহিত যুক্ত হইবেন। কুরআন শরীফে তাঁহাদের কথা উল্লিখিত হইয়াছে এইভাবে:
الَّذِينَ يَحْمِلُوْنَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا .
"যাহারা আরশ ধারণ করিয়া আছে এবং যাহারা ইহার চতুষ্পার্শ্ব ঘিরিয়া আছে তাহারা তাহাদের প্রতিপালকের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে প্রশংসার সহিত এবং তাহাতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে" (৪০:৭)।
কিয়ামতের দিন আশরবাহী ফেরেশতার সংখ্যা আটজন হওয়ার কথাটি এইভাবে উল্লিখিত হইয়াছে:
وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٍ ثَمَنِيَةٌ .
"এবং সেইদিন আটজন ফেরেশতা তোমার প্রতিপালকের আরশকে ধারণ করিবে তাহাদের ঊর্ধ্বে” (৬৯: ১৭)।
অনুরূপভাবে হাদীছে আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষাকারী ও ছিন্নকারীদের সংক্রান্ত এবং পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতাদের প্রসঙ্গও বর্ণিত হইয়াছে (দ্র. আল-লু'লু' ওয়া'ল-মারজান, ৩খ, পৃ. ২০৮ ও ২খ, পৃ. ২২৭-২৮)।
সুতরাং ফেরেশতাগণের প্রতি বিশ্বাস ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আল্লাহ্ তা'আলা পূণ্যকর্মের তালিকায় ইহার উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি বলেনঃ
وَلَكِنَّ الْبِرِّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَئِكَةِ وَالْكِتُبِ وَالنَّبِيِّينَ .
"বরং পূণ্য আছে কেহ আল্লাহতে, পরকালে, ফেরেশতাকূলে, সমস্ত কিতাবে এবং নবীগণের প্রতি ঈমান আনয়ন করিলে" (২: ১৭৭)।
إِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّيْنِ عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيدٌ . مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلُ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
"স্মরণ রাখিও! দুই গ্রহণকারী ফেরেশতা তাহার ডানে ও বামে বসিয়া তাহার কর্ম নিপিবদ্ধ করে। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তাহার জন্য তৎপর প্রহরী তাহার নিকটেই রহিয়াছে” (৫০: ১৭-১৮)।