📄 মৃত জন্তু, রক্ত ও শূকর মাংস নিষিদ্ধ ও বর্ণমালার ব্যবহার
হযরত (আ)-এর রিসালাত ও শরীআতের কথা হযরত আবূ যার (রা) বর্ণিত হাদীছের শেষ অংশে বর্ণিত ইহয়াছেঃ "এবং তাঁহার প্রতি নাযিল করিয়াছেন মৃত জন্তু, রক্ত ও শূকর মাংস ভক্ষণের নিষেধাজ্ঞা এবং বর্ণফল একুশটি পাতায়" (ইনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, বৈরূত)। উক্ত রিওয়য়াত হইতে জানা গেল যে, বর্ণমালাও তাঁহার নিকট প্রত্যাদিষ্ট হইয়াছিল।
📄 মৌনতা অবলম্বন
সাহাবী আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে সাঈদ ইব্ন জুবায়র বর্ণিত একটি রিওয়ায়াতে প্রতীয়মান হয় যে, মৌনতা অবলম্বন বা স্বল্পবাক থাকার নির্দেশও হযরত আদম (আ)-এর প্রতি অবতীর্ণ হইয়াছিল। সেই রিওয়ায়াতটি এইরূপ : “আল্লাহ তা'আলা যখন আদম (আ)-কে পৃথিবীতে পাঠাইলেন, তখন (ক্রমে ক্রমে) তাঁহার সন্তান-সন্তুতির সংখ্যা বৃদ্ধি পাইল। একদা তাঁহার পুত্র, পৌত্র ও প্রপৌত্রগণ তাঁহাকে ঘিরিয়া বসিল এবং তাঁহার নিকটেই নানারূপ আলাপ-আলোচনা করিতে লাগিল। আদম (আ) কিন্তু একটিও কথা না বলিয়া চুপচাপ বসিয়া রহিলেন। তখন তাহারা অনুযোগ করিয়া বলিল, হে আমাদের পিতা! আমরা কথাবার্তা বলিতেছি, অথচ আপনি একেবারে চুপচাপ, একটি কথাও বলিতেছেন না, ব্যাপার কী? জবাবে তিনি বলিলেন, হে আমার পুত্রগণ! আল্লাহ তা'আলা যখন তাঁহার নৈকট্য হইতে অমাকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন, তখন তিনি আমাকে নির্দেশ দিতে গিয়া বলেন : হে আদম! আমার সকাশে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত তুমি স্বল্পবাক থাকিবে” (ইবন জারীর তাবারী, তারীখ, ১খ, ১৫৮-১৫৯; ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৯৮; ইবনুল জাওযী, আল-মুনতাযাম, ১খ, ২২১)।
📄 আদম সৃষ্টি ও বিবর্তনবাদ
হযরত আদম (আ) যেহেতু পৃথিবীর আদি মানব, তাই তাঁহার জীবনী আলোচনা প্রসঙ্গে মানব সৃষ্টির পূর্ণ বিবরণ আসমানী কিতাবসমূহের আলোকে ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। কিন্তু প্রায় দেড় শত বৎসর পূর্বে ১৮৫৯ সালে লন্ডন হইতে প্রকাশিত বিজ্ঞানী ডারউইনের On the Origin of Species গ্রন্থের বক্তব্য আসমানী গ্রন্থসমূহের হিদায়াত বঞ্চিত বা তাহাদের অবিশ্বাসী শ্রেণীর লোকজনকে বিবর্তনবাদের এক নূতন ধূম্রজালে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছে। প্রাচীন যুগের বিভিন্ন প্রাণীর ফসিল পর্যালোচনা করিয়া ঐ তথাকথিত 'বিবর্তনবাদ' তত্ত্বে এমন একটি ধারণা দেওয়া হইয়াছে যে, ক্রমপরিবর্তনের মাধ্যমে মানবজাতি বর্তমান অবস্থায় উপনীত হইয়াছে, আদিতে এই মানুষ মানব আকারে ছিল না। বানর ও মানুষের অবয়বগত সামঞ্জস্য দর্শনে বিভ্রান্ত হইয়া এই তত্ত্বে বিশ্বাসিগণ উক্ত জাতি যে এক ও অভিন্ন পূর্ব প্রজন্ম হইতে সৃষ্ট এইরূপ একটি ধারণায় উপনীত হইয়াছেন। তাদের এই অনুমানসর্বস্ব তত্ত্বের বিস্তারিত আলোচনা এখানে নিষ্প্রয়োজন। কেননা ওহী তথা আসমানী হিদায়াত বা পথনির্দেশই অভ্রান্ত সত্য। এতদসত্ত্বেও সত্যানুসন্ধানী মানুষকে বিভ্রান্তমুক্ত রাখার উদ্দেশে এ সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য যে, 'অন দি অরিজিন অব স্পেসিস' গ্রন্থের জন্য ডারউইনকে বিবর্তনবাদের প্রবর্তকের মর্যাদা দিয়া বিশ্বজোড়া আলোড়ন সৃষ্টি করা হইয়াছিল। তিনি তাঁহার উক্ত পুস্তকটির যষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশ পর্যন্ত 'বিবর্তনবাদ' বা ইভ্যুলিউশন শব্দটির আদৌ ব্যবহার করেন নাই (মরিস বুকাইলী প্রণীত গ্রন্থের অনুবাদ 'মানুষের আদি উৎস, পৃ. ৩৫)।
ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্বের অসারতা সম্পর্কে আলোচনা করিতে গিয়া ফরাসী পণ্ডিত মরিস বুকাইলী (বুকাই) বলেন: "কোন একটা প্রাণীর মধ্যে কিছু পরিবর্তন বা পার্থক্য তিনি দেখতে পেয়েছিলেন, তারপর আর সব কিছুকেই তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে সেই পার্থক্য বা পরিবর্তনকেই বড় করে তুলে ধরেছিলেন। অথচ কোন প্রাণী বিশেষের মধ্যকার কোন পরিবর্তন বা পার্থক্য কখনও সেই প্রাণীর নিজ প্রজাতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না। অন্য কথায়, কোন ধরনের পরিবর্তন এক প্রজাতিকে অন্য প্রজাতিতে পরিণত করতে পারে না" (মানুষের আদি উৎস, পৃ. ৬৬)।
উপরিউক্ত সত্যের দিকে ইঙ্গিত করা হইয়াছে বৃটিশ রাজকীয় ডাকঘরের ডারউইনের শত বার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত ডাক টিকেটের মধ্যে। তাহাতে ডারউইনের দাবির দুই পার্শ্বে দুইটি সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীর ছবিও স্থান পায়। ঐ দুইটি ডারউইনকে লক্ষ্য করিয়া বলিতেছিল: “ এই যে জনাব! মেহেরবানী করিয়া শুনুন, আপনার থিওরীকে এড়াইয়া গিয়া এই যে, আমরা কোটি কোটি বৎসর যাবৎ আদি কালের সেই একই প্রজাতিরূপে রহিয়া গিয়াছি" (মানুষের আদি উৎস, পৃ. ৭৮)।
মরিস বুকাইলী এই সত্যটিকে আরও স্পষ্টভাবে তুলিয়া ধরিয়াছেন, "বিবর্তনের এই বিষয়টাকে আরেকটা বাস্তবতার সাথেও তুলনা করে দেখতে হবে। সেই বাস্তবতাটা হচ্ছে নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়া এবং তেলা পোকার মত এক শ্রেণীর পোকা-মাকড়ের অস্তিত্ব। ঐ শ্রেণীর ব্যাকটেরিয়া ও পোকা-মাকড় যে তাদের আদিম যুগের অবয়ব নিয়েই এ যাবৎ টিকে রয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নাই, যদিও এর মধ্যে একই প্রজাতিতে ভিন্নতা ঘটেছে এবং ঘটেছে প্রচণ্ডতর ব্যাপকতার সঙ্গেই। নব্য-ডারউইনবাদীরা প্রাণের এবং প্রজাতির বহুকরণের ব্যাপারটা শুধু লক্ষ্য করে গেছেন। কিন্তু একই প্রাণী প্রজাতির কমবেশি অভিন্ন থাকার মত সুস্পষ্ট অথচ অনড় একটি বিষয়কে তাঁরা যে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছেন, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই। ফলে তাদের গোটা থিওরিটাই মাঠে মারা পড়েছে" (মানুষের আদি উৎস, পৃ. ৭৯)।
বিবর্তনবাদের আলোচনা করিতে গিয়া বিজ্ঞানী ও এইচ ক্লার্ক লিখেন: "মানুষ স্তন্যপায়ী এবং ইহাও সন্দেহাতীত যে, মানুষের সহিত বিশেষ আকারের বানরের অবয়বগত বিশেষ মিল রহিয়াছে। ইহা পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। কিন্তু মানুষের শুধুমাত্র অবয়বগত মিল দেখিয়া অন্যান্য প্রাণীর সহিত উহার যথার্থ সম্পর্ক নির্ণয় করা বা বর্তমান পৃথিবীতে তাহার যথার্থ স্থান নির্ধারণ করা যায় না। দুর্ভাগ্যক্রমে পৃথিবীতে মানুষের যথাযথ রূপ নির্ধারণে অনেক জীববিজ্ঞানীই উদারতার দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করিয়া শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাটিয়া সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করিয়াছেন। প্রত্যেকটি প্রাণীর দেহগঠন কাজ তাহার মানসিক গঠনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যাহা ব্যাখ্যা করার মত কোন পদার্থবিদ্যা বা রাসায়নিক জ্ঞান আজ পর্যন্ত আমরা পাই নাই। প্রতিটি রকমের ও জাতির জীবের মধ্যে বিশেষ ধরনের জটিল মনোগঠন লক্ষ্য করা যায়, যাহা ঐ বিশেষ প্রকারের জীবের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট। প্রত্যেক প্রকার জীবের এই যে মনোগঠন তাহা তাহার দৈহিক গঠনের মতই গুরুত্বপূর্ণ” (The New Evolution, by H. clerk পৃ. ২৩)।
বিবর্তনের জন্য ফসিলকেই বিশ্বস্ততর ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বলিয়া স্বীকার করা হইয়া থাকে। সরল জীবন হইতে ক্রমশ জটিল জীবনের দিকে যে বিবর্তন তাহা কেবল ফসিলের ইতিহাস হইতেই জানা যাইতে পারে। তাই স্বয়ং ডারউইন তদীয় 'অরিজিন অব স্পেসিস' গ্রন্থে বিজ্ঞানী Dundor-কে উদ্ধৃত করিয়াছেন এইভাবে : "সরল জীবন হইতে ক্রমশ জটিল হইতে জটিলতর জীবনের দিকে যে বিবর্তন তাহা শুধু ফসিলের ইতিহাস হইতেই জানা যাইতে পারে। জীবিত প্রাণী ও উদ্ভিদের তুলনামূলক বিচারের দ্বারা তাহা পারিপার্শ্বিক প্রমাণ মাত্র, ঐতিহাসিক দলীল নির্ভর প্রমাণ নহে (ওরিজিন অফ স্পেসিস, প্যারা ২, পৃ. ৫২)।
আবার জি. জি সিম্পসন (১৯৪৪ সালে) বলেন : বিভিন্ন প্রকার জীবের মধ্যে ক্রম সম্পর্কহীনতা এত বেশী এবং উচ্চ স্তরের জীবের মধ্যে এত প্রবল যে, এই সময়ে ক্রমসম্পর্ক পাওয়াই যায় না (দ্র. Tempo and mode in Evolution, P. 99)। এই বিভিন্ন জীবের মধ্যে অমিল থাকাই বিবর্তন তত্ত্বের পক্ষে একটি বিরাট বাধাস্বরূপ (অধ্যক্ষ আবুল কাসেম, বিজ্ঞান সমাজ ধর্ম, পৃ. ১৪১)।
এক রকম পাখী আছে যাহার লেজ সরীসৃপের মত। ইহা হইতে ধরিয়া লওয়া হয় যে, সরীসৃপ হইতেই পাখি সৃষ্টি হইয়াছে। ইহা অনুমান মাত্র। ডাকবিল (duckbell) দুগ্ধপায়ী জীব ও সরীসৃপের মত। তাই বলিয়া কি ধরিয়া লইতে হইবে যে, সরীসৃপ হইতেই উহার উদ্ভব ঘটিয়াছে (দ্র. অধ্যক্ষ আবুল কাসেম, বিজ্ঞান সমাজ ধর্ম, বিবর্তনবাদ ও আল্লাহ্র অস্তিত্ব, পৃ. ১৪১)?
জীব বিজ্ঞানের বিখ্যাত পণ্ডিত ডব্লিউ জে টিংকলও বিবর্তনবাদের প্রমাণ যে নির্ভরযোগ্য নহে তাহা স্বীকার করিয়াছেন এইভাবে : "ইতোমধ্যেই আমরা দেখিয়াছি, কীভাবে অবস্থান বিবেচনার চাইতে স্তর মধ্যকার ফসিল দেখিয়া মাটিস্তরের বয়স নির্ণয় করা হয়। আমাদের দুর্ভাগ্যই বলিতে হইবে যে, এই কারণে বর্তমান গবেষণার জন্য এই ভূ-তাত্ত্বিক রেকর্ডের মূল্য নেহায়েত কম। কেননা যদি মাটি স্তরের বয়স নির্ণয়ের জন্য ফসিল ব্যবহার করা হয় তবে আমরা অমনি উল্টা ঘুরিয়া বলিতে পারি না যে, মাটির স্তরের বয়স নির্ধারণ করা যাইবে। বিবর্তনবাদী ভূ-তাত্ত্বিক বিবর্তন তত্ত্বকে সত্য ও নির্ভুল ধরিয়া লইয়াই উহার ভিত্তিতে তথ্যের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাইয়া থাকেন যদ্দরুণ এই রকম বিবর্তনবাদীর পাওয়া তথ্য দিয়া প্রমাণ করা যায় না যে, সরল আকার হইতেই প্রাণী জগতের বিকাশ ঘটিয়াছে" (Fundamental of Zoology, P. 438)।
বির্তনবাদী পণ্ডিত দবজানিস্কি (Dobzhanski) একটি চমৎকার চিত্রকল্পের অবতারণা করিয়া অনুমান-নির্ভর বিবর্তনবাদের অবাস্তবতার প্রমাণ দিয়াছেন। তিনি বলেন : "কল্পনা করুন যে, এই বাক্সের মধ্যে ছাপার টাইপ লইয়া একটি বানর ঝাঁকি দিতেছে। ঘটনাক্রমে কি ঐ টাইপগুলি দান্তের 'ডিভাইন কমেডি' পুস্তকটি রচনা করিতে পারে? প্রথম দৃষ্টিতেই এই অসুবিধা, যাহা স্বয়ং ডারউইনকেও অপ্রতিভ করিয়া তুলিয়াছিল, জীববিজ্ঞানের ভিতরের ও বাহিরের বহু চিন্তাবিদের নিকট অগ্রহণযোগ্য প্রতিপন্ন হইয়াছে। ভান করিয়া লাভ নাই যে, (বানরের উদাহরণ দিয়া) সেই অসুবিধাটুকুর সন্তোষজনক সমাধান করা হইয়াছে।"
📄 ডারউইনের স্বীকারোক্তি
বিবর্তনবাদ তত্ত্ব যে একটা অনুমান-নির্ভর তত্ত্বমাত্র, প্রমাণিত সত্য নহে, স্বয়ং ডারউইন তাহা স্বীকার করিয়া গিয়াছেন। প্যারিস হইতে প্রকাশিত এস ডারনেট লিখিত “ইভ্যুলিউশন অব দি লিভিং ওয়ার্ল্ড” পুস্তকে তাঁহার স্বলিখিত একটি স্বীকারোক্তিপত্রের ফটোকপিও মুদ্রিত হইয়াছে, যাহার মূল কপি বৃটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রহিয়াছে বলিয়া লেখক তথ্য প্রকাশ করিয়াছেন (সূত্র এ ডি এম এস, ৩৭৭২৫ এফ ৬)।
১৮৬১ সালে টমাস হটন স্কয়ারকে লিখিত উক্ত পত্রে ডারউইন স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেন যে, বিবর্তনবাদের ব্যাখ্যায় সত্য সত্যই তিনি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়াছেন। অবশ্য উক্ত পত্রে ডারউইন ইহাও বলিয়াছেন, “তবে আমি নেচার্যাল সিলেকশন বা প্রকৃতির নির্বাচন তত্ত্বে বিশ্বাসী। যদিও এই থিওরী অনুযায়ী কোন প্রজাতি এ যাবৎ পরিবর্তিত হইয়া অন্য আরেকটি প্রজাতিতে পরিণত হইয়াছে এমন একটি প্রমাণও আমি দেখাইতে পারিব না, তথাপি আমি এই তত্ত্বে বিশ্বাস করি.....।”
উপরিউক্ত পত্রখানা উদ্ধৃত করিয়া ফরাসী বিজ্ঞানী মরিস বুকাইলী মন্তব্য করেন : “উপরিউক্ত পত্রের বক্তব্য থেকে একটা বিষয় সুস্পষ্ট। ডারউইন নেচারাল সিলেকশনের নামে যে থিওরীর কথা বলতেন তার দ্বারা একটি প্রজাতি পরিবর্তিত হয়ে পুরোপুরি অন্য একটা প্রাণীতে যে পরিণত হয় না, সে বিষয়ে তিনি সম্যক অবহিত ছিলেন। শুধু তাই নয়, নিজস্ব উদ্দেশ্যমূলক পর্যবেক্ষণের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসাবে যখন তিনি নেচারাল সিলেকশনের আনুমানিক প্রভাবের কথা বলতেন, তখনও তিনি গোটা বিষয়টাকে নিছক একটা থিওরী বা তত্ত্ব হিসাবেই উপস্থাপন করতে চাইতেন। অথচ সংজ্ঞা হিসাবেই থিওরী বা তত্ত্ব হচ্ছে নিছক একটা ধারণা বা হাইপোথিসিস মাত্র, তার বেশী কিছু নয়। এই ধরনের থিওরী বা তত্ত্ব সময়ে সময়ে বিভিন্ন ধরনের ঘটনার ব্যাখ্যায় সূত্র হিসাবে কাজ করে থাকে। মানবজ্ঞানের অগ্রযাত্রার একটা পর্যায় বা সময়কাল পর্যন্ত এ ধরনের কোন থিওরী উপযোগী বলে প্রতীয়মানও হইতে পারে। তবে কোন্ থিওরী কতটা সঠিক, তার প্রমাণ সাব্যস্ত হয় সময়ের ধারায়। সময়ের সেই বিচারে ডারউইন থিওরী যে সঠিক তত্ত্ব হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে সে কথা এখন আর বলা চলে না” (মানুষের আদি উৎস, পৃ. ৬৪)।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন পদার্থ বিজ্ঞানী অধ্যাপক আবুল কাসেম তদীয় আলোচনার উপসংহারে লিখেন : “উপরে যা বলা হয়, তাতে দেখা যাবে, বিশেষ সৃষ্টিতত্ত্বকে নস্যাৎ করবার শক্তি এখনও বিবর্তন তত্ত্ব পায়নি। বিশেষ সৃষ্টি তত্ত্বের সমর্থকরা বলেন, বিবর্তন যে হয় তা সত্য কিন্তু এটা হয় এক একটা প্রজাতির মধ্যে সীমাবদ্ধভাবে। এটা স্বীকার করে নিলে বিশেষ সৃষ্টিতত্ত্ব তথা আল্লাহ্ সৃষ্টিকে স্বীকার করে নেওয়া ছাড়া গতি থাকে না। বিবর্তন তত্ত্বে যে বহু অলৌকিকতার অস্তিত্ব রয়েছে তাও আজ বৈজ্ঞানিকদের দ্বারা স্বীকৃত হয়েছে। বৃটিশ জীববিজ্ঞানী ডগলাস ডিওয়ার বলেন, বিবর্তন তত্ত্ব অলৌকিকতার অবসান কামনা করেছিল সত্য, কিন্তু তার দ্বারা তা সম্ভব হয়নি। এটা বিশেষ সৃষ্টিতত্ত্বের অলৌকিকতাকে নতুনভাবে পরিবেশন করেছে মাত্র” (আবুল কাসেম, বিজ্ঞান সমাজ ধর্ম, পৃ. ১৪৩)।
ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্ব যতই সেকেলে ও অবান্তর হউক না কেন, এক শ্রেণীর লোক উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাহা আঁকড়াইয়া ধরিয়া আছে। এই কথাটি মরিস বুকাইলী ব্যক্ত করিয়াছেন এইভাবে : “দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এই ডারউইনবাদকে যতটা না জ্ঞান-বিজ্ঞানের সহায়ক হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তার চেয়ে অধিক মাত্রায় ব্যবহার করা হয়েছে আদর্শগত উদ্দেশ্য পূরণের নিমিত্ত হিসাবে। অধুনা আমরা বিবর্তনবাদের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনেক বেশী ওয়াকিফহাল। আর এটা সম্ভব হয়েছে জীবাশ্ম বিজ্ঞানসহ অপরাপর প্রকৃতি বিজ্ঞানের বহুবিধ সঠিক তথ্য ও প্রমাণ আবিস্কারের দরুন। শুধু তাই নয়, ডারউইনের পর থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত প্রাপ্ত বংশগতি (জেনেটিক) ও জীববিজ্ঞান (বিশেষত মলিকুলার বায়োলজি) সংক্রান্ত প্রচুর তথ্য জ্ঞান অর্জনে যে কারো পক্ষেই এখন একটা সহজ হয়ে পড়েছে। অথচ এখনও আমাদের কেউ কেউ শতাধিক বছর পূর্বেকার এই বিভ্রান্তিকর ডারউইন থিওরীকে নিয়েই বসে রয়েছে। শুধু তাই নয়, এখনো এই ডারউইন থিওরীর এমন সমর্থকও আছেন, যাহারা মনে করেন, এই থিওরী বাদ দেওয়া মানে তাদের আদর্শের পৃষ্ঠে ছুরিকাঘাত করা। সুতরাং ডারউইনের এই থিওরী আজকের যুগে যতই বাতিল বলে প্রমাণিত ও হাস্যকর বলে বর্জিত হোক না কেন, তারা যে কোন মূল্যেই যে তা আঁকড়ে ধরে থাকতে চাইবেন, সেটাই স্বাভাবিক” (মানুষের আদি উৎস, পৃ. ৬৪-৬৫)।
বিবর্তন সম্বন্ধে আধুনিক মতবাদ প্রসঙ্গে আলোচনা করিতে গিয়া অধ্যক্ষ আবুল কাসেম বৈজ্ঞানিক উদ্ধৃতিসহ যে মন্তব্য করিয়াছেন তাহা প্রণিধানযোগ্য। তিনি লিখেন: “জীবদেহের কার্যপ্রকৃতি মূলত যন্ত্রের কার্য প্রকৃতি থেকে পৃথক। জীব প্রকৃতি মেসিনের স্বরূপ দ্বারা ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। মনে হয় জীবন একটি মৌলিক সত্তা। অধিকন্তু ইহা সৃষ্টিশীল। ইহা জীবদেহের স্বরূপগুলিকে এমনভাবে তৈরি ও ব্যবহার করে যাতে তার উদ্দেশ্য ও স্বার্থ সিদ্ধ হয়। এই কারণে সৃষ্টিধর্মী বিবর্তনবাদের উদ্ভব হয়েছে। এই তত্ত্ব এমন একটি উদ্দেশ্যশীল শক্তি বা নীতির প্রমাণ দেয় যা জীবদেহ থেকে একটি আপাত দুর্জেয় উদ্দেশ্যের দিকে পরিচালিত করার তাগিদে ক্রমশ উন্নততর জীবনের বিকাশ সাধন করছে। অতীতে জীব বিজ্ঞান ডারউইন তত্ত্বকে অবলম্বন করে নাস্তিক্যবাদী ভাবের বিস্তার করেছিল। আধুনিক জীববিজ্ঞান আজ নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করেছে, জীবন বস্তুধর্মী যন্ত্র নয়, জীবন একটি মৌলিক ব্যাপার। অধিকন্তু এটা সৃষ্টিশীল ও উদ্দেশ্যশীল।
"আধুনিক দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা ভাবছেন বিবর্তন সত্য হলেও সেটা অন্ধভাবে ঘটছে না। এমন সুন্দর ও সুসমঞ্জস সৃষ্টি বিনা চিন্তায় বিনা পরিকল্পনায় সম্ভব নয়। প্রত্যেকটি বিবর্তন ধারার মধ্যে একটি মহামন master mind কাজ করছে। এই মহামনই প্রত্যেকটি বিবর্তনের ধারার মধ্য দিয়ে একটা উদ্দেশ্যের দিকে সৃষ্টিকে পরিচালিত করছে। সুতরাং জীববিজ্ঞান আজ একটি মহামনের দিকে একটি উদ্দেশ্যশীল সত্তার দিকে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে। অন্য কথায়, যে বিবর্তনবাদ নাস্তিকতার পোষক হিসাবে দেখা দিয়েছিল তারই আধুনিক রূপ আজ তাকে আস্তিকতার মাহাত্ম্যে উন্নত করে তুলে ধরছে” (বিজ্ঞান সমাজ ধর্ম, পৃ. ১৪৩-৪৪)।
আল-কুরআনে এই সত্যটিই ঘোষিত হইয়াছে মুমিনের দু'আরূপে:
رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذا بَاطِئًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ .
"হে আমাদের প্রতি পালক! এই সৃষ্টিজগত তুমি অনর্থক সৃষ্টি কর নাই। তুমি পবিত্র, আমাদেরকে দোযখের শাস্তি হইতে রক্ষা করিও” (৩: ১৯১)।
শেখ সাদী (র) সম্ভবত এই উপলব্ধি হইতেই বলিয়াছিলেন: "বৃক্ষপত্রে কিশলয় দেখে তারে সজাগ সুজন স্রষ্টার মহিমা কীর্তি প্রতিপত্রে রয়েছে লিখন।"
মহান স্রষ্টা আল্লাহ তা'আলা যে একটা মহান উদ্দেশ্যে আসমান-যমীন সৃষ্টি করিয়াছেন, কুরআন শরীফের বহু স্থানে উহার উল্লেখ রহিয়াছে। যেমন:
وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا بَاطِلًا ذَلِكَ ظَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا فَوَيْلٌ لِّلَّذِينَ كَفَرُوا مِنَ النَّارِ .
"আমি আকাশ, পৃথিবী এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী কোন কিছুই অনর্থক সৃষ্টি করি নাই। অনর্থক সৃষ্টি করার ধারণা তাহাদের যাহারা কাফির। সুতরাং কাফিরদের জন্য রহিয়াছে জাহান্নামের দুর্ভোগ" (৩৮:২৭)।
অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা এই সম্পর্কে বলেন,
وَمَا خَلَقْنَا السَّمَواتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَعِبِينَ. مَا خَلَقْنَهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ .
"আমি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং উহাদের মধ্যে কোন কিছুই ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করি নাই। আমি এই দুইটি অযথা সৃষ্টি করি নাই, কিন্তু উহাদের অধিকাংশই ইহা জানে না” (৪৪ : ৩৮-৩৯)।
বিবর্তনবাদের আলোচেক বৈজ্ঞানিকগণ যে সৃষ্টিতত্ত্বের আলোচনা-সমালোচনায় কুরআনের উক্ত সত্য উপলব্ধির পথে অগ্রসর হইতেছেন ইহা একটি শুভ লক্ষণ সন্দেহ নাই।