📄 দয়া প্রবণতা ও সন্তান বাৎসল্য
কুরআন শরীফে মানব ও জিন সৃষ্টির উদ্দেশ্য বলা হইয়াছে:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالانْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُون .
"আমি জিন জাতি ও মানব জাতিতে সৃষ্টি করিয়াছি এইজন্য যে, তাহারা আমার ইবাদত করিবে” (৫১: ৫৬)। এই আয়াতে আদম সৃষ্টির বিশেষ উদ্দেশ্য ব্যক্ত হইয়াছে। আদম দেহে আত্মা সঞ্চারের মুহূর্তে তিনি হাঁচির পর আলহামদু লিল্লাহ বলিলে আল্লাহ তা'আলা বলেন: “তোমার প্রতি তোমার প্রতিপালক রহমত বর্ষণ করুন হে আদম! দয়া-প্রবণতার জন্যই আমি তোমাকে সৃষ্টি করিয়াছি” (আরাইস, পৃ. ২৯)।
সেই মুহূর্তে তাঁহার এই চেতনার উদ্ভব হয় যে, উদ্বেলিত অনুতপ্ত অন্তরে স্রষ্টার দরবারে কাকুতি-মিনতি করিয়া ক্ষমা চাহিতে হইবে। আদম (আ)-এর মধ্যে ঐ মুহূর্তে ঐ চেতনাটিও অনেকটা সহজাতভাবে জাগিয়া উঠে। আল্লামা ছা'লাবীর উদ্ধৃত বর্ণনায় ঐ কথাটি ফুটিয়া উঠিয়াছে: "কোন কোন বর্ণনায় আছে, যখন আদমকে তাঁহার প্রভু বলিলেন, তোমার প্রতিপালক তোমার প্রতি রহমত বর্ষণ করুন হে আদম! আদম ঊর্ধ্ব দিকে হস্ত উত্তোলিত করিয়া উহা তাঁহার মস্তকে রাখিলেন এবং আহ্ উহ্ বলিয়া উঠিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: তোমার কী হইল হে আদম? তিনি বলিলেন, আমি তো ভুল করিয়া বসিয়াছি। আল্লাহ জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি তাহা কোথা হইতে জানিতে পারিলে? আদম বলিলেন, 'রহমত তো' কেবল অন্যায়কারী ও অপরাধীদের প্রতিই হইয়া থাকে। সেই দিন হইতে উহা তাঁহার সন্তানদের রীতিতে পরিণত হইয়া যায় যে, যখনই তাহাদের কাহারও উপর কোন আপদ-বিপদ আপতিত হয়, তখনই তাহারা মস্তকে হাত রাখিয়া আহ্ উহ্ করিয়া উঠে" (আরাইস, পৃ. ২৯)।
আদি মানব আদম (আ)-এর চরিত্রে এই মমত্ববোধ সেই সৃষ্টির আদিম প্রভাতেই মূর্ত হইয়া উঠিয়াছিল। রূহের জগতে (মতান্তরের আরাফাত প্রান্তরে) যখন তাঁহার সম্মুখে তাঁহার পুণ্যবান ও পাপী বান্দাদের আত্মাকে সৃষ্টি করিয়া তাঁহার ডানে-বামে উপস্থিত করা হয়, আর একটি অতি উজ্জ্বল আত্মার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিয়া তিনি জানিতে পারিলেন যে, উনি তাঁহারই এক ভাবী বংশধর দাউদ (আ), আর তাঁহার আয়ু মাত্রই ষাট বৎসর, তখন ঐ স্বল্পায়ু সন্তানটির জন্য তাঁহার অন্তরে দয়ার উদ্রেক হয়। তাঁহার নিজের জন্য নির্ধারিত আয়ু এক হাজার বৎসর জানিতে পারিয়া তিনি স্বেচ্ছায় চল্লিশটি বৎসর (বর্ণনান্তরে ষাট বৎসর) তাঁহার সেই ভাবী সন্তানকে দান করিয়া সৃষ্টির সূচনা লগ্নেই সন্তান বাৎসল্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন (দ্র. মুসনাদে আহমাদ, ১খ, ২৫২, ২৯৯; বায়হাকী, ১০খ, ১৪৬; ইব্ন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৪৬)।
📄 কুরবানী
কন্যা আকলিমার বিবাহ লইয়া কাবীল যখন জিদ ধরে তখন আদম (আ) আল্লাহ্র নির্দেশ মুতাবিক হাবীল ও কাবীল উভয়কেই আল্লাহর দরবারে কুরবানী পেশ করিবার নির্দেশ দান করেন, যাহা ইতোপূর্বেই আলোচিত হইয়াছে। উহা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, তাঁহার কাল হইতেই কুরবানী প্রথা চালু হয়।
📄 সন্তানদের প্রতি ওসিয়াত
মৃত্যুর পূর্বেই পুত্র-পরিজনের প্রতি প্রয়োজনীয় ওসিয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধানটিও আদম (আ)-এর যুগেই প্রবর্তিত হইয়াছিল। আদম (আ) তাঁহার ইনতিকালের পূর্বেই তাঁহার সন্তান-সন্ততিদের প্রতি তাঁহার পরবর্তী নবী শীছ (আ)-এর প্রতি অনুগত থাকিবার নির্দেশ দিয়া যান।
📄 সাক্ষী রাখা ও দলীল লিখনের বিধান
সূরা আ'রাফের আয়াত উদ্ধৃত করিয়া ইতোপূর্বে আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১খ, ৮৩-তে উদ্ধৃত হাদীছসহ আদম (আ)-এর পুত্র দাউদকে তাঁহার নিজ আয়ু হইতে ৪০ বৎসর দানের ঘটনা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হইয়াছে। আয়াতে আছে:
وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنْفُسِهِمْ .
"আল্লাহ তা'আলা তাহাদেরকেই তাহাদের নিজ সত্তা সম্পর্কে সাক্ষী রাখেন" (৭: ১৭২)।
তারপর' ঐ আয়াতের শেষভাগে স্পষ্টভাবে বলা আছে:
قَالُوا بَلَى شَهِدَنَا أَنْ تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيمَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَذَا غُفِلِينَ.
"তাহারা বলিল, হাঁ, অবশ্যই আমরা সাক্ষী রহিলাম। ইহা এইজন্য যে, তোমরা যেন কিয়ামতের দিন না বল, "আমরা তো এ বিষয়ে গাফিল ছিলাম" (৭ঃ ১৭২)।