📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বিবাহ ও দেনমোহর

📄 বিবাহ ও দেনমোহর


কোন কোন রিওয়ায়াতে আছে, হাওয়াকে সৃষ্টির পর আদম (আ) তাহার দিকে হস্ত প্রসারিত করিলে ফেরেশতাগণ বলিলেন, থামুন আদম, একটু থামুন। আদম (আ) বলিলেন, আবার থামিতে হইবে কেন? হাওয়াকে তো আল্লাহ তা'আলা আমার জন্যই সৃষ্টি করিয়াছেন। ফেরেশতাগণ বলিলেন, তাহার মোহরানা আদায়ের পরই কেবল তিনি আপনার জন্য বৈধ হইবেন। আদম (আ) জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহা কিভাবে আদায় করিতে হইবে। ফেরেশতাগণ বলিলেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের প্রতি তিনবার দুরূদ পাঠ করুন। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, মুহাম্মাদ কে? ফেরেশতাগণ তাঁহার পরিচয় দিলেন এইভাবে: আপনার সন্তানদের মধ্য হইতে তিনি হইতেছেন সর্বশেষ নবী, মুহাম্মাদের সৃষ্টি না হইলে আপনাকে সৃষ্টি করা হইত না (ছা'লাবী, আরাইস, পৃ. ৩১)।
বলা বাহুল্য, তিনি তখন তাঁহার সেই সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান আখেরী নবীর প্রতি দুরূদ পাঠ করিয়াই মোহরানা আদায় করেন। ইহার পর হাওয়াকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করিয়া তিনি দাম্পত্য জীবন শুরু করেন। এইভাবেই পৃথিবীতে সর্বপ্রথম দুরূদ উচ্চারিত হয় এবং মোহরানা আদায়ের মাধ্যমে বিবাহের সূচনা হয়। খুলাসাতুল আম্বিয়া (পৃ. ১৩) গ্রন্থে বলা হইয়াছে, আদম (আ)-এর সহিত হাওয়া (আ) বিবাহের মোহর ছিল মহান আল্লাহর প্রশংসা, তাসবীহ, তাহলীল, পবিত্রতা বর্ণনা ও কলেমা শাহাদাত।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা

📄 তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা


পৃথিবীতে অবতরণের পর আদম (আ) একটি হাঁচি দিলে তাঁহার নাক হইতে টাটকা রক্ত ঝরিতে লাগিল। মাটিতে সেই রক্ত গড়াইয়া পড়িলে উহা কয়লার মত কালো বর্ণ ধারণ করে। উহা দেখিয়া আদম ভীত-বিহ্বল হইয়া পড়েন। কেননা এরূপ দৃশ্য ইতোপূর্বে তিনি কখনও দেখেন নাই। জান্নাতের সুখস্মৃতি তাঁহার স্মৃতিপটে জাগরূক হইয়া উঠিল। তখন তিনি মূর্ছা গেলেন। একাদিক্রমে চল্লিশটি বৎসর তাঁহার ক্রন্দনে ক্রন্দনে অতিবাহিত হইল। উহার পর আল্লাহ একজন ফেরেশতাকে প্রেরণ করিলেন। তিনি আসিয়া আদম (আ)-এর পৃষ্ঠদেশে ও পেটে হাত বুলাইয়া উহা তাঁহার বক্ষের উপর রাখিলেন। ইহাতে আদমের ভীতি-বিহ্বলতা দূর হইল এবং তিনি অনেকটা স্বস্তি বোধ করিলেন。
'হযরত শাহর ইব্‌ন হাওশাব (রা) বলেন, আমার নিকট এই বিবরণ পৌছিয়াছে যে, পৃথিবীতে আগমনের পর আদম (আ) লজ্জায় তিন শত বৎসর পর্যন্ত মাথা উঠাইয়া তাকান নাই। ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, আদম-হাওয়া জান্নাতের নিয়ামতরাজি হারাইয়া দুই শত বৎসর পর্যন্ত কান্নাকাটি করিয়া কাটান। চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত তাঁহারা কোনরূপ পানাহার করেন নাই। আদম ও হাওয়া এক শত বৎসর পরস্পর মিলিত হন নাই। তারপর যখন আল্লাহ তদীয় বান্দা আদমের প্রতি দয়া করিতে মনস্থ করেন তখন তাঁহাকে কতিপয় কলেমা শিক্ষা দেন (ছা'লাবী, আরাইস, পৃ. ৩৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আদম (আ) কর্তৃক মসজিদ নির্মাণ, সালাত ও হজ্জ আদায়

📄 আদম (আ) কর্তৃক মসজিদ নির্মাণ, সালাত ও হজ্জ আদায়


মসজিদ নির্মাণ ও উহা আবাদ করা একটি অতীব পূণ্য কাজ। কুরআন শরীফের আয়াতে মসজিদ আবাদ করাকে প্রকৃত ঈমানদার এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত লোকদের কাজ বলিয়া (৯: ১৮) উল্লেখ করা হইয়াছে। হাদীছে আছে:
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسْجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلوةِ وَآتَى الزَّكوةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ فَعَسَى أُولَئِكَ أَنْ يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ .
"যে ব্যক্তি কোন মসজিদ নির্মাণ করিবে আল্লাহ তা'আলা তাহার জন্য বেহেশতে একটি ঘর নির্মাণ করিবেন।” এই পূণ্য কাজটিও সর্বপ্রথম আদি পিতা হযরত আদম (আ) স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে করিয়াছিলেন। অবশ্য কা'বার নির্মাণ সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা উল্লেখ আছে। আল-আযরাকী তদীয় 'আখবার মাক্কা' গ্রন্থে লিখেন: "ফেরেশতাগণ সর্বপ্রথম কা'বা নির্মাণ করেন। হযরত আদম (আ)-এর জন্ম তখনও হয় নাই"। এই উক্তির স্বপক্ষে তিনি হযরত যায়নুল 'আবিদীন (র) বর্ণিত একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করিয়াছেন। হযরত আব্বাস (রা) হইতেও অনুরূপ একটি বর্ণনা আছে।
আন্-নাওয়াবী তদীয় 'তাহযীবুল আসমা ওয়াল-লুগাত' গ্রন্থে খণ্ড পৃ. উল্লেখ করেন যে, ফেরেশতাগণই সর্বপ্রথম কা'বা নির্মাণ করিয়াছিলেন। তারপর হযরত আদম কা'বা নির্মাণ করেন। ইহার সমর্থনে আল-বায়হাকী দালাইলুন্-নুবুওয়া গ্রন্থে মারফু' হাদীছ পেশ করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আল্লাহ পাক জিবরাঈলকে হযরত আদম (আ) ও হাওয়া (আ)-এর নিকট প্রেরণ করিয়া কা'বা নির্মাণ করার আদেশ দেন। তাঁহারা আল্লাহ্র আদেশ পালনার্থেই কা'বা নির্মাণ করেন। নির্মাণ শেষে কা'বা তাওয়াফ করার নির্দেশও তিনি দিয়াছিলেন। অতঃপর বহুকাল অতিবাহিত হইবার পর হযরত নূহ (আ) কা'বায় হজ্জ পালন করেন।
আল-আযরাকী হইতে এরূপ আরেকটি মতও বর্ণিত হইয়াছে যে, হযরত আদম (আ) কা'বা নির্মাণ করেন এবং তিনি তাঁহার বক্তব্যের অনুকূলে দুইটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করেন। বিখ্যাত হাদীছবেত্তা আবদুর রায্যাক স্বীয় গ্রন্থ 'আল-মুসান্নাফ'-এ লিপিবদ্ধ করিয়াছেন যে, হযরত আদম (আ) পাঁচটি পাহাড়ের দ্বারা কা'বা নির্মাণ করেন। পাহাড়গুলি হইল লুবনান, তূরে যীতা, তূরে সায়না, আল-জুদী ও হিরা।
আল-মুহিব্ব আত-তাবারীর ভাষ্য মুতাবিক কা'বার ভিত্তি নির্মাণে হিরা পর্বতের পাথর ব্যবহার করা হয়। হযরত আদম (আ)-এর পর তদীয় পুত্র শীছ (আ) দ্বিতীয়বার কা'বা নির্মাণে অংশগ্রহণ করেন (শিফাউল গিরাম, ১খ, পৃ. ৯২-৯৩; দ্র. ইসলামী বিশ্বকোষ, সপ্তম খণ্ড, পৃ. ৩১, কাবা শরীফ শীর্ষক নিবন্ধ)।
সূরা আল ইমরানের আয়াতে (৯৬) বলা হইয়াছে: "নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যাহা মানবজাতির জন্য নির্ধারিত হইয়াছে, তাহাই হইতেছে ঐ ঘর যাহা মক্কায় অবস্থিত এবং সারা জাহানের মানুষের জন্য হিদায়াত ও বরকতময়।"
উহার তাফসীরের সারসংক্ষেপ বর্ণনা প্রসঙ্গে মুফতী মুহাম্মাদ শফী (র) বলেন, মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহটি আল্লাহ্র পক্ষ হইতে নির্ধারিত করা হয় তাহা ঐ গৃহ যাহা বাক্কা তথা মক্কায় অবস্থিত। অতএব কা'বা গৃহই বিশ্বের সর্বপ্রথম ইবাদতগৃহ। উহার অর্থ ইহাও হইতে পারে যে, বিশ্বের সর্বপ্রথম ঘরটি ইবাদতগৃহরূপে নির্মিত হইয়াছিল। ইহার পূর্বে পৃথিবীর বুকে না কোন ইবাদতগৃহের অস্তিত্ব ছিল, না কোন বাসগৃহের অস্তিত্ব ছিল। হযরত আদম (আ) ছিলেন আল্লাহ্র নবী। তাঁহার ব্যাপারে ইহা অকল্পনীয় নহে যে, আপন বাসগৃহ নির্মাণের পূর্বেই তিনি আল্লাহ্র ইবাদতের জন্য গৃহ নির্মাণকে অগ্রাধিকার দিবেন। এই কারণে হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা), মুজাহিদ, কাতাদা, সুদ্দী প্রমুখ সাহাবী ও তাবিঈর মতে, কা'বাই পৃথিবীর সর্বপ্রথম গৃহ। আবার ইহাও অসম্ভব নহে যে, মানুষের বসবাসের গৃহ পূর্বেই নির্মিত হইয়াছিল। কিন্তু ইবাদতের জন্য সর্বপ্রথম কা'বা গৃহই নির্মিত হইয়াছিল। এই শেষোক্ত অভিমতটি হযরত আলী (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে।
বায়হাকী বর্ণিত এক হাদীছে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: হযরত আদম ও বিবি হাওয়ার পৃথিবীতে আগমনের পর আল্লাহ তা'আলা জিবরাঈল (আ)-এর মাধ্যমে তাহাদেরকে কা'বা গৃহ নির্মাণের আদেশ দেন। গৃহ নির্মাণকার্য সম্পন্ন হইলে তাঁহাদেরকে উহার তাওয়াফ করার আদেশ দেওয়া হয় এবং বলা হয়, হে আদম! আপনিই পৃথিবী পৃষ্ঠে সর্বপ্রথম মানব এবং এই ঘরটিই পৃথিবীর সর্বপ্রথম ইবাদত গৃহ, যাহা মানবজাতির জন্য নির্ধারিত হইয়াছে (তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআন, ২খ, পৃ. ১১৪; ইব্‌ন কাছীরের বরাতে)। কোন কোন হাদীছের ভাষ্য হইতে প্রতীয়মান হয় যে, হযরত নূহ (আ)-এর যুগে সংঘটিত মহাপ্লাবন পর্যন্ত হযরত আদম (আ) নির্মিত এ কাবা গৃহখানা অক্ষত ছিল (দ্র. ঐ)।
বুখারী ও মুসলিম বর্ণিত আরো একখানা হাদীছে আছে যে, হযরত আবূ যার (রা) একদা হুযুর (স)-কে জিজ্ঞাসা করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পৃথিবীর সর্বপ্রথম মসজিদ কোনটি? হুযুর (স) বলিলেন: মসজিদুল হারাম (কা'বা গৃহ)। আবূ যার (রা) পুনরায় প্রশ্ন করেন, তারপর কোনটি? হুযুর (স) বলেন, বায়তুল মাকদিস। দুই মসজিদের নিমার্ণকালের ব্যবধান কত, এই মর্মে আবার প্রশ্ন করিলে তিনি জবাব দিলেন: চল্লিশ বৎসর (পূর্বোক্ত, পৃ. ২১৫)।
এই ব্যাপারে ছা'লাবীর বর্ণনাটি এইরূপ: "(আদম (আ)-এর তওবা ও ক্ষমা লাভের পর) আল্লাহ্ তা'আলা জান্নাত হইতে একটি ইয়াকৃত পাথর নাযিল করিলেন এবং উহা বায়তুল্লাহ তথা কা'বা শরীফের স্থানে রাখিয়া কা'বার স্থান নির্ধারণ করিয়া দিলেন। উহার দুইটি দরজা: পূর্বের দরজা এবং পশ্চিমের দরজা। ঐগুলিতে নূরের ফানুস স্থাপন করিলেন। তারপর আদম (আ)-এর প্রতি ওহীযোগে নির্দেশ দিলেন: আমার আরশের ঠিক নীচে আমার একটি ঘর রহিয়াছে। তুমি ঐখানে গিয়া উহা তাওয়াফ কর, যেমনটি তাওয়াফ করা হইয়া থাকে আমার আরশের চতুষ্পার্শ্বে এবং সেখানে সালাত আদায় কর যেমনটি আমার আরশের চতুষ্পার্শ্বে সালাত আদায় করা হইয়া থাকে। সেখানেই তোমার দু'আ কবুল হইবে।
সেইমতে আদম (আ) ভারতবর্ষ হইতে বায়তুল্লাহ যিয়ারতের জন্য মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার পথ প্রদর্শনের জন্য একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করিয়া দেন। ঐ যাত্রায় আদম (আ) যে সকল স্থানে পদার্পণ করিয়াছেন সেইগুলিতে জনপদ গড়িয়া উঠে আর যে সমস্ত স্থানে তাঁহার পদচিহ্ন পড়ে নাই সেগুলি অনাবাদ ও উষর ভূমিতে পরিণত হয়। তিনি যখন আরাফাত প্রান্তরে গিয়া উপনীত হন এবং অবস্থান করেন তখন হাওয়া আরাফাত দিবসে আরাফাত প্রান্তরে তাঁহার সঙ্গে মিলিত হন। সে দিন হইতে ঐ দিনটি আরাফাতের দিন এবং ঐ স্থানটি আরাফাত বলিয়া অভিহিত হয়। কেননা এ স্থানেই তাঁহাদের সাক্ষাত ও পুনর্মিলন হইয়াছিল। তারপর তাঁহারা উভয়ে মিনার দিকে যান। সেখানে আদম (আ-কে বলা হয়: তোমার যাহা চাহিবার তাহা চাহিয়া লও। তিনি বলিলেনঃ
اتمنى المغفرة الرحمة "আমি মাগফিরাত (ক্ষমা) ও রহমত কামনা করি।" এই منی বা কামনা করা শব্দ হইতে মিনা শব্দটির উৎপত্তি এবং ঐ দিন হইতেই ঐ স্থানটি 'মিনা' নামে পরিচিতি লাভ করে। রিওয়ায়াতে সুস্পষ্টভাবে উল্লিখিত আছে: তাঁহাদের গুনাহ মাফ হইল এবং তাঁহাদের তওবা কবুল করা হইল। সেখান হইতে তাঁহারা ভারতবর্ষে ফিরিয়া আসেন। মুজাহিদ (র) বলেন, তাহাদের গুনাহ মাফ করা বা তওবা কবুল করা হয়, অতঃপর তাঁহারা হিন্দ ভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেন। আদম (আ) ভারত ভূমি হইতে চল্লিশ বার পদব্রজে মক্কায় হজ্জ করিতে যান। তখন মুজাহিদকে প্রশ্ন করা হয়, হে আবুল হাজ্জাজ! তিনি বাহন ব্যবহার করিলেন না কেন? মুজাহিদ বলিলেন, কোন বাহনই বা তাঁহাকে বহন করিতে পারিত! তাঁহার এক একটি পদক্ষেপ তো তিন দিনের পথ ছিল?
হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন উমার (রা) বলেন, আদম (আ) যখন হজ্জ ও আনুষঙ্গিক সমস্ত অনুষ্ঠান পালন করিলেন তখন ফেরেশতাগণ তাঁহার হজ্জ ও তওবা কবুলের জন্য অভিনন্দিত করিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দয়া প্রবণতা ও সন্তান বাৎসল্য

📄 দয়া প্রবণতা ও সন্তান বাৎসল্য


কুরআন শরীফে মানব ও জিন সৃষ্টির উদ্দেশ্য বলা হইয়াছে:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالانْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُون .
"আমি জিন জাতি ও মানব জাতিতে সৃষ্টি করিয়াছি এইজন্য যে, তাহারা আমার ইবাদত করিবে” (৫১: ৫৬)। এই আয়াতে আদম সৃষ্টির বিশেষ উদ্দেশ্য ব্যক্ত হইয়াছে। আদম দেহে আত্মা সঞ্চারের মুহূর্তে তিনি হাঁচির পর আলহামদু লিল্লাহ বলিলে আল্লাহ তা'আলা বলেন: “তোমার প্রতি তোমার প্রতিপালক রহমত বর্ষণ করুন হে আদম! দয়া-প্রবণতার জন্যই আমি তোমাকে সৃষ্টি করিয়াছি” (আরাইস, পৃ. ২৯)।
সেই মুহূর্তে তাঁহার এই চেতনার উদ্ভব হয় যে, উদ্বেলিত অনুতপ্ত অন্তরে স্রষ্টার দরবারে কাকুতি-মিনতি করিয়া ক্ষমা চাহিতে হইবে। আদম (আ)-এর মধ্যে ঐ মুহূর্তে ঐ চেতনাটিও অনেকটা সহজাতভাবে জাগিয়া উঠে। আল্লামা ছা'লাবীর উদ্ধৃত বর্ণনায় ঐ কথাটি ফুটিয়া উঠিয়াছে: "কোন কোন বর্ণনায় আছে, যখন আদমকে তাঁহার প্রভু বলিলেন, তোমার প্রতিপালক তোমার প্রতি রহমত বর্ষণ করুন হে আদম! আদম ঊর্ধ্ব দিকে হস্ত উত্তোলিত করিয়া উহা তাঁহার মস্তকে রাখিলেন এবং আহ্ উহ্ বলিয়া উঠিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: তোমার কী হইল হে আদম? তিনি বলিলেন, আমি তো ভুল করিয়া বসিয়াছি। আল্লাহ জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি তাহা কোথা হইতে জানিতে পারিলে? আদম বলিলেন, 'রহমত তো' কেবল অন্যায়কারী ও অপরাধীদের প্রতিই হইয়া থাকে। সেই দিন হইতে উহা তাঁহার সন্তানদের রীতিতে পরিণত হইয়া যায় যে, যখনই তাহাদের কাহারও উপর কোন আপদ-বিপদ আপতিত হয়, তখনই তাহারা মস্তকে হাত রাখিয়া আহ্ উহ্ করিয়া উঠে" (আরাইস, পৃ. ২৯)।
আদি মানব আদম (আ)-এর চরিত্রে এই মমত্ববোধ সেই সৃষ্টির আদিম প্রভাতেই মূর্ত হইয়া উঠিয়াছিল। রূহের জগতে (মতান্তরের আরাফাত প্রান্তরে) যখন তাঁহার সম্মুখে তাঁহার পুণ্যবান ও পাপী বান্দাদের আত্মাকে সৃষ্টি করিয়া তাঁহার ডানে-বামে উপস্থিত করা হয়, আর একটি অতি উজ্জ্বল আত্মার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিয়া তিনি জানিতে পারিলেন যে, উনি তাঁহারই এক ভাবী বংশধর দাউদ (আ), আর তাঁহার আয়ু মাত্রই ষাট বৎসর, তখন ঐ স্বল্পায়ু সন্তানটির জন্য তাঁহার অন্তরে দয়ার উদ্রেক হয়। তাঁহার নিজের জন্য নির্ধারিত আয়ু এক হাজার বৎসর জানিতে পারিয়া তিনি স্বেচ্ছায় চল্লিশটি বৎসর (বর্ণনান্তরে ষাট বৎসর) তাঁহার সেই ভাবী সন্তানকে দান করিয়া সৃষ্টির সূচনা লগ্নেই সন্তান বাৎসল্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন (দ্র. মুসনাদে আহমাদ, ১খ, ২৫২, ২৯৯; বায়হাকী, ১০খ, ১৪৬; ইব্‌ন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৪৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00