📄 আদম (আ)-এর নবুওয়াত ও রিসালাত
নবী হিসাবে প্রত্যক্ষভাবে কুরআনুল করীমে আদম (আ)-এর উল্লেখ না থাকিলেও পরোক্ষভাবে তাঁহার উল্লেখ আছে।
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعُلَمِينَ .
"নিশ্চয়ই আল্লাহ্ আদমকে, নূহকে ও ইবরাহীমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরকে বিশ্বজগতে মনোনীত করিয়াছেন" (৩: ৩৩)।
উক্ত আয়াতে নবী ও রাসূলরূপে নূহ ও ইরাহীম (আ)-এর সহিত সমপর্যায়ে আদম (আ)-এর উল্লেখ করা হইয়াছে। আল্লামা শাব্বীর আহমাদ উছমানী বলেন, "আল্লাহ তা'আলার এই মনোনীতকরণ ও নির্বাচিতকরণ জনিত সম্মানদান, যাহাকে আমরা 'নবুওয়াত' অভিধায় অভিহিত করিয়া থাকি" (তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৬৯, পাদটীকা ৮)।
হযরত আবূ যার গিফারী (রা) বর্ণিত হাদীছে আছেঃ
قلت يا رسول الله أرأيت آدم نبيا كان قال نعم نبيا ورسولا يكلم الله قبيلا
"আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! নবীগণের মধ্যে সর্বপ্রথম নবী কে? তিনি বলিলেন, আদম (আ)। আমি আবার জিজ্ঞাসা করিলাম, তিনি কি নবী ছিলেন? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : হাঁ, নবী ছিলেন। তাঁহার সাথে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা কথা বলিয়াছেন” (আহমাদ, ৫খ, ১৬৬, ১৭৮, ১৭৯)।
উক্ত হাদীছখানা উদ্ধৃত করিয়া আবূ বকর জাবির আল-জাযাইরী লিখেন, উক্ত মরফু' হাদীছে আদম (আ)-কে আল্লাহ তা'আলার কালাম-ধন্য ও ওহীপ্রাপ্ত নবীরূপে বর্ণনা করা হইয়াছে (আবূ বকর আল-জাযাইয়ী, আকীদাতুল-মুমিন, পৃ. ২৬৬; মাকতাবাতুল কুল্লিয়াতিল আযহারিয়া, ১ম সং, কায়রো, ১৩৯৭ হি.)।
মুহাম্মাদ আলী আস-সাবৃনী এতসম্পর্কে আরও স্পষ্টভাবে লিখিয়াছেন: ইহা নিশ্চিত যে, আদম (আ) নবীগণের অন্তর্ভুক্ত। ইহা জমহুর উলামার সর্ববাদীসম্মত অভিমত। কোন আলেমই এই মতের বিরোধিতা করেন নাই। তবে তিনি রাসূল ছিলেন কিনা সে সম্পর্কে মতভেদ আছে। তাঁহার নবুওয়াত সম্পর্কে আল-কিতাব ও সুন্নাহতে বর্ণনা আসিয়াছে। তবে আল-কুরআনে উহার সুস্পষ্ট উল্লেখ নাই। তাই আদম (আ) সম্পর্কে ঠিক ঐভাবে নবুওয়াতের উল্লেখ করা হয় নাই যেমনটি অন্যদের ব্যাপারে, যেমন ইবরাহীম, ইসমাঈল, মূসা ও ঈসা (আ) প্রমুখ নবীগণের ব্যাপারে করা হইয়াছে। কিন্তু ইহা উল্লিখিত হইয়াছে যে, আল্লাহ তা'আলা প্রত্যক্ষভাবে তাঁহাকে সম্বোধন করিয়াছেন এবং ঐ সম্বোধনের মাধ্যমে তাঁহাকে শরীআত দান করিয়াছেন। তাহাতে তিনি তাঁহার প্রতি আদেশ করিয়াছেন, নিষেধ করিয়াছেন। তাঁহার জন্য অনেক কিছুকে হালাল এবং অনেক কিছুকে হারাম করিয়াছেন। তাঁহার প্রতি কোন রাসূল বা বাহক না পাঠাইয়া তিনি এই সমস্ত করিয়াছেন। উহাই তাঁহার নবুওয়াত বা তিনি নবী হওয়ার অর্থ, যেমনটি আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করিয়াছি (আন-নবুওয়াতু ওয়াল আম্বিয়া, পৃ. ১২৪-১২৫, ২য় সংস্করণ, মক্কা ১৪০০/১৯৮০)।
আলিমগণের অনেকেই তাঁহাকে 'রাসূল' বলিয়াছেন। তাঁহাদের মতে তিনি তদীয় সন্তান-সন্তুতি ও বংশধরগণের প্রতি প্রেরিত হইয়াছিলেন। অন্য আলিমগণ তাঁহাকে 'নবী' বলিয়া থাকেন। তাঁহাদের দলীল হইতেছে সহীহ মুসলিমের বর্ণিত শাফাআত সংক্রান্ত হাদীছ যাহাতে উল্লিখিত হইয়াছে, কিয়ামতে মহা পেরেশানীর দিনে ওষ্ঠাগতপ্রাণ হইয়া লোকজন নূহ (আ)-এর কাছে ছুটিয়া যাইবে এবং তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া বলিবেঃ "আপানিই পৃথিবী বক্ষে প্রেরিত প্রথম রাসূল"। আদম (আ) যদি রাসূলই হইতেন তাহা হইলে এরূপ বলা হইত না।
যাঁহারা তাঁহাকে রাসূল বলিয়া থাকেন তাঁহারা ইহার জবাব দেন এইভাবে, যে মহাপ্লাবনের পর মানবজাতির পৃথিবীতে নূতনভাবে পুনর্বাসনের পর তিনিই প্রথম রাসূল, উক্ত কথা দ্বারা সেদিকেই ইঙ্গিত করা হইয়াছে। এবম্বিধ যুক্তি প্রদর্শনের পর আল-জাযাইরী তাঁহার অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন এইভাবে: তবে তিনি যে রাসূল ছিলেন এই অভিমতই অগ্রগণ্য" (আকীদাতুল মুমিন, পৃ. ১২৫)। এ ব্যাপারে আরও দলীল নিম্নে উক্ত হইল:
(১) আল্লাহ তা'আলা আদম-হাওয়াকে পৃথিবীতে প্রেরণকালে বলিয়া দেন:
فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِنِّي هُدًى فَمَنْ تَبِعَ هُدَى فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ .
"পরে যখন আমার পক্ষ হইতে তোমাদের নিকট সৎপথের কোন নির্দেশ আসিবে, তখন যাহারা আমার সৎপথের নির্দেশ অনুসরণ করিবে তাহাদের কোন ভয় নাই এবং তাহারা দুঃখিতও হইবে না” (২ঃ ৩৮)।
উক্ত আয়াতে ىٰدُه বা নির্দেশনা প্রেরণের কথা বলিয়া আসলে তিনি যে নবুওয়াত বা রিসালাতের দায়িত্ব লাভ করিবেন সেই আশ্বাসই দেওয়া হইয়াছিল।
(২) অন্য আয়াতে সুস্পষ্টভাবে সেই কথাটিই বলা হইয়াছে এইভাবেঃ
وَعَصَى آدَمُ رَبَّهُ فَغَولى ثُمَّ اجْتَبَاهُ رَبُّهُ فَتَابَ عَلَيْهِ وَهَدَى .
"আদম তাহার প্রতিপালকের হুকুম অমান্য করিল, ফলে সে ভ্রমে পতিত হইল। ইহার পর তাহার প্রতিপালক তাহাকে মনোনীত করিলেন, তাহার তওবা কবুল করিলেন ও তাহাকে পথনির্দেশ করিলেন" (২০: ১২১-১২২)।
মুহাম্মাদ আলী সাবৃনীর ভাষায়: "এই মনোনীতকরণই ছিল তাঁহাকে নবুওয়াত ও রিসালাত দান করা (আন্-নুবুওয়াতু ওয়াল আম্বিয়া, পৃ. ১২৫)।
(৩) আবূ সাঈদ খুদরী (রা) বর্ণিত হাদীছে আছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: "কিয়ামতের দিন আমিই হইব আদম-সন্তানদের তথা সমস্ত মানবজাতির সর্দার। ইহা আমার অহংকার নহে। আমার হাতেই থাকিবে আল্লাহর প্রশস্তির পতাকা। ইহা আমার অহংকার নহে। সেদিন আদমসহ সকল নবীই আমার পতাকাতলে থাকিবেন” (মুসনাদে আহমাদ, ৩খ, পৃ. ২)।
ইবন মাজা এবং তিরমিযীও হাদীছটি রিওয়ায়াত করিয়াছেন এবং তিরমিযী ইহাকে রীতিমত 'হাসান-সহীহ' পর্যায়ের হাদীছ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন (মাহমূদ মুহাম্মাদ খাত্তাব সুবকী কৃত আদ-দীন আল-খালিস, ১খ, পৃ. ৭৪, ৪র্থ সং, কায়রো)।
তাবারীর বর্ণনায় সুস্পষ্টভাবে উল্লিখিত হইয়াছে: "আল্লাহ তা'আলা যখন আদমকে পৃথিবীর রাজত্ব দান করিলেন তখন তিনি তাঁহাকে নবুওয়াতও দান করেন এবং তাঁহাকে তাঁহার সন্তানদের প্রতি রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেন। তিনি তাঁহার প্রতি একুশখানা সহীফা (পুস্তিকা) অবতীর্ণ করেন। তিনি স্বহস্তে তাহা লিপিবদ্ধ করেন এবং জিব্রাঈল (আ) তাঁহাকে এগুলি শিক্ষা দান করেন" (দ্র. তাবারীর-তারীখ, ১খ, পৃ. ১৫০; আল-মুনতাসার, ১খ, পৃ. ২২১)।
নবী হিসাবে প্রত্যক্ষভাবে কুরআনুল করীমে আদম (আ)-এর উল্লেখ না থাকিলেও পরোক্ষভাবে তাঁহার উল্লেখ আছে।
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعُلَمِينَ .
"নিশ্চয়ই আল্লাহ্ আদমকে, নূহকে ও ইবরাহীমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরকে বিশ্বজগতে মনোনীত করিয়াছেন" (৩: ৩৩)।
উক্ত আয়াতে নবী ও রাসূলরূপে নূহ ও ইরাহীম (আ)-এর সহিত সমপর্যায়ে আদম (আ)-এর উল্লেখ করা হইয়াছে। আল্লামা শাব্বীর আহমাদ উছমানী বলেন, "আল্লাহ তা'আলার এই মনোনীতকরণ ও নির্বাচিতকরণ জনিত সম্মানদান, যাহাকে আমরা 'নবুওয়াত' অভিধায় অভিহিত করিয়া থাকি"।
হযরত আবূ যার গিফারী (রা) বর্ণিত হাদীছে আছেঃ
قلت يا رسول الله أرأيت آدم نبيا كان قال نعم نبيا ورسولا يكلم الله قبيلا
"আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! নবীগণের মধ্যে সর্বপ্রথম নবী কে? তিনি বলিলেন, আদম (আ)। আমি আবার জিজ্ঞাসা করিলাম, তিনি কি নবী ছিলেন? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : হাঁ, নবী ছিলেন। তাঁহার সাথে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা কথা বলিয়াছেন” (আহমাদ, ৫খ, ১৬৬, ১৭৮, ১৭৯)।
উক্ত হাদীছখানা উদ্ধৃত করিয়া আবূ বকর জাবির আল-জাযাইরী লিখেন, উক্ত মরফু' হাদীছে আদম (আ)-কে আল্লাহ তা'আলার কালাম-ধন্য ও ওহীপ্রাপ্ত নবীরূপে বর্ণনা করা হইয়াছে।
মুহাম্মাদ আলী আস-সাবৃনী এতসম্পর্কে আরও স্পষ্টভাবে লিখিয়াছেন: ইহা নিশ্চিত যে, আদম (আ) নবীগণের অন্তর্ভুক্ত। ইহা জমহুর উলামার সর্ববাদীসম্মত অভিমত। কোন আলেমই এই মতের বিরোধিতা করেন নাই। তবে তিনি রাসূল ছিলেন কিনা সে সম্পর্কে মতভেদ আছে। তাঁহার নবুওয়াত সম্পর্কে আল-কিতাব ও সুন্নাহতে বর্ণনা আসিয়াছে। তবে আল-কুরআনে উহার সুস্পষ্ট উল্লেখ নাই। তাই আদম (আ) সম্পর্কে ঠিক ঐভাবে নবুওয়াতের উল্লেখ করা হয় নাই যেমনটি অন্যদের ব্যাপারে, যেমন ইবরাহীম, ইসমাঈল, মূসা ও ঈসা (আ) প্রমুখ নবীগণের ব্যাপারে করা হইয়াছে। কিন্তু ইহা উল্লিখিত হইয়াছে যে, আল্লাহ তা'আলা প্রত্যক্ষভাবে তাঁহাকে সম্বোধন করিয়াছেন এবং ঐ সম্বোধনের মাধ্যমে তাঁহাকে শরীআত দান করিয়াছেন। তাহাতে তিনি তাঁহার প্রতি আদেশ করিয়াছেন, নিষেধ করিয়াছেন। তাঁহার জন্য অনেক কিছুকে হালাল এবং অনেক কিছুকে হারাম করিয়াছেন। তাঁহার প্রতি কোন রাসূল বা বাহক না পাঠাইয়া তিনি এই সমস্ত করিয়াছেন। উহাই তাঁহার নবুওয়াত বা তিনি নবী হওয়ার অর্থ, যেমনটি আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করিয়াছি।
আলিমগণের অনেকেই তাঁহাকে 'রাসূল' বলিয়াছেন। তাঁহাদের মতে তিনি তদীয় সন্তান-সন্তুতি ও বংশধরগণের প্রতি প্রেরিত হইয়াছিলেন। অন্য আলিমগণ তাঁহাকে 'নবী' বলিয়া থাকেন। তাঁহাদের দলীল হইতেছে সহীহ মুসলিমের বর্ণিত শাফাআত সংক্রান্ত হাদীছ যাহাতে উল্লিখিত হইয়াছে, কিয়ামতে মহা পেরেশানীর দিনে ওষ্ঠাগতপ্রাণ হইয়া লোকজন নূহ (আ)-এর কাছে ছুটিয়া যাইবে এবং তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া বলিবেঃ "আপানিই পৃথিবী বক্ষে প্রেরিত প্রথম রাসূল"। আদম (আ) যদি রাসূলই হইতেন তাহা হইলে এরূপ বলা হইত না।
যাঁহারা তাঁহাকে রাসূল বলিয়া থাকেন তাঁহারা ইহার জবাব দেন এইভাবে, যে মহাপ্লাবনের পর মানবজাতির পৃথিবীতে নূতনভাবে পুনর্বাসনের পর তিনিই প্রথম রাসূল, উক্ত কথা দ্বারা সেদিকেই ইঙ্গিত করা হইয়াছে। এবম্বিধ যুক্তি প্রদর্শনের পর আল-জাযাইরী তাঁহার অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন এইভাবে: তবে তিনি যে রাসূল ছিলেন এই অভিমতই অগ্রগণ্য"। এ ব্যাপারে আরও দলীল নিম্নে উক্ত হইল:
(১) আল্লাহ তা'আলা আদম-হাওয়াকে পৃথিবীতে প্রেরণকালে বলিয়া দেন:
فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِنِّي هُدًى فَمَنْ تَبِعَ هُدَى فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ .
"পরে যখন আমার পক্ষ হইতে তোমাদের নিকট সৎপথের কোন নির্দেশ আসিবে, তখন যাহারা আমার সৎপথের নির্দেশ অনুসরণ করিবে তাহাদের কোন ভয় নাই এবং তাহারা দুঃখিতও হইবে না” (২ঃ ৩৮)।
উক্ত আয়াতে ىٰدُه বা নির্দেশনা প্রেরণের কথা বলিয়া আসলে তিনি যে নবুওয়াত বা রিসালাতের দায়িত্ব লাভ করিবেন সেই আশ্বাসই দেওয়া হইয়াছিল।
(২) অন্য আয়াতে সুস্পষ্টভাবে সেই কথাটিই বলা হইয়াছে এইভাবেঃ
وَعَصَى آدَمُ رَبَّهُ فَغَولى ثُمَّ اجْتَبَاهُ رَبُّهُ فَتَابَ عَلَيْهِ وَهَدَى .
"আদম তাহার প্রতিপালকের হুকুম অমান্য করিল, ফলে সে ভ্রমে পতিত হইল। ইহার পর তাহার প্রতিপালক তাহাকে মনোনীত করিলেন, তাহার তওবা কবুল করিলেন ও তাহাকে পথনির্দেশ করিলেন" (২০: ১২১-১২২)।
মুহাম্মাদ আলী সাবৃনীর ভাষায়: "এই মনোনীতকরণই ছিল তাঁহাকে নবুওয়াত ও রিসালাত দান করা।
(৩) আবূ সাঈদ খুদরী (রা) বর্ণিত হাদীছে আছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: "কিয়ামতের দিন আমিই হইব আদম-সন্তানদের তথা সমস্ত মানবজাতির সর্দার। ইহা আমার অহংকার নহে। আমার হাতেই থাকিবে আল্লাহর প্রশস্তির পতাকা। ইহা আমার অহংকার নহে। সেদিন আদমসহ সকল নবীই আমার পতাকাতলে থাকিবেন”।
ইবন মাজা এবং তিরমিযীও হাদীছটি রিওয়ায়াত করিয়াছেন এবং তিরমিযী ইহাকে রীতিমত 'হাসান-সহীহ' পর্যায়ের হাদীছ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন।
তাবারীর বর্ণনায় সুস্পষ্টভাবে উল্লিখিত হইয়াছে: "আল্লাহ তা'আলা যখন আদমকে পৃথিবীর রাজত্ব দান করিলেন তখন তিনি তাঁহাকে নবুওয়াতও দান করেন এবং তাঁহাকে তাঁহার সন্তানদের প্রতি রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেন। তিনি তাঁহার প্রতি একুশখানা সহীফা (পুস্তিকা) অবতীর্ণ করেন। তিনি স্বহস্তে তাহা লিপিবদ্ধ করেন এবং জিব্রাঈল (আ) তাঁহাকে এগুলি শিক্ষা দান করেন"।
📄 আদম (আ)-এর শরীআত ও আমল
সভ্যতার আদি যুগে আদম (আ)-এর সহীফাগুলি তো বটেই, পূর্ববর্তী যুগের তাবৎ নবী-রাসূলগণের প্রতি নাযিলকৃত আসমানী কিতাব ও সহীফাগুলি বিকৃতি, বিস্মৃতি ও বিলুপ্তির শিকার হইয়াছে। সায়্যিদ সুলায়মান নদভীর ভাষায়: "এ কথা আমরাও মানি, যুগে যুগে পয়গাম্বরগণের মাধ্যমে আল্লাহ্ পয়গাম দুনিয়ায় এসেছে, কিন্তু আমরা বারবার বলেছি এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর আলোকে প্রমাণ করেও দেখিয়েছি যে, বিশেষ বিশেষ যুগ বা বিশেষ বিশেষ দেশের জন্যই তাঁদের আবির্ভাব ঘটেছিল। তাঁরা ছিলেন সাময়িক প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে সাময়িক পয়গাম্বর। আর এজন্যই তাঁদের পয়গামসমূহ চিরদিনের জন্য সুসংরক্ষণের ইন্তেজাম হয়ে উঠেনি, ছিন্ন হয়ে গেছে এগুলোর মূল সূত্র" (নবী চিরন্তন, অনুবাদ আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী, ২য় সং, বুক সোসাইটি, ঢাকা ১৯৭৯ খৃ.)।
বলা বাহুল্য, উপরিউক্ত বক্তব্যটি আদি মানব এবং সর্বপ্রথম নবী আদম (আ) এবং তাঁহার শরী'আত ও সহীফাগুলির ব্যাপারে সর্বাধিক প্রযোজ্য। তাই তাঁহার শরী'আতের কাঠামো কী ছিল বা তাঁহার ইবাদাত ও 'আমলের নমুনা কী ছিল তাহা সুনির্দিষ্টভাবে বলা এক সুকঠিন ব্যাপার। তবে এতদসংক্রান্ত রিওয়ায়াতসমূহ হইতে ইহার কিছু কিছু আঁচ করা যায়।
কুরআন শরীফে যেমন নবী-রাসূলগণের সকলের নাম উল্লিখিত হয় নাই, তেমনি কোন্ কোন্ রাসূল বা নবীর প্রতি কোন্ কোন্ কিতাব অবতীর্ণ করা হইয়াছে তাহারও বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয় নাই এবং ইজমালীভাবে বলা হইয়াছে :
لَقَدْ اَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَتِ وَاَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتٰبَ وَالْمِيْزَانَ لِيَقُوْمَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ .
"নিশ্চয় আমি আমার রাসূলগণকে প্রেরণ করিয়াছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাহাদের সঙ্গে দিয়াছি কিতাব ও ন্যায়নীতি, যাহাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে" (৫৭ঃ ২৫)।
'শরহ উমদা'-এর বরাতে মওলানা আবদুল হক হক্কানী দেহলবী (র) লিখেন: মোট আসমানী কিতাবের সংখ্যা ১০৪। তন্মধ্যে ছোট ছোট ৫০টি হযরত শীছ (আ), ৩০টি হযরত ইদরীস (আ), ১০টি হযরত ইবরাহীম (আ) এবং ১০টি হযরত আদম (আ)-এর প্রতি অবতীর্ণ হইয়াছে। আর প্রধান প্রধান চারিখানা চারিজন নবীর প্রতি নাযিল হইয়াছে" (ইসলামী আকীদা, পৃ. ৯৭, অনুবাদ: মওলানা আবদুস সুবহান, ইফা প্রকাশিত, ১ম সং, ১৯৮১)।
সভ্যতার আদি যুগে আদম (আ)-এর সহীফাগুলি তো বটেই, পূর্ববর্তী যুগের তাবৎ নবী-রাসূলগণের প্রতি নাযিলকৃত আসমানী কিতাব ও সহীফাগুলি বিকৃতি, বিস্মৃতি ও বিলুপ্তির শিকার হইয়াছে। সায়্যিদ সুলায়মান নদভীর ভাষায়: "এ কথা আমরাও মানি, যুগে যুগে পয়গাম্বরগণের মাধ্যমে আল্লাহ্ পয়গাম দুনিয়ায় এসেছে, কিন্তু আমরা বারবার বলেছি এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর আলোকে প্রমাণ করেও দেখিয়েছি যে, বিশেষ বিশেষ যুগ বা বিশেষ বিশেষ দেশের জন্যই তাঁদের আবির্ভাব ঘটেছিল। তাঁরা ছিলেন সাময়িক প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে সাময়িক পয়গাম্বর। আর এজন্যই তাঁদের পয়গামসমূহ চিরদিনের জন্য সুসংরক্ষণের ইন্তেজাম হয়ে উঠেনি, ছিন্ন হয়ে গেছে এগুলোর মূল সূত্র"।
বলা বাহুল্য, উপরিউক্ত বক্তব্যটি আদি মানব এবং সর্বপ্রথম নবী আদম (আ) এবং তাঁহার শরী'আত ও সহীফাগুলির ব্যাপারে সর্বাধিক প্রযোজ্য। তাই তাঁহার শরী'আতের কাঠামো কী ছিল বা তাঁহার ইবাদাত ও 'আমলের নমুনা কী ছিল তাহা সুনির্দিষ্টভাবে বলা এক সুকঠিন ব্যাপার। তবে এতদসংক্রান্ত রিওয়ায়াতসমূহ হইতে ইহার কিছু কিছু আঁচ করা যায়।
কুরআন শরীফে যেমন নবী-রাসূলগণের সকলের নাম উল্লিখিত হয় নাই, তেমনি কোন্ কোন্ রাসূল বা নবীর প্রতি কোন্ কোন্ কিতাব অবতীর্ণ করা হইয়াছে তাহারও বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয় নাই এবং ইজমালীভাবে বলা হইয়াছে :
لَقَدْ اَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَتِ وَاَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتٰبَ وَالْمِيْزَانَ لِيَقُوْمَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ .
"নিশ্চয় আমি আমার রাসূলগণকে প্রেরণ করিয়াছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাহাদের সঙ্গে দিয়াছি কিতাব ও ন্যায়নীতি, যাহাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে" (৫৭ঃ ২৫)।
'শরহ উমদা'-এর বরাতে মওলানা আবদুল হক হক্কানী দেহলবী (র) লিখেন: মোট আসমানী কিতাবের সংখ্যা ১০৪। তন্মধ্যে ছোট ছোট ৫০টি হযরত শীছ (আ), ৩০টি হযরত ইদরীস (আ), ১০টি হযরত ইবরাহীম (আ) এবং ১০টি হযরত আদম (আ)-এর প্রতি অবতীর্ণ হইয়াছে। আর প্রধান প্রধান চারিখানা চারিজন নবীর প্রতি নাযিল হইয়াছে"।
📄 হাম্দ ও সালাম
আল্লামা ইব্ন কাছীর সহীহ ইব্ন হিব্বান হইতে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত একখানা হাদীছ উদ্ধৃত করিয়াছেন: "রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আল্লাহ যখন আদমকে সৃষ্টি করেন এবং তাঁহার মধ্যে রূহ ফুঁকিলেন তখন তিনি হাঁচি দিয়া উঠিলেন এবং বলিলেন: আলহামদু লিল্লাহ্ (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্)। তিনি তাঁহার আদেশক্রমেই হাহমদ বা আল্লাহ্র প্রশংসা করিলেন। তখন তাঁহার প্রতিপালক তাঁহার উদ্দেশে বলিলেন, তোমার প্রতিপালক তোমার প্রতি সদয় হউন হে আদম! ঐ পাশে উপবিষ্ট ফেরেশতামণ্ডলীর দিকে যাও এবং তাহাদেরকে সালাম দাও। তখন তিনি গিয়া তাহাদেরকে সালাম দিলেন। তিনি বলিলেন: আস্সালামু 'আলায়কুম। তাহারা বলিলেন: ওয়া 'আলায়কুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি। তারপর তিনি তাঁহার প্রতিপালকের নিকট ফিরিয়া গেলেন। তখন তিনি বলিলেন; ইহাই তোমার ও তোমার সন্তানদের মধ্যকার সম্ভাষণ" (কাসাসুল আম্বিয়া, ইবন কাছীর, পৃ. ৪৪ ও আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া)। বুখারীর রিওয়ায়াতেও অনুরূপ বক্তব্য রহিয়াছে।
উক্ত বর্ণনার দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হইল যে, সৃষ্টির প্রথম প্রভাতে আদম (আ)-এর সর্বপ্রথম ইবাদতটি ছিল 'আলহামদু লিল্লাহ' বলিয়া সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলার দরবারে হাম্দ বা স্তুতিবাদ।
আল্লামা ছা'লাবীর ভাষায়: 'হাঁচি দেওয়া শেষ হইতে না হইতেই আদমের রূহ তাঁহার মুখ ও রসনায় সঞ্চারিত হইল এবং আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে শিক্ষা দিলেন যেন তিনি বলেন, আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল 'আলামীন। সুতরাং উহাই ছিল তাঁহার মুখ নিঃসৃত সর্বপ্রথম বাণী' (আরাইস, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ২৯)।
পৃথিবী ব্যাপী মুসলমানদের মধ্যে বহুল প্রচলিত সালাম ও তাহার জবাব দানের শিষ্টাচার পূর্ণ বিধানটিও যে সৃষ্টির সূচনালগ্ন হইতেই চলিয়া আসিতেছে উপরিক্ত বর্ণনা দ্বারা তাহাও নিশ্চিতভাবে জানা গেল।
📄 বিবাহ ও দেনমোহর
কোন কোন রিওয়ায়াতে আছে, হাওয়াকে সৃষ্টির পর আদম (আ) তাহার দিকে হস্ত প্রসারিত করিলে ফেরেশতাগণ বলিলেন, থামুন আদম, একটু থামুন। আদম (আ) বলিলেন, আবার থামিতে হইবে কেন? হাওয়াকে তো আল্লাহ তা'আলা আমার জন্যই সৃষ্টি করিয়াছেন। ফেরেশতাগণ বলিলেন, তাহার মোহরানা আদায়ের পরই কেবল তিনি আপনার জন্য বৈধ হইবেন। আদম (আ) জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহা কিভাবে আদায় করিতে হইবে। ফেরেশতাগণ বলিলেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের প্রতি তিনবার দুরূদ পাঠ করুন। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, মুহাম্মাদ কে? ফেরেশতাগণ তাঁহার পরিচয় দিলেন এইভাবে: আপনার সন্তানদের মধ্য হইতে তিনি হইতেছেন সর্বশেষ নবী, মুহাম্মাদের সৃষ্টি না হইলে আপনাকে সৃষ্টি করা হইত না (ছা'লাবী, আরাইস, পৃ. ৩১)।
বলা বাহুল্য, তিনি তখন তাঁহার সেই সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান আখেরী নবীর প্রতি দুরূদ পাঠ করিয়াই মোহরানা আদায় করেন। ইহার পর হাওয়াকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করিয়া তিনি দাম্পত্য জীবন শুরু করেন। এইভাবেই পৃথিবীতে সর্বপ্রথম দুরূদ উচ্চারিত হয় এবং মোহরানা আদায়ের মাধ্যমে বিবাহের সূচনা হয়। খুলাসাতুল আম্বিয়া (পৃ. ১৩) গ্রন্থে বলা হইয়াছে, আদম (আ)-এর সহিত হাওয়া (আ) বিবাহের মোহর ছিল মহান আল্লাহর প্রশংসা, তাসবীহ, তাহলীল, পবিত্রতা বর্ণনা ও কলেমা শাহাদাত।