📄 হাবীল-কাবীলের মনোমালিন্যের কারণ
কুরআন মাজীদে আদমের দুই পুত্রের বিবরণ বর্ণনা প্রসঙ্গে তাহাদের এক ভাই অপর ভাইকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে বলিয়া বিবৃত হইয়াছে। কিন্তু ঐ পুত্রদ্বয়ের নাম উল্লেখ করা হয় নাই। এমনিভাবে কোন কোন হাদীছে ও (উদাহরণস্বরূপ দ্র. আহমাদ ইবন হাম্বাল, মুসনাদ, আত-তাবারী, তাফসীর, কায়রো সং, ১০খ, ২৩০; রিওয়ায়াত ১১৭৬৭-১১৭৬৯) 'ইবনায় আদাম' বা আদমের পুত্রদ্বয় শব্দই ব্যবহৃত হইয়াছে। এতদসত্ত্বেও মুফাস্স্সিরগণ ইহা দ্বারা হযরত আদম আলায়হিস সালামের দুই পুত্র হাবীল (নিহত) এবং কাবীল (হন্তা)-কেই বুঝান হইয়াছে বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। খুব সম্ভব এই ব্যাপারে মুফাস্সিসরগণের তথ্যসূত্র হইল ইসরাঈলী রিওয়ায়াত, বিশেষত তাওরাত (দ্র. বাইবেলের আদিপুস্তক, ৪: ১০-১৬ প্রভৃতি)। সেখানে তাহাদের নাম হাবীল ও কাবীল বলিয়া উল্লেখিত হইয়াছে (দ্র. আদিপুস্তক, ৪: ১-১৬)। উহাকেই 'আরবীকরণের সময়ে হাবীল ও কাবীলরূপে উল্লেখ করা হইয়াছে। এই তথ্যের উপর ভিত্তি করিয়াই আত-তাবারী তাঁহার ইতিহাস গ্রন্থে প্রত্যেক জায়গায়ই কাবীলকে কাইনরূপেই উল্লেখ করিয়াছেন (আত-তাবারী, তারীখ, নির্ঘণ্ট)। কোন কোন মুফাস্সির (যথা হাসান ও দাহহাক প্রমুখ) ابنی ادم কথাটি ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করিয়া উহা দ্বারা বানু ইসরাঈল-এর ঘটনা বুঝানো হইয়াছে বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন (দ্র. আত-তাবারী, তাফসীর, গবেষণা সম্পা. মাহমূদ শাকির, কায়রো, ১০খ, ২২০, রিওয়ায়াত ১১৭২১; আর-রাযী, তাফসীর কাবীর, কায়রো ১৩১৮ হি, ৩খ, ৪০২; আল-আলুসী, রূহুল মা'আনী, ৬খ, ১১১)। কিন্তু সাহাবী, তাবিঈ ও মাফাস্সিরগণের অধিকাংশের মত হইল, উক্ত কথাটি দ্বারা হযরত আদম (আ)-এর ঔরসজাত দুই পুত্রকেই বুঝানো হইয়াছে (দ্র. আত-তাবারী, ১০খ, ২২০)। স্বয়ং কুরআন-হাদীছের কিছু বর্ণনা (কাক প্রেরণ করা প্রভৃতি) দ্বারা ইহার সমর্থন পাওয়া যায় (প্রাগুক্ত বরাত)।
কুরবানীর কারণ সম্পর্কেও মতভেদ রহিয়াছে। স্বয়ং কুরআন মাজীদে এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করা হয় নাই, বরং إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا "উভয়ে যখন নিজ নিজ কুরবানী পেশ করিয়াছিল" (৫: ৮২)-এর দ্বারা বাক্য শুরু করা হইয়াছে। ইহাতে বুঝা যায় যে, উভয়ের মধ্যে কুরবানী কবুল হওয়া ও না হওয়ার ব্যাপারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। আত-তাবারী বিভিন্ন সাহাবী (রা) ও তাবিঈ (র) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, এই কুরবানী তাহারা স্বেছায় অথবা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশের আওতাধীনে করিয়াছিলেন (আত-তাবারী, ১০খ, পৃ. ২০৩-এর বরাতে ইসলামী বিশ্বকোষ, ২৫খ, পৃ. ২৩৬)। মওলানা হিফযুর রহমানও কুরআনে তাহাদের বিবাহ কাহিনীর কোন উল্লেখ না থাকার কথাটা উল্লেখ করিয়া উক্ত ভ্রাতৃদ্বয়ের মনোমালিন্যের কারণ যে বিবাহ না হইয়া কেবল কুরবানী কবুল হওয়া না হওয়া জনিত মনোমালিন্যও হইতে পারে সে দিকেই প্রকারান্তরে ইঙ্গিত করিয়াছেন (দ্র. কাসাসুল কুরআন, বঙ্গানুবাদ, ১খ, ৫৬)।
📄 কাবীল কর্তৃক ভাইকে হত্যা
কাবীলের মনে ভ্রাতৃ-হত্যার জন্য জিঘাংসাভাব জাগিয়াছিল সত্য, কিন্তু ইতোপূর্বে হত্যাকর্ম তো পৃথিবীতে আর কোন দিন ঘটে নাই। তাই হত্যার প্রক্রিয়াও তাহার জানা ছিল না। কীভাবে তাহার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করিবে এইজন্য তাহার চিন্তার অবধি ছিল না। এমতাবস্থায় ইবলীস উপস্থিত হইল। মুহূর্তে সে একটি মানুষের রূপ ধারণ করিয়া কাবীলের সম্মুখ দিয়া ধীরে ধীরে হাঁটিতে লাগিল এবং কাবীলের দৃষ্টির অগোচরে একটি কৃত্রিম সাপ বানাইয়া পথের উপর ছাড়িয়া দিল। সাপটি ধীরে ধীরে মানবরূপী ইবলীসের দিকে অগ্রসর হইতেছিল। অমনি সে যমিন হইতে বৃহৎ একখণ্ড পাথর উঠাইয়া সর্পের মস্তক লক্ষ্য করিয়া সজোরে নিক্ষেপ করিল। পাথরের আঘাতে তৎক্ষণাৎ সর্পটি মারা গেল। ইহা কাবীলের চোখের সম্মুখেই ঘটিল। ইব্ন জুরায়জের বর্ণনায় সাপের স্থলে পাখির কথা উল্লেখ রহিয়াছে (তাফসীর মাযহারী, ৩খ, পৃ. ৮১)।
কাবীলের সমস্যা দূরীভূত হইয়া গেল। হত্যা করিবার উপায় সে শিখিয়া ফেলিল। সুতরাং আর কাল বিলম্ব না করিয়া সে নিজেও বৃহদাকার পাথর হাতে লইয়া ঘুমন্ত হাবীলের মস্তক লক্ষ্য করিয়া সজোরে নিক্ষেপ করিল। সঙ্গে সঙ্গে হাবীলের মৃত্যু ঘটিল। কাসাসুল আম্বিয়ার বর্ণনামতে, এই ঘটনাটি ঘটে হযরত আদম (আ)-এর মক্কা শরীফে হজ্জ করিতে যাওয়াকালীন অনুপস্থিতির সুযোগে। কিন্তু ইন্ন কাছীর (র)-এর বর্ণনায় উহা ঘটে হযরত আদম (আ)-এর আপন বাড়িতে উপস্থিত থাকাকালে। তাঁহার বর্ণনায় সুস্পষ্টভাবে উল্লিখিত আছে: "একদা রাত্রিবেলা যখন হাবীলের চারণভূমি হইতে ফিরিতে বিলম্ব হইতেছিল, তখন চিন্তিত পিতা আদম (আ) কি কারণে বিলম্ব হইতেছে তাহা দেখিবার জন্য কাবীলকে চারণভূমিতে পাঠাইলেন” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৮৬; কাসাসুল আম্বিয়া, আরবী, ইন্ন কাছীর, পৃ. ৫৩)।
সেমতে কাবীল চারণভূমিতে গিয়া উপস্থিত হইল। তখন সত্য সত্যই হাবীল সেখানেই ছিলেন। কাবীল তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, তোমার কুরবানী কবুল হইল, আমারটা হইল না।
জবাবে হাবীল বলিলেন, إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِين
"আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের পক্ষ হইতেই কবুল করিয়া থাকেন।"
তিনি এই বাক্যের দ্বারা বুঝাইতে চাহিয়াছেন যে, তাকওয়া হইতেছে কবুলিয়তের পূর্বশর্ত। তুমি যদি তাকওয়া অবলম্বন করিয়া কবুলিয়তের সেই পূর্বশর্ত পূরণ করিতে ব্যর্থ হও, তবে তাহাতে আমার অপরাধ কি? কাবীলের কাছে উহার কোন সদুত্তর ছিল না। এইজন্য লজ্জিত হওয়ার পরিবর্তে তাহার ক্রোধ ও জিঘাংসাই বৃদ্ধি পায় এবং হস্তস্থিত একটি লৌহদণ্ড দ্বারা আঘাত করিয়া তাঁহার প্রাণ সংহার করে।
ইন্ন কাছীর (র)-এর বাকভঙ্গি হইতে প্রতীয়মান হয় যে, উহা সর্ববাদীসম্মত মত নহে। তাই তিনি আরও লিখেন, কাহারও কাহারও মতে সে তাহার দিকে একটি প্রস্তরখণ্ড নিক্ষেপ করে যাহা তাহার মস্তিষ্কে পতিত হইয়া তাহা চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া ফেলে। তখন হাবীল নিদ্রিত অবস্থায় ছিলেন। আবার কেহ কেহ বলিয়াছেন, বরং সে তাহাকে সজোরে গলা চাপিয়া ধরিয়া শ্বাসরুদ্ধ করে এবং তারপর হিংস্র প্রাণীদের মত কামড়াইয়া তাঁহার দেহকে ক্ষতবিক্ষত করিয়া ফেলে। এইভাবে হাবীলের মৃত্যু হয়। আল্লাহই সম্যক অবগত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৮৬)।
দামিশকের উত্তরে অবস্থিত কাসিউন পাহাড়ের চূড়ায় একটি গুহাকে রক্ত গুহা বলিয়া অভিহিত করা হইত। বর্তমানে ইহা "আরবাঈন" নামে পরিচিত। কাবীল হাবীলকে উক্ত স্থানে হত্যা করিয়াছিল বলিয়া জনশ্রুতি রহিয়াছে। এই জনশ্রুতির কথা আহলে কিতাব সূত্রে প্রাপ্ত। উহা কতটুকু সত্য তাহা একমাত্র আল্লাহই জানেন।
হাফিয ইব্ন আসাকির (র) তদীয় গ্রন্থে 'আহমাদ ইব্ন কাছীর' (র)-এর জীবনী আলোচনা প্রসঙ্গে একটি আশ্চর্যজনক কথা লিপিবদ্ধ করিয়াছেন।
'তিনি (আহমদ ইবন কাছীর) একজন পুণ্যবান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি একদা নবী করীম (স) আবু বাক্ (রা) ও হাবীলকে স্বপ্নে দেখেন। তিনি ঐ সময় হাবীলকে আল্লাহর নামে কসম দিয়া জিজ্ঞাসা করেন যে, সত্য সত্যই ঐ স্থানটি তাঁহার হত্যাস্থল কিনা? তিনি শপথ পূর্বক তাহা স্বীকার করেন এবং বলেন যে, তিনি আল্লাহ্র নিকট দু'আ করিয়াছিলেন যে, ঐ স্থানটিকে যেন তিনি দু'আ কবুলের স্থানরূপে গ্রহণ করিয়া লন। আল্লাহ তাআলা তাহার সেই দুআটি কবুলও করেন। হাফিয ইবন কাছীর (র) মন্তব্য করেন যে, ইহা একটি স্বপ্নমাত্র (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৮৭)।
📄 প্রথম লাশ দাফন
পৃথিবীতে যেহেতু ইতোপূর্বে কোন মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে নাই, তাই হাবীলের লাশ কাবীলের জন্য এক মহা সমস্যা হইয়া দেখা দিল। লাশ এইভাবে পড়িয়া থাকিলে তাহা পিতা-মাতা ও অন্যান্য ভাই-বোনের গোচরে আসিবে। হাবীলকে যেহেতু সে প্রকাশ্যেই হত্যার হুমকি দিয়াছিল এবং তাঁহার প্রতি তাহার বিদ্বেষ ও কোপানলের কথা অজ্ঞাত ছিল না, তাই এই লাশ দেখামাত্র যে কেহ চক্ষু খুঁজিয়া বলিয়া দিবে যে, ইহা একমাত্র কাবীলেরই কাজ হইতে পারে। তাই দুশ্চিন্তায় কাবীল দিক-বিদিক জ্ঞান হারাইয়া ফেলিল এবং লাশ কাঁধে তুলিয়া এদিক-সেদিক ছুটিতে লাগিল। ভাইয়ের লাশ লইয়া কাবীলের উদ্ভ্রান্তভাবে বেড়াইবার এই মেয়াদ কেহ চল্লিশ দিন, আবার কেহ এক বৎসর কাল দীর্ঘ ছিল বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (তাফসীর মাযহারী, ৩খ, পৃ. ৮১; বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৮৮)।
فَبَعَثَ اللَّهُ غُرَابًا يَبْحَثُ فِي الْأَرْضِ لِيُرِيَهُ كَيْفَ يُوَارِي سَوْءَةَ أَخِيهِ قَالَ يُوَيْلَتِي أَعْجَزْتُ أَنْ أَكُونَ مِثْلَ هُذَا الْغُرَابِ فَأُوَارِي سَوْءَةَ أَخِي فَاصْبَحَ مِنَ النَّدِمِينَ .
"অতঃপর আল্লাহ একটি কাক পাঠাইলেন, যে তাহার ভ্রাতার মৃতদেহ কিভাবে গোপন করা যায় তাহা দেখাইবার জন্য মাটি খনন করিতে লাগিল। সে বলিল, হায়! আমি কি এই কাকের মতও হইতে পারিলাম না, যাহাতে আমার ভ্রাতার মৃতদেহ গোপন করিতে পারি? অতঃপর সে অনুতপ্ত হইল" (৫: ৩১)।
আস-সুদ্দী কতক সাহাবীর বরাতে বর্ণনা করেন যে, ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা দুইটি সহোদর কাক প্রেরণ করিয়াছিলেন। উভয় কাক সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং তাহাদের একটি অপরটিকে হত্যা করে। হত্যাকৰ্ম সম্পন্ন করার পর হস্তা কাকটি মাটি খনন করিয়া তাহার মৃত ভাইয়ের দেহটি গর্তে নিক্ষেপ করিল এবং তারপর তাহা মাটি চাপা দিল। তাহা প্রত্যক্ষ করিয়া কাবীল বলিয়া উঠিল, হায়! আমি কি ঐ কাকটির মতও হইতে পারিলাম না যে, আমার ভাইয়ের লাশটি লোকচক্ষুর অন্তরালে গোপন করিয়া ফেলি! তখন সে কাকের অনুসরণে ঐরূপই করিল এবং হাবীলের মৃতদেহ দাফন করিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৮৮; তাফসীর তাবারী, ৬খ, পৃ. ১৯৭; তাফসীর রূহুল মা'আনী, ৬খ, পৃ. ১১৫-১১৬)।
এই ঘটনার পর্যালোচনা প্রসঙ্গে আল্লামা হিফযুর রহমান লিখেন, হাবীল ছিলেন আল্লাহ্র প্রিয়পাত্র আর কাবীল ছিল অভিশপ্ত। তাই হাবীলের পবিত্র মৃতদেহের যাহাতে অবমাননা না হয়, আদম সন্তানগণের মৃত্যুর পর যাহাতে সম্মানজনকভাবে তাহাদের মৃতদেহ দাফনের সুন্নাত বা রীতি প্রবর্তিত হয় এবং কাবীলকে যেন তাহার লজ্জাজনক অপরাধের দরুন এই দুনিয়ায়ও লাঞ্ছিত অপমানিত হইতে হয়, সে তাহার নির্বুদ্ধিতা ও অদূরদর্শিতার কথা যাহাতে হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করিতে পারে তজ্জন্য এই ব্যবস্থা করা হইয়াছিল। এইজন্য আপন অপরাধ গোপন করার মত সাধারণ জ্ঞানটুকুও তাহার মনে উদ্রেক হয় নাই, বরং এমন একটি প্রাণীকে এই ব্যাপারে তাহার পথিকৃত করা হইল যাহার ধূর্ততা ও সহজাত নোংরামী সর্বজন বিদিত। ফলে শেষ পর্যন্ত কাবীলকে এই খোদোক্তি করিতে হয় : 'হায়! আমি এই কাকটির মতও হইতে পারিলাম না' (হিফযুর রহমান, কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৬২)!
📄 কাবীলের পরিণতি
-মুজাহিদ (র)-এর বরাতে আল্লামা ইব্ন কাছীর (র) বলেন, "ভ্রাতৃ হত্যার দিনই কাবীলকে তাৎক্ষণিকভাবে উহার শাস্তি দেওয়া হয়। তাহার নলাকে তাহার উরুর সহিত সংলগ্ন করিয়া দেওয়া হয়, তাহার মুখমণ্ডলকে সূর্যের দিকে করিয়া দেওয়া হয়। সূর্য যে দিকে আবর্তিত হইত তাহার মুখমণ্ডলকে সেদিকেই ঘুরাইয়া দেওয়া হইত। ইহা ছিল তাহার পাপের আশু ফলস্বরূপ এবং তাহার দ্রোহ ও আপন ভ্রাতার প্রতি বিদ্বেষের পরিণতি।" রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, "আখিরাতের প্রাপ্য শাস্তি ছাড়াও দুনিয়ার ত্বরিৎ শাস্তি লাভের জন্য বিদ্রোহ ও নিকট আত্মীয়তা সম্পর্ক ছেদনের মত পাপ আর হয় না” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৮৮; আরও দ্র. আবূ দাউদ (৪৯০২), তিরমিযী (২৫১১), ইবন মাজা (৪২১১), আহমাদ, ৫খ, পৃ. ৩৬, ৩৮ ও ৩৮ এবং আল-আদাবুল-মুফরাদ, অধ্যায় ৩৩, হাদীছ নং ৬৭, তাশখন্দ মুদ্রণ ১৩৯০/১৯৭০)।
বাইবেল পুরাতন নিয়মের আদি পুস্তকে কাবীলের পরিণতি বর্ণিত হইয়াছে এইভাবেঃ "এরপর একদিন মাঠে থাকার সময় কয়িন তার ভাই হেবলের সঙ্গে কথা বলছিল, আর তখন সে হেবলকে আক্রমণ করে মেরে ফেলল। তখন সদাপ্রভু কয়িনকে বলেন, তোমার ভাই হেবল কোথায়? কয়িন বলল, আমি জানি না। আমার ভাইয়ের দেখাশোনার ভার কি আমার উপর? তখন সদাপ্রভু বললেন, এ তুমি কি করেছ? দেখ, জমি থেকে তোমার ভাইয়ের রক্ত আমার কাছে কাঁদছে। জমি যখন তোমার হাত থেকে তোমার ভাইয়ের রক্তগ্রহণ করবার জন্য মুখ খুলেছে, তখন জমির অভিশাপই তোমার উপর পড়ল। তুমি যখন জমি চাষ করবে, তখন তা আর তোমাকে তেমন ফসল দেবে না। তুমি পলাতক হয়ে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াবে। তখন কয়িন সদাপ্রভুকে বলল, এই শাস্তি আমার সহ্যের বাইরে। আজ তুমি আমাকে জমি থেকে তাড়িয়ে দিলে, যার ফলে আমি তোমার চোখের আড়াল হয়ে যাব। পলাতক হয়ে আমি পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াব, ফলে যার সামনে আমি পড়ব সে-ই আমাকে খুন করতে পারে। তখন সদাপ্রভু তাকে বললেন, তাহলে যে তোমাকে খুন করবে, তার উপর সাত গুণ প্রতিশোধ নেয়া হবে। এই বলে সদাপ্রভু কয়িনের জন্য এমন একটা চিহ্নের ব্যবস্থা করলেন যাতে কেউ তাকে হাতে পেয়েও খুন না করে" (আদিপুস্তক, ৪ : ৮-১৫, সৃষ্টির আদিতে, প্রকাশক বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি, ঢাকা)।
বাইলেলের এই বর্ণনা বিভ্রান্তিকর। ইবন কাছীর (র) বলেন, আহলে কিতাব তথা ইয়াহুদী-খৃস্টান সমাজ যাহাকে তৌরাত বলিয়া মনে করে তাহাদের গ্রন্থে আমি দেখিয়াছি যে, আল্লাহ তা'আলা কাবীলকে তাৎক্ষণিক শাস্তি না দিয়া অবকাশ দিয়াছিলেন এবং সে এডেনের পূর্ব দিকে অবস্থিত নূদ অঞ্চল বসবাস করে যাহাকে তাহারা কান্নীম নামে অভিহিত করিয়া থাকে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৮৮)। বর্তমান বাইবেলেও এই বক্তব্য বিদ্যমান আছে। কাবীলের বংশতালিকা প্রমাণ করে যে, তাৎক্ষণিকভাবে কাবীল শাস্তিপ্রাপ্ত হইয়া ধ্বংস হইয়া যায় নাই, বরং সুদীর্ঘ কাল পৃথিবীতে বসবাস করিয়া বংশ বিস্তার করিয়াছে।