📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বান্দাদেরকে সাক্ষী রাখার তাৎপর্য

📄 বান্দাদেরকে সাক্ষী রাখার তাৎপর্য


আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنْفُسِهِمْ "আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে তাহাদের নিজেদের সম্পর্কে সাক্ষী রাখিলেন" (৭: ১৭২)।
এই সাক্ষী রাখার ব্যাপারটি কী ছিল তাহার ব্যাখ্যা সম্পর্কেও বিভিন্ন মত রহিয়াছে।
(১) কেহ কেহ ইহাকে রূপক অর্থে গ্রহণ করিয়াছেন। যেমন তাফসীর বায়যাবীতে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাহাদের কাছে দলীল-প্রমাণ উপস্থাপিত করিয়া তাহাদের বিবেক-বুদ্ধিতে এই যোগ্যতা ও সহজাত শক্তি প্রদান করেন যে, তাহারা আল্লাহ্র একত্ববাদ সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করিতে সক্ষম হয়। ফলে তাহারা এ সমস্ত সত্তার সমপর্যায়ে উন্নীত হইয়া যায় যাহাদিগকে আল্লাহ তা'আলা (أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ )"আমি কি তোমাদের প্রভু নই?" বলার সাথে সাথে জবাব দিয়াছিল, (بَلَى )"হাঁ", আপনি আমাদের প্রতিপালক! আল্লাহকে রব বা প্রতিপালকরূপে চিনিয়া লওয়ার শক্তি প্রদানের পর তাহারা যে উহাতে সক্ষম ও সমর্থ হইয়া উঠিয়াছে, উহাকেই উক্ত আয়াতে ইশহাদ বা সাক্ষী রাখা বলা হইয়াছে।
(২) অনেকের মতে এই অঙ্গীকার শাব্দিকভাবেই করা হইয়াছিল, রূপক অর্থে নহে। হযরত ইবন আব্বাস (রা)-এর হাদীছে উহাই ব্যক্ত হইয়াছে এইভাবে: "নবী করীম (স) বলেন, আল্লাহ তা'আলা আদমের সন্তানদের নিকট হইতে তাঁহার পৃষ্ঠদেশে থাকা অবস্থায় অঙ্গীকার গ্রহণ করেন, অতঃপর তাঁহার পৃষ্ঠদেশ হইতে তাঁহার সমস্ত বংশধরকে নির্গত করেন। তারপর তাঁহার সম্মুখে তাহাদিগকে ছড়াইয়া দেন। তারপর তাহাদের সহিত সামনাসামনি কথোপকথন করেন। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নহি? তাহারা বলে, হাঁ, আমরা অবশ্যই সাক্ষী রহিলাম (সুনান নাসায়ীর বরাতে বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, জিলদ ১, পৃ. ৮৩)।
সহীহ হাদীছের এই বর্ণনা হইতে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, আসলেই আক্ষরিক অর্থে সাক্ষী রাখার ব্যাপারটি ঘটিয়াছিল। তালীকুস সাবীহ ফী শারাহ মিশকাতিল মাসাবীহ গ্রন্থে এরূপই উল্লিখিত হইয়াছে। আল্লামা শাব্বীর আহমাদ উছমানী (র) তদীয় তাফসীরে লিখেন, "সৃষ্টির ঊষালগ্নে প্রদত্ত সেই খোদায়ী শিক্ষার প্রভাবেই সর্বযুগের পৃথিবীর সর্বএলাকার আদম সন্তানদের মধ্যে সাধারণভাবে আল্লাহ্ প্রভুত্বের বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণা বিদ্যমান দেখা যায়। ইহা সুস্পষ্ট যে, সৃষ্টির শুরুর সেই ঊষা লগ্নে গোটা মানবজাতিকে নিশ্চয়ই রবুবিয়তের এই আকীদা-বিশ্বাস শিক্ষা দেওয়া হইয়াছিল (তাফসীরে উছমানী, ৭: ১৭২ আয়াতের পাদটীকা)।
আল্লাহকে রব হিসাবে স্বীকার করিবার সেই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারের কথা স্মরণ আছে বলিয়াও কোন কোন মনীষী উল্লেখ করিয়াছেন। হযরত আলী (রা) বলেন: "আমার সেই অঙ্গীকারের কথা সুস্পষ্ট স্মরণ আছে যে দিন আমার প্রভু পরওয়ারদিগার আমার নিকট হইতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। আমি সুস্পষ্টরূপে তাহাদিগকেও চিনিতে পারি যাহারা সেই দিন আমার ডান দিকে ও আমার বাদ দিকে উপস্থিত ছিলেন।" সাহল ইব্‌ন আবদুল্লাহ তস্তরী (র) বলেন, "আমি কি তোমাদের রব নহি" দিবসের সেই অঙ্গীকারের কথা আমার স্মরণ আছে (আল- ইয়াওয়াকীতুল জাওয়াহির গ্রন্থে ইহা উল্লিখিত রহিয়াছে)।
হযরত যুন্-নূন মিসরী (র)-কে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি বলেন, "উহা যেন এখনও আমার কানে বাজিতেছে।" কেহ কেহ তো উহাকে এমনি ঘটনা বলিয়া ধারণা করিয়াছেন যেন উহা মাত্র গতকল্য ঘটিয়াছে (তাফসীর রূহুল মাআনী, উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 একটি সংশয় নিরসন

📄 একটি সংশয় নিরসন


'আলাস্থ বিরাব্বিকুম' দিবসের আলোচনাসম্বলিত আয়াত ও হাদীছের বর্ণনায় বাহ্যত একটি বৈপরিত্য পরিলক্ষিত হয়, যাহাতে সাধারণ পাঠকগণ বিভ্রান্ত হইতে পারেন। ব্যাপারটি এই যে, আয়াতের দ্বারা প্রতীয়মান হয়, আদম সন্তানদিগকে আদম সন্তানদেরই পৃষ্ঠদেশ হইতে নির্গত করা হইয়াছিল (দ্র. ৭: ১৭২)। পক্ষান্তরে হাদীছের বর্ণনায় আছেঃ "অতঃপর তিনি আদমের পৃষ্ঠদেশে তাঁহার দক্ষিণ হস্ত বুলাইয়া দিলেন এবং তাঁহার মধ্য হইতে তাঁহার বংশধরগণকে নির্গত করিলেন"। তাহা হইলে ব্যাপারটি আসলে কী ঘটিয়াছিল? আদম সন্তানদিগকে আদমেরই পৃষ্ঠদেশ হইতে নির্গত করা হইয়াছিল, নাকি তাহাদেরই পরস্পরের পৃষ্ঠদেশ হইতে নির্গত করা হইয়াছিল?
প্রকৃতপক্ষে যাহা ঘটিয়াছিল তাহা এই যে, আদম (আ)-এর প্রত্যক্ষ সন্তান অর্থাৎ তাঁহার নিজ পুত্র-কন্যাগণকে তাঁহারাই পৃষ্ঠদেশ হইতে নির্গত করা হয়। এভাবে ধারাবাহিকতাসহ সকলেই সকলের পিতার পৃষ্ঠদেশ হইতে নির্গত হয়। তাই কুরআন ও হাদীছের উভয় বর্ণনাই সঠিক। সর্বপ্রথম নির্গমন যেহেতু আদমেরই পৃষ্ঠদেশ হইতে হইয়াছিল তাই হাদীছে সেভাবেই উল্লিখিত হইয়াছে। পক্ষান্তরে আয়াতের বর্ণনায় মধ্যবর্তী সন্তানদের মধ্য হইতে পরবর্তী সন্তানদের নির্গমনের উল্লেখ রহিয়াছে। সুতরাং উভয় বর্ণনার মধ্যে কোনই বৈপরিত্য নাই। শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলবী (র) প্রণীত হুজ্জাতুল্লাহিল-বালিগা এবং আল-ইয়াওয়াকীত ওয়াল-জাওয়াহির প্রভৃতি গ্রন্থে এইরূপ উল্লিখিত হইয়াছে (তালীসকু সাবীহ ফী শারহি মিশকাতিল মাসাবীহ-এর বরাতে তানযীমুল আশতাত-হাল্লি আবীসাতিল মিশকত, ১ খ., ১১৫)।
ইবন কাছীর (র) হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেনঃ আল্লাহ তা'আলা আদম (আ)-কে ষাট হাত উচ্চতাবিশিষ্ট করিয়া সৃষ্টি করেন। তারপর কমিতে কমিতে মানবাকৃতি আজিকার পর্যায়ে পৌঁছিয়াছে (বুখারী ও মুসলিমের বরাতে আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৮৫)।
এক বর্ণনা হইতে জানা যায়, তাঁহার দেহের প্রস্থ ছিল সাত হাত (আহমাদ, ২ খৃ., ৫৩৫)। এতদ্ব্যতীত এক রিওয়ায়াতে তো স্পষ্টভাবে আছে ستون ذراعافي السحاد ষাট হাত উর্ধদিকে)। হযরত শায়খ আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী (র) ইহার ব্যাখ্যায় বলিতেন: আদম (আ)-এর এই দৈহিক উচ্চতা বেহেশতে ছিল। যখন তাঁহাকে পৃথিবীতে নামাইয়া দেওয়া হয় তখন তাহা সঙ্গতভাবে হ্রাস করিয়া দেওয়া হয় (বদরে আলম মীরাঠী, তর্জমানুস্ সুন্নাহ, ১খ, ৪৬৯, ইফাবা প্রকাশিত)।
হযরত ইবন আব্বাস (রা) কর্তৃক বর্ণিতঃ "পৃথিবীতে আদম (আ)-এর সর্বপ্রথম খাদ্য ছিল গম। জিবরাঈল (আ) তাঁহার কাছে সাতটি গমের দানাসহ উপস্থিত হন। আদম (আ) তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন: উহা কি? জিবরাঈল (আ) বলিলেন: উহা সেই নিষিদ্ধ ফল যাহা ভক্ষণ করিতে বেহেশতে আপনাকে বারণ করা হইয়াছিল, কিন্তু এতদসত্ত্বেও আপনি তাহা ভক্ষণ করিয়াছিলেন। আদম (আ) জিজ্ঞাসা করিলেন: উহা দ্বারা আমি কী করিব? জবাবে জিবরাঈল (আ) বলিলেন: উহা আপনি ভূমিতে বপন করিবেন। সে মতে তিনি তাহা বপন করেন। এই বর্ণনায় আছেঃ ঐ দানাসমূহের প্রত্যেকটির ওজন ছিল লক্ষ দানার চেয়েও বেশী। ঐ দানাগুলি বপনের পর ফসল উৎপন্ন হয়, তিনি উহা কর্তন করিয়া ঘরে উঠান, মাড়াইয়া পিষিয়া আটা বানান। অতঃপর মণ্ড বা খামীর করিয়া রুটি প্রস্তুত করেন। এইভাবে বহু রকম ক্লেশ ও পরিশ্রমের পর উহা ভক্ষণ করেন (তারীখ তাবারী, ১খ, ১২৮)। ইহাই ছিল আল্লাহ্‌ তা'আলার পূর্ব-সতর্কবাণীর তাৎপর্য, যাহাতে তিনি আদম (আ)-কে বলিয়া দিয়াছিলেন:
فَلَا يُخْرِجَنَّكُمَا مِنَ الْجَنَّةِ فَتَشْقَى
"শয়তান যেন তোমাদের উভয়কে জান্নাত হইতে বাহির করিয়া না দেয়, দিলে তোমরা দুঃখ-কষ্ট পাইবে।"
ইবন আসাকির কর্তৃক উদ্ধৃত হযরত আনাস (রা) বর্ণিত হাদীছ হইতে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: "আদম ও হাওয়াকে পৃথিবীতে একত্রে নামাইয়া দেওয়া হয়। তখন তাঁহাদের পরণে ছিল জান্নাতের বৃক্ষপত্র। একত্র হওয়ার পর উত্তাপক্লিষ্ট আদম বসিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে হাওয়াকে উদ্দেশ্য করিয়া বলেনঃ হে হাওয়া! তাপ আমাকে ক্লিষ্ট করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, তখন জিবরাঈল তুলা লইয়া আসিয়া হাওয়াকে উহা দ্বারা সূতা কাটিতে বলেন এবং উভয়কে কাপড় বয়ন শিখাইয়া দেন (আল-বিদায়া ও ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৭৪)। এইভাবে পৃথিবীতে তাঁহাদের বস্ত্র পরিধানের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু তাঁহাদের প্রথম পরিহিত পোশাক ভেড়ার লোমের দ্বারা নির্মিত ছিল বলিয়া অন্য রিওয়ায়াতে উল্লিখিত হইয়াছে! প্রথমে ভেড়ার দেহ হইতে পশম খসাইয়া তারপর উহা হইতে সূতা কাটেন। তারপর আদম (আ) তাঁহার নিজের জন্য একটি জোব্বা এবং হাওয়া (আ)-এর জন্য একটি কামীস ও একটা ওড়না তৈয়ার করেন" (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১খ, ৮৫)।
وَطَفِقَا يَخْصِفَانِ عَلَيْهِمَا مِنْ وَرَقِ الْجَنَّةِ .
আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত ইবন আব্বাস (রা) বলেনঃ জান্নাতের যে বৃক্ষপত্রে আদম ও হাওয়া (আ) সর্বপ্রথম লজ্জা নিবারণ করিয়াছিলেন, উহা ছিল ডুমুর বৃক্ষের পত্র (৭ঃ ২২ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে)। ইবন কাছীর এই বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়া মন্তব্য করেন, সম্ভবত উহা আহলে কিতাবগণের নিকট হইতে প্রাপ্ত তথ্য। আয়াতের বাহ্যিক অর্থ সুনির্দিষ্ট কোন বৃক্ষের প্রতি ইঙ্গিতবহ নহে, ব্যাপক অর্থে উহা ব্যবহৃত। আর উহা মানিয়া লইলেও কোন ক্ষতি নাই। আল্লাহই সম্যক অবগত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৭৩)।
আদম ও হাওয়া (আ) জান্নাতে কোন সন্তান লাভ করিয়াছিলেন কি না তাহা লইয়া মতানৈক্য রহিয়াছে। ইবন কাছীর (র) বলেন: জান্নাতে ঐ দম্পতি যুগলের কোন সন্তান জন্মগ্রহণ করিয়াছিল কিনা তাহা লইয়া সীরাতবিদগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। তাঁহাদের কেহ কেহ বলিয়াছেন: জান্নাতে তাঁহাদের কোন সন্তান জন্ম গ্রহণ করে নাই। আবার অন্যরা বলিয়াছেন: না, বরং সেখানেই তাঁহাদের সন্তানের জন্ম হইয়াছে। কাবিল এবং তাহার ভগ্নীটির জন্ম জান্নাতেই হইয়াছিল।
ইমাম ইবন জারীর তাবারী (র) তদীয় ইতিহাস গ্রন্থে হাওয়ার গর্ভে বিশ দফায় চল্লিশজন সন্তানের জন্মগ্রহণের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। ইবন ইসহাক তাহাদের নামসমূহও বর্ণনা করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৮৯; আল-কামিল ফিত-তারীখ, ১খ, ৪২)। আবার কহে কেহ এক শত কুড়ি দফায় প্রত্যেক দফায় একজন পুত্র সন্তান ও একজন কন্যা সন্তান মোট দুই শত চল্লিশজন সন্তানের জন্ম লাভের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। সর্বপ্রথম দফায় কাবীল এবং তাহার যমজ ভগ্নী একলীমা এবং সর্বশেষ দফায় আবদুল মুগীছ এবং তদীয় যমজ ভগ্নী উম্মুল মুগীছ জন্মগ্রহণ করেন। তারপর ক্রমান্বয়ে তাহাদের সন্তান-সন্তুতির সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতে থাকে, যাহার কথা আল্লাহ তা'আলা ব্যক্ত করিয়াছেন এইভাবে:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱتَّقُوا۟ رَبَّكُمُ ٱلَّذِى خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَٰحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا ونساء .
"হে মানব! তোমারা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর যিনি তোমাদিগকে এক ব্যক্তি হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন ও যিনি তাহা হইতে তাহার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেন, যিনি তাহাদের দুইজন হইতে বহু নর-নারী ছড়াইয়া দেন” (৪৪১)।
ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করিয়াছেন যে, চারি লক্ষ সন্তান-সন্তুতি ও অধস্তন বংশধর না দেখিয়া আদম (আ) এই পৃথিবী হইতে বিদায় নেন নাই (কাসাসুল আম্বিয়া, ইবন কাছীর, পৃ. ৫৭)। তাঁহার এই সন্তান-সন্তুতির মধ্যে তাঁহার পুত্র শীছ (আ) ছিলেন অনন্য মর্যাদার অধিকারী। হাবীলের নিহত হওয়ার পর আদম (আ) এতই ভাঙ্গিয়া পড়েন যে, আওযাঈ-হাসান-ইবন আতিয়্যা বর্ণিত রিওয়ায়াতে আছে: আদম (আ) জান্নাতে অবস্থান করেন এক শত বৎসর। বর্ণনান্তরে ষাট বৎসর; জান্নাত হারানোর দুঃখে আক্ষেপ করিয়া কান্নাকাটি করিয়া কাটান চল্লিশ বৎসর (ইব্‌ন আসাকিরের বরাতে কাসাসুল আম্বিয়া, ইবন কাছীর প্রণীত, পৃ. ২৯)।
শীছ শব্দের অর্থ حبة الله বা আল্লাহর দান। পুত্র বিরহে শোকাতুর আদম (আ) আল্লাহ্র এই দান পাইয়া অনেকটা শান্ত হইয়াছিলেন। এই শীছ (আ) পরবর্তীতে আসমানী গ্রন্থধারী রাসূলও হইয়াছিলেন। সুতরাং তাঁহার মর্যাদা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশী ছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আদম (আ)-এর পুত্র শয়তানের দাস?

📄 আদম (আ)-এর পুত্র শয়তানের দাস?


আদম-হাওয়া (আ)-এর সন্তান-সন্ততির আলোচনা প্রসঙ্গে ইমাম আহমদ প্রমুখ বিশিষ্ট মুহাদ্দিছ বর্ণিত এক হাদীছে আছে, হুযূর (স) বলেন: হাওয়ার সন্তানগণ বাঁচিত না। একবার হাওয়ার গর্ভে সন্তান আগমন করিলে শয়তান তাঁহার নিকট আসিয়া বলিল, তুমি উহার নাম আবদুল হারিছ রাখিয়া দাও। তাহা হইলে সে বাঁচিবে। সে মতে তিনি তাহার আবদুল হারিছ বলিয়া নামকরণ করিলেন এবং সত্য সত্যই এই সন্তানটি বাঁচিয়া যায়। উহা ছিল শয়তানের প্ররোচনা ও নির্দেশ (কাসাসুল আম্বিয়া (উর্দু খুলাসাতুল আম্বিয়ার অনুবাদ), গদ্যানুবাদ মোহাম্মদ হাসান এফ.এম.এম.এ, বি-এড, ইসলামিয়া লাইব্রেরী, আন্দর কিল্লা চট্টগ্রাম, ১ম প্রকাশ ১৯৪, পৃ. ৪৫; আহমদ ৫খ, ১১)।
তিরমিযী, ইবন জারীর, ইবন আবী হাতিম, ইবন মারদূয়ায়হ প্রমুখ বিশিষ্ট মুহাদ্দিছ ও মুফাসসিরও তাঁহাদের তাফসীরে এই হাদীছ রিওয়ায়াত করিয়াছেন। হাকেম ও তদীয় 'মুস্তাদরাক' কিতাবে উহা উদ্ধৃত করিয়াছেন। হাকেম তো রীতিমত উহার "সনদ সহীহ, যদিও বুখারী মুসলিম (র) উহা রিওয়ায়াত করেন নাই” বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন। তিরমিযী বলিয়াছেন: হাদীছটি হাসান-গরীব পর্যায়ের, উমার ইবন ইবরাহীমের সূত্র ছাড়া অন্য কোন সুত্রে উহা আমরা প্রাপ্ত হই নাই। কেহ কেহ আবদুস সামাদ সূত্রে বর্ণনা করিলেও উহাকে মারফু' পর্যায়ে উত্তীর্ণ করেন নাই অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাণীরূপে নহে, সাহাবীর উক্তিরূপেই বর্ণনা করিয়াছেন (তিরমিযী, হাদীস নং ৩০৭৭)। আল্লামা ইবন কাছীর (র) হাদীছটির সূত্র সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত টানিয়াছেন এইভাবে: স্পষ্টতই উহা কা'ব আহবার সূত্রে প্রাপ্ত, স্পষ্টতই রাবী উহা ইসরাঈলী উপাখ্যান হইতে প্রাপ্ত হইয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৮৯)। উক্ত হাদীছ সম্পর্কে আমাদের এই দীর্ঘ আলোচনার কারণ হইতেছে হারিছ শয়তানের একটি নাম। তাই আবদুল হারিছ অর্থ শয়তানের দাস। আল্লাহর খিলাফতের মর্যাদা লাভকারী এবং শয়তানের তাযিমী সিজদাপ্রাপ্ত সম্মানিত আদম (আ)-এর সন্তানের এরূপ নামকরণ সহজে মানিয়া লওয়া যায় না।
এজন্য হাসান বসরী (র), যে সমস্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় উক্ত হাদীছ বলিয়া কথিত রিওয়ায়াত বর্ণনা করা হইয়াছে, সেগুলির ভিন্ন ব্যাখ্যা করিয়াছেন। তিনি যদি উক্ত বর্ণনাটিকে মরফু' হাদীছ বলিয়া মানিয়া লইতেন তাহা হইলে ভিন্নতর ব্যাখ্যার আশ্রয় লইতেন না।
আল্লামা ইবন কাছীর (র) একটি যুক্তির দ্বারাও উক্ত বর্ণনাটির মারফু' হাদীছ হওয়ার বিষয়টি নাকচ করিয়া দিয়াছেন। তাঁহার যুক্তি হইল: আল্লাহ তা'আলা অদম (আ) ও হাওয়া (আ)-কে মানব জাতির উৎসমূলরূপে এবং তাঁহাদের দ্বারা অগণিত মানব-মানবী সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিয়াছেন। এমতাবস্থায় হাওয়ার সন্তান বাঁচিত না তাহা কেমন করিয়া হইতে পারে! নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, উহাকে নবী করীম (স)-এর হাদীছ বলাটা ভ্রম প্রমাদ, ইহাকে মওকূফ বা সাহাবীর উক্তি আখ্যা দেওয়াই বিশুদ্ধতর। আমি আমার তাফসীর গ্রন্থে উহাই লিখিয়াছি (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৯০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হাবীল-কাবীলের ঘটনা: পৃথিবীর প্রথম নরহত্যা

📄 হাবীল-কাবীলের ঘটনা: পৃথিবীর প্রথম নরহত্যা


কুরআন শরীফে হাবীল-কাবীলের ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবৃত হইয়াছে। কেননা ইহাই ছিল পৃথিবীতে হানাহানি ও ভ্রাতৃ-হননের সর্বপ্রথম ঘটনা।
পূর্বেই উক্ত হইয়াছে যে, আদি মাতা হাওয়া (আ) প্রতিবারে দুইজন করিয়া সন্তান প্রসব করিতেন। উহাদের একজন পুত্র সন্তান এবং অন্য জন কন্যা সন্তান।
ফার্সী 'খুলাসাতুল আম্বিয়া' অবলম্বনে রচিত উর্দু কাসাসুল আম্বিয়া কিতাবের (মূল ফার্সী ভাষ্য হাজী মুহাম্মদ সাঈদ, উর্দু গ্রন্থাবলীর বিখ্যাত প্রকাশক, খালাসীটোলা, কোলকাতা, উর্দু ভাষ্য তদীয় পুত্র হাজী মুহাম্মদ শফী'র এবং অপর উর্দু ভাষ্যটি গোলাম নবী কুমিল্লায়ী, প্রকাশক অধুনালুপ্ত কুরআন মঞ্জিল, বাবু বাজার, ঢাকা, বাংলা কাসাসুল আম্বিয়া পুঁথি উহা অবলম্বনেই রচিত। -জালালাবাদী)। বর্ণনা অনুযায়ী হযরত আদম (আ) ও হাওয়া দম্পতি ভারতবর্ষে আসিয়া বসবাস শুরু করিলে হাওয়া গর্ভবতী হন এবং প্রথমবারের মত একটি পুত্র সন্তান ও একটি কন্যা সন্তান প্রসব করেন। পুত্রটির নাম রাখা হয় কাবীল এবং কন্যাটির নাম রাখা হয় একলিমা। কন্যাটি অত্যন্ত রূপবতী ছিল। দ্বিতীয় দফায় তাঁহার গর্ভে যে যমজ পুত্র-কন্যার জন্ম হয় তাহাদের নাম রাখা হয় যথাক্রমে হাবীল ও গাযা। গাযা ততটা রূপবতী ছিল না। তাহাদের যখন বিবাহের বয়স হইল তখন একদা হযরত জিবরাঈল (আ) আদম (আ)-এর নিকট আগমন করিয়া বলেন, আল্লাহ তা'আলা আপনার প্রতি সালাম জানাইয়া নির্দেশ দিয়াছেন যে, আপনি যেন হাবীলের সাথে কাবীলের যমজ ভগ্নির এবং কাবীলের সাথে হাবীলের যমজ ভগ্নির বিবাহের ব্যবস্থা করেন। সেমতে আদম (আ) তাঁহার উভয় সন্তানকে ডাকিয়া আল্লাহ্র নির্দেশের কথা তাঁহাদিগকে জানাইয়া দেন। কিন্তু কাবীল বাঁকিয়া বসিল এবং সে তাহার রূপবতী যমজ ভগ্নি একলিমাকে কোনমতেই হাতছাড়া করিতে রাজি হইল না। সে বলিল, আপনি যেহেতু হাবীলকে অধিক ভালবাসেন এইজন্য এরূপ বলিতেছেন। এইভাবে সর্বপ্রথম কাবীলই পৃথিবী বক্ষে পিতৃ-আদেশ অমান্য করিল। কিন্তু আদম (আ) তাহার আপত্তি অগ্রাহ্য করিয়া শেষ পর্যন্ত হাবীলের সহিত একলিমার বিবাহ দেন। কাবীল তাহাতে অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হইয়া উঠে এবং হাবীলকে চাপ দিতে থাকে যেন তিনি একলিমাকে তালাক দেন, যাহাতে সে একলিমাকে গ্রহণ করিতে পারে। কিন্তু হাবীল কোনক্রমেই তাহাতে সম্মত হইলেন না। তিনি বলিলেন, একলিমা আমার বৈধ স্ত্রী। আমার পিতা আল্লাহ্ হুকুমে আমার সহিত তাহার বিবাহ দিয়াছেন। এমতাবস্থায় কোনক্রমেই আমি পিতৃ আদেশ ও আল্লাহ্র আদেশ লঙ্ঘন করিতে পারি না। যখন তাহাদের এই বাদানুবাদের কথা আদম (আ)-এর কর্ণগোচর হইল তখন তিনি তাহাদের সান্ত্বনার জন্য উভয়কে আল্লাহ্র দরবারে কুরবানী পেশ করিতে নির্দেশ দিলেন। সাথে সাথে বলিয়া দিলেন, যাহার কুরবানী আল্লাহ্র দরবারে কবুল হইবে, একলিমা তাহারই অধিকারে থাকিবে। সে মতে হাবীল একটি উৎকৃষ্ট দুম্বা এবং কাবীল কিছু নিকৃষ্ট শস্য কুরবানীরূপে উৎসর্গ করিয়া মিনার পাহাড় শীর্ষে রাখিয়া দিলেন, যাহার বর্ণনা রহিয়াছে কুরআনের এই আয়াতে:
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَا ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرْبًا قُرْبَانًا فَتُقُبَّلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الْآخَرِ .
"আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত তুমি তাহাদেরকে যথাযথভাবে শোনাও। যখন তাহারা উভয়ে কুরবানী করিয়াছিল, তখন একজনের কুরবানী কবুল হইল এবং অন্য জনের কবুল হইল না" (৫:২৭)।
মোটকথা, উভয় ভ্রাতাই কুরবানী করিলেন এবং মিনার পাহাড় চূড়ায় নিজ নিজ কুরবানী রাখিয়া তাহা কবুল হওয়ার জন্য আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করিলেন। এমন সময় ধুম্রবিহীন একটি আগুনের হল্কা আসিয়া উট পাখির মত হাবীলের কুরবানীকে গ্রাস করিল। কাবীলের কুরবানী সেখানে পড়িয়াই রহিল। তখন কাবীল হাবীলের প্রতি আরও ক্ষিপ্ত হইয়া বলিল: قَالَ لَأَقْتُلُنَّكَ "আমি অবশ্যই তোকে হত্যা করিব”। এবারে হাবীল বলিলেন, إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকীদের কুরবানী কবুল করেন”। উহাতে ক্ষিপ্ত হইয়া কাবীল হাবীলকে হত্যা করে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৯৩)।
কাহিনী আকারে উপরে উদ্ধৃত হাবীল-কাবীলের সংঘাতের উক্ত ঘটনা এইরূপই বাংলা, উর্দু ও ফার্সী ভাষায় 'কাসাসুল আম্বিয়া'র বদৌলতে লোকায়ত সাহিত্যের পর্যায়ে উন্নীত হইয়াছে। পুঁথি সাহিত্য ছাড়াও অধুনা প্রকাশিত পুঁথিভিত্তিক গদ্য পুস্তকাদিতেও উক্ত কাহিনীর এই বিবরণ দেশব্যাপী প্রচারিত হইতেছে (দ্র. আদি ও আসল কাছাছুল আম্বিয়া, কৃত এম. এন. ইমদাদুল্লাহ, এম. এ., বি.এ. অনার্স, রয়েল সাইজে ২ খণ্ডে প্রকাশিত, ৬৪০ পৃষ্ঠা কলেবর, প্রকাশক বাংলাদেশ তাজ কোম্পানী লিমিটেড, ৬. প্যারীদাস রোড, ঢাকা)। কিন্তু মৌলিক তাফসীর, হাদীছ ও ইতিহাস গ্রন্থসমূহের বর্ণনার আলোকে পর্যালোচনা না করিলে মূল বক্তব্য যথার্থ হইলেও উহাকে কাহিনীসুলভ অতিরঞ্জনের ছাপ রহিয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান হয়। কেননা, তাফসীর তাবারী, ইবন কাছীর (র) কৃত বিশ্বকোষ পর্যায়ের ইতিহাস গ্রন্থ 'আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া' প্রভৃতি গ্রন্থে হাবীলের সহিত একলিমার বিবাহ হইয়াছিল বলিয়া কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না।
সুদ্দী, আবু মালিক, ইবন আব্বাস ও ইবন মাসউদ (রা) সূত্রে বর্ণিত আছে যে, কাবীল বয়সে হাবীলের চাইতে বড় ছিল। যমজ ভগ্নির রূপে বিমোহিত হইয়া সে বিবাহের ব্যাপারে পিতৃ-আদেশ অমান্য করে এবং তাহাকে বিবাহের ব্যাপারে নিজের অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালায়। আদম (আ) তাহাদের উভয়কে কুরবানী করার পরামর্শ বা আদেশ দেন। তারপর তিনি হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় চলিয়া যান।
আদম (আ) মক্কায় চলিয়া যাওয়ার পর হাবীল-কাবীল দুই ভাই কুরবানী দেন। হাবীলের অনেক মেষ ছাগল ছিল। তিনি একটি হৃষ্টপুষ্ট পশু কুরবানী দিলেন। পক্ষান্তরে কাবীল তাহার ক্ষেতের নিম্ন মানের এক আঁটি ফসল উৎসর্গ করিল। আকাশ হইতে আগুন আসিয়া হাবীলের কুরবানীকে গ্রাস করিল, কিন্তু কাবীলের উৎসর্গীকৃত ফসল পড়িয়া রহিল। আগুন তাহা স্পর্শ করিল না। তখন কাবীল ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিল এবং বলিল, আমি তোমাকে হত্যা করিব যাহাতে তুমি আমার ভগ্নিকে বিবাহ করিতে না পার (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১ম জিলদ, পৃ. ৮৬; তাফসীর তাবারী, ৬খ, পৃ. ১৯১)।
এই উক্তি হইতে প্রতীয়মান হয় যে, একলিমার সাথে হাবীলের বিবাহ হয় নাই। রাবী আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা) বলেন, "আল্লাহ্র কসম! নিহত ব্যক্তি (অর্থাৎ হাবীল) তাহাদের উভয়ের মধ্যে অধিকতর বলিষ্ঠ ছিল। কিন্তু তাহার সংযম তাহাকে ভ্রাতার উপর হাত তোলা হইতে বিরত রাখে (প্রাগুক্ত)।
আবু জাফর বাকির (র)-এর এক বর্ণনামতে, আদম (আ)-এর উপস্থিতিতেই তাঁহার উক্ত পুত্রদ্বয়ের কুরবানী প্রদান এবং হাবীলের কুরবানী কবুল হওয়ার ও কাবীলের কুরবানী কবুল না হওয়ার ঘটনা ঘটে এবং তিনি তাহা অবলোকনও করিয়াছিলেন। এই সময় কাবীল তাঁহাকে অভিযুক্ত করিয়া বলে, আপনি তাহার পক্ষে দু'আ করিয়াছেন বলিয়াই তাহার কুরবানী কবুল হইয়াছে, আমার পক্ষে দু'আ করেন নাই বলিয়া আমার কুরবানী কবুল হয় নাই। ঐ সময়ই সে হাবীলকে হত্যার হুমকি দেয়।
হাবীল নিজেকে নির্দোষ বলিয়া ঘোষণা করিয়া বলেন, তোমার কুরবানী কবুল না হওয়ার জন্য আমি দায়ী নই। আল্লাহ তা'আলার চিরন্তন রীতি এই যে, তিনি কেবল মুত্তাকী লোকদের কুরবানী কবুল করেন। আল্লাহ ভীতির পথ অবলম্বন করিলে তোমার কুরবানীও কবুল হইত। তুমি তাহা কর নাই। তাই তোমার কুরবানী কবুল হয় নাই। ইহাতে আমার কী অপরাধ (তাফসীর মাআরিফুল কুরআন, ১ম জিলদ, মুফতী মুহাম্মদ শফী, সূরা মায়িদার ২৭ নং আয়াতের ব্যাখ্যায়)।
আল্লাহ্র আদেশ শরীয়তের বিধান সকলের শিরোধার্য হওয়া উচিত-স্বয়ং পিতার মুখে তাহা শুনিয়াও কাবীল তাহা গ্রাহ্য করে নাই। আদম (আ) কেবল পিতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন আল্লাহ্র প্রথম নবীও। তাই শুধু পিতারূপে আদেশ দিয়াই তিনি ক্ষান্ত হন নাই, নবীসুলভ প্রজ্ঞাও তিনি এই ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন এবং কুরবানী প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের সমান সুযোগ উভয় পুত্রকেই প্রদান করেন। সে পরীক্ষায়ও যখন কাবীল উত্তীর্ণ হইতে পারিল না, বরং তাহার চক্ষের সম্মুখেই হাবীলের কুরবানী কবুল হইল এবং নিজের অগ্রহণযোগ্যতা দিবালোকের মত স্পষ্ট হইয়া উঠিল, তখন তাহার সংযত ও নিবৃত্ত হইয়া যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সে নিবৃত্ত হইল না, বরং রাগে, ক্ষোভে ও অপমানে তাহার হিতাহিত জ্ঞান লোপ পাইল। তাহার মধ্যে জিঘাংসা ও পশুপ্রবৃত্তি মাথাচাড়া দিয়া উঠিল। সে পিতার সম্মুখেই আপন সহোদর ভাইকে হত্যার প্রকাশ্য হুমকি দিয়া বসিল : لَأَقْتُلَنَّكَ 'আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করিব।'
এই ক্ষেত্রে হাবীলের যেহেতু কোন অপরাধ ছিল না, তাই তিনি পাল্টা রাগ করিয়া তাহার চাইতে দুর্বলতর প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করিতে পারিতেন। কিন্তু তিনি ছিলেন মুত্তাকী, পিতৃভক্ত, সচ্চরিত্রের অধিকারী। তিনি অত্যন্ত সংযতভাবে বুদ্ধিগ্রাহ্য ভাষায় কুরবানী কবুল হওয়া না হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করিয়া ভাইকে শান্ত করিবার চেষ্টা করিলেন। পরোক্ষে অগ্রজকে আল্লাহভীতি অবলম্বনের আহ্বান জানাইলেন। কিন্তু কাবীলের জিদ আরও বৃদ্ধি পাইল। অগত্যা হাবীল তদীয় অগ্রজের এই সীমালঙ্ঘন ও তাহার প্রাণসংহারী প্রচেষ্টার মুখেও চরম ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দিবেন বলিয়া নিজের সংকল্পও ঘোষণা করিলেন এইভাবেঃ "আমাকে হত্যা করার জন্য তুমি হাত তুলিলেও তোমাকে হত্যা করার জন্য আমি হাত তুলিব না; আমি তো জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি" (৫: ২৮)।
কিন্তু এতসব উপদেশ সত্ত্বেও কাবীলের পাপাচারী মন টলিল না। সে তাহার সংকল্পে অটল থাকিল। সর্বশেষে তিনি তাহাকে জাহান্নামের শাস্তির কথাটাও স্মরণ করাইয়া দিলেনঃ "তুমি আমার ও তোমার পাপের ভার বহন কর এবং অগ্রবর্তী হও, ইহাই আমি চাহি এবং ইহা যালিমদের কর্মফল” (৫: ২৯)।
কিন্তু তারপরেও কাবীল নিবৃত্ত হইল না। "অতঃপর তাহার চিত্ত ভ্রাতৃ হত্যায় তাহাকে প্ররোচিত করিল। ফলে সে তাহাকে হত্যা করিল। তাই সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হইল" (৫:৩০)।
সেই ক্ষতির পরিমাণ যে কী বিপুল হযরত ইবন মাসউদ (রা) বর্ণিত হাদীছে তাহার বিবরণ দেওয়া হইয়াছে এইভাবে:
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لا تقتل نفس ظلما الا كان على ابن ادم الاول كفل من دمها لانه كان اول من سن القتل
"রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, অন্যায়ভাবে নিহত প্রত্যেকটি ব্যক্তির একটি দায়ভাগ আদমের প্রথম সন্তানটির উপর বর্তায়। কেননা হত্যার রীতি সেই সর্বপ্রথম প্রবর্তন করিয়াছিল” (আহমাদ, জিলদ ১, পৃ. ৩৮৩, ৪৩০ ও ৪৩৩)। এই ব্যাপারে কুরআন শরীফেও সতর্কবাণী রহিয়াছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا .
"নরহত্যা অথবা দুনিয়া ধ্বংসাত্মক কার্য করা হেতু ব্যতীত কেহ কাহাকেও হত্যা করিলে সে যেন দুনিয়ার সকল মানুষকেই হত্যা করিল" (৫ঃ ৩২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00