📄 আল্লাহকে রব বলিয়া স্বীকারোক্তি
আল্লাহতা'আলা কুরআন শরীফে ইরশাদ করেন:
وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِي آدَمَ مِنْ ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنْفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ قَالُوا بَلَى شَهِدْنَا أَنْ تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيمَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَذَا غَافِلِينَ
"স্মরণ কর, তোমার প্রতিপালক আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ হইতে তাহার বংশধরকে বাহির করেন এবং তাহাদের নিজেদের সম্বন্ধে স্বীকারোক্তি গ্রহণ করেন এবং বলেন, আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই? তাহারা বলে, হাঁ, অবশ্যই, আমরা সাক্ষী রহিলাম। ইহা এইজন্য যে, তোমরা যেন কিয়ামতের দিন না বল, আমরা তো এ বিষয়ে গাফিল ছিলাম। কিংবা তোমরা যেন না বল, আমাদের পূর্বপুরুষগণই তো আমাদের পূর্বে শিরক করিয়াছে, আর আমরা তো তাহাদের পরবর্তী বংশধর। তবে কি পথভ্রষ্টদের কৃতকর্মের জন্য আপনি আমাদেরকে ধ্বংস করিবেন" (৭: ১৭২-৩)?
হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) এই আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি: আল্লাহ তা'আলা আদম (আ)-কে সৃষ্টি করিয়া তাঁহার দক্ষিণ হস্ত আদমের পৃষ্ঠে বুলাইয়া তাঁহার সন্তানদিগকে নির্গত করেন এবং বলেন, ইহাদিগকে জান্নাতের জন্য এবং জান্নাতীদের আমলসহ সৃষ্টি করিয়াছি। তারপর তিনি পুনরায় তাঁহার পৃষ্ঠে হাত বুলাইয়া আরও অনেক বংশধরকে নির্গত করিলেন এবং বলিলেন: ইহাদিগকে জাহান্নামের জন্য এবং জাহান্নামীদের আমলসহ সৃষ্টি করিয়াছি। এক ব্যক্তি বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহা হইলে আর আমল দিয়া কী হইবে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: “যখন আল্লাহ তা'আলা কোন বান্দাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন তখন তিনি তাহাকে জান্নাতীদের আমল করার তৌফিক দেন, জান্নাতীদের আমল করা অবস্থায় তাহার মৃত্যু হয় এবং উহার দ্বারাই সে জান্নাতে প্রবেশ করে। পক্ষান্তরে যখন তিনি কোন বান্দাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, তাহাকে তিনি জাহান্নামের আমল করার আবকাশ দেন। জাহান্নামীদের আমলে রত থাকা অবস্থায়ই সে মৃত্যুবরণ করে এবং উহার দ্বারাই সে জাহান্নামে প্রবেশ করে (আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী প্রমুখ ইমাম মালিক সূত্রে হাদীছটি বর্ণনা করেন; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১ খ., ৮৩)।
হযরত উবাই ইবন কা'ব (রা)-এর এ সংক্রান্ত বর্ণনায় আরও কিছু তথ্য রহিয়াছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা আদম সন্তানদের পৃষ্ঠদেশ হইতে তাহাদের সন্তানদিগকে নির্গত করিয়া তাহাদের সকলকে একত্র করেন, তাহাদিগকে বিভিন্নরূপ করেন, তারপর তাহাদিগকে অবয়ব দান করেন, তারপর তাহাদিগকে বাকশক্তিসম্পন্ন করেন। তাহারা বাক্যালাপ করে। তারপর তিনি তাহাদের নিকট হইতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন এবং তাহাদিগকে তাহাদের সত্তার উপর সাক্ষী করেন এই বলিয়া যে, আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নহি? তাহারা সকলে বলিল হাঁ (আপনি আমাদের প্রতিপালক)।
তখন আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, আমি তোমাদের উপর সপ্ত আকাশ, সপ্ত যমীন এবং তোমাদের পিতা আদমকে সাক্ষী রাখিতেছি, যেন কিয়ামতের দিন তোমরা বলিতে না পার যে, তোমরা ইহা জ্ঞাত ছিলে না। জানিয়া রাখ, আমি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। আমি ব্যতীত কোন প্রতিপালক নাই এবং আমার সহিত অন্য কাহাকেও শরীক সাব্যস্ত করিও না। অচিরেই আমি তোমাদের নিকট আমার রাসূলগণকে প্রেরণ করিব। তাঁহারা তোমাদিগকে আমার অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করাইয়া দিবেন। আমি তোমাদের প্রতি আমার কিতাবসমূহ নাযিল করিব। তাহারা বলিল, আমরা সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনি আমাদের প্রভু ও মাবুদ, আপনি ব্যতীত আমাদের আর কোন প্রতিপালক ও মাবুদ নাই। তাহারা সকলে ইহা স্বীকার করিল। আদম (আ)-কে তাহাদের উপর তুলিয়া ধরা হইল, তিনি তাহাদের দিকে তাকাইয়া রহিলেন। তিনি তাহাদের মধ্যে ধনী-গরীব, সুশ্রী-কুশ্রী সকলকেই দেখিলেন। তিনি বলিলেন: প্রভু! আপনার বান্দাদের সকলকে আপনি যদি সমান করিয়া সৃষ্টি করিতেন। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: আমি চাহিয়াছি যাহাতে (নি'মাতসমূহের জন্য) আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয় (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৮৪)।
তিনি নবীগণকে প্রত্যক্ষ করিলেন। তাঁহাদের মধ্যকার কেহ কেহ উজ্জ্বল প্রদীপের মত চমকাইতেছিলেন। রিসালাত ও নবুওয়াত সম্পর্কে তাঁহাদের নিকট হইতে স্বতন্ত্র একটি অঙ্গীকার গ্রহণ করা হইয়াছিল, যাহা তাঁহার নিম্নোক্ত বাণীতে বিধৃত হইয়াছে:
وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيْثَاقَهُمْ وَمِنْكَ وَمِنْ نُوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ وَأَخَذْنَا مِنْهُمْ مِيثَاقًا غليظا
"স্মরণ কর, যখন আমি নবীদের নিকট হইতে অঙ্গীকার গ্রহণ করিয়াছিলাম; তোমার নিকট হইতেও এবং নূহ, ইবরহীম, মূসা ও মরিয়ম তনয় ঈসার নিকট হইতেও গ্রহণ করিয়াছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার" (৩৩: ৭)।
উবাই (রা) হইতে বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়া ইমাম রাযী (র) বলেন, "সেদিন আল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী সকল আদম-সন্তানকে সৃষ্টি করিয়া তাহাদের অবয়ব দান করেন বা শক্তিসম্পন্ন করেন। তাহারা কথা বলে এবং আল্লাহ তা'আলা তাহাদের নিকট হইতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। সাথে সাথে তাহাদিগকেই তাহাদের সম্পর্কে সাক্ষী রাখেন, আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নহি? জবাবে তাহারা বলেন, হাঁ। এই অঙ্গীকার গ্রহণের স্থান সম্পর্কে বিভিন্ন মত রহিয়াছে:
(১) কাহারো মতে, উহা রূহের জগতে ঘটিয়াছিল;
(২) কাহারো মতে, আদম (আ)-এর দুনিয়ায় আগমনের পর উক্ত ঘটনাটি ঘটে;
(৩) কেহ কেহ আরাফাতের "নামান” নামক স্থানের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। যেমন ইবন আব্বাস (র) হইতে বর্ণিত আছে: আল্লাহ তা'আলা নামানে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন অর্থাৎ আরাফাতে (তানযীমুল আশতাত, ১খ, পৃ. ১১৩, ইসলাহী কুতুবখানা, দেওবন্দ)। ঘটনাটি ঘটিয়াছিল যিলহজ্জ মাসের নবম তারিখে (বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৮৩; ইবন আব্বাস বর্ণিত হাদীছ)।
📄 বান্দাদেরকে সাক্ষী রাখার তাৎপর্য
আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنْفُسِهِمْ "আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে তাহাদের নিজেদের সম্পর্কে সাক্ষী রাখিলেন" (৭: ১৭২)।
এই সাক্ষী রাখার ব্যাপারটি কী ছিল তাহার ব্যাখ্যা সম্পর্কেও বিভিন্ন মত রহিয়াছে।
(১) কেহ কেহ ইহাকে রূপক অর্থে গ্রহণ করিয়াছেন। যেমন তাফসীর বায়যাবীতে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাহাদের কাছে দলীল-প্রমাণ উপস্থাপিত করিয়া তাহাদের বিবেক-বুদ্ধিতে এই যোগ্যতা ও সহজাত শক্তি প্রদান করেন যে, তাহারা আল্লাহ্র একত্ববাদ সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করিতে সক্ষম হয়। ফলে তাহারা এ সমস্ত সত্তার সমপর্যায়ে উন্নীত হইয়া যায় যাহাদিগকে আল্লাহ তা'আলা (أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ )"আমি কি তোমাদের প্রভু নই?" বলার সাথে সাথে জবাব দিয়াছিল, (بَلَى )"হাঁ", আপনি আমাদের প্রতিপালক! আল্লাহকে রব বা প্রতিপালকরূপে চিনিয়া লওয়ার শক্তি প্রদানের পর তাহারা যে উহাতে সক্ষম ও সমর্থ হইয়া উঠিয়াছে, উহাকেই উক্ত আয়াতে ইশহাদ বা সাক্ষী রাখা বলা হইয়াছে।
(২) অনেকের মতে এই অঙ্গীকার শাব্দিকভাবেই করা হইয়াছিল, রূপক অর্থে নহে। হযরত ইবন আব্বাস (রা)-এর হাদীছে উহাই ব্যক্ত হইয়াছে এইভাবে: "নবী করীম (স) বলেন, আল্লাহ তা'আলা আদমের সন্তানদের নিকট হইতে তাঁহার পৃষ্ঠদেশে থাকা অবস্থায় অঙ্গীকার গ্রহণ করেন, অতঃপর তাঁহার পৃষ্ঠদেশ হইতে তাঁহার সমস্ত বংশধরকে নির্গত করেন। তারপর তাঁহার সম্মুখে তাহাদিগকে ছড়াইয়া দেন। তারপর তাহাদের সহিত সামনাসামনি কথোপকথন করেন। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নহি? তাহারা বলে, হাঁ, আমরা অবশ্যই সাক্ষী রহিলাম (সুনান নাসায়ীর বরাতে বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, জিলদ ১, পৃ. ৮৩)।
সহীহ হাদীছের এই বর্ণনা হইতে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, আসলেই আক্ষরিক অর্থে সাক্ষী রাখার ব্যাপারটি ঘটিয়াছিল। তালীকুস সাবীহ ফী শারাহ মিশকাতিল মাসাবীহ গ্রন্থে এরূপই উল্লিখিত হইয়াছে। আল্লামা শাব্বীর আহমাদ উছমানী (র) তদীয় তাফসীরে লিখেন, "সৃষ্টির ঊষালগ্নে প্রদত্ত সেই খোদায়ী শিক্ষার প্রভাবেই সর্বযুগের পৃথিবীর সর্বএলাকার আদম সন্তানদের মধ্যে সাধারণভাবে আল্লাহ্ প্রভুত্বের বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণা বিদ্যমান দেখা যায়। ইহা সুস্পষ্ট যে, সৃষ্টির শুরুর সেই ঊষা লগ্নে গোটা মানবজাতিকে নিশ্চয়ই রবুবিয়তের এই আকীদা-বিশ্বাস শিক্ষা দেওয়া হইয়াছিল (তাফসীরে উছমানী, ৭: ১৭২ আয়াতের পাদটীকা)।
আল্লাহকে রব হিসাবে স্বীকার করিবার সেই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারের কথা স্মরণ আছে বলিয়াও কোন কোন মনীষী উল্লেখ করিয়াছেন। হযরত আলী (রা) বলেন: "আমার সেই অঙ্গীকারের কথা সুস্পষ্ট স্মরণ আছে যে দিন আমার প্রভু পরওয়ারদিগার আমার নিকট হইতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। আমি সুস্পষ্টরূপে তাহাদিগকেও চিনিতে পারি যাহারা সেই দিন আমার ডান দিকে ও আমার বাদ দিকে উপস্থিত ছিলেন।" সাহল ইব্ন আবদুল্লাহ তস্তরী (র) বলেন, "আমি কি তোমাদের রব নহি" দিবসের সেই অঙ্গীকারের কথা আমার স্মরণ আছে (আল- ইয়াওয়াকীতুল জাওয়াহির গ্রন্থে ইহা উল্লিখিত রহিয়াছে)।
হযরত যুন্-নূন মিসরী (র)-কে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি বলেন, "উহা যেন এখনও আমার কানে বাজিতেছে।" কেহ কেহ তো উহাকে এমনি ঘটনা বলিয়া ধারণা করিয়াছেন যেন উহা মাত্র গতকল্য ঘটিয়াছে (তাফসীর রূহুল মাআনী, উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে)।
📄 একটি সংশয় নিরসন
'আলাস্থ বিরাব্বিকুম' দিবসের আলোচনাসম্বলিত আয়াত ও হাদীছের বর্ণনায় বাহ্যত একটি বৈপরিত্য পরিলক্ষিত হয়, যাহাতে সাধারণ পাঠকগণ বিভ্রান্ত হইতে পারেন। ব্যাপারটি এই যে, আয়াতের দ্বারা প্রতীয়মান হয়, আদম সন্তানদিগকে আদম সন্তানদেরই পৃষ্ঠদেশ হইতে নির্গত করা হইয়াছিল (দ্র. ৭: ১৭২)। পক্ষান্তরে হাদীছের বর্ণনায় আছেঃ "অতঃপর তিনি আদমের পৃষ্ঠদেশে তাঁহার দক্ষিণ হস্ত বুলাইয়া দিলেন এবং তাঁহার মধ্য হইতে তাঁহার বংশধরগণকে নির্গত করিলেন"। তাহা হইলে ব্যাপারটি আসলে কী ঘটিয়াছিল? আদম সন্তানদিগকে আদমেরই পৃষ্ঠদেশ হইতে নির্গত করা হইয়াছিল, নাকি তাহাদেরই পরস্পরের পৃষ্ঠদেশ হইতে নির্গত করা হইয়াছিল?
প্রকৃতপক্ষে যাহা ঘটিয়াছিল তাহা এই যে, আদম (আ)-এর প্রত্যক্ষ সন্তান অর্থাৎ তাঁহার নিজ পুত্র-কন্যাগণকে তাঁহারাই পৃষ্ঠদেশ হইতে নির্গত করা হয়। এভাবে ধারাবাহিকতাসহ সকলেই সকলের পিতার পৃষ্ঠদেশ হইতে নির্গত হয়। তাই কুরআন ও হাদীছের উভয় বর্ণনাই সঠিক। সর্বপ্রথম নির্গমন যেহেতু আদমেরই পৃষ্ঠদেশ হইতে হইয়াছিল তাই হাদীছে সেভাবেই উল্লিখিত হইয়াছে। পক্ষান্তরে আয়াতের বর্ণনায় মধ্যবর্তী সন্তানদের মধ্য হইতে পরবর্তী সন্তানদের নির্গমনের উল্লেখ রহিয়াছে। সুতরাং উভয় বর্ণনার মধ্যে কোনই বৈপরিত্য নাই। শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলবী (র) প্রণীত হুজ্জাতুল্লাহিল-বালিগা এবং আল-ইয়াওয়াকীত ওয়াল-জাওয়াহির প্রভৃতি গ্রন্থে এইরূপ উল্লিখিত হইয়াছে (তালীসকু সাবীহ ফী শারহি মিশকাতিল মাসাবীহ-এর বরাতে তানযীমুল আশতাত-হাল্লি আবীসাতিল মিশকত, ১ খ., ১১৫)।
ইবন কাছীর (র) হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেনঃ আল্লাহ তা'আলা আদম (আ)-কে ষাট হাত উচ্চতাবিশিষ্ট করিয়া সৃষ্টি করেন। তারপর কমিতে কমিতে মানবাকৃতি আজিকার পর্যায়ে পৌঁছিয়াছে (বুখারী ও মুসলিমের বরাতে আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৮৫)।
এক বর্ণনা হইতে জানা যায়, তাঁহার দেহের প্রস্থ ছিল সাত হাত (আহমাদ, ২ খৃ., ৫৩৫)। এতদ্ব্যতীত এক রিওয়ায়াতে তো স্পষ্টভাবে আছে ستون ذراعافي السحاد ষাট হাত উর্ধদিকে)। হযরত শায়খ আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী (র) ইহার ব্যাখ্যায় বলিতেন: আদম (আ)-এর এই দৈহিক উচ্চতা বেহেশতে ছিল। যখন তাঁহাকে পৃথিবীতে নামাইয়া দেওয়া হয় তখন তাহা সঙ্গতভাবে হ্রাস করিয়া দেওয়া হয় (বদরে আলম মীরাঠী, তর্জমানুস্ সুন্নাহ, ১খ, ৪৬৯, ইফাবা প্রকাশিত)।
হযরত ইবন আব্বাস (রা) কর্তৃক বর্ণিতঃ "পৃথিবীতে আদম (আ)-এর সর্বপ্রথম খাদ্য ছিল গম। জিবরাঈল (আ) তাঁহার কাছে সাতটি গমের দানাসহ উপস্থিত হন। আদম (আ) তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন: উহা কি? জিবরাঈল (আ) বলিলেন: উহা সেই নিষিদ্ধ ফল যাহা ভক্ষণ করিতে বেহেশতে আপনাকে বারণ করা হইয়াছিল, কিন্তু এতদসত্ত্বেও আপনি তাহা ভক্ষণ করিয়াছিলেন। আদম (আ) জিজ্ঞাসা করিলেন: উহা দ্বারা আমি কী করিব? জবাবে জিবরাঈল (আ) বলিলেন: উহা আপনি ভূমিতে বপন করিবেন। সে মতে তিনি তাহা বপন করেন। এই বর্ণনায় আছেঃ ঐ দানাসমূহের প্রত্যেকটির ওজন ছিল লক্ষ দানার চেয়েও বেশী। ঐ দানাগুলি বপনের পর ফসল উৎপন্ন হয়, তিনি উহা কর্তন করিয়া ঘরে উঠান, মাড়াইয়া পিষিয়া আটা বানান। অতঃপর মণ্ড বা খামীর করিয়া রুটি প্রস্তুত করেন। এইভাবে বহু রকম ক্লেশ ও পরিশ্রমের পর উহা ভক্ষণ করেন (তারীখ তাবারী, ১খ, ১২৮)। ইহাই ছিল আল্লাহ্ তা'আলার পূর্ব-সতর্কবাণীর তাৎপর্য, যাহাতে তিনি আদম (আ)-কে বলিয়া দিয়াছিলেন:
فَلَا يُخْرِجَنَّكُمَا مِنَ الْجَنَّةِ فَتَشْقَى
"শয়তান যেন তোমাদের উভয়কে জান্নাত হইতে বাহির করিয়া না দেয়, দিলে তোমরা দুঃখ-কষ্ট পাইবে।"
ইবন আসাকির কর্তৃক উদ্ধৃত হযরত আনাস (রা) বর্ণিত হাদীছ হইতে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: "আদম ও হাওয়াকে পৃথিবীতে একত্রে নামাইয়া দেওয়া হয়। তখন তাঁহাদের পরণে ছিল জান্নাতের বৃক্ষপত্র। একত্র হওয়ার পর উত্তাপক্লিষ্ট আদম বসিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে হাওয়াকে উদ্দেশ্য করিয়া বলেনঃ হে হাওয়া! তাপ আমাকে ক্লিষ্ট করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, তখন জিবরাঈল তুলা লইয়া আসিয়া হাওয়াকে উহা দ্বারা সূতা কাটিতে বলেন এবং উভয়কে কাপড় বয়ন শিখাইয়া দেন (আল-বিদায়া ও ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৭৪)। এইভাবে পৃথিবীতে তাঁহাদের বস্ত্র পরিধানের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু তাঁহাদের প্রথম পরিহিত পোশাক ভেড়ার লোমের দ্বারা নির্মিত ছিল বলিয়া অন্য রিওয়ায়াতে উল্লিখিত হইয়াছে! প্রথমে ভেড়ার দেহ হইতে পশম খসাইয়া তারপর উহা হইতে সূতা কাটেন। তারপর আদম (আ) তাঁহার নিজের জন্য একটি জোব্বা এবং হাওয়া (আ)-এর জন্য একটি কামীস ও একটা ওড়না তৈয়ার করেন" (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১খ, ৮৫)।
وَطَفِقَا يَخْصِفَانِ عَلَيْهِمَا مِنْ وَرَقِ الْجَنَّةِ .
আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত ইবন আব্বাস (রা) বলেনঃ জান্নাতের যে বৃক্ষপত্রে আদম ও হাওয়া (আ) সর্বপ্রথম লজ্জা নিবারণ করিয়াছিলেন, উহা ছিল ডুমুর বৃক্ষের পত্র (৭ঃ ২২ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে)। ইবন কাছীর এই বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়া মন্তব্য করেন, সম্ভবত উহা আহলে কিতাবগণের নিকট হইতে প্রাপ্ত তথ্য। আয়াতের বাহ্যিক অর্থ সুনির্দিষ্ট কোন বৃক্ষের প্রতি ইঙ্গিতবহ নহে, ব্যাপক অর্থে উহা ব্যবহৃত। আর উহা মানিয়া লইলেও কোন ক্ষতি নাই। আল্লাহই সম্যক অবগত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৭৩)।
আদম ও হাওয়া (আ) জান্নাতে কোন সন্তান লাভ করিয়াছিলেন কি না তাহা লইয়া মতানৈক্য রহিয়াছে। ইবন কাছীর (র) বলেন: জান্নাতে ঐ দম্পতি যুগলের কোন সন্তান জন্মগ্রহণ করিয়াছিল কিনা তাহা লইয়া সীরাতবিদগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। তাঁহাদের কেহ কেহ বলিয়াছেন: জান্নাতে তাঁহাদের কোন সন্তান জন্ম গ্রহণ করে নাই। আবার অন্যরা বলিয়াছেন: না, বরং সেখানেই তাঁহাদের সন্তানের জন্ম হইয়াছে। কাবিল এবং তাহার ভগ্নীটির জন্ম জান্নাতেই হইয়াছিল।
ইমাম ইবন জারীর তাবারী (র) তদীয় ইতিহাস গ্রন্থে হাওয়ার গর্ভে বিশ দফায় চল্লিশজন সন্তানের জন্মগ্রহণের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। ইবন ইসহাক তাহাদের নামসমূহও বর্ণনা করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৮৯; আল-কামিল ফিত-তারীখ, ১খ, ৪২)। আবার কহে কেহ এক শত কুড়ি দফায় প্রত্যেক দফায় একজন পুত্র সন্তান ও একজন কন্যা সন্তান মোট দুই শত চল্লিশজন সন্তানের জন্ম লাভের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। সর্বপ্রথম দফায় কাবীল এবং তাহার যমজ ভগ্নী একলীমা এবং সর্বশেষ দফায় আবদুল মুগীছ এবং তদীয় যমজ ভগ্নী উম্মুল মুগীছ জন্মগ্রহণ করেন। তারপর ক্রমান্বয়ে তাহাদের সন্তান-সন্তুতির সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতে থাকে, যাহার কথা আল্লাহ তা'আলা ব্যক্ত করিয়াছেন এইভাবে:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱتَّقُوا۟ رَبَّكُمُ ٱلَّذِى خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَٰحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا ونساء .
"হে মানব! তোমারা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর যিনি তোমাদিগকে এক ব্যক্তি হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন ও যিনি তাহা হইতে তাহার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেন, যিনি তাহাদের দুইজন হইতে বহু নর-নারী ছড়াইয়া দেন” (৪৪১)।
ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করিয়াছেন যে, চারি লক্ষ সন্তান-সন্তুতি ও অধস্তন বংশধর না দেখিয়া আদম (আ) এই পৃথিবী হইতে বিদায় নেন নাই (কাসাসুল আম্বিয়া, ইবন কাছীর, পৃ. ৫৭)। তাঁহার এই সন্তান-সন্তুতির মধ্যে তাঁহার পুত্র শীছ (আ) ছিলেন অনন্য মর্যাদার অধিকারী। হাবীলের নিহত হওয়ার পর আদম (আ) এতই ভাঙ্গিয়া পড়েন যে, আওযাঈ-হাসান-ইবন আতিয়্যা বর্ণিত রিওয়ায়াতে আছে: আদম (আ) জান্নাতে অবস্থান করেন এক শত বৎসর। বর্ণনান্তরে ষাট বৎসর; জান্নাত হারানোর দুঃখে আক্ষেপ করিয়া কান্নাকাটি করিয়া কাটান চল্লিশ বৎসর (ইব্ন আসাকিরের বরাতে কাসাসুল আম্বিয়া, ইবন কাছীর প্রণীত, পৃ. ২৯)।
শীছ শব্দের অর্থ حبة الله বা আল্লাহর দান। পুত্র বিরহে শোকাতুর আদম (আ) আল্লাহ্র এই দান পাইয়া অনেকটা শান্ত হইয়াছিলেন। এই শীছ (আ) পরবর্তীতে আসমানী গ্রন্থধারী রাসূলও হইয়াছিলেন। সুতরাং তাঁহার মর্যাদা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশী ছিল।
📄 আদম (আ)-এর পুত্র শয়তানের দাস?
আদম-হাওয়া (আ)-এর সন্তান-সন্ততির আলোচনা প্রসঙ্গে ইমাম আহমদ প্রমুখ বিশিষ্ট মুহাদ্দিছ বর্ণিত এক হাদীছে আছে, হুযূর (স) বলেন: হাওয়ার সন্তানগণ বাঁচিত না। একবার হাওয়ার গর্ভে সন্তান আগমন করিলে শয়তান তাঁহার নিকট আসিয়া বলিল, তুমি উহার নাম আবদুল হারিছ রাখিয়া দাও। তাহা হইলে সে বাঁচিবে। সে মতে তিনি তাহার আবদুল হারিছ বলিয়া নামকরণ করিলেন এবং সত্য সত্যই এই সন্তানটি বাঁচিয়া যায়। উহা ছিল শয়তানের প্ররোচনা ও নির্দেশ (কাসাসুল আম্বিয়া (উর্দু খুলাসাতুল আম্বিয়ার অনুবাদ), গদ্যানুবাদ মোহাম্মদ হাসান এফ.এম.এম.এ, বি-এড, ইসলামিয়া লাইব্রেরী, আন্দর কিল্লা চট্টগ্রাম, ১ম প্রকাশ ১৯৪, পৃ. ৪৫; আহমদ ৫খ, ১১)।
তিরমিযী, ইবন জারীর, ইবন আবী হাতিম, ইবন মারদূয়ায়হ প্রমুখ বিশিষ্ট মুহাদ্দিছ ও মুফাসসিরও তাঁহাদের তাফসীরে এই হাদীছ রিওয়ায়াত করিয়াছেন। হাকেম ও তদীয় 'মুস্তাদরাক' কিতাবে উহা উদ্ধৃত করিয়াছেন। হাকেম তো রীতিমত উহার "সনদ সহীহ, যদিও বুখারী মুসলিম (র) উহা রিওয়ায়াত করেন নাই” বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন। তিরমিযী বলিয়াছেন: হাদীছটি হাসান-গরীব পর্যায়ের, উমার ইবন ইবরাহীমের সূত্র ছাড়া অন্য কোন সুত্রে উহা আমরা প্রাপ্ত হই নাই। কেহ কেহ আবদুস সামাদ সূত্রে বর্ণনা করিলেও উহাকে মারফু' পর্যায়ে উত্তীর্ণ করেন নাই অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাণীরূপে নহে, সাহাবীর উক্তিরূপেই বর্ণনা করিয়াছেন (তিরমিযী, হাদীস নং ৩০৭৭)। আল্লামা ইবন কাছীর (র) হাদীছটির সূত্র সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত টানিয়াছেন এইভাবে: স্পষ্টতই উহা কা'ব আহবার সূত্রে প্রাপ্ত, স্পষ্টতই রাবী উহা ইসরাঈলী উপাখ্যান হইতে প্রাপ্ত হইয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৮৯)। উক্ত হাদীছ সম্পর্কে আমাদের এই দীর্ঘ আলোচনার কারণ হইতেছে হারিছ শয়তানের একটি নাম। তাই আবদুল হারিছ অর্থ শয়তানের দাস। আল্লাহর খিলাফতের মর্যাদা লাভকারী এবং শয়তানের তাযিমী সিজদাপ্রাপ্ত সম্মানিত আদম (আ)-এর সন্তানের এরূপ নামকরণ সহজে মানিয়া লওয়া যায় না।
এজন্য হাসান বসরী (র), যে সমস্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় উক্ত হাদীছ বলিয়া কথিত রিওয়ায়াত বর্ণনা করা হইয়াছে, সেগুলির ভিন্ন ব্যাখ্যা করিয়াছেন। তিনি যদি উক্ত বর্ণনাটিকে মরফু' হাদীছ বলিয়া মানিয়া লইতেন তাহা হইলে ভিন্নতর ব্যাখ্যার আশ্রয় লইতেন না।
আল্লামা ইবন কাছীর (র) একটি যুক্তির দ্বারাও উক্ত বর্ণনাটির মারফু' হাদীছ হওয়ার বিষয়টি নাকচ করিয়া দিয়াছেন। তাঁহার যুক্তি হইল: আল্লাহ তা'আলা অদম (আ) ও হাওয়া (আ)-কে মানব জাতির উৎসমূলরূপে এবং তাঁহাদের দ্বারা অগণিত মানব-মানবী সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিয়াছেন। এমতাবস্থায় হাওয়ার সন্তান বাঁচিত না তাহা কেমন করিয়া হইতে পারে! নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, উহাকে নবী করীম (স)-এর হাদীছ বলাটা ভ্রম প্রমাদ, ইহাকে মওকূফ বা সাহাবীর উক্তি আখ্যা দেওয়াই বিশুদ্ধতর। আমি আমার তাফসীর গ্রন্থে উহাই লিখিয়াছি (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৯০)।