📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দাউদ (আ)-কে আদম (আ)-এর আয়ু দান

📄 দাউদ (আ)-কে আদম (আ)-এর আয়ু দান


হাকেম আবূ ইয়ালা হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীছ উদ্ধৃত করেন যাহাতে বলা হইয়াছে: "সর্বপ্রথম আদম (আ)-এর দেহের যে অংশে রূহ সঞ্চারিত হয় তাহা হইল তাঁহার চক্ষু ও নাসারন্ধ্র। তখন তিনি হাঁচি দিলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বলিলেন : (يرحمك ربك) তোমার প্রভু তোমার প্রতি সদয় হউন)। তারপর আল্লাহ তা'আলা বলিলেনঃ হে আদম! উহাদের দিকে (ফেরেশতাদের প্রতি ইঙ্গিত করিয়া) যাও এবং তাহাদের উদ্দেশ্যে বল: আস্সালামু 'আলায়কুম। তারপর লক্ষ্য কর তাহারা কী বলে। আদম তাহাদের নিকট গেলেন এবং তাহাদেরকে সালাম দিলেন। জবাবে ফেরেশতাগণ বলিলেন: ওআলায়কাস্ সালামু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: ইহাই তোমার এবং তোমার সন্তানদের অভিবাদন পদ্ধতি। তখন আদম বলিলেনঃ হে প্রভু পরোয়ারদিগার! আমার সন্তান কী? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: আমার হাত গ্রহণ কর হে আদম! আদম বলিলেন: আমি আমার প্রভুর ডান হাত বাছিয়া নিতেছি এবং আমার প্রভুর উভয় হাতই ডান হাত এবং বরকতময়। অতপর আল্লাহতা'আলা তদীয় হাতের তালু প্রসারিত করিলেন। আদমের অনাগতকালের সকল সন্তানকেই পরম দয়াময়ের হাতের তালুর মধ্যে দেখা গেল। তাহাদের অনেকের মুখমণ্ডলই দীপ্তিময়। তন্মধ্যে এক ব্যক্তির দীপ্তি আদমের অত্যন্ত পছন্দ হইল। তিনি বলিলেন: 'প্রভূ! একে?' জবাবে আল্লাহতা'আলা বলিলেন: তোমারই সন্তান দাউদ।
আদম (আ) তখন জিজ্ঞাসা করিলেন: প্রভু। আপনি তাহার জন্য বয়স কী পরিমাণ বরাদ্দ করিয়াছেন? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: আমি তাহার জন্য ষাট বৎসর আয়ু বরাদ্দ করিয়াছি। আদম বলিলেন: প্রভু! আমার আয়ু হইতে তাহার আয়ু পূর্ণ করিয়া দিন-যাহাতে তাহার আয়ু শত বৎসর হয়। আল্লাহ তা'আলা তাহাই করিলেন এবং তাহাকে সাক্ষীও রাখিলেন। তারপর যখন আদমের আয়ু গত হইল আল্লাহ তা'আলা তখন মৃত্যুর ফেরেশতাকে প্রেরণ করিলেন। তখন আদম (আ) তাঁহাকে বলিলেন: আমার আয়ুর চল্লিশ বৎসর কি অবশিষ্ট নাই? ফেরেশতা তাঁহাকে বলিলেন: আপনি কি তাহা আপনার পুত্র দাউদকে দান করেন নাই? আদম অস্বীকার করিলেন, ফলে তাঁহার সন্তানরাও অস্বীকার করে। তিনি বিস্মৃত হইলেন, তাই তাঁহার সন্তানরাও বিস্তৃত হয় (আবূ ইয়ালা, মুসনাদ, ১১খ., ৪৫৩)।
তিরমিযীর এতদসংক্রান্ত বর্ণনাটি এইরূপ: হযরত আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: "আল্লাহ তা'আলা আদমকে সৃষ্টি করার পর তাঁহার পৃষ্ঠদেশে হাত বুলাইলে তাঁহার পৃষ্ঠদেশ হইতে কিয়ামত পর্যন্ত যাহারা সৃষ্টি হইবে তাঁহার সেই অনাগত সন্তানগণ বাহির হইয়া পড়িল। আল্লাহ তা'আলা তাহাদের মধ্যকার প্রতিটি মানুষের চক্ষুদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি জ্যোতির ঔজ্জ্বল্য সৃষ্টি করিলেন। তারপর সেইগুলিকে আদমের সম্মুখে উপস্থাপিত করিলেন। আদম (আ) বলিলেন: প্রভু! ইহারা কাহারা? জবাবে আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, উহারা হইতেছে তোমারই সন্তান-সন্তুতি। তিনি এক ব্যক্তির দিকে তাকাইয়া তাহার চক্ষুদ্বয়ের মধ্যবর্তী জ্যোতির ঔজ্জ্বল্যে বিমোহিত হইলেন। আদম বলিলেন: প্রভু! এই ব্যক্তিটি কে? জবাবে আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: এই ব্যক্তি হইতেছে তোমার বংশধরদের শেষ দিকের একজন, তাহার নাম দাউদ। আদম পুনরায় বলিলেন: আপনি তাহার জন্য কী পরিমাণ আয়ু বরাদ্দ করিয়াছেন? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: ষাট বৎসর। আদম বলিলেন: প্রভু। আমার আয়ু হইতে তাহার বয়স আরও চল্লিশ বৎসর বাড়াইয়া দিন। যখন আদমের বয়স পূর্ণ হইল, তখন তাঁহার কাছে মৃত্যুর ফেরেশতা আসিলেন। তখন তিনি বলিয়া উঠিলেন: আমার আয়ুর চল্লিশ বৎসর কী অবশিষ্ট রহিয়া যায় নাই? ফেরেশতা বলিলেন: আপনি কি উহা আপনার সন্তান দাউদকে দান করেন নাই? আদম অস্বীকার করিলেন, তাই তাঁহার সন্তানরাও অস্বীকৃতিপ্রবণ। আদম বিস্মৃত হইলেন, তাই তাঁহার সন্তানরাও বিস্মৃতিপ্রবণ।
তিরমিযী বর্ণনাটিকে হাসান সহীহ বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন (কাসাসুল আম্বিয়া (ইবন কাছীর), পৃ. ৪৩)। ইবন আবী হাতিম (র) হযরত আবূ হুরায়রা বর্ণিত এই রিওয়ায়াতে আরও বর্ণনা করিয়াছেন, তারপর আল্লাহ তা'আলা আদমের বংশধরগণকে তাঁহার সম্মুখে উপস্থাপিত করিয়া বলিলেন: ইহারা তোমার সন্তান। তখন তাহাদের মধ্যে কুষ্ঠ ও শ্বেত রোগগ্রস্ত, অন্ধ এবং নানাবিধ ব্যাধিগ্রস্ত লোকজন দেখিতে পাইয়া আদম বলিলেন: প্রভু! আমার সন্তানদিগকে এইরূপ করিলেন কেন? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: যাহাতে তাহারা নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে। তারপর দাউদের ঘটনাটি তিনি উল্লেখ করেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৮১)।
ইমাম-আহমাদ (র) হযরত আবু দারদা (রা) হইতে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা আদমকে সৃষ্টির সময় তাঁহার ডান কাঁধে আঘাত করিলেন এবং এইভাবে তাঁহার শ্বেত শুভ্র একদল সন্তানকে নির্গত করিলেন। তাহাদেরকে মুক্তার ন্যায় দেখাইতেছিল। তারপর তিনি তাঁহার বাম কাঁধে আঘাত করিলেন এবং এইভাবে তাঁহার একদল কৃষ্ণকায় সন্তানকে নির্গত করিলেন। তাহাদেরকে কয়লার ন্যায় দেখাইতেছিল। তারপর তাঁহার ডান পার্শ্ববর্তীদের সম্পর্কে বলিলেন: ইহারা জান্নাতী, আমি কোনও পরোয়া করি না আর বাম পার্শ্ববর্তীদের সম্পর্কে বলিলেন: 'ইহারা জাহান্নামী, আমি কোনও পরোয়া করি না।
ইব্‌ন আবিদ দুনিয়ার রিওয়ায়াতে হাসান হইতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা আদম (আ)-কে সৃষ্টি করার পর তাঁহার ডান পার্শ্বদেশ হইতে জান্নাতীগণকে এবং তাঁহার বাম পার্শ্বদেশ হইতে জাহান্নামীদেরকে নির্গত করেন। তাহারা ভূ-পৃষ্ঠে নিক্ষিপ্ত হয়। তাহাদের মধ্যে অন্ধ, বধির ও অন্যান্য ব্যাধিগ্রস্তরা ছিল। আদম (আ) বলিলেন, প্রভু! আমার সন্তানদেরকে সমান করিয়া সৃষ্টি করিলেন না কেন? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, আমার শুকরিয়া আদায় করা হউক উহাই আমার ইচ্ছা।
আবু হাতিম ইবন হিব্বান উদ্ধৃত হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত রিওয়ায়াতে এই তথ্য আছে: এ সময় আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, আর তখন তাঁহার হস্তদ্বয় মুষ্টিবদ্ধ ছিল, তুমি তোমার ইচ্ছামত দুই হাতের একটি বাছিয়া নাও। আদম বলিলেন, আমি আমার প্রভুর দক্ষিণ হস্ত বাছিয়া লইলাম এবং আমার প্রভুর উভয় হস্তই দক্ষিণ হস্ত (তাঁহার শানের উপযুক্ত) ও বরকতময়। তারপর আল্লাহ তা'আলা উভয় হস্ত প্রসারিত করিলেন। তখন উভয় হস্তে আদম ও তাঁহার সন্তান-সন্তুতিকে দেখা গেল। আদম বলিলেন, প্রভু! উহারা কাহারা? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, উহারা তোমার সন্তান-সন্ততি। প্রত্যেকটি মানুষের চক্ষুদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে তাহাদের আয়ু লিপিবদ্ধ ছিল। তাহাদের মধ্যকার এক ব্যক্তিকে সর্বাধিক উজ্জ্বল দীপ্তিময় দেখা গেল। তাহার আয়ু কেবল চল্লিশ বৎসর লিখিত ছিল। আদম বলিলেন, সে কে? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, তোমার সন্তান দাউদ, আর তাঁহার আয়ু আল্লাহ তা'আলা কেবল চল্লিশ বৎসর লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। আদম বলিলেন, প্রভু! ইহার আয়ু বৃদ্ধি করিয়া দিন। আল্লাহতা'আলা বলিলেন: তাহার জন্য উহাই নির্ধারিত করা হইয়াছে। তখন আদম বলিলেন, আমি আমার নিজ আয়ু হইতে তাহার জন্য ষাট বৎসর দিয়া দিলাম। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, উহা হইতেছে তোমার ও তাহার মধ্যকার ব্যাপার। তুমি জান্নাতে বসবাস কর। তারপর আদম আল্লাহ যত দিন চাহিলেন ততদিন জান্নাতে বসবাস করিলেন। তারপর সেখান হইতে অবতরণ করিলেন।
আদম তাঁহার মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে থাকেন। অবশেষে নির্দিষ্ট সময়ে মৃত্যুর ফেরেশতা তাঁহার নিকট আসিলেন। আদম তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন: আপনি সময়ের পূর্বেই আসিয়াছেন। আমার জন্য তো হাজার বৎসর আয়ু বরাদ্দ করা হইয়াছে। মৃত্যুর ফেরেশতা বলিলেনঃ হাঁ, তাহা সত্য বটে, তবে আপনি আপনার পুত্র দাউদের জন্য তাহা হইতে ষাট বৎসর দান করিয়া ফেলিয়াছেন। আদম তাহা অস্বীকার করিয়া বসিলেন। এজন্য তাহার সন্তানদের মধ্যেও অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা দেয়। আদম বিস্মৃত হন, সুতরাং তাহার সন্তানদের মধ্যেও বিস্মৃতি প্রবণতা দেখা দেয়। সেই দিন হইতেই লিপিবদ্ধ করার এবং সাক্ষী রাখার আদেশ দেওয়া হয় (ইব্‌ন হিব্বান, হাদীছ নং ৬১৩৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ৮২)।
কিন্তু পূর্বোল্লিখিত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত অন্য হাদীছে দাউদ (আ)-এর বয়স চল্লিশ বৎসরের স্থলে ষাট বৎসর বলিয়া উল্লেখ রহিয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল্লাহকে রব বলিয়া স্বীকারোক্তি

📄 আল্লাহকে রব বলিয়া স্বীকারোক্তি


আল্লাহতা'আলা কুরআন শরীফে ইরশাদ করেন:
وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِي آدَمَ مِنْ ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنْفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ قَالُوا بَلَى شَهِدْنَا أَنْ تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيمَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَذَا غَافِلِينَ
"স্মরণ কর, তোমার প্রতিপালক আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ হইতে তাহার বংশধরকে বাহির করেন এবং তাহাদের নিজেদের সম্বন্ধে স্বীকারোক্তি গ্রহণ করেন এবং বলেন, আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই? তাহারা বলে, হাঁ, অবশ্যই, আমরা সাক্ষী রহিলাম। ইহা এইজন্য যে, তোমরা যেন কিয়ামতের দিন না বল, আমরা তো এ বিষয়ে গাফিল ছিলাম। কিংবা তোমরা যেন না বল, আমাদের পূর্বপুরুষগণই তো আমাদের পূর্বে শিরক করিয়াছে, আর আমরা তো তাহাদের পরবর্তী বংশধর। তবে কি পথভ্রষ্টদের কৃতকর্মের জন্য আপনি আমাদেরকে ধ্বংস করিবেন" (৭: ১৭২-৩)?
হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) এই আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি: আল্লাহ তা'আলা আদম (আ)-কে সৃষ্টি করিয়া তাঁহার দক্ষিণ হস্ত আদমের পৃষ্ঠে বুলাইয়া তাঁহার সন্তানদিগকে নির্গত করেন এবং বলেন, ইহাদিগকে জান্নাতের জন্য এবং জান্নাতীদের আমলসহ সৃষ্টি করিয়াছি। তারপর তিনি পুনরায় তাঁহার পৃষ্ঠে হাত বুলাইয়া আরও অনেক বংশধরকে নির্গত করিলেন এবং বলিলেন: ইহাদিগকে জাহান্নামের জন্য এবং জাহান্নামীদের আমলসহ সৃষ্টি করিয়াছি। এক ব্যক্তি বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহা হইলে আর আমল দিয়া কী হইবে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: “যখন আল্লাহ তা'আলা কোন বান্দাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন তখন তিনি তাহাকে জান্নাতীদের আমল করার তৌফিক দেন, জান্নাতীদের আমল করা অবস্থায় তাহার মৃত্যু হয় এবং উহার দ্বারাই সে জান্নাতে প্রবেশ করে। পক্ষান্তরে যখন তিনি কোন বান্দাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, তাহাকে তিনি জাহান্নামের আমল করার আবকাশ দেন। জাহান্নামীদের আমলে রত থাকা অবস্থায়ই সে মৃত্যুবরণ করে এবং উহার দ্বারাই সে জাহান্নামে প্রবেশ করে (আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী প্রমুখ ইমাম মালিক সূত্রে হাদীছটি বর্ণনা করেন; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১ খ., ৮৩)।
হযরত উবাই ইবন কা'ব (রা)-এর এ সংক্রান্ত বর্ণনায় আরও কিছু তথ্য রহিয়াছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা আদম সন্তানদের পৃষ্ঠদেশ হইতে তাহাদের সন্তানদিগকে নির্গত করিয়া তাহাদের সকলকে একত্র করেন, তাহাদিগকে বিভিন্নরূপ করেন, তারপর তাহাদিগকে অবয়ব দান করেন, তারপর তাহাদিগকে বাকশক্তিসম্পন্ন করেন। তাহারা বাক্যালাপ করে। তারপর তিনি তাহাদের নিকট হইতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন এবং তাহাদিগকে তাহাদের সত্তার উপর সাক্ষী করেন এই বলিয়া যে, আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নহি? তাহারা সকলে বলিল হাঁ (আপনি আমাদের প্রতিপালক)।
তখন আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, আমি তোমাদের উপর সপ্ত আকাশ, সপ্ত যমীন এবং তোমাদের পিতা আদমকে সাক্ষী রাখিতেছি, যেন কিয়ামতের দিন তোমরা বলিতে না পার যে, তোমরা ইহা জ্ঞাত ছিলে না। জানিয়া রাখ, আমি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। আমি ব্যতীত কোন প্রতিপালক নাই এবং আমার সহিত অন্য কাহাকেও শরীক সাব্যস্ত করিও না। অচিরেই আমি তোমাদের নিকট আমার রাসূলগণকে প্রেরণ করিব। তাঁহারা তোমাদিগকে আমার অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করাইয়া দিবেন। আমি তোমাদের প্রতি আমার কিতাবসমূহ নাযিল করিব। তাহারা বলিল, আমরা সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনি আমাদের প্রভু ও মাবুদ, আপনি ব্যতীত আমাদের আর কোন প্রতিপালক ও মাবুদ নাই। তাহারা সকলে ইহা স্বীকার করিল। আদম (আ)-কে তাহাদের উপর তুলিয়া ধরা হইল, তিনি তাহাদের দিকে তাকাইয়া রহিলেন। তিনি তাহাদের মধ্যে ধনী-গরীব, সুশ্রী-কুশ্রী সকলকেই দেখিলেন। তিনি বলিলেন: প্রভু! আপনার বান্দাদের সকলকে আপনি যদি সমান করিয়া সৃষ্টি করিতেন। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: আমি চাহিয়াছি যাহাতে (নি'মাতসমূহের জন্য) আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয় (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৮৪)।
তিনি নবীগণকে প্রত্যক্ষ করিলেন। তাঁহাদের মধ্যকার কেহ কেহ উজ্জ্বল প্রদীপের মত চমকাইতেছিলেন। রিসালাত ও নবুওয়াত সম্পর্কে তাঁহাদের নিকট হইতে স্বতন্ত্র একটি অঙ্গীকার গ্রহণ করা হইয়াছিল, যাহা তাঁহার নিম্নোক্ত বাণীতে বিধৃত হইয়াছে:
وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيْثَاقَهُمْ وَمِنْكَ وَمِنْ نُوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ وَأَخَذْنَا مِنْهُمْ مِيثَاقًا غليظا
"স্মরণ কর, যখন আমি নবীদের নিকট হইতে অঙ্গীকার গ্রহণ করিয়াছিলাম; তোমার নিকট হইতেও এবং নূহ, ইবরহীম, মূসা ও মরিয়ম তনয় ঈসার নিকট হইতেও গ্রহণ করিয়াছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার" (৩৩: ৭)।
উবাই (রা) হইতে বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়া ইমাম রাযী (র) বলেন, "সেদিন আল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী সকল আদম-সন্তানকে সৃষ্টি করিয়া তাহাদের অবয়ব দান করেন বা শক্তিসম্পন্ন করেন। তাহারা কথা বলে এবং আল্লাহ তা'আলা তাহাদের নিকট হইতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। সাথে সাথে তাহাদিগকেই তাহাদের সম্পর্কে সাক্ষী রাখেন, আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নহি? জবাবে তাহারা বলেন, হাঁ। এই অঙ্গীকার গ্রহণের স্থান সম্পর্কে বিভিন্ন মত রহিয়াছে:
(১) কাহারো মতে, উহা রূহের জগতে ঘটিয়াছিল;
(২) কাহারো মতে, আদম (আ)-এর দুনিয়ায় আগমনের পর উক্ত ঘটনাটি ঘটে;
(৩) কেহ কেহ আরাফাতের "নামান” নামক স্থানের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। যেমন ইবন আব্বাস (র) হইতে বর্ণিত আছে: আল্লাহ তা'আলা নামানে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন অর্থাৎ আরাফাতে (তানযীমুল আশতাত, ১খ, পৃ. ১১৩, ইসলাহী কুতুবখানা, দেওবন্দ)। ঘটনাটি ঘটিয়াছিল যিলহজ্জ মাসের নবম তারিখে (বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৮৩; ইবন আব্বাস বর্ণিত হাদীছ)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বান্দাদেরকে সাক্ষী রাখার তাৎপর্য

📄 বান্দাদেরকে সাক্ষী রাখার তাৎপর্য


আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنْفُسِهِمْ "আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে তাহাদের নিজেদের সম্পর্কে সাক্ষী রাখিলেন" (৭: ১৭২)।
এই সাক্ষী রাখার ব্যাপারটি কী ছিল তাহার ব্যাখ্যা সম্পর্কেও বিভিন্ন মত রহিয়াছে।
(১) কেহ কেহ ইহাকে রূপক অর্থে গ্রহণ করিয়াছেন। যেমন তাফসীর বায়যাবীতে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাহাদের কাছে দলীল-প্রমাণ উপস্থাপিত করিয়া তাহাদের বিবেক-বুদ্ধিতে এই যোগ্যতা ও সহজাত শক্তি প্রদান করেন যে, তাহারা আল্লাহ্র একত্ববাদ সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করিতে সক্ষম হয়। ফলে তাহারা এ সমস্ত সত্তার সমপর্যায়ে উন্নীত হইয়া যায় যাহাদিগকে আল্লাহ তা'আলা (أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ )"আমি কি তোমাদের প্রভু নই?" বলার সাথে সাথে জবাব দিয়াছিল, (بَلَى )"হাঁ", আপনি আমাদের প্রতিপালক! আল্লাহকে রব বা প্রতিপালকরূপে চিনিয়া লওয়ার শক্তি প্রদানের পর তাহারা যে উহাতে সক্ষম ও সমর্থ হইয়া উঠিয়াছে, উহাকেই উক্ত আয়াতে ইশহাদ বা সাক্ষী রাখা বলা হইয়াছে।
(২) অনেকের মতে এই অঙ্গীকার শাব্দিকভাবেই করা হইয়াছিল, রূপক অর্থে নহে। হযরত ইবন আব্বাস (রা)-এর হাদীছে উহাই ব্যক্ত হইয়াছে এইভাবে: "নবী করীম (স) বলেন, আল্লাহ তা'আলা আদমের সন্তানদের নিকট হইতে তাঁহার পৃষ্ঠদেশে থাকা অবস্থায় অঙ্গীকার গ্রহণ করেন, অতঃপর তাঁহার পৃষ্ঠদেশ হইতে তাঁহার সমস্ত বংশধরকে নির্গত করেন। তারপর তাঁহার সম্মুখে তাহাদিগকে ছড়াইয়া দেন। তারপর তাহাদের সহিত সামনাসামনি কথোপকথন করেন। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নহি? তাহারা বলে, হাঁ, আমরা অবশ্যই সাক্ষী রহিলাম (সুনান নাসায়ীর বরাতে বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, জিলদ ১, পৃ. ৮৩)।
সহীহ হাদীছের এই বর্ণনা হইতে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, আসলেই আক্ষরিক অর্থে সাক্ষী রাখার ব্যাপারটি ঘটিয়াছিল। তালীকুস সাবীহ ফী শারাহ মিশকাতিল মাসাবীহ গ্রন্থে এরূপই উল্লিখিত হইয়াছে। আল্লামা শাব্বীর আহমাদ উছমানী (র) তদীয় তাফসীরে লিখেন, "সৃষ্টির ঊষালগ্নে প্রদত্ত সেই খোদায়ী শিক্ষার প্রভাবেই সর্বযুগের পৃথিবীর সর্বএলাকার আদম সন্তানদের মধ্যে সাধারণভাবে আল্লাহ্ প্রভুত্বের বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণা বিদ্যমান দেখা যায়। ইহা সুস্পষ্ট যে, সৃষ্টির শুরুর সেই ঊষা লগ্নে গোটা মানবজাতিকে নিশ্চয়ই রবুবিয়তের এই আকীদা-বিশ্বাস শিক্ষা দেওয়া হইয়াছিল (তাফসীরে উছমানী, ৭: ১৭২ আয়াতের পাদটীকা)।
আল্লাহকে রব হিসাবে স্বীকার করিবার সেই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারের কথা স্মরণ আছে বলিয়াও কোন কোন মনীষী উল্লেখ করিয়াছেন। হযরত আলী (রা) বলেন: "আমার সেই অঙ্গীকারের কথা সুস্পষ্ট স্মরণ আছে যে দিন আমার প্রভু পরওয়ারদিগার আমার নিকট হইতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। আমি সুস্পষ্টরূপে তাহাদিগকেও চিনিতে পারি যাহারা সেই দিন আমার ডান দিকে ও আমার বাদ দিকে উপস্থিত ছিলেন।" সাহল ইব্‌ন আবদুল্লাহ তস্তরী (র) বলেন, "আমি কি তোমাদের রব নহি" দিবসের সেই অঙ্গীকারের কথা আমার স্মরণ আছে (আল- ইয়াওয়াকীতুল জাওয়াহির গ্রন্থে ইহা উল্লিখিত রহিয়াছে)।
হযরত যুন্-নূন মিসরী (র)-কে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি বলেন, "উহা যেন এখনও আমার কানে বাজিতেছে।" কেহ কেহ তো উহাকে এমনি ঘটনা বলিয়া ধারণা করিয়াছেন যেন উহা মাত্র গতকল্য ঘটিয়াছে (তাফসীর রূহুল মাআনী, উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 একটি সংশয় নিরসন

📄 একটি সংশয় নিরসন


'আলাস্থ বিরাব্বিকুম' দিবসের আলোচনাসম্বলিত আয়াত ও হাদীছের বর্ণনায় বাহ্যত একটি বৈপরিত্য পরিলক্ষিত হয়, যাহাতে সাধারণ পাঠকগণ বিভ্রান্ত হইতে পারেন। ব্যাপারটি এই যে, আয়াতের দ্বারা প্রতীয়মান হয়, আদম সন্তানদিগকে আদম সন্তানদেরই পৃষ্ঠদেশ হইতে নির্গত করা হইয়াছিল (দ্র. ৭: ১৭২)। পক্ষান্তরে হাদীছের বর্ণনায় আছেঃ "অতঃপর তিনি আদমের পৃষ্ঠদেশে তাঁহার দক্ষিণ হস্ত বুলাইয়া দিলেন এবং তাঁহার মধ্য হইতে তাঁহার বংশধরগণকে নির্গত করিলেন"। তাহা হইলে ব্যাপারটি আসলে কী ঘটিয়াছিল? আদম সন্তানদিগকে আদমেরই পৃষ্ঠদেশ হইতে নির্গত করা হইয়াছিল, নাকি তাহাদেরই পরস্পরের পৃষ্ঠদেশ হইতে নির্গত করা হইয়াছিল?
প্রকৃতপক্ষে যাহা ঘটিয়াছিল তাহা এই যে, আদম (আ)-এর প্রত্যক্ষ সন্তান অর্থাৎ তাঁহার নিজ পুত্র-কন্যাগণকে তাঁহারাই পৃষ্ঠদেশ হইতে নির্গত করা হয়। এভাবে ধারাবাহিকতাসহ সকলেই সকলের পিতার পৃষ্ঠদেশ হইতে নির্গত হয়। তাই কুরআন ও হাদীছের উভয় বর্ণনাই সঠিক। সর্বপ্রথম নির্গমন যেহেতু আদমেরই পৃষ্ঠদেশ হইতে হইয়াছিল তাই হাদীছে সেভাবেই উল্লিখিত হইয়াছে। পক্ষান্তরে আয়াতের বর্ণনায় মধ্যবর্তী সন্তানদের মধ্য হইতে পরবর্তী সন্তানদের নির্গমনের উল্লেখ রহিয়াছে। সুতরাং উভয় বর্ণনার মধ্যে কোনই বৈপরিত্য নাই। শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলবী (র) প্রণীত হুজ্জাতুল্লাহিল-বালিগা এবং আল-ইয়াওয়াকীত ওয়াল-জাওয়াহির প্রভৃতি গ্রন্থে এইরূপ উল্লিখিত হইয়াছে (তালীসকু সাবীহ ফী শারহি মিশকাতিল মাসাবীহ-এর বরাতে তানযীমুল আশতাত-হাল্লি আবীসাতিল মিশকত, ১ খ., ১১৫)।
ইবন কাছীর (র) হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেনঃ আল্লাহ তা'আলা আদম (আ)-কে ষাট হাত উচ্চতাবিশিষ্ট করিয়া সৃষ্টি করেন। তারপর কমিতে কমিতে মানবাকৃতি আজিকার পর্যায়ে পৌঁছিয়াছে (বুখারী ও মুসলিমের বরাতে আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৮৫)।
এক বর্ণনা হইতে জানা যায়, তাঁহার দেহের প্রস্থ ছিল সাত হাত (আহমাদ, ২ খৃ., ৫৩৫)। এতদ্ব্যতীত এক রিওয়ায়াতে তো স্পষ্টভাবে আছে ستون ذراعافي السحاد ষাট হাত উর্ধদিকে)। হযরত শায়খ আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী (র) ইহার ব্যাখ্যায় বলিতেন: আদম (আ)-এর এই দৈহিক উচ্চতা বেহেশতে ছিল। যখন তাঁহাকে পৃথিবীতে নামাইয়া দেওয়া হয় তখন তাহা সঙ্গতভাবে হ্রাস করিয়া দেওয়া হয় (বদরে আলম মীরাঠী, তর্জমানুস্ সুন্নাহ, ১খ, ৪৬৯, ইফাবা প্রকাশিত)।
হযরত ইবন আব্বাস (রা) কর্তৃক বর্ণিতঃ "পৃথিবীতে আদম (আ)-এর সর্বপ্রথম খাদ্য ছিল গম। জিবরাঈল (আ) তাঁহার কাছে সাতটি গমের দানাসহ উপস্থিত হন। আদম (আ) তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন: উহা কি? জিবরাঈল (আ) বলিলেন: উহা সেই নিষিদ্ধ ফল যাহা ভক্ষণ করিতে বেহেশতে আপনাকে বারণ করা হইয়াছিল, কিন্তু এতদসত্ত্বেও আপনি তাহা ভক্ষণ করিয়াছিলেন। আদম (আ) জিজ্ঞাসা করিলেন: উহা দ্বারা আমি কী করিব? জবাবে জিবরাঈল (আ) বলিলেন: উহা আপনি ভূমিতে বপন করিবেন। সে মতে তিনি তাহা বপন করেন। এই বর্ণনায় আছেঃ ঐ দানাসমূহের প্রত্যেকটির ওজন ছিল লক্ষ দানার চেয়েও বেশী। ঐ দানাগুলি বপনের পর ফসল উৎপন্ন হয়, তিনি উহা কর্তন করিয়া ঘরে উঠান, মাড়াইয়া পিষিয়া আটা বানান। অতঃপর মণ্ড বা খামীর করিয়া রুটি প্রস্তুত করেন। এইভাবে বহু রকম ক্লেশ ও পরিশ্রমের পর উহা ভক্ষণ করেন (তারীখ তাবারী, ১খ, ১২৮)। ইহাই ছিল আল্লাহ্‌ তা'আলার পূর্ব-সতর্কবাণীর তাৎপর্য, যাহাতে তিনি আদম (আ)-কে বলিয়া দিয়াছিলেন:
فَلَا يُخْرِجَنَّكُمَا مِنَ الْجَنَّةِ فَتَشْقَى
"শয়তান যেন তোমাদের উভয়কে জান্নাত হইতে বাহির করিয়া না দেয়, দিলে তোমরা দুঃখ-কষ্ট পাইবে।"
ইবন আসাকির কর্তৃক উদ্ধৃত হযরত আনাস (রা) বর্ণিত হাদীছ হইতে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: "আদম ও হাওয়াকে পৃথিবীতে একত্রে নামাইয়া দেওয়া হয়। তখন তাঁহাদের পরণে ছিল জান্নাতের বৃক্ষপত্র। একত্র হওয়ার পর উত্তাপক্লিষ্ট আদম বসিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে হাওয়াকে উদ্দেশ্য করিয়া বলেনঃ হে হাওয়া! তাপ আমাকে ক্লিষ্ট করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, তখন জিবরাঈল তুলা লইয়া আসিয়া হাওয়াকে উহা দ্বারা সূতা কাটিতে বলেন এবং উভয়কে কাপড় বয়ন শিখাইয়া দেন (আল-বিদায়া ও ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৭৪)। এইভাবে পৃথিবীতে তাঁহাদের বস্ত্র পরিধানের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু তাঁহাদের প্রথম পরিহিত পোশাক ভেড়ার লোমের দ্বারা নির্মিত ছিল বলিয়া অন্য রিওয়ায়াতে উল্লিখিত হইয়াছে! প্রথমে ভেড়ার দেহ হইতে পশম খসাইয়া তারপর উহা হইতে সূতা কাটেন। তারপর আদম (আ) তাঁহার নিজের জন্য একটি জোব্বা এবং হাওয়া (আ)-এর জন্য একটি কামীস ও একটা ওড়না তৈয়ার করেন" (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১খ, ৮৫)।
وَطَفِقَا يَخْصِفَانِ عَلَيْهِمَا مِنْ وَرَقِ الْجَنَّةِ .
আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত ইবন আব্বাস (রা) বলেনঃ জান্নাতের যে বৃক্ষপত্রে আদম ও হাওয়া (আ) সর্বপ্রথম লজ্জা নিবারণ করিয়াছিলেন, উহা ছিল ডুমুর বৃক্ষের পত্র (৭ঃ ২২ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে)। ইবন কাছীর এই বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়া মন্তব্য করেন, সম্ভবত উহা আহলে কিতাবগণের নিকট হইতে প্রাপ্ত তথ্য। আয়াতের বাহ্যিক অর্থ সুনির্দিষ্ট কোন বৃক্ষের প্রতি ইঙ্গিতবহ নহে, ব্যাপক অর্থে উহা ব্যবহৃত। আর উহা মানিয়া লইলেও কোন ক্ষতি নাই। আল্লাহই সম্যক অবগত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৭৩)।
আদম ও হাওয়া (আ) জান্নাতে কোন সন্তান লাভ করিয়াছিলেন কি না তাহা লইয়া মতানৈক্য রহিয়াছে। ইবন কাছীর (র) বলেন: জান্নাতে ঐ দম্পতি যুগলের কোন সন্তান জন্মগ্রহণ করিয়াছিল কিনা তাহা লইয়া সীরাতবিদগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। তাঁহাদের কেহ কেহ বলিয়াছেন: জান্নাতে তাঁহাদের কোন সন্তান জন্ম গ্রহণ করে নাই। আবার অন্যরা বলিয়াছেন: না, বরং সেখানেই তাঁহাদের সন্তানের জন্ম হইয়াছে। কাবিল এবং তাহার ভগ্নীটির জন্ম জান্নাতেই হইয়াছিল।
ইমাম ইবন জারীর তাবারী (র) তদীয় ইতিহাস গ্রন্থে হাওয়ার গর্ভে বিশ দফায় চল্লিশজন সন্তানের জন্মগ্রহণের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। ইবন ইসহাক তাহাদের নামসমূহও বর্ণনা করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৮৯; আল-কামিল ফিত-তারীখ, ১খ, ৪২)। আবার কহে কেহ এক শত কুড়ি দফায় প্রত্যেক দফায় একজন পুত্র সন্তান ও একজন কন্যা সন্তান মোট দুই শত চল্লিশজন সন্তানের জন্ম লাভের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। সর্বপ্রথম দফায় কাবীল এবং তাহার যমজ ভগ্নী একলীমা এবং সর্বশেষ দফায় আবদুল মুগীছ এবং তদীয় যমজ ভগ্নী উম্মুল মুগীছ জন্মগ্রহণ করেন। তারপর ক্রমান্বয়ে তাহাদের সন্তান-সন্তুতির সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতে থাকে, যাহার কথা আল্লাহ তা'আলা ব্যক্ত করিয়াছেন এইভাবে:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱتَّقُوا۟ رَبَّكُمُ ٱلَّذِى خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَٰحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا ونساء .
"হে মানব! তোমারা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর যিনি তোমাদিগকে এক ব্যক্তি হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন ও যিনি তাহা হইতে তাহার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেন, যিনি তাহাদের দুইজন হইতে বহু নর-নারী ছড়াইয়া দেন” (৪৪১)।
ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করিয়াছেন যে, চারি লক্ষ সন্তান-সন্তুতি ও অধস্তন বংশধর না দেখিয়া আদম (আ) এই পৃথিবী হইতে বিদায় নেন নাই (কাসাসুল আম্বিয়া, ইবন কাছীর, পৃ. ৫৭)। তাঁহার এই সন্তান-সন্তুতির মধ্যে তাঁহার পুত্র শীছ (আ) ছিলেন অনন্য মর্যাদার অধিকারী। হাবীলের নিহত হওয়ার পর আদম (আ) এতই ভাঙ্গিয়া পড়েন যে, আওযাঈ-হাসান-ইবন আতিয়্যা বর্ণিত রিওয়ায়াতে আছে: আদম (আ) জান্নাতে অবস্থান করেন এক শত বৎসর। বর্ণনান্তরে ষাট বৎসর; জান্নাত হারানোর দুঃখে আক্ষেপ করিয়া কান্নাকাটি করিয়া কাটান চল্লিশ বৎসর (ইব্‌ন আসাকিরের বরাতে কাসাসুল আম্বিয়া, ইবন কাছীর প্রণীত, পৃ. ২৯)।
শীছ শব্দের অর্থ حبة الله বা আল্লাহর দান। পুত্র বিরহে শোকাতুর আদম (আ) আল্লাহ্র এই দান পাইয়া অনেকটা শান্ত হইয়াছিলেন। এই শীছ (আ) পরবর্তীতে আসমানী গ্রন্থধারী রাসূলও হইয়াছিলেন। সুতরাং তাঁহার মর্যাদা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশী ছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00