📄 আদম (আ)-এর তওবা
আবু হাতিম হযরত উবায়্য ইন্ন কা'ব (রা) বর্ণিত হাদীছ বর্ণনা করেন যাহাতে বলা হইয়াছে: রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আদম (আ) আল্লাহ তা'আলার দরবারে আরয করেন, আমি যদি তওবা করি এবং আপনার দিকে রুজু হই তাহা হইলে কি আমি বেহেশতে ফিরিয়া যাইতে পারিব? জবাবে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হাঁ। এই প্রসঙ্গেই আয়াত নাযিল হয়:
فَتَلَقَّى آدَمُ مِنْ رَّبِّهِ كَلِمَت فَتَابَ عَلَيْهِ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ .
"অতঃপর আদম তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে কিছু বাণী প্রাপ্ত হইল। আল্লাহ তাহার প্রতি ক্ষমাপরবশ হইলেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (২ঃ৩৭)।
মুজাহিদ, কাতাদা, সাঈদ ইবন জুবায়র প্রমুখ হইতে বর্ণিত আছে যে, সেই বিশেষ প্রার্থনা বাক্য ছিল সূরা আ'রাফের ২৩ নং আয়াতে বর্ণিত বাক্যগুলি:
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَّمْ تَغْفِرْلَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ .
"হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করিয়াছি, যদি তুমি আমাদেরকে ক্ষমা না কর এবং দয়া না কর তবে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হইব" (৭ঃ ২৩; তাফসীর তাবারী, জিলদ ১, পৃ. ২৪৪-২৪৫)।
হাকেম তদীয় মুস্তাদরাক গ্রন্থে সাঈদ ইব্ন জুবায়র-ইব্ন আব্বাস (র) সূত্রে উপরিউক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন: "আদম (আ) বলিলেন: আপনি কি আমাকে স্বহস্তে সৃষ্টি করেন নাই? জবাবে তাঁহাকে বলা হইল: হাঁ। তিনি প্রশ্ন করিলেন: আপনি কি আমার মধ্যে আপনার রূহ ফুঁকিয়া দেন নাই?' জবাবে বলা হইল: হাঁ। তিনি আবার প্রশ্ন করিলেন: আমি যদি তওবা করি, আপনি কি আমাকে জান্নাতে ফিরাইয়া নিবেন? জবাবে আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: হাঁ (হাকেম, ২খ, পৃ. ৫৪৫)। হাকেম উহা সহীহ বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন (ইবন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩১)।
হাকেম হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (র) বর্ণিত রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: আদমের যখন পদস্খলন হইল তখন তিনি বলিলেন, প্রভু! মুহাম্মাদ (স)-এর উসীলায় আমি আপনার নিকট যাজ্ঞা করিতেছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করিয়া দিন। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: তুমি মুহাম্মাদকে কেমনে চিনিতে পারিলে অথচ এখনও আমি তাহাকে সৃষ্টি করি নাই? জবাবে আদম (আ) বলিলেন: যখন আপনি স্বহস্তে আমাকে সৃষ্টি করিলেন এবং আমার মধ্যে আপনার 'রূহ' ফুঁকিয়া দিলেন তখন আমি মাথা উঠাইয়া আরশের পায়াসমূহের মধ্যে লিখিত দেখিতে পাইলাম : لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَّسُولُ الله তখন আমি উপলব্ধি করিতে পারিলাম যে, নিশ্চয়ই আপনার সৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক প্রিয় সত্তা ব্যতীত অন্য কাহাকেও আপনি আপনার পবিত্র নামের সহিত সম্পর্কিত করেন নাই। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: তুমি যথার্থই বলিয়াছ হে আদম! নিশ্চয় তিনি আমার কাছে সৃষ্টি জগতের সকলের তুলনায় প্রিয়। যখন তুমি তাঁহার উসীলায় ক্ষমা প্রার্থনা করিয়াছ, তখন আমি তোমাকে মাফ করিয়া দিলাম। মুহাম্মাদ না হইলে আমি তোমাকেও সৃষ্টি করিতাম না (হাকিম, মুস্তাদরাক, জিলদ ২, পৃ. ৬১৫)। হাদীছটির মূল উৎস আল-মুসতাদরাক, ২খ., পৃ. ৬১৫ এবং তাবারানীর মুজামুস সাগীর, পৃ. ২০৭। উক্ত গ্রন্থদ্বয় হইতে ইহা বায়কীর দালাইলুন নুবুওয়্যা, বাব মা জাআ ফীমা তাহাদ্দাছা বিহি (স) বিনি'মাতি রব্বিহি; ইব্ন আসাকির, ২খ., পৃ. ৩২৩; হায়ছামীর মাজমা'উয যাওয়াইদ, ৮খ., পৃ. ২৬০ প্রভৃতি গ্রন্থে উক্ত হইয়াছে। হাকেম ইহার সনদসূত্র যথার্থ বলিয়া মত ব্যক্ত করিলেও তাহা যথার্থ নহে। হাদীছের যথার্থতা যাচাইকারী ইমামগণ, যথা ইমাম যাহাবী, ইব্ন কাছীর (তারীখ, ২খ., পৃ. ৩২৩), ইব্ন হাজার আসকালানী, ইব্ন হিব্বান, আবূ নু'আয়ম, ইব্ন তায়মিয়্যা প্রমুখ ইমামগণ ইহাকে জাল হাদীছ (মনগড়া) ও বাতিল রিওয়ায়াত বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন। ইমাম বায়হাকী, ইবনুল জাওযী, তাহাবী প্রমুখ উক্ত রিওয়ায়াতের কতক রাবীর কঠোর সমালোচনা করিয়াছেন (বিস্তারিত দ্র. নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীছিদ দা'ঈফা ওয়াল-মাওদূআহ, ৪র্থ সং., বৈরূত-দামিল্ক ১৩৯৮ হি., ১খ., পৃ. ৩৮-৪৭, নং ২৫)। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে আদম (আ) আল্লাহর শিখানো দোআটি ছিল:
رَبُّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْلَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ (۲۳ : ۷) .
📄 আদম (আ) ও মূসা (আ)-এর বাদানুবাদ
আদম (আ) কর্তৃক নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ, বেহেশত হইতে তাঁহার নির্গমন ও এই পৃথিবীতে আগমন বাহ্যত তাঁহার অপরাধ ও শাস্তি মনে হইলেও ইহাই ছিল মহান কুশলী স্রষ্টার অভিপ্রায়। এই ব্যাপারে হযরত মূসা (আ) কর্তৃক আদি পিতা আদম (আ)-এর অভিযুক্ত হওয়া এবং সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাঁহার জবাব দানের বিবরণও এই সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করে। বুখারী শরীফে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীছে বলা হইয়াছে যে, নবী করীম (স) বলেন: মূসা (আ) আদম (আ)-এর সহিত বিতর্কে বলিলেন: আপনিই মানব জাতিকে আপনার ত্রুটির কারণে বেহেশত হইতে বহিষ্কার করিয়াছেন এবং তাহাদের দুর্ভাগ্য-দুর্গতির কারণ হইয়াছেন। আদম (আ) বলিলেনঃ হে মূসা! তুমি সেই ব্যক্তি যাহাকে আল্লাহ তাঁহার রিসালাত ও বাক্যালাপের জন্য নির্বাচিত ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করিয়াছেন। তুমি কি এমন একটি ব্যাপারে আমাকে দোষারোপ করিতেছ যাহা আমাকে সৃষ্টি করার পূর্বেই আল্লাহ আমার জন্য নির্ধারিত করিয়া রাখিয়াছিলেন? রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আদম (আ) বিতর্কে মূসা (আ)-এর উপর জয়ী হন। বুখারীর এক রিওয়ায়াতে রাসূলুল্লাহ (স) এই কথাটি ২ বার এবং অন্য রিওয়ায়াতে ৩ বার বলিয়াছেন বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে।
এই প্রসঙ্গে ইমাম আহমদ উল্লেখ করেন আদম (আ) মূসা (আ)-এর প্রতি তাওরাত নাযিলের কথা উল্লেখের সময় সাথে সাথে তাঁহাকে প্রশ্ন করেন: "আমি আগের, নাকি যিকর (তাওরাত) আগের?” জবাবে মূসা (আ) বলিলেন: না, বরং যিকর (তাওরাত) আগের। এই বর্ণনায় আরও আছে, মূসা (আ) আদম (আ) কে বলিয়াছিলেন: "আপনি সেই আদম যাহাকে আল্লাহ স্বহস্তে সৃষ্টি করিয়াছেন, তাঁহার ফেরেশতা দিয়া আপনাকে সিজদা করাইয়াছেন, আপনাকে জান্নাতে বসবাস করাইয়াছেন। তারপর আপনি সেই কাজটি করিলেন, যাহা আপনি করিয়াছিলেন"। আহমদের অন্য বর্ণনায় আছে, আদম (আ) ঐ সময় মূসা (আ) কে প্রশ্ন করেন: "আমার সৃষ্টির পূর্বেই কি তুমি আমার ব্যাপারে উহা লিখিত পাও নাই?" মূসা (আ) তাহা স্বীকার করিলেন। এইভাবে আদম (আ) মূসাকে পরাস্ত করিলেন (আহমাদ, ২খ. ৩৯২)।
ইবন আবূ হাতিমের বর্ণনায় আছে, আদম (আ) মূসা (আ)-কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তাওরাত আমার জন্মের কত আগে লিখিত হইয়াছিল? মূসা (আ) বলেন: চল্লিশ বৎসর আগে। আদম (আ) আবার প্রশ্ন করেন: তাহাতে কি পাও নাই: (وَغَطَى أَدَمُ رَبَّهُ فَفَوُی ) আদম তাহার প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করে এবং ভ্রমে পতিত হয়, ২০ : ১২১? জবাবে মূসা (আ) বলিলেন: হাঁ। তখন আদম (আ) বলিলেন: যে কাজটি আমি করিব বলিয়া আমাকে সৃষ্টির চল্লিশ বৎসর পূর্বেই লিপিবদ্ধ করা হইয়াছে, তাহা আমি কেন করিলাম এইজন্য তুমি আমাকে ভর্ৎসনা করিতেছ?" রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আদম মূসার উপরে জয়ী হইলেন। ইমাম মুসলিমও হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন (মুসলিম, হাদীছ নং ২৬৫২; কাসাসুল আম্বিয়া, ইবন কাছীর, পৃ. ৩৬)।
বায়হাকীর বর্ণনায় আদম (আ)-এর জবাবী বাক্যটি আরও জোরদারভাবে বর্ণিত হইয়াছে এইভাবে: "তুমি এমন একটি ব্যাপারে আমাকে তিরস্কার করিতেছ যাহা মহান আল্লাহ কর্তৃক পূর্বেই স্থিরীকৃত হইয়াছিল" (বায়হাকী, ফী আল-আসমা ওয়াস-সিফাত ১খ, ৩১৬)।
মূসা ও আদম (আ)-এর এই বাদানুবাদ কোথায় কিভাবে হইয়াছিল সেই সম্পর্কে মতভেদ আছে। (১) য়াযীদ ইবন হরমূয-এর বর্ণনায় عند ربهما )তাঁহাদের প্রতিপালকের দরবারে) কথাটি আছে। (২) মুহাম্মাদ ইবন সীরীন-এর বর্ণনায় আছে التقى ادم موسی )মূসা ও আদমের সাক্ষাৎ হয়)। (৩) আম্মার ও শা'বীর বর্ণনায় আছে لقى موسی ادم আদম (আ) মূসা (আ)-এর সহিত সাক্ষাৎ করিলেন)]।
(৪) হযরত উমর (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীছে আছে: মূসা (আ) আদম (আ)-এর সহিত সাক্ষাৎ করেন।
(৫) আবূ দাউদের বর্ণনায় আছে: (قال موسى يا رب أرنی ادم) (মুসা বলেন : হে আল্লাহ! আমাকে আদমকে দেখাইয়া দিন)।
ফাতহুল বারীতে হাফিয ইব্ন হাজার বলেন, উক্ত ঘটনা কখনকার তাহা লইয়া পণ্ডিতগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। কেহ কেহ বলিয়াছেন, হয়তোবা উহা মূসা (আ)-এর আমলের ঘটনা। মূসা (আ)-এর মুজিযাস্বরূপ আল্লাহ তা'আলা তখন আদম (আ)-এর প্রতি ওহী প্রেরণ করেন এবং তিনিই তাঁহাকে কথা বলান অথবা তাঁহার জন্য আদম (আ)-এর কবর উন্মোচিত করিয়া দেন এবং তাঁহার কাশ্ফ হয়। তখন তাঁহারা দুইজন কথোপকথন করেন অথবা তাঁহাকে আদম (আ)-এর রূহ দেখাইয়া দেন, যেমনটি নবী করীম (স)-কে মি'রাজ রজনীতে নবী-রাসূলগণের রূহ দেখান হইয়াছিল অথবা তাঁহাকে স্বপ্নে আদম (আ)-কে দেখান হয়। আর নবী-রাসূলগণের স্বপ্নও ওহীবিশেষ যদিও তাহা পরবর্তী কালে সংঘটিত হয়। ইহা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ, যেমনটি ইসমাঈল যাবীহুল্লাহ (আ)-এর ব্যাপারে ঘটিয়াছিল অথবা ইহা মূসা (আ)-এর ইন্তিকালের পরে সংঘটিত হইয়াছিল। তাঁহার মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই আলমে বারযাখে এই সাক্ষাৎকার ঘটে। প্রথম আসমানে তাঁহাদের উভয়ের রূহের সাক্ষাৎ হয়। ইব্ন আবদিল বারর ও কাসিবী এই মত দৃঢ়ভাবে পোষণ করেন। ইব্ন উমার (রা) বর্ণিত হাদীছে তো এইরূপ উক্ত হইয়াছে যে, মূসা (আ) যখন বলিলেন: 'আপনিই আদম?' আদম (আ) বলিলেন: আপনি কে? তিনি বলিলেন, আমি মূসা। উহা নিশ্চয়ই পরে সংঘটিত হয় নাই। উহা পরকালে সংঘটিত হইবে। হাদীছেঅতীত বাচক শব্দ প্রয়োগ করা হইয়াছে। এই অর্থে উহা নিশ্চিতভাবেই সংঘটিত হইবে। ইবনুল জাওযী বারযাখে তাঁহাদের সাক্ষাতের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করিয়াছেন। আবার উহা একটি রূপক বা মিছাল হওয়ার কথাটাও উড়াইয়া দেওয়া যায় না। তখন উহার অর্থ হইবে, যদি তাঁহাদের দুইজনের সাক্ষাৎ হইত, তবে অবশ্যই তাহাদের মধ্যে উক্তরূপ বাক্যালাপ হইত (ফাতহুল বারী, ১১খ, পৃ. ৫১৫; দারুর রায়্যান বিত-তুরাছ, ২য় সং, কায়রো ১৯৮৯)।
শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দিহলাবী (র) বলেন : উহার সারমর্ম হইল, স্বপ্নে কোন ফেরেশতা বা পুণ্যবান লোকের কাছে অজ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসার মাধ্যমে কোন ব্যক্তির জ্ঞানলাভের মতো রূহের জগতে মূসা (আ) হযরত আদম (আ)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করিয়া উক্ত ঘটনাগর্ভে নিহিত বিষয়াদি জানিয়া লইয়াছিলেন। আল্লাহ তা'আলা মূসা (আ)-এর জন্য ইল্ম-এর এই দ্বার উন্মুক্ত করিয়াছিলেন (তা'লীকুস সাবীহ 'আলা মিশকাত মাসাবীহ, ইদ্রিস কান্দেহলাবী, পৃ. ৭৭)।
📄 তওবা কবুলের পর তিরস্কার নিষিদ্ধ
পূর্বেই আলোচনা করা হইয়াছে যে, আদম (আ)-এর নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ কোন অপরাধ ছিল না, তবুও তাঁহার মত মর্যাদাসম্পন্ন সত্তা এবং আদি মানব ও আদি নবীর পক্ষে তাহা শোভনীয় হয় নাই বিধায় তাঁহার এই কর্মটিকে عصيان (পদস্খলন) বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। একই আয়াতের غوى শব্দটির অর্থে জীবন বিস্বাদ হইয়া যাওয়া। কুরতুবী প্রমুখ তাফসীরবিদগণ আয়াতে উক্ত غوی শব্দটি এই অর্থেই ব্যবহৃত হইয়াছে বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (দ্র. কুরতুবী, ঐ আয়াতের ব্যাখ্যায়)। ইবনুল আরাবী শব্দের আলোচনা প্রসঙ্গে লিখেন : কুরআন শরীফের উক্ত আয়াত আলোচনা প্রসঙ্গ বা এই সংক্রান্ত উক্ত হাদীছের আলোচনা প্রসঙ্গ ছাড়া আজ আমাদের মধ্যকার কাহারও জন্য আদম (আ)-এর অপরাধ প্রসঙ্গ আলোচনা করা জায়েয নহে। নিজেদের পক্ষ হইতে যেখানে নিজদের নিকটবর্তী কালের এবং নিজেদের প্রায় সমপর্যায়ের পিতৃপুরুষগণের সম্পর্কে এইরূপ আলোচনা জায়েয নহে, সেখানে আমাদের আদি পিতা এবং সবচাইতে সম্মানিত পিতা ও সর্বপ্রথম নবীর ব্যাপারে এইরূপ নিন্দাসূচক আলোচনা কীরূপে জায়েয হইতে পারে- যেখানে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার কৈফিয়ত গ্রহণ করিয়া তাঁহার তওবা কবুল করিয়া তাঁহাকে ক্ষমাও করিয়া দিয়াছেন? এই কারনেই আবু নসর কুশায়রী (র) বলেন: কুরআনে ব্যবহৃত উক্ত শব্দের কারণে আদম (আ)-কে গুনাহগার ও পথভ্রষ্ট বলা জায়েয নহে। কুরআন পাকের যেখানেই কোন নবী অথবা রাসূল সম্পর্কে এরূপ ভাষণ প্রয়োগ করা হইয়াছে, তাহা হয় অনুত্তম ( خلاف أولى) বুঝানোর জন্য, না হয় নবুওয়াত পূর্ববর্তী অবস্থা বুঝানোর জন্যই ব্যবহৃত হইয়াছে। তাই কুরআনী আয়াতে ও হাদীছ রিওয়ায়াতের প্রসঙ্গ ব্যতিরেকে নিজেদের পক্ষ হইতে এরূপ বিষয়ের অবতারণা করার বৈধতা বা অনুমতি নাই (কুরতুবী, ২০: ১২২,-এর তাফসীর প্রসঙ্গে; তাফসীর মা'আরিফুল কুরআন, মুফতী মুহাম্মদ শফী, উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায়)।
📄 দাউদ (আ)-কে আদম (আ)-এর আয়ু দান
হাকেম আবূ ইয়ালা হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীছ উদ্ধৃত করেন যাহাতে বলা হইয়াছে: "সর্বপ্রথম আদম (আ)-এর দেহের যে অংশে রূহ সঞ্চারিত হয় তাহা হইল তাঁহার চক্ষু ও নাসারন্ধ্র। তখন তিনি হাঁচি দিলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বলিলেন : (يرحمك ربك) তোমার প্রভু তোমার প্রতি সদয় হউন)। তারপর আল্লাহ তা'আলা বলিলেনঃ হে আদম! উহাদের দিকে (ফেরেশতাদের প্রতি ইঙ্গিত করিয়া) যাও এবং তাহাদের উদ্দেশ্যে বল: আস্সালামু 'আলায়কুম। তারপর লক্ষ্য কর তাহারা কী বলে। আদম তাহাদের নিকট গেলেন এবং তাহাদেরকে সালাম দিলেন। জবাবে ফেরেশতাগণ বলিলেন: ওআলায়কাস্ সালামু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: ইহাই তোমার এবং তোমার সন্তানদের অভিবাদন পদ্ধতি। তখন আদম বলিলেনঃ হে প্রভু পরোয়ারদিগার! আমার সন্তান কী? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: আমার হাত গ্রহণ কর হে আদম! আদম বলিলেন: আমি আমার প্রভুর ডান হাত বাছিয়া নিতেছি এবং আমার প্রভুর উভয় হাতই ডান হাত এবং বরকতময়। অতপর আল্লাহতা'আলা তদীয় হাতের তালু প্রসারিত করিলেন। আদমের অনাগতকালের সকল সন্তানকেই পরম দয়াময়ের হাতের তালুর মধ্যে দেখা গেল। তাহাদের অনেকের মুখমণ্ডলই দীপ্তিময়। তন্মধ্যে এক ব্যক্তির দীপ্তি আদমের অত্যন্ত পছন্দ হইল। তিনি বলিলেন: 'প্রভূ! একে?' জবাবে আল্লাহতা'আলা বলিলেন: তোমারই সন্তান দাউদ।
আদম (আ) তখন জিজ্ঞাসা করিলেন: প্রভু। আপনি তাহার জন্য বয়স কী পরিমাণ বরাদ্দ করিয়াছেন? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: আমি তাহার জন্য ষাট বৎসর আয়ু বরাদ্দ করিয়াছি। আদম বলিলেন: প্রভু! আমার আয়ু হইতে তাহার আয়ু পূর্ণ করিয়া দিন-যাহাতে তাহার আয়ু শত বৎসর হয়। আল্লাহ তা'আলা তাহাই করিলেন এবং তাহাকে সাক্ষীও রাখিলেন। তারপর যখন আদমের আয়ু গত হইল আল্লাহ তা'আলা তখন মৃত্যুর ফেরেশতাকে প্রেরণ করিলেন। তখন আদম (আ) তাঁহাকে বলিলেন: আমার আয়ুর চল্লিশ বৎসর কি অবশিষ্ট নাই? ফেরেশতা তাঁহাকে বলিলেন: আপনি কি তাহা আপনার পুত্র দাউদকে দান করেন নাই? আদম অস্বীকার করিলেন, ফলে তাঁহার সন্তানরাও অস্বীকার করে। তিনি বিস্মৃত হইলেন, তাই তাঁহার সন্তানরাও বিস্তৃত হয় (আবূ ইয়ালা, মুসনাদ, ১১খ., ৪৫৩)।
তিরমিযীর এতদসংক্রান্ত বর্ণনাটি এইরূপ: হযরত আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: "আল্লাহ তা'আলা আদমকে সৃষ্টি করার পর তাঁহার পৃষ্ঠদেশে হাত বুলাইলে তাঁহার পৃষ্ঠদেশ হইতে কিয়ামত পর্যন্ত যাহারা সৃষ্টি হইবে তাঁহার সেই অনাগত সন্তানগণ বাহির হইয়া পড়িল। আল্লাহ তা'আলা তাহাদের মধ্যকার প্রতিটি মানুষের চক্ষুদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি জ্যোতির ঔজ্জ্বল্য সৃষ্টি করিলেন। তারপর সেইগুলিকে আদমের সম্মুখে উপস্থাপিত করিলেন। আদম (আ) বলিলেন: প্রভু! ইহারা কাহারা? জবাবে আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, উহারা হইতেছে তোমারই সন্তান-সন্তুতি। তিনি এক ব্যক্তির দিকে তাকাইয়া তাহার চক্ষুদ্বয়ের মধ্যবর্তী জ্যোতির ঔজ্জ্বল্যে বিমোহিত হইলেন। আদম বলিলেন: প্রভু! এই ব্যক্তিটি কে? জবাবে আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: এই ব্যক্তি হইতেছে তোমার বংশধরদের শেষ দিকের একজন, তাহার নাম দাউদ। আদম পুনরায় বলিলেন: আপনি তাহার জন্য কী পরিমাণ আয়ু বরাদ্দ করিয়াছেন? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: ষাট বৎসর। আদম বলিলেন: প্রভু। আমার আয়ু হইতে তাহার বয়স আরও চল্লিশ বৎসর বাড়াইয়া দিন। যখন আদমের বয়স পূর্ণ হইল, তখন তাঁহার কাছে মৃত্যুর ফেরেশতা আসিলেন। তখন তিনি বলিয়া উঠিলেন: আমার আয়ুর চল্লিশ বৎসর কী অবশিষ্ট রহিয়া যায় নাই? ফেরেশতা বলিলেন: আপনি কি উহা আপনার সন্তান দাউদকে দান করেন নাই? আদম অস্বীকার করিলেন, তাই তাঁহার সন্তানরাও অস্বীকৃতিপ্রবণ। আদম বিস্মৃত হইলেন, তাই তাঁহার সন্তানরাও বিস্মৃতিপ্রবণ।
তিরমিযী বর্ণনাটিকে হাসান সহীহ বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন (কাসাসুল আম্বিয়া (ইবন কাছীর), পৃ. ৪৩)। ইবন আবী হাতিম (র) হযরত আবূ হুরায়রা বর্ণিত এই রিওয়ায়াতে আরও বর্ণনা করিয়াছেন, তারপর আল্লাহ তা'আলা আদমের বংশধরগণকে তাঁহার সম্মুখে উপস্থাপিত করিয়া বলিলেন: ইহারা তোমার সন্তান। তখন তাহাদের মধ্যে কুষ্ঠ ও শ্বেত রোগগ্রস্ত, অন্ধ এবং নানাবিধ ব্যাধিগ্রস্ত লোকজন দেখিতে পাইয়া আদম বলিলেন: প্রভু! আমার সন্তানদিগকে এইরূপ করিলেন কেন? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: যাহাতে তাহারা নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে। তারপর দাউদের ঘটনাটি তিনি উল্লেখ করেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৮১)।
ইমাম-আহমাদ (র) হযরত আবু দারদা (রা) হইতে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা আদমকে সৃষ্টির সময় তাঁহার ডান কাঁধে আঘাত করিলেন এবং এইভাবে তাঁহার শ্বেত শুভ্র একদল সন্তানকে নির্গত করিলেন। তাহাদেরকে মুক্তার ন্যায় দেখাইতেছিল। তারপর তিনি তাঁহার বাম কাঁধে আঘাত করিলেন এবং এইভাবে তাঁহার একদল কৃষ্ণকায় সন্তানকে নির্গত করিলেন। তাহাদেরকে কয়লার ন্যায় দেখাইতেছিল। তারপর তাঁহার ডান পার্শ্ববর্তীদের সম্পর্কে বলিলেন: ইহারা জান্নাতী, আমি কোনও পরোয়া করি না আর বাম পার্শ্ববর্তীদের সম্পর্কে বলিলেন: 'ইহারা জাহান্নামী, আমি কোনও পরোয়া করি না।
ইব্ন আবিদ দুনিয়ার রিওয়ায়াতে হাসান হইতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা আদম (আ)-কে সৃষ্টি করার পর তাঁহার ডান পার্শ্বদেশ হইতে জান্নাতীগণকে এবং তাঁহার বাম পার্শ্বদেশ হইতে জাহান্নামীদেরকে নির্গত করেন। তাহারা ভূ-পৃষ্ঠে নিক্ষিপ্ত হয়। তাহাদের মধ্যে অন্ধ, বধির ও অন্যান্য ব্যাধিগ্রস্তরা ছিল। আদম (আ) বলিলেন, প্রভু! আমার সন্তানদেরকে সমান করিয়া সৃষ্টি করিলেন না কেন? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, আমার শুকরিয়া আদায় করা হউক উহাই আমার ইচ্ছা।
আবু হাতিম ইবন হিব্বান উদ্ধৃত হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত রিওয়ায়াতে এই তথ্য আছে: এ সময় আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, আর তখন তাঁহার হস্তদ্বয় মুষ্টিবদ্ধ ছিল, তুমি তোমার ইচ্ছামত দুই হাতের একটি বাছিয়া নাও। আদম বলিলেন, আমি আমার প্রভুর দক্ষিণ হস্ত বাছিয়া লইলাম এবং আমার প্রভুর উভয় হস্তই দক্ষিণ হস্ত (তাঁহার শানের উপযুক্ত) ও বরকতময়। তারপর আল্লাহ তা'আলা উভয় হস্ত প্রসারিত করিলেন। তখন উভয় হস্তে আদম ও তাঁহার সন্তান-সন্তুতিকে দেখা গেল। আদম বলিলেন, প্রভু! উহারা কাহারা? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, উহারা তোমার সন্তান-সন্ততি। প্রত্যেকটি মানুষের চক্ষুদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে তাহাদের আয়ু লিপিবদ্ধ ছিল। তাহাদের মধ্যকার এক ব্যক্তিকে সর্বাধিক উজ্জ্বল দীপ্তিময় দেখা গেল। তাহার আয়ু কেবল চল্লিশ বৎসর লিখিত ছিল। আদম বলিলেন, সে কে? আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, তোমার সন্তান দাউদ, আর তাঁহার আয়ু আল্লাহ তা'আলা কেবল চল্লিশ বৎসর লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। আদম বলিলেন, প্রভু! ইহার আয়ু বৃদ্ধি করিয়া দিন। আল্লাহতা'আলা বলিলেন: তাহার জন্য উহাই নির্ধারিত করা হইয়াছে। তখন আদম বলিলেন, আমি আমার নিজ আয়ু হইতে তাহার জন্য ষাট বৎসর দিয়া দিলাম। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, উহা হইতেছে তোমার ও তাহার মধ্যকার ব্যাপার। তুমি জান্নাতে বসবাস কর। তারপর আদম আল্লাহ যত দিন চাহিলেন ততদিন জান্নাতে বসবাস করিলেন। তারপর সেখান হইতে অবতরণ করিলেন।
আদম তাঁহার মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে থাকেন। অবশেষে নির্দিষ্ট সময়ে মৃত্যুর ফেরেশতা তাঁহার নিকট আসিলেন। আদম তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন: আপনি সময়ের পূর্বেই আসিয়াছেন। আমার জন্য তো হাজার বৎসর আয়ু বরাদ্দ করা হইয়াছে। মৃত্যুর ফেরেশতা বলিলেনঃ হাঁ, তাহা সত্য বটে, তবে আপনি আপনার পুত্র দাউদের জন্য তাহা হইতে ষাট বৎসর দান করিয়া ফেলিয়াছেন। আদম তাহা অস্বীকার করিয়া বসিলেন। এজন্য তাহার সন্তানদের মধ্যেও অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা দেয়। আদম বিস্মৃত হন, সুতরাং তাহার সন্তানদের মধ্যেও বিস্মৃতি প্রবণতা দেখা দেয়। সেই দিন হইতেই লিপিবদ্ধ করার এবং সাক্ষী রাখার আদেশ দেওয়া হয় (ইব্ন হিব্বান, হাদীছ নং ৬১৩৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ৮২)।
কিন্তু পূর্বোল্লিখিত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত অন্য হাদীছে দাউদ (আ)-এর বয়স চল্লিশ বৎসরের স্থলে ষাট বৎসর বলিয়া উল্লেখ রহিয়াছে।