📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আদম ও হাওয়ার দুনিয়ায় অবতরণ

📄 আদম ও হাওয়ার দুনিয়ায় অবতরণ


সূরা বাকারার ৩৬ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফতী মুহাম্মাদ শফী (র) বলেন, “আদম (আ)-কে বিশেষ গাছ বা উহার ফল খাইতে নিষেধ করা হইয়াছিল এবং তাঁহাকে এ ব্যাপারেও সাবধান করিয়া দেওয়া হইয়াছিল যে, শয়তান তোমাদের শত্রু। কাজেই সে যেন তোমাদেরকে পাপে লিপ্ত করিয়া না দেয়। এতদসত্ত্বেও হযরত আদম (আ)-এর তাহা খাওয়া আপাতদৃষ্টিতে পাপ বলিয়া মনে হয়। অথচ নবীগণ পাপ হইতে মুক্ত ও পবিত্র। সঠিক তথ্য এই যে, নবীগণের যাবতীয় পাপ হইতে মুক্ত ও পরিশুদ্ধ থাকার কথা যুক্তি ও রিওয়ায়াত দ্বারা প্রমাণিত। চার ইমাম ও উম্মতের সর্বসম্মত অভিমতেও নবীগণ ছোটবড় যাবতীয় পাপ হইতে মুক্ত ও পবিত্র। কারণ নবীগণকে গোটা মানবজাতির অনুসরণীয় আদর্শ হিসাবে প্রেরণ করা হইয়াছিল। যদি তাঁহাদের দ্বারাও আল্লাহ পাকের ইচ্ছার পরিপন্থী ছোট-বড় কোন পাপকাজ সম্পন্ন হইত, তবে নবীগণের বাণী ও কার্যাবলীর উপর আস্থা ও বিশ্বাস উঠিয়া যাইত। যদি নবীগণের উপর আস্থা ও বিশ্বাস না থাকে তবে দীন ও শরীআতের স্থান কোথায়? অবশ্য কুরআন পাকের অনেক আয়াতে কতক নবী (আ) সম্পর্কে এ ধরনের ঘটনার বর্ণনা রহিয়াছে যাহাতে মনে হয় যে, তাঁহাদের দ্বারাও পাপ সংঘটিত হইয়াছে এবং আল্লাহ পাকের পক্ষ হইতে এজন্য তাঁহাদেরকে সর্তক করিয়া দেওয়া হইয়াছে। হযরত আদম (আ)-এর ঘটনাও এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।
এ ধরনের ঘটনাবলী সম্পর্কে উম্মতের সর্বসম্মত মত এই যে, ভুলবশত বা অনিচ্ছাকৃত কারণে নবীদের দ্বারা এ ধরনের কাজ সংঘটিত হইয়া থাকে। কোন নবী জানিয়া শুনিয়া বা ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ পাকের হুকুমের পরিপন্থী কোন কাজ করেন নাই। এ ত্রুটি ইজতিহাদগত ও অনিচ্ছাকৃত এবং তাহা ক্ষমার যোগ্য। শরীআতের পরিভাষায় ইহাকে পাপ বলা চলে না এবং এ ধরনের ভুল ও ত্রুটি-বিচ্যুতি সেসব বিষয়ে হইতেই পারে না যাহার সম্পর্ক ধর্মীয় শিক্ষা ও প্রচার এবং শরীআতের বিধি-বিধানের সহিত রহিয়াছে এবং তাঁহাদের ব্যক্তিগত কাজকর্মে এ ধরনের ভুল-ত্রুটি হইতে পারে। হযরত আদম (আ)-এর এই ঘটনা সম্পর্কে তাফসীরবিদগণ বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়াছেন।
(১) হযরত আদম (আ) কে যখন নিষেধ করা হইয়াছিল, তখন এক নির্দিষ্ট গাছের প্রতি ইঙ্গিত করিয়াই তাহা করা হইয়াছিল। কিন্তু তাহাতে শুধুমাত্র সে গাছটিই উদ্দিষ্ট ছিল না, বরং সে জাতীয় যাবতীয় গাছই ইহার অন্তর্ভুক্ত ছিল। যেমন হাদীছে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (স) একখণ্ড রেশমী কাপড় ও স্বর্ণ হাতে নিয়া ইরশাদ করিলেন, "এ বস্তু দুইটি আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম"। এ কথা সুস্পষ্ট যে, শুধু ঐ বিশেষ কাপড় ও স্বর্ণখণ্ড ব্যবহারই হারাম ছিল না যে দুইটি হুযুর (সা)-এর হাতে ছিল, বরং যাবতীয় রেশমী কাপড় ও স্বর্ণ সম্পর্কেই ছিল এই হুকুম, কিন্তু এখানে হয়তো এ ধারণাও হইতে পারে যে, এ নিষেধাজ্ঞার সম্পর্ক সেই বিশেষ কাপড় ও স্বর্ণ খণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল যেগুলি সে সময় তাঁহার হাতে ছিল। অনুরূপভাবে হযরত আদম (আ)-এর হয়তো এ ধারণা হইয়াছিল যে, যে গাছের প্রতি ইঙ্গিত করিয়া নিষেধ করা হইয়াছিল, এ নিষেধের সম্পর্ক ঐ গাছটিতেই সীমাবদ্ধ। শয়তান এ ধারণা তাঁর অন্তরে বদ্ধমূল করিয়া দিয়াছিল এবং কসম খাইয়া বিশ্বাস জন্মাইল যে, আমি তোমাদের হিতাকাঙ্খী। তোমাদেরকে এমন কোন কাজের পরামর্শ দেই না যাহা তোমাদের পক্ষে ক্ষতিকর হইতে পারে। যে গাছ সম্পর্কে নিষেধ করা হইয়াছিল তাহা অন্য গাছ।
তাহা ছাড়া এমনও হইতে পারে যে, শয়তান এ কুমন্ত্রণা তাঁহার অন্তঃকরণে সঞ্চারিত করিয়াছিল যে, এ গাছ সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞা আপনার সৃষ্টির সূচনা পর্বের সহিত সম্পৃক্ত ছিল। যেমন সদ্যজাত শিশুকে জীবনের প্রথম পর্যায়ে শক্ত ও গুরুপাক আহার হইতে বিরত রাখা হয়, কিন্তু সময় ও শক্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে সব ধরনের আহার্য গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়। সুতরাং এখানে আপনি শক্ত সমর্থ হইয়াছেন। এখন সে বিধিনিষেধ কার্যকর নয়।
আবার এ সম্ভাবনাও রহিয়াছে যে, শয়তান যখন আদম (আ)-কে সেই গাছের উপকারিতা ও গুণাবলীর বর্ণনা দিতেছিল, যেমন সেই গাছের ফল খাইলে আপনি অনন্তকাল নিশ্চিন্তে জান্নাতের নেয়ামতাদি ও সুখ-সাচ্ছন্দ্য ভোগ করিতে পারিবেন। তখন তাঁহার সৃষ্টির প্রথম পর্বে সে গাছ সম্পর্কে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কথা তাঁহার মনে ছিল না। কুরআন শরীফের فَنَسَى وَلَمْ نَجِدٌ لَهُ عَزَّمًا (আদম ভুলিয়া গেল এবং আমি তাহার মধ্যে সংকল্পের দৃঢ়তা পাই নাই) আয়াতও এ সম্ভাবতা সমর্থন করে। যাহাতে এ ধরনের বহু সম্ভাবনা থাকিতে পারে। তবে সারকথা এই যে, হযরত আদম (আ) বুঝিয়া শুনিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে এ হুকুম অমান্য করেন নাই, বরং তাঁহার দ্বারা ভুল হইয়া গিয়াছিল, যাহা প্রকৃতপক্ষে কোন পাপ নয়। অবশ্য আদম (আ) স্বীয় ভুলের জন্য তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার পর তাঁহাকে মাফ করিয়া দেওয়া হয়ে (তাফসীর মাআরিফুল কুরআন, মাদীনা মুনাওয়ারা থেকে মুদ্রিত, পৃ. ৩১)।
উপরন্তু আল্লাহ তা'আলা এ ঘটনার জন্য আদম (আ)-এর চেয়ে ইবলীসকেই অধিকতর দায়ী করিয়াছেন (দ্র. ২: ১২০, ২:৩৬, ৭:১১, ৭:২১, ৭:২২)। উপরিউক্ত আয়াতসমূহের প্রত্যেকটিতেই শয়তানকে আদম (আ)-কে প্ররোচিত করার জন্য দায়ী করা হইয়াছে এবং আদম (আ)-এর পদস্খলন বলিয়া ঐ ঘটনাকে অবিহিত করা হইয়াছে, পাপ বলা হয় নাই।
আদম ও হাওয়ার দুনিয়ায় অবতরণ
পূর্ব সতর্কীকরণ সত্ত্বেও নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণের জন্য আল্লাহ আদম (আ)-কে লক্ষ্য করিয়া বলিলেনঃ (৭ঃ ২২)
وَنَادُهُمَا رَبُّهُمَا أَلَمْ أَنْهُكُمَا عَنْ تِلْكُمَا الشَّجَرَةِ وَأقُلْ لَكُمَا إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمَا عَدُوٌّ مُّبِينٌ
"আমি কি তোমাদেরকে এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হইতে বারণ করি নাই এবং আমি কি তোমাদেরকে বলি নাই যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু” (৭ঃ ২২)।?
আদম (আ) ও হাওয়া (আ) তাঁহাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হইয়া আল্লাহ্ শিখানো তওবার বাণী দ্বারা দোআ করিলেন:
ربَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ
"হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করিয়াছি। যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন তবে আমরা নিশ্চিতভাবেই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হইব” (৭ঃ ২৩)।
قُلْنَا اهْبِطُوا مِنْهَا جَمِيعًا فَإِما يَأْتِيَنَّكُمْ مِنِّى هُدًى فَمَنْ تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَاهُمْ يَحْزَنُونَ . وَالَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِايَتِنَا أُولَئِكَ أَصْحَبُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَلِدُونَ .
"তোমরা সকলেই এখান হইতে নামিয়া যাও। পরে যখন আমার পক্ষ হইতে তোমাদের নিকট হেদায়াত আসিবে তখন যাহারা আমার হেদায়াত অনুসরণ করিবে তাহাদের কোন ভয় নাই এবং তাহারা দুঃখিতও হইবে না। যাহারা কুফরী করিবে ও আমার নির্দেশসমূহ অমান্য করিবে, তাহারাই অগ্নিবাসী, সেখানে তাহারা স্থায়ী হইবে" (২: ৩৮-৯)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় শায়খুল হিন্দ মওলানা মাহমূদুল হাসান '(র) লিখিয়াছেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ)-এর তওবা তো কবুল করিলেন কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে জান্নাতে পুনর্গমনের নির্দেশ দিলেন না, বরং পৃথিবীতে বসবাসের যে হুকুম দিয়াছিলেন তাহাই বহাল রাখিলেন। কেননা উহাই ছিল তাঁহার হিকমতের অনুকূল। যেহেতু আদম (আ)-কে দুনিয়ার খলীফা মনোনীত করা হইয়াছিল, বেহেশতের জন্য নহে, সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলা বলিয়া দিলেন, যাহারা আমার আদেশ পালনকারী হইবে, পৃথিবীতে বসবাস তাহাদের জন্য ক্ষতিকর হইবে না বরং লাভজনকই হইবে। তবে যাহারা নাফরমান তথা আল্লাহ্র আদেশ অমান্যকারী হইবে, তাহাদের জন্য জাহান্নাম, আর এই পার্থক্য বিধানের জন্য সমুচিত ক্ষেত্রও এই পৃথিবীই (ফাওয়াইদে শায়খুল হিন্দ, তাফসীর উছমানী, টীকা নং ৬১, ২: ৩৮ নং আয়াতের ব্যাখ্যা)। এই ব্যাখ্যায় উল্লিখিত প্রথম নির্দেশটি ছিল এইরূপ:
قُلْنَا اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلى حِينٍ .
"আমি বলিলম, তোমরা একে অন্যের শত্রুরূপে নামিয়া যাও, পৃথিবীতে কিছু কালের জন্য তোমাদের বসবাস ও জীবিকা রহিল" (২:৩৬)।
লক্ষণীয়, এখানে 'তোমরা নামিয়া যাও' আদেশে বহুবচন বোধক ক্রিয়াপদ ব্যবহৃত হইয়াছে। অন্যত্র বলা হইয়াছে:
قَالَ اهْبِطَا مِنْهَا جَمِيعًا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ
"তিনি বলিলেন, তোমরা উভয়ে একই সঙ্গে জান্নাত হইতে নামিয়া যাও। তোমরা পরস্পর পরস্পরের শত্রু” (২০: ১২৩)।
এখানে দ্বিবাচক ক্রিয়াপদ ব্যবহার করিয়া আদম (আ) ও ইবলীসকে বুঝান হইয়াছে। ইব্‌ন আবী হাতিম হযরত ইব্‌ন আব্বাস (র)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন: "আদম (আ)-কে মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী দাহ্না নামক স্থানে নামাইয়া দেওয়া হয়।" পক্ষান্তরে হাসান হইতে বর্ণিত আছেঃ "আদম (আ)-কে ভারতবর্ষে, হাওয়াকে জিদ্দায়, ইবলীসকে দাস্তিমসানে, যাহা বসরা হইতে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত এবং সর্পকে ইসফাহানে নামাইয়া দেওয়া হয়।" ইব্‌ন আবী হাতিমেরও অনুরূপ একটি বর্ণনা রহিয়াছে। আস-সুদ্দী (র) বলেন, "আদম (আ) ভারতবর্ষে অবতরণ করেন এবং তাঁহার সহিত হাজরে আসওয়াদত্ত অবতীর্ণ হয়। আদম (আ)-এর হাতের মুষ্টিতে তখন জান্নাতের লতাপাতা ছিল যাহা তিনি ভারতবর্ষে রোপণ করেন, ফলে সেখানে সুগন্ধি বৃক্ষ উৎপন্ন হয়" (কাসাসুল আম্বিয়া, ইন্ন কাছীর, পৃ. ২৯)।
ইবন উমার (রা)-এর বর্ণনায় আদম (আ) সাফায় এবং হাওয়া মারওয়ায় অবতরণ করিয়াছিলেন বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। ইব্‌ন আবূ হাতিমও অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩১)।
আবদুর রায্যাক হযরত আবূ মূসা আশ্'আরী (রা)-এর বরাতে বর্ণনা করেন: "আল্লাহ তা'আলা যখন আদম (আ)-কে জান্নাত হইতে পৃথিবীতে নামাইয়া দিলেন তখন তাঁহাকে সর্বপ্রকার কাজ শিক্ষা দেন। তিনি তাঁহাকে জান্নাতের ফলমূল পাথেয়স্বরূপ সাথে দিয়া দেন। তোমাদের এইসব ফলমূল হইতেছে জান্নাতের সেই ফলমূলেরই অংশ। তবে হাঁ, তোমাদের এই ফলমূলগুলি পরিবর্তিত ও বিকৃত হয়, কিন্তু সেগুলি ছিল অপরিবর্তিত ও অবিকৃত” (হাকিম, ২খ, পৃ. ৪৫৩)।
সহীহ মুসলিমে উল্লিখিত হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত হাদীছে আছেঃ "সর্বোত্তম দিন, যাহাতে সূর্যোদয় হয়, জুমু'আর দিন। কেননা এই দিনেই আদম (আ)-কে সৃষ্টি করা হয়, এই দিনেই তাঁহাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয় এবং এই দিনেই তাঁহাকে জান্নাত হইতে বাহির করা হয়"।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আদম (আ)-এর তওবা

📄 আদম (আ)-এর তওবা


আবু হাতিম হযরত উবায়্য ইন্ন কা'ব (রা) বর্ণিত হাদীছ বর্ণনা করেন যাহাতে বলা হইয়াছে: রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আদম (আ) আল্লাহ তা'আলার দরবারে আরয করেন, আমি যদি তওবা করি এবং আপনার দিকে রুজু হই তাহা হইলে কি আমি বেহেশতে ফিরিয়া যাইতে পারিব? জবাবে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হাঁ। এই প্রসঙ্গেই আয়াত নাযিল হয়:
فَتَلَقَّى آدَمُ مِنْ رَّبِّهِ كَلِمَت فَتَابَ عَلَيْهِ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ .
"অতঃপর আদম তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে কিছু বাণী প্রাপ্ত হইল। আল্লাহ তাহার প্রতি ক্ষমাপরবশ হইলেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (২ঃ৩৭)।
মুজাহিদ, কাতাদা, সাঈদ ইবন জুবায়র প্রমুখ হইতে বর্ণিত আছে যে, সেই বিশেষ প্রার্থনা বাক্য ছিল সূরা আ'রাফের ২৩ নং আয়াতে বর্ণিত বাক্যগুলি:
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَّمْ تَغْفِرْلَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ .
"হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করিয়াছি, যদি তুমি আমাদেরকে ক্ষমা না কর এবং দয়া না কর তবে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হইব" (৭ঃ ২৩; তাফসীর তাবারী, জিলদ ১, পৃ. ২৪৪-২৪৫)।
হাকেম তদীয় মুস্তাদরাক গ্রন্থে সাঈদ ইব্‌ন জুবায়র-ইব্‌ন আব্বাস (র) সূত্রে উপরিউক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন: "আদম (আ) বলিলেন: আপনি কি আমাকে স্বহস্তে সৃষ্টি করেন নাই? জবাবে তাঁহাকে বলা হইল: হাঁ। তিনি প্রশ্ন করিলেন: আপনি কি আমার মধ্যে আপনার রূহ ফুঁকিয়া দেন নাই?' জবাবে বলা হইল: হাঁ। তিনি আবার প্রশ্ন করিলেন: আমি যদি তওবা করি, আপনি কি আমাকে জান্নাতে ফিরাইয়া নিবেন? জবাবে আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: হাঁ (হাকেম, ২খ, পৃ. ৫৪৫)। হাকেম উহা সহীহ বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন (ইবন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩১)।
হাকেম হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (র) বর্ণিত রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: আদমের যখন পদস্খলন হইল তখন তিনি বলিলেন, প্রভু! মুহাম্মাদ (স)-এর উসীলায় আমি আপনার নিকট যাজ্ঞা করিতেছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করিয়া দিন। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: তুমি মুহাম্মাদকে কেমনে চিনিতে পারিলে অথচ এখনও আমি তাহাকে সৃষ্টি করি নাই? জবাবে আদম (আ) বলিলেন: যখন আপনি স্বহস্তে আমাকে সৃষ্টি করিলেন এবং আমার মধ্যে আপনার 'রূহ' ফুঁকিয়া দিলেন তখন আমি মাথা উঠাইয়া আরশের পায়াসমূহের মধ্যে লিখিত দেখিতে পাইলাম : لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَّسُولُ الله তখন আমি উপলব্ধি করিতে পারিলাম যে, নিশ্চয়ই আপনার সৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক প্রিয় সত্তা ব্যতীত অন্য কাহাকেও আপনি আপনার পবিত্র নামের সহিত সম্পর্কিত করেন নাই। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: তুমি যথার্থই বলিয়াছ হে আদম! নিশ্চয় তিনি আমার কাছে সৃষ্টি জগতের সকলের তুলনায় প্রিয়। যখন তুমি তাঁহার উসীলায় ক্ষমা প্রার্থনা করিয়াছ, তখন আমি তোমাকে মাফ করিয়া দিলাম। মুহাম্মাদ না হইলে আমি তোমাকেও সৃষ্টি করিতাম না (হাকিম, মুস্তাদরাক, জিলদ ২, পৃ. ৬১৫)। হাদীছটির মূল উৎস আল-মুসতাদরাক, ২খ., পৃ. ৬১৫ এবং তাবারানীর মুজামুস সাগীর, পৃ. ২০৭। উক্ত গ্রন্থদ্বয় হইতে ইহা বায়কীর দালাইলুন নুবুওয়্যা, বাব মা জাআ ফীমা তাহাদ্দাছা বিহি (স) বিনি'মাতি রব্বিহি; ইব্‌ন আসাকির, ২খ., পৃ. ৩২৩; হায়ছামীর মাজমা'উয যাওয়াইদ, ৮খ., পৃ. ২৬০ প্রভৃতি গ্রন্থে উক্ত হইয়াছে। হাকেম ইহার সনদসূত্র যথার্থ বলিয়া মত ব্যক্ত করিলেও তাহা যথার্থ নহে। হাদীছের যথার্থতা যাচাইকারী ইমামগণ, যথা ইমাম যাহাবী, ইব্‌ন কাছীর (তারীখ, ২খ., পৃ. ৩২৩), ইব্‌ন হাজার আসকালানী, ইব্‌ন হিব্বান, আবূ নু'আয়ম, ইব্‌ন তায়মিয়্যা প্রমুখ ইমামগণ ইহাকে জাল হাদীছ (মনগড়া) ও বাতিল রিওয়ায়াত বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন। ইমাম বায়হাকী, ইবনুল জাওযী, তাহাবী প্রমুখ উক্ত রিওয়ায়াতের কতক রাবীর কঠোর সমালোচনা করিয়াছেন (বিস্তারিত দ্র. নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীছিদ দা'ঈফা ওয়াল-মাওদূআহ, ৪র্থ সং., বৈরূত-দামিল্ক ১৩৯৮ হি., ১খ., পৃ. ৩৮-৪৭, নং ২৫)। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে আদম (আ) আল্লাহর শিখানো দোআটি ছিল:
رَبُّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْلَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ (۲۳ : ۷) .

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আদম (আ) ও মূসা (আ)-এর বাদানুবাদ

📄 আদম (আ) ও মূসা (আ)-এর বাদানুবাদ


আদম (আ) কর্তৃক নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ, বেহেশত হইতে তাঁহার নির্গমন ও এই পৃথিবীতে আগমন বাহ্যত তাঁহার অপরাধ ও শাস্তি মনে হইলেও ইহাই ছিল মহান কুশলী স্রষ্টার অভিপ্রায়। এই ব্যাপারে হযরত মূসা (আ) কর্তৃক আদি পিতা আদম (আ)-এর অভিযুক্ত হওয়া এবং সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাঁহার জবাব দানের বিবরণও এই সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করে। বুখারী শরীফে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীছে বলা হইয়াছে যে, নবী করীম (স) বলেন: মূসা (আ) আদম (আ)-এর সহিত বিতর্কে বলিলেন: আপনিই মানব জাতিকে আপনার ত্রুটির কারণে বেহেশত হইতে বহিষ্কার করিয়াছেন এবং তাহাদের দুর্ভাগ্য-দুর্গতির কারণ হইয়াছেন। আদম (আ) বলিলেনঃ হে মূসা! তুমি সেই ব্যক্তি যাহাকে আল্লাহ তাঁহার রিসালাত ও বাক্যালাপের জন্য নির্বাচিত ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করিয়াছেন। তুমি কি এমন একটি ব্যাপারে আমাকে দোষারোপ করিতেছ যাহা আমাকে সৃষ্টি করার পূর্বেই আল্লাহ আমার জন্য নির্ধারিত করিয়া রাখিয়াছিলেন? রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আদম (আ) বিতর্কে মূসা (আ)-এর উপর জয়ী হন। বুখারীর এক রিওয়ায়াতে রাসূলুল্লাহ (স) এই কথাটি ২ বার এবং অন্য রিওয়ায়াতে ৩ বার বলিয়াছেন বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে।
এই প্রসঙ্গে ইমাম আহমদ উল্লেখ করেন আদম (আ) মূসা (আ)-এর প্রতি তাওরাত নাযিলের কথা উল্লেখের সময় সাথে সাথে তাঁহাকে প্রশ্ন করেন: "আমি আগের, নাকি যিকর (তাওরাত) আগের?” জবাবে মূসা (আ) বলিলেন: না, বরং যিকর (তাওরাত) আগের। এই বর্ণনায় আরও আছে, মূসা (আ) আদম (আ) কে বলিয়াছিলেন: "আপনি সেই আদম যাহাকে আল্লাহ স্বহস্তে সৃষ্টি করিয়াছেন, তাঁহার ফেরেশতা দিয়া আপনাকে সিজদা করাইয়াছেন, আপনাকে জান্নাতে বসবাস করাইয়াছেন। তারপর আপনি সেই কাজটি করিলেন, যাহা আপনি করিয়াছিলেন"। আহমদের অন্য বর্ণনায় আছে, আদম (আ) ঐ সময় মূসা (আ) কে প্রশ্ন করেন: "আমার সৃষ্টির পূর্বেই কি তুমি আমার ব্যাপারে উহা লিখিত পাও নাই?" মূসা (আ) তাহা স্বীকার করিলেন। এইভাবে আদম (আ) মূসাকে পরাস্ত করিলেন (আহমাদ, ২খ. ৩৯২)।
ইবন আবূ হাতিমের বর্ণনায় আছে, আদম (আ) মূসা (আ)-কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তাওরাত আমার জন্মের কত আগে লিখিত হইয়াছিল? মূসা (আ) বলেন: চল্লিশ বৎসর আগে। আদম (আ) আবার প্রশ্ন করেন: তাহাতে কি পাও নাই: (وَغَطَى أَدَمُ رَبَّهُ فَفَوُی ) আদম তাহার প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করে এবং ভ্রমে পতিত হয়, ২০ : ১২১? জবাবে মূসা (আ) বলিলেন: হাঁ। তখন আদম (আ) বলিলেন: যে কাজটি আমি করিব বলিয়া আমাকে সৃষ্টির চল্লিশ বৎসর পূর্বেই লিপিবদ্ধ করা হইয়াছে, তাহা আমি কেন করিলাম এইজন্য তুমি আমাকে ভর্ৎসনা করিতেছ?" রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আদম মূসার উপরে জয়ী হইলেন। ইমাম মুসলিমও হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন (মুসলিম, হাদীছ নং ২৬৫২; কাসাসুল আম্বিয়া, ইবন কাছীর, পৃ. ৩৬)।
বায়হাকীর বর্ণনায় আদম (আ)-এর জবাবী বাক্যটি আরও জোরদারভাবে বর্ণিত হইয়াছে এইভাবে: "তুমি এমন একটি ব্যাপারে আমাকে তিরস্কার করিতেছ যাহা মহান আল্লাহ কর্তৃক পূর্বেই স্থিরীকৃত হইয়াছিল" (বায়হাকী, ফী আল-আসমা ওয়াস-সিফাত ১খ, ৩১৬)।
মূসা ও আদম (আ)-এর এই বাদানুবাদ কোথায় কিভাবে হইয়াছিল সেই সম্পর্কে মতভেদ আছে। (১) য়াযীদ ইবন হরমূয-এর বর্ণনায় عند ربهما )তাঁহাদের প্রতিপালকের দরবারে) কথাটি আছে। (২) মুহাম্মাদ ইবন সীরীন-এর বর্ণনায় আছে التقى ادم موسی )মূসা ও আদমের সাক্ষাৎ হয়)। (৩) আম্মার ও শা'বীর বর্ণনায় আছে لقى موسی ادم আদম (আ) মূসা (আ)-এর সহিত সাক্ষাৎ করিলেন)]।
(৪) হযরত উমর (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীছে আছে: মূসা (আ) আদম (আ)-এর সহিত সাক্ষাৎ করেন।
(৫) আবূ দাউদের বর্ণনায় আছে: (قال موسى يا رب أرنی ادم) (মুসা বলেন : হে আল্লাহ! আমাকে আদমকে দেখাইয়া দিন)।
ফাতহুল বারীতে হাফিয ইব্‌ন হাজার বলেন, উক্ত ঘটনা কখনকার তাহা লইয়া পণ্ডিতগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। কেহ কেহ বলিয়াছেন, হয়তোবা উহা মূসা (আ)-এর আমলের ঘটনা। মূসা (আ)-এর মুজিযাস্বরূপ আল্লাহ তা'আলা তখন আদম (আ)-এর প্রতি ওহী প্রেরণ করেন এবং তিনিই তাঁহাকে কথা বলান অথবা তাঁহার জন্য আদম (আ)-এর কবর উন্মোচিত করিয়া দেন এবং তাঁহার কাশ্‌ফ হয়। তখন তাঁহারা দুইজন কথোপকথন করেন অথবা তাঁহাকে আদম (আ)-এর রূহ দেখাইয়া দেন, যেমনটি নবী করীম (স)-কে মি'রাজ রজনীতে নবী-রাসূলগণের রূহ দেখান হইয়াছিল অথবা তাঁহাকে স্বপ্নে আদম (আ)-কে দেখান হয়। আর নবী-রাসূলগণের স্বপ্নও ওহীবিশেষ যদিও তাহা পরবর্তী কালে সংঘটিত হয়। ইহা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ, যেমনটি ইসমাঈল যাবীহুল্লাহ (আ)-এর ব্যাপারে ঘটিয়াছিল অথবা ইহা মূসা (আ)-এর ইন্তিকালের পরে সংঘটিত হইয়াছিল। তাঁহার মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই আলমে বারযাখে এই সাক্ষাৎকার ঘটে। প্রথম আসমানে তাঁহাদের উভয়ের রূহের সাক্ষাৎ হয়। ইব্‌ন আবদিল বারর ও কাসিবী এই মত দৃঢ়ভাবে পোষণ করেন। ইব্‌ন উমার (রা) বর্ণিত হাদীছে তো এইরূপ উক্ত হইয়াছে যে, মূসা (আ) যখন বলিলেন: 'আপনিই আদম?' আদম (আ) বলিলেন: আপনি কে? তিনি বলিলেন, আমি মূসা। উহা নিশ্চয়ই পরে সংঘটিত হয় নাই। উহা পরকালে সংঘটিত হইবে। হাদীছেঅতীত বাচক শব্দ প্রয়োগ করা হইয়াছে। এই অর্থে উহা নিশ্চিতভাবেই সংঘটিত হইবে। ইবনুল জাওযী বারযাখে তাঁহাদের সাক্ষাতের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করিয়াছেন। আবার উহা একটি রূপক বা মিছাল হওয়ার কথাটাও উড়াইয়া দেওয়া যায় না। তখন উহার অর্থ হইবে, যদি তাঁহাদের দুইজনের সাক্ষাৎ হইত, তবে অবশ্যই তাহাদের মধ্যে উক্তরূপ বাক্যালাপ হইত (ফাতহুল বারী, ১১খ, পৃ. ৫১৫; দারুর রায়্যান বিত-তুরাছ, ২য় সং, কায়রো ১৯৮৯)।
শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দিহলাবী (র) বলেন : উহার সারমর্ম হইল, স্বপ্নে কোন ফেরেশতা বা পুণ্যবান লোকের কাছে অজ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসার মাধ্যমে কোন ব্যক্তির জ্ঞানলাভের মতো রূহের জগতে মূসা (আ) হযরত আদম (আ)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করিয়া উক্ত ঘটনাগর্ভে নিহিত বিষয়াদি জানিয়া লইয়াছিলেন। আল্লাহ তা'আলা মূসা (আ)-এর জন্য ইল্‌ম-এর এই দ্বার উন্মুক্ত করিয়াছিলেন (তা'লীকুস সাবীহ 'আলা মিশকাত মাসাবীহ, ইদ্রিস কান্দেহলাবী, পৃ. ৭৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তওবা কবুলের পর তিরস্কার নিষিদ্ধ

📄 তওবা কবুলের পর তিরস্কার নিষিদ্ধ


পূর্বেই আলোচনা করা হইয়াছে যে, আদম (আ)-এর নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ কোন অপরাধ ছিল না, তবুও তাঁহার মত মর্যাদাসম্পন্ন সত্তা এবং আদি মানব ও আদি নবীর পক্ষে তাহা শোভনীয় হয় নাই বিধায় তাঁহার এই কর্মটিকে عصيان (পদস্খলন) বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। একই আয়াতের غوى শব্দটির অর্থে জীবন বিস্বাদ হইয়া যাওয়া। কুরতুবী প্রমুখ তাফসীরবিদগণ আয়াতে উক্ত غوی শব্দটি এই অর্থেই ব্যবহৃত হইয়াছে বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (দ্র. কুরতুবী, ঐ আয়াতের ব্যাখ্যায়)। ইবনুল আরাবী শব্দের আলোচনা প্রসঙ্গে লিখেন : কুরআন শরীফের উক্ত আয়াত আলোচনা প্রসঙ্গ বা এই সংক্রান্ত উক্ত হাদীছের আলোচনা প্রসঙ্গ ছাড়া আজ আমাদের মধ্যকার কাহারও জন্য আদম (আ)-এর অপরাধ প্রসঙ্গ আলোচনা করা জায়েয নহে। নিজেদের পক্ষ হইতে যেখানে নিজদের নিকটবর্তী কালের এবং নিজেদের প্রায় সমপর্যায়ের পিতৃপুরুষগণের সম্পর্কে এইরূপ আলোচনা জায়েয নহে, সেখানে আমাদের আদি পিতা এবং সবচাইতে সম্মানিত পিতা ও সর্বপ্রথম নবীর ব্যাপারে এইরূপ নিন্দাসূচক আলোচনা কীরূপে জায়েয হইতে পারে- যেখানে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার কৈফিয়ত গ্রহণ করিয়া তাঁহার তওবা কবুল করিয়া তাঁহাকে ক্ষমাও করিয়া দিয়াছেন? এই কারনেই আবু নসর কুশায়রী (র) বলেন: কুরআনে ব্যবহৃত উক্ত শব্দের কারণে আদম (আ)-কে গুনাহগার ও পথভ্রষ্ট বলা জায়েয নহে। কুরআন পাকের যেখানেই কোন নবী অথবা রাসূল সম্পর্কে এরূপ ভাষণ প্রয়োগ করা হইয়াছে, তাহা হয় অনুত্তম ( خلاف أولى) বুঝানোর জন্য, না হয় নবুওয়াত পূর্ববর্তী অবস্থা বুঝানোর জন্যই ব্যবহৃত হইয়াছে। তাই কুরআনী আয়াতে ও হাদীছ রিওয়ায়াতের প্রসঙ্গ ব্যতিরেকে নিজেদের পক্ষ হইতে এরূপ বিষয়ের অবতারণা করার বৈধতা বা অনুমতি নাই (কুরতুবী, ২০: ১২২,-এর তাফসীর প্রসঙ্গে; তাফসীর মা'আরিফুল কুরআন, মুফতী মুহাম্মদ শফী, উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায়)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00